alt

উপ-সম্পাদকীয়

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : সরকারের দায় ও দায়িত্ব

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

: রোববার, ১৫ মে ২০২২
image

সয়াবিন তেলের বাজার কেন স্থিতিশীল করা যাচ্ছে না?

করোনার ধাক্কায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থা টালমাটাল। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতিও ভিন্ন হওয়ার কিছু নয়। যেহেতু অধিকাংশ নিত্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আগুনে পুড়তেই হচ্ছে মানুষকে। সেই আগুনে ঘি ঢালল ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি।

এরপরেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যেমন, ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে, মজুতও যথেষ্ট পরিমাণে আছে ফলে কোনো ঘাটতি হওয়ার কথা নয়; তাহলে চাল কিনতে কেন সাধারণ মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে? এর উত্তর হতে পারে দুটি-হয় উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে সরকার সঠিক তথ্য দেয়নি, বাড়তি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে অথবা বাজারে সিন্ডিকেট করে এই অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে।

সয়াবিন তেলের বাজারের আধিপত্য হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির হাতে। ফলে এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিনতর কোনো ব্যাপার নয়। এরপরও সরকার সেটি পারল না কেন? তাই কীভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটি এখন অর্থনীতির এজেন্ডা। নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান দামের মধ্যে সরকারের ভর্তুকির বোঝা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে জরুরি সেবাসমূহ, যেমন- গ্যাস ও বিদ্যুতের ‘মূল্য সমন্বয়’ প্রয়োজন। তারা মনে করছেন, করোনার টিকা, বুস্টার ডোজের মতো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ সংগ্রহ, কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে ধান- চাল ক্রয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ইত্যাদি কাজের জন্য তহবিল নিশ্চিত করতে এই ‘মূল্য সমন্বয়’ সাহায্য করবে। কথায় যুক্তি আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কেন এগুলো করতে হবে? সেই সিরিয়া যুদ্ধের সময়ে জ্বালানি তেলের দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও জনগণের পকেট থেকে বেশি দাম নেওয়া হয়েছে। আমরা জানি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারে। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় চাপে পড়েছে গরিব মানুষ আর এ অবস্থায় তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। অথচ ফেব্রুয়ারিতেই মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবার কি অবস্থা হবে-বাজেট বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলবেন।

সংসারের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো গ্যাস, বিদ্যুৎ ও রান্নার তেল। এই তিনটির দাম সব অঙ্ককে হার মানাচ্ছে। এই অবস্থায় গরিব মধ্যবিত্ত বাঁচবে কীভাবে প্রশ্ন সেখানে। জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সদিচ্ছা থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণকে সুরাহা দেওয়া যায় বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

রাতারাতি ভোজ্যতেলের সংকট কাটানোর বিকল্প চিন্তা ও পরিকল্পনা করা সম্ভব না হলেও বিকল্পের সন্ধান শুরু করতে হবে এখনই। ভোজ্যতেল আমাদের একটি প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় দ্রব্য। তেল ছাড়া রান্না হবে না। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় যেকোনো পণ্যের জন্য পরনির্ভরতা বিপজ্জনক। আমদানির উৎসে সংকট হলে আমরাও সংকটে পড়ি। এই অভিজ্ঞতা আমাদের অতীতে কিছু পণ্য নিয়ে হয়েছে। সংকটে না পড়লে আমরা সমাধান নিয়েও ভাবি না। ধানের আবাদ বাড়িয়েছি, গরুর ঘাটতিও কমানো গেছে। ভোজ্যতেল নিয়ে হাহাকার কমানোর উপায়ও বের করতে হবে। এ জন্য এককভাবে সয়াবিনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আমাদের ভোজ্যতেলের বিকল্প ভালো উৎস হতে পারে শর্ষে তেল।

ব্যবসায়ীরা বারবার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ান। আন্তর্জাতিক বাজারে যে পণ্যটির দাম বেড়েছে, তা বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করতে কমপক্ষে ২-৩ মাস সময় লাগবে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তারা আবার বলেন বেশি দামে কেনা। তাই আগের দামে কেনা হলেও শুধু ঘোষণার কারণেই বাড়তি দামে বিক্রি করে এক দিনে ব্যবসায়ীরা লুটে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা।

একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধ মজুদ গড়ে তুলে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে-এ অভিযোগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল সয়াবিন তেলের অবৈধ মজুদের ঘটনায়। বিভিন্ন চক্রের তৎপরতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, ভোক্তারা এর সুফল পাবে কি না সন্দেহ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তথ্য বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, আমদানি ও সরবরাহে কোন ধরনের সংকট না থাকলেও সয়াবিন তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী শুধুমাত্র অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে কৃত্রিম সংকটের কারণে। ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছে।

করোনার কারণে গত দুই বছরে বহু মানুষের আয় কমেছে। সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ পরিবারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ সময় জীবনযাত্রার সব খাতে ব্যয়বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে মানুষ পরিস্থিতি সামাল দেবে কীভাবে? যেহেতু বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো আয় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু বাধ্য হয়ে ভোক্তাদের ভোগ কমাতে হচ্ছে। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে দেশের জনসম্পদ খাতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পুষ্টিকর খাবার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্য খাতে যে প্রভাব পড়বে, তাতে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এমনিতেই জীবনযাত্রার সব খাতে এর প্রভাব বিদ্যমান। এ সময় যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি চলমান থাকে, তাহলে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ পথে বসতে বাধ্য হবে। কাজেই কোন ব্যক্তি যাতে কারসাজি করে বা পণ্যের অবৈধ মজুত গড়ে তুলে নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সেদিকে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে।

মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় চাপে পড়েছে গরিব মানুষ আর এ অবস্থায় তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

কতিপয় অসাধু ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের কাছে গোটা জাতি জিম্মি কেন? তেলের বাজার ও বেসামাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায় ও দায়িত্ব জানতে চায় জনগণ। তবে ভোজ্যতেলের এ অনভিপ্রেত মূল্যবৃদ্ধিতে নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের অবস্থা ভালো নেই। তেলের আগুন আর চুলার আগুন একাকার হয়ে গেছে। তবে এ কথা নিদ্বিধায় বলা যায় যে, তৈল মর্দন সংস্কৃতির চর্চায় অভ্যস্ত সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর এতে বিশেষ কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না-কেননা তারা তেলে জলের গুণাগুণে বরাবরই ওয়াকিবহাল। এ বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক ও দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের ভোগান্তিটাই বা কতটুকু? এক্ষেত্রে বিত্তহীন মানুষেরা সাশ্রয়ী নীতির পথ ধরবে অথবা তেল ছাড়া খাদ্যে অভ্যস্ত হবে। এতে অবশ্যই শারীরিক পুষ্টির কিছুটা ঘাটতি হলেও তৈলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা উপকৃত হবে। সেটা অবশ্য জাতীয় স্বাস্থ্য আওতাভুক্ত বিষয়। সরকার সে রকমটা বিবেচনায় নিয়ে যদি বাণিজ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে এ সংকটের সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করে-তাহলে দেশের সাধারণ মানুষগুলো অন্ততঃ তেলের আকালে পড়বে না। সাধারণ ও গরিব বান্ধব এ সরকার এ সংকট উত্তোরণের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী প্রত্যাশা করে থাকেন।

আমাদের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল বলে এ অবস্থা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের কর্তা ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের নাকে বা বুকে তেল মেখে ঘুমিয়ে থাকার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর ব্যবস্থা ও নজরদারি অভাব হলেই দায়সারা মনিটরিং হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবে। ভোক্তা অধিকার সংস্থা, টিসিবি, পণ্য বিপণন ব্যবস্থাপনা, চাহিদা সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং সর্বোপরি আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনয়ন পূর্বক এ সমস্যা সমাধানে তৎপর হতে হবে। অধিকন্তু বিভিন্ন বাজার কমিটি দ্রব্যসামগ্রীর গুণাগুণ যাচাই কমিটি, মালামাল সংরক্ষণ ও গুদামজাত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সর্বোপরি মহানগর ও পৌর এলাকাস্থিত বাজারগুলোতে তাদের নিজস্ব পরিদর্শন টিমের আন্তরিকতার সঙ্গে তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। আর সকলের সমন্বিত কার্যক্রমে এ দূরবস্থার নিরসন সম্ভব হবে।

[লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক,

বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে করণীয়

জীবন ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে পদ্মা সেতু

বাজেট বরাদ্দ এবং আদিবাসী

লাভ-ক্ষতির হিসাব

পাখি রক্ষায় চাই বাস্তবসম্মত উদ্যোগ

ছবি

একজন বিজ্ঞানপ্রেমীর অকাল প্রয়াণ

বন্যাকালীন রোগ-বালাই রোধে করণীয়

অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ছবি

‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক দূষণে আরএসএসের ভূমিকা

একতা, ন্যায় ও শক্তির প্রেরণা

ছবি

পদ্মা সেতু : স্বপ্ন এখন বাস্তব

পদ্মা সেতু : বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের প্রতীক

মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ছবি

রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার আকুতি

চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি

কুসিক নির্বাচনে ইসি কি পাস করেছে

বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

ছবি

জয় হোক মানবতার

বন্যা : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ভূমি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের এনজিও ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা কী

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম মোস্তাফা জব্বার

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

ছবি

শরণার্থীদের নিরাপত্তার অধিকার

পদ্মা সেতু : বিএনপির দায় ও সরকারের দায়িত্ব

প্রস্তাবিত বাজেট ব্যাংক খাতে কী প্রভাব রাখবে

ছবি

পদ্মা সেতু : দেশের ‘আইকনিক স্থাপনা’

ডিজিটাল কারেন্সির ব্যবহার ও সম্ভাবনা

নবীকে নিয়ে বিজেপি নেতার কটূক্তি

অগ্নিকান্ডে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি ও করণীয়

ছিন্নমূল মানুষ ও বাংলার কথা

খুনিদের বাঁচাতে আইন হয় কিন্তু আইনজীবীদের সুরক্ষায় আইন নেই

বিশ্ব খরা ও মরুকরণ প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

tab

উপ-সম্পাদকীয়

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ : সরকারের দায় ও দায়িত্ব

ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

image

সয়াবিন তেলের বাজার কেন স্থিতিশীল করা যাচ্ছে না?

রোববার, ১৫ মে ২০২২

করোনার ধাক্কায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থা টালমাটাল। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পরিস্থিতিও ভিন্ন হওয়ার কিছু নয়। যেহেতু অধিকাংশ নিত্যপণ্যের জন্য আমদানির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আগুনে পুড়তেই হচ্ছে মানুষকে। সেই আগুনে ঘি ঢালল ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি।

এরপরেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। যেমন, ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে, মজুতও যথেষ্ট পরিমাণে আছে ফলে কোনো ঘাটতি হওয়ার কথা নয়; তাহলে চাল কিনতে কেন সাধারণ মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে? এর উত্তর হতে পারে দুটি-হয় উৎপাদন ও মজুদ নিয়ে সরকার সঠিক তথ্য দেয়নি, বাড়তি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে অথবা বাজারে সিন্ডিকেট করে এই অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে।

সয়াবিন তেলের বাজারের আধিপত্য হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির হাতে। ফলে এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিনতর কোনো ব্যাপার নয়। এরপরও সরকার সেটি পারল না কেন? তাই কীভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটি এখন অর্থনীতির এজেন্ডা। নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান দামের মধ্যে সরকারের ভর্তুকির বোঝা সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে জরুরি সেবাসমূহ, যেমন- গ্যাস ও বিদ্যুতের ‘মূল্য সমন্বয়’ প্রয়োজন। তারা মনে করছেন, করোনার টিকা, বুস্টার ডোজের মতো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ সংগ্রহ, কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে ধান- চাল ক্রয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ইত্যাদি কাজের জন্য তহবিল নিশ্চিত করতে এই ‘মূল্য সমন্বয়’ সাহায্য করবে। কথায় যুক্তি আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে কেন এগুলো করতে হবে? সেই সিরিয়া যুদ্ধের সময়ে জ্বালানি তেলের দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকলেও জনগণের পকেট থেকে বেশি দাম নেওয়া হয়েছে। আমরা জানি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারে। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় চাপে পড়েছে গরিব মানুষ আর এ অবস্থায় তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। অথচ ফেব্রুয়ারিতেই মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, যা গত প্রায় দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবার কি অবস্থা হবে-বাজেট বিশেষজ্ঞরাই ভালো বলবেন।

সংসারের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো গ্যাস, বিদ্যুৎ ও রান্নার তেল। এই তিনটির দাম সব অঙ্ককে হার মানাচ্ছে। এই অবস্থায় গরিব মধ্যবিত্ত বাঁচবে কীভাবে প্রশ্ন সেখানে। জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সদিচ্ছা থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণকে সুরাহা দেওয়া যায় বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

রাতারাতি ভোজ্যতেলের সংকট কাটানোর বিকল্প চিন্তা ও পরিকল্পনা করা সম্ভব না হলেও বিকল্পের সন্ধান শুরু করতে হবে এখনই। ভোজ্যতেল আমাদের একটি প্রাত্যহিক প্রয়োজনীয় দ্রব্য। তেল ছাড়া রান্না হবে না। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় যেকোনো পণ্যের জন্য পরনির্ভরতা বিপজ্জনক। আমদানির উৎসে সংকট হলে আমরাও সংকটে পড়ি। এই অভিজ্ঞতা আমাদের অতীতে কিছু পণ্য নিয়ে হয়েছে। সংকটে না পড়লে আমরা সমাধান নিয়েও ভাবি না। ধানের আবাদ বাড়িয়েছি, গরুর ঘাটতিও কমানো গেছে। ভোজ্যতেল নিয়ে হাহাকার কমানোর উপায়ও বের করতে হবে। এ জন্য এককভাবে সয়াবিনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে আমাদের ভোজ্যতেলের বিকল্প ভালো উৎস হতে পারে শর্ষে তেল।

ব্যবসায়ীরা বারবার আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ান। আন্তর্জাতিক বাজারে যে পণ্যটির দাম বেড়েছে, তা বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করতে কমপক্ষে ২-৩ মাস সময় লাগবে। আর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তারা আবার বলেন বেশি দামে কেনা। তাই আগের দামে কেনা হলেও শুধু ঘোষণার কারণেই বাড়তি দামে বিক্রি করে এক দিনে ব্যবসায়ীরা লুটে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা।

একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধ মজুদ গড়ে তুলে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে-এ অভিযোগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল সয়াবিন তেলের অবৈধ মজুদের ঘটনায়। বিভিন্ন চক্রের তৎপরতা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক না কেন, ভোক্তারা এর সুফল পাবে কি না সন্দেহ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের তথ্য বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, আমদানি ও সরবরাহে কোন ধরনের সংকট না থাকলেও সয়াবিন তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী শুধুমাত্র অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে কৃত্রিম সংকটের কারণে। ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে নাভিশ্বাস উঠেছে।

করোনার কারণে গত দুই বছরে বহু মানুষের আয় কমেছে। সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ পরিবারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এ সময় জীবনযাত্রার সব খাতে ব্যয়বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে মানুষ পরিস্থিতি সামাল দেবে কীভাবে? যেহেতু বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো আয় বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু বাধ্য হয়ে ভোক্তাদের ভোগ কমাতে হচ্ছে। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে দেশের জনসম্পদ খাতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পুষ্টিকর খাবার নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্য খাতে যে প্রভাব পড়বে, তাতে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এমনিতেই জীবনযাত্রার সব খাতে এর প্রভাব বিদ্যমান। এ সময় যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি চলমান থাকে, তাহলে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ পথে বসতে বাধ্য হবে। কাজেই কোন ব্যক্তি যাতে কারসাজি করে বা পণ্যের অবৈধ মজুত গড়ে তুলে নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সেদিকে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে।

মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় চাপে পড়েছে গরিব মানুষ আর এ অবস্থায় তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করাই বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

কতিপয় অসাধু ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের কাছে গোটা জাতি জিম্মি কেন? তেলের বাজার ও বেসামাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায় ও দায়িত্ব জানতে চায় জনগণ। তবে ভোজ্যতেলের এ অনভিপ্রেত মূল্যবৃদ্ধিতে নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের অবস্থা ভালো নেই। তেলের আগুন আর চুলার আগুন একাকার হয়ে গেছে। তবে এ কথা নিদ্বিধায় বলা যায় যে, তৈল মর্দন সংস্কৃতির চর্চায় অভ্যস্ত সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর এতে বিশেষ কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না-কেননা তারা তেলে জলের গুণাগুণে বরাবরই ওয়াকিবহাল। এ বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক ও দিনমজুর শ্রেণীর মানুষের ভোগান্তিটাই বা কতটুকু? এক্ষেত্রে বিত্তহীন মানুষেরা সাশ্রয়ী নীতির পথ ধরবে অথবা তেল ছাড়া খাদ্যে অভ্যস্ত হবে। এতে অবশ্যই শারীরিক পুষ্টির কিছুটা ঘাটতি হলেও তৈলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা উপকৃত হবে। সেটা অবশ্য জাতীয় স্বাস্থ্য আওতাভুক্ত বিষয়। সরকার সে রকমটা বিবেচনায় নিয়ে যদি বাণিজ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে এ সংকটের সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করে-তাহলে দেশের সাধারণ মানুষগুলো অন্ততঃ তেলের আকালে পড়বে না। সাধারণ ও গরিব বান্ধব এ সরকার এ সংকট উত্তোরণের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী প্রত্যাশা করে থাকেন।

আমাদের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল বলে এ অবস্থা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের কর্তা ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের নাকে বা বুকে তেল মেখে ঘুমিয়ে থাকার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর ব্যবস্থা ও নজরদারি অভাব হলেই দায়সারা মনিটরিং হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেবে। ভোক্তা অধিকার সংস্থা, টিসিবি, পণ্য বিপণন ব্যবস্থাপনা, চাহিদা সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং সর্বোপরি আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আনয়ন পূর্বক এ সমস্যা সমাধানে তৎপর হতে হবে। অধিকন্তু বিভিন্ন বাজার কমিটি দ্রব্যসামগ্রীর গুণাগুণ যাচাই কমিটি, মালামাল সংরক্ষণ ও গুদামজাত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং সর্বোপরি মহানগর ও পৌর এলাকাস্থিত বাজারগুলোতে তাদের নিজস্ব পরিদর্শন টিমের আন্তরিকতার সঙ্গে তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। আর সকলের সমন্বিত কার্যক্রমে এ দূরবস্থার নিরসন সম্ভব হবে।

[লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক,

বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

back to top