alt

উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে ‘পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম’

গৌতম রায়

: শনিবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৪

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিককালে ভোট রাজনীতি ঘিরে একটা দুঃখজনক প্রবণতা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। শাসক শিবির যে ব্যক্তিটিকে সংসদে সব থেকে বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করে, সেই ব্যক্তিটির সংসদে যাওয়া আটকাতে, রাজনৈতিকভাবে তাকে মোকাবিলা করার পরিবর্তে, ধর্ম-জাতপাত ইত্যাদি বিষয় দিয়ে তাকে মোকাবিলা করবার জন্য বেশি উৎসাহী হয়ে পড়ে।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে (২০২৪) পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ থেকে বাম- কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হয়েছেন মহ. সেলিম। কেবলমাত্র বামপন্থি রাজনীতির আইকন হিসেবেই নয়, গোটা বাংলা তথা ভারতের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদের সমর্থক, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ভারতকে বাঁচিয়ে রাখতে চানÑ এমন সমস্ত মানুষের প্রতিনিধি হলেন সেলিম।

সেই কারণে অদ্ভুতভাবে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি, প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িক শক্তিসহ গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শিবির, মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে সেলিমের প্রার্থী হওয়া ঘিরে এক অদ্ভুত ধরনের সাম্প্রদায়িক তাস খেলতে শুরু করেছেন। সেলিম যেহেতু জন্মসূত্রে মুসলমান আর মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রটি যেহেতু জনবিন্যাসের দিক থেকে মুসলমান প্রধান, যদিও সেখানে বর্ণহিন্দু, তফশিলি জাতি- উপজাতিভুক্ত হিন্দু এবং সংখ্যালঘু জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের একটা বড় অংশ রয়েছে (জিয়াগঞ্জ অঞ্চলে, দুর্গা সিং থেকে অরিজিৎ সিং- বাংলার সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ধারার যারা প্রতিনিধি ছিলেন বা আছেন)। তবুও প্রচার করা হচ্ছে, সেলিম যেহেতু জন্মসূত্রে মুসলমান, সেই কারণেই তিনি মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রটি বেছে নিয়েছেন।

ঠিক একইভাবে অতীতে তিনি যখন ২০০৪ সালে বা ২০০৯ সালে পূর্বতন কলকাতা উত্তর-পূর্ব পরবর্তীকালে কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বামফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে, তখনো গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শিবির উল্লাসে চিৎকার করেছিল; সেলিম যেহেতু মুসলমান, সেহেতু কেন তিনি হিন্দু প্রধান উত্তর পূর্ব বা পরবর্তীকালে উত্তর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন? কেন তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না? কেন তিনি মালদহ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না?

আর আজ যখন গোটা মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষের দাবিকে সম্মান দিয়ে, তাদের রাজনৈতিক সহযোগী কংগ্রেসের অধীর চৌধুরীর ভাবনাকে মর্যাদা দিয়ে, সেলিম মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তখনই আবার সেই ধর্মজাতপাতের তাসটিকে মেলে ধরতে শুরু করেছে গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শিবির।

এই যে প্রবণতা, তাকে যথার্থই সেলিম অভিহিত করেছেন; পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম হিসেবে। একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তরে এই মূল্যায়ন করেছেন সেলিম। আমাদের কাছে অত্যন্ত যন্ত্রণার বিষয় হল; একটা সময় জুড়ে যখন গোটা বামপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের রাজনৈতিক এবং অবশ্যই সামাজিক আন্দোলনের দরুণ দেশ ভাগের ক্ষতের যে স্থায়ী ফলাফল ছিল, হিন্দু মুসলমানের মধ্যে একটা মানসিক দূরত্ব, সেই স্থায়ী ক্ষতকে অনেকখানি উপশম করতে পারা গিয়েছিল দেশভাগের অব্যবহিত পরে।

পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল মানুষদের মধ্যে যে ধরনের সামাজিক দূরত্ব প্রতিবেশী মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্পর্কে সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ (আজ যে বারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রটি বিজেপির সফ্ট টার্গেট হয়ে উঠেছে, এই শিল্পাঞ্চলে উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ছড়াবার ইনি আদিগুরু। তার পিতা পঞ্চানন তর্করতœ, দেওঘরে গান্ধীজীর গাডড়তে ইঁট ছুঁঙেছিলেন। তাদের কাছে, গান্ধীজীর অপরাধ ছিল, গান্ধীজী মন্দিরে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের প্রবেশাধিকার নিয়ে আন্দোলন করছেন। ৫২-এর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আরএসএসের শাখা সংগঠন ‘রামরাজ্য পরিষদের’ প্রার্থী ছিলেন শ্রীজীববাবু। সমরেশ বসু, তার ‘শ্রীমতী কাফেতে’ অমূল্য চরিত্রটির মধ্যে এদের কথা লিখেছেন), হরিপদ ভারতী প্রমুখেরা (মরিচঝাঁপির ঘটনা এরই মস্তিষ্ক প্রসূত) তৈরি করেছিলেন, সেটা দূর করবার ক্ষেত্রে বামপন্থিদের, ছিন্নমূল মানুষদের অধিকার ঘিরে আন্দোলন, উদ্বাস্তু সমাজকে ঘিরে তাদের সংগঠন ইউ সিআরসির যে ঐতিহাসিক আন্দোলন একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

সেই ভূমিকারই অন্যতম ফসল ছিল বামফ্রন্ট সরকার। আর সেই বামফ্রন্ট সরকার ছিন্নমূল মানুষদের আর্থ-সামাজিক অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেই ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করবার মতো কোনো পর্যায় তার আগে বা পরে ভারতে অঙ্গরাজ্যে একটা সময়ের ত্রিপুরা সরকার (বাম নেতৃত্বাধীন) আর কেরলে বামেরা যখন ক্ষমতায় থেকেছে, সেই সময় ব্যতীত, আর কোনো সরকার আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি দেখাতে পারিনি বা দেখাতে চায়নি।

ছিন্নমূল মানুষদের সমস্যা ছাড়াও বহু ধরনের সমস্যা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থেকেছে। বিশেষ করে আধা-সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক পরিকাঠামো গরিব মানুষকে গরিব থেকে গরিবতর করেছে; কিন্তু সেই সব রাজ্যে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন সরকার, এরা গরিব মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের উন্নতি ঘটিয়ে, সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেই সম্পর্কে আদৌ কখনো কোনো উৎসাহ প্রকাশ করেনি।

বামপন্থি পরিকাঠামোর বাইরে এ প্রসঙ্গে একমাত্র ব্যতিক্রমী বলতে হয় শের-ই কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লাহ যখন প্রথম দফায় দেশভাগের অবহিত পরেই কাশ্মীরে শাসন ক্ষমতায় ছিলেন,তিনিই গোটা ভারতের মধ্যে প্রথম ভূমি সংস্কারের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। খুব সামান্য পরিমাণে হলেও গরিব মানুষদের হাতে সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের দখলে থাকা জমি বন্টন করতে পেরেছিলেন। আর এই কারণেই তিনি মূলত শাসকের চক্ষুশূল হন। পরবর্তীকালে তার সম্বন্ধে নানা ধরনের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত কুৎসা বিভিন্ন শিবির থেকে উঠতে থাকে।

আসলে শ্রেণী স্বার্থে আঘাত দেওয়া, এই কারণেই একটা সময় শেখ আবদুল্লাহ শাসকের চক্ষুশূল হয়েছিলেন, বামপন্থিরা শাসকের চক্ষু হয়েছিলেন। সেভাবেই দেশভাগের ঠিক অব্যবহিত পরই যেভাবে বিভাজনের রাজনীতিকে গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তি, হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, রাম রাজ্য পরিষদ, ভারতীয় জনসঙ্ঘ কাজ করেছিল তাকে একটা বলগা হীন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

সেভাবেই ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়কাল থেকে নিজেদের একেবারে সবরকম ভাবে নিয়োজিত করেছিল গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির। এই শিবিরের মধ্যে বহু ক্ষেত্রেই সুবিধাবাদী বেশকিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি, তারাও নিজেদের আত্মনিয়োজিত করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে সূচনা পর্ব থেকেই আমরা দেখতে পাই, মুখে তিনি হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি নিয়ে অনেক লম্বা ঝগঙা কথা বললেও, কার্যক্ষেত্রে সব সময় তিনি হিন্দু সম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি যাতে কোনো না কোনো উপায়ে সুবিধা পায় সেজন্য কাজ করে গেছেন।

মমতার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা কংগ্রেসের ভেতরে হলেও, কংগ্রেস দলের যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে অবস্থান, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অবস্থান, গণতন্ত্রের প্রতি অবস্থান (কিছু কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে), সেসব অবস্থানের সঙ্গে মমতার রাজনৈতিক জীবন, কর্মধারা বিন্যাসের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

গোটা সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ভারতের আসন্ন লোকসভা ভোটকে২০২৪) পরিচালিত করতে চান হিন্দু-মুসলমান, মন্দির মসজিদ ইস্যু দিয়ে। আর বামপন্থিরা এই ভোটকে পরিচালিত করতে চান, মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রশ্নকে সামনে রেখে। মানুষের রুটি রুজির প্রশ্নকে সামনে রেখে। স্বাস্থ্যের প্রশ্নকে সামনে রেখে।

সেলিম যে কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেই মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত লাগোয়া একটি কেন্দ্র। এই কেন্দ্রটির একটি স্থায়ী সমস্যা গঙ্গা-পদ্মার ভাঙ্গন। অত্যন্ত অবিবেচকের মত ফরাক্কায় গঙ্গা নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রোধ করে, বাংলাদেশকে জলে মারবার যে দুঃখজনক ষড়যন্ত্র এক কালে এই ভারতের বুকে হয়েছিল, সেই পাপকে নিরসনের উদ্দেশ্যে বামপন্থি নেতা জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে তৈরি হওয়া পরিবেশের দরুণ ই, সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয়েছিলেন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে পানি চুক্তি করতে।

ফরাক্কা বাঁধ যখন নির্মিত হয়, তখনই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য বলেছিলেন; গঙ্গা যেভাবে তার গতিপথ পরিবর্তন করছে, তার ফলে এই বাধ আগামী দিনে অকেজো হয়ে পড়বে। কপিল ভট্টাচার্যের কথা আজ প্রায় বর্ণে বর্ণে সত্যি হতে চলেছে। এরকম একটি অপরিকল্পিত, খানিকটা রাজনৈতিক অসূয়াপ্রসূত ভাবনা থেকে নির্মিত বাঁধের দরুন মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা এবং পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ ভয়ংকর রকমভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে। কেবল বহমানতার জন্য যে পানির প্রয়োজন সেটাই নয়, ফরাক্কা বাঁধের দরুন ভাঙন এই জেলার একটা স্থায়ী সমস্যা। এই সমস্যার দরুন কেবল মুর্শিদাবাদ নয়, প্রতিবেশী দেশ, বাংলাদেশের ও ব্যাপক আর্থিক এবং মানবসম্পদের ক্ষতি হচ্ছে।

তার পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ। মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হওয়ার দরুন এখন এমন এবং একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে যে, কেন্দ্রের শাসক বিজেপি আর রাজ্যের শাসক তৃণমূলের জয়েন্ট ভেঞ্চারে এই অঞ্চলটি চোরা চালানের কার্যত স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়েছে। একটা ব্যাপক অংকের টাকা, জিনিসপত্র এই মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে দেশের বাইরে চোরা চালান হয়। আর সেই চোরা চালানোর টাকার বখরা দুই শাসককে সমানভাবে পায়।

এই চোরাচালান কার্যত মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে একটা বেআইনি বিকল্প রোজগারের জায়গা হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছে তৃণমূল আর বিজেপি যৌথভাবে। সাধারণ মানুষের কাজ নেই। আধুনিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিষেবা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

এসব না থাকা না, ব্যাপারগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে রাখতেই, তাদের একটা বড় অংশকে চোরা চালানের দুটো পাঁচটা টাকার ললিপপ দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছে বিজেপি আর তৃণমূল যৌথভাবে।

এই দুই রাজনৈতিক দলই খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে, সেলিম জিতে সংসদে গেলে চোরাকারবারিরা কোনোভাবেই এই লোকসভা কেন্দ্রে মাথাচাড়া দিতে পারবে না। চোরাচালান (স্মাগলিং) তৃণমূলের কাছে একটা শিল্প। আর সেই শিল্পের অন্যতম প্রধান উদ্যোগপতি হিসেবে বীরভূমের তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অনুব্রত ম-ল এখন শ্রীঘরে বাস করছে।

ঠিক একই অবস্থা তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার প্রায় সমস্ত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তৈরি করে ফেলেছে। সেলিম যদি জিতে সংসদে যান, যেমন সংসদের ভিতরে তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির এই যৌথ অপরাধ ঘিরে তিনি সরব হবেন, আবার তিনি পথে নামবেন এই চোরাচালান আটকাবার জন্য। যাতে একদিকে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। অপরদিকে রক্ষিত হয় প্রতিবেশী দেশ, বাংলাদেশের সুস্তিতি এবং সেখানকার গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো আর ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ।

এ কারণেই সেলিম জুজু এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে সব থেকে বেশি তাড়া করে ফিরছে। একদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে আটকাতে যেমন সেলিমকে সংসদে যাওয়া আটকানোর লক্ষ্যে এই পার্টিশন সিনড্রমকে গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তুলে ধরতে চাইছে। ঠিক তেমনি চোরাচালান থেকে শুরু করে হাজারো রকমের অপরাধ,যেগুলি তৃণমূলকে এটিএম মেশিন। অর্থাৎ অ্যানিটাইম মানি মেশিনের মতো কাঁচা টাকার জোগান দেয়, এই গোটা বিষয়টি সেলিম জিতলে পরে আর কিছুতেই সহজসাধ্য হবে না তৃণমূল-বিজেপির কাছে।

সেই কারণেই ওই পার্টিশন সিনড্রম অর্থাৎ মুসলমান জনবসতিপূর্ণ জায়গায় কেন সেলিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন, কেন অন্যত্র প্রার্থী হলেন না, এই সমস্ত বিভাজনমূলক, অরাজনৈতিক প্রচারকে রাজনীতির বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলোÑ তৃণমূল বা বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত স্বার্থে তোলা বিষয়গুলো যখন তখনই নাম-ডাকওয়ালা সংবাদমাধ্যমের লোকেরাও একই কথা প্রশ্নের আকারে তুলে প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরকে একটা বড় রকমের মাইলেজ দিতে উদ্যোগী হচ্ছে।

গত শতাব্দীর তিন-চারের দশকে যেভাবে হিন্দু-মুসলমান করে, হিন্দু মহাসভা- আরএসএস-মুসলিম লীগ দেশ ভাগ করেছিল, ঠিক সেভাবেই এখন হিন্দু-মুসলমান আর মন্দির-মসজিদ করে, নতুনভাবে একটা বিভাজনের পরিবেশ সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দিতে চাইছে তৃণমূল-বিজেপি নিজের নিজের কৌশল হিসেবে।

ওই কৌশলের যে নীলনকশা, সেটা কিন্তু তৈরি হচ্ছে একই জায়গায়। নাগপুরের রেশমবাগের কেশব ভবন, যেটি আরএসএসের সদর দপ্তর, সেখানেই। কেবলমাত্র মানুষের স্বার্থে লড়াই করা বাম গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শিবির বনাম মানুষের লড়াইকে আলোচনার বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে, মন্দির-মসজিদ, হিন্দু- মুসলমানের ভিত্তিতে ভোট করতে চায় বিজেপি আর তৃণমূল শিবির। লড়াইটা কিন্তু এখন দেশ বাঁচানো বনাম দেশ এবং দেশের মানুষকে একটা প্রলঙ্কর সর্বনাশ থেকে বাঁচানোর লড়াই।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে

ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু : আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও গ্রীষ্মের তন্দ্রাচ্ছন্ন স্বপ্ন-দুপুর

ছবি

লোকসভা নির্বাচন : কী হচ্ছে, কী হবে

জমির বায়না দলিল কার্যকর কিংবা বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া

জনসেবায় পেশাদারিত্ব

খাদ্য কেবল নিরাপদ হলেই হবে না, পুষ্টিকরও হতে হবে

উচ্চশিক্ষাতেও আদিবাসীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে

ছবি

যুদ্ধটা এখনো শেষ হয়নি রনো ভাই

টাকার অবমূল্যায়ন কি জরুরি ছিল

পরিবার : বিশ্বের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান

তাপপ্রবাহে ঝুঁকি এড়াতে করণীয়

ডলারের মূল্যবৃদ্ধি : দীর্ঘমেয়াদে সুফল মিলতে পারে

ছবি

কী আছে ট্রাম্পের ভাগ্যে?

ছবি

বাংলার ‘ভাশুর কথাশিল্পী’ শওকত ওসমান

রাজধানীকে বসবাসযোগ্য করুন

সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়

মুখপাত্রদের তৈরি নয়, ‘তলাপাত্র’দের তৈরি জোট প্রসঙ্গে

চেকের মামলায় সাফাই সাক্ষী বনাম আসামি

ছবি

ডারউইনের খোঁজে নিউইয়র্কের জাদুঘরে

আদিবাসী হত্যার বিচার কোন পথে

কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করুন

রম্যগদ্য : গলায় বেঁধা বড়শি

খেলার চেয়ে ‘ধুলা’ বেশি

জেগে উঠুক সুকুমার বৃত্তি

প্রসঙ্গ : লোকসভা নির্বাচন

ছবি

বারবার পুড়ছে বাংলাদেশের ফুসফুস

শিশুমৃত্যু রোধে দক্ষ মিডওয়াইফদের ভূমিকা

বিসিএস জ্বরে পুড়ছে তারুণ্য

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া পৃথিবী

নমিনির অনুপস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির গচ্ছিত টাকা পাবে কে

হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজন সচেতনতা

হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজন সচেতনতা

যদি শুধু বিনোদন সংস্কৃতি হয় তাহলে বাকি সব কী?

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিক্ষা

বন্ধ হোক প্রশ্ন ফাঁস

tab

উপ-সম্পাদকীয়

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের রাজনীতিতে ‘পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম’

গৌতম রায়

শনিবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৪

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিককালে ভোট রাজনীতি ঘিরে একটা দুঃখজনক প্রবণতা ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। শাসক শিবির যে ব্যক্তিটিকে সংসদে সব থেকে বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করে, সেই ব্যক্তিটির সংসদে যাওয়া আটকাতে, রাজনৈতিকভাবে তাকে মোকাবিলা করার পরিবর্তে, ধর্ম-জাতপাত ইত্যাদি বিষয় দিয়ে তাকে মোকাবিলা করবার জন্য বেশি উৎসাহী হয়ে পড়ে।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে (২০২৪) পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ থেকে বাম- কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হয়েছেন মহ. সেলিম। কেবলমাত্র বামপন্থি রাজনীতির আইকন হিসেবেই নয়, গোটা বাংলা তথা ভারতের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদের সমর্থক, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ভারতকে বাঁচিয়ে রাখতে চানÑ এমন সমস্ত মানুষের প্রতিনিধি হলেন সেলিম।

সেই কারণে অদ্ভুতভাবে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি, প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িক শক্তিসহ গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শিবির, মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে সেলিমের প্রার্থী হওয়া ঘিরে এক অদ্ভুত ধরনের সাম্প্রদায়িক তাস খেলতে শুরু করেছেন। সেলিম যেহেতু জন্মসূত্রে মুসলমান আর মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রটি যেহেতু জনবিন্যাসের দিক থেকে মুসলমান প্রধান, যদিও সেখানে বর্ণহিন্দু, তফশিলি জাতি- উপজাতিভুক্ত হিন্দু এবং সংখ্যালঘু জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের একটা বড় অংশ রয়েছে (জিয়াগঞ্জ অঞ্চলে, দুর্গা সিং থেকে অরিজিৎ সিং- বাংলার সংস্কৃতির বহুত্ববাদী ধারার যারা প্রতিনিধি ছিলেন বা আছেন)। তবুও প্রচার করা হচ্ছে, সেলিম যেহেতু জন্মসূত্রে মুসলমান, সেই কারণেই তিনি মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রটি বেছে নিয়েছেন।

ঠিক একইভাবে অতীতে তিনি যখন ২০০৪ সালে বা ২০০৯ সালে পূর্বতন কলকাতা উত্তর-পূর্ব পরবর্তীকালে কলকাতা উত্তর লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বামফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে, তখনো গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শিবির উল্লাসে চিৎকার করেছিল; সেলিম যেহেতু মুসলমান, সেহেতু কেন তিনি হিন্দু প্রধান উত্তর পূর্ব বা পরবর্তীকালে উত্তর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন? কেন তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না? কেন তিনি মালদহ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না?

আর আজ যখন গোটা মুর্শিদাবাদ জেলার মানুষের দাবিকে সম্মান দিয়ে, তাদের রাজনৈতিক সহযোগী কংগ্রেসের অধীর চৌধুরীর ভাবনাকে মর্যাদা দিয়ে, সেলিম মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তখনই আবার সেই ধর্মজাতপাতের তাসটিকে মেলে ধরতে শুরু করেছে গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শিবির।

এই যে প্রবণতা, তাকে যথার্থই সেলিম অভিহিত করেছেন; পোস্ট পার্টিশন সিনড্রম হিসেবে। একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তরে এই মূল্যায়ন করেছেন সেলিম। আমাদের কাছে অত্যন্ত যন্ত্রণার বিষয় হল; একটা সময় জুড়ে যখন গোটা বামপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের রাজনৈতিক এবং অবশ্যই সামাজিক আন্দোলনের দরুণ দেশ ভাগের ক্ষতের যে স্থায়ী ফলাফল ছিল, হিন্দু মুসলমানের মধ্যে একটা মানসিক দূরত্ব, সেই স্থায়ী ক্ষতকে অনেকখানি উপশম করতে পারা গিয়েছিল দেশভাগের অব্যবহিত পরে।

পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল মানুষদের মধ্যে যে ধরনের সামাজিক দূরত্ব প্রতিবেশী মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্পর্কে সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্রীজীব ন্যায়তীর্থ (আজ যে বারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রটি বিজেপির সফ্ট টার্গেট হয়ে উঠেছে, এই শিল্পাঞ্চলে উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ছড়াবার ইনি আদিগুরু। তার পিতা পঞ্চানন তর্করতœ, দেওঘরে গান্ধীজীর গাডড়তে ইঁট ছুঁঙেছিলেন। তাদের কাছে, গান্ধীজীর অপরাধ ছিল, গান্ধীজী মন্দিরে নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের প্রবেশাধিকার নিয়ে আন্দোলন করছেন। ৫২-এর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আরএসএসের শাখা সংগঠন ‘রামরাজ্য পরিষদের’ প্রার্থী ছিলেন শ্রীজীববাবু। সমরেশ বসু, তার ‘শ্রীমতী কাফেতে’ অমূল্য চরিত্রটির মধ্যে এদের কথা লিখেছেন), হরিপদ ভারতী প্রমুখেরা (মরিচঝাঁপির ঘটনা এরই মস্তিষ্ক প্রসূত) তৈরি করেছিলেন, সেটা দূর করবার ক্ষেত্রে বামপন্থিদের, ছিন্নমূল মানুষদের অধিকার ঘিরে আন্দোলন, উদ্বাস্তু সমাজকে ঘিরে তাদের সংগঠন ইউ সিআরসির যে ঐতিহাসিক আন্দোলন একটা বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

সেই ভূমিকারই অন্যতম ফসল ছিল বামফ্রন্ট সরকার। আর সেই বামফ্রন্ট সরকার ছিন্নমূল মানুষদের আর্থ-সামাজিক অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেই ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করবার মতো কোনো পর্যায় তার আগে বা পরে ভারতে অঙ্গরাজ্যে একটা সময়ের ত্রিপুরা সরকার (বাম নেতৃত্বাধীন) আর কেরলে বামেরা যখন ক্ষমতায় থেকেছে, সেই সময় ব্যতীত, আর কোনো সরকার আজ পর্যন্ত দেখাতে পারেনি দেখাতে পারিনি বা দেখাতে চায়নি।

ছিন্নমূল মানুষদের সমস্যা ছাড়াও বহু ধরনের সমস্যা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে থেকেছে। বিশেষ করে আধা-সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক পরিকাঠামো গরিব মানুষকে গরিব থেকে গরিবতর করেছে; কিন্তু সেই সব রাজ্যে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন সরকার, এরা গরিব মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের উন্নতি ঘটিয়ে, সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেই সম্পর্কে আদৌ কখনো কোনো উৎসাহ প্রকাশ করেনি।

বামপন্থি পরিকাঠামোর বাইরে এ প্রসঙ্গে একমাত্র ব্যতিক্রমী বলতে হয় শের-ই কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লাহ যখন প্রথম দফায় দেশভাগের অবহিত পরেই কাশ্মীরে শাসন ক্ষমতায় ছিলেন,তিনিই গোটা ভারতের মধ্যে প্রথম ভূমি সংস্কারের জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। খুব সামান্য পরিমাণে হলেও গরিব মানুষদের হাতে সামন্ততান্ত্রিক প্রভুদের দখলে থাকা জমি বন্টন করতে পেরেছিলেন। আর এই কারণেই তিনি মূলত শাসকের চক্ষুশূল হন। পরবর্তীকালে তার সম্বন্ধে নানা ধরনের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত কুৎসা বিভিন্ন শিবির থেকে উঠতে থাকে।

আসলে শ্রেণী স্বার্থে আঘাত দেওয়া, এই কারণেই একটা সময় শেখ আবদুল্লাহ শাসকের চক্ষুশূল হয়েছিলেন, বামপন্থিরা শাসকের চক্ষু হয়েছিলেন। সেভাবেই দেশভাগের ঠিক অব্যবহিত পরই যেভাবে বিভাজনের রাজনীতিকে গোটা হিন্দুত্ববাদী শক্তি, হিন্দু মহাসভা, আরএসএস, রাম রাজ্য পরিষদ, ভারতীয় জনসঙ্ঘ কাজ করেছিল তাকে একটা বলগা হীন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

সেভাবেই ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়কাল থেকে নিজেদের একেবারে সবরকম ভাবে নিয়োজিত করেছিল গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির। এই শিবিরের মধ্যে বহু ক্ষেত্রেই সুবিধাবাদী বেশকিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি, তারাও নিজেদের আত্মনিয়োজিত করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে সূচনা পর্ব থেকেই আমরা দেখতে পাই, মুখে তিনি হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি নিয়ে অনেক লম্বা ঝগঙা কথা বললেও, কার্যক্ষেত্রে সব সময় তিনি হিন্দু সম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি যাতে কোনো না কোনো উপায়ে সুবিধা পায় সেজন্য কাজ করে গেছেন।

মমতার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা কংগ্রেসের ভেতরে হলেও, কংগ্রেস দলের যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে অবস্থান, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অবস্থান, গণতন্ত্রের প্রতি অবস্থান (কিছু কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে), সেসব অবস্থানের সঙ্গে মমতার রাজনৈতিক জীবন, কর্মধারা বিন্যাসের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

গোটা সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ভারতের আসন্ন লোকসভা ভোটকে২০২৪) পরিচালিত করতে চান হিন্দু-মুসলমান, মন্দির মসজিদ ইস্যু দিয়ে। আর বামপন্থিরা এই ভোটকে পরিচালিত করতে চান, মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রশ্নকে সামনে রেখে। মানুষের রুটি রুজির প্রশ্নকে সামনে রেখে। স্বাস্থ্যের প্রশ্নকে সামনে রেখে।

সেলিম যে কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেই মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত লাগোয়া একটি কেন্দ্র। এই কেন্দ্রটির একটি স্থায়ী সমস্যা গঙ্গা-পদ্মার ভাঙ্গন। অত্যন্ত অবিবেচকের মত ফরাক্কায় গঙ্গা নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রোধ করে, বাংলাদেশকে জলে মারবার যে দুঃখজনক ষড়যন্ত্র এক কালে এই ভারতের বুকে হয়েছিল, সেই পাপকে নিরসনের উদ্দেশ্যে বামপন্থি নেতা জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে তৈরি হওয়া পরিবেশের দরুণ ই, সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হয়েছিলেন, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে পানি চুক্তি করতে।

ফরাক্কা বাঁধ যখন নির্মিত হয়, তখনই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নদী বিশেষজ্ঞ কপিল ভট্টাচার্য বলেছিলেন; গঙ্গা যেভাবে তার গতিপথ পরিবর্তন করছে, তার ফলে এই বাধ আগামী দিনে অকেজো হয়ে পড়বে। কপিল ভট্টাচার্যের কথা আজ প্রায় বর্ণে বর্ণে সত্যি হতে চলেছে। এরকম একটি অপরিকল্পিত, খানিকটা রাজনৈতিক অসূয়াপ্রসূত ভাবনা থেকে নির্মিত বাঁধের দরুন মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা এবং পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ ভয়ংকর রকমভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে। কেবল বহমানতার জন্য যে পানির প্রয়োজন সেটাই নয়, ফরাক্কা বাঁধের দরুন ভাঙন এই জেলার একটা স্থায়ী সমস্যা। এই সমস্যার দরুন কেবল মুর্শিদাবাদ নয়, প্রতিবেশী দেশ, বাংলাদেশের ও ব্যাপক আর্থিক এবং মানবসম্পদের ক্ষতি হচ্ছে।

তার পাশাপাশি রয়েছে নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ। মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হওয়ার দরুন এখন এমন এবং একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে যে, কেন্দ্রের শাসক বিজেপি আর রাজ্যের শাসক তৃণমূলের জয়েন্ট ভেঞ্চারে এই অঞ্চলটি চোরা চালানের কার্যত স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়েছে। একটা ব্যাপক অংকের টাকা, জিনিসপত্র এই মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে দেশের বাইরে চোরা চালান হয়। আর সেই চোরা চালানোর টাকার বখরা দুই শাসককে সমানভাবে পায়।

এই চোরাচালান কার্যত মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে একটা বেআইনি বিকল্প রোজগারের জায়গা হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছে তৃণমূল আর বিজেপি যৌথভাবে। সাধারণ মানুষের কাজ নেই। আধুনিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিষেবা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।

এসব না থাকা না, ব্যাপারগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে ভুলিয়ে রাখতেই, তাদের একটা বড় অংশকে চোরা চালানের দুটো পাঁচটা টাকার ললিপপ দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছে বিজেপি আর তৃণমূল যৌথভাবে।

এই দুই রাজনৈতিক দলই খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে, সেলিম জিতে সংসদে গেলে চোরাকারবারিরা কোনোভাবেই এই লোকসভা কেন্দ্রে মাথাচাড়া দিতে পারবে না। চোরাচালান (স্মাগলিং) তৃণমূলের কাছে একটা শিল্প। আর সেই শিল্পের অন্যতম প্রধান উদ্যোগপতি হিসেবে বীরভূমের তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অনুব্রত ম-ল এখন শ্রীঘরে বাস করছে।

ঠিক একই অবস্থা তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার প্রায় সমস্ত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তৈরি করে ফেলেছে। সেলিম যদি জিতে সংসদে যান, যেমন সংসদের ভিতরে তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির এই যৌথ অপরাধ ঘিরে তিনি সরব হবেন, আবার তিনি পথে নামবেন এই চোরাচালান আটকাবার জন্য। যাতে একদিকে ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। অপরদিকে রক্ষিত হয় প্রতিবেশী দেশ, বাংলাদেশের সুস্তিতি এবং সেখানকার গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো আর ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ।

এ কারণেই সেলিম জুজু এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে সব থেকে বেশি তাড়া করে ফিরছে। একদিকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে আটকাতে যেমন সেলিমকে সংসদে যাওয়া আটকানোর লক্ষ্যে এই পার্টিশন সিনড্রমকে গোটা প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তুলে ধরতে চাইছে। ঠিক তেমনি চোরাচালান থেকে শুরু করে হাজারো রকমের অপরাধ,যেগুলি তৃণমূলকে এটিএম মেশিন। অর্থাৎ অ্যানিটাইম মানি মেশিনের মতো কাঁচা টাকার জোগান দেয়, এই গোটা বিষয়টি সেলিম জিতলে পরে আর কিছুতেই সহজসাধ্য হবে না তৃণমূল-বিজেপির কাছে।

সেই কারণেই ওই পার্টিশন সিনড্রম অর্থাৎ মুসলমান জনবসতিপূর্ণ জায়গায় কেন সেলিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন, কেন অন্যত্র প্রার্থী হলেন না, এই সমস্ত বিভাজনমূলক, অরাজনৈতিক প্রচারকে রাজনীতির বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলোÑ তৃণমূল বা বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত স্বার্থে তোলা বিষয়গুলো যখন তখনই নাম-ডাকওয়ালা সংবাদমাধ্যমের লোকেরাও একই কথা প্রশ্নের আকারে তুলে প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরকে একটা বড় রকমের মাইলেজ দিতে উদ্যোগী হচ্ছে।

গত শতাব্দীর তিন-চারের দশকে যেভাবে হিন্দু-মুসলমান করে, হিন্দু মহাসভা- আরএসএস-মুসলিম লীগ দেশ ভাগ করেছিল, ঠিক সেভাবেই এখন হিন্দু-মুসলমান আর মন্দির-মসজিদ করে, নতুনভাবে একটা বিভাজনের পরিবেশ সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দিতে চাইছে তৃণমূল-বিজেপি নিজের নিজের কৌশল হিসেবে।

ওই কৌশলের যে নীলনকশা, সেটা কিন্তু তৈরি হচ্ছে একই জায়গায়। নাগপুরের রেশমবাগের কেশব ভবন, যেটি আরএসএসের সদর দপ্তর, সেখানেই। কেবলমাত্র মানুষের স্বার্থে লড়াই করা বাম গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শিবির বনাম মানুষের লড়াইকে আলোচনার বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে, মন্দির-মসজিদ, হিন্দু- মুসলমানের ভিত্তিতে ভোট করতে চায় বিজেপি আর তৃণমূল শিবির। লড়াইটা কিন্তু এখন দেশ বাঁচানো বনাম দেশ এবং দেশের মানুষকে একটা প্রলঙ্কর সর্বনাশ থেকে বাঁচানোর লড়াই।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

back to top