alt

উপ-সম্পাদকীয়

জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে

ফকর উদ্দিন মানিক

: বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২

এই ভ্যাপসা গরমে লোডশেডিং এ অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, এর ফলে দুর্বিষহ জনজীবন। কয়েক দিন ধরে পত্রিকার পাতায় ও টিভি চ্যানেলে দেশের সর্বত্র লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বলছে, গ্যাসসংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নত হতে পারে, সে ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। কিন্তু এর প্রতিকার কি?

২০১১ সাল পর্যন্ত এই দেশে ঘরবাড়িতে বিদ্যুতের অভাবে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকত, লোডশেডিং ছিল নিত্য-নৈমত্তিক ঘটনা। অনেকের কাছে তা ছিল দুঃসহ স্মৃতির মতো। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যে মানুষ লোডশেডিং শব্দটি ভুলেই গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে দেশ আবার লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ছেয়ে গেল কেন? হ্যাঁ, এ ব্যাপারে বিশ্ব পরিস্থিতির দায় আছে, কিন্তু এর বাইরে কি আর কারওর কোন দায় নেই? বলাবাহুল্য, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২২-২৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও চাহিদা মাত্র ১৩-১৪ হাজার মেগাওয়াট। তাই অনেকের প্রশ্ন সক্ষমতা সত্ত্বেও লোডশেডিং কেন?

আসলে দেশে সর্বশেষ হিসাবমতে- ২০০৮-০৯ সালে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও তখন উৎপাদন হতো মাত্র ৪ হাজার মেগাওয়াট অর্থাৎ ঘাটতি থাকত প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ২০২২ সালে এসে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও চাহিদামতো প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করার মতো কাঁচামালের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। ফলে ১-২ ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কারণ, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। এর প্রধান কারণ প্রায় ৮৫% বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস ও তেল নির্ভর বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, ধৈর্য সহকারে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সবাইকে নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র, যাদের অনেক টাকা-পয়সা আছে, তারাও লোডশেডিংয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেনে হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় হচ্ছে, জাপানে হচ্ছে। কোন কোন দেশে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও, ব্যাংকে অর্থ থাকা সত্ত্বেও সংবরণ করছে।

‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি,

আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপভাতি।’

সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিং মানেই হলো বিদ্যুৎ খাতের ‘উন্নয়ন’ দর্শনে বড় রকমের ত্রুটি আছে

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতার মতো-দিনের বেলা প্রদীপ জ্বালানো মানুষকে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের সময় অন্ধকারেই সময় কাটাতে হয়। ঠিক তদ্রুপ সুসময়ে যে জাতি কারণে-অকারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ মৌলিক চাহিদাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সম্পদ মিতব্যয়ী না হয়ে বরং অপচয় সেই জাতির দুঃসময়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। বস্তুত অপব্যয়ই অভাব নিয়ে আসে।

পৃথিবীর অন্যতম সেরা আবিষ্কার বিদ্যুৎ। চোখ বন্ধ করে একবার চিন্তা করে দেখলে বুঝতে পারবেন বিদ্যুৎ ছাড়া কিছুই সম্ভব না, আর সেই মূল্যবান বিদ্যুৎ সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও আমরা অহরহ অপচয় করি। এক ঢাকা শহরে যদি তিন দিন বিদ্যুৎ না থাকে কেমন হবে ভাবুন তো? বিদ্যুৎ না থাকলে লিফট চলবে কি?

জেনারেটর দিয়ে কয় ঘণ্টা বেকআপ দেবেন? শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কমে যাবে, ফলে জিনিসের দাম বেড়ে যাবে, এর ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অনেক পার্থক্য হওয়ায় জীবনযাত্রা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। শুধু কি তা-ই, বিদ্যুৎ না থাকলে অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হলে অর্থনৈতিতে স্থবিরতা দেখা দেবে।

অন্যদিকে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিং মানেই হলো বিদ্যুৎ খাতের ‘উন্নয়ন’ দর্শনে বড় রকমের ত্রুটি আছে বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ ছিল না, এখন বিদ্যুৎ আছে। কত বিদ্যুৎ দরকার, উৎপাদন সক্ষমতা কত বাড়ানো হবে, বিজ্ঞানভিত্তিক এই ‘উন্নয়ন’ দর্শন আমাদের বিদ্যুৎ খাতে অনুপস্থিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে জাতীয় সম্পদের অপচয়। বিশেষ করে অতিমাত্রায় বিদ্যুতের অপচয় লক্ষ করা যায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। যেখানে অযথা লাইট, ফ্যান, এসিসহ বিভিন্ন ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়াও শহর-গ্রাম প্রায় সব বাসা-বাড়িতে অত্যধিক মাত্রায় ও কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনে টিভি, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, হিটার, ইস্ত্রিসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যেগুলো বিদ্যুৎ অপচয়ের জন্য দায়ী।

এ ছাড়া রান্নার কাজের জন্য অতিরিক্ত গ্যাসের ব্যবহার, কাপড় শুকানোর জন্য বৈদ্যুতিক ফ্যানের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, ম্যাচের কাঠি বাচানোর জন্য গ্যাসের চুলা জালিয়ে রাখা, বাসায় ফ্যান, লাইট চালু রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা ও বিয়ে বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা লোডশেডিংয়ের জন্য দায়ী।

প্রায় সারা দেশ এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত। শহর, মফস্বল কিংবা অজপাড়াগাঁ সবখানেই এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সহজলভ্যতার ফলে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে, কারণে বা অকারণে বিদ্যুৎ অপচয় করে, যা আমাদের দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। এখন সবারই উচিত বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা। আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রত্যহ অনেক বিদ্যুৎ অপচয় করে ফেলি। এর সঙ্গে দিনকে দিন বাড়তে থাকা বিভিন্ন প্রযুক্তির পণ্যের ব্যবহার তো আছেই। তাই বলে কি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন না? অবশ্যই করবেন। তবে বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয় না করে বরং মিতব্যয়ী হওয়া উচিত। উন্নয়নশীল দেশ থেক উন্নত দেশ হওয়ার জন্য প্রত্যেক মানুষকে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ হোক বা মনুষ্য সৃষ্ট সম্পদই হোক, প্রতি ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে আমাদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বড় বড় অপচয় ও অব্যবস্থাপনা ছাড়াও আমাদের দিন যাপনে, দৈনন্দিন কাজকর্মে, চলতে-ফিরতে অসতর্কতা-অসচেতনতা ও অজ্ঞতার কারণে আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও কর্মপরিবেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, তেল ব্যবহারে ছোট ছোট অপচয় করে যাচ্ছি। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানো ও কাপড় শুকানোর জন্য বাসাবাড়ির গ্যাসের চুলা অকারণে জ্বালিয়ে রাখার বিষয়টি মা-বোনদের পুরনো অভ্যাস। এই অপচয়ের কারণেই হয়তো ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় এখন গ্যাসসংকট দেখা দেয়। শুধু তা-ই না, অপচয়ে রাজার ভান্ডারও ফুরিয়ে যায় এবং

সব ধর্মে অপচয় কে বর্জন ও মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে- ‘অপচয়কারী শয়তানের ভাই’। তাই জাতির প্রতিটি কণা পরিমাণ সম্পদের যথাযথ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য অপচয়প্রবণতা ত্যাগ করে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় মিতব্যয়ী হতে পারলে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।

সরকারের একার পক্ষে জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সম্পদ ব্যবহারে প্রত্যেকের একটুখানি সচেতনতার কারণে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎই হয়তো একজনের বড় ধরনের কোনো কাজে লাগতে পারে। অতএব, দেশের সুনাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসা এবং নিজে সচেতনতা অবলম্বনপূর্বক অপরজনকে সচেতন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎসহ সব রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমিয়ে দেশের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করি।

[লেখক : সভাপতি, সিএসই অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আইনে হিল্লা বিয়ে বলে কিছু নেই

কয়লা নিয়ে কী ভাবছে সরকার

জ্বালানি তেলের দাম ও কিছু প্রশ্ন

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে

ফকর উদ্দিন মানিক

বুধবার, ২৭ জুলাই ২০২২

এই ভ্যাপসা গরমে লোডশেডিং এ অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, এর ফলে দুর্বিষহ জনজীবন। কয়েক দিন ধরে পত্রিকার পাতায় ও টিভি চ্যানেলে দেশের সর্বত্র লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকার বলছে, গ্যাসসংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উন্নত হতে পারে, সে ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। কিন্তু এর প্রতিকার কি?

২০১১ সাল পর্যন্ত এই দেশে ঘরবাড়িতে বিদ্যুতের অভাবে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকত, লোডশেডিং ছিল নিত্য-নৈমত্তিক ঘটনা। অনেকের কাছে তা ছিল দুঃসহ স্মৃতির মতো। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্যে মানুষ লোডশেডিং শব্দটি ভুলেই গিয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে দেশ আবার লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ছেয়ে গেল কেন? হ্যাঁ, এ ব্যাপারে বিশ্ব পরিস্থিতির দায় আছে, কিন্তু এর বাইরে কি আর কারওর কোন দায় নেই? বলাবাহুল্য, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ২২-২৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও চাহিদা মাত্র ১৩-১৪ হাজার মেগাওয়াট। তাই অনেকের প্রশ্ন সক্ষমতা সত্ত্বেও লোডশেডিং কেন?

আসলে দেশে সর্বশেষ হিসাবমতে- ২০০৮-০৯ সালে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও তখন উৎপাদন হতো মাত্র ৪ হাজার মেগাওয়াট অর্থাৎ ঘাটতি থাকত প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ২০২২ সালে এসে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও চাহিদামতো প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করার মতো কাঁচামালের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। ফলে ১-২ ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কারণ, বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ইউনিট প্রতি উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। এর প্রধান কারণ প্রায় ৮৫% বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস ও তেল নির্ভর বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, ধৈর্য সহকারে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সবাইকে নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র, যাদের অনেক টাকা-পয়সা আছে, তারাও লোডশেডিংয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেনে হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় হচ্ছে, জাপানে হচ্ছে। কোন কোন দেশে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও, ব্যাংকে অর্থ থাকা সত্ত্বেও সংবরণ করছে।

‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি,

আশু গৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপভাতি।’

সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিং মানেই হলো বিদ্যুৎ খাতের ‘উন্নয়ন’ দর্শনে বড় রকমের ত্রুটি আছে

কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের কবিতার মতো-দিনের বেলা প্রদীপ জ্বালানো মানুষকে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের সময় অন্ধকারেই সময় কাটাতে হয়। ঠিক তদ্রুপ সুসময়ে যে জাতি কারণে-অকারণে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ মৌলিক চাহিদাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় সম্পদ মিতব্যয়ী না হয়ে বরং অপচয় সেই জাতির দুঃসময়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। বস্তুত অপব্যয়ই অভাব নিয়ে আসে।

পৃথিবীর অন্যতম সেরা আবিষ্কার বিদ্যুৎ। চোখ বন্ধ করে একবার চিন্তা করে দেখলে বুঝতে পারবেন বিদ্যুৎ ছাড়া কিছুই সম্ভব না, আর সেই মূল্যবান বিদ্যুৎ সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও আমরা অহরহ অপচয় করি। এক ঢাকা শহরে যদি তিন দিন বিদ্যুৎ না থাকে কেমন হবে ভাবুন তো? বিদ্যুৎ না থাকলে লিফট চলবে কি?

জেনারেটর দিয়ে কয় ঘণ্টা বেকআপ দেবেন? শুধু তা-ই নয়, বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন কমে যাবে, ফলে জিনিসের দাম বেড়ে যাবে, এর ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অনেক পার্থক্য হওয়ায় জীবনযাত্রা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। শুধু কি তা-ই, বিদ্যুৎ না থাকলে অনলাইনভিত্তিক ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ হলে অর্থনৈতিতে স্থবিরতা দেখা দেবে।

অন্যদিকে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লোডশেডিং মানেই হলো বিদ্যুৎ খাতের ‘উন্নয়ন’ দর্শনে বড় রকমের ত্রুটি আছে বলে মত দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ ছিল না, এখন বিদ্যুৎ আছে। কত বিদ্যুৎ দরকার, উৎপাদন সক্ষমতা কত বাড়ানো হবে, বিজ্ঞানভিত্তিক এই ‘উন্নয়ন’ দর্শন আমাদের বিদ্যুৎ খাতে অনুপস্থিত বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে জাতীয় সম্পদের অপচয়। বিশেষ করে অতিমাত্রায় বিদ্যুতের অপচয় লক্ষ করা যায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। যেখানে অযথা লাইট, ফ্যান, এসিসহ বিভিন্ন ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে থাকে। এ ছাড়াও শহর-গ্রাম প্রায় সব বাসা-বাড়িতে অত্যধিক মাত্রায় ও কিছু ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনে টিভি, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, হিটার, ইস্ত্রিসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যেগুলো বিদ্যুৎ অপচয়ের জন্য দায়ী।

এ ছাড়া রান্নার কাজের জন্য অতিরিক্ত গ্যাসের ব্যবহার, কাপড় শুকানোর জন্য বৈদ্যুতিক ফ্যানের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, ম্যাচের কাঠি বাচানোর জন্য গ্যাসের চুলা জালিয়ে রাখা, বাসায় ফ্যান, লাইট চালু রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা ও বিয়ে বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা লোডশেডিংয়ের জন্য দায়ী।

প্রায় সারা দেশ এখন বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত। শহর, মফস্বল কিংবা অজপাড়াগাঁ সবখানেই এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সহজলভ্যতার ফলে অনেকেই বিভিন্ন সময়ে, কারণে বা অকারণে বিদ্যুৎ অপচয় করে, যা আমাদের দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর। এখন সবারই উচিত বিদ্যুৎ অপচয় রোধ করা। আমরা নিজেদের অজান্তেই প্রত্যহ অনেক বিদ্যুৎ অপচয় করে ফেলি। এর সঙ্গে দিনকে দিন বাড়তে থাকা বিভিন্ন প্রযুক্তির পণ্যের ব্যবহার তো আছেই। তাই বলে কি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন না? অবশ্যই করবেন। তবে বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয় না করে বরং মিতব্যয়ী হওয়া উচিত। উন্নয়নশীল দেশ থেক উন্নত দেশ হওয়ার জন্য প্রত্যেক মানুষকে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ হোক বা মনুষ্য সৃষ্ট সম্পদই হোক, প্রতি ক্ষেত্রে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে আমাদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বড় বড় অপচয় ও অব্যবস্থাপনা ছাড়াও আমাদের দিন যাপনে, দৈনন্দিন কাজকর্মে, চলতে-ফিরতে অসতর্কতা-অসচেতনতা ও অজ্ঞতার কারণে আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও কর্মপরিবেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, তেল ব্যবহারে ছোট ছোট অপচয় করে যাচ্ছি। দিয়াশলাইয়ের কাঠি বাঁচানো ও কাপড় শুকানোর জন্য বাসাবাড়ির গ্যাসের চুলা অকারণে জ্বালিয়ে রাখার বিষয়টি মা-বোনদের পুরনো অভ্যাস। এই অপচয়ের কারণেই হয়তো ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় এখন গ্যাসসংকট দেখা দেয়। শুধু তা-ই না, অপচয়ে রাজার ভান্ডারও ফুরিয়ে যায় এবং

সব ধর্মে অপচয় কে বর্জন ও মিতব্যয়িতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে- ‘অপচয়কারী শয়তানের ভাই’। তাই জাতির প্রতিটি কণা পরিমাণ সম্পদের যথাযথ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতের জন্য অপচয়প্রবণতা ত্যাগ করে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় মিতব্যয়ী হতে পারলে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।

সরকারের একার পক্ষে জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সম্পদ ব্যবহারে প্রত্যেকের একটুখানি সচেতনতার কারণে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎই হয়তো একজনের বড় ধরনের কোনো কাজে লাগতে পারে। অতএব, দেশের সুনাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসা এবং নিজে সচেতনতা অবলম্বনপূর্বক অপরজনকে সচেতন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎসহ সব রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমিয়ে দেশের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করি।

[লেখক : সভাপতি, সিএসই অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

back to top