alt

উপ-সম্পাদকীয়

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

গৌতম রায়

: শুক্রবার, ০৫ আগস্ট ২০২২

শুভ্রা ঘোড়ুই সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের একজন মেয়ে। সেভাবে কোন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তিনি যুক্ত, এমনটা এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি। শুভ্রা নিজের কোন অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে এসেছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি হাসপাতালে। সেখানে দেখেন, পশ্চিমবঙ্গের বরখাস্ত মন্ত্রী, ভয়াবহ আর্থিক তছরুপের দায় অভিযুক্ত পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে, ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরের পক্ষ থেকে হেফাজতে নেয়া অবস্থায়, ডাক্তার পরীক্ষার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। শুভ্রা কোন দিকে কোন কিছু চিন্তা না করে, নিজের পায়ের চটি খুলে, সদ্য সাবেক মন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন। শুভ্রার ছোড়া চটিটি পার্থবাবুর গায়ে না লাগলেও যে গাড়িতে করে তাকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল, সেই গাড়িতে লেগেছে। তারপর সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে শুভ্রা বলেছেন; চটি ছুড়ব না তো কি ফুলের মালা ছুড়ব?

শুভ্রার এই ঘটনা এই, সাহসিকতা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন শাসকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সর্বাত্মক বহিঃপ্রকাশ। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা ইস্তক গোটা তৃণমূল কংগ্রেস দলটির প্রায় সব স্তরের নেতা, কর্মী, সমর্থকেরা আর্থিক কেলেঙ্কারি, নয় তো ক্ষমতার কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সারদা-নারদা রোজভ্যালি ইত্যাদি নানা ধরনের কেলেঙ্কারির কথা বারবার উঠে এসেছে। সাধারণ মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় তৃণমূল কংগ্রেসদের নেতা-মন্ত্রীদের তোয়ালে মুড়ে টাকা ঘুষ নিতে দেখেছেন।

তারপরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার ভোটে জিতেছে। লোকসভার ভোটে ও তার দল কেন্দ্রের শাসক বিজেপির থেকে ভালো ফল করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন ভোট প্রক্রিয়ার মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই যে জয়, এ গুলি আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনরকমভাবে অভিযুক্ত করছে না। মনে হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দান-খয়রাতের উন্নয়ন সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত মোহিত করে রেখেছে।

মমতা এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো; যেমন ২০১১ এ, তেমনিই ২০১৬ তে, ঠিক তেমনি ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেতার নেপথ্য কারিগর ছিল আরএসএস। নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি সেভাবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতিতে পেরে উঠতে পারছে না। সেই কারণেই নিজেদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং বিভাজনের রাজনীতির অত্যন্ত বেশি রকমের সহায়ক শক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের গত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে নেপথ্যে থেকে জেতবার ব্যবস্থা আরএসএস শেষ করে দিয়েছে।

বামপন্থীরা এই সময়কালে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে মমতার প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার যোগসূত্র ঘিরে সোচ্চার হয়েও আরএসএসের নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝিয়ে উঠতে পারেননি। বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে বামপন্থী রাজনীতির গতিপ্রকৃতির যে ধারা ছিল, সেই ধারাটি বামপন্থী রাজনীতির ব্যাটন মোহম্মদ সেলিম ধরবার পরে, অতি দ্রুততার সঙ্গে বদলাতে শুরু করেছে, তা এই শুভ্রা ঘোড়ইয়ের এই প্রকাশ্য প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারা যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষ শুধু কাগুজে প্রতিবাদ নয়, প্রতিবাদকে প্রতিরোধের সংকল্পে দৃঢ় করে, শাসকের বিরুদ্ধে সংগটিত হওয়ার প্রশ্নে একটা উপযুক্ত নেতৃত্ব চাইছিল। আর সেই নেতৃত্ব যে তারা খুঁজে পেয়েছে মোহাম্মদ সেলিমের মতো সর্বাত্মক ডায়নামিক একজন নেতার মধ্যে, তা আজ শুভ্রা ঘোড়ইয়ের মতো অতি সাধারণ একজন বাঙালি গৃহবধূর আচরণের ভেতর দিয়েই খুব পরিষ্কার।

বাঙালি গৃহবধূ শুধু নয়, গোটা বাঙালি নারী সমাজের মেরুদন্ডকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিনে নিতে চেয়েছিল সরকারি কোষাগার থেকে সামান্য দান ধ্যান করে। মাত্র ৫০০ টাকা করে বাঙালি মেয়েদের উপঢৌকনের আড়ালে নিজের দলের প্রতি আনুগত্য কিনে নিতে চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের ভেতর দিয়ে। এই ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পটি ঘিরে ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বৃহৎ পুঁজির মালিকানাধীন একাংশের সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত প্রশংসায় মুখর ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনবাদী রাজনীতি ঘিরে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই তথাকথিত জনবাদি রাজনীতিকে পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি হিসেবে যদি কেউ অভিহিত করতেন, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং অতিবাম রাজনীতি করা মানুষজন, যারা প্রকারান্তরে মমতার রাজনীতিকে বিজেপিকে ঠেকানোর উপায় হিসেবে মনে করেন, তারা প্রবল সমালোচনা করতেন। দুই হাত তুলে তারা সমর্থন করতেন মমতার তথাকথিত জনবাদী রাজনীতিকে। এই জনবাদী রাজনীতি নাকি নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ-এমনটাই তথাকথিত প্রগতিশীল শিবিরের একটা অংশের মধ্যে থেকে শিবা কীর্তনের মতো গেয়ে যাওয়া হতো।

আজ যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ আস্থাভাজন মন্ত্রী তথা দলীয় সতীর্থ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ভয়াবহ আর্থিক দুর্নীতির কথা প্রকাশ্যে এসেছে, মমতা বাধ্য হয়েছেন তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিয়ে দলীয় পদ থেকে বাদ দিয়ে গোটা ব্যাপারটি থেকে নিজেকে বা তার দলকে বাঁচিয়ে রাখতে, তখনই কিন্তু একের পর এক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর গুলির নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতির বিষয় সরাসরি আদালতের আঙিনায় চলে এসেছে। সেই সব দুর্নীতির ঘিরে আদালত অনুসন্ধানে নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই অনুসন্ধান পর্ব আটকানোর তাগিদেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সাধারণ নাগরিকদের করের টাকাতে একের পর এক উচ্চ আদালতে যাচ্ছেন।

এই রকম একটি অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের একদিকে সীমাহীন সম্প্রদায়িক অভিপ্রায়, অন্যদিকে বলগাহীন অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি-এসবের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ভেতরের জাগ্রত বিবেককে শাসকের অপদার্থতা ঘিরে একেবারে আগ্নেয়গিরির স্ফুলিঙ্গে পরিণত করেছেন। তাই বাঙালি নারী সমাজকে ৫০০ টাকা করে কার্যত ঘুষ দিয়ে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিনে নিতে চেয়েছিলেন, সেই নারী সমাজেরই প্রতিনিধি শুভ্রা ঘোড়ই আজ মমতার অতি ঘনিষ্ঠ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দিকে চটি সুরে নিজের ক্ষোভ প্রকাশের হিম্মত দেখাতে পেরেছেন। আর এই হিম্মত শুভৃরা ঘোড়ইদের অর্জন করবার শক্তি শিখিয়েছেন মোহাম্মদ সেলিম।

বিগত গত ১১ বছর ধরে মমতা সরকারের নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘিরে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ, চিটফান্ডে সর্বশ্বান্ত হয়ে যাওয়া, মানুষের যে ক্ষোভ সেগুলোকে দানা বাঁধিয়ে হাজারোটা শুভ্রা ঘোড়ই তৈরি করতে একদা বামফ্রন্ট না পারলেও, আজ কিন্তু যোগ্যতম নেতৃত্বের দৌলতে এই জায়গাটা প্রতিষ্ঠিত করতে তারা সক্ষম হয়েছেন।

আর তথাকথিত জনবাদী রাজনীতির স্বরূপটি যে কি, তা শুভ্রা ঘোড়ইয়ের আচরণের ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষকে পরিষ্কার করে দেখতে পেয়েছেন। উন্নয়নের নাম করে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে সাধারণ মানুষকে পাইয়ে দেয়ার রাজনীতির ভিত্তিতে, তাদের রুটিরুজি প্রশ্নটিকে ভুলিয়ে দিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষ কি চোখে দেখছেন, তা শুভ্রা দেবীর আচরণের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে।

সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির এই ছলনার বিষয়টিকে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু বিরোধী নেতৃত্বের শক্ত বুনিয়াদের অভাবে সাধারণ মানুষ তাদের সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ প্রকাশে কিছুটা ভীত ছিলেন। আর সেই কারণেই ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। প্রতিবাদ করলে তাদের অবস্থা হবে সারের দাম ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা শিলাদিত্যের মতো। তাই তারা প্রতিবাদের প্রশ্নটিকে প্রতিরোধের সংকল্পে এতকাল দৃঢ় করেছেন। আর এখন সেই প্রতিবাদকে প্রতিরোধে পর্যবসিত করবার সাহস যখন সেলিমের মতো মানুষ নেতৃত্বে এসে সর্বস্তরের জনগণকে জোগাতে শুরু করেছেন, তখনই কিন্তু শুভ্রা ঘোড়ইরা আর নিজেদের রাগ ঘৃণা কে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননি। তাই তারা পার্থ চট্টোপাধ্যায় কে এসি গাড়ি থেকে নামিয়ে সরকারি কর্মীদের দিয়ে হুইলচেয়ারে করে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন; কেন একজন দাগি অপরাধীর জন্য সরকারের এত টাকা খরচ করা হচ্ছে ?

এই যে সাহসের পরিচয় আজ একা শুভ্রাঘোড়ই দিয়েছেন, কাল তা হাজারটা শুভ্রা ঘোড়ই দেবেন। ৫০০ টাকা করে ঘুষ দিয়ে প্রীতিলতা ওয়াদেদার, কল্পনা জোশিদের উত্তরসূরীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনই চিরদিনের মতো যে কিনে নিতে পারেননি, সেটা শুভ্রা প্রমাণ করে দিয়েছেন। তাই যথার্থই হয়ে উঠেছে মোহাম্মদ সেলিমের এই স্লোগান; দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে?

এই স্লোগান যেন আইয়ুব বিরোধী গণ আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক স্লোগান, ‘আইয়ুব খানের হাতে হারিকেন পোঁদে বাশে’র সেই পর্যায়ের একটি স্লোগান, যা এক দিন টলিয়ে দিয়েছিল আইয়ুব খানের তানাসাহিকে। তাই আগামীতে মোহাম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে এই স্লোগানই টলিয়ে দেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তানাশাহিকে। আর মমতা নবীন পট্টনায়েক... এদের মতো মানুষরা যত শক্তিহীন হবেন, ততই ভারতের সংখ্যাগুরু আধিপত্যবাদী আরএসএস বিজেপিরা, রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে সরতে শুরু করবেন।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

সামাজিক সংঘের ভূমিকা

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ

আলোর ভেতর যত কালো

বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন

সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ও যুদ্ধবিরোধিতার গুরুত্ব

পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি : কৃষিপণ্যে প্রভাব

সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ইসি কতটা সক্ষম

ছবি

সোশ্যাল মিডিয়া কি একাকিত্ব ও অহংবোধ বাড়িয়ে দিচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

আদিবাসী বিতর্ক

অনগ্রসর আদিবাসী জাতি

সাক্ষরতা ও শিক্ষা

সম্প্রীতির বাঁধন কি আলগা হয়ে আসছে?

অর্থনৈতিক সংকট : মুক্তি কোন পথে

গাড়িতে চাই শিশু আসন

ডলার সংকটের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের উপায়

ছবি

পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার

বিশ্ব মন্দায় বাংলাদেশের শক্তি

টেকসই উন্নয়নে সাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি

ছবি

ডলার সংকটের শেষ কোথায়?

পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধ

মানব পাচারে প্রযুক্তির অপব্যবহার

ছবি

বাংলাদেশের কেন শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা কম

শিক্ষকের মর্যাদা

ধেয়ে আসছে বৈশ্বিক ঋণসংকট, শ্রীলঙ্কাতেই শেষ নয়

সব ফিউজ বাল্বের মূল্য সমান

মাঙ্কিপক্সে আতঙ্ক নয়

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের উপায় কী

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা : স্থপতি স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা

ছবি

গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে

কাগজ সংকট সভ্যতারও সংকট

শিশুদের পঠনদক্ষতা বাড়াতে পারে ‘ডাকপড়া’

অর্থনীতির সংকট কাটবে কীভাবে?

ছবি

পারিসার সাহস

সংখ্যালঘু ও ধর্মীয় অনুভূতি

যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের সংস্কৃতি

tab

উপ-সম্পাদকীয়

দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে

গৌতম রায়

শুক্রবার, ০৫ আগস্ট ২০২২

শুভ্রা ঘোড়ুই সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের একজন মেয়ে। সেভাবে কোন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তিনি যুক্ত, এমনটা এখনো পর্যন্ত জানা যায়নি। শুভ্রা নিজের কোন অসুস্থ আত্মীয়কে নিয়ে এসেছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি হাসপাতালে। সেখানে দেখেন, পশ্চিমবঙ্গের বরখাস্ত মন্ত্রী, ভয়াবহ আর্থিক তছরুপের দায় অভিযুক্ত পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে, ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরের পক্ষ থেকে হেফাজতে নেয়া অবস্থায়, ডাক্তার পরীক্ষার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। শুভ্রা কোন দিকে কোন কিছু চিন্তা না করে, নিজের পায়ের চটি খুলে, সদ্য সাবেক মন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন। শুভ্রার ছোড়া চটিটি পার্থবাবুর গায়ে না লাগলেও যে গাড়িতে করে তাকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল, সেই গাড়িতে লেগেছে। তারপর সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে শুভ্রা বলেছেন; চটি ছুড়ব না তো কি ফুলের মালা ছুড়ব?

শুভ্রার এই ঘটনা এই, সাহসিকতা পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন শাসকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সর্বাত্মক বহিঃপ্রকাশ। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা ইস্তক গোটা তৃণমূল কংগ্রেস দলটির প্রায় সব স্তরের নেতা, কর্মী, সমর্থকেরা আর্থিক কেলেঙ্কারি, নয় তো ক্ষমতার কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সারদা-নারদা রোজভ্যালি ইত্যাদি নানা ধরনের কেলেঙ্কারির কথা বারবার উঠে এসেছে। সাধারণ মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় তৃণমূল কংগ্রেসদের নেতা-মন্ত্রীদের তোয়ালে মুড়ে টাকা ঘুষ নিতে দেখেছেন।

তারপরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার ভোটে জিতেছে। লোকসভার ভোটে ও তার দল কেন্দ্রের শাসক বিজেপির থেকে ভালো ফল করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশের নিয়ন্ত্রণাধীন ভোট প্রক্রিয়ার মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই যে জয়, এ গুলি আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোনরকমভাবে অভিযুক্ত করছে না। মনে হতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দান-খয়রাতের উন্নয়ন সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত মোহিত করে রেখেছে।

মমতা এবং তার দল তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো; যেমন ২০১১ এ, তেমনিই ২০১৬ তে, ঠিক তেমনি ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেতার নেপথ্য কারিগর ছিল আরএসএস। নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি সেভাবে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতিতে পেরে উঠতে পারছে না। সেই কারণেই নিজেদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং বিভাজনের রাজনীতির অত্যন্ত বেশি রকমের সহায়ক শক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের গত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে নেপথ্যে থেকে জেতবার ব্যবস্থা আরএসএস শেষ করে দিয়েছে।

বামপন্থীরা এই সময়কালে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সঙ্গে মমতার প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার যোগসূত্র ঘিরে সোচ্চার হয়েও আরএসএসের নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝিয়ে উঠতে পারেননি। বিগত প্রায় ১১ বছর ধরে বামপন্থী রাজনীতির গতিপ্রকৃতির যে ধারা ছিল, সেই ধারাটি বামপন্থী রাজনীতির ব্যাটন মোহম্মদ সেলিম ধরবার পরে, অতি দ্রুততার সঙ্গে বদলাতে শুরু করেছে, তা এই শুভ্রা ঘোড়ইয়ের এই প্রকাশ্য প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে খুব ভালোভাবে বুঝতে পারা যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষ শুধু কাগুজে প্রতিবাদ নয়, প্রতিবাদকে প্রতিরোধের সংকল্পে দৃঢ় করে, শাসকের বিরুদ্ধে সংগটিত হওয়ার প্রশ্নে একটা উপযুক্ত নেতৃত্ব চাইছিল। আর সেই নেতৃত্ব যে তারা খুঁজে পেয়েছে মোহাম্মদ সেলিমের মতো সর্বাত্মক ডায়নামিক একজন নেতার মধ্যে, তা আজ শুভ্রা ঘোড়ইয়ের মতো অতি সাধারণ একজন বাঙালি গৃহবধূর আচরণের ভেতর দিয়েই খুব পরিষ্কার।

বাঙালি গৃহবধূ শুধু নয়, গোটা বাঙালি নারী সমাজের মেরুদন্ডকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিনে নিতে চেয়েছিল সরকারি কোষাগার থেকে সামান্য দান ধ্যান করে। মাত্র ৫০০ টাকা করে বাঙালি মেয়েদের উপঢৌকনের আড়ালে নিজের দলের প্রতি আনুগত্য কিনে নিতে চেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের ভেতর দিয়ে। এই ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পটি ঘিরে ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বৃহৎ পুঁজির মালিকানাধীন একাংশের সংবাদমাধ্যম অত্যন্ত প্রশংসায় মুখর ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনবাদী রাজনীতি ঘিরে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই তথাকথিত জনবাদি রাজনীতিকে পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি হিসেবে যদি কেউ অভিহিত করতেন, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং অতিবাম রাজনীতি করা মানুষজন, যারা প্রকারান্তরে মমতার রাজনীতিকে বিজেপিকে ঠেকানোর উপায় হিসেবে মনে করেন, তারা প্রবল সমালোচনা করতেন। দুই হাত তুলে তারা সমর্থন করতেন মমতার তথাকথিত জনবাদী রাজনীতিকে। এই জনবাদী রাজনীতি নাকি নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ-এমনটাই তথাকথিত প্রগতিশীল শিবিরের একটা অংশের মধ্যে থেকে শিবা কীর্তনের মতো গেয়ে যাওয়া হতো।

আজ যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ আস্থাভাজন মন্ত্রী তথা দলীয় সতীর্থ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ভয়াবহ আর্থিক দুর্নীতির কথা প্রকাশ্যে এসেছে, মমতা বাধ্য হয়েছেন তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিয়ে দলীয় পদ থেকে বাদ দিয়ে গোটা ব্যাপারটি থেকে নিজেকে বা তার দলকে বাঁচিয়ে রাখতে, তখনই কিন্তু একের পর এক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর গুলির নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতির বিষয় সরাসরি আদালতের আঙিনায় চলে এসেছে। সেই সব দুর্নীতির ঘিরে আদালত অনুসন্ধানে নির্দেশ দিচ্ছেন। সেই অনুসন্ধান পর্ব আটকানোর তাগিদেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সাধারণ নাগরিকদের করের টাকাতে একের পর এক উচ্চ আদালতে যাচ্ছেন।

এই রকম একটি অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের একদিকে সীমাহীন সম্প্রদায়িক অভিপ্রায়, অন্যদিকে বলগাহীন অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি-এসবের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ভেতরের জাগ্রত বিবেককে শাসকের অপদার্থতা ঘিরে একেবারে আগ্নেয়গিরির স্ফুলিঙ্গে পরিণত করেছেন। তাই বাঙালি নারী সমাজকে ৫০০ টাকা করে কার্যত ঘুষ দিয়ে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিনে নিতে চেয়েছিলেন, সেই নারী সমাজেরই প্রতিনিধি শুভ্রা ঘোড়ই আজ মমতার অতি ঘনিষ্ঠ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দিকে চটি সুরে নিজের ক্ষোভ প্রকাশের হিম্মত দেখাতে পেরেছেন। আর এই হিম্মত শুভৃরা ঘোড়ইদের অর্জন করবার শক্তি শিখিয়েছেন মোহাম্মদ সেলিম।

বিগত গত ১১ বছর ধরে মমতা সরকারের নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘিরে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ, চিটফান্ডে সর্বশ্বান্ত হয়ে যাওয়া, মানুষের যে ক্ষোভ সেগুলোকে দানা বাঁধিয়ে হাজারোটা শুভ্রা ঘোড়ই তৈরি করতে একদা বামফ্রন্ট না পারলেও, আজ কিন্তু যোগ্যতম নেতৃত্বের দৌলতে এই জায়গাটা প্রতিষ্ঠিত করতে তারা সক্ষম হয়েছেন।

আর তথাকথিত জনবাদী রাজনীতির স্বরূপটি যে কি, তা শুভ্রা ঘোড়ইয়ের আচরণের ভেতর দিয়ে সাধারণ মানুষকে পরিষ্কার করে দেখতে পেয়েছেন। উন্নয়নের নাম করে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে সাধারণ মানুষকে পাইয়ে দেয়ার রাজনীতির ভিত্তিতে, তাদের রুটিরুজি প্রশ্নটিকে ভুলিয়ে দিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষ কি চোখে দেখছেন, তা শুভ্রা দেবীর আচরণের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে।

সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির এই ছলনার বিষয়টিকে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু বিরোধী নেতৃত্বের শক্ত বুনিয়াদের অভাবে সাধারণ মানুষ তাদের সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ প্রকাশে কিছুটা ভীত ছিলেন। আর সেই কারণেই ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত। প্রতিবাদ করলে তাদের অবস্থা হবে সারের দাম ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা শিলাদিত্যের মতো। তাই তারা প্রতিবাদের প্রশ্নটিকে প্রতিরোধের সংকল্পে এতকাল দৃঢ় করেছেন। আর এখন সেই প্রতিবাদকে প্রতিরোধে পর্যবসিত করবার সাহস যখন সেলিমের মতো মানুষ নেতৃত্বে এসে সর্বস্তরের জনগণকে জোগাতে শুরু করেছেন, তখনই কিন্তু শুভ্রা ঘোড়ইরা আর নিজেদের রাগ ঘৃণা কে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেননি। তাই তারা পার্থ চট্টোপাধ্যায় কে এসি গাড়ি থেকে নামিয়ে সরকারি কর্মীদের দিয়ে হুইলচেয়ারে করে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন; কেন একজন দাগি অপরাধীর জন্য সরকারের এত টাকা খরচ করা হচ্ছে ?

এই যে সাহসের পরিচয় আজ একা শুভ্রাঘোড়ই দিয়েছেন, কাল তা হাজারটা শুভ্রা ঘোড়ই দেবেন। ৫০০ টাকা করে ঘুষ দিয়ে প্রীতিলতা ওয়াদেদার, কল্পনা জোশিদের উত্তরসূরীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনই চিরদিনের মতো যে কিনে নিতে পারেননি, সেটা শুভ্রা প্রমাণ করে দিয়েছেন। তাই যথার্থই হয়ে উঠেছে মোহাম্মদ সেলিমের এই স্লোগান; দাগ তো চেহারার, আয়না মুছে কি হবে?

এই স্লোগান যেন আইয়ুব বিরোধী গণ আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক স্লোগান, ‘আইয়ুব খানের হাতে হারিকেন পোঁদে বাশে’র সেই পর্যায়ের একটি স্লোগান, যা এক দিন টলিয়ে দিয়েছিল আইয়ুব খানের তানাসাহিকে। তাই আগামীতে মোহাম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে এই স্লোগানই টলিয়ে দেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তানাশাহিকে। আর মমতা নবীন পট্টনায়েক... এদের মতো মানুষরা যত শক্তিহীন হবেন, ততই ভারতের সংখ্যাগুরু আধিপত্যবাদী আরএসএস বিজেপিরা, রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দূরে সরতে শুরু করবেন।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

back to top