alt

উপ-সম্পাদকীয়

বিসিএস জ্বরে পুড়ছে তারুণ্য

মাসুদুর রহমান

: মঙ্গলবার, ০৭ মে ২০২৪

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় নির্ধারিত সময়সীমার দশ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষাকেন্দ্রে ফাহাদ ফয়সাল নামে একজন পরীক্ষার্থীকে প্রবেশ করতে না দেয়ায় তিনি রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়ে মাথা ঠুকিয়ে আহাজারি করতে থাকেন। ঘটনাটি গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এবং সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে। এর আগে ২০২১ সালের ২১ মার্চ পাবনার আতাইকুলা থানার এসআই হাসান আলী বিসিএস পরীক্ষা দিতে না পারায় নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন যা জনমনে দাগ কেটেছিল।

প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সনদধারী তরুণ-তরুণীরা বিসিএস প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সর্বশেষ ৪৬তম বিসিএস পরীক্ষায় ৩ হাজার ১৪০টি পদের বিপরীতে মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার আবেদনকারী ছিলেন। ১৪টি সাধারণ ও ১২টি পেশাগত/কারিগরি ক্যাডারে পরীক্ষা নেয়া হয়। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক সামগ্রিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।

২০১৫ সালে ঘোষিত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী একজন বিসিএস ধারী চাকরিজীবীর মূল বেতন ৯ম গ্রেড অনুযায়ী ২২,০০০ টাকা দিয়ে শুরু হয়ে সর্বশেষ ৫৩,০৬০ টাকায় দাঁড়ায়। শুরুতেই এর সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ১৪,৩০০(কর্মস্থল বিশেষ) টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকা যোগ হয়ে অনধিক ৩৭৮০০ টাকা প্রাপ্য হন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পদোন্নতির সুযোগ থাকে। অথচ সমযোগ্যতায় বেসরকারিতে এর চেয়ে অধিকতর আর্থিক সুবিধা, পদোন্নতি ও সম্মানপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বিসিএসের দিকে এত ঝোঁক? প্রচলিত বাস্তবতায় উত্তরটা খুবই সরল ও সাধারণ আর তা হলোÑ অধিকাংশরাই ক্ষমতার ব্যবহার-অপব্যবহার, নিরাপত্তা ও বাড়তি ইনকামের (দুর্নীতি) লোভনীয় সুযোগে আকৃষ্ট হয়ে ঝোঁকে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি রোধ কল্পে ২০১৫ সালের মূল বেতনের সঙ্গে ৫% ইনক্রিমেন্ট যোগের বিধান চালু করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি তো কমেইনি বরং তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। খোদ তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আব্দুল মুহিত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘যাদের স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে তারা বদলাবে না।’ সদ্যপ্রসূত বাংলাদেশে উদীয়মান দুর্নীতিকে আঁতুড় ঘরেই শেষ করতে বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে বলেছিলেন, ‘আমার কৃষক দুর্নীতি করে না, আমার মজদুর দুর্নীতি করে না, দুর্নীতি করে আমাদের শিক্ষিত সমাজ।’ সাম্প্রতিককালে কানাডার বেগম পাড়ায় বিলাসবহুল বাড়িসহ বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের অধিকাংশেরও বেশি আমলাদের মর্মে চিহ্নিত হয়েছে। আর ক্ষমতার অপব্যহার তো বলাই বাহুল্য যা অসংখ্য অপ্রীতিকর উদাহরণে জর্জরিত যা এই স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।

আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজ এখন ‘আমলা’ হওয়ার নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘আমলা আসক্তি’ এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। স্নাতক প্রথম বর্ষ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিসিএস গাইডই যেন তাদের জীবন ও জীবিকার একমাত্র সোপান বলে মনে করছে। অথচ, বিসিএস কোনো একাডেমিক কোর্স নয়। এটি স্রেফ পেশাভিত্তিক পাঁচমিশালি কিছু মৌলিক ধারণাভিত্তিক চাকরিপ্রাপ্তির প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনাÑ যার অনেকটাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাস্তর থেকে সংগৃহীত হয়। এটা কোনো গবেষণাধর্মী পড়াশোনা নয়। অথচ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা, যাদের বিষয়ভিত্তিক গবেষণাই হবে পড়ালেখার মৌলিক প্রতিপাদ্য অথচ সে বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহই নেই।

সবাই বড় বড় কর্মকর্তা, অধিকর্তা হতে চান। এটি এখন আতংকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু অনলাইন পোর্টালে বিসিএস পাসের গল্পকে মহাসমারোহে প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে। এ যেন আলেকজান্ডারের দিগ্বিজয়ের বীরত্ব গাথা কাহিনী! এতে করে শিক্ষিত তরুণরা আরও বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিসিএস আসক্ত তরুণ শিক্ষার্থীদের জনাকীর্ণ মৌন মিছিল। সেখানে গবেষক শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া বেশ দুরূহ। মনে হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আমলা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়ে গেছে। জাতীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা-সংকট নিরসনে নেই কোনো গবেষণা। নেই কোনো উদ্যোগ।

২০২১ সালে ঢাকাস্থ ‘ডিকাব’-এর এক অনুষ্ঠানে সাবেক পরারাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন আফসোস করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়ে এখন বহু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার; এবার ২৩ জনের মধ্যে ১৪ জনই ইঞ্জিনিয়ার ও ৫ জন ডাক্তার।’ অর্থাৎ পররাষ্ট্র ক্যাডারে নির্ধারিত ২৩ পদের ১৯টিতেই প্রকৌশল ও চিকিৎসাপড়ুয়া শিক্ষার্থী। এদের প্রায় সবাইই পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। ৩৮তম বিসিএস এ প্রশাসন ক্যাডারে নির্বাচিত হয়েছিলেন বুয়েট, কুয়েট ও রুয়েট থেকে যাথাক্রমে ৮২, ৬৪ ও ৫৯ জন। এভাবে কৃষিবিদ থেকেও বহু দৃষ্টান্ত আছে। উল্লেখ্য, একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদের মতো বিশেষায়িত শিক্ষার্থীদের পেছনে রাষ্ট্রের লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়Ñ যা এভাবে কার্যত জলে যায়।

অর্থাৎ কৃষি, প্রকৌশল ও চিকিৎসার মাধ্যমে মানবতার সেবা নয় বরং আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার মোহে মোহাবিষ্ট হওয়ার মধ্যেই শিক্ষার সার্থকতা বলে তারা মনে করেন। এ কেমন বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়! ভাবতেই অবাক লাগে আমলা তৈরি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদ- হতে পারে না। গবেষক, উৎপাদক ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদ- নির্ণিত হয়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক টাইমস হায়ার এডুকেশনের জরিপে এশিয়ার সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি। অথচ, ভারতের ৪০টি এবং পাকিস্তানের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। দিনে দিনে এমন অবনমনের সূচক ক্রমশ নিচেই নামছে। এটা আমাদের জন্য দুঃখ ও লজ্জার বটে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সরকার, রাজনীতিক কেউই এই দায় এড়াতে পারেন না।

পৃথিবীর উন্নত দেশের মতো আমাদের তরুণদেরও মেধার সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। স্বাধীনতার তিপ্পান্ন বছরে আজো আমরা আমাদের নিজস্ব মেধার প্রয়োগ ঘটিয়ে সামগ্রিক প্রাকৃতিক সম্পদকে উৎপাদনশীল করতে পারিনি। আমাদের আজো বিদেশি মেধা ও প্রযুক্তি ওপর নির্ভর করতে হয়। উপরন্তু, রাষ্ট্রীয় পরিপোষণে পরিপুষ্ট অনেক মেধাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে যেটা সমীচীন নয়। শিক্ষায় আমলা মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

১৯৭৩ সালের ২০ মার্চ বুয়েটের প্রথম সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশের দুশ বছরের ও পাকিস্তানের তেইশ বছরের গোলামির শিক্ষা আমাদের শুধু কেরানিই বানিয়েছে, মানুষ বানায়নি।’ তাই তিনি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্ক গবেষণাধর্মী ও উৎপাদনশীল শিক্ষার ধারা চালু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে এগোতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর গবেষণা ও উৎপাদনশীল শিক্ষা দর্শনের আলোকেই শিক্ষার ধারা চালু করতে ও প্রসার ঘটাতে হবে। বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের রূপকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। দেশ মাতৃকার সেবায় ও উন্নয়নে তাদের পরম নৈতিক দায় রয়েছেÑ এটা তাদের উপলব্ধি করা উচিত। দেশপ্রেমহীন নৈতিকতা বিবর্জিত অনাদর্শিক মেধা ও শিক্ষা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কেননা, এমন শিক্ষা ক্ষতি ছাড়া দেশ ও জাতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনে না। তাই এখনই সময়, পথনির্বিশেষে এ দুরাবস্থা উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা। নতুবা এর নেতিবাচক প্রভাব সবার ওপরই বর্তাবে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

দূর হোক মনের পশুত্ব

মনের পশুত্বের প্রতীকী ত্যাগের আরেক নাম কোরবানি

ঈদে সুস্থ খাদ্যাভ্যাস

এমআইটি : প্রযুক্তির সৃষ্টি রহস্যের খোঁজ

কবিগুরুর বাণী ‘প্রমাণিত মিথ্যা’

কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধ হবে কিভাবে

কানিহাটি সিরিজ এবং পঞ্চব্রীহি নিয়ে আরও কিছু কথা

কলকাতায় হিজাব বিতর্ক

বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিয়ে বিতর্ক

হাতের শক্তি ও মহিমা

বাজেট বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ

ছবি

কেন মেঘ আসে হৃদয় আকাশে

সংখ্যালঘুদের সম্পদ লুটেরাদের বিচার কি হবে

বাজেট ভাবনায় শঙ্কিত যারা

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যে

জ্ঞানই শক্তি

পরিবেশ নিয়ে কিছু কথা

অগ্নিমূল্যের বাজার : সাধারণ মানুষের স্বস্তি মিলবে কি?

বেসরকারি স্কুল-কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নৈরাজ্য

যৌতুক মামলার অপব্যবহার

শহীদের রক্তে লেখা ঐতিহাসিক ছয় দফা

রসে ভরা বাংলাদেশ

সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই

দুর্নীতির উৎসমুখ

কানিহাটি সিরিজের বোরো ধান নিয়ে কিছু কথা

নজিরবিহীন বেনজীর

টেকসই উন্নয়ন করতে হবে প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখে আহমদ

কী বার্তা দিল ভারতের সংসদ নির্বাচন

গরমে প্রয়োজন স্বাস্থ্য সচেতনতা

ক্লাইমেট জাস্টিস ফর বাংলাদেশ : শুধু ঋণ বা অনুদান নয়, প্রয়োজন ক্ষতিপূরণ

এখন ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ কী

দুর্নীতি নিয়ে মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া দরকার

গোল্ডেন রাইস কেন বারবার থমকে দাঁড়ায়

প্রাকৃতিক রসগোল্লা

বেড়েই চলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বিসিএস জ্বরে পুড়ছে তারুণ্য

মাসুদুর রহমান

মঙ্গলবার, ০৭ মে ২০২৪

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় নির্ধারিত সময়সীমার দশ মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষাকেন্দ্রে ফাহাদ ফয়সাল নামে একজন পরীক্ষার্থীকে প্রবেশ করতে না দেয়ায় তিনি রাস্তায় গড়াগড়ি দিয়ে মাথা ঠুকিয়ে আহাজারি করতে থাকেন। ঘটনাটি গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় এবং সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে। এর আগে ২০২১ সালের ২১ মার্চ পাবনার আতাইকুলা থানার এসআই হাসান আলী বিসিএস পরীক্ষা দিতে না পারায় নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন যা জনমনে দাগ কেটেছিল।

প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সনদধারী তরুণ-তরুণীরা বিসিএস প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সর্বশেষ ৪৬তম বিসিএস পরীক্ষায় ৩ হাজার ১৪০টি পদের বিপরীতে মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার আবেদনকারী ছিলেন। ১৪টি সাধারণ ও ১২টি পেশাগত/কারিগরি ক্যাডারে পরীক্ষা নেয়া হয়। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক সামগ্রিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।

২০১৫ সালে ঘোষিত জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী একজন বিসিএস ধারী চাকরিজীবীর মূল বেতন ৯ম গ্রেড অনুযায়ী ২২,০০০ টাকা দিয়ে শুরু হয়ে সর্বশেষ ৫৩,০৬০ টাকায় দাঁড়ায়। শুরুতেই এর সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ১৪,৩০০(কর্মস্থল বিশেষ) টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ১৫০০ টাকা যোগ হয়ে অনধিক ৩৭৮০০ টাকা প্রাপ্য হন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পদোন্নতির সুযোগ থাকে। অথচ সমযোগ্যতায় বেসরকারিতে এর চেয়ে অধিকতর আর্থিক সুবিধা, পদোন্নতি ও সম্মানপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বিসিএসের দিকে এত ঝোঁক? প্রচলিত বাস্তবতায় উত্তরটা খুবই সরল ও সাধারণ আর তা হলোÑ অধিকাংশরাই ক্ষমতার ব্যবহার-অপব্যবহার, নিরাপত্তা ও বাড়তি ইনকামের (দুর্নীতি) লোভনীয় সুযোগে আকৃষ্ট হয়ে ঝোঁকে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি রোধ কল্পে ২০১৫ সালের মূল বেতনের সঙ্গে ৫% ইনক্রিমেন্ট যোগের বিধান চালু করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি তো কমেইনি বরং তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। খোদ তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আব্দুল মুহিত আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘যাদের স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে তারা বদলাবে না।’ সদ্যপ্রসূত বাংলাদেশে উদীয়মান দুর্নীতিকে আঁতুড় ঘরেই শেষ করতে বঙ্গবন্ধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে বলেছিলেন, ‘আমার কৃষক দুর্নীতি করে না, আমার মজদুর দুর্নীতি করে না, দুর্নীতি করে আমাদের শিক্ষিত সমাজ।’ সাম্প্রতিককালে কানাডার বেগম পাড়ায় বিলাসবহুল বাড়িসহ বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের অধিকাংশেরও বেশি আমলাদের মর্মে চিহ্নিত হয়েছে। আর ক্ষমতার অপব্যহার তো বলাই বাহুল্য যা অসংখ্য অপ্রীতিকর উদাহরণে জর্জরিত যা এই স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।

আমাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজ এখন ‘আমলা’ হওয়ার নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘আমলা আসক্তি’ এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। স্নাতক প্রথম বর্ষ পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিসিএস গাইডই যেন তাদের জীবন ও জীবিকার একমাত্র সোপান বলে মনে করছে। অথচ, বিসিএস কোনো একাডেমিক কোর্স নয়। এটি স্রেফ পেশাভিত্তিক পাঁচমিশালি কিছু মৌলিক ধারণাভিত্তিক চাকরিপ্রাপ্তির প্রতিযোগিতামূলক পড়াশোনাÑ যার অনেকটাই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাস্তর থেকে সংগৃহীত হয়। এটা কোনো গবেষণাধর্মী পড়াশোনা নয়। অথচ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা, যাদের বিষয়ভিত্তিক গবেষণাই হবে পড়ালেখার মৌলিক প্রতিপাদ্য অথচ সে বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহই নেই।

সবাই বড় বড় কর্মকর্তা, অধিকর্তা হতে চান। এটি এখন আতংকের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু অনলাইন পোর্টালে বিসিএস পাসের গল্পকে মহাসমারোহে প্রকাশ ও প্রচার করা হচ্ছে। এ যেন আলেকজান্ডারের দিগ্বিজয়ের বীরত্ব গাথা কাহিনী! এতে করে শিক্ষিত তরুণরা আরও বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিসিএস আসক্ত তরুণ শিক্ষার্থীদের জনাকীর্ণ মৌন মিছিল। সেখানে গবেষক শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া বেশ দুরূহ। মনে হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আমলা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়ে গেছে। জাতীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা-সংকট নিরসনে নেই কোনো গবেষণা। নেই কোনো উদ্যোগ।

২০২১ সালে ঢাকাস্থ ‘ডিকাব’-এর এক অনুষ্ঠানে সাবেক পরারাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন আফসোস করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয়ে এখন বহু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার; এবার ২৩ জনের মধ্যে ১৪ জনই ইঞ্জিনিয়ার ও ৫ জন ডাক্তার।’ অর্থাৎ পররাষ্ট্র ক্যাডারে নির্ধারিত ২৩ পদের ১৯টিতেই প্রকৌশল ও চিকিৎসাপড়ুয়া শিক্ষার্থী। এদের প্রায় সবাইই পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে। ৩৮তম বিসিএস এ প্রশাসন ক্যাডারে নির্বাচিত হয়েছিলেন বুয়েট, কুয়েট ও রুয়েট থেকে যাথাক্রমে ৮২, ৬৪ ও ৫৯ জন। এভাবে কৃষিবিদ থেকেও বহু দৃষ্টান্ত আছে। উল্লেখ্য, একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদের মতো বিশেষায়িত শিক্ষার্থীদের পেছনে রাষ্ট্রের লাখ লাখ টাকা ব্যয় হয়Ñ যা এভাবে কার্যত জলে যায়।

অর্থাৎ কৃষি, প্রকৌশল ও চিকিৎসার মাধ্যমে মানবতার সেবা নয় বরং আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার মোহে মোহাবিষ্ট হওয়ার মধ্যেই শিক্ষার সার্থকতা বলে তারা মনে করেন। এ কেমন বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়! ভাবতেই অবাক লাগে আমলা তৈরি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদ- হতে পারে না। গবেষক, উৎপাদক ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির ওপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদ- নির্ণিত হয়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক টাইমস হায়ার এডুকেশনের জরিপে এশিয়ার সেরা ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পায়নি। অথচ, ভারতের ৪০টি এবং পাকিস্তানের ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। দিনে দিনে এমন অবনমনের সূচক ক্রমশ নিচেই নামছে। এটা আমাদের জন্য দুঃখ ও লজ্জার বটে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সরকার, রাজনীতিক কেউই এই দায় এড়াতে পারেন না।

পৃথিবীর উন্নত দেশের মতো আমাদের তরুণদেরও মেধার সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। স্বাধীনতার তিপ্পান্ন বছরে আজো আমরা আমাদের নিজস্ব মেধার প্রয়োগ ঘটিয়ে সামগ্রিক প্রাকৃতিক সম্পদকে উৎপাদনশীল করতে পারিনি। আমাদের আজো বিদেশি মেধা ও প্রযুক্তি ওপর নির্ভর করতে হয়। উপরন্তু, রাষ্ট্রীয় পরিপোষণে পরিপুষ্ট অনেক মেধাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে যেটা সমীচীন নয়। শিক্ষায় আমলা মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

১৯৭৩ সালের ২০ মার্চ বুয়েটের প্রথম সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশের দুশ বছরের ও পাকিস্তানের তেইশ বছরের গোলামির শিক্ষা আমাদের শুধু কেরানিই বানিয়েছে, মানুষ বানায়নি।’ তাই তিনি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিজ্ঞানমনস্ক গবেষণাধর্মী ও উৎপাদনশীল শিক্ষার ধারা চালু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে এগোতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর গবেষণা ও উৎপাদনশীল শিক্ষা দর্শনের আলোকেই শিক্ষার ধারা চালু করতে ও প্রসার ঘটাতে হবে। বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের রূপকল্প বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। দেশ মাতৃকার সেবায় ও উন্নয়নে তাদের পরম নৈতিক দায় রয়েছেÑ এটা তাদের উপলব্ধি করা উচিত। দেশপ্রেমহীন নৈতিকতা বিবর্জিত অনাদর্শিক মেধা ও শিক্ষা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কেননা, এমন শিক্ষা ক্ষতি ছাড়া দেশ ও জাতির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনে না। তাই এখনই সময়, পথনির্বিশেষে এ দুরাবস্থা উত্তরণের পথ খুঁজে বের করা। নতুবা এর নেতিবাচক প্রভাব সবার ওপরই বর্তাবে।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

back to top