alt

উপ-সম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা

সন্ধ্যা রানী সাহা

: রোববার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষে আমরা আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের একটি চিঠি টাঙানো অবস্থায় দেখতে পাই। যেখানে তিনি তার ছেলের শিক্ষকের উদ্দেশ্যে কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সেই ঐতিহাসিক চিঠির শেষটা এ রকম- ‘আমার ছেলের প্রতি সদয় আচরণ করবেন; কিন্তু সোহাগ করবেন না। কেন না আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তান যেন বিপদে ধৈর্য হারা না হয়। থাকে যেন তার সাহসী হওয়ার প্রত্যয়। তাকে এ শিক্ষাও দেবেন- নিজের প্রতি তার যেন পূর্ণ আস্থা থাকে। আর তখনই তার আস্থা থাকবে সমগ্র মানব জাতির প্রতি।’

বাস্তবে আমাদের দেশের কোনো অভিভাবক কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষককে অনুরূপ কোনো নির্দেশনা দিয়ে পত্র দেবেন কিম্বা কোনো শিক্ষক কোনো অভিভাবককে অনুরূপ পত্র দেবেন; একথা ভাবা যায় না। নানা কারণে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের পরিবারের মধ্যে তেমন কোনো সেতুবন্ধন নেই বললেই চলে। যার ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার এবং পাঠ সমাপ্তির হারের মধ্যে ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। এপিএসসি ২০২০ অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রস ভর্তির হার (জরিপ অনুযায়ী নির্ধারিত বয়স এবং তার বাইরের সবার) ১০৪.৯ %। এবং প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপ্তির হার ৮২.৮০%। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এ ব্যবধান লক্ষণীয়। অথচ এসডিজির ৪নং লক্ষ্য অনুযায়ী সকলের জন্য একীভূত এবং সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ ২০৩০ সালের মধ্যেই নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

কাজেই শুধুমাত্র শিক্ষকদের নানাভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে। আমাদের প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা যে পিছিয়ে পড়ছে এজন্য শিক্ষক এবং অন্যান্য স্টেক-হোল্ডারদের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ করার প্রবণতা রয়েছে। শ্রেণীকক্ষ পর্যবেক্ষণকালে শিক্ষার্থী উপস্থিতির নিম্নহার এবং অনেকের শিখনফল অর্জন করতে না পারার কারণ হিসেবে শিক্ষকগণ অনেক সময় কলে থাকেন যে অভিভাবক অসচেতন, অসচ্ছল, বাড়িতে পড়ে না, প্রতিদিন আসে না ইত্যাদি। এ থেকে অভিভাবকদের সাথে যে শিক্ষকদের এবং পর্যবেক্ষক/পরিদর্শকদের (প্রকারান্তরে তারাও এক ধরনের শিক্ষক) তেমন সম্পর্ক নেই তা ভালোভাবেই বোঝা যায়।

যদিও ১১ সদস্যের বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মধ্যে অভিভাবকদের চারজন প্রতিনিধি এবং শিক্ষকদের তিন জন প্রতিনিধি রয়েছেন। আছে শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি নামের আরেকটি ১০ সদস্যের সংগঠন। যেগুলো মূলত শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে শিশুর মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জন কেন্দ্রিক কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে বিদ্যালয় যেন সুপরিচালিত হতে পারে সে বিষয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; কিন্তু এসব কমিটির প্রত্যেকটি যে সমানভাবে তৎপর তা মোটেও নয়। কমিটির সভাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে শুধুই আনুষ্ঠনিকতায় পরিণত হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য বর্তমানে যে মা সমাবেশ চালু আছে তাতে শিক্ষকদের এবং কর্মকর্তাদের প্রাধান্যের কারণে (পরিচালকের ভূমিকায়) খুব বেশি সফল করা যায় না।

অভিভাবকদের প্রতি শিক্ষকগণের যতগুলো অভিযোগ আমরা শুনে থাকি অভিভাবকদের অবশ্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ততটা বলতে শুনি না। শিক্ষার্থীদের শারিরীকভাবে আহত না করা পর্যন্ত অভিভাবকগণ সাধারণত শিক্ষকদের বিরূদ্ধে যায় না। এমনকি শিশুর শিখনফল অর্জন হলো না কেন- এ বিষয়েও অভিভাবকরা উদাসীন থাকে। বড়জোর তারা নিজের শিশুরই ধারণ ক্ষমতা কম বলে হার মানে। শিক্ষিত এবং সচেতন অভিভাবকগণ নিজ দায়িত্বে শধুমাত্র তাদের নিজেদের শিশুদের দেখভাল করে থাকে। বিদ্যালয়ের অন্যদের বিষয়ে তাদের সেরকম ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে বাকিরা পিছিয়ে পড়ে। অথচ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রযাত্রায় দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীকে সমানভাবে যোগ্য করে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। কারণ তখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরতরাই থাকবে। তাই তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের সর্বত্র একটি প্রাথমিক শিক্ষাবান্ধব সংস্কৃতি সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বপ্রথম অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে সচেতন করা অত্যাবশ্যক- এ বিষয়টি শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনদের উপলব্ধি করতে হবে।

এক্ষত্রে শুধুমাত্র কমিটি গঠন করে কার্যাবলীর তালিকা বুঝিয়ে দেয়া যথেষ্ট নয়। আমরা জানি শিক্ষকরা শিশুদের এক প্রকার অভিভাবক। আবার অভিভাবকগণও অনেকটা শিক্ষক। অতএব শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক স্থাপন এবং তা বজায় রাখতে স্ট্র্যাটেজিক প্লান প্রস্তুত করে তদানুযায়ী প্রতি মাসে বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অগ্রগতি মনিটর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক বর্তমানের মতো নামেমাত্র থাকলে চলবে না। শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সব নিয়ম যেমন- কাজের পরিমাণ ও গুণগত দিক, সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সবাই মিলে কাজ করা ইত্যাদি অনুসরণ করে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের জন্য কী কী কাজ করতে পারে সে বিষয়ে প্রথমত শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট তৃণমূল পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের উৎসাহিত করবেন। ধরা যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে ডাক্তার কর্মসূচি চলমান। কর্মসূচি চলাকালে বিদ্যালয়ের ১৫ সদস্য বিশিষ্টক্ষুদে ডাক্তার দল স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থীর ওজন ঊচ্চতার চেয়ে কম পাওয়া গেল। এমত অবস্থায় শিক্ষকদের কাজ দ্রুত অভিভাবকদের তা অবহিত করে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার এবং বিশ্রামসহ অন্যান্য বিষয়ের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে নিকটবর্তী চিকিৎসালয়ে শিশুকে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করা; কিন্তু বাস্তবে ওই ওজন-উচ্চতা পরিমাপ করে লিখে রাখার মধ্যেই যদি সীমাবদ্ধ থাকা হয় তাহলে কম ওজনের শিশু শ্রেণীকক্ষে সেভাবে রেসপন্স করবে না, তার গ্রোথ এবং ডেভেলপমেন্ট ঠিকমতো হবে না। সে ভবিষ্যতে নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কাজেই শ্রেণীর সকল শিশুর শারীরিক সুস্থতার জন্য শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ককে এমনভাবে সুসংগঠিত করা প্রয়োজন যাতে উভয়ে মিলে শিশুর কল্যাণ সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ কাজের পরিমাণগত দিকের উন্নয়ন ঘটে।

শুধুমাত্র শিক্ষকদের নানাভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে

শ্রেণীর সব শিশুর শিখনফল অর্জন নিশ্চিত করতে অভিভাবক এবং শিক্ষক উভয়েই একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। সাধারণত দেখা যায় শ্রেণীতে যে শিশুরা বাড়ি থেকে পাঠ শিখে আসে তাদের দিকে শিক্ষকদের বেশি মনোযোগ থাকে। এ বিষয়টি যারা শিখনফল অর্জন করতে পারছে না তাদের অভিভাবকদের অজ্ঞাতেই থেকে যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট শ্রেণীর সব অভিভাবককে মাঝে মাঝে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মোকাবেলায় শিক্ষক যদি পাঠদান করেন তখন সবাই লক্ষ্য করতে পারেন শিশুর অগ্রগতি, শিক্ষকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের শিশুকে কতটা গুরুত্ব শিক্ষক কর্তৃক প্রদান করা হলো ইত্যাদি। এতে শিক্ষক সতর্কতার সাথে কাজ করতে বাধ্য থাকবেন। কাজেই কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ককে ঢেলে সাজানো আবশ্যক।

শিশুরা যেন পিছিয়ে না পড়ে এজন্য সরকার শিক্ষবৃন্দকে নানাভাবে প্রশিক্ষিত করে চলেছে। কিভাবে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান করতে হবে, কীভাবে ছোট ছোট দল গঠন করে পারগ শিশুদের সহায়তায় অপরাগদের একই দলে রেখে শেখানো যায়, কিভাবে শিশুদের বিদ্যালয়ে প্রতিদিন উপস্থিত করা যায়। ধারাবাহিক মূল্যায়ন কখন কিভাবে করতে হয় ইত্যাদি সব প্রশিক্ষণই শিক্ষকদের সময়ে সময়ে দেয়া হয়। তা ছাড়া শিক্ষকদের জন্য ডিপ্লোমা-ইন-এডুকেশন তো আছেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সহনীয়। তারপরও কেন পিছিয়ে পড়বে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

সরকার সব শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি, পোশাকভাতা, ভবন নির্মাণ, স্লিপ বরাদ্দ, রুটিন মেইনটেন্যান্স বরাদ্দ, প্রাক-প্রাথমিকবরাদ্দ, ওয়াসব্লক তৈরি, ক্ষুদ্র মেরামত, বড় ধরনের মেরামত, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক নানা প্রতিযোগিতর ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদি বাবাদ যে খরচ করছে তার সাথে শিশুর পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মানানসই নয়। সুতরাং বিদ্যালয় এলাকার সকল অভিভাবকদের বিদ্যালয়ের সাথে কৌশলগত উপায়ে চুক্তি করে অগ্রসর হবে। তবেই প্রতিটি শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

[লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ]

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

কাঁঠাল হতে পারে রপ্তানি বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত

ছবি

প্রাণের মেলা

গণতন্ত্র কি তাহলে বিদায়ের পথে

সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত হোক

সাঁওতালী ভাষা বিতর্ক এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী

ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার রাজধানীর আজিমপুর

ছবি

ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির নবজাগরণ

খুলনায় একুশে বইমেলার মুগ্ধতা

মধুরতম ভাষা ও রক্তাক্ত বাংলা

উৎসব ও প্রথার বিবর্তন

চুরমার ফিলিস্তিন ও খাদ্য রাজনীতি

কুষ্ঠজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে করণীয়

যুব ক্ষমতায়ন স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে

লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের লাইব্রেরি

একজীবনে অনেক বছর বেঁচে থেকেও নিজেকে চেনা হয়ে ওঠে না

“ছুরি-কাঁটা ও নব্যধনী”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সন্দেশখালি লাইন

শিশুরও হতে পারে ক্যান্সার, প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

চিকিৎসা নিতে কেন ভারতে গিয়েছিলাম

ইসরায়েলের গণহত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা

বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু গণিত

ছবি

সুন্দরবন কি আরেকটু বেশি মনোযোগ পেতে পারে না

নিজেকে বরং নিজেই প্রশ্ন করতে শিখুন

গড়ে উঠুক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

ছবি

বিদ্যা দেবী মা সরস্বতী

বিশ্ব বেতার দিবস ও বাংলাদেশ বেতার

কৃষিবিদ দিবস

ছয় বছরের অর্জন ও প্রত্যাশা

জলবায়ু সম্মেলন এবং নয়া উদারবাদী কর্তৃত্ব

জিআই সনদের সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

নির্বাচন ও সামাজিক অস্থিরতা

ছবি

খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরোনোর পথ কী

ছবি

ট্রাম্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন, তবে পথ মসৃণ নয়

দুর্নীতিবাজদের খতম করা যাবে কি?

মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে

tab

উপ-সম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা

সন্ধ্যা রানী সাহা

রোববার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিস কক্ষে আমরা আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের একটি চিঠি টাঙানো অবস্থায় দেখতে পাই। যেখানে তিনি তার ছেলের শিক্ষকের উদ্দেশ্যে কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছেন। সেই ঐতিহাসিক চিঠির শেষটা এ রকম- ‘আমার ছেলের প্রতি সদয় আচরণ করবেন; কিন্তু সোহাগ করবেন না। কেন না আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তান যেন বিপদে ধৈর্য হারা না হয়। থাকে যেন তার সাহসী হওয়ার প্রত্যয়। তাকে এ শিক্ষাও দেবেন- নিজের প্রতি তার যেন পূর্ণ আস্থা থাকে। আর তখনই তার আস্থা থাকবে সমগ্র মানব জাতির প্রতি।’

বাস্তবে আমাদের দেশের কোনো অভিভাবক কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষককে অনুরূপ কোনো নির্দেশনা দিয়ে পত্র দেবেন কিম্বা কোনো শিক্ষক কোনো অভিভাবককে অনুরূপ পত্র দেবেন; একথা ভাবা যায় না। নানা কারণে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থীদের পরিবারের মধ্যে তেমন কোনো সেতুবন্ধন নেই বললেই চলে। যার ফলে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার এবং পাঠ সমাপ্তির হারের মধ্যে ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। এপিএসসি ২০২০ অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রস ভর্তির হার (জরিপ অনুযায়ী নির্ধারিত বয়স এবং তার বাইরের সবার) ১০৪.৯ %। এবং প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপ্তির হার ৮২.৮০%। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এ ব্যবধান লক্ষণীয়। অথচ এসডিজির ৪নং লক্ষ্য অনুযায়ী সকলের জন্য একীভূত এবং সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ ২০৩০ সালের মধ্যেই নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

কাজেই শুধুমাত্র শিক্ষকদের নানাভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে। আমাদের প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা যে পিছিয়ে পড়ছে এজন্য শিক্ষক এবং অন্যান্য স্টেক-হোল্ডারদের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ করার প্রবণতা রয়েছে। শ্রেণীকক্ষ পর্যবেক্ষণকালে শিক্ষার্থী উপস্থিতির নিম্নহার এবং অনেকের শিখনফল অর্জন করতে না পারার কারণ হিসেবে শিক্ষকগণ অনেক সময় কলে থাকেন যে অভিভাবক অসচেতন, অসচ্ছল, বাড়িতে পড়ে না, প্রতিদিন আসে না ইত্যাদি। এ থেকে অভিভাবকদের সাথে যে শিক্ষকদের এবং পর্যবেক্ষক/পরিদর্শকদের (প্রকারান্তরে তারাও এক ধরনের শিক্ষক) তেমন সম্পর্ক নেই তা ভালোভাবেই বোঝা যায়।

যদিও ১১ সদস্যের বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মধ্যে অভিভাবকদের চারজন প্রতিনিধি এবং শিক্ষকদের তিন জন প্রতিনিধি রয়েছেন। আছে শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি নামের আরেকটি ১০ সদস্যের সংগঠন। যেগুলো মূলত শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে শিশুর মানসম্পন্ন শিক্ষা অর্জন কেন্দ্রিক কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে বিদ্যালয় যেন সুপরিচালিত হতে পারে সে বিষয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; কিন্তু এসব কমিটির প্রত্যেকটি যে সমানভাবে তৎপর তা মোটেও নয়। কমিটির সভাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে শুধুই আনুষ্ঠনিকতায় পরিণত হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য বর্তমানে যে মা সমাবেশ চালু আছে তাতে শিক্ষকদের এবং কর্মকর্তাদের প্রাধান্যের কারণে (পরিচালকের ভূমিকায়) খুব বেশি সফল করা যায় না।

অভিভাবকদের প্রতি শিক্ষকগণের যতগুলো অভিযোগ আমরা শুনে থাকি অভিভাবকদের অবশ্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ততটা বলতে শুনি না। শিক্ষার্থীদের শারিরীকভাবে আহত না করা পর্যন্ত অভিভাবকগণ সাধারণত শিক্ষকদের বিরূদ্ধে যায় না। এমনকি শিশুর শিখনফল অর্জন হলো না কেন- এ বিষয়েও অভিভাবকরা উদাসীন থাকে। বড়জোর তারা নিজের শিশুরই ধারণ ক্ষমতা কম বলে হার মানে। শিক্ষিত এবং সচেতন অভিভাবকগণ নিজ দায়িত্বে শধুমাত্র তাদের নিজেদের শিশুদের দেখভাল করে থাকে। বিদ্যালয়ের অন্যদের বিষয়ে তাদের সেরকম ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে বাকিরা পিছিয়ে পড়ে। অথচ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রযাত্রায় দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীকে সমানভাবে যোগ্য করে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। কারণ তখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরতরাই থাকবে। তাই তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় জীবনের সর্বত্র একটি প্রাথমিক শিক্ষাবান্ধব সংস্কৃতি সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বপ্রথম অভিভাবকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে সচেতন করা অত্যাবশ্যক- এ বিষয়টি শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনদের উপলব্ধি করতে হবে।

এক্ষত্রে শুধুমাত্র কমিটি গঠন করে কার্যাবলীর তালিকা বুঝিয়ে দেয়া যথেষ্ট নয়। আমরা জানি শিক্ষকরা শিশুদের এক প্রকার অভিভাবক। আবার অভিভাবকগণও অনেকটা শিক্ষক। অতএব শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক স্থাপন এবং তা বজায় রাখতে স্ট্র্যাটেজিক প্লান প্রস্তুত করে তদানুযায়ী প্রতি মাসে বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অগ্রগতি মনিটর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক বর্তমানের মতো নামেমাত্র থাকলে চলবে না। শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার সব নিয়ম যেমন- কাজের পরিমাণ ও গুণগত দিক, সময়ানুবর্তিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সবাই মিলে কাজ করা ইত্যাদি অনুসরণ করে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিভাবকরা বিদ্যালয়ের জন্য কী কী কাজ করতে পারে সে বিষয়ে প্রথমত শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট তৃণমূল পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের উৎসাহিত করবেন। ধরা যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদে ডাক্তার কর্মসূচি চলমান। কর্মসূচি চলাকালে বিদ্যালয়ের ১৫ সদস্য বিশিষ্টক্ষুদে ডাক্তার দল স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাকালে অনেক শিক্ষার্থীর ওজন ঊচ্চতার চেয়ে কম পাওয়া গেল। এমত অবস্থায় শিক্ষকদের কাজ দ্রুত অভিভাবকদের তা অবহিত করে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার এবং বিশ্রামসহ অন্যান্য বিষয়ের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে নিকটবর্তী চিকিৎসালয়ে শিশুকে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করা; কিন্তু বাস্তবে ওই ওজন-উচ্চতা পরিমাপ করে লিখে রাখার মধ্যেই যদি সীমাবদ্ধ থাকা হয় তাহলে কম ওজনের শিশু শ্রেণীকক্ষে সেভাবে রেসপন্স করবে না, তার গ্রোথ এবং ডেভেলপমেন্ট ঠিকমতো হবে না। সে ভবিষ্যতে নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কাজেই শ্রেণীর সকল শিশুর শারীরিক সুস্থতার জন্য শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ককে এমনভাবে সুসংগঠিত করা প্রয়োজন যাতে উভয়ে মিলে শিশুর কল্যাণ সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ কাজের পরিমাণগত দিকের উন্নয়ন ঘটে।

শুধুমাত্র শিক্ষকদের নানাভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানই যথেষ্ট নয়। শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনতে হবে

শ্রেণীর সব শিশুর শিখনফল অর্জন নিশ্চিত করতে অভিভাবক এবং শিক্ষক উভয়েই একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। সাধারণত দেখা যায় শ্রেণীতে যে শিশুরা বাড়ি থেকে পাঠ শিখে আসে তাদের দিকে শিক্ষকদের বেশি মনোযোগ থাকে। এ বিষয়টি যারা শিখনফল অর্জন করতে পারছে না তাদের অভিভাবকদের অজ্ঞাতেই থেকে যায়। কিন্তু নির্দিষ্ট শ্রেণীর সব অভিভাবককে মাঝে মাঝে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মোকাবেলায় শিক্ষক যদি পাঠদান করেন তখন সবাই লক্ষ্য করতে পারেন শিশুর অগ্রগতি, শিক্ষকের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের শিশুকে কতটা গুরুত্ব শিক্ষক কর্তৃক প্রদান করা হলো ইত্যাদি। এতে শিক্ষক সতর্কতার সাথে কাজ করতে বাধ্য থাকবেন। কাজেই কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ককে ঢেলে সাজানো আবশ্যক।

শিশুরা যেন পিছিয়ে না পড়ে এজন্য সরকার শিক্ষবৃন্দকে নানাভাবে প্রশিক্ষিত করে চলেছে। কিভাবে আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান করতে হবে, কীভাবে ছোট ছোট দল গঠন করে পারগ শিশুদের সহায়তায় অপরাগদের একই দলে রেখে শেখানো যায়, কিভাবে শিশুদের বিদ্যালয়ে প্রতিদিন উপস্থিত করা যায়। ধারাবাহিক মূল্যায়ন কখন কিভাবে করতে হয় ইত্যাদি সব প্রশিক্ষণই শিক্ষকদের সময়ে সময়ে দেয়া হয়। তা ছাড়া শিক্ষকদের জন্য ডিপ্লোমা-ইন-এডুকেশন তো আছেই। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সহনীয়। তারপরও কেন পিছিয়ে পড়বে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। বিষয়টি শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

সরকার সব শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি, পোশাকভাতা, ভবন নির্মাণ, স্লিপ বরাদ্দ, রুটিন মেইনটেন্যান্স বরাদ্দ, প্রাক-প্রাথমিকবরাদ্দ, ওয়াসব্লক তৈরি, ক্ষুদ্র মেরামত, বড় ধরনের মেরামত, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক নানা প্রতিযোগিতর ব্যবস্থা, শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদি বাবাদ যে খরচ করছে তার সাথে শিশুর পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মানানসই নয়। সুতরাং বিদ্যালয় এলাকার সকল অভিভাবকদের বিদ্যালয়ের সাথে কৌশলগত উপায়ে চুক্তি করে অগ্রসর হবে। তবেই প্রতিটি শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

[লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ]

back to top