alt

উপ-সম্পাদকীয়

শেখ হাসিনা ভারত থেকে কী কী এনেছেন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

: শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে ভারত গিয়েছিলেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে ভারত গিয়েছিলেন। দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ভারতের রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম জারদোশ। দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে-সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশ অঙ্গীকার করেছে, সিলেটের কুশিয়ারা নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। ১৯৯৬ সনে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির পর এই প্রথম আরেকটি অভিন্ন নদী কুশিয়ারার পানিবণ্টন প্রসঙ্গে সমঝোতা হলো। বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য ভারত বিনা মূল্যে ট্রানজিটের প্রস্তাবও দিয়েছে। ভারতের নির্ধারিত স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশ নেপাল, ভুটানের সঙ্গে ব্যবসায় এ সুবিধা নিতে পারবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ, পণ্যের ঘাটতি এবং অত্যধিক মূল্যস্ফীতির মধ্যে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা খুবই জরুরি। বিশ্ব যেভাবে অর্থনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে মহামন্দার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তাতে পৃথিবীর অনুন্নত ও গরিব দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে, হাজার হাজার শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, লাখ লাখ কর্মহীন লোক অনাহারে মারা যেতে পারে, লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দেশে গণ-অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাংলাদেশের আপদকালীন খাদ্য ও জ্বালানির নিশ্চয়তা বিধানে ভারতের আশ্বাস কিছুটা স্বস্তি দেবে। এ ছাড়া পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশ এক সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির তরফ থেকে নানাবিধ হতাশাব্যঞ্জক কথাবার্তা উচ্চারিত হচ্ছে। বিএনপি বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতবার ভারত সফরে গিয়েছেন ততবার শুধু দিয়ে এসেছেন, নিয়ে আসতে পারেননি। সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার আরেকটি কমন কথা চৈনিক বামপন্থীদের মতো বিএনপি ইদানীং খুব ঘন ঘন বলছে। বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং সাংস্কৃতিক দলের নাচ-গানের অভ্যর্থনা থাকা সত্ত্বেও একজন ‘অখ্যাত’ প্রতিমন্ত্রী দ্বারা শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানোর কারণে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের মনোকষ্ট লক্ষ্য করা গেছে। শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধী লোকজন নয়, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীও এমন ‘লো-প্রোফাইলের’ অভ্যর্থনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এমন দেশপ্রেম থাকা ভালো, কিন্তু অভ্যর্থনা জানানোর প্রটোকল তো সব দেশে এক রকম নয়। আমাদের দেশসহ অনেকগুলো দেশে সম-পদমর্যাদার ব্যক্তি বিমানবন্দরে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে থাকে। ভারতের রীতি হচ্ছে, যে কোন পদমর্যাদার ব্যক্তি ভারতের এলে তাকে বিমান বন্দরে স্বাগত জানান একজন প্রতিমন্ত্রী; কারণ, ভারতের মূল অভ্যর্থনা শুরু হয় অতিথির সফরের দ্বিতীয় দিন থেকে, দ্বিতীয় দিনে অতিথিকে রাষ্ট্রপতি ভবনে লালগালিচা অভ্যর্থনার মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। তবে এই রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন বিদেশি অতিথিকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ-ভারত পরস্পর প্রতিবেশী, অনেক সমস্যা রয়েছে, একটি সমস্যা সমাধানের পর নতুন আরেকটি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার লম্বা আন্তর্জাতিক সীমানার এক পাশে বাংলাদেশ এবং অপর পাশে ভারত। পাকিস্তান আমলেও চোরাচালানের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসত, বাংলাদেশ আমলেও একই অবস্থা বিরাজমান; কারণ, আমাদের দেশে জমির তুলনায় লোকসংখ্যা বেশি। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছাড়াও পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেয়ার জন্য কিছু যুবক বেআইনিভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত তাদের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করলেও তা দ্বারা চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। ভারতীয় সীমানা প্রহরা চৌকিগুলো এক সময় অনুপ্রবেশকারী দেখামাত্র গুলি চালানোর নীতি কার্যকর করত, আওয়ামী লীগ সরকারের চাপে সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। গুলি করে হত্যা করার বর্বর এই রীতিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করার ব্যাপারে ভারত ও বাংলাদেশ এবার সম্মত হয়েছে।

১৯৪৭ সনে দেশ ভাগের সময় সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফ। তাকে সময় দেয়া হয়েছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। র‌্যাডক্লিফ মানচিত্র বিভাজন থেকেই উদ্ভব হয়েছিল ১৬২টি ছিটমহলের। এই ছিটমহলগুলোর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ছিল ভারতের অভ্যন্তরে। পাকিস্তান আমলে ছিটমহলগুলো অদলবদল করার কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ফরোয়ার্ড ব্লক ছিটমহল বিনিময়ের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিলে তা মীমাংসা হতে লাগে আঠার বছর। শেখ হাসিনার আমলে ২০১৫ সনের ১ আগস্ট রাতে ছিটমহলগুলোর বিনিময় কার্যকর হয়। ছিটমহলগুলো অদলবদল হওয়ার পূর্বে এর অধিবাসীরা ভারত বা বাংলাদেশ কোন দেশের নাগরিক সুবিধাদি ভোগ করতে পারেনি। শেখ হাসিনার সফল কূটনীতির কারণে ছিটমহলবাসীর বন্দিজীবনের অবসান হয়।

ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয় পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সনে এবং উদ্বোধন করা হয় ১৯৭২ সনে। ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে মাওলানা ভাসানী লংমার্চ করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার বা মাওলানা ভাসানী কেন বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন না, তা আজও স্পষ্ট নয়। ভারত কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বাড়ানোর জন্য এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে ১৯৫১ সনে জওহরলাল নেহেরুর আমলে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান আমলে ফারাক্কা বাঁধের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। অথচ সিন্ধু নদের ওপর ভারতের অংশে বাঁধ নির্মাণের ফলে উদ্ভুত সমস্যার সমাধান পাকিস্তান করেছে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ১৯৬০ সনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পাদিত সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি বিশ্বে সফল নদী পানিবণ্টন চুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম। বঙ্গবন্ধু সমস্যাটির সমাধানে সমধিক গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৭৪ সনে বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী যে যৌথ বিবৃতি দেন তাতে উল্লেখ করা হয় যে, চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করবে না।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ভারত তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ফারাক্কার ইস্যুটি জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়। মুসলিম দেশগুলোসহ কোন দেশ জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগকে সমর্থন না করায় বাংলাদেশ ইস্যুটি অ্যাজেন্ডা থেকে উইথড্র করতে বাধ্য হয়। ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করতে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে পরামর্শ প্রদান করে। কারণ পৃথিবীর প্রায় সব দেশের কাছে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সুবিধা লাভের সুবিধার্থে জিয়াউর রহমান, হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ফারাক্কা চুক্তির কথা বলেছেন, কিন্তু সামান্যতম অগ্রগতিও হয়নি, এই তিন আমলে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সনে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই ফারাক্কা বাঁধ সমস্যার সমাধানে ব্রতি হন। বিষয়টি আঁচ করে বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, স্বল্প মেয়াদের চুক্তি করলে বিএনপি মানবে না। শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদের চুক্তি করায় বিএনপির মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৭ সনে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের আলাদা জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি আদায়ে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত ছিল। ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেও এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেনি; কারণ, ভারত সরকার সীমান্তে ঘাঁটি গড়তে শান্তি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাটি তখন এত সংঘাতময় ছিল যে, বাংলাদেশ ব্যাংককে চট্টগ্রাম অফিস থেকে হেলিকপ্টারে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় টাকা পাঠাতে হতো। পার্বত্য শান্তি চুক্তির আগে এবং পর খালেদা জিয়া বলতে থাকেন যে, শেখ হাসিনা ফেনী পর্যন্ত ভারতকে দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই চুক্তির পরও খালেদা জিয়া বহু বছর ফেনীর একটি আসনের এমপি ছিলেন। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে শেখ হাসিনা সমুদ্রসীমা বিরোধ মিটিয়ে সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন।

জিয়াউর রহমান, হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়াও রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গিয়েছেন, তারা ভারত থেকে উল্লেখ করার মতো কী কী বেনিফিট এনেছেন তার কোন তালিকা নেই। বিএনপির একটি কমন অভিযোগ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর স্বার্বভৌমত্ব আদৌ আছে কি না, তা গবেষণার বিষয়। দেশ বেচার অভিযোগ শেরে বাংলাকেও মুসলিম লীগ দিত। শেরে বাংলা জবাবে একবার বলেছিলেন, মুসলিম লীগ দেশের যে খারাপ অবস্থা করেছে, বিক্রি করতে চাইলেও কেউ কিনবে না। ট্রানজিট ইস্যু বরাবরই বিএনপির কাছে রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ দিয়েছে। এবার ভারত বাংলাদেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, এতে কি ভারতের স্বার্বভৌমত্বের খর্ব হবে?

অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের ইস্যুটি শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপানোর কারণ স্পষ্ট নয়। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন তিস্তা পানিবণ্টনের কোন উদ্যোগ নিয়েছে বলে তো শোনা যায় না। শেখ হাসিনা যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তা তো দৃশ্যমান। এই সব জাতীয় সঙ্কটকে নির্বাচনে জেতার ইস্যু করলে সংকটের সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৯৭২ সনে সম্পাদিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি নিয়েও দেশ বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু বিএনপির মওদুদ আহমেদ এই চুক্তির প্রশংসাই করেছিলেন।

আওয়ামী লীগকে হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দেয়, যেমন মুসলমানেরা দলবদ্ধ হয়ে ভোট দেয় মমতা ব্যানার্জিকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে উলফার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ প্রশ্রয় দেয় না; এই কারণে ভারতের সব দলের নেতারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে। সম্ভবত কিছু লোকের ভারত বিরোধিতার এটাও একটা কারণ। প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতা জিইয়ে রেখে স্বস্তি পাওয়া কঠিন। ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের মাপকাঠি শুধু দেয়া-নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস তৈরির জন্যও মাঝেমধ্যে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সৌজন্য ভ্রমণে যাওয়া সমীচীন। বিএনপি এটা বোঝে, তবে বোঝে শুধু ক্ষমতায় থাকলে।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ কী

শিক্ষকতা কেন আমাদের দেশে ‘বাই চান্স’ পেশা?

অর্থনীতিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে স্টার্টআপ

উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও সম্ভাবনা : একটি অনুভাবনা

জাগো বহ্নিশিখা

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আচরণ প্রসঙ্গে

ছবি

শাকিব খান, দুষ্মন্ত-শকুন্তলা এবং নায়িকা সমাচার

ছোটদের লেখাপড়ায় নিতে হবে মেগা প্রকল্প

ছবি

সার্বজনীন দুর্গাৎসব

বেদিয়া ও কুর্মি জাতিসত্তার হোক স্বতন্ত্র পরিচয়

ডিজিটাল শিল্পযুগ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ছবি

সর্বজনীন থেকে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠা দুর্গোৎসব

যে কারণে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ প্রয়োজন

সীমান্তে উত্তেজনা, কী চায় মায়ানমার

সত্যি ওরা পেরেছে

শিশু নির্যাতনের প্রতিকারের পথে বাধা কী

আত্মগোপন, নিখোঁজ আর গুম

আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস

বাঁচো, বাঁচো এবং বাঁচো

কন্যাশিশুকে শিক্ষায়ও এগিয়ে থাকতে হবে 

বুদ্ধিজীবিতার দায়

আদিবাসীর তালিকা নিয়ে বিতর্ক কেন

সত্য কাজে কেউ নয় রাজি

মেগা প্রকল্প ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

শেষ আফ্রিকান টিক ওক গাছটি কি মারা গেছে?

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হোক

ছবি

সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাক পাঠ্যবই

ডিজিটাল শিল্পযুগ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্ব

কৃষি ও কম্পিউটার শিক্ষা বাস্তবমুখী হওয়া প্রয়োজন

জনপ্রিয়তা, সম্মান এবং সৃষ্টি সুখের গোপন তরিকা

ছবি

বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার চামড়া রপ্তানি করা সম্ভব

ছবি

স্বপ্নছোঁয়া জয় ও এগিয়ে যাওয়ার পথনকশা

সড়ক দুর্ঘটনার মূল্য কত

ছবি

হার না মানা লাল-সবুজের মেয়েরা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

শেখ হাসিনা ভারত থেকে কী কী এনেছেন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে ভারত গিয়েছিলেন

শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে ভারত গিয়েছিলেন। দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ভারতের রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম জারদোশ। দুই দেশের মধ্যে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে-সীমান্ত হত্যা বন্ধে দুই দেশ অঙ্গীকার করেছে, সিলেটের কুশিয়ারা নদীর পানির হিস্যা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। ১৯৯৬ সনে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির পর এই প্রথম আরেকটি অভিন্ন নদী কুশিয়ারার পানিবণ্টন প্রসঙ্গে সমঝোতা হলো। বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির জন্য ভারত বিনা মূল্যে ট্রানজিটের প্রস্তাবও দিয়েছে। ভারতের নির্ধারিত স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশ নেপাল, ভুটানের সঙ্গে ব্যবসায় এ সুবিধা নিতে পারবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ, পণ্যের ঘাটতি এবং অত্যধিক মূল্যস্ফীতির মধ্যে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা খুবই জরুরি। বিশ্ব যেভাবে অর্থনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়ে মহামন্দার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তাতে পৃথিবীর অনুন্নত ও গরিব দেশগুলো দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে, হাজার হাজার শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, লাখ লাখ কর্মহীন লোক অনাহারে মারা যেতে পারে, লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে দেশে গণ-অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাংলাদেশের আপদকালীন খাদ্য ও জ্বালানির নিশ্চয়তা বিধানে ভারতের আশ্বাস কিছুটা স্বস্তি দেবে। এ ছাড়া পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশ এক সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির তরফ থেকে নানাবিধ হতাশাব্যঞ্জক কথাবার্তা উচ্চারিত হচ্ছে। বিএনপি বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতবার ভারত সফরে গিয়েছেন ততবার শুধু দিয়ে এসেছেন, নিয়ে আসতে পারেননি। সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার আরেকটি কমন কথা চৈনিক বামপন্থীদের মতো বিএনপি ইদানীং খুব ঘন ঘন বলছে। বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং সাংস্কৃতিক দলের নাচ-গানের অভ্যর্থনা থাকা সত্ত্বেও একজন ‘অখ্যাত’ প্রতিমন্ত্রী দ্বারা শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানোর কারণে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের মনোকষ্ট লক্ষ্য করা গেছে। শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধী লোকজন নয়, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীও এমন ‘লো-প্রোফাইলের’ অভ্যর্থনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এমন দেশপ্রেম থাকা ভালো, কিন্তু অভ্যর্থনা জানানোর প্রটোকল তো সব দেশে এক রকম নয়। আমাদের দেশসহ অনেকগুলো দেশে সম-পদমর্যাদার ব্যক্তি বিমানবন্দরে অতিথিকে অভ্যর্থনা জানিয়ে থাকে। ভারতের রীতি হচ্ছে, যে কোন পদমর্যাদার ব্যক্তি ভারতের এলে তাকে বিমান বন্দরে স্বাগত জানান একজন প্রতিমন্ত্রী; কারণ, ভারতের মূল অভ্যর্থনা শুরু হয় অতিথির সফরের দ্বিতীয় দিন থেকে, দ্বিতীয় দিনে অতিথিকে রাষ্ট্রপতি ভবনে লালগালিচা অভ্যর্থনার মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়। তবে এই রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে শেখ হাসিনাসহ কয়েকজন বিদেশি অতিথিকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ-ভারত পরস্পর প্রতিবেশী, অনেক সমস্যা রয়েছে, একটি সমস্যা সমাধানের পর নতুন আরেকটি সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার লম্বা আন্তর্জাতিক সীমানার এক পাশে বাংলাদেশ এবং অপর পাশে ভারত। পাকিস্তান আমলেও চোরাচালানের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসত, বাংলাদেশ আমলেও একই অবস্থা বিরাজমান; কারণ, আমাদের দেশে জমির তুলনায় লোকসংখ্যা বেশি। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছাড়াও পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেয়ার জন্য কিছু যুবক বেআইনিভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত তাদের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করলেও তা দ্বারা চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। ভারতীয় সীমানা প্রহরা চৌকিগুলো এক সময় অনুপ্রবেশকারী দেখামাত্র গুলি চালানোর নীতি কার্যকর করত, আওয়ামী লীগ সরকারের চাপে সম্প্রতি কিছুটা কমেছে। গুলি করে হত্যা করার বর্বর এই রীতিটি সম্পূর্ণ বন্ধ করার ব্যাপারে ভারত ও বাংলাদেশ এবার সম্মত হয়েছে।

১৯৪৭ সনে দেশ ভাগের সময় সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফ। তাকে সময় দেয়া হয়েছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। র‌্যাডক্লিফ মানচিত্র বিভাজন থেকেই উদ্ভব হয়েছিল ১৬২টি ছিটমহলের। এই ছিটমহলগুলোর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ছিল ভারতের অভ্যন্তরে। পাকিস্তান আমলে ছিটমহলগুলো অদলবদল করার কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ফরোয়ার্ড ব্লক ছিটমহল বিনিময়ের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিলে তা মীমাংসা হতে লাগে আঠার বছর। শেখ হাসিনার আমলে ২০১৫ সনের ১ আগস্ট রাতে ছিটমহলগুলোর বিনিময় কার্যকর হয়। ছিটমহলগুলো অদলবদল হওয়ার পূর্বে এর অধিবাসীরা ভারত বা বাংলাদেশ কোন দেশের নাগরিক সুবিধাদি ভোগ করতে পারেনি। শেখ হাসিনার সফল কূটনীতির কারণে ছিটমহলবাসীর বন্দিজীবনের অবসান হয়।

ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয় পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সনে এবং উদ্বোধন করা হয় ১৯৭২ সনে। ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে মাওলানা ভাসানী লংমার্চ করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার বা মাওলানা ভাসানী কেন বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন না, তা আজও স্পষ্ট নয়। ভারত কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বাড়ানোর জন্য এই বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে ১৯৫১ সনে জওহরলাল নেহেরুর আমলে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তান আমলে ফারাক্কা বাঁধের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। অথচ সিন্ধু নদের ওপর ভারতের অংশে বাঁধ নির্মাণের ফলে উদ্ভুত সমস্যার সমাধান পাকিস্তান করেছে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ১৯৬০ সনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পাদিত সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি বিশ্বে সফল নদী পানিবণ্টন চুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম। বঙ্গবন্ধু সমস্যাটির সমাধানে সমধিক গুরুত্বারোপ করেন। ১৯৭৪ সনে বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী যে যৌথ বিবৃতি দেন তাতে উল্লেখ করা হয় যে, চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করবে না।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ভারত তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ফারাক্কার ইস্যুটি জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়। মুসলিম দেশগুলোসহ কোন দেশ জিয়াউর রহমানের এই উদ্যোগকে সমর্থন না করায় বাংলাদেশ ইস্যুটি অ্যাজেন্ডা থেকে উইথড্র করতে বাধ্য হয়। ভারতের সঙ্গে সমঝোতা করে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করতে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে পরামর্শ প্রদান করে। কারণ পৃথিবীর প্রায় সব দেশের কাছে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সুবিধা লাভের সুবিধার্থে জিয়াউর রহমান, হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ফারাক্কা চুক্তির কথা বলেছেন, কিন্তু সামান্যতম অগ্রগতিও হয়নি, এই তিন আমলে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে কোলকাতা বন্দরের নাব্যতা বাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সনে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই ফারাক্কা বাঁধ সমস্যার সমাধানে ব্রতি হন। বিষয়টি আঁচ করে বদরুদ্দোজা চৌধুরী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, স্বল্প মেয়াদের চুক্তি করলে বিএনপি মানবে না। শেখ হাসিনা ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদের চুক্তি করায় বিএনপির মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৭ সনে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের আলাদা জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি আদায়ে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত ছিল। ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করেও এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেনি; কারণ, ভারত সরকার সীমান্তে ঘাঁটি গড়তে শান্তি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাটি তখন এত সংঘাতময় ছিল যে, বাংলাদেশ ব্যাংককে চট্টগ্রাম অফিস থেকে হেলিকপ্টারে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় টাকা পাঠাতে হতো। পার্বত্য শান্তি চুক্তির আগে এবং পর খালেদা জিয়া বলতে থাকেন যে, শেখ হাসিনা ফেনী পর্যন্ত ভারতকে দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই চুক্তির পরও খালেদা জিয়া বহু বছর ফেনীর একটি আসনের এমপি ছিলেন। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে শেখ হাসিনা সমুদ্রসীমা বিরোধ মিটিয়ে সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছেন।

জিয়াউর রহমান, হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এবং খালেদা জিয়াও রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গিয়েছেন, তারা ভারত থেকে উল্লেখ করার মতো কী কী বেনিফিট এনেছেন তার কোন তালিকা নেই। বিএনপির একটি কমন অভিযোগ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর স্বার্বভৌমত্ব আদৌ আছে কি না, তা গবেষণার বিষয়। দেশ বেচার অভিযোগ শেরে বাংলাকেও মুসলিম লীগ দিত। শেরে বাংলা জবাবে একবার বলেছিলেন, মুসলিম লীগ দেশের যে খারাপ অবস্থা করেছে, বিক্রি করতে চাইলেও কেউ কিনবে না। ট্রানজিট ইস্যু বরাবরই বিএনপির কাছে রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ দিয়েছে। এবার ভারত বাংলাদেশকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, এতে কি ভারতের স্বার্বভৌমত্বের খর্ব হবে?

অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের ইস্যুটি শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপানোর কারণ স্পষ্ট নয়। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন তিস্তা পানিবণ্টনের কোন উদ্যোগ নিয়েছে বলে তো শোনা যায় না। শেখ হাসিনা যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তা তো দৃশ্যমান। এই সব জাতীয় সঙ্কটকে নির্বাচনে জেতার ইস্যু করলে সংকটের সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। ১৯৭২ সনে সম্পাদিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি নিয়েও দেশ বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু বিএনপির মওদুদ আহমেদ এই চুক্তির প্রশংসাই করেছিলেন।

আওয়ামী লীগকে হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দেয়, যেমন মুসলমানেরা দলবদ্ধ হয়ে ভোট দেয় মমতা ব্যানার্জিকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে উলফার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ প্রশ্রয় দেয় না; এই কারণে ভারতের সব দলের নেতারা আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে। সম্ভবত কিছু লোকের ভারত বিরোধিতার এটাও একটা কারণ। প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরিতা জিইয়ে রেখে স্বস্তি পাওয়া কঠিন। ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের মাপকাঠি শুধু দেয়া-নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস তৈরির জন্যও মাঝেমধ্যে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সৌজন্য ভ্রমণে যাওয়া সমীচীন। বিএনপি এটা বোঝে, তবে বোঝে শুধু ক্ষমতায় থাকলে।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

back to top