alt

উপ-সম্পাদকীয়

তিস্তার ডান তীরের মঙ্গা মোকাবিলায় করণীয়

ছোলজার রহমান

: মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১

আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের ফলে তিস্তা নদী খাত নীলফামারী জেলার ডালিয়া থেকে আড়াই কিলোমিটার পূর্বদিকে সরে গিয়ে দোয়ানীতে আসে এবং সম্পূর্ণরূপে লালমনিরহাট জেলার নদীতে পরিণত হয়। সেচের জন্য পানি দান করে নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও লাভজনক হলেও উত্তরের ভারত কর্তৃক একবার গজলডোবায় এবং পরবর্তীতে দোয়ানীতে পানি আটকে নেয়ায় ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার সর্ববৃহৎ এ নদী খাতটি সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে যায়। গতিপথ বদলে দেয়ায় তলদেশ ভরাট হয়ে মূল নদী খাত বলতে কিছু থাকছে না। শুধু বাড়িঘর ও চাষাবাদহীন অংশে ১০০ গজ প্রশস্ত এলাকার মধ্য দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে ১ বা ২ ফুট গভীরতার যে প্রবাহ দেখা যায় সেটিই বর্তমানে এর মূল প্রবাহ।

প্রতি বছর বর্ষাকালের ফ্লাশ ফ্লাড বা পৃষ্ঠপ্রবাহ বা শিট প্রবাহের আকারে ৩-৪ ফুট উচ্চতার পানিপ্রবাহ ফসলি জমিসমূহের উপরি মৃত্তিকা ক্ষয় করে নিয়ে যায় এবং উজান থেকে বয়ে আনা বালি দিয়ে জমিসমূহ ভরাট করে দেয়। প্রতিবছর এরকম উপরের মাটি ধুয়ে নিয়ে যাওয়া ও বালি সঞ্চয় কাজের মাধ্যমে ফসলি জমিসমূহ ক্রমাগত বালুকাময় জমিতে পরিণত হচ্ছে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের চাষের জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়ে বাসিন্দাগণ নিত্য পানিসেচ ও রাসায়নিক সার দিয়ে ধু-ধু বালির মধ্যে সামান্যই ফসল ফলাচ্ছেন। এতে চাষ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ব্যাপক শ্রমের প্রয়োজন হয়। ৩-৪ দিনের মধ্যে সেচ না দিলে ফসলের গাছসমূহ মরে যায়। সেচের জন্য মেশিন ও পলিথিনের দীর্ঘ পাইপ ব্যবহৃত হয়। মৃত্তিকায় মোটেও পানি ধরে রাখা যায় না এবং কয়েকর ঘণ্টার মধ্যে বালির নিচ দিয়ে অনেক নিচে চলে যায় বলে ২-১ দিন পরপর সেচ এবং ৩-৪ বার রাসায়নিক সার দিতে হয়। ভূমি অসমতল ও অত্যধিক মোটাদানার বালিবিশিষ্ট হলে সেচ দেয়া কষ্টকর এবং প্রতিদিনই সেচ দিতে হয়। এ প্রকারের কৃষি উৎপাদনে ইঞ্জিনের জ্বালানি তেল ক্রয় এবং রাসায়নিক সার ক্রয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

পারিবারিক সদস্যের বিনামূল্যের শ্রম দিয়ে পরিবারসমূহ এরূপ কৃষিকাজ করে থাকে। ভুট্টা, বাদাম, সরিষা, লাউ, পেঁয়াজ, রসুন, তামাক, গম, ধনিয়া ইত্যাদি চাষ হলেও ভুট্টাই প্রধান ফসল। কেউ কেউ সামান্য পরিমাণে ধান ও ডাল ফলায়। ডিসেম্বরে পুরো উদ্যমে প্রস্তুত হয়ে জমি নির্বাচন ও নিজের জমি চিহ্নিত করা হয়। উপরের মাটি ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির আইল বা সীমানা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বালি দিয়ে ঢেকে গেলেও আইল খুঁজে পাওয়া যায় না, নদীভাঙন হলেও জমির আইল থাকে না। তাই প্রতি বছরই আমিন দিয়ে মাপামাপি করে সীমানা নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়ে। জমির ধরন ও মাটির গুণাগুণ দেখে উপযুক্ত ফসল নির্বাচন করা হয়। বীজ ও চারা সংগ্রহ করে বিনাচাষে শুধু সার ও পানি দিয়ে রোপণ করা হয়। তারপর থেকে প্রধান কাজ হলো পানি সেচ ও সার দেয়া। তাপমাত্রা যত বাড়তে থাকে সেচ দেয়ার পরিমাণও তত বাড়াতে হয়। ফসলভেদে রোপণের সময় আগেপিছে হয়ে থাকে। ফাল্গুন-চৈত্র-বৈশাখ মাসে ফসল তোলা হয়। কোন কোন কৃষক বর্ষাকালের অনিশ্চয়তা ও দুর্যোগেও কিছুটা ফসল ফলানোর আশায় বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে উঁচু জায়গায় ধানের বীজ ছড়িয়ে দিয়ে আসেন। পাখিতে খেয়ে ও পানিতে ভেসে যাওয়ার আগে অংকুরিত হয়ে কিছুসংখ্যক গাছ থেকে যায় এবং নদীভাঙন-মাটি ক্ষয়-বালি দ্বারা ঢেকে যাওয়ার পরেও কোন না কোন জমির কোন না কোন অংশে ফসল টিকে যেতেও পারে। এতে কোন চাষ, যত্ন, সেচ, সার ও নিড়ানী দেয়ার সুযোগ থাকে না। এতে যৎসামান্য ফসল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বৈশাখ থেকে নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং গ্রামবাসী জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক পর্যন্ত পানির কারণে গৃহবন্দী ও বেকার হয়ে থাকেন।

আগে মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। তাই মাছ ধরার কাজটিও লাভজনক হচ্ছে না। গবাদি পশুপালন লাভজনক হলেও বন্যাকালীন আশ্রয়, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা অনেকটাই সমস্যা ও দুঃশ্চিন্তাজনক। গ্রামবাসীর পানীয় জল ও শৌচাগারের সমস্যায় পড়তে হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেবা ও ক্ষুদ্র খামারির পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তার সুফল এখানে পৌঁছায় না। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক থাকলেও নিয়োজিত কর্মীদের সেবাদানের মানসিকতাহীনতার কারণে এলাকাবাসী বছরে অল্প কয়েক দিনই তাদের নাগাল পেয়ে থাকেন।

৫ থেকে ৭ মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর্মহীন পানিবন্দী থাকলেও হাতের কাজ, বাঁশের কাজ, কুটির শিল্পের কাজ, সুঁচি শিল্পের কাজ, বুনন কাজ ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজ সামান্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দিয়ে করানো যেত। কম পারিশ্রমিকে শ্রম দিয়েও তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারত। কিন্তু নিভৃত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাহীন এবং অগোচরে থাকায় কোন উদ্যোক্তা সেখানে যায় না এবং তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া শ্রমঘণ্টাকে কাজে লাগাতে এগিয়ে আসে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে তাদের ফসলি জমিসমূহ রক্ষা করাও সম্ভব। যেহেতু ৩ থেকে ৪ ফুট উচ্চতার পানিপ্রবাহ জমিসমূহকে নষ্ট করে দেয়, সেকারণে ডান তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে নদী খাতের দিকে পূর্ব থেকে পশ্চিমগামী ১ থেকে ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ৮-১০ ফুট উচ্চতার রাস্তারূপী ৮-১০টি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করা হলে পৃষ্ঠপ্রবাহ ও পৃষ্ঠ ক্ষয় রোধ হতো এবং জমিসমূহ রক্ষা পেত।

ডান তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জয়বাংলা বাজারের ২-৩ কিলোমিটার উত্তরে প্রথম ক্রস বাঁধ শুরু করে ২ কিলোমিটার পরপর অন্যগুলো পর্যায়ক্রমে দেয়া হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের বিনিময়ে জমিগুলো রক্ষা পেত। একেকটি স্পার/ক্রসবাঁধ তৈরিতে ১০ কোটি টাকা করে ব্যয় হলেও শত কোটি টাকার বিনিময়ে মঙ্গাকবলিত এ পকেট এলাকাটি রক্ষা পেত। নদী খনন করেও এর সুরাহা করা যেতে পারে। বছরের বেশিরভাগ সময়ে শুষ্ক থাকায় এবং বর্ষাকালেও তেমন গভীরতা না থাকায় ড্রেজিং মেশিন কার্যকরী হবে কিনা- অথবা ভাটি থেকে খনন করে উজানের দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।

মাটি রাখার স্থান অভাবে ড্রেজিং মেশিন দ্বারা কাটা মাটি পুনরায় নদীতেই ফেলা হয়, তাই এটি এখানে প্রযোজ্য ও ফলদায়ক হবে না। ফসলি জমি উদ্ধারের জন্য নদীর তলদেশ খনন করে উভয় পার্শ্বের জমিতে দেয়া হলে দুইপাড়ের মানুষ নিজেরাই জমিসমূহ উঁচু ও সমান করে নিতে পারত। প্রশস্ততা বেশি হওয়ায় খননকৃত মাটি কমপক্ষে ১ কিলোমিটার দূরে যে কোন তীরে পৌঁছানোর জন্য ঘুর্ণায়মান শিকল ব্যবস্থায় পরিবহন বেশ কার্যকর হতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিচু জমি ভরাটে দীর্ঘ পাইপলাইনযুক্ত শ্যালোমেশিন বা ছোট ছোট যন্ত্র ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। এরূপ অধিকসংখ্যক মেশিনের সাহায্যেও নদী খাত খনন করে দুইপাড়ে মাটি পৌঁছানো যেতে পারে। শুকনো মৌসুমে মানুষের মাধ্যমে কেটে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নও করা যেতে পারে। এলাকাটি পাদদেশীয় পলল সমভূমির অন্তর্গত হওয়ায় পলল পাখার মতো পলি ছড়ানোর বিষয়টি প্রতি বছরই ঘটে থাকে। পলির সরবরাহ তুলনামূলক বেশি এবং হারও অত্যন্ত দ্রুত। তাই একবার নদী খাত খনন করে দীর্ঘদিন সমস্যামুক্ত ও নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। প্রতি বছরই উচ্চ ও মধ্যগতির ৩০ কিলোমিটার নদীপথের কিছু কিছু জায়গা থেকে পলি অপসারণ করা না হলে নদী খননের সুফল স্থায়ী হবে না।

তিস্তাকে ঘিরে যে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা শোনা যাচ্ছে তা হয়ত অনেক সময়সাপেক্ষ। তাই তার দিকে চেয়ে কালক্ষেপণ করা কিংবা বসে না থেকে মঙ্গা দূরীকরণ ও ফসলি জমি উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

[লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ, সরকারি এমএম কলেজ]

প্রাণের মাঝে আয়

সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব মিলবে কি?

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ : সম্ভাবনা ও শঙ্কা

ছবি

চীন এবং আফগানিস্তানে তালেবান : সম্পর্ক ও নতুন সমীকরণ

এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার

ছবি

দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী

ছবি

পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের নেপথ্যে কী

জনতার সংগ্রাম কখনও ব্যর্থ হয় না

বাঁচতে হলে মানতে হবে

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি

ছবি

স্মরণ : বোধিপাল মহাথেরো

সংকটে জীবন ও জীবিকা

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

টিকাদান কর্মসূচির গতি বাড়াতে হবে

কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

ছবি

শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আসক্তি

ছবি

উদ্বাস্তু শিশুদের শিক্ষা

ক্ষমতায় ফিরছে তালেবান?

ন্যাপ : বাম ধারার উন্মেষ

ছবি

জনতার বিক্ষোভে অশান্ত কিউবা

রাষ্ট্র বনাম জনগণ, নাকি রাষ্ট্র ও জনগণ?

ছবি

করোনা যুদ্ধে মাস্কই প্রধান অস্ত্র

হাসপাতালের সেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালা

কাজুবাদাম সংগ্রহ ও সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা

টানেলের ওপারে যাওয়ার রোডম্যাপ চাই

মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব বাহিনী

করোনাকালে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ

উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি

ছবি

করোনা অতিমারীতে পাবলিক পরীক্ষা

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ নিধন পরিবেশ ও আইনবিরোধী

অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা

দুর্ঘটনার পর সচেতনতা বৃদ্ধি পায়

জমির চূড়ান্ত মালিকানা পেতে কী করবেন?

ঈদ উৎসবে ডেল্টার ছোবল

tab

উপ-সম্পাদকীয়

তিস্তার ডান তীরের মঙ্গা মোকাবিলায় করণীয়

ছোলজার রহমান

মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১

আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের ফলে তিস্তা নদী খাত নীলফামারী জেলার ডালিয়া থেকে আড়াই কিলোমিটার পূর্বদিকে সরে গিয়ে দোয়ানীতে আসে এবং সম্পূর্ণরূপে লালমনিরহাট জেলার নদীতে পরিণত হয়। সেচের জন্য পানি দান করে নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলার কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও লাভজনক হলেও উত্তরের ভারত কর্তৃক একবার গজলডোবায় এবং পরবর্তীতে দোয়ানীতে পানি আটকে নেয়ায় ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার সর্ববৃহৎ এ নদী খাতটি সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে যায়। গতিপথ বদলে দেয়ায় তলদেশ ভরাট হয়ে মূল নদী খাত বলতে কিছু থাকছে না। শুধু বাড়িঘর ও চাষাবাদহীন অংশে ১০০ গজ প্রশস্ত এলাকার মধ্য দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে ১ বা ২ ফুট গভীরতার যে প্রবাহ দেখা যায় সেটিই বর্তমানে এর মূল প্রবাহ।

প্রতি বছর বর্ষাকালের ফ্লাশ ফ্লাড বা পৃষ্ঠপ্রবাহ বা শিট প্রবাহের আকারে ৩-৪ ফুট উচ্চতার পানিপ্রবাহ ফসলি জমিসমূহের উপরি মৃত্তিকা ক্ষয় করে নিয়ে যায় এবং উজান থেকে বয়ে আনা বালি দিয়ে জমিসমূহ ভরাট করে দেয়। প্রতিবছর এরকম উপরের মাটি ধুয়ে নিয়ে যাওয়া ও বালি সঞ্চয় কাজের মাধ্যমে ফসলি জমিসমূহ ক্রমাগত বালুকাময় জমিতে পরিণত হচ্ছে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের চাষের জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বাধ্য হয়ে বাসিন্দাগণ নিত্য পানিসেচ ও রাসায়নিক সার দিয়ে ধু-ধু বালির মধ্যে সামান্যই ফসল ফলাচ্ছেন। এতে চাষ দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না, ব্যাপক শ্রমের প্রয়োজন হয়। ৩-৪ দিনের মধ্যে সেচ না দিলে ফসলের গাছসমূহ মরে যায়। সেচের জন্য মেশিন ও পলিথিনের দীর্ঘ পাইপ ব্যবহৃত হয়। মৃত্তিকায় মোটেও পানি ধরে রাখা যায় না এবং কয়েকর ঘণ্টার মধ্যে বালির নিচ দিয়ে অনেক নিচে চলে যায় বলে ২-১ দিন পরপর সেচ এবং ৩-৪ বার রাসায়নিক সার দিতে হয়। ভূমি অসমতল ও অত্যধিক মোটাদানার বালিবিশিষ্ট হলে সেচ দেয়া কষ্টকর এবং প্রতিদিনই সেচ দিতে হয়। এ প্রকারের কৃষি উৎপাদনে ইঞ্জিনের জ্বালানি তেল ক্রয় এবং রাসায়নিক সার ক্রয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

পারিবারিক সদস্যের বিনামূল্যের শ্রম দিয়ে পরিবারসমূহ এরূপ কৃষিকাজ করে থাকে। ভুট্টা, বাদাম, সরিষা, লাউ, পেঁয়াজ, রসুন, তামাক, গম, ধনিয়া ইত্যাদি চাষ হলেও ভুট্টাই প্রধান ফসল। কেউ কেউ সামান্য পরিমাণে ধান ও ডাল ফলায়। ডিসেম্বরে পুরো উদ্যমে প্রস্তুত হয়ে জমি নির্বাচন ও নিজের জমি চিহ্নিত করা হয়। উপরের মাটি ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির আইল বা সীমানা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বালি দিয়ে ঢেকে গেলেও আইল খুঁজে পাওয়া যায় না, নদীভাঙন হলেও জমির আইল থাকে না। তাই প্রতি বছরই আমিন দিয়ে মাপামাপি করে সীমানা নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়ে। জমির ধরন ও মাটির গুণাগুণ দেখে উপযুক্ত ফসল নির্বাচন করা হয়। বীজ ও চারা সংগ্রহ করে বিনাচাষে শুধু সার ও পানি দিয়ে রোপণ করা হয়। তারপর থেকে প্রধান কাজ হলো পানি সেচ ও সার দেয়া। তাপমাত্রা যত বাড়তে থাকে সেচ দেয়ার পরিমাণও তত বাড়াতে হয়। ফসলভেদে রোপণের সময় আগেপিছে হয়ে থাকে। ফাল্গুন-চৈত্র-বৈশাখ মাসে ফসল তোলা হয়। কোন কোন কৃষক বর্ষাকালের অনিশ্চয়তা ও দুর্যোগেও কিছুটা ফসল ফলানোর আশায় বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে উঁচু জায়গায় ধানের বীজ ছড়িয়ে দিয়ে আসেন। পাখিতে খেয়ে ও পানিতে ভেসে যাওয়ার আগে অংকুরিত হয়ে কিছুসংখ্যক গাছ থেকে যায় এবং নদীভাঙন-মাটি ক্ষয়-বালি দ্বারা ঢেকে যাওয়ার পরেও কোন না কোন জমির কোন না কোন অংশে ফসল টিকে যেতেও পারে। এতে কোন চাষ, যত্ন, সেচ, সার ও নিড়ানী দেয়ার সুযোগ থাকে না। এতে যৎসামান্য ফসল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বৈশাখ থেকে নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং গ্রামবাসী জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক পর্যন্ত পানির কারণে গৃহবন্দী ও বেকার হয়ে থাকেন।

আগে মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। তাই মাছ ধরার কাজটিও লাভজনক হচ্ছে না। গবাদি পশুপালন লাভজনক হলেও বন্যাকালীন আশ্রয়, খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা অনেকটাই সমস্যা ও দুঃশ্চিন্তাজনক। গ্রামবাসীর পানীয় জল ও শৌচাগারের সমস্যায় পড়তে হয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেবা ও ক্ষুদ্র খামারির পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তার সুফল এখানে পৌঁছায় না। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা ক্লিনিক থাকলেও নিয়োজিত কর্মীদের সেবাদানের মানসিকতাহীনতার কারণে এলাকাবাসী বছরে অল্প কয়েক দিনই তাদের নাগাল পেয়ে থাকেন।

৫ থেকে ৭ মাস পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর্মহীন পানিবন্দী থাকলেও হাতের কাজ, বাঁশের কাজ, কুটির শিল্পের কাজ, সুঁচি শিল্পের কাজ, বুনন কাজ ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজ সামান্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দিয়ে করানো যেত। কম পারিশ্রমিকে শ্রম দিয়েও তারা সন্তুষ্ট থাকতে পারত। কিন্তু নিভৃত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাহীন এবং অগোচরে থাকায় কোন উদ্যোক্তা সেখানে যায় না এবং তাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া শ্রমঘণ্টাকে কাজে লাগাতে এগিয়ে আসে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে তাদের ফসলি জমিসমূহ রক্ষা করাও সম্ভব। যেহেতু ৩ থেকে ৪ ফুট উচ্চতার পানিপ্রবাহ জমিসমূহকে নষ্ট করে দেয়, সেকারণে ডান তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে নদী খাতের দিকে পূর্ব থেকে পশ্চিমগামী ১ থেকে ২ কিলোমিটার দীর্ঘ ৮-১০ ফুট উচ্চতার রাস্তারূপী ৮-১০টি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করা হলে পৃষ্ঠপ্রবাহ ও পৃষ্ঠ ক্ষয় রোধ হতো এবং জমিসমূহ রক্ষা পেত।

ডান তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জয়বাংলা বাজারের ২-৩ কিলোমিটার উত্তরে প্রথম ক্রস বাঁধ শুরু করে ২ কিলোমিটার পরপর অন্যগুলো পর্যায়ক্রমে দেয়া হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের বিনিময়ে জমিগুলো রক্ষা পেত। একেকটি স্পার/ক্রসবাঁধ তৈরিতে ১০ কোটি টাকা করে ব্যয় হলেও শত কোটি টাকার বিনিময়ে মঙ্গাকবলিত এ পকেট এলাকাটি রক্ষা পেত। নদী খনন করেও এর সুরাহা করা যেতে পারে। বছরের বেশিরভাগ সময়ে শুষ্ক থাকায় এবং বর্ষাকালেও তেমন গভীরতা না থাকায় ড্রেজিং মেশিন কার্যকরী হবে কিনা- অথবা ভাটি থেকে খনন করে উজানের দিকে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।

মাটি রাখার স্থান অভাবে ড্রেজিং মেশিন দ্বারা কাটা মাটি পুনরায় নদীতেই ফেলা হয়, তাই এটি এখানে প্রযোজ্য ও ফলদায়ক হবে না। ফসলি জমি উদ্ধারের জন্য নদীর তলদেশ খনন করে উভয় পার্শ্বের জমিতে দেয়া হলে দুইপাড়ের মানুষ নিজেরাই জমিসমূহ উঁচু ও সমান করে নিতে পারত। প্রশস্ততা বেশি হওয়ায় খননকৃত মাটি কমপক্ষে ১ কিলোমিটার দূরে যে কোন তীরে পৌঁছানোর জন্য ঘুর্ণায়মান শিকল ব্যবস্থায় পরিবহন বেশ কার্যকর হতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিচু জমি ভরাটে দীর্ঘ পাইপলাইনযুক্ত শ্যালোমেশিন বা ছোট ছোট যন্ত্র ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। এরূপ অধিকসংখ্যক মেশিনের সাহায্যেও নদী খাত খনন করে দুইপাড়ে মাটি পৌঁছানো যেতে পারে। শুকনো মৌসুমে মানুষের মাধ্যমে কেটে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নও করা যেতে পারে। এলাকাটি পাদদেশীয় পলল সমভূমির অন্তর্গত হওয়ায় পলল পাখার মতো পলি ছড়ানোর বিষয়টি প্রতি বছরই ঘটে থাকে। পলির সরবরাহ তুলনামূলক বেশি এবং হারও অত্যন্ত দ্রুত। তাই একবার নদী খাত খনন করে দীর্ঘদিন সমস্যামুক্ত ও নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। প্রতি বছরই উচ্চ ও মধ্যগতির ৩০ কিলোমিটার নদীপথের কিছু কিছু জায়গা থেকে পলি অপসারণ করা না হলে নদী খননের সুফল স্থায়ী হবে না।

তিস্তাকে ঘিরে যে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা শোনা যাচ্ছে তা হয়ত অনেক সময়সাপেক্ষ। তাই তার দিকে চেয়ে কালক্ষেপণ করা কিংবা বসে না থেকে মঙ্গা দূরীকরণ ও ফসলি জমি উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

[লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ, সরকারি এমএম কলেজ]

back to top