alt

উপ-সম্পাদকীয়

নীরবতার সংস্কৃতি ও মানব মুক্তির দর্শন

শেখর ভট্টাচার্য

: বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১

একটি জাতি মনস্তাত্বিক দিক থেকে কতটুকু এগিয়ে আছে, তা পরিমাপ করতে হলে সবার আগে জানতে হয় সে জাতির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা কতটুকু স্বস্তিতে আছেন। সু-সভ্য সংখ্যাগুরুরা সব সময় শঙ্কিত থাকেন কোন কারণে অন্যায্যভাবে সংখ্যালঘুদের পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে কিনা- এ কথাটি ভেবে। মতপ্রকাশ এবং মতকে গুরুত্ব দিয়ে শোনার ক্ষেত্রে তাই সংখ্যালঘুদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত অধিকাংশ মানুষের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সাম্প্রতিক কুমিল্লা থেকে সুচিত সাম্প্রদায়িক হামলা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ অনেক অসভ্য আচরণ, সব বিবেচনায় মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের মৌলবিশ্বাসের ওপর কুঠারাঘাত করেছে- এ কথাটি আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

আমাদের দেশে একটি প্রথা বা সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি, সেটি হলো বহমান সময়ের কোন অপকীর্তি নিয়ে যখন আলোচনা, সমালোচনা হয় তখন ক্ষমতাসীনরা তাদের শাসন আমলের পূর্বের অন্য কোন সময়ের তুলনা দিয়ে বলেন, ওই সময়ের থেকে অপকীর্তির তীব্রতা এবং নিষ্ঠুরতার মাত্রা কম। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া হয় যে সংখ্যা, মাত্রা ইত্যাদি তুলনামুলকভাবে কম, তাহলে কী ক্ষমতাসীনদের দায় কমে যায়? আমরা যা কিছুই বলিনা কেন, ক্ষমতাসীনরা কিন্তু সংবিধানের রীতি অনুযায়ী সব দায় মাথায় নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ গ্রহণ করেন, তাই তাদেরই রাষ্ট্র পরিচালনার সফলতার জন্য প্রশংসার ভাগ যেভাবে দেয়া হয়, একইভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতাও তাদের কাঁধে নিতে হয়। তবে এ বছরের দুর্গোৎসবের সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের মাত্রা এবং তাৎপর্য বোধ হয় আর অন্য কোন সময়ের সাথে তুলনা করে দায় এড়ানোর আর কোন সুযোগ নেই। সারা দেশে কম, বেশি ছড়িয়ে যাওয়া এই বীভৎস সংখ্যালঘু নির্যাতন মাত্রা ও ব্যাপ্তিতে এতই গভীর যে, এর দাগ হয়তো সময়ের সাথে কিছুটা শুকোবে কিন্তু চিহ্ন থেকে যাবে বহুকাল। এ চিহ্ন মুছতে হলে, যুগান্তকারী গণতান্ত্রিক কোন পদক্ষেপ নিতে হবে; যার মাধ্যমে সংখ্যালঘুরা ভাবেন সরকার তাদের ব্যর্থতাকে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রমাণ করছেনা বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার বার্তা দিচ্ছে।

দায় কী শুধুমাত্র সরকারের একার? সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের এগিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মানুষের কী কোন দায় নেই? আমরা সকলে মিলে নৈতিকতার অবক্ষয়ের চূড়ান্ত সীমানায় দাঁড়িয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছি। যখন মৌলবাদী শক্তির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে বলা হচ্ছিলো পার্শ্ববর্তী ভারতে সঙ্ঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাত, নির্যাতনের তুলনায় ব্যাপ্তি ও মাত্রায় অনেক কম তখন আমরা নীরবতাই হীরন্ময় বা ‘সায়েলেন্স ইজ গোল্ডেন’ এই নীতি অনুসরণ করেছি। রাজনীতিবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ‘বিশ্ব মডেল’, সরকারের সহযোগী সুশীল সমাজ এ কথাটির প্রতিধ্বনি তুলেছেন। পত্রিকার পাতায় যতো সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের সংবাদ ছাপা হতো, সবগুলোকেই ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা কিংবা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আওতায় নিয়ে আসা হতো। এভাবেই দিনে দিনে নানাভাবে ঋণ বেড়েছে। বাংলাদেশে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সংখ্যালঘুদের নায্যতা প্রাপ্তির বৈষম্যকে ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতনের সাথে তুলনা করে এক ধরনের ‘নায্যতা’ দানের চেষ্টা করে গেছেন। আর এ চেষ্টাকে বৈধতা দেয়ার জন্য নীরবতার সংস্কৃতির চর্চা করে গেছেন দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী এবং গণমাধ্যম।

অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ফরাসি দার্শনিক, সাহিত্যিক ভলতেয়ারের বিখ্যাত সেই উক্তি অধঃপতনের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছি। মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি বলেছিলেন- ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি হয়তো একমত পোষণ নাও করতে পারি; কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাবো।’ মত ও বিশ্বাস খুব কাছাকাছি দুটো বিষয়। মতকে যেমন শ্রদ্ধা করতে হয় অন্যের বিশ্বাসকেও ঠিক একইভাবে শ্রদ্ধা করতে হয়। গণতন্ত্রে তাই শত মত, শত বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলতে হয়। গণতন্ত্র কখনো কোন একটি মতকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি প্রদান করেনা। সবচেয়ে নীরব, সব চেয়ে ক্ষমতাহীন ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর বিশ্বাসকে ও সম্মান করতে শিক্ষা প্রদান করে গণতন্ত্র। তাই গণতন্ত্রের মৌলবাণী হচ্ছে শত ফুল বিকশিত করার পরিবেশ তৈরি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। শত ফুল, শত মত, শত বিশ্বাস তো দূরের কথা আমরা নিজেদের মত, বিশ্বাস ছাড়া সব মতকে গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হই। এটি যে শুধু বাংলাদশেই ঘটে থাকে তা কিন্তু নয়, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও পরমত ও পরের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে।

পঁচাত্তরের পর দেশের চাকা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার যে অপচেষ্টা চলছিলো, তা কিন্তু ভিন্ন রূপে ভিন্ন কৌশলে এখনও চলমান আছে। এখনো পাঠ্যপুস্তকে পাকিস্তান আমলের মতো সাম্প্রদায়িক সংস্কার অব্যাহত আছে। পাকিস্তানি শাসকেরা, নজরুলের কবিতার পঙ্ক্তিকে নিজেদের মত করে রচনা করতো, রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেও স্বস্তিতে থাকতে পারতো না। সাম্প্রতিককালে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে কবি, সাহিত্যিকদের অপছন্দের কবিতা, সাহিত্য রচনাকে বাদ দেয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িওক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। এসব কিছু করা হচ্ছে ভোটের ও ক্ষমতার রাজনীতিতে জয় লাভের জন্য। এ চেষ্টা ক্ষমতাসীন দল যেমন করে থাকেন একইভাবে ক্ষমতাকাক্সক্ষী দলেরাও অত্যন্ত কৌশলের সাথে করে যান। অর্থাৎ সব পক্ষ মিলে কে কতটুকু ছাড় দিতে পারেন মৌলবাদী গোষ্ঠীকে, এর একটি অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। রাজনৈতিক দলের নীতি-নির্ধারকরা সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের হিসাব ঠিক রাখার জন্য অত্যন্ত সচেতনভাবে মৌলবাদ ও মৌলবাদীদের মোটা তাজাকরণ প্রকল্প অব্যাহত রাখেন। আর আমাদের বিভিন্নমুখী এবং বিভিন্ন রঙের বুদ্ধিজীবীরা কৌশলটি যে কতটুকু ন্যায়সংগত ও সময়ানুগ তা প্রমাণের জন্য নানাভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যান। এই যে সমঝোতার পথে চলা, এ পথই আসলে আমাদের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপট তৈরিতে সহায়তা করেছে।

আমাদের দেশের শুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষের কী অভাব আছে? আমাদের অতি সাধারণ মানুষেরা কোন সময়ই সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সম্পন্ন ছিলেন না। আমাদের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের প্রান্তঃসীমায় বাস করা মানুষেরা। তারাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন। কুমিল্লার পরিকল্পিত হামলা ঠেকাতে কিন্তু স্থানীয় হিন্দু, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হামলাকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা পারেননি। আমরা শুনতে পাই প্রতিটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরই গণমাধ্যমের খবরে প্রান্তঃসীমার মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের সংবাদ। কিন্তু আমরা জেনে বিস্মিত হই এবং এটি একটি নিষ্ঠুর সত্য, রামু থেকে শুরু করে শাল্লা পর্যন্ত কোনো ঘটনাতেই বের হচ্ছে না মঞ্চের নেপথ্যে কারা ছিলেন তাদের নাম-পরিচয়। শুধু তাই নয়, হামলাকারীরা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন আর অভিযুক্ত নিরীহ মানুষেরা জামিনের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন। হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হচ্ছে না। হামলাকারীদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হয় তাহলে পরবর্তী হামলাকারীরা পরের পরিকল্পনা সফল করার জন্য উৎসাহ পেয়ে যায়। আর এ শাস্তি না হওয়ার কারণেই সাম্প্রদায়িক হামলা ক্রমাগত সংগঠিত হচ্ছে, ত্রিশ লাখ বাঙালির সম্মিলিত অর্জন এ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে।

আমাদের দেশে একটি প্রথা বা সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি, সেটি হলো বহমান সময়ের কোন অপকীর্তি নিয়ে যখন আলোচনা, সমালোচনা হয় তখন ক্ষমতাসীনরা তাদের শাসন আমলের পূর্বের অন্য কোন সময়ের তুলনা দিয়ে বলেন, ওই সময়ের থেকে অপকীর্তির তীব্রতা এবং নিষ্ঠুরতার মাত্রা কম।

আমাদের ফিরতে হবে। কোথায় ফিরতে হবে? আমাদের আবার স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জন, ত্রিশ লাখ মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা বাহাত্তরের সংবিধানে। সে সংবিধান থেকে আমাদের উল্টোপথে চলার কারণেই আজ অপশক্তিরা সিন্দাবাদের ভূতের মতো বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে আছে। আমরা আমাদের শুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে চাই না। বাহাত্তরের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার কথা পরিষ্কারভাবে লেখা আছে- রাষ্ট্র ধর্মের কথা লেখা নেই। তারপরও প্রকাশ্যে আমরা সংবিধান বিরোধী কথা শুনতে পাই। সব মানুষকে সাথে নিয়ে আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের বাংলায় ফিরতে হবে। ফিরতে হবে চন্ডীদাস ও বঙ্গবন্ধুর বাংলায়। উদাত্তভাবে মানবিকতার কথা বলে গেছেন চন্ডীদাস। পৃথিবীতে অনেক মহান বিপ্লব সাধনের পূর্বে যিনি বলেছিলেন- ‘শুন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ বঙ্গবন্ধু চন্ডীদাসের মানবিকতার দর্শনকে গ্রহণ করেছিলেন। ত্রিশ লাখ শহীদও আত্মদান করেছিলেন সেই দর্শনকে বিশ্বাস করে। আমাদের তাই ফিরতে হবে ‘বিশ্ব কবির সোনার বাংলায়, নজরুলের বাংলাদেশে, জীবনান্দের রূপসী বাংলায়।’ যেখানে মনুষ্যত্ব বিকাশের অমলিন প্রচেষ্টায় সবাই নিজেকে নিয়োজিত রাখে। আমাদের ফিরতেই হবে- এছাড়া আর কোন বিকল্প আমাদের নেই।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

ছবি

নারী জাগরণের পথিকৃৎ

পাহাড় কি শান্তিতে আছে?

আসামের ডিটেনশন সেন্টারের নাম কেন বদলাচ্ছে

বাঙালির অদম্য দেশপ্রেম

বিলুপ্তির পথে বিরল প্রজাতির হনুমান

বনগুলো কি হারিয়ে যাবে

ডিজিটাল সাম্য সমাজের বীজ বঙ্গবন্ধু বপন করেছেন

ছবি

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সংস্কৃতি

চাকরি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, বিড়ম্বনা এবং অচলায়তন

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সাফল্য কি মিলল

ভয়কে জয় করা পরীক্ষা

শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

ভালোমন্দ বোধ বিভ্রান্ত হয়

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা

কলকাতার পুরভোট ও সমকালীন রাজনীতি

ছবি

জেলখানার চিঠি - পিতা-পুত্রের কথোপকথন

ছবি

আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস

ছবি

নদী রক্ষার আন্দোলন

ছবি

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীরা কেন ‘হাফ পাস’ পাবে না

ছবি

রাজস্ব ও দেশের উন্নয়ন

অনলাইন জন্মনিবন্ধনে সমস্যা

ছবি

করোনার আরেক আতঙ্ক ওমিক্রন

শান্তিচুক্তি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার

পাঠ্যপুস্তক এবং আমাদের গোঁড়ামি

জগৎজ্যোতি দাস : ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ

শিক্ষা বিস্তারে সরকারিকরণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি

ছবি

বারবার কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হচ্ছে

ছবি

প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড আইন বিতর্ক

সহনশীলতা : সৃষ্টির শক্তি

ছবি

ভোগ্যপণ্যের ওপর ডলারের দামের প্রভাব

ছবি

খেলা বনাম রাজনীতি

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

ছবি

শহীদ ডা. মিলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন

ভারতের কৃষি আইন, মোদির ঘোষণা এবং রাজনীতি

তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা কেন দরকার?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

নীরবতার সংস্কৃতি ও মানব মুক্তির দর্শন

শেখর ভট্টাচার্য

বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১

একটি জাতি মনস্তাত্বিক দিক থেকে কতটুকু এগিয়ে আছে, তা পরিমাপ করতে হলে সবার আগে জানতে হয় সে জাতির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা কতটুকু স্বস্তিতে আছেন। সু-সভ্য সংখ্যাগুরুরা সব সময় শঙ্কিত থাকেন কোন কারণে অন্যায্যভাবে সংখ্যালঘুদের পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে কিনা- এ কথাটি ভেবে। মতপ্রকাশ এবং মতকে গুরুত্ব দিয়ে শোনার ক্ষেত্রে তাই সংখ্যালঘুদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত অধিকাংশ মানুষের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সাম্প্রতিক কুমিল্লা থেকে সুচিত সাম্প্রদায়িক হামলা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ অনেক অসভ্য আচরণ, সব বিবেচনায় মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের মৌলবিশ্বাসের ওপর কুঠারাঘাত করেছে- এ কথাটি আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

আমাদের দেশে একটি প্রথা বা সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি, সেটি হলো বহমান সময়ের কোন অপকীর্তি নিয়ে যখন আলোচনা, সমালোচনা হয় তখন ক্ষমতাসীনরা তাদের শাসন আমলের পূর্বের অন্য কোন সময়ের তুলনা দিয়ে বলেন, ওই সময়ের থেকে অপকীর্তির তীব্রতা এবং নিষ্ঠুরতার মাত্রা কম। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া হয় যে সংখ্যা, মাত্রা ইত্যাদি তুলনামুলকভাবে কম, তাহলে কী ক্ষমতাসীনদের দায় কমে যায়? আমরা যা কিছুই বলিনা কেন, ক্ষমতাসীনরা কিন্তু সংবিধানের রীতি অনুযায়ী সব দায় মাথায় নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার শপথ গ্রহণ করেন, তাই তাদেরই রাষ্ট্র পরিচালনার সফলতার জন্য প্রশংসার ভাগ যেভাবে দেয়া হয়, একইভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতাও তাদের কাঁধে নিতে হয়। তবে এ বছরের দুর্গোৎসবের সময় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের মাত্রা এবং তাৎপর্য বোধ হয় আর অন্য কোন সময়ের সাথে তুলনা করে দায় এড়ানোর আর কোন সুযোগ নেই। সারা দেশে কম, বেশি ছড়িয়ে যাওয়া এই বীভৎস সংখ্যালঘু নির্যাতন মাত্রা ও ব্যাপ্তিতে এতই গভীর যে, এর দাগ হয়তো সময়ের সাথে কিছুটা শুকোবে কিন্তু চিহ্ন থেকে যাবে বহুকাল। এ চিহ্ন মুছতে হলে, যুগান্তকারী গণতান্ত্রিক কোন পদক্ষেপ নিতে হবে; যার মাধ্যমে সংখ্যালঘুরা ভাবেন সরকার তাদের ব্যর্থতাকে ন্যায়সঙ্গত বলে প্রমাণ করছেনা বরং ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার বার্তা দিচ্ছে।

দায় কী শুধুমাত্র সরকারের একার? সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের এগিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মানুষের কী কোন দায় নেই? আমরা সকলে মিলে নৈতিকতার অবক্ষয়ের চূড়ান্ত সীমানায় দাঁড়িয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছি। যখন মৌলবাদী শক্তির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে বলা হচ্ছিলো পার্শ্ববর্তী ভারতে সঙ্ঘটিত সাম্প্রদায়িক সংঘাত, নির্যাতনের তুলনায় ব্যাপ্তি ও মাত্রায় অনেক কম তখন আমরা নীরবতাই হীরন্ময় বা ‘সায়েলেন্স ইজ গোল্ডেন’ এই নীতি অনুসরণ করেছি। রাজনীতিবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ‘বিশ্ব মডেল’, সরকারের সহযোগী সুশীল সমাজ এ কথাটির প্রতিধ্বনি তুলেছেন। পত্রিকার পাতায় যতো সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের সংবাদ ছাপা হতো, সবগুলোকেই ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা কিংবা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আওতায় নিয়ে আসা হতো। এভাবেই দিনে দিনে নানাভাবে ঋণ বেড়েছে। বাংলাদেশে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সংখ্যালঘুদের নায্যতা প্রাপ্তির বৈষম্যকে ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতনের সাথে তুলনা করে এক ধরনের ‘নায্যতা’ দানের চেষ্টা করে গেছেন। আর এ চেষ্টাকে বৈধতা দেয়ার জন্য নীরবতার সংস্কৃতির চর্চা করে গেছেন দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী এবং গণমাধ্যম।

অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ফরাসি দার্শনিক, সাহিত্যিক ভলতেয়ারের বিখ্যাত সেই উক্তি অধঃপতনের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছি। মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি বলেছিলেন- ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি হয়তো একমত পোষণ নাও করতে পারি; কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাবো।’ মত ও বিশ্বাস খুব কাছাকাছি দুটো বিষয়। মতকে যেমন শ্রদ্ধা করতে হয় অন্যের বিশ্বাসকেও ঠিক একইভাবে শ্রদ্ধা করতে হয়। গণতন্ত্রে তাই শত মত, শত বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলতে হয়। গণতন্ত্র কখনো কোন একটি মতকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি প্রদান করেনা। সবচেয়ে নীরব, সব চেয়ে ক্ষমতাহীন ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর বিশ্বাসকে ও সম্মান করতে শিক্ষা প্রদান করে গণতন্ত্র। তাই গণতন্ত্রের মৌলবাণী হচ্ছে শত ফুল বিকশিত করার পরিবেশ তৈরি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। শত ফুল, শত মত, শত বিশ্বাস তো দূরের কথা আমরা নিজেদের মত, বিশ্বাস ছাড়া সব মতকে গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হই। এটি যে শুধু বাংলাদশেই ঘটে থাকে তা কিন্তু নয়, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও পরমত ও পরের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে।

পঁচাত্তরের পর দেশের চাকা পেছন দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার যে অপচেষ্টা চলছিলো, তা কিন্তু ভিন্ন রূপে ভিন্ন কৌশলে এখনও চলমান আছে। এখনো পাঠ্যপুস্তকে পাকিস্তান আমলের মতো সাম্প্রদায়িক সংস্কার অব্যাহত আছে। পাকিস্তানি শাসকেরা, নজরুলের কবিতার পঙ্ক্তিকে নিজেদের মত করে রচনা করতো, রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করেও স্বস্তিতে থাকতে পারতো না। সাম্প্রতিককালে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে কবি, সাহিত্যিকদের অপছন্দের কবিতা, সাহিত্য রচনাকে বাদ দেয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িওক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। এসব কিছু করা হচ্ছে ভোটের ও ক্ষমতার রাজনীতিতে জয় লাভের জন্য। এ চেষ্টা ক্ষমতাসীন দল যেমন করে থাকেন একইভাবে ক্ষমতাকাক্সক্ষী দলেরাও অত্যন্ত কৌশলের সাথে করে যান। অর্থাৎ সব পক্ষ মিলে কে কতটুকু ছাড় দিতে পারেন মৌলবাদী গোষ্ঠীকে, এর একটি অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। রাজনৈতিক দলের নীতি-নির্ধারকরা সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের হিসাব ঠিক রাখার জন্য অত্যন্ত সচেতনভাবে মৌলবাদ ও মৌলবাদীদের মোটা তাজাকরণ প্রকল্প অব্যাহত রাখেন। আর আমাদের বিভিন্নমুখী এবং বিভিন্ন রঙের বুদ্ধিজীবীরা কৌশলটি যে কতটুকু ন্যায়সংগত ও সময়ানুগ তা প্রমাণের জন্য নানাভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে যান। এই যে সমঝোতার পথে চলা, এ পথই আসলে আমাদের বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপট তৈরিতে সহায়তা করেছে।

আমাদের দেশের শুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষের কী অভাব আছে? আমাদের অতি সাধারণ মানুষেরা কোন সময়ই সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সম্পন্ন ছিলেন না। আমাদের সব চেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের প্রান্তঃসীমায় বাস করা মানুষেরা। তারাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন। কুমিল্লার পরিকল্পিত হামলা ঠেকাতে কিন্তু স্থানীয় হিন্দু, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হামলাকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা পারেননি। আমরা শুনতে পাই প্রতিটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরই গণমাধ্যমের খবরে প্রান্তঃসীমার মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের সংবাদ। কিন্তু আমরা জেনে বিস্মিত হই এবং এটি একটি নিষ্ঠুর সত্য, রামু থেকে শুরু করে শাল্লা পর্যন্ত কোনো ঘটনাতেই বের হচ্ছে না মঞ্চের নেপথ্যে কারা ছিলেন তাদের নাম-পরিচয়। শুধু তাই নয়, হামলাকারীরা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন আর অভিযুক্ত নিরীহ মানুষেরা জামিনের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করছেন। হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হচ্ছে না। হামলাকারীদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা না হয় তাহলে পরবর্তী হামলাকারীরা পরের পরিকল্পনা সফল করার জন্য উৎসাহ পেয়ে যায়। আর এ শাস্তি না হওয়ার কারণেই সাম্প্রদায়িক হামলা ক্রমাগত সংগঠিত হচ্ছে, ত্রিশ লাখ বাঙালির সম্মিলিত অর্জন এ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে।

আমাদের দেশে একটি প্রথা বা সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি, সেটি হলো বহমান সময়ের কোন অপকীর্তি নিয়ে যখন আলোচনা, সমালোচনা হয় তখন ক্ষমতাসীনরা তাদের শাসন আমলের পূর্বের অন্য কোন সময়ের তুলনা দিয়ে বলেন, ওই সময়ের থেকে অপকীর্তির তীব্রতা এবং নিষ্ঠুরতার মাত্রা কম।

আমাদের ফিরতে হবে। কোথায় ফিরতে হবে? আমাদের আবার স্বাধীন বাংলাদেশের অর্জন, ত্রিশ লাখ মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা বাহাত্তরের সংবিধানে। সে সংবিধান থেকে আমাদের উল্টোপথে চলার কারণেই আজ অপশক্তিরা সিন্দাবাদের ভূতের মতো বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে আছে। আমরা আমাদের শুভ শক্তিসম্পন্ন মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে চাই না। বাহাত্তরের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার কথা পরিষ্কারভাবে লেখা আছে- রাষ্ট্র ধর্মের কথা লেখা নেই। তারপরও প্রকাশ্যে আমরা সংবিধান বিরোধী কথা শুনতে পাই। সব মানুষকে সাথে নিয়ে আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের বাংলায় ফিরতে হবে। ফিরতে হবে চন্ডীদাস ও বঙ্গবন্ধুর বাংলায়। উদাত্তভাবে মানবিকতার কথা বলে গেছেন চন্ডীদাস। পৃথিবীতে অনেক মহান বিপ্লব সাধনের পূর্বে যিনি বলেছিলেন- ‘শুন হে মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ বঙ্গবন্ধু চন্ডীদাসের মানবিকতার দর্শনকে গ্রহণ করেছিলেন। ত্রিশ লাখ শহীদও আত্মদান করেছিলেন সেই দর্শনকে বিশ্বাস করে। আমাদের তাই ফিরতে হবে ‘বিশ্ব কবির সোনার বাংলায়, নজরুলের বাংলাদেশে, জীবনান্দের রূপসী বাংলায়।’ যেখানে মনুষ্যত্ব বিকাশের অমলিন প্রচেষ্টায় সবাই নিজেকে নিয়োজিত রাখে। আমাদের ফিরতেই হবে- এছাড়া আর কোন বিকল্প আমাদের নেই।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

back to top