alt

উপ-সম্পাদকীয়

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

পাভেল পার্থ

: বুধবার, ২২ জুন ২০২২

বাংলাদেশে ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি এবং পানিপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সিলেট-সুনামগঞ্জসহ নিদারুণ বন্যায় তলিয়ে আছে দেশ। বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও শেরপুর-নেত্রকোণা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ঘটছে টিলা ও পাহাড় ধস। বহু মানুষ পাহাড় ধসের আতঙ্কে আছেন। বিগত নির্মম টিলা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় দেখা গেছে ঘরের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়ই পাহাড় ধসে চুরমার হয়েছে জীবন। ১১ জুন ২০০৭ সালে অবিরাম বর্ষণে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকার লেবুবাগান, কুসুমবাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহত হন ১৩০ এরও বেশি পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষ। সে সময় লিখেছিলাম, ‘পাহাড় কাটা না থামালে মৃত্যুর মিছিল থামবে না’। ১৫ বছর ধরে লিখেই চলেছি। একটির পর একটি পাহাড় বিপর্যয় হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি আজো।

অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট বাণিজ্য, করপোরেট, কৃষি ও তথাকথিত উন্নয়নের নামে একটির পর একটি পাহাড় প্রশ্নহীন ভাবে খুন করা হচ্ছে। ১৫ জুন ২০১০ ভোরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হন। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার টুইন্যা পাহাড় ধসে পাঁচজন মারা যান। ২০০৮ সালের ৬ জুলাইও এখানে পাহাড় ধসে চারজন মারা যান। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সেনা সদস্যদেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে তখন। এলোপাতাড়ি পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে প্রাকৃতিক বনের আচ্ছাদন উজাড় করার জন্যই মূলত পাহাড়গুলো ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে। দেখা গেছে পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দাদের চাইতে যারা বাইরে থেকে পাহাড়ি এলাকায় অস্থায়ী বসবাস করছেন বেশিরভাগ ধসে পড়ছে সেসব পাহাড়।

নদীভাঙনসহ নানান সংকটে উদ্বাস্তু হয়ে সমতল, চরাঞ্চল ও নদী অববাহিকার এসব গরিব মানুষ পাহাড়ি এলাকায় নয়াবসতি গেড়েছেন। কোনো পাহাড়ের ঢাল ৪৫ ডিগ্রী বেশী কাটা হলেই তাতে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোথাও কোথাও পাহাড় ও টিলা কেটে ৯০ ডিগ্রি করা হয়েছে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ মাটি কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে। চলমান বন্যা পরিস্থিতি আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে, প্রকৃতিবিরুদ্ধ উন্নয়ন সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। বন্যার পাশাপাশি পাহাড় ধস মিলে এক সংকটময় পরিস্থিতি জনজীবন ও বাস্তুতন্ত্রকে ভবিষ্যতে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিপর্যস্ত হবে প্রকৃতি, সমাজ, সংষ্কৃতি, উৎপাদন, অর্থনীতি, জীবন ও রাজনীতি। বন্যা মোকাবিলার পাশাপাশি পাহাড় ও টিলা ধস সামাল দিতে এখনি আমাদের সামগ্রিক তৎপরতা সজাগ ও সক্রিয় করা জরুরি।

পাহাড় ধস : চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল

১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি এলাকায় যে ভূমিধস হয়েছিল তার বিস্তার এতটা ভয়াবহ ছিল না। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড় ধসে নিহত হন ৬ জন, ২০১৪ সালে ১ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১২ সালে ২৮ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১০ ও ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০০৮ সালে ১৪ জন। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বড় ধরণের পাহাড়ি বিপর্যয় ঘটেনি। ২০১৭ সালের আগে পাহাড় ধসে পাহাড়ি আদিবাসী জীবন ও বসত নিশ্চিহ্ন হতে দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১৭ সালের জুনের পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে চাকমা ও বান্দরবানে খিয়াং আদিবাসীদের মৃত্যু ঘটেছে। ২০১৭ সালের ১২ জুন মধ্যরাত থেকে ১৩ জুন ভোরে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রায় ১৩৭ জন মানুষ নিহত হয়েছে। বেসামরিক জনগণের পাশাপাশি কয়েকজন সেনা সদস্যেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছিল। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় বিপর্যয়ের পর পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১৭ জুন ২০০৭ এর প্রথম দিনের অভিযানে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ১৯টি মামলা হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জানায় ১৯৯৪ থেকে ২০০২ পর্যন্ত পাহাড় কাটা সংক্রান্ত ২৮টি মামলার ক্ষেত্রে ১৮টিতে সাজা হয়।

টিলা ধস : বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল

সিলেট বিভাগের প্রায় এক হাজার ৭৪৫টি টিলাভূমি (২৭৪৯.৫০ একর) আজ টুকরো টুকরো করে কেটে চুরমার ও দখল করে বর্ষাকালে ভয়াবহ ধস পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। সিলেট সদরের খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, বালুচর, গুয়অবাড়ি, আখালিয়া বড়গুল, ব্রাহ্মণশাসন, মুক্তিযোদ্ধা টিলা, টিলাগাঁও এলাকায় টিলা কেটে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরেও একই অবস্থা। টিলা কেটে ঝুঁকিপূর্ণ এই বসতিগুলোতে মূলত বসবাস করছেন বহিরাগত সেটেলাররা। দেশের নানা অঞ্চল থেকে জীবিকার সন্ধানে যারা সিলেট এসেছেন, পূর্বে পাথরখনির কাজ করলেও এদের বড় অংশই এখন দিনমজুর বা নির্মাণ শ্রমিক। ২০২২ সালের ৫ ই জুন পরিবেশ-প্রকৃতি সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। প্রধানমন্ত্রী ‘প্রকৃতিবান্ধব’ উন্নয়নে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানালেন। বললেন, একমাত্র প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়নের ভেতর দিয়েই আমাদের সকলের আসামির জীবন সুরক্ষিত হতে পারে। নিদারুণভাবে পরিবেশ দিবসের পরদিন ভোরে টানা বৃষ্টিতে সিলেটের জৈন্তাপুরের চিকনাগুল ইউনিয়নের পূর্ব সাতজানি গ্রামের টিলা ধসে পড়ে। টিলাধসে মাটিচাপায় ঘরসুদ্ধু নিহত হয় একটি পরিবার। সুমি বেগম, শামীমারা বেগম, জুবের আহমেদ ও সাফি আহমেদেরা ঘরের ভেতর ঘুমিয়েই ছিলেন। পরিবেশ দিবসের ঠিক আগের দিন ৪ জুন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের ঘিলাছড়া ইউনিয়নের উত্তর আশিঘর-ইছাপুরে টিলা ধসে কয়েকটি বাড়ি চুরমার হয়ে যায়।

শুধু পরিবেশ দিবসের আগের বা পরের দিন নয়; শুধু সিলেট নয়; দেশজুড়ে যেখানেই টিলা-পাহাড় আছে সেখানেই বর্ষাকালের টানা বৃষ্টিতে ধস হচ্ছে। ঘটছে প্রাণ ও সম্পদহানির নির্মম ঘটনা। এ বছরের ১৪ মে সিলেটের গোলাপগঞ্জের লক্ষণাবাদ ইউনিয়নের চক্রবর্ত্তী গ্রামে ঘুমের ভেতর টিলাধসে মারা যান অপু পাল। ১২ মে সিলেটের গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নের প্রথমখ- নয়াগ্রামে এবং খাদিমনগর ইউনিয়নের সাহেবের বাজার রামপুর গ্রামে টিলা ধসে ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়। নজিরবিহীন টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির ভেতর সিলেটের মালনীছড়া চাবাগান, টিলাগড় এবং আবাদানি টিলায় ধস হয়েছে। এসব প্রাচীন টিলা ও পাহাড় এলোপাথারি কাটা হচ্ছে। কোথায় আবাসন, অস্থায়ী নিবাস, রিসোর্ট, হোটেল, মাদ্রাসা, মুরগির খামার, উচটু দালান আবার কোথাওবা টিলা কেটে হাইটেক পার্কের জন্য গ্যাস পাইপ নেয়ার জন্য টিলায় ফাটল ধরছে। টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে টিলা-পাহাড়। এছাড়া এসব টিলায় প্রাকৃতিক বনভূমি ও বৃক্ষাচ্ছাদন নেই। বিশেষ করে গুল্ম, ঘাস-গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, ঝোপ ও লতানো উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ও সংখ্যা একেবারেই নিঃস্ব প্রায়। আগে বৃষ্টির পানিতে টিলা-পাহাড় এভাবে ধসে পড়ত না। কারণ লতা-ঝোপ-গুল্মের শেকড় মাটি ধরে রাখতে পারত। মাটি ক্ষয় হতো কম।

প্রকৃতিবিরুদ্ধ উন্নয়ন সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। বন্যার পাশাপাশি পাহাড় ধস মিলে এক সংকটময় পরিস্থিতি জনজীবন ও বাস্তুতন্ত্রকে ভবিষ্যতে আরও জটিল করে তুলতে পারে

পাহাড় আগলে দাঁড়াতে হবে

পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবনের বসবাস। ঐতিহাসিকভাবে যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাহাড়ের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা পাহাড়কে দেখে একটা জায়গা হিসেবে। যেখানে বসবাস করা যায়, চাষবাস করা যায়, পোল্ট্রি ফার্ম করা যায়, মাদ্রাসা ঘর তোলা যায়, হোটেল রেস্টুরেন্ট করা যায় বা একটি নিরাপত্তা চৌকি বসানো যায়। পাহাড় যাদের কাছে জীবন্তসত্তা নয়, তারাই বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে সর্বনাশ করেছে। আর এ কারণেই বর্ষাকালের অবিরত বর্ষণে পাহাড় ধসে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের এসব পাহাড়শ্রেণীর মাটির গঠন ও বুননের বৈশিষ্ট্য এমনই যে এসব পাহাড় এলাপাতাড়ি কাটা হলে এবং পাহাড়ের উপরিভাগের বৃক্ষাচ্ছাদন সরে গেলে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে এসব পাহাড় ধসে পড়বে। এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটছে না, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড় টিলাও ধসে বাংলাদেশের উপর পড়ছে। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই পশ্চিম খাসি এলাকার কালাপাহাড় ধসে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তরক্ষী ক্যাম্পসহ আশেপাশের ধানজমিন ও বসতবাড়ি সব পাহাড়ি বালির নিচে চাপা পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়েও একই ঘটনা ঘটছে, এলাপাথারি পাহাড় কেটে কয়লা, চুনাপাথর তোলা হচ্ছে। ফাঁপা পাহাড় বৃষ্টির পানিতে ধসে পড়ছে ভাটির বাংলাদেশের হাওরে। বছর বছর পাহাড়ি ঢলে হাওর তলিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণও এই।

চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের সব কয়টি পাহাড়ি এলাকা কাটা হয়েছে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে যারা কখনোই পাহাড় সংস্কৃতির মানুষ নন। পাহাড় যাদের কাছে শুধু ব্যবসার বস্তু, জীবনযাপনের কোনো অংশ নয়। দেশে ইমারত নির্মাণ আইনে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদন্ড এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা আছে। কিন্তুপাহাড়কে জীবন দিয়ে আগলে রাখার কোনো পাহাড়বান্ধব প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের চাইনো হাইড্রো করপোরেশনের কাছ থেকে পাহাড় কাটার প্রস্তাব পাওয়ায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে পাহাড় কাটার অনুমতি চেয়েছিল। কোনো ধরনের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাব যাচাই ও মূল্যায়ন ছাড়াই পাহাড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা, বহিরাগত উদ্বাস্তু মানুষের বসতি, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র, জমি ভরাট বা নির্মাণকাজে পাহাড় কেটেই মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে সারা দেশে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় পাহাড়ের স্থানীয় বন ও বৃক্ষপ্রজাতিকে গুরুত্ব না দিয়ে লাগানো হয়েছে সেগুন, একাশিয়া, রাবার, ম্যাঞ্জিয়ামের মতো আগ্রাসি প্রজাতি। এসব গাছের শিকড় পাহাড়ের মাটির বুনট ও উপরিস্তরের মাটিকে ধরে রাখতে পারেনা। ফলে দিনে দিনে এক একটি পাহাড় নিজের শরীরে নানান আঘাত সয়ে মুমূর্ষু হয়ে ধ্বসে পড়ছে অল্প বর্ষণেই। বছর বছর পাহাড় ও টিলা ধসের ঘটনা এবং চলমান বন্যা পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া জরুরি। সতর্ক হওয়া জরুরি।

আশা করি আর কোনো পাহাড়-টিলা দয়ামায়াহীন ভোগ্য বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হবে না। পাহাড় কেটে কেটে গড়ে উঠবে না আর কোনো স্থাপনা, অবকাঠামো বা ঝুঁকিপূর্ণ বসত। পাহাড়ি এলাকার আদিবাসিন্দাদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান। পাহাড়ের আদিবাসিন্দাসহ কোনো প্রাণপ্রজাতি উদ্বাস্তু হবে না তার আপন পাহাড় থেকে। কোনো পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষও পাহাড়খেকোদের কাটা পাহাড়ে এসে লাশ হবে না আর। মুমূর্ষু টিলা-পাহাড়ের আহাজারি থামানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দেশের আর কোথাও টিলা কী পাহাড় ধসে জানমালের ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি আমরা চাই না। টিলা ও পাহাড় ধস রোধে এখনি সজাগ, সতর্ক ও তৎপর হওয়া জরুরি।

[লেখক : গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ]

ছবি

রথযাত্রার প্রচলন যেভাবে

আম রপ্তানির অন্তরায়

ছবি

বন্যা দুর্গত মানুষের দীর্ঘশ্বাস

পদ্মা সেতু : জাতির গর্বের প্রতীক

ভারতে মুসলমানদের কথা বললেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসে

করোনার চতুর্থ ঢেউ : আশঙ্কা ও টিকার কার্যকারিতা

শিক্ষক হত্যা : নৈতিক অবক্ষয়ের কদর্য রূপ

বদলে যাবে দক্ষিণাঞ্চল এগিয়ে যাবে দেশ

সাঁওতাল বিদ্রোহের চেতনা

বিপণন ব্যবস্থাপনা ও বাজার গবেষণা

এ লজ্জা কোথায় রাখি

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে করণীয়

জীবন ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে পদ্মা সেতু

বাজেট বরাদ্দ এবং আদিবাসী

লাভ-ক্ষতির হিসাব

পাখি রক্ষায় চাই বাস্তবসম্মত উদ্যোগ

ছবি

একজন বিজ্ঞানপ্রেমীর অকাল প্রয়াণ

বন্যাকালীন রোগ-বালাই রোধে করণীয়

অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়

মাদকাসক্তি ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি

ছবি

‘ভয় নেই, আমি এসে গেছি’

পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক দূষণে আরএসএসের ভূমিকা

একতা, ন্যায় ও শক্তির প্রেরণা

ছবি

পদ্মা সেতু : স্বপ্ন এখন বাস্তব

পদ্মা সেতু : বাঙালির আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের প্রতীক

মাঙ্কিপক্স ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ছবি

রোহিঙ্গাদের বাড়ি ফেরার আকুতি

চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি

কুসিক নির্বাচনে ইসি কি পাস করেছে

বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

ছবি

জয় হোক মানবতার

বন্যা : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের ভূমি ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের এনজিও ব্যবস্থাপনার মূল সমস্যা কী

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল প্রকাশ মাধ্যম মোস্তাফা জব্বার

বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে

tab

উপ-সম্পাদকীয়

পাহাড়-টিলা ধস সামাল দিতে আমরা কি প্রস্তুত

পাভেল পার্থ

বুধবার, ২২ জুন ২০২২

বাংলাদেশে ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি এবং পানিপ্রবাহের প্রাকৃতিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সিলেট-সুনামগঞ্জসহ নিদারুণ বন্যায় তলিয়ে আছে দেশ। বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও শেরপুর-নেত্রকোণা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ঘটছে টিলা ও পাহাড় ধস। বহু মানুষ পাহাড় ধসের আতঙ্কে আছেন। বিগত নির্মম টিলা ও পাহাড় ধসের ঘটনায় দেখা গেছে ঘরের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়ই পাহাড় ধসে চুরমার হয়েছে জীবন। ১১ জুন ২০০৭ সালে অবিরাম বর্ষণে চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকার লেবুবাগান, কুসুমবাগ, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বান্দরবানে পাহাড় ধসে নিহত হন ১৩০ এরও বেশি পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষ। সে সময় লিখেছিলাম, ‘পাহাড় কাটা না থামালে মৃত্যুর মিছিল থামবে না’। ১৫ বছর ধরে লিখেই চলেছি। একটির পর একটি পাহাড় বিপর্যয় হলেও এর কোনো সুরাহা হয়নি আজো।

অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, রিয়েল এস্টেট বাণিজ্য, করপোরেট, কৃষি ও তথাকথিত উন্নয়নের নামে একটির পর একটি পাহাড় প্রশ্নহীন ভাবে খুন করা হচ্ছে। ১৫ জুন ২০১০ ভোরে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হন। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার টুইন্যা পাহাড় ধসে পাঁচজন মারা যান। ২০০৮ সালের ৬ জুলাইও এখানে পাহাড় ধসে চারজন মারা যান। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সেনা সদস্যদেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছে তখন। এলোপাতাড়ি পাহাড় কাটা ও পাহাড়ে প্রাকৃতিক বনের আচ্ছাদন উজাড় করার জন্যই মূলত পাহাড়গুলো ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে। দেখা গেছে পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দাদের চাইতে যারা বাইরে থেকে পাহাড়ি এলাকায় অস্থায়ী বসবাস করছেন বেশিরভাগ ধসে পড়ছে সেসব পাহাড়।

নদীভাঙনসহ নানান সংকটে উদ্বাস্তু হয়ে সমতল, চরাঞ্চল ও নদী অববাহিকার এসব গরিব মানুষ পাহাড়ি এলাকায় নয়াবসতি গেড়েছেন। কোনো পাহাড়ের ঢাল ৪৫ ডিগ্রী বেশী কাটা হলেই তাতে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, মৌলভীবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোথাও কোথাও পাহাড় ও টিলা কেটে ৯০ ডিগ্রি করা হয়েছে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ মাটি কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে। চলমান বন্যা পরিস্থিতি আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে, প্রকৃতিবিরুদ্ধ উন্নয়ন সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। বন্যার পাশাপাশি পাহাড় ধস মিলে এক সংকটময় পরিস্থিতি জনজীবন ও বাস্তুতন্ত্রকে ভবিষ্যতে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিপর্যস্ত হবে প্রকৃতি, সমাজ, সংষ্কৃতি, উৎপাদন, অর্থনীতি, জীবন ও রাজনীতি। বন্যা মোকাবিলার পাশাপাশি পাহাড় ও টিলা ধস সামাল দিতে এখনি আমাদের সামগ্রিক তৎপরতা সজাগ ও সক্রিয় করা জরুরি।

পাহাড় ধস : চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল

১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড়ি এলাকায় যে ভূমিধস হয়েছিল তার বিস্তার এতটা ভয়াবহ ছিল না। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম জেলায় পাহাড় ধসে নিহত হন ৬ জন, ২০১৪ সালে ১ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১২ সালে ২৮ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১০ ও ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০০৮ সালে ১৪ জন। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বড় ধরণের পাহাড়ি বিপর্যয় ঘটেনি। ২০১৭ সালের আগে পাহাড় ধসে পাহাড়ি আদিবাসী জীবন ও বসত নিশ্চিহ্ন হতে দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১৭ সালের জুনের পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে চাকমা ও বান্দরবানে খিয়াং আদিবাসীদের মৃত্যু ঘটেছে। ২০১৭ সালের ১২ জুন মধ্যরাত থেকে ১৩ জুন ভোরে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে প্রায় ১৩৭ জন মানুষ নিহত হয়েছে। বেসামরিক জনগণের পাশাপাশি কয়েকজন সেনা সদস্যেরও করুণ মৃত্যু ঘটেছিল। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় বিপর্যয়ের পর পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ১৭ জুন ২০০৭ এর প্রথম দিনের অভিযানে চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ১৯টি মামলা হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জানায় ১৯৯৪ থেকে ২০০২ পর্যন্ত পাহাড় কাটা সংক্রান্ত ২৮টি মামলার ক্ষেত্রে ১৮টিতে সাজা হয়।

টিলা ধস : বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল

সিলেট বিভাগের প্রায় এক হাজার ৭৪৫টি টিলাভূমি (২৭৪৯.৫০ একর) আজ টুকরো টুকরো করে কেটে চুরমার ও দখল করে বর্ষাকালে ভয়াবহ ধস পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। সিলেট সদরের খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, বালুচর, গুয়অবাড়ি, আখালিয়া বড়গুল, ব্রাহ্মণশাসন, মুক্তিযোদ্ধা টিলা, টিলাগাঁও এলাকায় টিলা কেটে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরেও একই অবস্থা। টিলা কেটে ঝুঁকিপূর্ণ এই বসতিগুলোতে মূলত বসবাস করছেন বহিরাগত সেটেলাররা। দেশের নানা অঞ্চল থেকে জীবিকার সন্ধানে যারা সিলেট এসেছেন, পূর্বে পাথরখনির কাজ করলেও এদের বড় অংশই এখন দিনমজুর বা নির্মাণ শ্রমিক। ২০২২ সালের ৫ ই জুন পরিবেশ-প্রকৃতি সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’। প্রধানমন্ত্রী ‘প্রকৃতিবান্ধব’ উন্নয়নে সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান জানালেন। বললেন, একমাত্র প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়নের ভেতর দিয়েই আমাদের সকলের আসামির জীবন সুরক্ষিত হতে পারে। নিদারুণভাবে পরিবেশ দিবসের পরদিন ভোরে টানা বৃষ্টিতে সিলেটের জৈন্তাপুরের চিকনাগুল ইউনিয়নের পূর্ব সাতজানি গ্রামের টিলা ধসে পড়ে। টিলাধসে মাটিচাপায় ঘরসুদ্ধু নিহত হয় একটি পরিবার। সুমি বেগম, শামীমারা বেগম, জুবের আহমেদ ও সাফি আহমেদেরা ঘরের ভেতর ঘুমিয়েই ছিলেন। পরিবেশ দিবসের ঠিক আগের দিন ৪ জুন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের ঘিলাছড়া ইউনিয়নের উত্তর আশিঘর-ইছাপুরে টিলা ধসে কয়েকটি বাড়ি চুরমার হয়ে যায়।

শুধু পরিবেশ দিবসের আগের বা পরের দিন নয়; শুধু সিলেট নয়; দেশজুড়ে যেখানেই টিলা-পাহাড় আছে সেখানেই বর্ষাকালের টানা বৃষ্টিতে ধস হচ্ছে। ঘটছে প্রাণ ও সম্পদহানির নির্মম ঘটনা। এ বছরের ১৪ মে সিলেটের গোলাপগঞ্জের লক্ষণাবাদ ইউনিয়নের চক্রবর্ত্তী গ্রামে ঘুমের ভেতর টিলাধসে মারা যান অপু পাল। ১২ মে সিলেটের গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নের প্রথমখ- নয়াগ্রামে এবং খাদিমনগর ইউনিয়নের সাহেবের বাজার রামপুর গ্রামে টিলা ধসে ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয়। নজিরবিহীন টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যা পরিস্থিতির ভেতর সিলেটের মালনীছড়া চাবাগান, টিলাগড় এবং আবাদানি টিলায় ধস হয়েছে। এসব প্রাচীন টিলা ও পাহাড় এলোপাথারি কাটা হচ্ছে। কোথায় আবাসন, অস্থায়ী নিবাস, রিসোর্ট, হোটেল, মাদ্রাসা, মুরগির খামার, উচটু দালান আবার কোথাওবা টিলা কেটে হাইটেক পার্কের জন্য গ্যাস পাইপ নেয়ার জন্য টিলায় ফাটল ধরছে। টানা বৃষ্টিতে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে টিলা-পাহাড়। এছাড়া এসব টিলায় প্রাকৃতিক বনভূমি ও বৃক্ষাচ্ছাদন নেই। বিশেষ করে গুল্ম, ঘাস-গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ, ঝোপ ও লতানো উদ্ভিদের বৈচিত্র্য ও সংখ্যা একেবারেই নিঃস্ব প্রায়। আগে বৃষ্টির পানিতে টিলা-পাহাড় এভাবে ধসে পড়ত না। কারণ লতা-ঝোপ-গুল্মের শেকড় মাটি ধরে রাখতে পারত। মাটি ক্ষয় হতো কম।

প্রকৃতিবিরুদ্ধ উন্নয়ন সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে ভয়াবহ হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। বন্যার পাশাপাশি পাহাড় ধস মিলে এক সংকটময় পরিস্থিতি জনজীবন ও বাস্তুতন্ত্রকে ভবিষ্যতে আরও জটিল করে তুলতে পারে

পাহাড় আগলে দাঁড়াতে হবে

পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবনের বসবাস। ঐতিহাসিকভাবে যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাহাড়ের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা পাহাড়কে দেখে একটা জায়গা হিসেবে। যেখানে বসবাস করা যায়, চাষবাস করা যায়, পোল্ট্রি ফার্ম করা যায়, মাদ্রাসা ঘর তোলা যায়, হোটেল রেস্টুরেন্ট করা যায় বা একটি নিরাপত্তা চৌকি বসানো যায়। পাহাড় যাদের কাছে জীবন্তসত্তা নয়, তারাই বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে সর্বনাশ করেছে। আর এ কারণেই বর্ষাকালের অবিরত বর্ষণে পাহাড় ধসে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের এসব পাহাড়শ্রেণীর মাটির গঠন ও বুননের বৈশিষ্ট্য এমনই যে এসব পাহাড় এলাপাতাড়ি কাটা হলে এবং পাহাড়ের উপরিভাগের বৃক্ষাচ্ছাদন সরে গেলে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে এসব পাহাড় ধসে পড়বে। এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ঘটছে না, উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড় টিলাও ধসে বাংলাদেশের উপর পড়ছে। ২০০৮ সালের ২০ জুলাই পশ্চিম খাসি এলাকার কালাপাহাড় ধসে বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তরক্ষী ক্যাম্পসহ আশেপাশের ধানজমিন ও বসতবাড়ি সব পাহাড়ি বালির নিচে চাপা পড়ে। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়েও একই ঘটনা ঘটছে, এলাপাথারি পাহাড় কেটে কয়লা, চুনাপাথর তোলা হচ্ছে। ফাঁপা পাহাড় বৃষ্টির পানিতে ধসে পড়ছে ভাটির বাংলাদেশের হাওরে। বছর বছর পাহাড়ি ঢলে হাওর তলিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণও এই।

চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের সব কয়টি পাহাড়ি এলাকা কাটা হয়েছে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে যারা কখনোই পাহাড় সংস্কৃতির মানুষ নন। পাহাড় যাদের কাছে শুধু ব্যবসার বস্তু, জীবনযাপনের কোনো অংশ নয়। দেশে ইমারত নির্মাণ আইনে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদন্ড এবং ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা আছে। কিন্তুপাহাড়কে জীবন দিয়ে আগলে রাখার কোনো পাহাড়বান্ধব প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চীনের চাইনো হাইড্রো করপোরেশনের কাছ থেকে পাহাড় কাটার প্রস্তাব পাওয়ায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে পাহাড় কাটার অনুমতি চেয়েছিল। কোনো ধরনের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত প্রভাব যাচাই ও মূল্যায়ন ছাড়াই পাহাড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে স্থাপনা, বহিরাগত উদ্বাস্তু মানুষের বসতি, রিসোর্ট, বিনোদনকেন্দ্র, জমি ভরাট বা নির্মাণকাজে পাহাড় কেটেই মাটি সরবরাহ করা হচ্ছে সারা দেশে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় পাহাড়ের স্থানীয় বন ও বৃক্ষপ্রজাতিকে গুরুত্ব না দিয়ে লাগানো হয়েছে সেগুন, একাশিয়া, রাবার, ম্যাঞ্জিয়ামের মতো আগ্রাসি প্রজাতি। এসব গাছের শিকড় পাহাড়ের মাটির বুনট ও উপরিস্তরের মাটিকে ধরে রাখতে পারেনা। ফলে দিনে দিনে এক একটি পাহাড় নিজের শরীরে নানান আঘাত সয়ে মুমূর্ষু হয়ে ধ্বসে পড়ছে অল্প বর্ষণেই। বছর বছর পাহাড় ও টিলা ধসের ঘটনা এবং চলমান বন্যা পরিস্থিতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া জরুরি। সতর্ক হওয়া জরুরি।

আশা করি আর কোনো পাহাড়-টিলা দয়ামায়াহীন ভোগ্য বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হবে না। পাহাড় কেটে কেটে গড়ে উঠবে না আর কোনো স্থাপনা, অবকাঠামো বা ঝুঁকিপূর্ণ বসত। পাহাড়ি এলাকার আদিবাসিন্দাদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হবে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান। পাহাড়ের আদিবাসিন্দাসহ কোনো প্রাণপ্রজাতি উদ্বাস্তু হবে না তার আপন পাহাড় থেকে। কোনো পরিবেশ উদ্বাস্তু মানুষও পাহাড়খেকোদের কাটা পাহাড়ে এসে লাশ হবে না আর। মুমূর্ষু টিলা-পাহাড়ের আহাজারি থামানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দেশের আর কোথাও টিলা কী পাহাড় ধসে জানমালের ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি আমরা চাই না। টিলা ও পাহাড় ধস রোধে এখনি সজাগ, সতর্ক ও তৎপর হওয়া জরুরি।

[লেখক : গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ]

back to top