alt

উপ-সম্পাদকীয়

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

জয়তী ঘোষ

: বুধবার, ০৩ আগস্ট ২০২২

সঞ্জনা মুদালিগে। কাজ করতেন শ্রীলঙ্কার রাজধানীর কলম্বোর একটি বিপণিকেন্দ্রে। বিক্রয়কর্মী হিসেবে। অর্থনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরিতে তার বেতন কমিয়ে অর্ধেক করে দেয়া হয়। কিন্তু তার আগেই জানুয়ারিতে নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে গয়না বন্ধক রাখতে হয় তার। পরেও চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়। কেননা ওই বেতনে তার যাতায়াতের খরচটাও হচ্ছিল না। সেই সময় রান্নায় গ্যাসের বদলে তুলে নিতে হয় লাকড়ি। খাবার জোটে আগে যা খেতেন তার চারভাগের একভাগ। তার এই গল্প উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায়। তবে এই চিত্র শুধু তার একার নয়। বরং শ্রীলঙ্কার বহু পরিবারের, যাদের ছেলেমেয়েরা ক্ষুধার্ত দিন পার করছে, বয়স্ক স্বজনেরা কষ্ট পাচ্ছে ওষুধের অভাবে।

তবে সেখানেকার এই দুর্দশার চিত্র বিশ্বের নজরের আসে গত মাসের শুরুতে, যখন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনবিক্ষোভ শুরু হয়। শ্রীলঙ্কানরা একে বলেন আরাগালয় বা সংগ্রাম। অহিংস সেই জনবিক্ষোভের মুখে রাজাপাকসের পতন ঘটে। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের পরিবার শ্রীলঙ্কাকে শক্ত হাতে শাসন করে আসছিল। অবশ্যই তা নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। কিন্তু দেশটির চলমান ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্য দেশে বিদেশের গণমাধ্যম ওই পরিবারটাকেই দায়ী করে।

শুধু রাজাপাকসে পরিবারকে দোষারোপ খুবই সহজ। যদিও নিশ্চিতভাবেই তারা যে আগ্রাসী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ কায়েম করেছিলেন, সেই সঙ্গে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে তারা যেসব ঝামেলা তৈরি করেছিলেন, বিশেষ করে মারাত্মক হারে কর হ্রাস এবং সার আমদানির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেগুলো চলমান অর্থনৈতিক সংকটের বড় কারণ, তবুও তা পুরো ঘটনার অংশ মাত্র। মূলধারার গণমাধ্যমে ভাষ্যকারেরা সে কথা বলছেনই না। কেননা তাতে বিশ্ব অর্থনীতি কীভাবে চলে, তার গোমর ফাঁস হয়ে যাবে।

তবে এই সংকট শুধু কিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ উপাদানের কারণে তৈরি হয়নি, কয়েক দশক ধরেই, তা পাকিয়ে উঠেছে। সত্তরের দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি চালু হওয়ার সময় থেকেই, শ্রীলঙ্কাকে নব্য উদারনৈতিক সংস্কারের দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির করা হচ্ছিল। অনেকটা দক্ষিণ আমেরিকার চিলির মতোই। এর পেছনে সেই সুপরিচিতি অর্থনৈতিক কৌশলের প্রয়োগ ঘটানো হয়- বিদেশি ঋণপ্রবাহ-পুষ্ট রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যাকে উৎসাহ জুুগিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও দাভোস গোষ্ঠী। কিন্তু এর ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রায় ঋণ বাড়তে থাকে শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনীতিগুলোর।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সুদের হার কমিয়ে দেয়াতে সস্তায় ঋণসুবিধা পাওয়া গেল। শ্রীলঙ্কা তখন নিজের ব্যয় মেটাতে বিদেশি সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিল (সরকারি বন্ড বা ঋণপত্রের মাধ্যমে)। ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাদের ঋণের অনুপাত দ্বিগুণ বেড়ে ৮০ শতাংশ হলো, যার একটি বড় অংশ ছিল ওই ঋণপত্রের মাধ্যমে। রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো আয়ের তুলনায় গৃহীত ঋণের পরিশোধ্যের পরিমাণ বাড়তে লাগলো তাদের। এবার মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় গেল পড়ে; পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হলো দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায়। বৈদেশিক বিনিময় হার হ্রাস পেল। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে না পারলেও সরকারকে ঠিকই বিদেশি সুদের টাকা পরিশোধ করে যেতে হচ্ছিল।

এই আলোকে দেখলে এটা পরিষ্কার যে শ্রীলঙ্কা একা নয়। বরং, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে যে ঝড় ধেয়ে আসছে, শ্রীলঙ্কাতে তার শুরুটা দেখা গেছে মাত্র। এর আগে উন্নত দেশগুলোতে যখন সুদের হার কম ছিল, তখন শ্রীলঙ্কার মতো উদীয়মান বা প্রান্তস্থ অর্থনীতির দেশগুলোতে ঋণের বাড়তি প্রবাহ তৈরি হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো একে উৎসাহ দিলেও প্রক্রিয়াটি ছিল সমস্যাজনক, যা নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোকে সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এবং এই দেশগুলোই কিন্তু মহামারিতে বেশি ধরাশায়ী হয়েছে।

উন্নত দেশগুলোর সামর্থ্য ছিল অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার। মহামারির সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেতন দেয়া বন্ধ হয়নি যুক্তরাজ্যে। আর্থিক খাতের সামর্থ্যরে কারণে তারা তা করতে পেরেছে। অন্যান্য সুবিধাও তাদের ছিল। অন্যদিকে, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর আর্থিক ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ ছিল না। কারণ ওই একই আর্থিক খাত। এসব দেশে সরকারের ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় চোখ রাঙাতে থাকে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ও পুঁজি পাচারের আতঙ্ক। সেইসঙ্গে তাদের রপ্তানি ও পর্যটন খাতে ধস নামে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের সমস্যার কারণে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ফলে তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ ছিল না। সবমিলিয়ে অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়ে যায়। মহামারী প্রথমার্ধে ঋণপরিশোধের ক্ষেত্রে যে ছাড় দেয়া হয়, তাতে সমস্যা কাটেনি, তা কিছু সময়ের জন্য স্থগিত হয়েছিল মাত্র। ঋণকাঠামোর কোন কার্যকর পুনর্গঠনও করা হয়নি। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) দুঃখ প্রকাশ করে গেছে শুধু, কিন্তু বলতে গেলে কিছুই তারা করেনি। বরংতারা এবং বিশ্বব্যাংক ঋণ পরিশোধে বারবার শক্ত চাপ দিয়ে সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে আইএমএফের চাপ ছিল অত্যধিক।

আইএমএফের যে স্পেশাল ড্রইং রাইটস (এসডিআর) বা কোন দেশের রিজার্ভ সংকটে দেয়ার জন্য যে তহবিল আছে, সেখান থেকে যাদের এই মুহূর্তে এই সহায়তা খুব দরকার তাদের জন্য বরাদ্দ করা গুরুত্বপূর্ণ

এদিকে শিল্পোন্নত দেশের জোট জি৭ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সমস্যার আকার এবং তা সৃষ্টিতে তাদের যে ভূমিকা সেই বিচারে তারা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। কঠিন সত্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা কখনোই অপেক্ষাকৃত অনুনন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে বিনিয়োগ করতে চান না, সেই দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। মুক্তবাজারে ঋণদানের সময় ঋণ প্রদানের সম্ভাব্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময়ই এই দিকগুলোকে বড় করে দেখে। এর মানে হচ্ছে, এই সংকট আরও বিস্তৃত হবে। এটি শুধু ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে, তা-ই নয়, এর ফলে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য ঋণপরিশোধ করা দুঃসাধ্য করে তুলবে। লেবানন, সুরিনাম ও জাম্বিয়া এর মধ্যেই ঋণ শোধে ব্যর্থ হয়ে গেছে। বেলারুশে রয়েছে একদম কিনারায়। ঋণ নিয়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে মিসর, ঘানা ও তিউনিশিয়ায়। স্বল্প মাথাপিছু আয় এবং চরম দরিদ্র অনেক দেশই এখন মন্দাবস্থায় নিপতিত হয়েছে। শত শত কোটি মানুষ এখন বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম পুষ্টি জোগাতে পারছে না। স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তাই বস্তুগত অনিরাপত্তা ও সামাজিক উত্তেজনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সেসব দেশে।

এই পরিস্থিতি এখনো সামলানোর সুযোগ আছে। কিন্তু তার জন্য খুব জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ও শিল্পোন্নত দেশসমূহের। পাশাপাশি যেভাবে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো ঋণের পরিশোধের পরিমাণ কমানো এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যে অতিরিক্ত প্রদেয় ছিল, তা কমিয়েছে, সেভাবে অন্যান্য উৎস যেমন চীন, যাদের কাছ থেকে এই সব সংকটাপন্ন দেশ ঋণ নিয়েছে, তাদের সঙ্গে খুব দ্রুত ও পদ্ধতিগতভাবে ঋণের পরিশোধ্য পরিমাণ কমানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া এসব দেশে ফটকাবা মজুতদারি নিয়ন্ত্রণে আইন থাকা দরকার। সবশেষে আইএমএফের যে স্পেশাল ড্রইং রাইটস (এসডিআর) বা কোন দেশের রিজার্ভ সংকটে দেয়ার জন্য যে তহবিল আছে, সেখান থেকে যাদের এই মুহূর্তে এই সহায়তা খুব দরকার তাদের জন্য বরাদ্দ করা গুরুত্বপূর্ণ। ন্যূনতম এই পদক্ষেপগুলো যদি না নেয়া হয়, তাহলে কোভিড মহামারী-উত্তর এই সময়ে, ইউক্রেন যুদ্ধের অব্যবহিত এই বিশ্বে অনেক দেশই দেউলিয়াত্বের কবলে পড়বে, দারিদ্র্য ও সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

[লেখক : ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক]

(সম্প্রতি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক)

যুবসমাজ : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

ছবি

বাংলা সিনেমার সুদিন কি ফিরছে

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

জয়তী ঘোষ

বুধবার, ০৩ আগস্ট ২০২২

সঞ্জনা মুদালিগে। কাজ করতেন শ্রীলঙ্কার রাজধানীর কলম্বোর একটি বিপণিকেন্দ্রে। বিক্রয়কর্মী হিসেবে। অর্থনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরিতে তার বেতন কমিয়ে অর্ধেক করে দেয়া হয়। কিন্তু তার আগেই জানুয়ারিতে নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতে গয়না বন্ধক রাখতে হয় তার। পরেও চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়। কেননা ওই বেতনে তার যাতায়াতের খরচটাও হচ্ছিল না। সেই সময় রান্নায় গ্যাসের বদলে তুলে নিতে হয় লাকড়ি। খাবার জোটে আগে যা খেতেন তার চারভাগের একভাগ। তার এই গল্প উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায়। তবে এই চিত্র শুধু তার একার নয়। বরং শ্রীলঙ্কার বহু পরিবারের, যাদের ছেলেমেয়েরা ক্ষুধার্ত দিন পার করছে, বয়স্ক স্বজনেরা কষ্ট পাচ্ছে ওষুধের অভাবে।

তবে সেখানেকার এই দুর্দশার চিত্র বিশ্বের নজরের আসে গত মাসের শুরুতে, যখন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনবিক্ষোভ শুরু হয়। শ্রীলঙ্কানরা একে বলেন আরাগালয় বা সংগ্রাম। অহিংস সেই জনবিক্ষোভের মুখে রাজাপাকসের পতন ঘটে। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের পরিবার শ্রীলঙ্কাকে শক্ত হাতে শাসন করে আসছিল। অবশ্যই তা নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। কিন্তু দেশটির চলমান ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার জন্য দেশে বিদেশের গণমাধ্যম ওই পরিবারটাকেই দায়ী করে।

শুধু রাজাপাকসে পরিবারকে দোষারোপ খুবই সহজ। যদিও নিশ্চিতভাবেই তারা যে আগ্রাসী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ কায়েম করেছিলেন, সেই সঙ্গে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে তারা যেসব ঝামেলা তৈরি করেছিলেন, বিশেষ করে মারাত্মক হারে কর হ্রাস এবং সার আমদানির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেগুলো চলমান অর্থনৈতিক সংকটের বড় কারণ, তবুও তা পুরো ঘটনার অংশ মাত্র। মূলধারার গণমাধ্যমে ভাষ্যকারেরা সে কথা বলছেনই না। কেননা তাতে বিশ্ব অর্থনীতি কীভাবে চলে, তার গোমর ফাঁস হয়ে যাবে।

তবে এই সংকট শুধু কিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ উপাদানের কারণে তৈরি হয়নি, কয়েক দশক ধরেই, তা পাকিয়ে উঠেছে। সত্তরের দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতি চালু হওয়ার সময় থেকেই, শ্রীলঙ্কাকে নব্য উদারনৈতিক সংস্কারের দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির করা হচ্ছিল। অনেকটা দক্ষিণ আমেরিকার চিলির মতোই। এর পেছনে সেই সুপরিচিতি অর্থনৈতিক কৌশলের প্রয়োগ ঘটানো হয়- বিদেশি ঋণপ্রবাহ-পুষ্ট রপ্তানিনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যাকে উৎসাহ জুুগিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও দাভোস গোষ্ঠী। কিন্তু এর ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রায় ঋণ বাড়তে থাকে শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনীতিগুলোর।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর, উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে সুদের হার কমিয়ে দেয়াতে সস্তায় ঋণসুবিধা পাওয়া গেল। শ্রীলঙ্কা তখন নিজের ব্যয় মেটাতে বিদেশি সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিল (সরকারি বন্ড বা ঋণপত্রের মাধ্যমে)। ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাদের ঋণের অনুপাত দ্বিগুণ বেড়ে ৮০ শতাংশ হলো, যার একটি বড় অংশ ছিল ওই ঋণপত্রের মাধ্যমে। রপ্তানি ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো আয়ের তুলনায় গৃহীত ঋণের পরিশোধ্যের পরিমাণ বাড়তে লাগলো তাদের। এবার মহামারি ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় গেল পড়ে; পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হলো দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায়। বৈদেশিক বিনিময় হার হ্রাস পেল। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করতে না পারলেও সরকারকে ঠিকই বিদেশি সুদের টাকা পরিশোধ করে যেতে হচ্ছিল।

এই আলোকে দেখলে এটা পরিষ্কার যে শ্রীলঙ্কা একা নয়। বরং, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে যে ঝড় ধেয়ে আসছে, শ্রীলঙ্কাতে তার শুরুটা দেখা গেছে মাত্র। এর আগে উন্নত দেশগুলোতে যখন সুদের হার কম ছিল, তখন শ্রীলঙ্কার মতো উদীয়মান বা প্রান্তস্থ অর্থনীতির দেশগুলোতে ঋণের বাড়তি প্রবাহ তৈরি হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো একে উৎসাহ দিলেও প্রক্রিয়াটি ছিল সমস্যাজনক, যা নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোকে সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এবং এই দেশগুলোই কিন্তু মহামারিতে বেশি ধরাশায়ী হয়েছে।

উন্নত দেশগুলোর সামর্থ্য ছিল অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার। মহামারির সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেতন দেয়া বন্ধ হয়নি যুক্তরাজ্যে। আর্থিক খাতের সামর্থ্যরে কারণে তারা তা করতে পেরেছে। অন্যান্য সুবিধাও তাদের ছিল। অন্যদিকে, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর আর্থিক ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ ছিল না। কারণ ওই একই আর্থিক খাত। এসব দেশে সরকারের ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় চোখ রাঙাতে থাকে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ও পুঁজি পাচারের আতঙ্ক। সেইসঙ্গে তাদের রপ্তানি ও পর্যটন খাতে ধস নামে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের সমস্যার কারণে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ফলে তাদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ ছিল না। সবমিলিয়ে অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়ে যায়। মহামারী প্রথমার্ধে ঋণপরিশোধের ক্ষেত্রে যে ছাড় দেয়া হয়, তাতে সমস্যা কাটেনি, তা কিছু সময়ের জন্য স্থগিত হয়েছিল মাত্র। ঋণকাঠামোর কোন কার্যকর পুনর্গঠনও করা হয়নি। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি নিয়ে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) দুঃখ প্রকাশ করে গেছে শুধু, কিন্তু বলতে গেলে কিছুই তারা করেনি। বরংতারা এবং বিশ্বব্যাংক ঋণ পরিশোধে বারবার শক্ত চাপ দিয়ে সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে আইএমএফের চাপ ছিল অত্যধিক।

আইএমএফের যে স্পেশাল ড্রইং রাইটস (এসডিআর) বা কোন দেশের রিজার্ভ সংকটে দেয়ার জন্য যে তহবিল আছে, সেখান থেকে যাদের এই মুহূর্তে এই সহায়তা খুব দরকার তাদের জন্য বরাদ্দ করা গুরুত্বপূর্ণ

এদিকে শিল্পোন্নত দেশের জোট জি৭ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সমস্যার আকার এবং তা সৃষ্টিতে তাদের যে ভূমিকা সেই বিচারে তারা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। কঠিন সত্য হচ্ছে বিনিয়োগকারীরা কখনোই অপেক্ষাকৃত অনুনন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে বিনিয়োগ করতে চান না, সেই দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন। মুক্তবাজারে ঋণদানের সময় ঋণ প্রদানের সম্ভাব্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময়ই এই দিকগুলোকে বড় করে দেখে। এর মানে হচ্ছে, এই সংকট আরও বিস্তৃত হবে। এটি শুধু ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিগুলোর ওপর প্রভাব ফেলবে, তা-ই নয়, এর ফলে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য ঋণপরিশোধ করা দুঃসাধ্য করে তুলবে। লেবানন, সুরিনাম ও জাম্বিয়া এর মধ্যেই ঋণ শোধে ব্যর্থ হয়ে গেছে। বেলারুশে রয়েছে একদম কিনারায়। ঋণ নিয়ে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে মিসর, ঘানা ও তিউনিশিয়ায়। স্বল্প মাথাপিছু আয় এবং চরম দরিদ্র অনেক দেশই এখন মন্দাবস্থায় নিপতিত হয়েছে। শত শত কোটি মানুষ এখন বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম পুষ্টি জোগাতে পারছে না। স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। তাই বস্তুগত অনিরাপত্তা ও সামাজিক উত্তেজনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সেসব দেশে।

এই পরিস্থিতি এখনো সামলানোর সুযোগ আছে। কিন্তু তার জন্য খুব জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা ও শিল্পোন্নত দেশসমূহের। পাশাপাশি যেভাবে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো ঋণের পরিশোধের পরিমাণ কমানো এবং সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যে অতিরিক্ত প্রদেয় ছিল, তা কমিয়েছে, সেভাবে অন্যান্য উৎস যেমন চীন, যাদের কাছ থেকে এই সব সংকটাপন্ন দেশ ঋণ নিয়েছে, তাদের সঙ্গে খুব দ্রুত ও পদ্ধতিগতভাবে ঋণের পরিশোধ্য পরিমাণ কমানোর জন্য উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া এসব দেশে ফটকাবা মজুতদারি নিয়ন্ত্রণে আইন থাকা দরকার। সবশেষে আইএমএফের যে স্পেশাল ড্রইং রাইটস (এসডিআর) বা কোন দেশের রিজার্ভ সংকটে দেয়ার জন্য যে তহবিল আছে, সেখান থেকে যাদের এই মুহূর্তে এই সহায়তা খুব দরকার তাদের জন্য বরাদ্দ করা গুরুত্বপূর্ণ। ন্যূনতম এই পদক্ষেপগুলো যদি না নেয়া হয়, তাহলে কোভিড মহামারী-উত্তর এই সময়ে, ইউক্রেন যুদ্ধের অব্যবহিত এই বিশ্বে অনেক দেশই দেউলিয়াত্বের কবলে পড়বে, দারিদ্র্য ও সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।

[লেখক : ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক]

(সম্প্রতি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক)

back to top