alt

উপ-সম্পাদকীয়

উৎপাদনের ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা উচিত

নিতাই চন্দ্র রায়

: মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী ২০২১

সে অনুসারে আগামী চার বছরে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। রোডম্যাপে অংশ হিসেবে পিয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে রয়েছে-১. উচ্চফলনশীল জাত ও উন্নত পদ্ধতিতে চাষবাদ। ২. ফসল প্রতিস্থাপন করে পেঁয়াজ চাষ এলাকা বৃদ্ধি। ৩. আখ ও ভুট্টার সঙ্গে শীতকালীন এবং আদা, হলুদ ও মুখিকচুর সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন পিয়াজের সাথি ফসলের চাষ। ৪. মুড়িকাটা ও গ্রীষ্মকালীন পিয়াজের উৎপাদন বাড়ানো। ৫. দেশব্যাপী ১ লাখ কৃষকের প্রতি এক শতক জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের জন্য তিন টন বীজ বিতরণ। ৬. বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজে পেঁয়াজ সংরক্ষণের মাধ্যমে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমিয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি করা ও পেঁয়াজ চাষিদের প্রশিক্ষণ।

রোডম্যাপ অনুযায়ী চলতি বছর পিয়াজের ফলন ২ লাখ টন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পরের বছর (২০২১-২২) ৩ লাখ ২২ হাজার টন, তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০ লাখ টন অতিরিক্ত পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশে বর্তমানে পেঁয়াজ চাষের আওতায় জমির পরিমাণ ২ লাভ ৩৭ হাজার হেক্টর। এসব জমিতে মোট পিয়াজের উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত পিয়াজের মধ্যে রবি ৮১.৫৫ শতাংশ, মুড়িকাটি ১৮.১৯ শতাংশ এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ০ দশমিক ১১ শতাংশ। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১০ দশমিক ৮২ টন।

দেশে প্রতি বছর ২৫ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হলেও এরমধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই উৎপাদন ১৯ লাখ টনের মধ্যে থাকে। বীজ ও অপচয় বাদে মোট চাহিদা ২৫ লাখ ৯৬ হাজার টন। ২৫ শতাংশ সংগ্রহোত্তর ক্ষতি বিবেচনায় উৎপাদন দরকার ৩৪ লাখ ৬১ হাজার টন। সে অনুযায়ী পিয়াজের ঘাটতি ৮ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন। তাই প্রতি বছর চাহিদা মেটাতে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।

ডিএইর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯০ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৯২০ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৩৪০ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৯১ হাজার টন। গত অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৭ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। আমদানিকরা পিয়াজের পুরোটাই আসে ভারত থেকে। আর সামান্য পরিমাণে আসে চীন, মিশর, পাকিস্তানও মায়ানমার থেকে।

রোডম্যাপ অনুযায়ী চলতি (২০২০-২১) অর্থবছরে ২৫ লাখ ৯৬ হাজার টন নিট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৫ শতাংশ ক্ষতিসহ পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৬১ হাজার টন। উৎপাদনশীলতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে ৬ লাখ ২৫ হাজার টন। ২ লাখ ৭০ হাজার টন আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হবে। পরের বছর (২০২১-২২) চাহিদা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ২৫ হাজার টন। ক্ষতিসহ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৬৮ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে চতুর্থ বছরে কোনো পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হবে না।

বিদ্যমান পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা সনাতন ও মোটেও বিজ্ঞান সম্মত নয়। ব্যাপক ক্ষতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পেঁয়াজকে ঘরে চিলেকোঠায় না হয় মাটির মেঝে বিছিয়ে অথবা পাটের বস্তায় মার্চ থেকে নভেম্বর অর্থাৎ চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের প্রাণান্তর চেষ্টা করা হয়। এ অবস্থায় পিয়াজের জাত ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা উপযুক্ত না হওয়ায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এতে সংরক্ষণকালীন শরীরতাত্ত্বি¡ক কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে ওজন কমে যায়। যেমন আর্দ্রতা কমে পেঁয়াজ সংকুচিত হয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, পচনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং অসময়ে অঙ্কুরিত হয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে যখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিরাজ করে, তখন পেঁয়াজ নষ্ট হয় বেশি।

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর এক আদেশে ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের পিয়াজের ক্ষেত্রে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এ সিদ্ধান্তের পর থেকে দিনাজপুরের হিলি, সাতক্ষীরার ভোমরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। উৎপাদনের এই ভরা মৌসুমে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির ফলে গত কয়েক দিনে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা কমে বর্তমানে খুচরা ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে দেশের পেঁয়াজ চাষিদের মধ্যে পণ্যটির ন্যায্যমূল্য নিয়ে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি করা পিয়াজের দাম কমে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে। মিসর ও চীন থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমাদানিতে ব্যবসায়ীদের খরচ পড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। এই সময়ে ভারতীয় পিয়াজের আমদানি হলে আমদানিকারকরাও বিপুল পরিমাণ লোকসানের সম্মুখীন হবেন এবং সংকটকালে ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে নিরৎসাহিত হবেন।

গত বছর কেজি প্রতি পিয়াজের উৎপাদন খরচ ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২০ থেকে ২২ টাকা। ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা জানান, বর্তমানে পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ টাকা। কৃষক বিক্রি করছেন ২৪ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। এই সময় ভারতীয় পেঁয়াজ বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করলে পিয়াজের দাম কমে যাবে। এতে লাভ তো দূরের কথা কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না। ২০১৯ সালে ভারতীয় পিয়াজের অবাধ আমদানির কারণে কৃষক ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন এবং লোকসান দিয়ে পেঁয়াজ বিক্রির কারণে পরের বছরই দেশে পেঁয়াজের আবাদ কমে যায়।

সবে মাত্র মুড়িকাটা পেঁয়াজ তোলা শুরু হয়েছে। এতেই পিয়াজের দাম কমে গেছে। এখন সারা দেশে চলছে চারা পেঁয়াজ রোপণের ধুম। পরপর দুই বছর পিয়াজের দাম বেশি থাকায় এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে চারা পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের মধ্যে প্রচুর আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু অবাধে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির কারণে যদি বাজারে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম কমে যায়, তা হলে পেঁয়াজ উৎপাদনের কৃষকের আগ্রহ কমে যাবে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের রোডম্যাপ বিঘিœত হবে। বাংলাদেশকে নির্ভরশীল হতে হবে ভারতীয় পেঁয়াজের ওপরে। তাই ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সময়ে কৃষকের স্বার্থে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। অথবা কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পিয়াজের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্কারোপ করতে হবে। নইলে পিয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। বাস্তবতার মুখ দেখবে না কখনও। শুধু আমদানি বন্ধ করলেই দেশ পিয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। এ জন্য কৃষকের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, পেঁয়াজ চাষিদের মধ্যে শতকরা চার ভাগ সুদে কৃষিঋণ প্রদান, পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, পাউডার তৈরি ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণ, পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের ওপর পর্যাপ্ত কৃষক প্রশিক্ষণ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ সার ও বালাইনাশক সররাহ, আখ, ভুট্টা, হলুদ, আদা, মরিচ ও মুখিকচুর সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে পেঁয়াজের চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান হেক্টর প্রতি পিয়াজের ফলন ১১ টন থেকে ১৫ থেকে ১৬ টনে উন্নীত করতে হবে।

[লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি),

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.]

netairoy18@yahoo.com

ছবি

নারী জাগরণের পথিকৃৎ

পাহাড় কি শান্তিতে আছে?

আসামের ডিটেনশন সেন্টারের নাম কেন বদলাচ্ছে

বাঙালির অদম্য দেশপ্রেম

বিলুপ্তির পথে বিরল প্রজাতির হনুমান

বনগুলো কি হারিয়ে যাবে

ডিজিটাল সাম্য সমাজের বীজ বঙ্গবন্ধু বপন করেছেন

ছবি

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সংস্কৃতি

চাকরি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, বিড়ম্বনা এবং অচলায়তন

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সাফল্য কি মিলল

ভয়কে জয় করা পরীক্ষা

শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

কলকাতার পুরভোট ও সমকালীন রাজনীতি

ছবি

জেলখানার চিঠি - পিতা-পুত্রের কথোপকথন

ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

ছবি

নদী রক্ষার আন্দোলন

ছবি

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীরা কেন ‘হাফ পাস’ পাবে না

ছবি

রাজস্ব ও দেশের উন্নয়ন

অনলাইন জন্মনিবন্ধনে সমস্যা

ছবি

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন

শান্তিচুক্তি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার

পাঠ্যপুস্তক এবং আমাদের গোঁড়ামি

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

শিক্ষা বিস্তারে সরকারিকরণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

ছবি

বারবার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে

ছবি

প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন বিতর্ক

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

উৎপাদনের ভরা মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা উচিত

নিতাই চন্দ্র রায়

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী ২০২১

সে অনুসারে আগামী চার বছরে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। রোডম্যাপে অংশ হিসেবে পিয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বিভিন্ন কৌশলের মধ্যে রয়েছে-১. উচ্চফলনশীল জাত ও উন্নত পদ্ধতিতে চাষবাদ। ২. ফসল প্রতিস্থাপন করে পেঁয়াজ চাষ এলাকা বৃদ্ধি। ৩. আখ ও ভুট্টার সঙ্গে শীতকালীন এবং আদা, হলুদ ও মুখিকচুর সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন পিয়াজের সাথি ফসলের চাষ। ৪. মুড়িকাটা ও গ্রীষ্মকালীন পিয়াজের উৎপাদন বাড়ানো। ৫. দেশব্যাপী ১ লাখ কৃষকের প্রতি এক শতক জমিতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের জন্য তিন টন বীজ বিতরণ। ৬. বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজে পেঁয়াজ সংরক্ষণের মাধ্যমে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমিয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি করা ও পেঁয়াজ চাষিদের প্রশিক্ষণ।

রোডম্যাপ অনুযায়ী চলতি বছর পিয়াজের ফলন ২ লাখ টন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পরের বছর (২০২১-২২) ৩ লাখ ২২ হাজার টন, তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০ লাখ টন অতিরিক্ত পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশে বর্তমানে পেঁয়াজ চাষের আওতায় জমির পরিমাণ ২ লাভ ৩৭ হাজার হেক্টর। এসব জমিতে মোট পিয়াজের উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত পিয়াজের মধ্যে রবি ৮১.৫৫ শতাংশ, মুড়িকাটি ১৮.১৯ শতাংশ এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ০ দশমিক ১১ শতাংশ। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ১০ দশমিক ৮২ টন।

দেশে প্রতি বছর ২৫ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হলেও এরমধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। তাই উৎপাদন ১৯ লাখ টনের মধ্যে থাকে। বীজ ও অপচয় বাদে মোট চাহিদা ২৫ লাখ ৯৬ হাজার টন। ২৫ শতাংশ সংগ্রহোত্তর ক্ষতি বিবেচনায় উৎপাদন দরকার ৩৪ লাখ ৬১ হাজার টন। সে অনুযায়ী পিয়াজের ঘাটতি ৮ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন। তাই প্রতি বছর চাহিদা মেটাতে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।

ডিএইর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯০ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৯২০ টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৩৪০ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৯১ হাজার টন। গত অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় ১০ লাখ ৭ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। আমদানিকরা পিয়াজের পুরোটাই আসে ভারত থেকে। আর সামান্য পরিমাণে আসে চীন, মিশর, পাকিস্তানও মায়ানমার থেকে।

রোডম্যাপ অনুযায়ী চলতি (২০২০-২১) অর্থবছরে ২৫ লাখ ৯৬ হাজার টন নিট চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৫ শতাংশ ক্ষতিসহ পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৪ লাখ ৬১ হাজার টন। উৎপাদনশীলতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে ৬ লাখ ২৫ হাজার টন। ২ লাখ ৭০ হাজার টন আমদানির মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হবে। পরের বছর (২০২১-২২) চাহিদা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ২৫ হাজার টন। ক্ষতিসহ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৫ লাখ টন। ২০২১-২২ অর্থ বছরে ৬৮ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে চতুর্থ বছরে কোনো পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হবে না।

বিদ্যমান পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা সনাতন ও মোটেও বিজ্ঞান সম্মত নয়। ব্যাপক ক্ষতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পেঁয়াজকে ঘরে চিলেকোঠায় না হয় মাটির মেঝে বিছিয়ে অথবা পাটের বস্তায় মার্চ থেকে নভেম্বর অর্থাৎ চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের প্রাণান্তর চেষ্টা করা হয়। এ অবস্থায় পিয়াজের জাত ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা উপযুক্ত না হওয়ায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এতে সংরক্ষণকালীন শরীরতাত্ত্বি¡ক কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে ওজন কমে যায়। যেমন আর্দ্রতা কমে পেঁয়াজ সংকুচিত হয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, পচনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং অসময়ে অঙ্কুরিত হয়ে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়। বিশেষ করে জুন ও জুলাই মাসে যখন অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিরাজ করে, তখন পেঁয়াজ নষ্ট হয় বেশি।

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর এক আদেশে ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরনের পিয়াজের ক্ষেত্রে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। এ সিদ্ধান্তের পর থেকে দিনাজপুরের হিলি, সাতক্ষীরার ভোমরা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। উৎপাদনের এই ভরা মৌসুমে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির ফলে গত কয়েক দিনে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা কমে বর্তমানে খুচরা ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে দেশের পেঁয়াজ চাষিদের মধ্যে পণ্যটির ন্যায্যমূল্য নিয়ে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে বিকল্প দেশ থেকে আমদানি করা পিয়াজের দাম কমে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজিতে। মিসর ও চীন থেকে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমাদানিতে ব্যবসায়ীদের খরচ পড়েছে প্রায় ৪০ টাকা। এই সময়ে ভারতীয় পিয়াজের আমদানি হলে আমদানিকারকরাও বিপুল পরিমাণ লোকসানের সম্মুখীন হবেন এবং সংকটকালে ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানিতে নিরৎসাহিত হবেন।

গত বছর কেজি প্রতি পিয়াজের উৎপাদন খরচ ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২০ থেকে ২২ টাকা। ফরিদপুরের পেঁয়াজ চাষিরা জানান, বর্তমানে পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৭ থেকে ২৮ টাকা। কৃষক বিক্রি করছেন ২৪ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে। এই সময় ভারতীয় পেঁয়াজ বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করলে পিয়াজের দাম কমে যাবে। এতে লাভ তো দূরের কথা কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারবেন না। ২০১৯ সালে ভারতীয় পিয়াজের অবাধ আমদানির কারণে কৃষক ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন এবং লোকসান দিয়ে পেঁয়াজ বিক্রির কারণে পরের বছরই দেশে পেঁয়াজের আবাদ কমে যায়।

সবে মাত্র মুড়িকাটা পেঁয়াজ তোলা শুরু হয়েছে। এতেই পিয়াজের দাম কমে গেছে। এখন সারা দেশে চলছে চারা পেঁয়াজ রোপণের ধুম। পরপর দুই বছর পিয়াজের দাম বেশি থাকায় এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে চারা পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের মধ্যে প্রচুর আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু অবাধে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির কারণে যদি বাজারে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম কমে যায়, তা হলে পেঁয়াজ উৎপাদনের কৃষকের আগ্রহ কমে যাবে এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের রোডম্যাপ বিঘিœত হবে। বাংলাদেশকে নির্ভরশীল হতে হবে ভারতীয় পেঁয়াজের ওপরে। তাই ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সময়ে কৃষকের স্বার্থে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। অথবা কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পিয়াজের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্কারোপ করতে হবে। নইলে পিয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। বাস্তবতার মুখ দেখবে না কখনও। শুধু আমদানি বন্ধ করলেই দেশ পিয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। এ জন্য কৃষকের মধ্যে উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, পেঁয়াজ চাষিদের মধ্যে শতকরা চার ভাগ সুদে কৃষিঋণ প্রদান, পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, পাউডার তৈরি ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে পেঁয়াজ সংরক্ষণ, পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের ওপর পর্যাপ্ত কৃষক প্রশিক্ষণ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ সার ও বালাইনাশক সররাহ, আখ, ভুট্টা, হলুদ, আদা, মরিচ ও মুখিকচুর সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে পেঁয়াজের চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান হেক্টর প্রতি পিয়াজের ফলন ১১ টন থেকে ১৫ থেকে ১৬ টনে উন্নীত করতে হবে।

[লেখক : সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি),

নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.]

netairoy18@yahoo.com

back to top