alt

উপ-সম্পাদকীয়

মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি

সাকিলা পারভীন

: শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২২
image

২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি। তখন বেলা দ্বি-প্রহর। খুলনা শহরের আহসান আহমেদ রোডের বাসায় জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কন্যারা বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। পেশার পাশাপাশি সামাজিক কাজে সদা ব্যস্ত সাংবাদিক মানিক সাহা ঘরে ফিরে পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন। খুলনা প্রেসক্লাব থেকে রওনা হয়েছিলেন রিকশায়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁততায়ীর বোমা হামলায় থেমে যেতে হয় সাংবাদিক মানিক সাহাকে। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্তব্ধ হয়ে যায় খুলনাসহ সারাদেশের গণমাধ্যম। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে সারাদেশের সাংবাদিকসহ প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনগুলো। ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

ছোট্ট খুলনা শহরের একজন অতি সাধারণ জীবন-যাপনকারী সাংবাদিকের কি এমন ক্ষমতা? হ্যাঁ! ক্ষমতা একটু বেশিই ছিল বৈকি! ক্ষমতা ছিল সততার, ক্ষমতা ছিল স্বচ্ছতার, জবাবাদিহিতার, নেতৃত্বের, বস্তুনিষ্ঠতার, দৃঢ়তার, একাগ্রতার, ক্ষমতা ছিল সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীনভাবে রুখে দাঁড়াবার। সাংবাদিক মানিক সাহার এসব ক্ষমতাকে সমাজের সব কুচক্রী মহল, ষড়যন্ত্রকারী, দখলবাজ, সন্ত্রাসীদের ভীত করে তুলেছিল। তাই তো তাকে চিরতরে থামিয়ে দেয়ার নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছে দুর্বৃত্তরা। সেই ষড়যন্ত্রকে আরও সফল করতে কিঞ্চিৎ সহায়তা করেছে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনার বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির প্রচলন।

গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার রক্ষায় একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক মানিক সাহা আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন, খুলনা প্রেস ক্লাব, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মতো সংগঠনে। ছাত্র জীবন থেকে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যকাণ্ডের পর বিদ্রোহ করেছেন গ্রেপ্তার হয়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে জীবনের শেষ ১০/১৫ বছর সাংবাদিকতাই ছিল তার মূল পরিচয়। কোন অন্যায়ের কাছে মাথানত না করলেও মানিক সাহার মাথা বিহীন মরদেহেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে হয়েছে। কেননা দুর্বৃত্তরা ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেস ক্লাবের অদূরে বোমার আঘাতে বিচ্ছন্ন করে দিয়েছিল তার উঁচু মাথা।

সাংবাদিক মানিক সাহাকে হত্যার পর খুলনা শহরে ছুটে আসেন দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিরা। ছুটে আসেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যার ন্যায় বিচার হবে। কেবল মানিক সাহা হত্যা নয়, সব হত্যা-নির্যাতনের বিচার হবে। স্বাধীন দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা কাজ করবেন পূর্ণ স্বাধীনতায়। এরই মধ্যে পেরিয়েছে প্রায় দুই দশক। সেসব আশার বাণী আজও ভুলিনি সাংবাদিক মানিক সাহার সহকর্মী, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনরা। যেমন অসম্ভব জেনেও আজও অপেক্ষায় থাকেন মানিক সাহার জীবনসঙ্গী ও সন্তানরা।

ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হয়েছে অনেক মাইলফলক। তবে থেমে থাকেনি দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-হামলা-মামলা এমনকি হত্যার ঘটনা। কেবল ২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রায় দেড় শতাধিক সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হামলা-মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আর গত দেড় দশকে দেশে ২৩ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন; আহত হয়েছেন ৫৬১ জন।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২১) পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশে একজন সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান এবং ১৫৪ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হামলা-মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটজন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মীদের দ্বারা ১৪ জন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৩ জন এবং হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালে ১৩ জন সাংবাদিক আহত হন। এছাড়া ১০৬ জন সাংবাদিক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রণীত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নির্যাতনের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আইনটি প্রণীত হওয়ার পর থেকে এটি প্রমাণিত যে, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হামলার চেয়ে মামলার শক্তি বেশি। আর্টিকেল নাইনটিন ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া ২২৫টি মামলার ঘটনা রেকর্ড করেছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ৪১৭ জন ব্যক্তি এসব মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬৮ জন সাংবাদিক। এই সময় ১৫ জন সাংবাদিক এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ আইনে ২০২০ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার হওয়া লেখক মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাশিমপুর কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যু আইনটির ভয়াবহতার কথা আরও একবার মনে করিয়ে দেয়। ‘৩০০ টাকা বরাদ্দে রোগী পায় ৭০ টাকার খাবার’- এমন খবর প্রকাশ করায় জুলাই মাসে ঠাকুরগাঁওয়ের তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা হয়। এমনকি এই মামলায় অসুস্থ সাংবাদিককে হাতে হাতকড়া লাগাতে পিছপা হয়নি আইনশৃখলা বাহিনীর সদস্যরা।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়ে, যখন সাংবাদিকেরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হন। সাধারণত সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে থাকেন কিংবা প্রভাবশালীদের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক থাকে। ফলে সাংবাদিকদের হত্যা কিংবা নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার হয় না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে থেকেই যায়; সাংবাদিক নির্যাতন করলে শাস্তি পেতে হবে না, এমন মানসিকতা সাংবাদিক নির্যাতনকারীদের মনে আরও সাহস জোগায়।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্যানুযায়ী ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এত সাংবাদিক নিহত হলেন, অথচ বিচার শেষ হয়েছে মাত্র আটটির। এই আটটির বিচারিক রায়ের পাঁচটিই ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেও জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস। আর কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)’র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল থেকে এপর্যন্ত পেশার কারণে খুন হয়েছেন ২৩ জন সাংবাদিকে। আর উইকিপিডিয়ার হিসাবে ১৯৯৬ সাল থেকে এপর্যন্ত খুন হওয়া সাংবাদিকের সংখ্যা ৩৫। প্রকৃত অর্থে ওই সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। বিচার না পাওয়া ব্যক্তিদের দলে রয়েছেন- মানিক সাহা হত্যার ছয় মাস না যেতেই দুর্বৃত্তদের নৃশংস বোমার আঘাতে হত্যার শিকার দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালুর স্বজনেরা, নিহত সাংবাদিক সাগর-রুনির সন্তান মেঘসহ আরও অনেক পরিবার। রক্ত হিম করা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র জমা দেয়ার তারিখ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮৫ বার পিছিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার এই ভূমিকাকে ঠিক কোন বিশেষণে ডাকা যায় তা জানা নেই!

আর সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা মামলার ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ এমএ রব হাওলাদার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১১ আসামির মধ্যে ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ১০ হজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের দণ্ড দেয়া হয়। হত্যা মামলায় এসব আসামিদের সাজা হলেও বিস্ফোরক মামলায় কোনো আসামিকে সাজা দেয়া যায়নি। যে রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছিল তার পরিবারসহ সুহৃদ সাংবাদিক সমাজ। মানিক সাহার রায়ের পর সারাদেশের সাংবাদিকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেছেন। পুনঃতদন্তরে দাবি জানিয়েছেন। সে দাবি ওই পর্যন্তই। বাস্তবে কেউ আর সেটা আমলে নেয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

[লেখক : সাংবাদিক]

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

tab

উপ-সম্পাদকীয়

মানিক সাহা হত্যাকাণ্ড ও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি

সাকিলা পারভীন

image

শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২২

২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি। তখন বেলা দ্বি-প্রহর। খুলনা শহরের আহসান আহমেদ রোডের বাসায় জীবনসঙ্গীর সঙ্গে কন্যারা বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। পেশার পাশাপাশি সামাজিক কাজে সদা ব্যস্ত সাংবাদিক মানিক সাহা ঘরে ফিরে পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন। খুলনা প্রেসক্লাব থেকে রওনা হয়েছিলেন রিকশায়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আঁততায়ীর বোমা হামলায় থেমে যেতে হয় সাংবাদিক মানিক সাহাকে। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। স্তব্ধ হয়ে যায় খুলনাসহ সারাদেশের গণমাধ্যম। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে সারাদেশের সাংবাদিকসহ প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনগুলো। ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

ছোট্ট খুলনা শহরের একজন অতি সাধারণ জীবন-যাপনকারী সাংবাদিকের কি এমন ক্ষমতা? হ্যাঁ! ক্ষমতা একটু বেশিই ছিল বৈকি! ক্ষমতা ছিল সততার, ক্ষমতা ছিল স্বচ্ছতার, জবাবাদিহিতার, নেতৃত্বের, বস্তুনিষ্ঠতার, দৃঢ়তার, একাগ্রতার, ক্ষমতা ছিল সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীনভাবে রুখে দাঁড়াবার। সাংবাদিক মানিক সাহার এসব ক্ষমতাকে সমাজের সব কুচক্রী মহল, ষড়যন্ত্রকারী, দখলবাজ, সন্ত্রাসীদের ভীত করে তুলেছিল। তাই তো তাকে চিরতরে থামিয়ে দেয়ার নীল নকশা বাস্তবায়ন করেছে দুর্বৃত্তরা। সেই ষড়যন্ত্রকে আরও সফল করতে কিঞ্চিৎ সহায়তা করেছে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনার বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির প্রচলন।

গণমাধ্যমকর্মীদের অধিকার রক্ষায় একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক মানিক সাহা আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়ন, খুলনা প্রেস ক্লাব, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মতো সংগঠনে। ছাত্র জীবন থেকে বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যকাণ্ডের পর বিদ্রোহ করেছেন গ্রেপ্তার হয়েছেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সাংবাদিকতা ও রাজনীতির পাশাপাশি ছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে জীবনের শেষ ১০/১৫ বছর সাংবাদিকতাই ছিল তার মূল পরিচয়। কোন অন্যায়ের কাছে মাথানত না করলেও মানিক সাহার মাথা বিহীন মরদেহেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে হয়েছে। কেননা দুর্বৃত্তরা ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেস ক্লাবের অদূরে বোমার আঘাতে বিচ্ছন্ন করে দিয়েছিল তার উঁচু মাথা।

সাংবাদিক মানিক সাহাকে হত্যার পর খুলনা শহরে ছুটে আসেন দেশি-বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধিরা। ছুটে আসেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যার ন্যায় বিচার হবে। কেবল মানিক সাহা হত্যা নয়, সব হত্যা-নির্যাতনের বিচার হবে। স্বাধীন দেশের গণমাধ্যমকর্মীরা কাজ করবেন পূর্ণ স্বাধীনতায়। এরই মধ্যে পেরিয়েছে প্রায় দুই দশক। সেসব আশার বাণী আজও ভুলিনি সাংবাদিক মানিক সাহার সহকর্মী, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনরা। যেমন অসম্ভব জেনেও আজও অপেক্ষায় থাকেন মানিক সাহার জীবনসঙ্গী ও সন্তানরা।

ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হয়েছে অনেক মাইলফলক। তবে থেমে থাকেনি দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-হামলা-মামলা এমনকি হত্যার ঘটনা। কেবল ২০২১ সালে বাংলাদেশে প্রায় দেড় শতাধিক সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হামলা-মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আর গত দেড় দশকে দেশে ২৩ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন; আহত হয়েছেন ৫৬১ জন।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২১) পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশে একজন সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান এবং ১৫৪ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হামলা-মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। নির্যাতিত সাংবাদিকদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটজন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মীদের দ্বারা ১৪ জন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১৩ জন এবং হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালে ১৩ জন সাংবাদিক আহত হন। এছাড়া ১০৬ জন সাংবাদিক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রণীত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নির্যাতনের জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আইনটি প্রণীত হওয়ার পর থেকে এটি প্রমাণিত যে, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হামলার চেয়ে মামলার শক্তি বেশি। আর্টিকেল নাইনটিন ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া ২২৫টি মামলার ঘটনা রেকর্ড করেছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ৪১৭ জন ব্যক্তি এসব মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬৮ জন সাংবাদিক। এই সময় ১৫ জন সাংবাদিক এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ আইনে ২০২০ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার হওয়া লেখক মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাশিমপুর কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যু আইনটির ভয়াবহতার কথা আরও একবার মনে করিয়ে দেয়। ‘৩০০ টাকা বরাদ্দে রোগী পায় ৭০ টাকার খাবার’- এমন খবর প্রকাশ করায় জুলাই মাসে ঠাকুরগাঁওয়ের তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা হয়। এমনকি এই মামলায় অসুস্থ সাংবাদিককে হাতে হাতকড়া লাগাতে পিছপা হয়নি আইনশৃখলা বাহিনীর সদস্যরা।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সবচেয়ে বড় হুমকির মুখে পড়ে, যখন সাংবাদিকেরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হন। সাধারণত সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে থাকেন কিংবা প্রভাবশালীদের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক থাকে। ফলে সাংবাদিকদের হত্যা কিংবা নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু বিচার হয় না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে থেকেই যায়; সাংবাদিক নির্যাতন করলে শাস্তি পেতে হবে না, এমন মানসিকতা সাংবাদিক নির্যাতনকারীদের মনে আরও সাহস জোগায়।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের তথ্যানুযায়ী ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এত সাংবাদিক নিহত হলেন, অথচ বিচার শেষ হয়েছে মাত্র আটটির। এই আটটির বিচারিক রায়ের পাঁচটিই ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলেও জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস। আর কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)’র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল থেকে এপর্যন্ত পেশার কারণে খুন হয়েছেন ২৩ জন সাংবাদিকে। আর উইকিপিডিয়ার হিসাবে ১৯৯৬ সাল থেকে এপর্যন্ত খুন হওয়া সাংবাদিকের সংখ্যা ৩৫। প্রকৃত অর্থে ওই সব হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি। বিচার না পাওয়া ব্যক্তিদের দলে রয়েছেন- মানিক সাহা হত্যার ছয় মাস না যেতেই দুর্বৃত্তদের নৃশংস বোমার আঘাতে হত্যার শিকার দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালুর স্বজনেরা, নিহত সাংবাদিক সাগর-রুনির সন্তান মেঘসহ আরও অনেক পরিবার। রক্ত হিম করা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র জমা দেয়ার তারিখ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮৫ বার পিছিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থার এই ভূমিকাকে ঠিক কোন বিশেষণে ডাকা যায় তা জানা নেই!

আর সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা মামলার ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর খুলনা বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ এমএ রব হাওলাদার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১১ আসামির মধ্যে ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ১০ হজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের দণ্ড দেয়া হয়। হত্যা মামলায় এসব আসামিদের সাজা হলেও বিস্ফোরক মামলায় কোনো আসামিকে সাজা দেয়া যায়নি। যে রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছিল তার পরিবারসহ সুহৃদ সাংবাদিক সমাজ। মানিক সাহার রায়ের পর সারাদেশের সাংবাদিকরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেছেন। পুনঃতদন্তরে দাবি জানিয়েছেন। সে দাবি ওই পর্যন্তই। বাস্তবে কেউ আর সেটা আমলে নেয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলবে।

[লেখক : সাংবাদিক]

back to top