alt

উপ-সম্পাদকীয়

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ : জাতিসংঘ সংস্কারের এখনই সময়

এন্থনি পাহনক

: শনিবার, ০৭ মে ২০২২

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাসীর সামনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশেষ করে জাতিসংঘের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও ভেটো পদ্ধতির কারণে কোন প্রস্তাবই আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি আইসিসিতে (আন্তর্জাতিক অপরাধ কোর্ট) পুতিনের বিরুদ্ধে মামলা এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছে নানা অস্পষ্টতা ও জটিলতা।

ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া ইউক্রেন সংকটে জাতিসংঘের ব্যর্থতা নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের বিষয়টি আবারও আলোচনা হচ্ছে, যাতে করে ভবিষ্যতে বিশ্ববাসীর এমন আরেকটি ঘটনার সাক্ষী না হতে হয়। ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নানা সংকটময় মুহূর্তে পৃথিবীর শান্তিকামী দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জাতিসংঘ সংস্কারের জন্য প্রেরণা হতে পারে। কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা এবং তার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা বিশ্লেষণের পূর্বে আমরা প্রথমেই আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে জেনে নেব।

প্রথমেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ভূমিকা নিয়ে কথা বলা যাক। আইসিসি একটি জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা যা মূলত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। আইসিসি যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ছয়জন বিচারক প্যানেলের মাধ্যমে রায় প্রদান করলেও রায় কার্যকর করার এখতিয়ার আইসিসির নেই।

আইসিসি বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করছে। কিন্তু শুরুতেই যে প্রশ্নটি বড় আকারে দেখা দিচ্ছে, তা হলো রাশিয়া ইউক্রেন কোন দেশই ১৯৯৮ সালে স্বাক্ষরিত রোম সনদে সাক্ষর করেনি।

পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইসিসি ইউক্রেনে মানবতাবিরোধী কোন অপরাধের অস্তিত্ব পেলেও পুতিন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাকে আইনের মুখোমুখি করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

রোম সনদ ছাড়াও জেনেভা ও হেগ কনভেনশনে যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে আচরণের রূপরেখা স্পষ্টতই বলা আছে। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ৩৯ ধারায় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের কথা বলা আছে যে, কোন রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে হামলা চালালে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু এটি কার্যকর হবে না কারণ রাশিয়াও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের একটি সদস্য এবং যে কোন প্রস্তাবে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা তার আছে।

নিরাপত্তা পরিষদের সর্বসম্মত সমর্থনে জাতিসংঘ ২০০২ সালে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ৯০-এর দশকে সাবেক যুগোসøাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য সার্বিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সেøাবোদান মিলোশেভিচকে বিচারের মুখোমুখি করা। এবং এটি সম্ভব হয়েছিল কারণ মিলোশেভিচকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য সেই প্রস্তাবে একমত ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ইউরোপ দখল হয়ে গেলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র আটলান্টিক সনদ গঠন করে, যা পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ গঠনের পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। আটলান্টিক সনদে বলা হয়, অন্যায়ভাবে এক দেশ অন্য দেশের ভূমি দখল করার পরিবর্তে দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন মস্কো, তেহরান, ডাম্বারটন ওকস এবং ইয়েলটা সম্মেলনে যোগ দিয়ে জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামোটি গঠন করে। এসব চুক্তিগুলো যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও ফ্রান্সকে ভেটো ক্ষমতা প্রদান করে যার মাধ্যমে এই দেশগুলো সর্বসম্মতিতে কোন প্রস্তাব পাশ, অর্থনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা যে কোন দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করতে পারবে।

জাতিসংঘ ১৯৪৫-৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতার জন্য নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের গণহত্যা বন্ধের লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র পাস হয় (UDHR)। এলেনর রুজভেল্টের নেতৃত্বে লেবাননের কূটনৈতিক চার্লস মালিক, চীনা রাজনীতিবিদ পেং চুং চ্যাং এবং অন্যান্য ছয়টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে এই ঘোষণাপত্রটি ১৯৪৮ সালে চূড়ান্তভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।

যদিও UDHR সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রটি একটি পৃথক কোন আইন নয়, তবুও এর ওপর ভিত্তি করে মানবাধিকারের ওপর দুটি কনভেনশন গঠন করা হয়েছে। একটি হলো আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার (ICCPR) এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক কনভেনশন (ICESCR)। এই কনভেনশনগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো একই চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রকাশ করে।

এ ধরনের বৈশ্বিক উদ্যোগ সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো পাওয়ারের কারণে প্রায়শই স্থায়ী পাঁচটি দেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যখন টেলিভিশনে ইউক্রেনে গণকবরের ছবি প্রদর্শিত হয়, রাশিয়ার সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় বেসামরিক স্থাপনা তদুপরি শুধুমাত্র ভেটো পাওয়ারের কারণে রাশিয়া পার পেয়ে যায়, তখন খুব গুরুত্ব সহকারেই জাতিসংঘের সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে ভাবার দরকার বৈকি।

যদি কার্যকারি পরিবর্তন আনা যায় তাহলে যেকোন ঘটনায় জাতিসংঘ আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে, যা যে কোন রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রে হামলা চালাতে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে।

অন্য অনেক বিশেষজ্ঞদের মতো আমার কাছেও ভেটো পাওয়ার বাতিল করা কোন সমাধান মনে হয় না। বরং সংস্কার করা গেলে জাতিসংঘ আরও বেশি সক্রিয় হবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রস্তাবটি হলো, জাতিসংঘে যে কোন প্রস্তাবের জন্য সাধারণ পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ ভোট এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচটি ভোটের চারটি যদি একদিকে থাকে তাহলে যেন সেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। অবশ্য এই সংস্কারটিও কঠিন হবে, কারণ এটি বাস্তবায়ন করতে হলে সাধারণ পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ এবং নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যকে এটি অনুমোদন করতে হবে। অন্যথায় তা শুধু প্রস্তাব আকারেই থাকবে।

অতএব, পরিবর্তনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে আলোচনা হতে পারে ন্যাটোর সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক, পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর বিস্তার, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধবিরতি ইত্যাদি।

ইউক্রেনে প্রতিদিন যে নৃশংসতা ঘটছে, তা অবশ্যই ধ্বংসাত্মক এবং বেদনাদায়ক। ইউক্রেনসহ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যুদ্ধ এড়াতে হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা উচিত। আর তা হলো নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার। এটি অবশ্যই কঠিন কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর দেশগুলো জাতিসংঘ নামক বটবৃক্ষের ছায়াতলে এসে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, যুদ্ধ বিরতির মতো কাজগুলো করতে পেরেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অকল্পনীয় ছিল। তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাবার, জাতিসংঘকে নতুন করে সক্রিয় করার।

(আল-জাজিরা থেকে অনূদিত)

ভাষান্তর : এনামুল হাসান আরিফ, শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটি]

নতুন ভাইরাস মাঙ্কিপক্স

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে কীভাবে

ছবি

বন্যায় হাওরের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে করণীয়

সমাজের নির্লিপ্ততা এবং ন্যায়ের দাবি

পদ্মা সেতুর টোল

আলু উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহার

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল : ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম

সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় বিবেচ্য বিষয়

ই-কমার্সের জবাবদিহিতা

ইভিএমে আস্থার সংকট

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : কাড়ছে প্রাণ, বাড়ছে পঙ্গুত্ব

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে বিতর্ক

ছবি

পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেন নেই?

দুর্নীতি ও দোষারোপের রাজনীতি

মমতা এবং আরএসএসের সম্পর্ক প্রসঙ্গে

ভূমি অপরাধ আইন এবং আদিবাসী

ঝুঁকিতে অর্থনীতি : করণীয় কী

চুকনগর : বিশ্বের স্বাধীনতা ইতিহাসে অন্যতম গণহত্যা

পিকের মেধা-প্রতিভা

পেশার অর্জন

প্রসঙ্গ : ধর্মীয় অনুভূতি

নির্বাচনই কি একমাত্র লক্ষ্য?

ছবি

হরপ্রাসাদের ‘তৈল’ এবং উন্নয়নের পথরেখা

নদী রক্ষায় চাই কার্যকর ব্যবস্থা

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশমাধ্যম

সংবাদ ও বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনে গ্লোবাল সাউথের সর্বনাশ

সাইবার অপরাধ ও প্রাসঙ্গিক কথা

ছবি

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : সরকারের দায় ও দায়িত্ব

প্রস্তাবিত ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন

ছবি

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা

‘চাচা চৌকিদার বিধায় থানা ভাতিজার’

পশ্চিমবঙ্গবাসীর একমাত্র ভবিতব্য

তেলজাতীয় ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গুরুত্ব

প্রশাসন ক্যাডার কেন প্রথম পছন্দ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ : জাতিসংঘ সংস্কারের এখনই সময়

এন্থনি পাহনক

শনিবার, ০৭ মে ২০২২

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাসীর সামনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিশেষ করে জাতিসংঘের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও ভেটো পদ্ধতির কারণে কোন প্রস্তাবই আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি আইসিসিতে (আন্তর্জাতিক অপরাধ কোর্ট) পুতিনের বিরুদ্ধে মামলা এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছে নানা অস্পষ্টতা ও জটিলতা।

ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়া ইউক্রেন সংকটে জাতিসংঘের ব্যর্থতা নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের বিষয়টি আবারও আলোচনা হচ্ছে, যাতে করে ভবিষ্যতে বিশ্ববাসীর এমন আরেকটি ঘটনার সাক্ষী না হতে হয়। ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নানা সংকটময় মুহূর্তে পৃথিবীর শান্তিকামী দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জাতিসংঘ সংস্কারের জন্য প্রেরণা হতে পারে। কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা এবং তার থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা বিশ্লেষণের পূর্বে আমরা প্রথমেই আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে জেনে নেব।

প্রথমেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ভূমিকা নিয়ে কথা বলা যাক। আইসিসি একটি জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা যা মূলত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। আইসিসি যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ছয়জন বিচারক প্যানেলের মাধ্যমে রায় প্রদান করলেও রায় কার্যকর করার এখতিয়ার আইসিসির নেই।

আইসিসি বর্তমানে ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করছে। কিন্তু শুরুতেই যে প্রশ্নটি বড় আকারে দেখা দিচ্ছে, তা হলো রাশিয়া ইউক্রেন কোন দেশই ১৯৯৮ সালে স্বাক্ষরিত রোম সনদে সাক্ষর করেনি।

পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইসিসি ইউক্রেনে মানবতাবিরোধী কোন অপরাধের অস্তিত্ব পেলেও পুতিন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাকে আইনের মুখোমুখি করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

রোম সনদ ছাড়াও জেনেভা ও হেগ কনভেনশনে যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধবন্দি ও বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে আচরণের রূপরেখা স্পষ্টতই বলা আছে। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদের ৩৯ ধারায় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের কথা বলা আছে যে, কোন রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে হামলা চালালে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু এটি কার্যকর হবে না কারণ রাশিয়াও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের একটি সদস্য এবং যে কোন প্রস্তাবে ভেটো দেয়ার ক্ষমতা তার আছে।

নিরাপত্তা পরিষদের সর্বসম্মত সমর্থনে জাতিসংঘ ২০০২ সালে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ৯০-এর দশকে সাবেক যুগোসøাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য সার্বিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সেøাবোদান মিলোশেভিচকে বিচারের মুখোমুখি করা। এবং এটি সম্ভব হয়েছিল কারণ মিলোশেভিচকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছিল এবং নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য সেই প্রস্তাবে একমত ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ইউরোপ দখল হয়ে গেলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র আটলান্টিক সনদ গঠন করে, যা পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ গঠনের পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। আটলান্টিক সনদে বলা হয়, অন্যায়ভাবে এক দেশ অন্য দেশের ভূমি দখল করার পরিবর্তে দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন মস্কো, তেহরান, ডাম্বারটন ওকস এবং ইয়েলটা সম্মেলনে যোগ দিয়ে জাতিসংঘের বর্তমান কাঠামোটি গঠন করে। এসব চুক্তিগুলো যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও ফ্রান্সকে ভেটো ক্ষমতা প্রদান করে যার মাধ্যমে এই দেশগুলো সর্বসম্মতিতে কোন প্রস্তাব পাশ, অর্থনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা যে কোন দেশের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করতে পারবে।

জাতিসংঘ ১৯৪৫-৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর নৃশংসতার জন্য নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের গণহত্যা বন্ধের লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালে মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র পাস হয় (UDHR)। এলেনর রুজভেল্টের নেতৃত্বে লেবাননের কূটনৈতিক চার্লস মালিক, চীনা রাজনীতিবিদ পেং চুং চ্যাং এবং অন্যান্য ছয়টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে এই ঘোষণাপত্রটি ১৯৪৮ সালে চূড়ান্তভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।

যদিও UDHR সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রটি একটি পৃথক কোন আইন নয়, তবুও এর ওপর ভিত্তি করে মানবাধিকারের ওপর দুটি কনভেনশন গঠন করা হয়েছে। একটি হলো আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার (ICCPR) এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক কনভেনশন (ICESCR)। এই কনভেনশনগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো একই চুক্তিতে আবদ্ধ হয় এবং মানবাধিকারবিষয়ক কমিটিগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রকাশ করে।

এ ধরনের বৈশ্বিক উদ্যোগ সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো পাওয়ারের কারণে প্রায়শই স্থায়ী পাঁচটি দেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যখন টেলিভিশনে ইউক্রেনে গণকবরের ছবি প্রদর্শিত হয়, রাশিয়ার সামরিক হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় বেসামরিক স্থাপনা তদুপরি শুধুমাত্র ভেটো পাওয়ারের কারণে রাশিয়া পার পেয়ে যায়, তখন খুব গুরুত্ব সহকারেই জাতিসংঘের সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে ভাবার দরকার বৈকি।

যদি কার্যকারি পরিবর্তন আনা যায় তাহলে যেকোন ঘটনায় জাতিসংঘ আরও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে, যা যে কোন রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রে হামলা চালাতে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে।

অন্য অনেক বিশেষজ্ঞদের মতো আমার কাছেও ভেটো পাওয়ার বাতিল করা কোন সমাধান মনে হয় না। বরং সংস্কার করা গেলে জাতিসংঘ আরও বেশি সক্রিয় হবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রস্তাবটি হলো, জাতিসংঘে যে কোন প্রস্তাবের জন্য সাধারণ পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ ভোট এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচটি ভোটের চারটি যদি একদিকে থাকে তাহলে যেন সেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। অবশ্য এই সংস্কারটিও কঠিন হবে, কারণ এটি বাস্তবায়ন করতে হলে সাধারণ পরিষদের দুই তৃতীয়াংশ এবং নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যকে এটি অনুমোদন করতে হবে। অন্যথায় তা শুধু প্রস্তাব আকারেই থাকবে।

অতএব, পরিবর্তনের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। প্রাথমিকভাবে আলোচনা হতে পারে ন্যাটোর সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক, পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর বিস্তার, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধবিরতি ইত্যাদি।

ইউক্রেনে প্রতিদিন যে নৃশংসতা ঘটছে, তা অবশ্যই ধ্বংসাত্মক এবং বেদনাদায়ক। ইউক্রেনসহ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যুদ্ধ এড়াতে হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করা উচিত। আর তা হলো নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার। এটি অবশ্যই কঠিন কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর দেশগুলো জাতিসংঘ নামক বটবৃক্ষের ছায়াতলে এসে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, যুদ্ধ বিরতির মতো কাজগুলো করতে পেরেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে অকল্পনীয় ছিল। তাই সময় এসেছে নতুন করে ভাবার, জাতিসংঘকে নতুন করে সক্রিয় করার।

(আল-জাজিরা থেকে অনূদিত)

ভাষান্তর : এনামুল হাসান আরিফ, শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সানফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটি]

back to top