alt

উপ-সম্পাদকীয়

সাঁওতালী ভাষা বিতর্ক এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী

মিথুশিলাক মুরমু

: বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী সাঁওতালদের ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। বাংলাদেশে যেমন সাঁওতালী ভাষার বর্ণমালা নিয়ে চর্তুমুখী দ্বন্দ্ব, একই চিত্র লক্ষণীয় ভারতের সাঁওতাল অধ্যুষিত রাজ্য ও জেলাগুলোতেও। বিশেষ করে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে ৯২তম সংবিধান সংশোধনী আইন অনুসারে বোড়ো, দোগরি, মৈথিলি ও সাঁওতালী ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদান করলে ভারতে বিতর্কের আগুন জ¦লে উঠে। ভারতের সংবিধানের ৩৪৪ (১) এবং ৩৫১ অনুচ্ছেদে ১৪টি ভাষার উল্লেখ ছিলো। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ২১তম সাংবিধানিক সংশোধনী দ্বারা সিন্ধি ভাষাটিকে যোগ করা হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে কঙ্কানি, মণিপুরী ও নেপালি ভাষাকে যুক্ত করা হয়। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের জনগণনা অনুযায়ী সাঁওতালী ভাষা ১৫তম সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা এবং ভাষা বক্তার সংখ্যা ৭৪ লক্ষ যা ভারতের মোট জনসংখ্যার ০.৬১ শতাংশ। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ভারতের আদমশুমারি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ৪৪ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা হিন্দি, এরপরেই রয়েছে বাংলা ৮.৩%, মারাঠি ৭.০৯%, তেলেগু ৬.৯৩%, গুজরাটি ৪.৭৪%, উর্দু ৪.৩৪%। মাতৃভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যার বিচারে সাঁওতালী ভাষাটি বিশে^র ১৪০তম সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভূক্তি হওয়ায় দিনটিকে সাঁওতালরা যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করে থাকে।

ভারতের সংবিধানে সাঁওতালী ভাষা যুক্ত হওয়ার পরবর্তীকাল থেকে বর্ণমালা বির্তকের পালে হাওয়া লেগে যায়। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটানের আদিবাসী সাঁওতালরা কোথাও বাংলা, দেবনাগরী, অসমিয়া, নেপালি, ওড়িয়া এবং রোমান বর্ণমালায় লেখ্যরূপে অভ্যস্ত। এসব ভাষাতেই তারা সাহিত্যচর্চা করে আসছে। অষ্টম তফসিলে সাঁওতালী ভাষা স্বীকৃতির ক্ষণকাল থেকেই অলচিকি বর্ণমালার মূলত উত্থানপর্ব। সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতিতে ঝাড়খ- রাজ্যের স্থানীয় এবং সহ-সরকারি ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ঘটে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতি মেলেছে ঠিকই কিন্তু বর্ণমালা কি হবে সেটি কোথাও সুনির্দিষ্ট করে লিপিবদ্ধ নেই। আর এটিই বিতর্কের ক্ষেত্রকে গোলমেলে করে তুলেছে। অলচিকি বর্ণমালার সমর্থকরা ধরেই নিয়েছেন সাঁওতালী ভাষা মনেই অলচিকি বর্ণমালা। যেহেতু বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু অলচিকির পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এতেই ধারণা করা হয়েছে রাষ্ট্রের সাঁওতালী বর্ণমালা অলচিকি আবশ্যিক। শ্রীমতি মুরমু ঝড়খন্ডের রাজ্যপাল থাকাকালীন তিনি তার কক্ষে অলচিকির প্রসারে বর্ণমালা সম্বলিত প্রতিকৃতি সংরক্ষণ করতেন। অনুমেয় যে, দিল্লির রাইসিনা হিলেও তিনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন। ইতোপূর্বে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র সরকার কমিশন অলচিকিকে সাঁওতালদের একমাত্র লিপিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারি সহযোগিতার সুপারিশ করেছিলো। অলচিকিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ^বিদ্যালয়ের সাঁওতালী ভাষার অধ্যাপক শ্রীপতি টুডু ২৩৫ পৃষ্ঠার বিশে^র দীর্ঘতম সংবিধানের অনুবাদ করেছেন, আর সেটি হলো অলচিকি বর্ণমালায়। গত ১৭-২১ জুলাই, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রীপতি টুডু স্পেনে সংখ্যালঘু ভাষা সম্মেলনে সাঁওতালী ভাষার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে এটি নিশ্চিত যে, তিনি ৬৫টি দেশের ৭৫ জন প্রতিনিধিদের সম্মুখে তথ্য-উপাত্ত উত্থাপন করেছেন ইংরেজিতে অলচিকিতে নয়; যেহেতু তিনি অলচিকিকে ভালোবাসেন, সেজন্যেই একদল সাঁওতালরা অলিখিতভাবেই অলচিকি’র জয় জয়কার ঘোষণাতে উদ্যত হয়েছেন।

সাঁওতালী ভাষার বর্ণমালা আবিষ্কার করেছেন কমপক্ষে দশজন বিদগ্ধ আদিবাসী সাঁওতাল। কোনোটি অলচিকির আগে আবার কতকগুলো পরে। তারপরও কেন অলচিকি বর্ণমালাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাঁওতালদের দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে! আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের বাৎসরিক অনুষ্ঠান ‘আদিবাসী গুণীজন সংবর্ধনা’ থেকে শুরু করে সাঁওতালী সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার নির্বাচনেও অলচিকি ছাড়া অন্যান্য লিপিতে লেখা সাঁওতালী পুস্তককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আর এতেই কেউ কেউ ধর্মের গন্ধ রয়েছে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করেন। ধর্মের দোহায় দিয়ে নিজস্বতা, স্বকীয়তা বজায় রাখতেই নাকি অলচিকি! আরো সাঁওতালী বর্ণমালা যারা আবিস্কার করলেন, সেটি উপেক্ষিত হলো। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা রয়েছে। সাঁওতাল বর্ণমালার নামকরণ ও আবিষ্কারকরা হলেনÑ ১। সাধুরাম চাঁদ মুরমুÑ মঁজ দাঁদের আঁক, গ্রাম- কামারবান্দী, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ; ২। সুবলনাথ মুরমুÑ সাঁওতালী অক্ষর, সালবোনা, কেন্দপুকুর, মালদা, পশ্চিমবঙ্গ; ৩। মনোহর হাঁসদাÑ হাপড়াম অক্ষরমালা, দূর্গাপুর, বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ; ৪। বাবুধন মুরমুÑ নতুন সাঁওতালী অক্ষর, দাতিয়ার পাখার, মহেশপুর, ঝাড়খন্ড; ৫। বাস্তা হেমব্রমÑ সাঁওতালী অক্ষর, কোচপাড়া, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ; ৬। ড. রঘুনাথ হেমব্রমÑ সাঁওতালী অক্ষর , ঝিলমিলি, বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ; ৭। রঘুনাথ মুরমুÑ অলচিকি, ডহরাডিহি, রায়রঙ্গপুর, ময়ূরভঞ্জ, ওড়িশা; ৮। ঈশ^র মুরমুÑ আদিবাসী লিপি, গোড্ডা, ঝাড়খন্ড; ৯। সেথ সরেনÑ সাঁওতালী অক্ষর, বারহারওয়া, সাহেবগঞ্জ, ঝাড়খন্ড; ১০। জুগিঝলা সরেনÑ সাঁওতালী অক্ষর, গারহারিয়া, কাটাপাহাড়ি, লালগড়, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ।

সাঁওতালী ভাষাতে কথোপকথন, গান, বক্তব্য, ভাষণ, প্রচার অর্থাৎ মৌখিক আলাপনে কে কোন বর্ণমালার অনুসারী, সেটি নিশ্চিত হওয়া খুবই দুরূহ কাজ। লেখনীতেই সবচেয়ে বিপন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে সাঁওতালী বর্ণমালা। অলচিকি বর্ণমালাতে ভারতের সংবিধান যেমন অনুদিত হয়েছে, অনুরূপভাবে রোমান লিপিতেও অনুদিত হয়েছে। রোমান লিপিতে লেখ্যরূপের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে, ইতোমধ্যেই ভাষার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক, ব্যাকরণ, অভিধানসহ অজস্র অজস্র পুস্তক রচনা করা হয়েছে। সারা বিশে^র নাগরিকরা সাঁওতালী ভাষা শিখনে, রচনায়, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। রোমান লিপি খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ বছর আগে থেকে প্রচলিত এবং এই লিপির দ্বারা বিশে^র উন্নত দেশগুলো নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। যেমনÑ জার্মান, আইসল্যান্ড, আফ্রিকা, ইতালি, নরওয়ে, ফ্রান্সসহ অনেক দেশে রোমান লিপির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এছাড়াও কিছু কিছু রাষ্ট্র আছে, যারা তাদের ভাষার লেখনশৈলীর জন্য রোমান লিপিকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছেন। যেমনÑ হাঙ্গেরী, ইন্দোনেশিয়া, মালয়, তুর্কি, ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান প্রভৃতি। সুতরাং রোমান লিপিতে ধর্মের তকমা দিয়ে সাঁওতালদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা শুধুমাত্র অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির অবতারণা ছাড়া কিছু নয়! ভারত-বাংলাদেশে সাঁওতালদের বর্ণমালাকে সাম্প্রদায়িকীকরণে ভাষা বিজ্ঞানীদের একপেশে মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক পথ-নির্দেশনা প্রত্যাশিত। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রত্যেকটি ভাষায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আদিবাসী কোল সম্প্রদায়ের সংখ্যা একেবারে হাতে গোণা। ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, ‘কোল ভাষা হচ্ছে ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা। দ্রাবিড়, আর্য আর তিব্বতী চিনা বা মঙ্গল জাতির লোক ভারতে আসবার আগেও কোল ভাষায় (অর্থাৎ কিনা আধুনিক কোল ভাষার অতি প্রাচীন রূপের) প্রচার এদেশে ছিল। ...কোল গোষ্ঠীর ভাষা হচ্ছেÑ সাঁওতাল, মুরান্ডি, হো, কুরকু, শবর, প্রবর প্রভৃতি।’

অপেক্ষাকৃত সংখ্যাধিক্য সাঁওতালদের বর্ণমালায় ধর্মের প্রলেপ দিয়ে ভাষার জীবনী শক্তিকে ক্ষীণ করে তুলেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নয়, ভাষা বেঁচে থাকে ভালোবাসায়; ক্ষমতার দম্ভে নয়, লালন-পালন, সংরক্ষণ ও চর্চার মধ্য দিয়ে। প্রজন্মের কাছে ভাষার ঐশ^র্য তুলে ধরতে বর্ণমালা অপরিহার্য, তবে সেই বর্ণমালা হতে হবে সর্বজন গ্রাহ্য এবং সুদূরপ্রসারি। সাম্প্রতিককালে সাঁওতাল মিউজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সামাব) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ রোমান বর্ণমালায় অনুবাদ সম্পন্ন করেছে, শীঘ্রই পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে বিশ^াস করি। ইতোমধ্যেই ৭ মার্চের ভাষণ, ৬ দফা কর্মসূচি ইত্যাদি সাঁওতালী ভাষার রোমান বর্ণমালায় অনুদিত হয়েছে এবং সাঁওতালী জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক অমর ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র কোল, সাঁওতালী, বাংলা ভাষায় ছাপিয়ে নজর কেড়েছিলেন।

বাংলাদেশের সিংহভাগ আদিবাসী সাঁওতালদের আকাঙ্খা হচ্ছে, যে ভাষা শতাধিক বর্ষ অতিক্রম করে তরতর করে এগিয়ে চলেছে, ভাষার সবগুলোদিক পরিপূর্ণ রেখে বিশ^মঞ্চে আসীন; কেন শুধুমাত্র বর্ণমালা বিতর্কে সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করব! অলচিকি বর্ণমালা আবিষ্কারক রঘুনাথ মুরমু লিখেছিলেনÑ ‘আছে তোমার বর্ণমালা/ আছে তোমার ভাষা/ ...হারিয়ে গেলে ভাষা/ তোমার হারিয়ে গেলে বর্ণ/ নিজেই তুমি হারিয়ে যাবে...’।

রঘুনাথ মুরমু কী অলচিকি বর্ণমালার কথাই বলেছেন! নাকি সাঁওতালদের লোকগাথায় যে বর্ণমালার বর্ণনা পাওয়া যায় সেটি। সাঁওতালরা কোন বর্ণমালা গ্রহণ করবে, সেটি নিজেরাই নির্ধারণ করবে।

[লেখক : কলামিস্ট]

ছবি

ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম

বৈসাবি : ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব

‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন

উদার-উদ্দাম বৈশাখ চাই

ঈদ নিয়ে আসুক শান্তি ও সমৃদ্ধি, বিস্তৃত হোক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ

প্রসঙ্গ: বিদেশি ঋণ

ছাত্ররাজনীতি কি খারাপ?

জাকাত : বিশ্বের প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস : শুরুর কথা

ছবি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত

প্রবাসীর ঈদ-ভাবনা

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

ধানের ফলন বাড়াতে ক্লাইমেট স্মার্ট গুটি ইউরিয়া প্রযুক্তি

কমিশন কিংবা ভিজিটে জমি রেজিস্ট্রির আইনি বিধান ও প্রাসঙ্গিকতা

ছবি

ঈদের অর্থনীতি

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে ‘পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম’

শিক্ষকের বঞ্চনা, শিক্ষকের বেদনা

নিরাপদ সড়ক কেন চাই

রম্যগদ্য : ‘প্রহরীর সাতশ কোটি টাকা...’

ছবি

অবন্তিকাদের আত্মহনন

শিক্ষাবিষয়ক ভাবনা

অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান নয়

পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে

আত্মহত্যা রোধে নৈতিক শিক্ষা

আউশ ধান : পরিবেশ ও কৃষকবান্ধব ফসল

ছবি

বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আতুড়ঘর

চেক ডিজঅনার মামলার অধিক্ষেত্র ও প্রাসঙ্গিকতা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের কৃষি

ছবি

‘হৃৎ কলমের’ পাখি এবং আমাদের জেগে ওঠা

ছবি

ভূগর্ভস্থ পানি সুরক্ষায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

প্রসঙ্গ : নিত্যপণ্যের দাম

ছবি

টঙ্ক আন্দোলনের কুমুদিনী হাজং

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে চাই বিকেন্দ্রীকরণ

দূষণমুক্ত পানির বিকল্প নাই

রম্যগদ্য : ‘দুনিয়ার বাঙালি এক হও”

tab

উপ-সম্পাদকীয়

সাঁওতালী ভাষা বিতর্ক এবং উত্তরবঙ্গের আদিবাসী

মিথুশিলাক মুরমু

বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম আদিবাসী সাঁওতালদের ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। বাংলাদেশে যেমন সাঁওতালী ভাষার বর্ণমালা নিয়ে চর্তুমুখী দ্বন্দ্ব, একই চিত্র লক্ষণীয় ভারতের সাঁওতাল অধ্যুষিত রাজ্য ও জেলাগুলোতেও। বিশেষ করে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে ৯২তম সংবিধান সংশোধনী আইন অনুসারে বোড়ো, দোগরি, মৈথিলি ও সাঁওতালী ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদান করলে ভারতে বিতর্কের আগুন জ¦লে উঠে। ভারতের সংবিধানের ৩৪৪ (১) এবং ৩৫১ অনুচ্ছেদে ১৪টি ভাষার উল্লেখ ছিলো। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ২১তম সাংবিধানিক সংশোধনী দ্বারা সিন্ধি ভাষাটিকে যোগ করা হয়। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সংবিধান সংশোধনী আইনের মাধ্যমে কঙ্কানি, মণিপুরী ও নেপালি ভাষাকে যুক্ত করা হয়। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের জনগণনা অনুযায়ী সাঁওতালী ভাষা ১৫তম সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা এবং ভাষা বক্তার সংখ্যা ৭৪ লক্ষ যা ভারতের মোট জনসংখ্যার ০.৬১ শতাংশ। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে টাইমস অব ইন্ডিয়ায় ভারতের আদমশুমারি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ৪৪ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা হিন্দি, এরপরেই রয়েছে বাংলা ৮.৩%, মারাঠি ৭.০৯%, তেলেগু ৬.৯৩%, গুজরাটি ৪.৭৪%, উর্দু ৪.৩৪%। মাতৃভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যার বিচারে সাঁওতালী ভাষাটি বিশে^র ১৪০তম সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভূক্তি হওয়ায় দিনটিকে সাঁওতালরা যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করে থাকে।

ভারতের সংবিধানে সাঁওতালী ভাষা যুক্ত হওয়ার পরবর্তীকাল থেকে বর্ণমালা বির্তকের পালে হাওয়া লেগে যায়। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটানের আদিবাসী সাঁওতালরা কোথাও বাংলা, দেবনাগরী, অসমিয়া, নেপালি, ওড়িয়া এবং রোমান বর্ণমালায় লেখ্যরূপে অভ্যস্ত। এসব ভাষাতেই তারা সাহিত্যচর্চা করে আসছে। অষ্টম তফসিলে সাঁওতালী ভাষা স্বীকৃতির ক্ষণকাল থেকেই অলচিকি বর্ণমালার মূলত উত্থানপর্ব। সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতিতে ঝাড়খ- রাজ্যের স্থানীয় এবং সহ-সরকারি ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তি ঘটে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতি মেলেছে ঠিকই কিন্তু বর্ণমালা কি হবে সেটি কোথাও সুনির্দিষ্ট করে লিপিবদ্ধ নেই। আর এটিই বিতর্কের ক্ষেত্রকে গোলমেলে করে তুলেছে। অলচিকি বর্ণমালার সমর্থকরা ধরেই নিয়েছেন সাঁওতালী ভাষা মনেই অলচিকি বর্ণমালা। যেহেতু বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রীমতি দ্রৌপদী মুরমু অলচিকির পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এতেই ধারণা করা হয়েছে রাষ্ট্রের সাঁওতালী বর্ণমালা অলচিকি আবশ্যিক। শ্রীমতি মুরমু ঝড়খন্ডের রাজ্যপাল থাকাকালীন তিনি তার কক্ষে অলচিকির প্রসারে বর্ণমালা সম্বলিত প্রতিকৃতি সংরক্ষণ করতেন। অনুমেয় যে, দিল্লির রাইসিনা হিলেও তিনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন। ইতোপূর্বে ২০০১ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র সরকার কমিশন অলচিকিকে সাঁওতালদের একমাত্র লিপিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সরকারি সহযোগিতার সুপারিশ করেছিলো। অলচিকিকে প্রতিষ্ঠিত করতে পুরুলিয়ার সিধো-কানহো-বিরসা বিশ^বিদ্যালয়ের সাঁওতালী ভাষার অধ্যাপক শ্রীপতি টুডু ২৩৫ পৃষ্ঠার বিশে^র দীর্ঘতম সংবিধানের অনুবাদ করেছেন, আর সেটি হলো অলচিকি বর্ণমালায়। গত ১৭-২১ জুলাই, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে শ্রীপতি টুডু স্পেনে সংখ্যালঘু ভাষা সম্মেলনে সাঁওতালী ভাষার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে এটি নিশ্চিত যে, তিনি ৬৫টি দেশের ৭৫ জন প্রতিনিধিদের সম্মুখে তথ্য-উপাত্ত উত্থাপন করেছেন ইংরেজিতে অলচিকিতে নয়; যেহেতু তিনি অলচিকিকে ভালোবাসেন, সেজন্যেই একদল সাঁওতালরা অলিখিতভাবেই অলচিকি’র জয় জয়কার ঘোষণাতে উদ্যত হয়েছেন।

সাঁওতালী ভাষার বর্ণমালা আবিষ্কার করেছেন কমপক্ষে দশজন বিদগ্ধ আদিবাসী সাঁওতাল। কোনোটি অলচিকির আগে আবার কতকগুলো পরে। তারপরও কেন অলচিকি বর্ণমালাকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাঁওতালদের দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে! আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরের বাৎসরিক অনুষ্ঠান ‘আদিবাসী গুণীজন সংবর্ধনা’ থেকে শুরু করে সাঁওতালী সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার নির্বাচনেও অলচিকি ছাড়া অন্যান্য লিপিতে লেখা সাঁওতালী পুস্তককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। আর এতেই কেউ কেউ ধর্মের গন্ধ রয়েছে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করেন। ধর্মের দোহায় দিয়ে নিজস্বতা, স্বকীয়তা বজায় রাখতেই নাকি অলচিকি! আরো সাঁওতালী বর্ণমালা যারা আবিস্কার করলেন, সেটি উপেক্ষিত হলো। নিশ্চয়ই কোনো না কোনো অন্তর্নিহিত ব্যাখ্যা রয়েছে। সাঁওতাল বর্ণমালার নামকরণ ও আবিষ্কারকরা হলেনÑ ১। সাধুরাম চাঁদ মুরমুÑ মঁজ দাঁদের আঁক, গ্রাম- কামারবান্দী, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ; ২। সুবলনাথ মুরমুÑ সাঁওতালী অক্ষর, সালবোনা, কেন্দপুকুর, মালদা, পশ্চিমবঙ্গ; ৩। মনোহর হাঁসদাÑ হাপড়াম অক্ষরমালা, দূর্গাপুর, বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ; ৪। বাবুধন মুরমুÑ নতুন সাঁওতালী অক্ষর, দাতিয়ার পাখার, মহেশপুর, ঝাড়খন্ড; ৫। বাস্তা হেমব্রমÑ সাঁওতালী অক্ষর, কোচপাড়া, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ; ৬। ড. রঘুনাথ হেমব্রমÑ সাঁওতালী অক্ষর , ঝিলমিলি, বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ; ৭। রঘুনাথ মুরমুÑ অলচিকি, ডহরাডিহি, রায়রঙ্গপুর, ময়ূরভঞ্জ, ওড়িশা; ৮। ঈশ^র মুরমুÑ আদিবাসী লিপি, গোড্ডা, ঝাড়খন্ড; ৯। সেথ সরেনÑ সাঁওতালী অক্ষর, বারহারওয়া, সাহেবগঞ্জ, ঝাড়খন্ড; ১০। জুগিঝলা সরেনÑ সাঁওতালী অক্ষর, গারহারিয়া, কাটাপাহাড়ি, লালগড়, মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ।

সাঁওতালী ভাষাতে কথোপকথন, গান, বক্তব্য, ভাষণ, প্রচার অর্থাৎ মৌখিক আলাপনে কে কোন বর্ণমালার অনুসারী, সেটি নিশ্চিত হওয়া খুবই দুরূহ কাজ। লেখনীতেই সবচেয়ে বিপন্ন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে সাঁওতালী বর্ণমালা। অলচিকি বর্ণমালাতে ভারতের সংবিধান যেমন অনুদিত হয়েছে, অনুরূপভাবে রোমান লিপিতেও অনুদিত হয়েছে। রোমান লিপিতে লেখ্যরূপের যাত্রা শুরু হয়েছে প্রায় ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে, ইতোমধ্যেই ভাষার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক, ব্যাকরণ, অভিধানসহ অজস্র অজস্র পুস্তক রচনা করা হয়েছে। সারা বিশে^র নাগরিকরা সাঁওতালী ভাষা শিখনে, রচনায়, সংরক্ষণ ও উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। রোমান লিপি খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ বছর আগে থেকে প্রচলিত এবং এই লিপির দ্বারা বিশে^র উন্নত দেশগুলো নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। যেমনÑ জার্মান, আইসল্যান্ড, আফ্রিকা, ইতালি, নরওয়ে, ফ্রান্সসহ অনেক দেশে রোমান লিপির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এছাড়াও কিছু কিছু রাষ্ট্র আছে, যারা তাদের ভাষার লেখনশৈলীর জন্য রোমান লিপিকে অগ্রাধিকার দিয়ে চলেছেন। যেমনÑ হাঙ্গেরী, ইন্দোনেশিয়া, মালয়, তুর্কি, ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান প্রভৃতি। সুতরাং রোমান লিপিতে ধর্মের তকমা দিয়ে সাঁওতালদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা শুধুমাত্র অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির অবতারণা ছাড়া কিছু নয়! ভারত-বাংলাদেশে সাঁওতালদের বর্ণমালাকে সাম্প্রদায়িকীকরণে ভাষা বিজ্ঞানীদের একপেশে মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক পথ-নির্দেশনা প্রত্যাশিত। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রত্যেকটি ভাষায় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। আদিবাসী কোল সম্প্রদায়ের সংখ্যা একেবারে হাতে গোণা। ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, ‘কোল ভাষা হচ্ছে ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা। দ্রাবিড়, আর্য আর তিব্বতী চিনা বা মঙ্গল জাতির লোক ভারতে আসবার আগেও কোল ভাষায় (অর্থাৎ কিনা আধুনিক কোল ভাষার অতি প্রাচীন রূপের) প্রচার এদেশে ছিল। ...কোল গোষ্ঠীর ভাষা হচ্ছেÑ সাঁওতাল, মুরান্ডি, হো, কুরকু, শবর, প্রবর প্রভৃতি।’

অপেক্ষাকৃত সংখ্যাধিক্য সাঁওতালদের বর্ণমালায় ধর্মের প্রলেপ দিয়ে ভাষার জীবনী শক্তিকে ক্ষীণ করে তুলেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নয়, ভাষা বেঁচে থাকে ভালোবাসায়; ক্ষমতার দম্ভে নয়, লালন-পালন, সংরক্ষণ ও চর্চার মধ্য দিয়ে। প্রজন্মের কাছে ভাষার ঐশ^র্য তুলে ধরতে বর্ণমালা অপরিহার্য, তবে সেই বর্ণমালা হতে হবে সর্বজন গ্রাহ্য এবং সুদূরপ্রসারি। সাম্প্রতিককালে সাঁওতাল মিউজিশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সামাব) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ রোমান বর্ণমালায় অনুবাদ সম্পন্ন করেছে, শীঘ্রই পাঠকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে বিশ^াস করি। ইতোমধ্যেই ৭ মার্চের ভাষণ, ৬ দফা কর্মসূচি ইত্যাদি সাঁওতালী ভাষার রোমান বর্ণমালায় অনুদিত হয়েছে এবং সাঁওতালী জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক অমর ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র কোল, সাঁওতালী, বাংলা ভাষায় ছাপিয়ে নজর কেড়েছিলেন।

বাংলাদেশের সিংহভাগ আদিবাসী সাঁওতালদের আকাঙ্খা হচ্ছে, যে ভাষা শতাধিক বর্ষ অতিক্রম করে তরতর করে এগিয়ে চলেছে, ভাষার সবগুলোদিক পরিপূর্ণ রেখে বিশ^মঞ্চে আসীন; কেন শুধুমাত্র বর্ণমালা বিতর্কে সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করব! অলচিকি বর্ণমালা আবিষ্কারক রঘুনাথ মুরমু লিখেছিলেনÑ ‘আছে তোমার বর্ণমালা/ আছে তোমার ভাষা/ ...হারিয়ে গেলে ভাষা/ তোমার হারিয়ে গেলে বর্ণ/ নিজেই তুমি হারিয়ে যাবে...’।

রঘুনাথ মুরমু কী অলচিকি বর্ণমালার কথাই বলেছেন! নাকি সাঁওতালদের লোকগাথায় যে বর্ণমালার বর্ণনা পাওয়া যায় সেটি। সাঁওতালরা কোন বর্ণমালা গ্রহণ করবে, সেটি নিজেরাই নির্ধারণ করবে।

[লেখক : কলামিস্ট]

back to top