alt

উপ-সম্পাদকীয়

নাসির-তামিমার বিয়ে বৈধ না অবৈধ

একটি আইনি বিশ্লেষণ

সিরাজ প্রামাণিক

: রোববার, ০৩ অক্টোবর ২০২১

ডিভোর্স না দিয়ে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করার অভিযোগের ধুয়া তুলে নাসির-তামিমাকে নিয়ে এর পূর্বেও পক্ষে-বিপক্ষে আবেগ, উত্তাপ, আলোচনা সমালোচনার ঢেউ উঠেছিল। অবশেষে আদালতের মামলায় ক্রিকেটার নাসির হোসাইন, তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মি এবং তাম্মির মা সুমি আক্তারের বিরুদ্ধে সমন জারি হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা জন্ম দিয়েছে। চায়ের দোকান থেকে টেলিভিশনের টক শো পর্যন্ত চলছে ধর্ম ও আইনি ব্যাখ্যা। আরও কিছুদিন চলবে এটাই স্বাভাবিক। তবে লেখার শুরুতে মূল ঘটনা জেনে নিই। মামলাটি তদন্ত করেছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসীম তিনজনকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামিমা রাকিবকে তালাক দেননি। আইনগতভাবে রাকিব তালাকের কোনো নোটিসও পাননি। তামিমা উল্টো জালিয়াতি করে তালাকের নোটিস তৈরি করে তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তালাক না দেয়ার ফলে তামিমা তাম্মী এখনও রাকিবের স্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। দেশের ধর্মীয় বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী এক স্বামীকে তালাক না দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা তাম্মীর বিয়ে অবৈধ। স্বামী থাকা অবস্থায় অবৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তারা দন্ডবিধির ৪৬৮/৪৭১/৪৯৪/৪৯৭/৫০০/৩৪ ধারায় অপরাধ করেছেন মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ বিয়েটিতে তামিমার মা সুমি আক্তারকেও দোষী বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাম্মির স্বামী দাবি করে রাকিব হাসান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় বলা হয়েছে ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাম্মি ও রাকিবের বিয়ে হয়। তাদের ৮ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। তাম্মি পেশায় একজন কেবিন ক্রু। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাম্মি ও ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা রাকিবের নজরে আসে। পরে পত্রপত্রিকায় তিনি ঘটনার বিষয়ে জানেন। মামলায় আরও বলা হয়েছে, তাম্মি ও নাসিরের এমন অনৈতিক ও অবৈধ সম্পর্কের কারণে রাকিব ও তার শিশু কন্যা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আসামিদের এমন কার্যকলাপে রাকিবের চরমভাবে মানহানি হয়েছে।

এবার আসি বৈধ আর অবৈধ বিয়ে নিয়ে। আইনগত অবস্থার ভিত্তিতে তিন ধরনের বিয়ে দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো হলো-বৈধ বিয়ে, অনিয়মিত বিয়ে, অবৈধ বিয়ে। যে বিয়ে মূলত বেআইনি নয়, কিন্তু যাতে কোন নিয়ম বা বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে, তাকে ফাসিদ বিয়ে বা অনিয়মিত বিয়ে বলা হয়। যেমন কোন মুসলমান নারী ইদ্দত পালন করছেন, এ রকম সময় তাকে বিয়ে করা হলে তা ফাসিদ বিয়ে বলে গণ্য হবে। ফাসিদ বিয়ের ফলে যে সন্তান জন্মলাভ করবে, তা বৈধ সন্তান বলে গণ্য হবে। নাসির-তামিমার মধ্যে যদি অনিয়মিত বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে এ বিয়েটা মোটেই বেআইনি নয়।

এবার আসি দন্ডবিধির ৪৯৭ ধারা সম্পর্কে। এখানে বলা হয়েছে যে, কোন পুরুষ কোন নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে এবং ওই নারীর স্বামীর অনুমতি না থাকলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে। কোন স্ত্রী পরকীয়া করলে যার সঙ্গে পরকীয়া করবে শুধু সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর কিছুই করার নেই।

একইভাবে স্বামী পরকীয়া করলে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে বা যার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত হবে তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিকার পাবেন না। সে কারণ ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশের উচ্চ আদালত এ ধারাটি কেন অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন এই আইন স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। নারীদের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করে। স্বামী কখনই স্ত্রীর প্রভু বা মালিক হতে পারেন না। তবে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন। লাহোর হাইকোর্ট একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা পাকিস্তান লিগ্যাল ডিসিশন, ১৯৭৪ সন্নিবেশিত রয়েছে। নারী আসামি হতে পারে না। তবে ওই পুরুষটির সাজা দিতে হলে অভিযোগকারীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার সময় আসামি জানত অথবা জানার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল যে, যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী নারী অপর কোন ব্যক্তির স্ত্রী।

উল্লেখ থাকে যে, কোন নারীকে তার পূর্বের স্বামী তালাক দিয়েছেন এই সরল বিশ্বাসে আসামি বিয়ে করলে তাকে এ ধারার অধীন দোষী সাব্যস্থ করা যায় না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যে নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করা হয় সেই নারী ওই সময় বিবাহিত না হলে এই ধারার অধীনে কোন অপরাধ আমলে আনা যায় না। এ ধারার অধীনে শাস্তি দিতে হলে বিয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হয়। তবে লাহোর হাইকোর্ট বলেছে, অবিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রীলোক যদি দীর্ঘদিন ধরে একত্রে বসবাস করে তাহলে বলা যাবে না যে, তারা ব্যাভিচারের অপরাধ করেছে। (পিএলডি ১৯৬২, ৫৫৮)। যেহেতু সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারামতে কোন ঘটনা প্রমাণের দায়িত্ব বাদীর। গোপাল চন্দ্র বনাম লাসমত দাসী মামলা যা ৩৪ ডিএলআর, ১৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে যে, বিচার্য বিষয় সম্পর্কে যে পক্ষ কোন ঘটনার অস্তিত্বের দাবি করে সে পক্ষই তা প্রমাণ করবে।

এবার আসি তালাক বিষয়ে। যে কোন যুক্তিসংগত কারণে মুসলিম স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে তালাক দিতে পারেন। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, আপনি তালাক দিতে চাইলে, তালাকের নোটিস নিজেই তৈরি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাকে তালাক দিচ্ছেন তিনি যদি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় বসবাস করেন, তাহলে সেই ইউপি চেয়ারম্যানকে উক্ত তালাকের নোটিস দিতে হবে। আর তিনি যদি পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাস করেন তাহলে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত নোটিস পাঠাতে হবে। ওই একই নোটিসের কপি যাকে তালাক দিচ্ছেন অর্থাৎ তালাক গ্রহীতাকে পাঠাতে হবে।

অনেকেই মনে করেন তালাকের নোটিস কাজীর মাধ্যমে না পাঠালে তা কার্যকর হয় না। এটি ভুল ধারণা। তালাকের নোটিস স্বামী বা স্ত্রী নিজে লিখিত আকারে পাঠিয়ে দিলেই হবে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে তালাকের নোটিস পাঠাতে কাজীর কাছে যেতে হবে-এমন কোন কথা লেখা নেই। আবার ১৯৬১ এর ৭(১) নং ধারা অনুযায়ী স্বামী যদি চেয়ারম্যান এবং স্ত্রীকে নোটিস প্রদান না করে তাহলে ৭ (২) ধারা অনুযায়ী স্বামী শাস্তি পাবে ঠিকই, কিন্তু তালাক বাতিল হবে না। উক্ত তালাক কার্যকর হবে। আবার তালাক রেজিস্ট্রি আইনে বাধ্যতামূলক নয়। বিয়ে রেজিস্ট্রি যেমন বাধ্যতামূলক এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি না করলে আইনে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তালাক রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে এ রকম বাধ্যবাধকতা কিংবা কোন শাস্তির ব্যবস্থা নেই।

এতক্ষণ যা কিছু উপস্থাপন করেছি, তা আইনের কথা মাত্র। তাহলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কীভাবে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেন যে, তালাক না দিয়েই তামিমা সুলতানা তাম্মি আরেকটি বিয়ে করেছেন? আমাদের বিচার বিভাগের একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা দরকার, যাতে করে ভুল প্রতিবেদনে যেন বিচার কাজ শুরু না হয়।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

কলকাতার পুরভোট ও সমকালীন রাজনীতি

ছবি

জেলখানার চিঠি - পিতা-পুত্রের কথোপকথন

ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

ছবি

নদী রক্ষার আন্দোলন

ছবি

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীরা কেন ‘হাফ পাস’ পাবে না

ছবি

রাজস্ব ও দেশের উন্নয়ন

অনলাইন জন্মনিবন্ধনে সমস্যা

ছবি

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন

শান্তিচুক্তি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার

পাঠ্যপুস্তক এবং আমাদের গোঁড়ামি

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

শিক্ষা বিস্তারে সরকারিকরণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

ছবি

বারবার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে

ছবি

প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন বিতর্ক

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

খসড়া আয়কর আইন নিয়ে কিছু কথা

তেল-গ্যাস সংকট : হাত বাড়াতে হবে সমুদ্রে

ইউপি নির্বাচন ও ইসির ভূমিকা

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

রোহিঙ্গা সংকট : নিরাপত্তা পরিষদেও প্রচেষ্টা চালাতে হবে

খেলার মাঠে পাকিস্তানপন্থার উল্লাস

পঞ্চাশের পাওয়া না-পাওয়া

ছবি

স্মরণ : লাল ঝান্ডা ও সম্পাদকের কলম

ছবি

স্মরণ : একজন সাহসী সম্পাদক

গ্লাসগো সম্মেলন থেকে কী মিলল?

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

নাসির-তামিমার বিয়ে বৈধ না অবৈধ

একটি আইনি বিশ্লেষণ

সিরাজ প্রামাণিক

রোববার, ০৩ অক্টোবর ২০২১

ডিভোর্স না দিয়ে অন্যের স্ত্রীকে বিয়ে করার অভিযোগের ধুয়া তুলে নাসির-তামিমাকে নিয়ে এর পূর্বেও পক্ষে-বিপক্ষে আবেগ, উত্তাপ, আলোচনা সমালোচনার ঢেউ উঠেছিল। অবশেষে আদালতের মামলায় ক্রিকেটার নাসির হোসাইন, তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মি এবং তাম্মির মা সুমি আক্তারের বিরুদ্ধে সমন জারি হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা জন্ম দিয়েছে। চায়ের দোকান থেকে টেলিভিশনের টক শো পর্যন্ত চলছে ধর্ম ও আইনি ব্যাখ্যা। আরও কিছুদিন চলবে এটাই স্বাভাবিক। তবে লেখার শুরুতে মূল ঘটনা জেনে নিই। মামলাটি তদন্ত করেছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসীম তিনজনকে আদালতে হাজির হতে সমন জারি করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তামিমা রাকিবকে তালাক দেননি। আইনগতভাবে রাকিব তালাকের কোনো নোটিসও পাননি। তামিমা উল্টো জালিয়াতি করে তালাকের নোটিস তৈরি করে তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তালাক না দেয়ার ফলে তামিমা তাম্মী এখনও রাকিবের স্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। দেশের ধর্মীয় বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী এক স্বামীকে তালাক না দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা তাম্মীর বিয়ে অবৈধ। স্বামী থাকা অবস্থায় অবৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে তারা দন্ডবিধির ৪৬৮/৪৭১/৪৯৪/৪৯৭/৫০০/৩৪ ধারায় অপরাধ করেছেন মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ বিয়েটিতে তামিমার মা সুমি আক্তারকেও দোষী বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাম্মির স্বামী দাবি করে রাকিব হাসান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় বলা হয়েছে ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাম্মি ও রাকিবের বিয়ে হয়। তাদের ৮ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। তাম্মি পেশায় একজন কেবিন ক্রু। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি তাম্মি ও ক্রিকেটার নাসির হোসেনের বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা রাকিবের নজরে আসে। পরে পত্রপত্রিকায় তিনি ঘটনার বিষয়ে জানেন। মামলায় আরও বলা হয়েছে, তাম্মি ও নাসিরের এমন অনৈতিক ও অবৈধ সম্পর্কের কারণে রাকিব ও তার শিশু কন্যা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আসামিদের এমন কার্যকলাপে রাকিবের চরমভাবে মানহানি হয়েছে।

এবার আসি বৈধ আর অবৈধ বিয়ে নিয়ে। আইনগত অবস্থার ভিত্তিতে তিন ধরনের বিয়ে দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো হলো-বৈধ বিয়ে, অনিয়মিত বিয়ে, অবৈধ বিয়ে। যে বিয়ে মূলত বেআইনি নয়, কিন্তু যাতে কোন নিয়ম বা বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে, তাকে ফাসিদ বিয়ে বা অনিয়মিত বিয়ে বলা হয়। যেমন কোন মুসলমান নারী ইদ্দত পালন করছেন, এ রকম সময় তাকে বিয়ে করা হলে তা ফাসিদ বিয়ে বলে গণ্য হবে। ফাসিদ বিয়ের ফলে যে সন্তান জন্মলাভ করবে, তা বৈধ সন্তান বলে গণ্য হবে। নাসির-তামিমার মধ্যে যদি অনিয়মিত বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে এ বিয়েটা মোটেই বেআইনি নয়।

এবার আসি দন্ডবিধির ৪৯৭ ধারা সম্পর্কে। এখানে বলা হয়েছে যে, কোন পুরুষ কোন নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করলে এবং ওই নারীর স্বামীর অনুমতি না থাকলে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে। কোন স্ত্রী পরকীয়া করলে যার সঙ্গে পরকীয়া করবে শুধু সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর কিছুই করার নেই।

একইভাবে স্বামী পরকীয়া করলে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে বা যার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত হবে তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিকার পাবেন না। সে কারণ ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশের উচ্চ আদালত এ ধারাটি কেন অবৈধ এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন এই আইন স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর। নারীদের স্বাতন্ত্র্য খর্ব করে। স্বামী কখনই স্ত্রীর প্রভু বা মালিক হতে পারেন না। তবে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে বলে মত দিয়েছেন। লাহোর হাইকোর্ট একটি নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা পাকিস্তান লিগ্যাল ডিসিশন, ১৯৭৪ সন্নিবেশিত রয়েছে। নারী আসামি হতে পারে না। তবে ওই পুরুষটির সাজা দিতে হলে অভিযোগকারীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে, ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার সময় আসামি জানত অথবা জানার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল যে, যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী নারী অপর কোন ব্যক্তির স্ত্রী।

উল্লেখ থাকে যে, কোন নারীকে তার পূর্বের স্বামী তালাক দিয়েছেন এই সরল বিশ্বাসে আসামি বিয়ে করলে তাকে এ ধারার অধীন দোষী সাব্যস্থ করা যায় না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যে নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করা হয় সেই নারী ওই সময় বিবাহিত না হলে এই ধারার অধীনে কোন অপরাধ আমলে আনা যায় না। এ ধারার অধীনে শাস্তি দিতে হলে বিয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হয়। তবে লাহোর হাইকোর্ট বলেছে, অবিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রীলোক যদি দীর্ঘদিন ধরে একত্রে বসবাস করে তাহলে বলা যাবে না যে, তারা ব্যাভিচারের অপরাধ করেছে। (পিএলডি ১৯৬২, ৫৫৮)। যেহেতু সাক্ষ্য আইনের ১০১ ধারামতে কোন ঘটনা প্রমাণের দায়িত্ব বাদীর। গোপাল চন্দ্র বনাম লাসমত দাসী মামলা যা ৩৪ ডিএলআর, ১৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে যে, বিচার্য বিষয় সম্পর্কে যে পক্ষ কোন ঘটনার অস্তিত্বের দাবি করে সে পক্ষই তা প্রমাণ করবে।

এবার আসি তালাক বিষয়ে। যে কোন যুক্তিসংগত কারণে মুসলিম স্বামী বা স্ত্রী একে অপরকে তালাক দিতে পারেন। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭(১) ধারা অনুযায়ী, আপনি তালাক দিতে চাইলে, তালাকের নোটিস নিজেই তৈরি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাকে তালাক দিচ্ছেন তিনি যদি ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় বসবাস করেন, তাহলে সেই ইউপি চেয়ারম্যানকে উক্ত তালাকের নোটিস দিতে হবে। আর তিনি যদি পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাস করেন তাহলে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে লিখিত নোটিস পাঠাতে হবে। ওই একই নোটিসের কপি যাকে তালাক দিচ্ছেন অর্থাৎ তালাক গ্রহীতাকে পাঠাতে হবে।

অনেকেই মনে করেন তালাকের নোটিস কাজীর মাধ্যমে না পাঠালে তা কার্যকর হয় না। এটি ভুল ধারণা। তালাকের নোটিস স্বামী বা স্ত্রী নিজে লিখিত আকারে পাঠিয়ে দিলেই হবে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশে তালাকের নোটিস পাঠাতে কাজীর কাছে যেতে হবে-এমন কোন কথা লেখা নেই। আবার ১৯৬১ এর ৭(১) নং ধারা অনুযায়ী স্বামী যদি চেয়ারম্যান এবং স্ত্রীকে নোটিস প্রদান না করে তাহলে ৭ (২) ধারা অনুযায়ী স্বামী শাস্তি পাবে ঠিকই, কিন্তু তালাক বাতিল হবে না। উক্ত তালাক কার্যকর হবে। আবার তালাক রেজিস্ট্রি আইনে বাধ্যতামূলক নয়। বিয়ে রেজিস্ট্রি যেমন বাধ্যতামূলক এবং বিয়ে রেজিস্ট্রি না করলে আইনে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু তালাক রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে এ রকম বাধ্যবাধকতা কিংবা কোন শাস্তির ব্যবস্থা নেই।

এতক্ষণ যা কিছু উপস্থাপন করেছি, তা আইনের কথা মাত্র। তাহলে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কীভাবে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেন যে, তালাক না দিয়েই তামিমা সুলতানা তাম্মি আরেকটি বিয়ে করেছেন? আমাদের বিচার বিভাগের একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা দরকার, যাতে করে ভুল প্রতিবেদনে যেন বিচার কাজ শুরু না হয়।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

back to top