alt

উপ-সম্পাদকীয়

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

শেখর ভট্টাচার্য

: শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর ২০২১

নীতিবিজ্ঞান যে খুব ভালো বুঝি এ কথাটি দাবি করে বলতে পারব না। আমার নীতিবিজ্ঞানের জ্ঞান মাত্র ৩০০ নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সম্মান শ্রেণীতে পড়ার সময় সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে ৩০০ নম্বরের নীতিবিজ্ঞান পড়তে হয়েছিল। নীতিবিজ্ঞান পড়ে একটি বিষয় খুব ভালো করে বুঝেছিলাম, একটি কাজ “নৈতিক” না অনৈতিক তা বুঝতে হলে কাজের উদ্দেশ্য কী, তা ভালো করে জানতে হবে। সার্জন যখন চাকু ব্যবহার করে মরণাপন্ন রোগীর সার্জারি করেন তখন সেটা নৈতিক কাজ হিসাবে গণ্য হয়, কারণ কাজটির উদ্দেশ্য মহৎ। আবার কোন ছিনতাইকারী ছুরির ভয় দেখিয়ে যখন, মানুষের অর্থসহ মূল্যবান জিনিস ছিনতাই করে নিয়ে যায় তখন সে কাজটি অনৈতিক, কারণ উদ্দেশ্য মহৎ নয়। আর একটি উদাহরণ দেই নৈতিকতা, অনৈতিকতার। এই উদাহরণটি নীতিবিজ্ঞানের পাঠককে ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়। আপনি একজন অসহায় মানুষের বিরক্তিকর চাওয়ার জবাবে তাকে রাগান্বিত হয়ে একটি পাঁচ টাকার মুদ্রা ছুড়ে মারলেন, সেই অসহায় মানুষটি সেই টাকাটি কুড়িয়ে নিয়ে কিছু কিনে তার ক্ষুধা নিবারণ করলো। কাজটি কী নৈতিক না অনৈতিক? ক্ষুধা ও নিবারণ হলো, আবার দাতা টাকাও দিলেন কাজটা তো নৈতিক হওয়া উচিত। কিন্তু নীতিবিজ্ঞান এ কাজটিকে নৈতিক বলে না। কারণ দাতার উদ্দেশ্য মহৎ ছিল না। দাতা রাগান্বিত হয়ে, তাকে আঘাত করার জন্য মুদ্রা ছুড়ে মেরেছিলেন। ছুড়ে মারা মুদ্রা শরীরে লেগে অসহায় মানুষটি আঘাতও পেতে পারতেন এবং সর্বোপোরি দাতা রাগের বশে টাকাটি ছুড়ে মেরেছিলেন, দান করার উদ্দেশ্যে নয়।

স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে, এমনকি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও আমরা সামাজিক রীতিনীতিকে ক্রিয়াশীল দেখেছি। সাম্প্রতিক সময়ে মনে হচ্ছে নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ প্রায় নির্বাসনে চলে যাচ্ছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে, ঢাকার মহিলা সমিতি মঞ্চে একটি নাটক নিয়মিত মঞ্চায়ন হতো, নাটকটির নাম ছিল “সুবচন নির্বাসনে”। নাটকটি লিখেছিলেন, বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকার ও নাট্যভিনেতা প্রয়াত আব্দুল্লা আল মামুন। নাটকটি তিনি শুধু লিখেনইনি, নাটকটিতে তার দাপুটে অভিনয় দেখে দর্শকরা মুগ্ধ না হয়ে পারতেন না। সামাজিক জটিলতা, রাজনীতি এবং সমাজনীতির প্রভাবে নৈতিকতা কীভাবে নির্বাসিত হয়, নৈতিক বচন কীভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়, সে বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল নাটকটিতে। নাটকের গল্পের মূল চরিত্র বৃদ্ধ স্কুল শিক্ষক। তিনি তার সন্তানদের শৈশব থেকে কিছু সুবচন শিখিয়ে বড় করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক মানদন্ডকে শক্তিশালী করে মানবিক গুণ নিয়ে যাতে তারা বেড়ে ওঠে। প্রধানত তিনি তিনটি সুবচন শিখিয়েছিলেন সন্তানদের।

সুবচন নির্বাসনে নাটকে তিনটি সুবচন মিথ্যা প্রমাণিত হয়। নাটকটিতে স্কুলমাস্টারের বড় ছেলে খোকন পড়ালেখা করে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাস করার পর একটি অফিসে চাকরিপ্রার্থী হয়। অন্যদিকে তারই সহপাঠী তৃতীয় শ্রেণীতে পাস করে ওই একই অফিসে ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়ে যায়। এভাবেই মিথ্যে প্রমাণিত হয় ‘সততাই মহৎ গুণ’ সুবচনটি। স্কুলমাস্টারের ছোট ছেলে তপন মেধাবী ছাত্র, কিন্তু বড় ভাইয়ের অবস্থা দেখে পড়াশোনা ছেড়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’ সুবচনটিকে আর সত্য বলতে পারে না সে। একমাত্র মেয়ে রানু চরিত্রহীন স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ‘সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে’ সুবচনটি মিথ্যে প্রমাণিত হয় এখানে। নাটকের শেষদিকে স্কুলমাস্টারকে তিন সন্তান কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলে, তাদের করুণ পরিণতির জন্য পিতাই দায়ী। বৃদ্ধ পিতা দায় স্বীকার করেন। নাট্যকার বিচারের ভার অর্পণ করেন দর্শকের হাতে। নাট্যকার আব্দুল্লা আল মামুন যে বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন দর্শক বা নাগরিকদের হাতে, সে বিচার প্রক্রিয়া কিন্তু এখনও সম্পন হয়নি। সমাজ নিজেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে মানুষের প্রতি।

সাম্প্রতিক সময়ে যারা অনৈতিকভাবে ক্ষমতা অর্জন করেন, সমাজ তাদের স্বাদরে গ্রহণ করে। মূল্যবোধের মূল্যকে পরম যত্নে রেখে সমাজ ধীরে ধীরে বোধশূন্য হয়ে পড়ছে। মূল্যবোধ হলো রীতিনীতি ও আদর্শের মাপকাঠি; যা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। নীতি ভালো-মন্দের মধ্যে একটা স্পষ্ট পার্থক্য গড়ে দেয়। সুতরাং ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে সে সমাজ বা রাষ্ট্রের অনেক কিছুতেই ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। মূল্যবোধের অবক্ষয় বিষয়টি নিয়ে এতো আলোচনা হয় যে, মূল্যবোধ বিষয়টির আর সমাজের মানুষের কাছে গ্রাহ্য করার মতো কোন বিষয় হিসাবে দেখা যায়না। কিছুকাল পূর্বেও অনৈতিক কাজে জড়িত ব্যক্তিকে সামাজিক মানুষেরা এড়িয়ে চলতেন। এমনকি যিনি অন্যায় বা অপরাধ করতেন, তিনি নিজেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্যদের এড়িয়ে চলতেন। অন্যদিকে গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ ভালো হওয়ার পরামর্শ দিতেন। বয়স্ক ব্যক্তি, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, আইন কর্মকর্তাদের সবাই সম্মান করতেন।

বহমান কালে সমাজ ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ হারচ্ছে ব্যক্তির কাছ থেকে। সমাজের সংজ্ঞা পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। সামাজিক মূল্যবোধের আর নির্দিষ্ট কোন রীতি নীতি নেই। সমাজের গঠন, নীতি পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থ, বিত্তের মানদন্ডে এখন সমাজে মানুষের গ্রহণ যোগ্যতা নিশ্চিত হচ্ছে। আমাদের সমাজে সবকালে ন্যাচারেল লিডার বা স্বভাব নেতাদের একটি গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সামাজিক যে কোন কর্মকান্ডে স্বভাব নেতাদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। আজকাল আর স্বতঃস্ফূর্ত স্বভাব নেতাদের দেখা পাওয়া যায়না। নেতা মানেই নিয়ন্ত্রক, যার কাছে অবৈধভাবে ক্ষমতা অর্জিত হয়, তিনিই নেতা। অধিকাংশ সচেতন নাগরিক এরকম অবস্থাকে নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। অবক্ষয় ব্যাপারটা ক্যানসারের মতো। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে, যা আমরা এখন প্রতিনিয়ত দেখছি। সম্মানের সঙ্গে নীতির এবং নীতির সঙ্গে সামাজিক পরিস্থিতির একটা শক্তিশালী সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কটি যত দুর্বল হয়, নৈতিক অবক্ষয় তত মজবুত হয়।

সমাজ নেতা এখন কারা হচ্ছেন? সামাজিক প্রতিষ্ঠানে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন? চার পাশে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ডেকে নিয়ে আসা হয়, বিত্তশালী মানুষদের। কারন তারা নেতৃত্বে এলে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ঘটাতে পারবেন অর্থ এবং ক্ষমতা দিয়ে। নীতি, নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ প্রচলিত সমাজ কাঠামো এবং ক্ষমতা কাঠামোতে বড় বেমানান। বড় অসহায়। এক সময় অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনকারীকে সমাজ এড়িয়ে চলতো, কালের পরিক্রমায় এখন নৈতিকতার মাপকাঠিতে যিনি শক্তিশালী তাকে সমাজ এড়িয়ে চলে। কেন এমন বৈপরীত্য? অনৈতিকভাবে অর্থ, ক্ষমতা ও বিত্ত অর্জনকারী মানুষের নেতৃত্ব কী সমাজের জন্য দীর্ঘ পরিসরে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে? আবার ফিরে আসি নীতিশাস্ত্রের কথায়। এই যে দুর্বৃত্ত পরায়ণদের নেতৃত্ব সে নেতৃত্বের উদ্দেশ্য কী? সে নেতৃত্বের উদ্দেশ্য হলো, আরও ক্ষমতা আরও অর্থ, বিত্ত, দাপট এবং সর্বপোরি সমাজের নিয়ন্ত্রণ। এ রকম নিয়ন্ত্রণের ফলে এক সময় প্রান্তিক, অতিদরিদ্র মানুষেরা সর্বহারা হয়ে পড়বেন। ক্ষমতাশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে আমাদের এই সমাজ, আমাদের এই দেশ।

নেতৃত্ব যখন যাবে মাটির মানুষের হাতে, প্রান্তজনের মুঠোয় তখন সময়ের পরিবর্তন হবে

আমরা কী চাই ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা যারা লুণ্ঠন করে ইউরোপ, আমেরিকায় রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলছেন তাদের নেতৃত্ব চিরস্থায়ী হোক বাংলাদেশে। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদের মতো মানুষ আমাদের রাজনীতি সমাজনীতির উপদেশ দিয়ে যাক টিভি টকশো’তে এসে? আমাদের নেতৃত্ব চলে যাক অরাজনৈতিক লুণ্ঠনকারীদের হাতে। দেশপ্রেমিক মানুষেরা নিশ্চয়ই তা গ্রহণ করবেন না। একটি আশার বিষয়, এ দেশের সাধারণ মানুষেরা অন্তর দিয়ে দেশটিকে ভালোবাসেন। তারা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তৈরি পোশাক কারখানা, ওষুধ শিল্পসহ নানা রকম রপ্তানিমুখী শিল্প, কারখানায়। করোনাকালে আমাদের বাজারে এই যে কৃষিজাত পণ্যের কোন অভাব ছিল না, এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আমাদের কৃষকরা। তারা কিন্তু রাজনীতিতে নেই। তারা দেশ গড়ার কাজে নীরবে তাদের নিয়োজিত রাখছেন। তাদের হাড়খাটা পরিশ্রমের ফল ভোগ করছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সুযোগ সন্ধানী মানুষরা। তাদের জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের বিশ্বাস এখনও আমাদের রাজনীতি ক্ষেত্রে খুব কম হলেও কিছু মানুষ আছেন, যারা দেশপ্রেমিক; যারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারেন। তাদের এগিয়ে আসতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মূল মালিক যারা তাদের হাতে দেশের স্টিয়ারিং তুলে দিতে হবে। নেতৃত্ব যখন যাবে মাটির মানুষের হাতে, প্রান্তজনের মুঠোয় তখন সময়ের পরিবর্তন হবে। আমরা আশাবাদী নির্বাসন থেকে নীতি-নৈতিকতা ফিরে এসে অপার সম্ভাবনাময় দেশটিকে প্রকৃত অর্থে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসাবে গড়ে উঠবে। সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায় আছি গভীর আগ্রহ নিয়ে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

প্রিয়জন হারানোর বেদনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হয়েছেটা কী

ক্ষমতার অপব্যবহার দুর্নীতির অন্যতম কারণ

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন চাই

বাংলাদেশ-রাশিয়া বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক

মুজিববর্ষে আদিবাসীদের প্রতি ভালোবাসা

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে হবে মূল লক্ষ্য

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা : এখনও অনেক কাজ বাকি

ছবি

নাসিক নির্বাচন কি বার্তা দিচ্ছে?

ছবি

ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলো

ছবি

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমাদের জীবন, আমাদের সন্তান

সমাজে বিভক্তির ফাটল

ভারতে মুসলমানের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক অবহেলা

প্রসঙ্গ তালাকের নোটিশ

কীভাবে অজান্তেই ধনী হয়ে উঠছি

নির্বাচন ব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত কল্যাণ হবে না

ননএমপিও : অবসান হোক এ অসহ রাত্রির

ছবি

কখন ও কেমন হবে করোনার শেষটা

ছবি

‘বিদ্রোহী’ ও সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ

আস্থাহীনতা কেন চিন্তাহীনতার জন্ম দেয়?

কৃষির রূপান্তর : প্রাপ্তির মধ্যে অপ্রাপ্তিও আছে

ভূমি মন্ত্রণালয়ের আধুনিকায়ন ও প্রত্যাশা

ডিজিটাল বাংলাদেশ : প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

“অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু”

নতুন কপিরাইট আইনের খসড়া

ছবি

গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে নারীর অংশগ্রহণ

গণমাধ্যমের শিরদাঁড়া

এনসিটিবিতে হচ্ছেটা কী?

করোনায় সৃষ্ট মনোজগতের বিচ্ছিন্নতা

কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য

ছবি

মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি

আগামীতে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি বেঁচে থাকবে?

ছবি

উড়বে ঘুড়ি, পুড়বে আতশবাজি

স্বজন হত্যার বিচারের অপেক্ষায় এক মানুষ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায়

শেখর ভট্টাচার্য

শুক্রবার, ২৬ নভেম্বর ২০২১

নীতিবিজ্ঞান যে খুব ভালো বুঝি এ কথাটি দাবি করে বলতে পারব না। আমার নীতিবিজ্ঞানের জ্ঞান মাত্র ৩০০ নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সম্মান শ্রেণীতে পড়ার সময় সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে ৩০০ নম্বরের নীতিবিজ্ঞান পড়তে হয়েছিল। নীতিবিজ্ঞান পড়ে একটি বিষয় খুব ভালো করে বুঝেছিলাম, একটি কাজ “নৈতিক” না অনৈতিক তা বুঝতে হলে কাজের উদ্দেশ্য কী, তা ভালো করে জানতে হবে। সার্জন যখন চাকু ব্যবহার করে মরণাপন্ন রোগীর সার্জারি করেন তখন সেটা নৈতিক কাজ হিসাবে গণ্য হয়, কারণ কাজটির উদ্দেশ্য মহৎ। আবার কোন ছিনতাইকারী ছুরির ভয় দেখিয়ে যখন, মানুষের অর্থসহ মূল্যবান জিনিস ছিনতাই করে নিয়ে যায় তখন সে কাজটি অনৈতিক, কারণ উদ্দেশ্য মহৎ নয়। আর একটি উদাহরণ দেই নৈতিকতা, অনৈতিকতার। এই উদাহরণটি নীতিবিজ্ঞানের পাঠককে ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়। আপনি একজন অসহায় মানুষের বিরক্তিকর চাওয়ার জবাবে তাকে রাগান্বিত হয়ে একটি পাঁচ টাকার মুদ্রা ছুড়ে মারলেন, সেই অসহায় মানুষটি সেই টাকাটি কুড়িয়ে নিয়ে কিছু কিনে তার ক্ষুধা নিবারণ করলো। কাজটি কী নৈতিক না অনৈতিক? ক্ষুধা ও নিবারণ হলো, আবার দাতা টাকাও দিলেন কাজটা তো নৈতিক হওয়া উচিত। কিন্তু নীতিবিজ্ঞান এ কাজটিকে নৈতিক বলে না। কারণ দাতার উদ্দেশ্য মহৎ ছিল না। দাতা রাগান্বিত হয়ে, তাকে আঘাত করার জন্য মুদ্রা ছুড়ে মেরেছিলেন। ছুড়ে মারা মুদ্রা শরীরে লেগে অসহায় মানুষটি আঘাতও পেতে পারতেন এবং সর্বোপোরি দাতা রাগের বশে টাকাটি ছুড়ে মেরেছিলেন, দান করার উদ্দেশ্যে নয়।

স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশে, এমনকি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও আমরা সামাজিক রীতিনীতিকে ক্রিয়াশীল দেখেছি। সাম্প্রতিক সময়ে মনে হচ্ছে নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ প্রায় নির্বাসনে চলে যাচ্ছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে, ঢাকার মহিলা সমিতি মঞ্চে একটি নাটক নিয়মিত মঞ্চায়ন হতো, নাটকটির নাম ছিল “সুবচন নির্বাসনে”। নাটকটি লিখেছিলেন, বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকার ও নাট্যভিনেতা প্রয়াত আব্দুল্লা আল মামুন। নাটকটি তিনি শুধু লিখেনইনি, নাটকটিতে তার দাপুটে অভিনয় দেখে দর্শকরা মুগ্ধ না হয়ে পারতেন না। সামাজিক জটিলতা, রাজনীতি এবং সমাজনীতির প্রভাবে নৈতিকতা কীভাবে নির্বাসিত হয়, নৈতিক বচন কীভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হয়, সে বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল নাটকটিতে। নাটকের গল্পের মূল চরিত্র বৃদ্ধ স্কুল শিক্ষক। তিনি তার সন্তানদের শৈশব থেকে কিছু সুবচন শিখিয়ে বড় করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল নৈতিক মানদন্ডকে শক্তিশালী করে মানবিক গুণ নিয়ে যাতে তারা বেড়ে ওঠে। প্রধানত তিনি তিনটি সুবচন শিখিয়েছিলেন সন্তানদের।

সুবচন নির্বাসনে নাটকে তিনটি সুবচন মিথ্যা প্রমাণিত হয়। নাটকটিতে স্কুলমাস্টারের বড় ছেলে খোকন পড়ালেখা করে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পাস করার পর একটি অফিসে চাকরিপ্রার্থী হয়। অন্যদিকে তারই সহপাঠী তৃতীয় শ্রেণীতে পাস করে ওই একই অফিসে ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়ে যায়। এভাবেই মিথ্যে প্রমাণিত হয় ‘সততাই মহৎ গুণ’ সুবচনটি। স্কুলমাস্টারের ছোট ছেলে তপন মেধাবী ছাত্র, কিন্তু বড় ভাইয়ের অবস্থা দেখে পড়াশোনা ছেড়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’ সুবচনটিকে আর সত্য বলতে পারে না সে। একমাত্র মেয়ে রানু চরিত্রহীন স্বামীর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ‘সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে’ সুবচনটি মিথ্যে প্রমাণিত হয় এখানে। নাটকের শেষদিকে স্কুলমাস্টারকে তিন সন্তান কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলে, তাদের করুণ পরিণতির জন্য পিতাই দায়ী। বৃদ্ধ পিতা দায় স্বীকার করেন। নাট্যকার বিচারের ভার অর্পণ করেন দর্শকের হাতে। নাট্যকার আব্দুল্লা আল মামুন যে বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছিলেন দর্শক বা নাগরিকদের হাতে, সে বিচার প্রক্রিয়া কিন্তু এখনও সম্পন হয়নি। সমাজ নিজেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে মানুষের প্রতি।

সাম্প্রতিক সময়ে যারা অনৈতিকভাবে ক্ষমতা অর্জন করেন, সমাজ তাদের স্বাদরে গ্রহণ করে। মূল্যবোধের মূল্যকে পরম যত্নে রেখে সমাজ ধীরে ধীরে বোধশূন্য হয়ে পড়ছে। মূল্যবোধ হলো রীতিনীতি ও আদর্শের মাপকাঠি; যা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। নীতি ভালো-মন্দের মধ্যে একটা স্পষ্ট পার্থক্য গড়ে দেয়। সুতরাং ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, তাহলে সে সমাজ বা রাষ্ট্রের অনেক কিছুতেই ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। মূল্যবোধের অবক্ষয় বিষয়টি নিয়ে এতো আলোচনা হয় যে, মূল্যবোধ বিষয়টির আর সমাজের মানুষের কাছে গ্রাহ্য করার মতো কোন বিষয় হিসাবে দেখা যায়না। কিছুকাল পূর্বেও অনৈতিক কাজে জড়িত ব্যক্তিকে সামাজিক মানুষেরা এড়িয়ে চলতেন। এমনকি যিনি অন্যায় বা অপরাধ করতেন, তিনি নিজেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্যদের এড়িয়ে চলতেন। অন্যদিকে গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ ভালো হওয়ার পরামর্শ দিতেন। বয়স্ক ব্যক্তি, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, আইন কর্মকর্তাদের সবাই সম্মান করতেন।

বহমান কালে সমাজ ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ হারচ্ছে ব্যক্তির কাছ থেকে। সমাজের সংজ্ঞা পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। সামাজিক মূল্যবোধের আর নির্দিষ্ট কোন রীতি নীতি নেই। সমাজের গঠন, নীতি পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থ, বিত্তের মানদন্ডে এখন সমাজে মানুষের গ্রহণ যোগ্যতা নিশ্চিত হচ্ছে। আমাদের সমাজে সবকালে ন্যাচারেল লিডার বা স্বভাব নেতাদের একটি গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সামাজিক যে কোন কর্মকান্ডে স্বভাব নেতাদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। আজকাল আর স্বতঃস্ফূর্ত স্বভাব নেতাদের দেখা পাওয়া যায়না। নেতা মানেই নিয়ন্ত্রক, যার কাছে অবৈধভাবে ক্ষমতা অর্জিত হয়, তিনিই নেতা। অধিকাংশ সচেতন নাগরিক এরকম অবস্থাকে নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। অবক্ষয় ব্যাপারটা ক্যানসারের মতো। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে, যা আমরা এখন প্রতিনিয়ত দেখছি। সম্মানের সঙ্গে নীতির এবং নীতির সঙ্গে সামাজিক পরিস্থিতির একটা শক্তিশালী সম্পর্ক আছে। এই সম্পর্কটি যত দুর্বল হয়, নৈতিক অবক্ষয় তত মজবুত হয়।

সমাজ নেতা এখন কারা হচ্ছেন? সামাজিক প্রতিষ্ঠানে কারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন? চার পাশে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ডেকে নিয়ে আসা হয়, বিত্তশালী মানুষদের। কারন তারা নেতৃত্বে এলে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ঘটাতে পারবেন অর্থ এবং ক্ষমতা দিয়ে। নীতি, নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ প্রচলিত সমাজ কাঠামো এবং ক্ষমতা কাঠামোতে বড় বেমানান। বড় অসহায়। এক সময় অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনকারীকে সমাজ এড়িয়ে চলতো, কালের পরিক্রমায় এখন নৈতিকতার মাপকাঠিতে যিনি শক্তিশালী তাকে সমাজ এড়িয়ে চলে। কেন এমন বৈপরীত্য? অনৈতিকভাবে অর্থ, ক্ষমতা ও বিত্ত অর্জনকারী মানুষের নেতৃত্ব কী সমাজের জন্য দীর্ঘ পরিসরে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে? আবার ফিরে আসি নীতিশাস্ত্রের কথায়। এই যে দুর্বৃত্ত পরায়ণদের নেতৃত্ব সে নেতৃত্বের উদ্দেশ্য কী? সে নেতৃত্বের উদ্দেশ্য হলো, আরও ক্ষমতা আরও অর্থ, বিত্ত, দাপট এবং সর্বপোরি সমাজের নিয়ন্ত্রণ। এ রকম নিয়ন্ত্রণের ফলে এক সময় প্রান্তিক, অতিদরিদ্র মানুষেরা সর্বহারা হয়ে পড়বেন। ক্ষমতাশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে আমাদের এই সমাজ, আমাদের এই দেশ।

নেতৃত্ব যখন যাবে মাটির মানুষের হাতে, প্রান্তজনের মুঠোয় তখন সময়ের পরিবর্তন হবে

আমরা কী চাই ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা যারা লুণ্ঠন করে ইউরোপ, আমেরিকায় রাজপ্রাসাদ গড়ে তুলছেন তাদের নেতৃত্ব চিরস্থায়ী হোক বাংলাদেশে। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদের মতো মানুষ আমাদের রাজনীতি সমাজনীতির উপদেশ দিয়ে যাক টিভি টকশো’তে এসে? আমাদের নেতৃত্ব চলে যাক অরাজনৈতিক লুণ্ঠনকারীদের হাতে। দেশপ্রেমিক মানুষেরা নিশ্চয়ই তা গ্রহণ করবেন না। একটি আশার বিষয়, এ দেশের সাধারণ মানুষেরা অন্তর দিয়ে দেশটিকে ভালোবাসেন। তারা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তৈরি পোশাক কারখানা, ওষুধ শিল্পসহ নানা রকম রপ্তানিমুখী শিল্প, কারখানায়। করোনাকালে আমাদের বাজারে এই যে কৃষিজাত পণ্যের কোন অভাব ছিল না, এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আমাদের কৃষকরা। তারা কিন্তু রাজনীতিতে নেই। তারা দেশ গড়ার কাজে নীরবে তাদের নিয়োজিত রাখছেন। তাদের হাড়খাটা পরিশ্রমের ফল ভোগ করছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সুযোগ সন্ধানী মানুষরা। তাদের জাগিয়ে তুলতে হবে। আমাদের বিশ্বাস এখনও আমাদের রাজনীতি ক্ষেত্রে খুব কম হলেও কিছু মানুষ আছেন, যারা দেশপ্রেমিক; যারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারেন। তাদের এগিয়ে আসতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মূল মালিক যারা তাদের হাতে দেশের স্টিয়ারিং তুলে দিতে হবে। নেতৃত্ব যখন যাবে মাটির মানুষের হাতে, প্রান্তজনের মুঠোয় তখন সময়ের পরিবর্তন হবে। আমরা আশাবাদী নির্বাসন থেকে নীতি-নৈতিকতা ফিরে এসে অপার সম্ভাবনাময় দেশটিকে প্রকৃত অর্থে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসাবে গড়ে উঠবে। সুবর্ণ দিনের প্রত্যাশায় আছি গভীর আগ্রহ নিয়ে।

[লেখক : প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

back to top