alt

উপ-সম্পাদকীয়

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

সিরাজ প্রামাণিক

: শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২

খবরটি পড়ে চোখ আটকে গেল। মন খারাপ হয়ে গেলো। মন খারাপের গল্পটি দিয়েই লেখাটি শুরু করি। সুনামগঞ্জ আদালতে বিচারকের সঙ্গে পুলিশের এক কনস্টেবল ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করায় কাঠগড়ায় আটক রাখার আদেশ দিয়ে বিচারক নিজেই কিছু সময়ের জন্য আটক হয়ে গিয়েছিলেন। আটক পুলিশ সদস্য পিন্টুকে ছাড়িয়ে নিতে কোর্টে দায়িত্বরত অন্য পুলিশ সদস্যরা এজলাস কক্ষ ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় বিচারকের নাম ধরে গালিগালাজ করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এজলাস কক্ষের সব দরজা বন্ধ করে চলে বিচার কার্যক্রম। এর প্রতিবাদ করলে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে পুলিশ সদস্যরা। সুনামগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতে গত সোমবার (৮ আগস্ট) বেলা ২ ঘটিকার সময় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতি কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক এক প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়। এদিকে বিচারক, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কোর্ট পুলিশের অসদাচরণের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। অন্যথায় দেশের প্রতিটি আদালতের সামনে আগামী রোববার (১৪ আগস্ট) থেকে ঘণ্টাব্যাপী শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

পাঠক, নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে পুলিশপ্রধান শাহাদুল হকের চাকরিচ্যুতির গল্পের কথা। সেই ২০০৩ সালের ১৯ জুন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সরকারি গাড়িযোগে বনানী কামাল আতাতুর্ক এলাকা অতিক্রম করছিলেন। সে সময় পুলিশ সার্জেন্ট বিচারপতি মহোদয়ের গাড়ি থামিয়ে পুলিশের নীল রঙের একটা জিপ গাড়ি আগে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। একই সঙ্গে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে স্যালুট প্রদান করেন। বিষয়টি লক্ষ্য করে বিচারপতি মহোদয় গাড়ি থেকে নেমে সার্জেন্টের কাছে জিজ্ঞেস করেন, সুপ্রিম কোর্টের লোগো-সংবলিত গাড়ি ও কালো পতাকা দেখে সালাম না করার কারণ কি? সার্জেন্ট বলেন যে, আমরা সুপ্রিম কোর্টের পতাকা স্যালুট করতে বাধ্য নই। আমাদের অত ঠ্যাকা পড়ে নাই! বিষয়টি নিয়ে সার্জেন্ট সোয়েবুর রহমান বিচারপতি মহোদয়ের সঙ্গে তর্কে জড়ান। পরে আশপাশে থাকা আরও কয়েকজন পুলিশ সার্জেন্টকে ডাকেন সোয়েবুর রহমান। ৫ জন পুলিশ অফিসার জুডিশিয়ারি নিয়ে নানাভাবে কটূক্তি করেন। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ৩০ জুন ২০০৩ ওই পাঁচজন পুলিশ অফিসারকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে আইজিপি এবং পুলিশ ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপালকে ১২ জুলাই ২০০৩ তারিখের মধ্যে নির্দেশ দেন চারটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। প্রশ্নগুলো ছিল এ রকম, (১) সার্জেন্ট শোয়েবের আদালতের প্রতি অবমাননার উক্তিতে পুলিশ সদস্যদের ট্রেনিং কলেজে আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে কি জাতীয় ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে? (২) সব র‌্যাংকের পুলিশ কর্মকর্তা মহামান্য হাইকোর্টের লোগো-সংবলিত গাড়ি বহনকারীকে স্যালুট দিতে বাধ্য কি না? (৩) ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স বিষয়ে সকল পুলিশ কর্মকর্তা সকল ইভেন্টে অনুসরণ করতে বাধ্য কি না? ও (৪) পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণে এমনটি শেখানো হয়েছে কি না, যে কম গুরুত্বহীন ব্যক্তির গাড়িকে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া।

এই নির্দেশনা দেয়ার কিছুদিন পরে অস্থায়ী বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় তিনি আর বিচারপতি হিসেবে চাকরিতে ছিলেন না। তবে পুলিশপ্রধান চারটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশ সার্জেন্ট বিচারপতিকে সালাম দিতে বাধ্য ছিলেন না। যে বিচারপতি ওই আদেশ দিয়েছিলেন সে এখন আর চাকরিতে নেই। ওই বিচারপতিকেই বরং দেশের প্রচলিত আইনে সরকারি কাজে বাধা দেয়ার ও পুলিশ অফিসারকে হুমকি দেয়ার জন্য বিচার করা উচিত। একইসঙ্গে আইজি বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে বিভিন্ন আকার-ইঙ্গিতে কটূক্তি করেন। জবাবের কপি আমলে নিয়ে বিচারপতি মো. আবদুুল মতিন এবং বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহম্মেদ স্বপ্রণোদিতভাবে আইজিপির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু করেন। একই সঙ্গে আইজিপিকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। আইজিপি সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। হাইকোর্ট ডিভিশন আইজিপিসহ চারজন পুলিশ অফিসারের জবাবে সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা প্রদান করেন।

হাইকোর্ট ডিভিশনের আদেশের পরে দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা অভিমত দেন, দ্য পাবলিক সার্ভেন্ট অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৫ অনুযায়ী পুলিশ প্রধানের চাকরিতে থাকার সুযোগ নেই। রায় প্রদানের সময় আইজিপি ফ্রান্সে ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে ছিলেন একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সে যখন দেশে আসেন সে সময় তাকে বিমানবন্দরে পুলিশ প্রধান হিসেবে প্রোটোকল দেওয়া হয়নি। তাকে সাময়িক পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ডিএমপির কমিশনারকে চার্জে রাখা হয়। পরে সাসপেন্ড করা হয়। হাইকোর্ট ডিভিশন এ রায়ে জুডিশিয়ারির মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবজারভেশন প্রদান করেন। পরে কলেবরে পাঠকের জ্ঞাতার্থে ওই পর্যবেক্ষণগুলো ব্যাখ্যা করা হবে।

হাইকোর্ট ডিভিশন সুস্পষ্টভাবে বলে, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পুলিশসহ নির্বাহী বিভাগ আদালতকে সহায়তা করতে বাধ্য। তা ছাড়া আদালত বলতে শুধু গম্বুজাকৃতির বিল্ডিংকেই বোঝাবে না, বরং ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারা অনুয়ায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির এখতিয়ার সমগ্র বাংলাদেশ। সমগ্র বাংলাদেশেই এখতিয়ার প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায় পুলিশপ্রধানসহ বিবাদীপক্ষ। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপের কোন যুক্তি না থাকায় আপিল খারিজ করে দেয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ২৫ ধারায় বিধান অনুযায়ী, পদাধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা সারা বাংলাদেশের জন্য, দায়রা বিচার, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে জাস্টিস অব পিস হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

এর পূর্বেও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম তানভীর আরাফাত অনৈতিক ও বেআইনি কার্যকলাপ, আক্রমণাত্মক ও বিশৃঙ্খলামূলক আচরণ দ্বারা ভয়ভীতি প্রদর্শণ ও সরকারি দায়িত্ব পালনে পদমর্যাদার অপব্যবহার করেছিলেন। হাইকোর্ট প্রথম দিকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেও অদৃশ্য কারণবশত: কজ লিস্ট থেকে মামলাটি হারিয়ে যায়।

পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স হয়। সেখানে পুলিশ সুপার ভুল করেও কখনো আসে না। ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা দিয়ে কাজ সারতে চায়। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠে না, চিঠি লেখে না। বিচারক-আইনজীবী কনফারেন্স কখনো হয় না। বিচারকরা নিজেদের ব্রাহ্মণ শ্রেণীর মনে করেন। কখনো কখনো আইনজীবীদের প্রতিপক্ষ মনে করেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কাঠগোড়ায় বসিয়ে রাখেন। ঠুনকো অভিযোগে আইনজীবীদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে এবার আনন্দের সংবাদ এই যে, বিচারকের সঙ্গে এমন আচরণে আইনজীবীরা প্রতিবাদ করেছেন। আশা করি, আইনজীবীদের সঙ্গে পুলিশের এহেন আচরণে বিচরকরাও সোচ্চার হবেন। এ বিষয়ে অতীতের মতো দেশের সর্বোচ্চ আদালত কি ব্যবস্থা নেয়, সেটা দেখবার বিষয়।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

কৃষি ও কম্পিউটার শিক্ষা বাস্তবমুখী হওয়া প্রয়োজন

জনপ্রিয়তা, সম্মান এবং সৃষ্টি সুখের গোপন তরিকা

ছবি

বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার চামড়া রপ্তানি করা সম্ভব

ছবি

স্বপ্নছোঁয়া জয় ও এগিয়ে যাওয়ার পথনকশা

সড়ক দুর্ঘটনার মূল্য কত

ছবি

হার না মানা লাল-সবুজের মেয়েরা

ছবি

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

নারী ফুটবল দলকে অভিনন্দন

সেলিম : ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণের ঋত্ত্বিক

ছবি

পোলট্রি শিল্পের সংকট

ছবি

বিদায় রানী এলিজাবেথ

সর্প দংশনের কার্যকর চিকিৎসা পেতে চ্যালেঞ্জ এবং বাধা

খেলনা শিল্পের সম্ভাবনা

অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে গাছ লাগানোর গুরুত্ব

ছবি

যানজট : অর্থনীতির নীরব ঘাতক

বিপজ্জনক বর্জ্য এবং এর ব্যবস্থাপনা

কৃষি খাতের উন্নয়ন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

নতুন শিক্ষাক্রম ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক

বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে ঢাকা

প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

ডিজিটাল শিল্পযুগ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা

বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন

সুন্দরবনের সুরক্ষায় সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য রিডিং কম্পিটিশন

দুগ্ধশিল্পের সম্ভাবনা ও সংকট

বাণিজ্য ঘাটতি কমবে কীভাবে

সেন্টার বেইজড বিশ্বমানের হাসপাতাল

ডিজিটাল বৈষম্য দূর করা জরুরি

নারী নিগ্রহ : প্রশ্নবিদ্ধ সামাজিক সুস্থতা

ছবি

শেখ হাসিনা ভারত থেকে কী কী এনেছেন

দেশভাগ ঘিরে চর্চার পণ্যায়ন

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন ও আজকের শিক্ষা

দুর্নীতি কি অন্যায়

প্রশিক্ষিত নার্স ও মিডওয়াইফের প্রয়োজনীয়তা

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও কৃষি ভাবনা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বিচারকের সঙ্গে পুলিশের অসদাচরণ এবং জাস্টিস অব দ্য পিস

সিরাজ প্রামাণিক

শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২

খবরটি পড়ে চোখ আটকে গেল। মন খারাপ হয়ে গেলো। মন খারাপের গল্পটি দিয়েই লেখাটি শুরু করি। সুনামগঞ্জ আদালতে বিচারকের সঙ্গে পুলিশের এক কনস্টেবল ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করায় কাঠগড়ায় আটক রাখার আদেশ দিয়ে বিচারক নিজেই কিছু সময়ের জন্য আটক হয়ে গিয়েছিলেন। আটক পুলিশ সদস্য পিন্টুকে ছাড়িয়ে নিতে কোর্টে দায়িত্বরত অন্য পুলিশ সদস্যরা এজলাস কক্ষ ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় বিচারকের নাম ধরে গালিগালাজ করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এজলাস কক্ষের সব দরজা বন্ধ করে চলে বিচার কার্যক্রম। এর প্রতিবাদ করলে আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে পুলিশ সদস্যরা। সুনামগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতে গত সোমবার (৮ আগস্ট) বেলা ২ ঘটিকার সময় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার প্রতিবাদে সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতি কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক এক প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়। এদিকে বিচারক, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কোর্ট পুলিশের অসদাচরণের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। অন্যথায় দেশের প্রতিটি আদালতের সামনে আগামী রোববার (১৪ আগস্ট) থেকে ঘণ্টাব্যাপী শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

পাঠক, নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে পুলিশপ্রধান শাহাদুল হকের চাকরিচ্যুতির গল্পের কথা। সেই ২০০৩ সালের ১৯ জুন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সরকারি গাড়িযোগে বনানী কামাল আতাতুর্ক এলাকা অতিক্রম করছিলেন। সে সময় পুলিশ সার্জেন্ট বিচারপতি মহোদয়ের গাড়ি থামিয়ে পুলিশের নীল রঙের একটা জিপ গাড়ি আগে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। একই সঙ্গে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে স্যালুট প্রদান করেন। বিষয়টি লক্ষ্য করে বিচারপতি মহোদয় গাড়ি থেকে নেমে সার্জেন্টের কাছে জিজ্ঞেস করেন, সুপ্রিম কোর্টের লোগো-সংবলিত গাড়ি ও কালো পতাকা দেখে সালাম না করার কারণ কি? সার্জেন্ট বলেন যে, আমরা সুপ্রিম কোর্টের পতাকা স্যালুট করতে বাধ্য নই। আমাদের অত ঠ্যাকা পড়ে নাই! বিষয়টি নিয়ে সার্জেন্ট সোয়েবুর রহমান বিচারপতি মহোদয়ের সঙ্গে তর্কে জড়ান। পরে আশপাশে থাকা আরও কয়েকজন পুলিশ সার্জেন্টকে ডাকেন সোয়েবুর রহমান। ৫ জন পুলিশ অফিসার জুডিশিয়ারি নিয়ে নানাভাবে কটূক্তি করেন। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ৩০ জুন ২০০৩ ওই পাঁচজন পুলিশ অফিসারকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে আইজিপি এবং পুলিশ ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপালকে ১২ জুলাই ২০০৩ তারিখের মধ্যে নির্দেশ দেন চারটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। প্রশ্নগুলো ছিল এ রকম, (১) সার্জেন্ট শোয়েবের আদালতের প্রতি অবমাননার উক্তিতে পুলিশ সদস্যদের ট্রেনিং কলেজে আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে কি জাতীয় ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে? (২) সব র‌্যাংকের পুলিশ কর্মকর্তা মহামান্য হাইকোর্টের লোগো-সংবলিত গাড়ি বহনকারীকে স্যালুট দিতে বাধ্য কি না? (৩) ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স বিষয়ে সকল পুলিশ কর্মকর্তা সকল ইভেন্টে অনুসরণ করতে বাধ্য কি না? ও (৪) পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণে এমনটি শেখানো হয়েছে কি না, যে কম গুরুত্বহীন ব্যক্তির গাড়িকে আগে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া।

এই নির্দেশনা দেয়ার কিছুদিন পরে অস্থায়ী বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় তিনি আর বিচারপতি হিসেবে চাকরিতে ছিলেন না। তবে পুলিশপ্রধান চারটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ডিউটিরত অবস্থায় পুলিশ সার্জেন্ট বিচারপতিকে সালাম দিতে বাধ্য ছিলেন না। যে বিচারপতি ওই আদেশ দিয়েছিলেন সে এখন আর চাকরিতে নেই। ওই বিচারপতিকেই বরং দেশের প্রচলিত আইনে সরকারি কাজে বাধা দেয়ার ও পুলিশ অফিসারকে হুমকি দেয়ার জন্য বিচার করা উচিত। একইসঙ্গে আইজি বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে বিভিন্ন আকার-ইঙ্গিতে কটূক্তি করেন। জবাবের কপি আমলে নিয়ে বিচারপতি মো. আবদুুল মতিন এবং বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহম্মেদ স্বপ্রণোদিতভাবে আইজিপির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল ইস্যু করেন। একই সঙ্গে আইজিপিকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। আইজিপি সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। হাইকোর্ট ডিভিশন আইজিপিসহ চারজন পুলিশ অফিসারের জবাবে সন্তুষ্ট না হওয়ায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা প্রদান করেন।

হাইকোর্ট ডিভিশনের আদেশের পরে দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা অভিমত দেন, দ্য পাবলিক সার্ভেন্ট অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৫ অনুযায়ী পুলিশ প্রধানের চাকরিতে থাকার সুযোগ নেই। রায় প্রদানের সময় আইজিপি ফ্রান্সে ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে ছিলেন একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সে যখন দেশে আসেন সে সময় তাকে বিমানবন্দরে পুলিশ প্রধান হিসেবে প্রোটোকল দেওয়া হয়নি। তাকে সাময়িক পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে ডিএমপির কমিশনারকে চার্জে রাখা হয়। পরে সাসপেন্ড করা হয়। হাইকোর্ট ডিভিশন এ রায়ে জুডিশিয়ারির মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবজারভেশন প্রদান করেন। পরে কলেবরে পাঠকের জ্ঞাতার্থে ওই পর্যবেক্ষণগুলো ব্যাখ্যা করা হবে।

হাইকোর্ট ডিভিশন সুস্পষ্টভাবে বলে, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পুলিশসহ নির্বাহী বিভাগ আদালতকে সহায়তা করতে বাধ্য। তা ছাড়া আদালত বলতে শুধু গম্বুজাকৃতির বিল্ডিংকেই বোঝাবে না, বরং ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারা অনুয়ায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির এখতিয়ার সমগ্র বাংলাদেশ। সমগ্র বাংলাদেশেই এখতিয়ার প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায় পুলিশপ্রধানসহ বিবাদীপক্ষ। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপের কোন যুক্তি না থাকায় আপিল খারিজ করে দেয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ২৫ ধারায় বিধান অনুযায়ী, পদাধিকারবলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা সারা বাংলাদেশের জন্য, দায়রা বিচার, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে জাস্টিস অব পিস হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

এর পূর্বেও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম তানভীর আরাফাত অনৈতিক ও বেআইনি কার্যকলাপ, আক্রমণাত্মক ও বিশৃঙ্খলামূলক আচরণ দ্বারা ভয়ভীতি প্রদর্শণ ও সরকারি দায়িত্ব পালনে পদমর্যাদার অপব্যবহার করেছিলেন। হাইকোর্ট প্রথম দিকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেও অদৃশ্য কারণবশত: কজ লিস্ট থেকে মামলাটি হারিয়ে যায়।

পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স হয়। সেখানে পুলিশ সুপার ভুল করেও কখনো আসে না। ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা দিয়ে কাজ সারতে চায়। চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠে না, চিঠি লেখে না। বিচারক-আইনজীবী কনফারেন্স কখনো হয় না। বিচারকরা নিজেদের ব্রাহ্মণ শ্রেণীর মনে করেন। কখনো কখনো আইনজীবীদের প্রতিপক্ষ মনে করেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কাঠগোড়ায় বসিয়ে রাখেন। ঠুনকো অভিযোগে আইনজীবীদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে এবার আনন্দের সংবাদ এই যে, বিচারকের সঙ্গে এমন আচরণে আইনজীবীরা প্রতিবাদ করেছেন। আশা করি, আইনজীবীদের সঙ্গে পুলিশের এহেন আচরণে বিচরকরাও সোচ্চার হবেন। এ বিষয়ে অতীতের মতো দেশের সর্বোচ্চ আদালত কি ব্যবস্থা নেয়, সেটা দেখবার বিষয়।

[লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট]

back to top