alt

উপ-সম্পাদকীয়

কানিহাটি সিরিজ এবং পঞ্চব্রীহি নিয়ে আরও কিছু কথা

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

: শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

হরিপদ কাপালির ‘হরিধান’ নিয়ে চলতি শতকের প্রথম দশকে বেশ আলোচনা ছিল। এর পিছনের ব্যাক্তিটি ছিলেন একজন খ্যাতনামা মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সুযোগ-সন্ধানী কয়েকজন শীর্ষ-কর্মকর্তা সাথে ছিলেন। আমি তখন প্রচারণানির্ভর হরিধান নিয়ে লিখেছিলাম কয়েকটি পত্রিকায়।

বিএডিসির আরেকটা প্রচেষ্টা ছিল আফ্রিকা থেকে আনা কয়েকটা ‘নেরিকা’ ধানের কৌলিক সারি নিয়ে। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী সেগুলো এনেছিলেন খরার ধান হিসেবে আবাদের পরিকল্পনা নিয়ে। তবে পরীক্ষা-নীরিক্ষার ব্যাপার ছিল। বিএডিসির সর্বোচ্চ সেই সুযোগসন্ধানী আধিকারিকগণ কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই উক্ত কৌলিক-সারিগুলো প্রবর্তনের জন্য উঠেপড়ে লেগে যান! মন্ত্রী মহোদয় কিন্তু ব্রিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নেরিকা নিয়ে কিছু গবেষণা করতে। অথচ তার আগেই ব্রির কাছে ৭৬টি নেরিকা ধানের কৌলিক-সারি ছিল। ব্রির উদ্ভিদ-প্রজননবিদরা সেগুলো নেড়ে-ঘেঁটে সিকেয় তুলে রেখেছিল। তবুও মাননীয় মন্ত্রীর আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু ফলাফল যথা পূর্বং তথা পরং।

অথচ মাঠপর্যায়ে নেরিকা নিয়ে তখন সেকি তোড়জোড়! বিএডিসি এবং কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তখন ঘুম হারাম ব্যস্ততা। সে সময় আমি নেরিকা কৌলিক-সারিগুলোর অসারতা নিয়ে কয়েকটি পত্রিকায় লিখেছিলাম।

এখন কোথায় গেল সেই হরিধান এবং আফ্রিকা থেকে আনা নেরিকার আসল কৌলিকসারিগুলো! একইভাবে আমি পঞ্চব্রীহি এবং কানিহাটি সিরিজের কৌলিকসারিগুলো নিয়ে লিখেছি (ওগুলো কিন্তু এখনো জাতে উঠতে পারেনি)।

কানিহাটি দিয়ে শুরু করি। এই কৌলিক-সারিগুলো নিয়ে তার উদ্ভাবক ড. আবেদ চৌধুরী খুবই আশাবাদি ছিলেন। তাই প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ধানের জন্য যথাযথ প্রতিষ্ঠান ব্রির সাথে কোনো যোগযোগ না করে বিএডিসির সাথে একটা চুক্তি করেন এবং তার সারিগুলো (কানিহাটি-১ থেকে কানিহাটি-১৪ পর্যন্ত) পরীক্ষা করতে দেন।

বিএডিসির কর্মকর্তারা তাদের ইটাহাটা এবং সুবর্ণচর খামারে দুটো পরীক্ষা সম্পন্ন করেন ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। ইটাহাটার পরীক্ষা ছিল বোরো মৌসুমে এবং সুবর্ণচরেরটা রোপা-আমন মৌসুমে। সেখান থেকে বাছাই করা কিছু সারি সম্ভবত ২০১৯-২০ বোরো মৌসুমে আবারও পরীক্ষা করা হয়। ইটাহাটায় প্রাপ্ত অধিকাংশ সারির ফলন হেক্টর প্রতি ৭.৫ টন থেকে ১২ টন পর্যন্ত। তবে এই পরীক্ষার ফলাফলের সাথে অন্য জায়গার ফলাফলের মিল নেই। যেমন কানিহাটি-৪ এর ফলন ইটাহাটায় হেক্টর প্রতি ৯ টন হলেও বিএডিসির আরেকটি পরীক্ষায় বোরো মওসুমে পাওয়া গেছে ৫.৫ টন। এখানে কানিহাটি-৩ এর হেক্টর প্রতি ফলন ১২ টন। জীবন কাল ১৪০ দিন। আমন মৌসুমে একটু কম হতে পারে। অথচ সুবর্ণচরে আমন মৌসুমে এই সারিটি ফলন দিয়েছে হেক্টরপ্রতি মাত্র ৪.২ টন এবং জীবনকাল ১৩০ দিন।

ইটাহাটায় করা পরীক্ষার উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। সম্ভবত হাওরের উপযোগী স্বল্পজীবনকালীন কৌলিকসারির সন্ধান। বিএডিসির এই পরীক্ষার সাথে যদি ব্রি প্রধান কার্যালয়ের বোরো মওসুমের একই কৌলিক-সারিগুলোর তুলনা করা যায় তাহলে ইটাহাটার ফলাফল গ্রহণযোগ্য নয়। সেখানে কানিহাটি-১ এবং কানিহাটি ১১ এর ফলন যথাক্রমে হেক্টরপ্রতি ৫.৫ টন এবং ৯.০ টন। জীবনকাল যথাক্রমে ১৩০ এবং ১৩২ দিন। অথচ ব্রি কানিহাটি-১ ও কানিহাটির-১১ এর ফলন পেয়েছে হেক্টরপ্রতি ৫.২৫ টন এবং ৪.১৪ টন এবং দুটোরই জীবনকাল ১৫০ দিন বা তার থেকে একটু বেশি।

সুবর্ণচরের ফলাফল মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। সেখানে করা পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল রোপা-আমনের জন্য দক্ষিণবঙ্গে খরা পরিহারে সক্ষম উচ্চতাপমাত্রা সহনশীল, স্বল্পজীবনসমৃদ্ধ এবং ভালো ফলনের কৌলিকসারি খুঁজে বের করা। সেই ফলাফল তারা একটি জর্নালে প্রকাশ করেছিলেন। তবে জীবনকাল বিবেচনায় কোনোক্রমেই স্বল্পজীবনকালের কৌলিকসারি বলা চলে না। রোপা-আমনে সুবর্ণচরে ফলন পাওয়া গেছে হেক্টর প্রতি ২.৬ টন থেকে ৪.৮ পর্যন্ত। এদের জীবনকাল ১০৩ থেকে ১৪১ দিনের মধ্যে। সেই তুলনায় ব্রির খরা সহনশীল বা খরা পরিহারকারী জাতগুলোর (যেমন ব্রি ধান-৫৬ এবং ব্রি ধান-৫৭) জীবনকাল ১০৫ থেকে ১১০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ৪ থেকে ৪.৫ টন। রোপা-আমনের জিঙ্কসমৃদ্ধ ব্রি ধান-৬২, এর জীবনকাল মাত্র ১০০ দিন এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫ টন। ১১৫ দিনের সুগন্ধিীজাত ব্রি ধান-৭৫ এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.৫ টন। এছাড়াও ১২৫ থেকে ১৩৫ দিন জীবনকালের বেশ কিছু জাত আছে যাদের ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.০ থেকে ৬.০ টন। ধান-গবেষণা নিয়ে যাদের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা আছে তারাই বলতে পারবেন ব্রির তুলনায় কানিহাটি সিরিজের কৌলিকসারিগুলোর অবস্থান কোথায়।

এবারে পঞ্চব্রীহির বিষয়ে আসি। পঞ্চব্রীহি ধান নিয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়েছে বা হচ্ছে। এই আলোচকদের বেশিরভাগই প্রকৃত কৃষিবিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। অপ্রয়োজনীয় বিধায় এ ব্যাপারে ব্রি’র বিজ্ঞানীদের খুব একটা আগ্রহ নেই। তবুও দুই-একজন তাদের মন্তব্য প্রকাশ করেছেন।

পঞ্চব্রীহি ধানের বিষয়ে আমাদের ব্রি-হবিগঞ্জের বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন বিজ্ঞানী এই ধানের উদ্ভাবকের সাথে যোগযোগ করেছিলেন; কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি। ধান নিয়ে কিছু করতে হলে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ব্রি’র সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করতে হবে। ব্রি দলেবলে কাজ করে। ব্রি’র বিজ্ঞানীদেরও নেচার গ্রুপসহ বিভিন্ন খ্যাতনামা জার্নালে প্রকাশনা আছে; কিন্তু সেটা নিয়ে তারা ঢোল পেটাতে যায় না। কারণ তাদের কাছে নেচার বা অনুরূপ কোনো জার্নালে প্রকাশের থেকে কৃষকের গালভরা হাসিমুখটাই প্রকৃত জার্নাল।

[লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কারিগরি শিক্ষা

মাদক রুখতে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক প্রতিরোধ

পারিবারিক অপরাধপ্রবণতা ও কয়েকটি প্রশ্ন

ডারউইনকে খুঁজে পেয়েছি

চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ফসল উৎপাদন করা জরুরি

পিএসসি প্রশ্নফাঁসের দায় এড়াবে কীভাবে

এত উন্নয়নের পরও বাসযোগ্যতায় কেন পিছিয়েই থাকছে ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য কি কেউ নেই?

জলবায়ু রক্ষায় কাজের কাজ কি কিছু হচ্ছে

অধরার হাতে সমর্পিত ক্ষমতা

প্রসঙ্গ : কোটাবিরোধী আন্দোলন

রম্যগদ্য : যে করিবে চালাকি, বুঝিবে তার জ্বালা কী

একটি মিথ্যা ধর্ষণ মামলার পরিণতি

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা কেন শ্রেণীকক্ষের বাইরে

মেধা নিয়ে কম মেধাবীর ভাবনা

প্রজাতন্ত্রের সেবক কেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বনে যান

ছবি

বাইডেন কি দলে বোঝা হয়ে যাচ্ছেন?

ছবি

দুই যুগের পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সাপ উপকারী প্রাণীও বটে!

ছবি

বাস্তববাদী রাজনীতিক জ্যোতি বসু

কোটাবিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষকদের পেনশন সংকট

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা : এই নাটকের শেষ কোথায়?

আড্ডাকে অবহেলা নয়

অবাসযোগ্য ঢাকার গোপন রহস্য

ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর পর্যটনে গুরুত্ব দিন

রথযাত্রা উৎসব

মুসলিম আইনে জমি অগ্রক্রয়ের অধিকার বনাম বাস্তবতা

শিক্ষকের ভালোবাসা : এক নীরব বিপ্লব

পণ্য বয়কট : বিশ্ব রাজনীতির বড় হাতিয়ার

বিদেশি বিনিয়োগ কমছে কেন

একজন উদ্যোগী গবেষকের কথা

জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে প্রয়োজন পুকুর খনন

নীল আর্মস্ট্রংয়ের স্পেস স্যুট

কোটাব্যবস্থা ও আজকের বাস্তবতা

রম্যগদ্য : ‘যঃ পলায়তিঃ স্বঃ জীবতিঃ...’

দুর্নীতি প্রতিরোধ সময়ের দাবি

tab

উপ-সম্পাদকীয়

কানিহাটি সিরিজ এবং পঞ্চব্রীহি নিয়ে আরও কিছু কথা

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

হরিপদ কাপালির ‘হরিধান’ নিয়ে চলতি শতকের প্রথম দশকে বেশ আলোচনা ছিল। এর পিছনের ব্যাক্তিটি ছিলেন একজন খ্যাতনামা মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) সুযোগ-সন্ধানী কয়েকজন শীর্ষ-কর্মকর্তা সাথে ছিলেন। আমি তখন প্রচারণানির্ভর হরিধান নিয়ে লিখেছিলাম কয়েকটি পত্রিকায়।

বিএডিসির আরেকটা প্রচেষ্টা ছিল আফ্রিকা থেকে আনা কয়েকটা ‘নেরিকা’ ধানের কৌলিক সারি নিয়ে। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী সেগুলো এনেছিলেন খরার ধান হিসেবে আবাদের পরিকল্পনা নিয়ে। তবে পরীক্ষা-নীরিক্ষার ব্যাপার ছিল। বিএডিসির সর্বোচ্চ সেই সুযোগসন্ধানী আধিকারিকগণ কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই উক্ত কৌলিক-সারিগুলো প্রবর্তনের জন্য উঠেপড়ে লেগে যান! মন্ত্রী মহোদয় কিন্তু ব্রিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নেরিকা নিয়ে কিছু গবেষণা করতে। অথচ তার আগেই ব্রির কাছে ৭৬টি নেরিকা ধানের কৌলিক-সারি ছিল। ব্রির উদ্ভিদ-প্রজননবিদরা সেগুলো নেড়ে-ঘেঁটে সিকেয় তুলে রেখেছিল। তবুও মাননীয় মন্ত্রীর আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু ফলাফল যথা পূর্বং তথা পরং।

অথচ মাঠপর্যায়ে নেরিকা নিয়ে তখন সেকি তোড়জোড়! বিএডিসি এবং কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের তখন ঘুম হারাম ব্যস্ততা। সে সময় আমি নেরিকা কৌলিক-সারিগুলোর অসারতা নিয়ে কয়েকটি পত্রিকায় লিখেছিলাম।

এখন কোথায় গেল সেই হরিধান এবং আফ্রিকা থেকে আনা নেরিকার আসল কৌলিকসারিগুলো! একইভাবে আমি পঞ্চব্রীহি এবং কানিহাটি সিরিজের কৌলিকসারিগুলো নিয়ে লিখেছি (ওগুলো কিন্তু এখনো জাতে উঠতে পারেনি)।

কানিহাটি দিয়ে শুরু করি। এই কৌলিক-সারিগুলো নিয়ে তার উদ্ভাবক ড. আবেদ চৌধুরী খুবই আশাবাদি ছিলেন। তাই প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি ধানের জন্য যথাযথ প্রতিষ্ঠান ব্রির সাথে কোনো যোগযোগ না করে বিএডিসির সাথে একটা চুক্তি করেন এবং তার সারিগুলো (কানিহাটি-১ থেকে কানিহাটি-১৪ পর্যন্ত) পরীক্ষা করতে দেন।

বিএডিসির কর্মকর্তারা তাদের ইটাহাটা এবং সুবর্ণচর খামারে দুটো পরীক্ষা সম্পন্ন করেন ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে। ইটাহাটার পরীক্ষা ছিল বোরো মৌসুমে এবং সুবর্ণচরেরটা রোপা-আমন মৌসুমে। সেখান থেকে বাছাই করা কিছু সারি সম্ভবত ২০১৯-২০ বোরো মৌসুমে আবারও পরীক্ষা করা হয়। ইটাহাটায় প্রাপ্ত অধিকাংশ সারির ফলন হেক্টর প্রতি ৭.৫ টন থেকে ১২ টন পর্যন্ত। তবে এই পরীক্ষার ফলাফলের সাথে অন্য জায়গার ফলাফলের মিল নেই। যেমন কানিহাটি-৪ এর ফলন ইটাহাটায় হেক্টর প্রতি ৯ টন হলেও বিএডিসির আরেকটি পরীক্ষায় বোরো মওসুমে পাওয়া গেছে ৫.৫ টন। এখানে কানিহাটি-৩ এর হেক্টর প্রতি ফলন ১২ টন। জীবন কাল ১৪০ দিন। আমন মৌসুমে একটু কম হতে পারে। অথচ সুবর্ণচরে আমন মৌসুমে এই সারিটি ফলন দিয়েছে হেক্টরপ্রতি মাত্র ৪.২ টন এবং জীবনকাল ১৩০ দিন।

ইটাহাটায় করা পরীক্ষার উদ্দেশ্য পরিষ্কার নয়। সম্ভবত হাওরের উপযোগী স্বল্পজীবনকালীন কৌলিকসারির সন্ধান। বিএডিসির এই পরীক্ষার সাথে যদি ব্রি প্রধান কার্যালয়ের বোরো মওসুমের একই কৌলিক-সারিগুলোর তুলনা করা যায় তাহলে ইটাহাটার ফলাফল গ্রহণযোগ্য নয়। সেখানে কানিহাটি-১ এবং কানিহাটি ১১ এর ফলন যথাক্রমে হেক্টরপ্রতি ৫.৫ টন এবং ৯.০ টন। জীবনকাল যথাক্রমে ১৩০ এবং ১৩২ দিন। অথচ ব্রি কানিহাটি-১ ও কানিহাটির-১১ এর ফলন পেয়েছে হেক্টরপ্রতি ৫.২৫ টন এবং ৪.১৪ টন এবং দুটোরই জীবনকাল ১৫০ দিন বা তার থেকে একটু বেশি।

সুবর্ণচরের ফলাফল মোটামুটি গ্রহণযোগ্য। সেখানে করা পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল রোপা-আমনের জন্য দক্ষিণবঙ্গে খরা পরিহারে সক্ষম উচ্চতাপমাত্রা সহনশীল, স্বল্পজীবনসমৃদ্ধ এবং ভালো ফলনের কৌলিকসারি খুঁজে বের করা। সেই ফলাফল তারা একটি জর্নালে প্রকাশ করেছিলেন। তবে জীবনকাল বিবেচনায় কোনোক্রমেই স্বল্পজীবনকালের কৌলিকসারি বলা চলে না। রোপা-আমনে সুবর্ণচরে ফলন পাওয়া গেছে হেক্টর প্রতি ২.৬ টন থেকে ৪.৮ পর্যন্ত। এদের জীবনকাল ১০৩ থেকে ১৪১ দিনের মধ্যে। সেই তুলনায় ব্রির খরা সহনশীল বা খরা পরিহারকারী জাতগুলোর (যেমন ব্রি ধান-৫৬ এবং ব্রি ধান-৫৭) জীবনকাল ১০৫ থেকে ১১০ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি ৪ থেকে ৪.৫ টন। রোপা-আমনের জিঙ্কসমৃদ্ধ ব্রি ধান-৬২, এর জীবনকাল মাত্র ১০০ দিন এবং ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫ টন। ১১৫ দিনের সুগন্ধিীজাত ব্রি ধান-৭৫ এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.৫ টন। এছাড়াও ১২৫ থেকে ১৩৫ দিন জীবনকালের বেশ কিছু জাত আছে যাদের ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.০ থেকে ৬.০ টন। ধান-গবেষণা নিয়ে যাদের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা আছে তারাই বলতে পারবেন ব্রির তুলনায় কানিহাটি সিরিজের কৌলিকসারিগুলোর অবস্থান কোথায়।

এবারে পঞ্চব্রীহির বিষয়ে আসি। পঞ্চব্রীহি ধান নিয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে অনেক আলোচনা হয়েছে বা হচ্ছে। এই আলোচকদের বেশিরভাগই প্রকৃত কৃষিবিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। অপ্রয়োজনীয় বিধায় এ ব্যাপারে ব্রি’র বিজ্ঞানীদের খুব একটা আগ্রহ নেই। তবুও দুই-একজন তাদের মন্তব্য প্রকাশ করেছেন।

পঞ্চব্রীহি ধানের বিষয়ে আমাদের ব্রি-হবিগঞ্জের বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন বিজ্ঞানী এই ধানের উদ্ভাবকের সাথে যোগযোগ করেছিলেন; কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি। ধান নিয়ে কিছু করতে হলে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ব্রি’র সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করতে হবে। ব্রি দলেবলে কাজ করে। ব্রি’র বিজ্ঞানীদেরও নেচার গ্রুপসহ বিভিন্ন খ্যাতনামা জার্নালে প্রকাশনা আছে; কিন্তু সেটা নিয়ে তারা ঢোল পেটাতে যায় না। কারণ তাদের কাছে নেচার বা অনুরূপ কোনো জার্নালে প্রকাশের থেকে কৃষকের গালভরা হাসিমুখটাই প্রকৃত জার্নাল।

[লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; সাবেক নির্বাহী পরিচালক, কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন]

back to top