alt

উপ-সম্পাদকীয়

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন

মোস্তাফা জব্বার

: সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১
image

‘রক্তে আনো লাল’ শীর্ষক স্মরণিকা

৫১ বছর পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার লেখা একটি প্রবন্ধের ডিজিটাল কপি পেলাম। রক্তে আনো লাল নামক একটি স্মরণিকার কপি হাতে পেলাম। ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখা অমর একুশে সংকলন প্রকাশ করে যাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। সংকলনে সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক প্রয়াত এম আনিসুজ্জামান যিনি আমার প্রথম লেখা প্রকাশ করেন ১৯৬৯ সালে ও প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাইদ। লেখাটি আমার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে আমি গর্ব বোধ করি এজন্য যে সেখানেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল। আমার উত্তরসূরিরা দুজন পন্ডিতের সঙ্গে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপিয়ে আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। এখনও লেখাটি সমসাময়িক চিন্তা ভাবনার প্রকাশ ঘটায়।

মানুষ চিন্তাশীল। চিন্তার বিকাশে তার আত্মার বিকাশ ঘটে। এবং সেই আস্থার জীবনেই মানুষের জীবন। ভাষা সেই চিন্তার প্রসার ও প্রকাশের মাধ্যম। ভাষাহীন চিন্তা করতে পারে না। তাই জীব জগতের একমাত্র মানুষই চিন্তাশীল, তার ভাষা আছে বলে। সুতরাং একই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীতে চিন্তার সমিলতা থাকাটা স্বাভাবিক। সম্ভবতঃ সেজন্যেই ভাষাকেও জাতি গঠনের একটা পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতি বা “নেশনের” বিজ্ঞান সম্মত পরিচয় হচ্ছে ‘পরস্পর’ একাত্মবোধ। কোন একটা জনসমষ্টি একটা বিজাতীয় ঔপনিবেশিক শাসনে ক্রমে ক্রমে অধপাতে ধাবিত হবে। বিজাতীয় শক্তির জাতিগত নিপীড়ন, নির্যাতন ও চরম বঞ্চনার ফলে সৃষ্ট বেধনাবোধ, শাসক গোষ্ঠির প্রতি মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার দুর্বার ইচ্ছায় অর্থাৎ স্বাধীনতা সম্ভোগের দুরন্ত বাসনায় সেই জনসমষ্টি জাতীয়তা বোধে উদ্দীপিত হবে।

বস্তুত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। অনেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সাম্রাজ্য বিস্তারের পদ্ধতি, ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্র রূপে চিহ্নিত করেছেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কেবল তা নয়। দৃষ্টান্ত দেয়া হয়ে থাকে, জার্মান জাতীয়তাবাদকে। জার্মানির মানবতাবিরোধী ভূমিকা অবশ্য নিন্দনীয়। এবং সেটা জাতীয়তাবাদের একটা বিকৃত ইচ্ছার প্রকাশ করেছে।

আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো জার্মানির মতো সা¤্রাজ্য বিস্তারের বাসনা রাখে না এবং এই আন্দোলনে উপনিবেশবাদের বিস্তার রোধ করাও সম্ভব। সুতরাং কেবলমাত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা জাতীয় রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় বিপ্লব সাধনের আজকের বিশ্বে ক্ষুদ্র শক্তিসমূহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহকে প্রতিহত করতে পারে। লক্ষ্যণীয় যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়ে বিশেষ করে সর্বহারার শ্রেণী স্বার্থকে নস্যাৎ করে পুঁজিবাদী শোষণ কৌশলরূপে ব্যবহৃত হতে পারে এবং শুধু জাতীয় বিপ্লবই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকের মুক্তি আনতে পারে না। জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করা যায় ও বিজাতীয় পুঁজির বিকাশ রুদ্ধ হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ও বিজাতীয় পুঁজির দ্বন্দ্বের অবসান হওয়ার জাতীয় পুঁজি বিকাশের যথার্থ অনুকূল পরিবেশ পেয়ে থাকে। সেই মুহূর্তে যদি সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করা সম্ভব না হয়, তাহলে জাতীয় বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য। লক্ষ্যচ্যুত জাতীয় বিপ্লব তখন মুষ্টিমেয় স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করে জাতীয় বণিক শ্রেণি সিংহাসণে বসলে, মূলতঃ প্রভুত্বের রদ বদলই হয়ে যাবে।

শোষক শোষকই এদের কোন জাত নেই ॥

জাতীয় শোষকও শোষক, বিজাতীয় তো বটেই। জাতীয় বিপ্লব পর্যন্ত জাতীয় বণিক শ্রেণী জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের সহায়তা করে থাকে। তাদের আশা থাকে ঔপনিবেশিক শক্তি বিতাড়িত হলে নিজেরাই শোষণ করার পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু তাদের ট্র্যাজেডি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের দানবীয় গ্রাস থেকে মুক্তি পাবার জন্য জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে এবং অনেকেই সফল হয়েছে। চীন, উত্তর কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম, কিউবা তার জলন্ত প্রমাণ। পক্ষান্তরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ও মধ্যপ্রাচ্য সাম্র্রাজ্যবাদবিরোধী তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি জাতীয়তাবাদই। আমাদের দেশেও পাঞ্জাবী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্রতর রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগে আন্তর্জাতিক কারণে সরাসরি রাজ্য আক্রমণ খুব একটা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাল, তলোয়ার নিয়ে রাজ্য দখল করতে পারলেই বিশ্ব তা মেনে নিচ্ছে না। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের নতুন আবরণ এসেছে। উপনিবেশ বিস্তারের জন্য লুকানো হস্ত প্রসারিত হয় AID-র মাধ্যমে বা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ নিয়ে। এই নয়া উপনিবেশবাদী কার্যক্রমকে প্রতিহত করার জন্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নেই। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, পূর্বেই বলেছি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন। বিজাতীয় শাসন ও শোষণকে উৎখাত করে জাতীয় জীবনের সর্বাঙ্গ থেকে বিজাতীয় প্রভাব মুছে ফেলে একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। জাতীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও ভাবাদর্শের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান ও মূল লক্ষ্য। অতএব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারলে ও সার্থক রূপ দেয়া সম্ভব হলে বিপ্লবের পরবর্তী স্তরে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নির্মূল হয়।

মানুষের দেশগত একটা পরিচয় আছে। দেশের জলবায়ু, সমাজ, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি সভ্যতা ও ঐতিহ্যগত পরিচয়ে মানুষ নিজেকে পরিচিত করতে ভালোবাসে। তার মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি জাতীয় মূল্যবোধ অগ্রসরমান হয়। সে নিজেকে চিনে তার পাশের মানুষকে দিয়ে। একে অন্যে পাশাপাশি জানাজানি, গুহাচারী ও গোত্রীয় মানুষকেও পরস্পরের আত্মীয় করে তুলেছে। পরস্পর ভাব বিনিময়ের জন্য প্রয়োজন পড়েছে কিছু কিছু সংকেতের তা দৈহিকই হোক আর ধ্বনিগতই হোক, মানুষ যতোই সভ্য হয়েছে, ধ্বনিগত সংকেতের ব্যবহার ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। দৈহিক সংকেতগুলোর প্রকাশ আজো নৃত্যে ব্যবহৃত হয়। আর ধ্বনিগত সংকেতগুলো ক্রমে ক্রমে বিবর্তিত হয়ে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। জাগতিক বিবর্তনের তাগিদে মানুষের গুহা জীবন, গোত্রীয় জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন বারবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নতুন নতুন জনসমষ্টি একত্রিত হয়েছে। সেই ভাঙ্গা গড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাষারও ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। কালে কালে বিলুপ্ত হয়েছে কোন ভাষা। নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। ধ্বংসের মাঝে জন্মেছে নতুন। ভাষা ও জাতি সম্পর্কযুক্ত এ জন্যই যে জাতি গঠনেও বিশেষ জনমসষ্টির পরস্পর একাত্মবোধের দরকার, ভাষা গঠনেও জনসমষ্টির ঐক্যবন্ধন আবশ্যকীয়। গোত্রযুগে একটা গোত্র যখন অন্য গোত্র দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তখন আক্রান্ত গোত্রে স্বভাবতই একটা এক্যবন্ধন গড়ে উঠেছে। অনাত্মীয়কে প্রতিহত করার ও শত্রুর অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য, পরস্পর ভেদাভেদ তুলে, শ্রেণী চেতনাকে অস্বীকার করে সম্মিলিত সংগ্রাম চালিয়েছে। আধুনিক যুগে বিজাতীয় আক্রমণ আরও তীক্ষè ও জঘণ্য হয়েছে। পুঁজিবাদী দেশসমূহ তাদের উৎপন্ন পণ্যদ্রব্যের বাজারের আশায় ও কাচামাল সংগ্রহের জন্য সাধারণ উপনিবেশ বিস্তার করে থাকে। আক্রান্ত উপনিবেশের জনগণ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে রুখে দাঁড়ায়। ভাষা সেই ঐক্য বন্ধনের বাণী প্রচার করে মানুষকে মানুষের আরো কাছের, আরো গভীর আত্মীয়ে পরিণত করে।

পাকিস্তান হলো। বাঙালিদের তাতে সমর্থন ছিল মুক্তির আশায়। কিন্তু পাকিস্তানি মুসলিম ধনিক সম্প্রদায় তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে তৎপর হলেন। পাকিস্তানে যে সব জাতি বা জাতির অংশ অন্তর্ভুক্ত হলো, ধনিক সম্প্রদায় প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঙালিরা তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দিক থেকে সচেতন। আর্য, সেন, পাল, মোগল, পাঠান, ইংরেজ সবাই বাঙালীদের সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থাকতো। তাদের আশঙ্কা হচ্ছিল যে কোন সময় বাঙালিদের পাকিস্তানি মুসলিম ধনিকের স্বার্থ উদ্ধারের পথকে রুদ্ধ করে দিতে পারে এবং তারা পাঞ্জাবের মানুষের ওপর একটু বেশি আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেজন্য মুসলিক ধনিক সম্প্রদায়ের আক্রমণ চললো বাঙালিদের লক্ষ্য করে। ভাষা চক্রান্তে তার প্রথম প্রকাশ ঘটে।

জাতীয়তাবোধ মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যেতে পারেনা। শতাব্দীর পর শতাব্দীর শোষণে বাঙালিরা কোনমতে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি টিকিয়ে রেখেছিল, তেমনি তার ছিল নিজের সব কিছুর প্রতিই একটা মমত্ববোধ। ধনিক চক্রের ও সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়াল চক্রান্ত বাঙালি চিত্তে প্রবল নাড়া লাগলো। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে ঘিরে ঘটলো এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণই পাকিস্তানোত্তর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রকাশ ও সূচনা।

বাঙালীর একটা দেশ আছে। সেই দেশের স্বতন্ত্র একটা পরিচয় আছে। স্বতন্ত্র ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সর্বোপরি একটা বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে, যা সমগ্র পৃথিবীতে বাঙালিকে একটা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সব মানুষেরই, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকে। চিন্তাশীল মানুষ সংস্কৃতি সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন। দৈশিক পরিধিতে, কালিক চেতনা নিয়ে জাতীয় পরিচয়ে মানুষ শিল্প সাহিত্যের লালন করে। শিল্প সাহিত্য, তাই তার অতি প্রিয় বস্তু, আত্মার আত্মীয়। কেননা, জাতীয় ভাবাদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধে ক্রমে ক্রমে সে গড়ে তুলে শিল্প সাহিত্যের ভিত্তি। শিল্প সাহিত্যে লালন করে সে জাতীয় মনন। সেই মননশীলতাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই যথার্থই বলা হয়, “জাতিকে বাদ দিয়ে যেমন মানুষকে ভাবা যায় না, মাটিকে বাদ দিয়ে তেমনি মানুষের অস্তিত্ব থাকে না, দৈশিক পরিচিতি ব্যতীত মানুষের মননশীলতার কোন পরিচয় পাওয়া যায় না।”

ভাষা যুগে যুগে সংস্কৃতি-প্রবাহকে বহন করে। কিন্তু যে দেশ স্বাধীন নয়, সে দেশে দেশীয় ভাষার মর্যাদা থাকে না। ঔপনিবেশিক নিগঢ়ে দেশীয় ভাষাকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, নয়তো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাবে দেশীয় ভাষা লুপ্ত হয়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষা হয়ে যায় উপনিবেশের ভাষা। পাকিস্তানের তাই হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধী, বেলুচী, পশতু, পাঞ্জাবি ভাষাগুলো ক্রমে ক্রমে উর্দুর চাপে লুপ্ত হতে চলেছে। সম্প্রতি খোদ সেখানেও সিন্ধীরা উর্দুর বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

ভাষা আন্দোলনকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম তার নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিলো শুধু সংস্কৃতিসেবীদের হাতে। কিন্তু অতি দ্রুত নেতৃত্ব অতি দ্রুত একটি ছাত্র সংগঠনের কাছে চলে যায়। কেননা তখন ভাষা আন্দোলনের শুধু ভাষা আন্দোলনই ছিল না সেটা একটা জাতির সঠিক বিক্ষোভের বাহন হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাসমূহ। ক্রমে ক্রমে সেই আন্দোলন ৫৪ সালের নির্বাচনী সংগ্রাম, অমর শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে ৬৬ সালে একটা সুষ্ঠু কর্মসূচি পেয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুথান সেই আন্দোলনকে করেছে আরও সুসংহত, আরও বেগবান।

৭০ সালের বাঙালি; সুসংবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ বাঙালি। স্থির চিত্তে মুক্তির শপথে তার অনঢ় অবস্থান।

সাম্রাজ্যবাদী চক্র ভাষা সমস্যার বাঙালিদের একটা “কনসেসন” দিয়েছে ঠিকই কিন্তু প্রকারাস্তরে ভেঙে ফেলেছেন বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদন্ড।

বাঙলাদেশ হয়েছে একটা উপনিবেশ। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম বিস্ফোরণ হয়েছিল ৫২ সালে; উত্তপ্ত বাংলাদেশ এখন তার চরম বিস্ফোরণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায়।

তখন বাংলাদেশে শুধু একটি মাত্র ছাত্র সংগঠনই ছিল, “পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ” নামে, বর্তমানে সেটা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।

সংযোজন:

(রক্তে আনো লাল ॥ নব বিক্রম, সাহিত্য সম্পাদক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখা কর্তৃক সম্পাদিত। এ. স্মরণিকা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার পক্ষ থেকে প্রচার সম্পাদক হাবিব মুর্শেদ (দুলাল) অ্যাসোসিয়েটেড প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছেপেছেন এবং ঢাকা কলেজ থেকে প্রকাশ করেছেন, প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন জাহিদ। এ, স্মরণিকার শুভেচ্ছা মূল্য ২৫ পয়সা ধার্য করা হয়েছে।

এ সংকলনে লিখেছেন : এম. আনিসুজ্জামান ॥ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং মোস্তাফা জব্বার ॥ ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৭০।)

[লেখক : ৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মী]

ছবি

নারী জাগরণের পথিকৃৎ

পাহাড় কি শান্তিতে আছে?

আসামের ডিটেনশন সেন্টারের নাম কেন বদলাচ্ছে

বাঙালির অদম্য দেশপ্রেম

বিলুপ্তির পথে বিরল প্রজাতির হনুমান

বনগুলো কি হারিয়ে যাবে

ডিজিটাল সাম্য সমাজের বীজ বঙ্গবন্ধু বপন করেছেন

ছবি

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সংস্কৃতি

চাকরি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, বিড়ম্বনা এবং অচলায়তন

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সাফল্য কি মিলল

ভয়কে জয় করা পরীক্ষা

শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

কলকাতার পুরভোট ও সমকালীন রাজনীতি

ছবি

জেলখানার চিঠি - পিতা-পুত্রের কথোপকথন

ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

ছবি

নদী রক্ষার আন্দোলন

ছবি

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীরা কেন ‘হাফ পাস’ পাবে না

ছবি

রাজস্ব ও দেশের উন্নয়ন

অনলাইন জন্মনিবন্ধনে সমস্যা

ছবি

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন

শান্তিচুক্তি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার

পাঠ্যপুস্তক এবং আমাদের গোঁড়ামি

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

শিক্ষা বিস্তারে সরকারিকরণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

ছবি

বারবার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে

ছবি

প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন বিতর্ক

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন

মোস্তাফা জব্বার

image

‘রক্তে আনো লাল’ শীর্ষক স্মরণিকা

সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১

৫১ বছর পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার লেখা একটি প্রবন্ধের ডিজিটাল কপি পেলাম। রক্তে আনো লাল নামক একটি স্মরণিকার কপি হাতে পেলাম। ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখা অমর একুশে সংকলন প্রকাশ করে যাতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ভাষা আন্দোলন নামে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। সংকলনে সাংবাদিক ও চিন্তাবিদ সাপ্তাহিক জনতার সম্পাদক প্রয়াত এম আনিসুজ্জামান যিনি আমার প্রথম লেখা প্রকাশ করেন ১৯৬৯ সালে ও প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সাইদ। লেখাটি আমার জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে আমি গর্ব বোধ করি এজন্য যে সেখানেই আমার রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছিল। আমার উত্তরসূরিরা দুজন পন্ডিতের সঙ্গে আমার একটি প্রবন্ধ ছাপিয়ে আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। এখনও লেখাটি সমসাময়িক চিন্তা ভাবনার প্রকাশ ঘটায়।

মানুষ চিন্তাশীল। চিন্তার বিকাশে তার আত্মার বিকাশ ঘটে। এবং সেই আস্থার জীবনেই মানুষের জীবন। ভাষা সেই চিন্তার প্রসার ও প্রকাশের মাধ্যম। ভাষাহীন চিন্তা করতে পারে না। তাই জীব জগতের একমাত্র মানুষই চিন্তাশীল, তার ভাষা আছে বলে। সুতরাং একই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীতে চিন্তার সমিলতা থাকাটা স্বাভাবিক। সম্ভবতঃ সেজন্যেই ভাষাকেও জাতি গঠনের একটা পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতি বা “নেশনের” বিজ্ঞান সম্মত পরিচয় হচ্ছে ‘পরস্পর’ একাত্মবোধ। কোন একটা জনসমষ্টি একটা বিজাতীয় ঔপনিবেশিক শাসনে ক্রমে ক্রমে অধপাতে ধাবিত হবে। বিজাতীয় শক্তির জাতিগত নিপীড়ন, নির্যাতন ও চরম বঞ্চনার ফলে সৃষ্ট বেধনাবোধ, শাসক গোষ্ঠির প্রতি মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার দুর্বার ইচ্ছায় অর্থাৎ স্বাধীনতা সম্ভোগের দুরন্ত বাসনায় সেই জনসমষ্টি জাতীয়তা বোধে উদ্দীপিত হবে।

বস্তুত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। অনেকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সাম্রাজ্য বিস্তারের পদ্ধতি, ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্র রূপে চিহ্নিত করেছেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কেবল তা নয়। দৃষ্টান্ত দেয়া হয়ে থাকে, জার্মান জাতীয়তাবাদকে। জার্মানির মানবতাবিরোধী ভূমিকা অবশ্য নিন্দনীয়। এবং সেটা জাতীয়তাবাদের একটা বিকৃত ইচ্ছার প্রকাশ করেছে।

আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগুলো জার্মানির মতো সা¤্রাজ্য বিস্তারের বাসনা রাখে না এবং এই আন্দোলনে উপনিবেশবাদের বিস্তার রোধ করাও সম্ভব। সুতরাং কেবলমাত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তথা জাতীয় রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় বিপ্লব সাধনের আজকের বিশ্বে ক্ষুদ্র শক্তিসমূহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহকে প্রতিহত করতে পারে। লক্ষ্যণীয় যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হয়ে বিশেষ করে সর্বহারার শ্রেণী স্বার্থকে নস্যাৎ করে পুঁজিবাদী শোষণ কৌশলরূপে ব্যবহৃত হতে পারে এবং শুধু জাতীয় বিপ্লবই সর্বহারা কৃষক শ্রমিকের মুক্তি আনতে পারে না। জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করা যায় ও বিজাতীয় পুঁজির বিকাশ রুদ্ধ হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় ও বিজাতীয় পুঁজির দ্বন্দ্বের অবসান হওয়ার জাতীয় পুঁজি বিকাশের যথার্থ অনুকূল পরিবেশ পেয়ে থাকে। সেই মুহূর্তে যদি সর্বহারার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধন করা সম্ভব না হয়, তাহলে জাতীয় বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য। লক্ষ্যচ্যুত জাতীয় বিপ্লব তখন মুষ্টিমেয় স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়ে যাবে। ঔপনিবেশিক শক্তিকে উৎখাত করে জাতীয় বণিক শ্রেণি সিংহাসণে বসলে, মূলতঃ প্রভুত্বের রদ বদলই হয়ে যাবে।

শোষক শোষকই এদের কোন জাত নেই ॥

জাতীয় শোষকও শোষক, বিজাতীয় তো বটেই। জাতীয় বিপ্লব পর্যন্ত জাতীয় বণিক শ্রেণী জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের সহায়তা করে থাকে। তাদের আশা থাকে ঔপনিবেশিক শক্তি বিতাড়িত হলে নিজেরাই শোষণ করার পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু তাদের ট্র্যাজেডি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের দানবীয় গ্রাস থেকে মুক্তি পাবার জন্য জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন চলছে এবং অনেকেই সফল হয়েছে। চীন, উত্তর কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম, কিউবা তার জলন্ত প্রমাণ। পক্ষান্তরে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস ও মধ্যপ্রাচ্য সাম্র্রাজ্যবাদবিরোধী তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের ভিত্তি জাতীয়তাবাদই। আমাদের দেশেও পাঞ্জাবী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্রতর রূপ নিচ্ছে। বিজ্ঞানের যুগে আন্তর্জাতিক কারণে সরাসরি রাজ্য আক্রমণ খুব একটা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাল, তলোয়ার নিয়ে রাজ্য দখল করতে পারলেই বিশ্ব তা মেনে নিচ্ছে না। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদের নতুন আবরণ এসেছে। উপনিবেশ বিস্তারের জন্য লুকানো হস্ত প্রসারিত হয় AID-র মাধ্যমে বা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপ নিয়ে। এই নয়া উপনিবেশবাদী কার্যক্রমকে প্রতিহত করার জন্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন ছাড়া গত্যন্তর নেই। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, পূর্বেই বলেছি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন। বিজাতীয় শাসন ও শোষণকে উৎখাত করে জাতীয় জীবনের সর্বাঙ্গ থেকে বিজাতীয় প্রভাব মুছে ফেলে একটা জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। জাতীয় শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও ভাবাদর্শের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান ও মূল লক্ষ্য। অতএব জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারলে ও সার্থক রূপ দেয়া সম্ভব হলে বিপ্লবের পরবর্তী স্তরে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নির্মূল হয়।

মানুষের দেশগত একটা পরিচয় আছে। দেশের জলবায়ু, সমাজ, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি সভ্যতা ও ঐতিহ্যগত পরিচয়ে মানুষ নিজেকে পরিচিত করতে ভালোবাসে। তার মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি জাতীয় মূল্যবোধ অগ্রসরমান হয়। সে নিজেকে চিনে তার পাশের মানুষকে দিয়ে। একে অন্যে পাশাপাশি জানাজানি, গুহাচারী ও গোত্রীয় মানুষকেও পরস্পরের আত্মীয় করে তুলেছে। পরস্পর ভাব বিনিময়ের জন্য প্রয়োজন পড়েছে কিছু কিছু সংকেতের তা দৈহিকই হোক আর ধ্বনিগতই হোক, মানুষ যতোই সভ্য হয়েছে, ধ্বনিগত সংকেতের ব্যবহার ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। দৈহিক সংকেতগুলোর প্রকাশ আজো নৃত্যে ব্যবহৃত হয়। আর ধ্বনিগত সংকেতগুলো ক্রমে ক্রমে বিবর্তিত হয়ে ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। জাগতিক বিবর্তনের তাগিদে মানুষের গুহা জীবন, গোত্রীয় জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন বারবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নতুন নতুন জনসমষ্টি একত্রিত হয়েছে। সেই ভাঙ্গা গড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাষারও ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। কালে কালে বিলুপ্ত হয়েছে কোন ভাষা। নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। ধ্বংসের মাঝে জন্মেছে নতুন। ভাষা ও জাতি সম্পর্কযুক্ত এ জন্যই যে জাতি গঠনেও বিশেষ জনমসষ্টির পরস্পর একাত্মবোধের দরকার, ভাষা গঠনেও জনসমষ্টির ঐক্যবন্ধন আবশ্যকীয়। গোত্রযুগে একটা গোত্র যখন অন্য গোত্র দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তখন আক্রান্ত গোত্রে স্বভাবতই একটা এক্যবন্ধন গড়ে উঠেছে। অনাত্মীয়কে প্রতিহত করার ও শত্রুর অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য, পরস্পর ভেদাভেদ তুলে, শ্রেণী চেতনাকে অস্বীকার করে সম্মিলিত সংগ্রাম চালিয়েছে। আধুনিক যুগে বিজাতীয় আক্রমণ আরও তীক্ষè ও জঘণ্য হয়েছে। পুঁজিবাদী দেশসমূহ তাদের উৎপন্ন পণ্যদ্রব্যের বাজারের আশায় ও কাচামাল সংগ্রহের জন্য সাধারণ উপনিবেশ বিস্তার করে থাকে। আক্রান্ত উপনিবেশের জনগণ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই ঐক্যবদ্ধভাবে তাকে রুখে দাঁড়ায়। ভাষা সেই ঐক্য বন্ধনের বাণী প্রচার করে মানুষকে মানুষের আরো কাছের, আরো গভীর আত্মীয়ে পরিণত করে।

পাকিস্তান হলো। বাঙালিদের তাতে সমর্থন ছিল মুক্তির আশায়। কিন্তু পাকিস্তানি মুসলিম ধনিক সম্প্রদায় তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে তৎপর হলেন। পাকিস্তানে যে সব জাতি বা জাতির অংশ অন্তর্ভুক্ত হলো, ধনিক সম্প্রদায় প্রথমেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বাঙালিরা তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক দিক থেকে সচেতন। আর্য, সেন, পাল, মোগল, পাঠান, ইংরেজ সবাই বাঙালীদের সম্বন্ধে সর্বদা সচেতন থাকতো। তাদের আশঙ্কা হচ্ছিল যে কোন সময় বাঙালিদের পাকিস্তানি মুসলিম ধনিকের স্বার্থ উদ্ধারের পথকে রুদ্ধ করে দিতে পারে এবং তারা পাঞ্জাবের মানুষের ওপর একটু বেশি আস্থা স্থাপন করেছিলেন। সেজন্য মুসলিক ধনিক সম্প্রদায়ের আক্রমণ চললো বাঙালিদের লক্ষ্য করে। ভাষা চক্রান্তে তার প্রথম প্রকাশ ঘটে।

জাতীয়তাবোধ মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যেতে পারেনা। শতাব্দীর পর শতাব্দীর শোষণে বাঙালিরা কোনমতে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি টিকিয়ে রেখেছিল, তেমনি তার ছিল নিজের সব কিছুর প্রতিই একটা মমত্ববোধ। ধনিক চক্রের ও সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়াল চক্রান্ত বাঙালি চিত্তে প্রবল নাড়া লাগলো। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে ঘিরে ঘটলো এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণই পাকিস্তানোত্তর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রকাশ ও সূচনা।

বাঙালীর একটা দেশ আছে। সেই দেশের স্বতন্ত্র একটা পরিচয় আছে। স্বতন্ত্র ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সর্বোপরি একটা বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান রয়েছে, যা সমগ্র পৃথিবীতে বাঙালিকে একটা জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সব মানুষেরই, ধর্ম, গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ থাকে। চিন্তাশীল মানুষ সংস্কৃতি সম্পর্কে একটু বেশি সচেতন। দৈশিক পরিধিতে, কালিক চেতনা নিয়ে জাতীয় পরিচয়ে মানুষ শিল্প সাহিত্যের লালন করে। শিল্প সাহিত্য, তাই তার অতি প্রিয় বস্তু, আত্মার আত্মীয়। কেননা, জাতীয় ভাবাদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধে ক্রমে ক্রমে সে গড়ে তুলে শিল্প সাহিত্যের ভিত্তি। শিল্প সাহিত্যে লালন করে সে জাতীয় মনন। সেই মননশীলতাই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই যথার্থই বলা হয়, “জাতিকে বাদ দিয়ে যেমন মানুষকে ভাবা যায় না, মাটিকে বাদ দিয়ে তেমনি মানুষের অস্তিত্ব থাকে না, দৈশিক পরিচিতি ব্যতীত মানুষের মননশীলতার কোন পরিচয় পাওয়া যায় না।”

ভাষা যুগে যুগে সংস্কৃতি-প্রবাহকে বহন করে। কিন্তু যে দেশ স্বাধীন নয়, সে দেশে দেশীয় ভাষার মর্যাদা থাকে না। ঔপনিবেশিক নিগঢ়ে দেশীয় ভাষাকে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, নয়তো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাবে দেশীয় ভাষা লুপ্ত হয়ে যায়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভাষা হয়ে যায় উপনিবেশের ভাষা। পাকিস্তানের তাই হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধী, বেলুচী, পশতু, পাঞ্জাবি ভাষাগুলো ক্রমে ক্রমে উর্দুর চাপে লুপ্ত হতে চলেছে। সম্প্রতি খোদ সেখানেও সিন্ধীরা উর্দুর বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

ভাষা আন্দোলনকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম তার নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিলো শুধু সংস্কৃতিসেবীদের হাতে। কিন্তু অতি দ্রুত নেতৃত্ব অতি দ্রুত একটি ছাত্র সংগঠনের কাছে চলে যায়। কেননা তখন ভাষা আন্দোলনের শুধু ভাষা আন্দোলনই ছিল না সেটা একটা জাতির সঠিক বিক্ষোভের বাহন হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাসমূহ। ক্রমে ক্রমে সেই আন্দোলন ৫৪ সালের নির্বাচনী সংগ্রাম, অমর শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে ৬৬ সালে একটা সুষ্ঠু কর্মসূচি পেয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুথান সেই আন্দোলনকে করেছে আরও সুসংহত, আরও বেগবান।

৭০ সালের বাঙালি; সুসংবদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ বাঙালি। স্থির চিত্তে মুক্তির শপথে তার অনঢ় অবস্থান।

সাম্রাজ্যবাদী চক্র ভাষা সমস্যার বাঙালিদের একটা “কনসেসন” দিয়েছে ঠিকই কিন্তু প্রকারাস্তরে ভেঙে ফেলেছেন বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদন্ড।

বাঙলাদেশ হয়েছে একটা উপনিবেশ। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রথম বিস্ফোরণ হয়েছিল ৫২ সালে; উত্তপ্ত বাংলাদেশ এখন তার চরম বিস্ফোরণের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষায়।

তখন বাংলাদেশে শুধু একটি মাত্র ছাত্র সংগঠনই ছিল, “পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ” নামে, বর্তমানে সেটা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।

সংযোজন:

(রক্তে আনো লাল ॥ নব বিক্রম, সাহিত্য সম্পাদক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখা কর্তৃক সম্পাদিত। এ. স্মরণিকা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার পক্ষ থেকে প্রচার সম্পাদক হাবিব মুর্শেদ (দুলাল) অ্যাসোসিয়েটেড প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছেপেছেন এবং ঢাকা কলেজ থেকে প্রকাশ করেছেন, প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন জাহিদ। এ, স্মরণিকার শুভেচ্ছা মূল্য ২৫ পয়সা ধার্য করা হয়েছে।

এ সংকলনে লিখেছেন : এম. আনিসুজ্জামান ॥ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং মোস্তাফা জব্বার ॥ ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ১৯৭০।)

[লেখক : ৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মী]

back to top