alt

উপ-সম্পাদকীয়

তেলজাতীয় ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গুরুত্ব

জগৎ চাঁদ মালাকার

: শুক্রবার, ১৩ মে ২০২২

মানুষ বাড়ছে জমি কমছে সেজন্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ আমাদের রয়েছে, ফলে অল্প জমিতে অধিক ফসল ফলানোর তাগিদও বাড়ছে। লক্ষ্য হচ্ছে এক জমি থেকে বছরে তিন ফসল ফলানো। আর এজন্য এমন সব ফসলের জাত প্রয়োজন যেন জমি প্রস্তুতের সময় ব্যতীত বাকি সময়ে তিনটি ফসল কেটে নিয়ে আসা যায়। অনেক শস্য বিন্যাসে, যেমন শর্ষে-বোরো-রোপা আমন-এ তিনটি ফসলের জাত এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন ৩২০-৩৪৫ দিনের মধ্যে তিনটি ফসলই সংগ্রহ করা যায়।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে মানবদেহে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির ৩০ শতাংশ তেল বা চর্বি জাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত, কিন্তু আমাদের আসে মাত্র ৯ শতাংশ, যা নিতান্তই অপ্রতুল। আমাদের ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং তা সম্ভব তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। ভোজ্যতেলের জন্য বছরে আমাদের প্রায় ২৪-২৭ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় এর সিংহভাগ খরচ হয় পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানি করতে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হলো আমদের দেশের কৃষি-পরিবেশ উপযোগী তেল উৎপাদনকারি তেলবীজ ফসল যেমন-শর্ষে, তিল, তিসি, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম ইত্যাদি এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

ধান যেহেতু কৃষকদের প্রধান ফসল, তাই কৃষক সাধারণত চায় না যে, ধানের ফলন কমে যাক বরং মাঝখানে একটি বাড়তি ফসল পেতে চান কৃষক। ফলে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি কিন্তু অধিক ফলনশীল জাত পছন্দ করেন। ধানের স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ করা, বিনা ধান-৭, ১৬ ব্রি ধান-৩৩, ৩৯, ৪৯, ৫৬.৫৭, ৭১, ৭৫ ব্রি হাইব্রিড ধান ৪ বাউ ধান-১ ও বোরো ধানের জাত যথাযথভাবে চাষাবাদ করতে পারলে ফলন খুব একটা না কমিয়ে ২৩০-২৫০ দিনের মধ্যে দুটি ধান ফসল সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব। কৃষকের কাছে সে রকম জাতের তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং শস্যবিন্যাসে এদের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা বড় প্রয়োজন। আর সেটা পারলে দুই ধানের মাঝখানে ৮০-৯০ দিনের উচ্চফলনশীল শর্ষের জাত বারি শর্ষে ১৪,১৫,১৭, বিনা শর্ষে ৯.বাউ শর্ষে ১,২,৩ আবাদ করা সম্ভব। যে সব জমিতে আউশ বা পাট আবাদ করা হয় সে সকল জমিতে শর্ষে চাষের জন্য বারি শর্ষে-১৮ (ক্যানোলা টাইপ) নির্বাচন করা যেতে পারে। কারণ উক্ত জাতের জীবনকাল ও ফলন বেশি।

বাংলাদেশে মাথাপিছু তেল গ্রহণের চাহিদা ৩০ গ্রাম, আমরা গ্রহণ করি ২০-২২ গ্রাম। ¯েœহ পদার্থ-আমিষের মতো প্রাণী এবং উদ্ভিদ দুই উৎস থেকেই স্নেহ পদার্থ পাওয়া যায়। যেমন ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস, চর্বিযুক্ত মাছ ইত্যাদি প্রাণী থেকে এবং শর্ষের তেল, তিলের তেল, বাদামের তেল, সয়াবিনের তেল ইত্যাদি উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়।

কৃষি ভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী গ্রামে বসবাস করে, যারা কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নানামুখী উৎপাদনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এ খাতের সফলতা প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক উপাদনসমূহ যেমন-কর্মসংস্থান সৃজন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রচলিত শস্য বিন্যাসে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রমাণিত স্বল্পমেয়াদি তেল ফসলের আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে বর্তমান তেল ফসলের (শর্ষে, তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, সয়াবিন) আবাদি এলাকা ৭.২৪ লক্ষ হেক্টর থেকে ১৫-২০% বৃদ্ধি করা।

বিএআরআই ও বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত তেল ফসলের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মৌ-চাষ অন্তর্ভুক্ত করে তেলজাতীয় ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫- ২০% বৃদ্ধি করা। মৌ চাষ সম্প্রসারণের ফলে তেল ফসলের পরাগায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে ফলন বৃদ্দি পাবে। তা ছাড়া উৎপাদিত মধু থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরী হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু ভোজ্যতেল ব্যবহার বাড়বে এবং পুষ্টি ঘাটতি পূরণ হবে।

বর্তমানে দেশ দানাজাতীয় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও তেল, চর্বি ও প্রোটিনের পুষ্টি সমৃদ্ধ শস্য বিশেষভাবে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে অনেকটাই পিছিয়ে আছে

বর্তমানে দেশ দানাজাতীয় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও তেল, চর্বি ও প্রোটিনের পুষ্টি সমৃদ্ধ শস্য বিশেষভাবে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে অনেকটাই পিছিয়ে আছে, যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs) ২০৩০-এর পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি অর্জনের একটি প্রধান অন্তরায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, গুণগত মানসম্পন্ন পরিমিত ভোজ্যতেল খাওয়া ব্যতিরেকে পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়, কারণ ভোজ্যতেলে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড যা মানবদেহে তৈরি হয় না। এ ঘাটতি পূরণে ভোজ্যতেল সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সেজন্য দেহকে সুস্থ, সুগঠিত ও রোগ প্রতিরোধে কার্যকর রাখতে নিয়মিত সঠিক পরিমাণ ভালোমানের ভোজ্যতেল গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে মানবদেহে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরীর ৩০ শতাংশ তেল বা চর্বি জাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত, কিন্তু আমাদের আসে মাত্র ৯ শতাংশ যা নিতান্তই অপ্রতুল। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

আমদানি নির্ভরতার ফলে একদিকে যেমন বিদেশে প্রচুর অর্থ চলে যাচ্ছে, তেমনি আমদানি ও বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা পণ্যটির বাজারকে প্রায়ই অস্থিতিশীল করছে। এখন সময় এসেছে দেশে তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে নিজেদের উৎপাদিত ভেজালমুক্ত তেল ব্যবহার করার। তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির দুটো কৌশল রয়েছে- একটি হলো বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে হেক্টর প্রতি ফলন বৃদ্ধি (Vertical Expansion) অন্যটি হলো প্রচলিত শস্যবিন্যাসে তেলফসলকে অন্তর্ভুক্ত করে তেল ফসলের আবাদি এলাকা বৃদ্ধি (Horizontal Expansion) । এ মুহূর্তে দেশে প্রায় ২০ লক্ষ হে. বোরো-পতিত-রোপা আমন শস্যবিন্যাস প্রচলিত আছে যাকে শর্ষে-বোরো-রোপা আমন শস্যবিন্যাসে রূপান্তরিত করতে পারলে শর্ষের উৎপাদন বৃদ্ধি অনেকাংশে সম্ভব। এ শস্য বিন্যাসটি প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি রোপা আমন (জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন) এবং স্বল্প জীবনকালের শর্ষের জাত (জীবনকাল ৭৫-৮০ দিন) বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ইতোমধ্যে স্বল্পমেয়াদি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, যা এখন সহজলভ্য। তাছাড়া অন্যান্য তেল ফসল যেমন-তিল, চিনাবাদাম, সয়াবিন এবং সূর্যমুখীর বেশ কিছু উন্নত জাত রয়েছে যেগুলো উচ্চফলনশীল হওয়ায় চাষের আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

উল্লেখ্য যে, দেশে তেলজাতীয় ফসল সূর্যমুখী আবাদের একটি অপার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ফসলটি চাষাবাদে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় ঘানিতে নিষ্কাশন করে লোকজন ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার ও করছেন। উচ্চফলনশীল খাট জাতের প্রচলন এবং উপযুক্ত বাজার মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে এ তেল ফসলটির আবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে তেল ফসলের আবাদি জমি ৭.২৪ লক্ষ হেক্টর থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মৌচাষকে অন্তর্ভুক্ত করে হেক্টরপ্রতি ফলন ১.৩৪ মে. টন থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারলে দেশে অতিরিক্ত ১.২৫ লক্ষ মে. টন তেল উৎপাদন করা সম্ভব যার বাজার মূল্য প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মৌ-চাষ পরাগায়ণের মাধ্যমে শুধু তেল ফসলের উৎপাদনই বাড়ায় না পাশাপাশি মধুও উৎপাদিত হয়, যা থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং আলাদা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

[লেখক: প্রকল্প পরিচালক, কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজে স্থাপিত উদ্ভিদ সংগনিরোধ ল্যাবরেটরিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর প্রকল্প]

পশ্চিমবঙ্গের দলবদলের রাজনীতি প্রসঙ্গে

ছবি

শিরিন : নিপীড়িত ফিলিস্তিনের স্বর

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যর্থ বিশ্ব

সয়াবিন তেলের ইতিবৃত্ত

শ্রীলঙ্কার মতোই কি পরিণতি হতে চলেছে বাংলাদেশের

সুশীল সমাজের বিকাশ কেন জরুরি

নতুন ভাইরাস মাঙ্কিপক্স

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে কীভাবে

ছবি

বন্যায় হাওরের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে করণীয়

সমাজের নির্লিপ্ততা এবং ন্যায়ের দাবি

পদ্মা সেতুর টোল

আলু উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহার

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল : ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম

সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলায় বিবেচ্য বিষয়

ই-কমার্সের জবাবদিহিতা

ইভিএমে আস্থার সংকট

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা : কাড়ছে প্রাণ, বাড়ছে পঙ্গুত্ব

চাকরিতে প্রবেশের বয়স নিয়ে বিতর্ক

ছবি

পূর্ণাঙ্গ আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেন নেই?

দুর্নীতি ও দোষারোপের রাজনীতি

মমতা এবং আরএসএসের সম্পর্ক প্রসঙ্গে

ভূমি অপরাধ আইন এবং আদিবাসী

ঝুঁকিতে অর্থনীতি : করণীয় কী

চুকনগর : বিশ্বের স্বাধীনতা ইতিহাসে অন্যতম গণহত্যা

পিকের মেধা-প্রতিভা

পেশার অর্জন

প্রসঙ্গ : ধর্মীয় অনুভূতি

নির্বাচনই কি একমাত্র লক্ষ্য?

ছবি

হরপ্রাসাদের ‘তৈল’ এবং উন্নয়নের পথরেখা

নদী রক্ষায় চাই কার্যকর ব্যবস্থা

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশমাধ্যম

সংবাদ ও বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তনে গ্লোবাল সাউথের সর্বনাশ

সাইবার অপরাধ ও প্রাসঙ্গিক কথা

ছবি

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : সরকারের দায় ও দায়িত্ব

tab

উপ-সম্পাদকীয়

তেলজাতীয় ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গুরুত্ব

জগৎ চাঁদ মালাকার

শুক্রবার, ১৩ মে ২০২২

মানুষ বাড়ছে জমি কমছে সেজন্য ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ আমাদের রয়েছে, ফলে অল্প জমিতে অধিক ফসল ফলানোর তাগিদও বাড়ছে। লক্ষ্য হচ্ছে এক জমি থেকে বছরে তিন ফসল ফলানো। আর এজন্য এমন সব ফসলের জাত প্রয়োজন যেন জমি প্রস্তুতের সময় ব্যতীত বাকি সময়ে তিনটি ফসল কেটে নিয়ে আসা যায়। অনেক শস্য বিন্যাসে, যেমন শর্ষে-বোরো-রোপা আমন-এ তিনটি ফসলের জাত এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন ৩২০-৩৪৫ দিনের মধ্যে তিনটি ফসলই সংগ্রহ করা যায়।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে মানবদেহে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির ৩০ শতাংশ তেল বা চর্বি জাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত, কিন্তু আমাদের আসে মাত্র ৯ শতাংশ, যা নিতান্তই অপ্রতুল। আমাদের ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে হবে এবং তা সম্ভব তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। ভোজ্যতেলের জন্য বছরে আমাদের প্রায় ২৪-২৭ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় এর সিংহভাগ খরচ হয় পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল আমদানি করতে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হলো আমদের দেশের কৃষি-পরিবেশ উপযোগী তেল উৎপাদনকারি তেলবীজ ফসল যেমন-শর্ষে, তিল, তিসি, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম ইত্যাদি এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

ধান যেহেতু কৃষকদের প্রধান ফসল, তাই কৃষক সাধারণত চায় না যে, ধানের ফলন কমে যাক বরং মাঝখানে একটি বাড়তি ফসল পেতে চান কৃষক। ফলে কৃষকরা স্বল্পমেয়াদি কিন্তু অধিক ফলনশীল জাত পছন্দ করেন। ধানের স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ করা, বিনা ধান-৭, ১৬ ব্রি ধান-৩৩, ৩৯, ৪৯, ৫৬.৫৭, ৭১, ৭৫ ব্রি হাইব্রিড ধান ৪ বাউ ধান-১ ও বোরো ধানের জাত যথাযথভাবে চাষাবাদ করতে পারলে ফলন খুব একটা না কমিয়ে ২৩০-২৫০ দিনের মধ্যে দুটি ধান ফসল সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব। কৃষকের কাছে সে রকম জাতের তথ্য পৌঁছে দেয়া এবং শস্যবিন্যাসে এদের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা বড় প্রয়োজন। আর সেটা পারলে দুই ধানের মাঝখানে ৮০-৯০ দিনের উচ্চফলনশীল শর্ষের জাত বারি শর্ষে ১৪,১৫,১৭, বিনা শর্ষে ৯.বাউ শর্ষে ১,২,৩ আবাদ করা সম্ভব। যে সব জমিতে আউশ বা পাট আবাদ করা হয় সে সকল জমিতে শর্ষে চাষের জন্য বারি শর্ষে-১৮ (ক্যানোলা টাইপ) নির্বাচন করা যেতে পারে। কারণ উক্ত জাতের জীবনকাল ও ফলন বেশি।

বাংলাদেশে মাথাপিছু তেল গ্রহণের চাহিদা ৩০ গ্রাম, আমরা গ্রহণ করি ২০-২২ গ্রাম। ¯েœহ পদার্থ-আমিষের মতো প্রাণী এবং উদ্ভিদ দুই উৎস থেকেই স্নেহ পদার্থ পাওয়া যায়। যেমন ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস, চর্বিযুক্ত মাছ ইত্যাদি প্রাণী থেকে এবং শর্ষের তেল, তিলের তেল, বাদামের তেল, সয়াবিনের তেল ইত্যাদি উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়।

কৃষি ভিত্তিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী গ্রামে বসবাস করে, যারা কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নানামুখী উৎপাদনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এ খাতের সফলতা প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক উপাদনসমূহ যেমন-কর্মসংস্থান সৃজন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রচলিত শস্য বিন্যাসে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রমাণিত স্বল্পমেয়াদি তেল ফসলের আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে বর্তমান তেল ফসলের (শর্ষে, তিল, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, সয়াবিন) আবাদি এলাকা ৭.২৪ লক্ষ হেক্টর থেকে ১৫-২০% বৃদ্ধি করা।

বিএআরআই ও বিনা কর্তৃক উদ্ভাবিত তেল ফসলের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মৌ-চাষ অন্তর্ভুক্ত করে তেলজাতীয় ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলন ১৫- ২০% বৃদ্ধি করা। মৌ চাষ সম্প্রসারণের ফলে তেল ফসলের পরাগায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে ফলন বৃদ্দি পাবে। তা ছাড়া উৎপাদিত মধু থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরী হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে মাথাপিছু ভোজ্যতেল ব্যবহার বাড়বে এবং পুষ্টি ঘাটতি পূরণ হবে।

বর্তমানে দেশ দানাজাতীয় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও তেল, চর্বি ও প্রোটিনের পুষ্টি সমৃদ্ধ শস্য বিশেষভাবে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে অনেকটাই পিছিয়ে আছে

বর্তমানে দেশ দানাজাতীয় খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও তেল, চর্বি ও প্রোটিনের পুষ্টি সমৃদ্ধ শস্য বিশেষভাবে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে অনেকটাই পিছিয়ে আছে, যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDGs) ২০৩০-এর পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি অর্জনের একটি প্রধান অন্তরায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, গুণগত মানসম্পন্ন পরিমিত ভোজ্যতেল খাওয়া ব্যতিরেকে পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব নয়, কারণ ভোজ্যতেলে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড যা মানবদেহে তৈরি হয় না। এ ঘাটতি পূরণে ভোজ্যতেল সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সেজন্য দেহকে সুস্থ, সুগঠিত ও রোগ প্রতিরোধে কার্যকর রাখতে নিয়মিত সঠিক পরিমাণ ভালোমানের ভোজ্যতেল গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে মানবদেহে দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরীর ৩০ শতাংশ তেল বা চর্বি জাতীয় খাদ্য থেকে আসা উচিত, কিন্তু আমাদের আসে মাত্র ৯ শতাংশ যা নিতান্তই অপ্রতুল। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

আমদানি নির্ভরতার ফলে একদিকে যেমন বিদেশে প্রচুর অর্থ চলে যাচ্ছে, তেমনি আমদানি ও বিপণনে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা পণ্যটির বাজারকে প্রায়ই অস্থিতিশীল করছে। এখন সময় এসেছে দেশে তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে নিজেদের উৎপাদিত ভেজালমুক্ত তেল ব্যবহার করার। তেল ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির দুটো কৌশল রয়েছে- একটি হলো বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে হেক্টর প্রতি ফলন বৃদ্ধি (Vertical Expansion) অন্যটি হলো প্রচলিত শস্যবিন্যাসে তেলফসলকে অন্তর্ভুক্ত করে তেল ফসলের আবাদি এলাকা বৃদ্ধি (Horizontal Expansion) । এ মুহূর্তে দেশে প্রায় ২০ লক্ষ হে. বোরো-পতিত-রোপা আমন শস্যবিন্যাস প্রচলিত আছে যাকে শর্ষে-বোরো-রোপা আমন শস্যবিন্যাসে রূপান্তরিত করতে পারলে শর্ষের উৎপাদন বৃদ্ধি অনেকাংশে সম্ভব। এ শস্য বিন্যাসটি প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি রোপা আমন (জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন) এবং স্বল্প জীবনকালের শর্ষের জাত (জীবনকাল ৭৫-৮০ দিন) বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ইতোমধ্যে স্বল্পমেয়াদি জাত অবমুক্ত করা হয়েছে, যা এখন সহজলভ্য। তাছাড়া অন্যান্য তেল ফসল যেমন-তিল, চিনাবাদাম, সয়াবিন এবং সূর্যমুখীর বেশ কিছু উন্নত জাত রয়েছে যেগুলো উচ্চফলনশীল হওয়ায় চাষের আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

উল্লেখ্য যে, দেশে তেলজাতীয় ফসল সূর্যমুখী আবাদের একটি অপার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ফসলটি চাষাবাদে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় ঘানিতে নিষ্কাশন করে লোকজন ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার ও করছেন। উচ্চফলনশীল খাট জাতের প্রচলন এবং উপযুক্ত বাজার মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে এ তেল ফসলটির আবাদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। বর্তমানে তেল ফসলের আবাদি জমি ৭.২৪ লক্ষ হেক্টর থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মৌচাষকে অন্তর্ভুক্ত করে হেক্টরপ্রতি ফলন ১.৩৪ মে. টন থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারলে দেশে অতিরিক্ত ১.২৫ লক্ষ মে. টন তেল উৎপাদন করা সম্ভব যার বাজার মূল্য প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মৌ-চাষ পরাগায়ণের মাধ্যমে শুধু তেল ফসলের উৎপাদনই বাড়ায় না পাশাপাশি মধুও উৎপাদিত হয়, যা থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং আলাদা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

[লেখক: প্রকল্প পরিচালক, কেন্দ্রীয় প্যাকিং হাউজে স্থাপিত উদ্ভিদ সংগনিরোধ ল্যাবরেটরিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর প্রকল্প]

back to top