alt

উপ-সম্পাদকীয়

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও কৃষি ভাবনা

সত্যেন মন্ডল

: বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

মায়ানমার থেকে রাশিয়া পর্যন্ত, ইউরোপ-আমেরিকা সর্বত্র কেমন যেন অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোভিড-১৯ এর প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব, সারা দুনিয়ায় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মুল্য লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে, তখন বলতেই পারি আমরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছি। বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার একটি বড় কারণ বিশ্বের অন্যতম খাদ্য উৎপাদনকারী দুটি দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন এর মধ্যে যুদ্ধ।

বিশ্বায়নের কৃষি বাজারের প্রেক্ষাপটে-বিশ্বব্যাপী কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এমন পরিস্থিতি পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। যুদ্ধের গত কয়েকমাসে যেসব পরিণতিগুলো স্পষ্ট, সেগুলো হলো- ইউক্রেন থেকে রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে, ভবিষ্যতের ফসল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের দাম বেড়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছে সেই দেশগুলো যারা ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে কৃষিদ্রব্য বা খাদ্য আমদানির উপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে কৃষি বাজারের অস্থিরতার বড় কারণ হলো যুদ্ধ, যা একই সময়ে চূড়ান্ত কৃষিপণ্য এবং কৃষি উপকরণের বাজারকে ব্যাহত করছে। গম এবং তৈলবীজের মতো কৃষি ফসলগুলো হলো রুটি এবং ভোজ্যতেলের মতো প্রধান খাবারের উপাদান, যা সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য ক্যালোরির প্রাথমিক উৎস। বর্তমান সময়ে খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সারের প্রভাব ধনী দেশগুলোর পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিকল্প উপায়গুলোকে সীমিত করেছে। যেহেতু বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া এবং বেলারুশ থেকে সার আমদানি করাকে সীমিত করেছে, ফলে আমাদের দেশ সহ অনেক দেশে সারের দাম বেড়ে যাচ্ছে, সে কারণে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে। এতো গেলো খাদ্য নিরাপত্তার উপর মনুষ্য সৃষ্টি যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার প্রভাব, এবার আসা যাক প্রকৃতির খেয়ালিপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কথায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে, ফলে এ বছর আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও কৃষকদের সেচ দিয়ে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করতে দেখা গেছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে। বাংলাদেশে প্রায় ২৫ লক্ষ হেক্টর উপকূলীয় অঞ্চল এর মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। তার মধ্যে ৬.৫ লক্ষ হেক্টর বৃহত্তর খুলনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলায়, এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও চাঁদপুর জেলায় লবণাক্ততা রয়েছে। সাধারণত (শূন্য) ০-২ ডিএস/মিটার মাত্রার মাটিকে শূন্য মাটি বলা হয়।

এছাড়া ২-৪, ৪-৮, ৮-১৫ ও ১৫ ডিএস/মিটার এর অধিক মাত্রাকে যথাক্রমে স্বল্প, মধ্যম, ও অতিমাত্রার মাটি বলা হয়। বিশ্বায়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে আমাদের এই ক্রম-হ্রাসমান কৃষি জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ১৬.৫১ কোটি মানুষ সরাসরি জলবায়ূ পরিবর্তনের শিকার হতে চলেছে। ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনের কারণে, বন্যা, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও খরার মত ঘটনা ঘটছে। যার কারণে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ২১.৮ লক্ষ মেট্রিক টন এবং বন্যা বা অতি বর্ষনের ফলে প্রায় ২৩.৮ লক্ষ মেট্রিক টন ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ছোট-বড় ৯৩টি দুর্যোগের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। এ সময়ে এ দেশের কৃষি ও অবকাঠামো খাতে ৫৯০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। এছাড়া ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষ করে বন্যার কারণে ১,০৬,৩০০ হেক্টর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অল্প হলেও বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। বঙ্গোপসাগরের লোনা পানিতে এর মধ্যে ৮ লক্ষ ৩০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি লবণাক্ত হয়ে গেছে। জাতিসংঘের ইন্টার-গভর্নমেন্ট প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এর মতে ২১০০ সালের অনেক আগেই আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রের পানির উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যাওযার আশংকা রযেছে।

সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত পানি দ্বারা তলিয়ে যাবে,এতে ১৩ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যার পরিমাণ প্রায় দুই কোটি। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল পানির নিচে ডুবে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ। ফলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে এ অঞ্চলের অগনিত মানুষ। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়বে। সিডর আইলা ও নার্গিসের মতো ঘুর্নিঝড় আগে ১০ থেকে ১৫ বছর পর পর আসত। এখন প্রায় প্রতিবছর আসছে এবং এগুলোর গতিও বাড়ছে।

এক সময় ছিল, আমাদের দেশের কৃষকরা চাষাবাদের সময়সূচি সম্পর্কে একটা পূর্ব প্রস্তুতি নিতে পারত, শস্য বিন্যাস ছিল তাদের অনেকটাই নির্ধারিত। এখন সবই অনিয়শ্চতায় ভরা। তাদের প্রচলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আর তেমন কাজে লাগছে না। ফলে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে আমাদের কৃষি খাত। অন্যদিকে আশংকা করা হচ্ছে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বৃষ্টিপাত ৪-৫% কমে যাবে ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা এলাকা আরও বাডবে।

কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন সকল সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বিত উদ্যোগ। দেশে সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে সকলকে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা সহিষ্ণু ও স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত উদ্ভাবন, জাতগুলোর বীজ বর্ধন এবং কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা বর্তমান পেক্ষাপটে অতি আবশ্যক। সে লক্ষ্যে বিআরআরআই লবণাক্ততা সহিষ্ণু ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯ (বোরো), ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪ ও ব্রি ধান৭৩ (আমন) ও খরা সহিষ্ণু ব্রি ধান৫৬ ও ব্রি ধান৫৭ উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের এ পর্যন্ত ১৮৬ টি ধানের জাতের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। যেটা করতে সাহায্য করেছে ‘বেইজিং জিনোমিক্স ইনস্টিটিউট’ চীন। এই তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা হয়তো আরও ভালো ভালো উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হবেন।

শস্য বহুমুখীকরণ বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এ কর্মসূচি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে। বিগত ২০০৯-২০১৯ সালে ক্রপিং ও ফার্মিং সিস্টেমের উপর ব্যাপকভাবে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজ সম্পাদিত হয়েছে। এসব কাজের ধারাবাহিকতায় সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ হাতে নিচ্ছে যাতে দানাদার ফসল, তেলজাতীয় ফসল, শাক-সবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগি পালন, পুকুরে মাছ চাষ ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যারা কৃষক, কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদ আছি সকলে মিলে আমাদের পরীক্ষালব্দ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এ দেশের আপামর জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উজাড় করে দিতে হবে।

[লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর]

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

বাঁচো, বাঁচো এবং বাঁচো

কন্যাশিশুকে শিক্ষায়ও এগিয়ে থাকতে হবে 

বুদ্ধিজীবিতার দায়

আদিবাসীর তালিকা নিয়ে বিতর্ক কেন

সত্য কাজে কেউ নয় রাজি

মেগা প্রকল্প ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

শেষ আফ্রিকান টিক ওক গাছটি কি মারা গেছে?

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হোক

ছবি

সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাক পাঠ্যবই

ডিজিটাল শিল্পযুগ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্ব

কৃষি ও কম্পিউটার শিক্ষা বাস্তবমুখী হওয়া প্রয়োজন

জনপ্রিয়তা, সম্মান এবং সৃষ্টি সুখের গোপন তরিকা

ছবি

বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার চামড়া রপ্তানি করা সম্ভব

ছবি

স্বপ্নছোঁয়া জয় ও এগিয়ে যাওয়ার পথনকশা

সড়ক দুর্ঘটনার মূল্য কত

ছবি

হার না মানা লাল-সবুজের মেয়েরা

ছবি

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু

নারী ফুটবল দলকে অভিনন্দন

সেলিম : ভারতে বামপন্থার পুনর্জাগরণের ঋত্ত্বিক

ছবি

পোলট্রি শিল্পের সংকট

ছবি

বিদায় রানী এলিজাবেথ

সর্প দংশনের কার্যকর চিকিৎসা পেতে চ্যালেঞ্জ এবং বাধা

খেলনা শিল্পের সম্ভাবনা

অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে গাছ লাগানোর গুরুত্ব

ছবি

যানজট : অর্থনীতির নীরব ঘাতক

বিপজ্জনক বর্জ্য এবং এর ব্যবস্থাপনা

কৃষি খাতের উন্নয়ন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

নতুন শিক্ষাক্রম ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক

বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে ঢাকা

প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

ডিজিটাল শিল্পযুগ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা

বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন

tab

উপ-সম্পাদকীয়

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও কৃষি ভাবনা

সত্যেন মন্ডল

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

মায়ানমার থেকে রাশিয়া পর্যন্ত, ইউরোপ-আমেরিকা সর্বত্র কেমন যেন অস্থিরতা বিরাজ করছে। কোভিড-১৯ এর প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব, সারা দুনিয়ায় যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মুল্য লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে, তখন বলতেই পারি আমরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছি। বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার একটি বড় কারণ বিশ্বের অন্যতম খাদ্য উৎপাদনকারী দুটি দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন এর মধ্যে যুদ্ধ।

বিশ্বায়নের কৃষি বাজারের প্রেক্ষাপটে-বিশ্বব্যাপী কৃষি এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এমন পরিস্থিতি পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। যুদ্ধের গত কয়েকমাসে যেসব পরিণতিগুলো স্পষ্ট, সেগুলো হলো- ইউক্রেন থেকে রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে, ভবিষ্যতের ফসল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বব্যাপী কৃষিপণ্যের দাম বেড়েছে এবং সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছে সেই দেশগুলো যারা ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে কৃষিদ্রব্য বা খাদ্য আমদানির উপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে কৃষি বাজারের অস্থিরতার বড় কারণ হলো যুদ্ধ, যা একই সময়ে চূড়ান্ত কৃষিপণ্য এবং কৃষি উপকরণের বাজারকে ব্যাহত করছে। গম এবং তৈলবীজের মতো কৃষি ফসলগুলো হলো রুটি এবং ভোজ্যতেলের মতো প্রধান খাবারের উপাদান, যা সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য ক্যালোরির প্রাথমিক উৎস। বর্তমান সময়ে খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সারের প্রভাব ধনী দেশগুলোর পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বিকল্প উপায়গুলোকে সীমিত করেছে। যেহেতু বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা রাশিয়া এবং বেলারুশ থেকে সার আমদানি করাকে সীমিত করেছে, ফলে আমাদের দেশ সহ অনেক দেশে সারের দাম বেড়ে যাচ্ছে, সে কারণে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে। এতো গেলো খাদ্য নিরাপত্তার উপর মনুষ্য সৃষ্টি যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার প্রভাব, এবার আসা যাক প্রকৃতির খেয়ালিপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কথায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে, ফলে এ বছর আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও কৃষকদের সেচ দিয়ে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করতে দেখা গেছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে। বাংলাদেশে প্রায় ২৫ লক্ষ হেক্টর উপকূলীয় অঞ্চল এর মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। তার মধ্যে ৬.৫ লক্ষ হেক্টর বৃহত্তর খুলনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলায়, এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও চাঁদপুর জেলায় লবণাক্ততা রয়েছে। সাধারণত (শূন্য) ০-২ ডিএস/মিটার মাত্রার মাটিকে শূন্য মাটি বলা হয়।

এছাড়া ২-৪, ৪-৮, ৮-১৫ ও ১৫ ডিএস/মিটার এর অধিক মাত্রাকে যথাক্রমে স্বল্প, মধ্যম, ও অতিমাত্রার মাটি বলা হয়। বিশ্বায়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করে আমাদের এই ক্রম-হ্রাসমান কৃষি জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠির খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ১৬.৫১ কোটি মানুষ সরাসরি জলবায়ূ পরিবর্তনের শিকার হতে চলেছে। ইতিমধ্যে এই পরিবর্তনের কারণে, বন্যা, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও খরার মত ঘটনা ঘটছে। যার কারণে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ২১.৮ লক্ষ মেট্রিক টন এবং বন্যা বা অতি বর্ষনের ফলে প্রায় ২৩.৮ লক্ষ মেট্রিক টন ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ছোট-বড় ৯৩টি দুর্যোগের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। এ সময়ে এ দেশের কৃষি ও অবকাঠামো খাতে ৫৯০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। এছাড়া ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষ করে বন্যার কারণে ১,০৬,৩০০ হেক্টর আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা অল্প হলেও বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। বঙ্গোপসাগরের লোনা পানিতে এর মধ্যে ৮ লক্ষ ৩০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি লবণাক্ত হয়ে গেছে। জাতিসংঘের ইন্টার-গভর্নমেন্ট প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এর মতে ২১০০ সালের অনেক আগেই আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রের পানির উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যাওযার আশংকা রযেছে।

সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত পানি দ্বারা তলিয়ে যাবে,এতে ১৩ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যার পরিমাণ প্রায় দুই কোটি। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল পানির নিচে ডুবে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এ অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ। ফলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে এ অঞ্চলের অগনিত মানুষ। এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়বে। সিডর আইলা ও নার্গিসের মতো ঘুর্নিঝড় আগে ১০ থেকে ১৫ বছর পর পর আসত। এখন প্রায় প্রতিবছর আসছে এবং এগুলোর গতিও বাড়ছে।

এক সময় ছিল, আমাদের দেশের কৃষকরা চাষাবাদের সময়সূচি সম্পর্কে একটা পূর্ব প্রস্তুতি নিতে পারত, শস্য বিন্যাস ছিল তাদের অনেকটাই নির্ধারিত। এখন সবই অনিয়শ্চতায় ভরা। তাদের প্রচলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আর তেমন কাজে লাগছে না। ফলে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে আমাদের কৃষি খাত। অন্যদিকে আশংকা করা হচ্ছে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বৃষ্টিপাত ৪-৫% কমে যাবে ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে খরা এলাকা আরও বাডবে।

কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের স্থিতিশীল খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন সকল সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বিত উদ্যোগ। দেশে সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে সকলকে। বিভিন্ন প্রতিকূলতা সহিষ্ণু ও স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন জাত উদ্ভাবন, জাতগুলোর বীজ বর্ধন এবং কৃষক পর্যায়ে সরবরাহ করা বর্তমান পেক্ষাপটে অতি আবশ্যক। সে লক্ষ্যে বিআরআরআই লবণাক্ততা সহিষ্ণু ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৯৭, ব্রি ধান৯৯ (বোরো), ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪ ও ব্রি ধান৭৩ (আমন) ও খরা সহিষ্ণু ব্রি ধান৫৬ ও ব্রি ধান৫৭ উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের এ পর্যন্ত ১৮৬ টি ধানের জাতের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। যেটা করতে সাহায্য করেছে ‘বেইজিং জিনোমিক্স ইনস্টিটিউট’ চীন। এই তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা হয়তো আরও ভালো ভালো উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হবেন।

শস্য বহুমুখীকরণ বর্তমান সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এ কর্মসূচি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে। বিগত ২০০৯-২০১৯ সালে ক্রপিং ও ফার্মিং সিস্টেমের উপর ব্যাপকভাবে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজ সম্পাদিত হয়েছে। এসব কাজের ধারাবাহিকতায় সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ হাতে নিচ্ছে যাতে দানাদার ফসল, তেলজাতীয় ফসল, শাক-সবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগি পালন, পুকুরে মাছ চাষ ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যারা কৃষক, কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদ আছি সকলে মিলে আমাদের পরীক্ষালব্দ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এ দেশের আপামর জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উজাড় করে দিতে হবে।

[লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর]

back to top