alt

উপ-সম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব

সন্ধ্যা রানী সাহা

: বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২

বিশ্বায়নের এলোপাতাড়ি ঢেউ আর অস্থির অবস্থায় সারা বিশ্বের সাথে আমরাও কিছুটা ঝুঁকির মুখে। আর এ ঝুঁকিকে মোকাবেলার জন্য আমাদের শ্রেণীকক্ষের পাঠদান প্রক্রিয়া বিশ^মানের হওয়া প্রয়োজন। কারণ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রক্রিয়া বা বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রণালির অংশ। তাই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করা আবশ্যক যেন ভর্তিকৃত প্রতিটি শিশু প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নির্ধারিত ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে।

কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এলো, কিছু অনুপস্থিত থাকলো, কেউ কেউ শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো, বেশিরভাগ পারলো না- এমনভাবে চলতে পারে না। শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে আকর্ষণীয় উপকরণ, উদাহরণ এবং অঙ্গভঙ্গির অবতারণা করলেন না, শ্রেণীকক্ষে মাল্টিমিডিয়া-প্রজেক্টর-ল্যাপটপ ইত্যাদির ব্যবহার করা হলো না, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জন হলো না ইত্যাদি বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক বিবেচনার কোনো উপায় আর নেই। কারণ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থরাই পরবর্তীতে কুশিক্ষিত যুবকে পরিণত হয়ে সামাজকে অস্থির করে তুলছে। এসব অস্থির যুবকেরা প্রয়োজনীয় অর্থ অর্জনে সুযোগ সৃষ্টির অক্ষমতার কারণে সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। এখনই এসব বিষয়কে বিবেচনায় না আনতে পারলে ভবিষ্যতে এদের সংখ্যা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি একটি স্কুল-পরিদর্শনকালে শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমি প্রশ্ন করলাম- ‘What class are you in?’ শিক্ষার্থীরা একযোগে উত্তর দিল ‘I am in class five’ নির্দিষ্ট কাউকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা ঠিক ছিল।

কিন্তু আমি বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটি করি নাই। আমার দৃষ্টি ছিল সামনে উপবিষ্ট শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার্থীদের উচ্চতা ছাড়িয়ে সামনের দেওয়ালের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে। অর্থাৎ আমি সবার উদ্দেশ্যেই প্রশ্নটি করেছিলাম। তাই We are in class five বলে জবাব দিলে যথাযথ হতো। ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানরত শিক্ষকও বিষয়টিকে ধরতে পারেননি। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘শিক্ষক খুব মেধাবী, রসায়নে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রিধারী কিন্তু জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।’

এ চিত্র যে শুধু একটি বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণীর তা নয়। অথচ আমরা জানি যে, শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের মূল প্রক্রিয়াই হলো প্রশ্ন-উত্তরমূলক কার্যকলাপ। সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক বেশি আর প্রধান শিক্ষক তার চেয়ে কম এই চিন্তা করে শ্রেণীকক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে প্রধান শিক্ষককে বিরত হলে চলবে না। শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি থাকলেও শেখানোর যোগ্যতা কম থাকতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক এবং তৃণমূল পর্যায়ের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের অধিকতর তৎপর হতে হবে। শ্রেণী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের কার্যাবলী নিয়মিত তদারকি করবেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা।

এতক্ষণ যাদের কথা বলা হলো তারা হলেন সেবা দানকারী ব্যক্তিবর্গের দল। বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আরেকটি দল রয়েছে তা হলো সেবা গ্রহণকারী দল। এ দলে রয়েছে প্রথমত শিক্ষার্থী। অতঃপর অভিভাবক, এলাকাবাসী, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি, জনপ্রতিনিধি, সমাজ, রাষ্ট্র, সকলই। এ সেবাদানকারী এবং সেবা গ্রহণকারী উভয় প্রকার দলের মধ্যে পারস্পারিক বন্ধন এবং একই দলের একে অপরের মধ্যকার যে শিশু-শিক্ষাকেন্দ্রিক মিথস্ক্রিয়া তাই হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক। এভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যালয়টি যথাযথ মর্যাদা পেতে পারে। আবার এর অভাবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। অতএব সেবাদানকারী এবং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে আন্তর্ব্যক্তিক সুসর্ম্পকের ওপরই প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে। আমাদের বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে সমস্ত স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন (সেবাদানকারী এবং সেবাগ্রহণকারী উভয়ই বিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন) তথা ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন তাদের মধ্যকার সুসম্পর্ক অর্থাৎ আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সুসম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করতে পারে। আমরা লক্ষ্য করে থাকি যে শিশুরা সাধারণত পিতামাতার কথার তুলনায় শিক্ষকের কথাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আমরা এ কারণে অনেকটা গর্ববোধও করে থাকি।

কিন্তু এমনটি ভাবলে চলবে না। এহেন অবস্থায় বুঝতে হবে যে বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাড়ির অভিভাবকদের মধ্যে সম্পর্কের একটা তিক্ততা তৈরি হয়েছে; যা দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক তার ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দ, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুপ্রবেশ করাতে পারেন। অভিভাবকদের এজন্য শ্রেণী পাঠদান পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকা জরুরি। নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষক শ্রেণী-পাঠদান করবেন অভিভাবদের উপস্থিতিতে। শ্রেণীকক্ষে স্থান সংকুলান না হলে বিদ্যালয়ের মাঠে নির্দিষ্ট শ্রেণী-পাঠদান প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগও আর থাকবে না। শিক্ষক এবং অভিভাবকরা পরস্পরকে চিনতে পারবেন। তাদের মধ্যে অধিকতর আন্তর্ব্যক্তিক সুসম্পর্ক স্থাপিত হবার সুযোগ তৈরি হবে। বাস্তবে বর্তমানে অনেক শিক্ষকের সন্তানই ভালো করছে কিন্তু অন্যরা পারছে না। শিক্ষকরা অনুরূপ পক্ষপাতিত্ব থেকে অনায়াসে নিজেদের সরিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। তারা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যের সাথে একাত্ম হয়ে আরও সক্রিয়ভাবে নিজেদের নিবেদিত করে একযোগে বাংলাদেশের সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিতে ব্রতী হবেন। দেশে ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৮৭৩১টি। ২০২০ সালে তা ১,২৯,২৫৮টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন ১,১৭,২৭৫ জন। ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭,২১,৮০১ জন। ১৯৭১ সালে শিক্ষক-শিক্ষর্থীর অনুপাত ছিল ১ : ৪৩ এবং ২০২০ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১ : ২৮ এ।

১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০,৯০,০০৩ জন। ২০২০ সালে এ সংখ্যা হয়েছে ২,০১,২২,৩৩৭ জন। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৩১.৮%। ২০২০ সালে তা ৫১.১% হয়। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক ছিলেন ২.২%। ২০২০ তা উন্নীত হয় ৬০.৪% এ। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ছিল ৫২.০% । ২০২০ সালে ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯৭.৩%। ১৯৭১ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৭৮.৯%। ২০২০ সালে তা কমে ১৭.৯%। অর্থাৎ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্র্ণজয়ন্তী উদযাপন পর্যন্ত নানাবিধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। চলতি সরকারের সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, সমাজসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে কোনো সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা-প্রাপ্তি নিয়ে আমরা এখনও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নই। অথচ এটি বাংলাদেশের সকল শিশুর সাংবিধানিক অধিকার।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের হাত ধরে মেশিন টুলস, টেক্সটাইল মেশিনারি ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়। এগুলোর বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে ১৭৬০-১৮৪০ সময়ে ইউরোপে শিল্প-বাণিজ্যের যে অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয় তা প্রথম শিল্প বিপ্লব নামে পরিচিত।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে (১৮৭১-১৯১৪) ইলেকট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, রেলওয়ে-মোটরকার (১৮৮৬) অ্যারোডিনামিক্স (১৯০৯) ইত্যাদির আবিষ্কার ও ব্যবহার বিশ^কে আরেক দফায় উন্নতির চরম পর্যায়ে পেঁৗঁছে দেয়; যাকে বলা হয় দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শুরু বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি (১৯৫০ এর দশকের শেষদিকে) শুরু কম্পিউটার তথা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে। উৎপাদন প্রক্রিয়াতে কম্পিউটার এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে কারণে যন্ত্রপাতি মানব শক্তির জায়গা দখল করতে শুরু করলো। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের পর সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দরজায় এসে হাজির হলো আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) বিগ ডেটা, ব্লক-চেইন, ক্লাউড অ্যান্ড কম্পিউটিং, রোবটিকস, ন্যানো টেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ইত্যাদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জ্ঞানভিত্তিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।

এমন যুগ সন্ধিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তিতে যেন আমাদের অংশগ্রহণ দ্রুততর হতে পারে এবং বঞ্চিতরা তথ্য প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে পারে সেভাবেই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনা করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভল্যুশনের প্রভাব, সম্ভব্যতা, চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবেলায় আমাদের করণীয় বিষয়ে ভাবতে হবে। গতানুগতিক মুখস্থ, পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেট-অর্জন নির্ভর সকল তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ পরিহার করে চতুর্থ বা তার পরবর্তী শিল্প বিপ্লব প্রসূত কর্মবাজারে প্রবেশের উপযোগী করে সাজাতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান মানব-কর্মীর বদলে রোবটকে কর্মী হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। জ্ঞানভিত্তিক এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিপুূলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার বহুগুণ কর্মক্ষেত্র। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা না গেলে বাংলাদেশ কিভাবে এই বৈশি^ক পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে? কাজেই বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য মোতাবেক দেশের সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত বাংলাদেশকে করতেই হবে।

এক্ষেত্রে তৃণমুল পর্যায়ের কর্মকর্তা অর্থাৎ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা স্থানীয় (নিজ জেলায় কর্মরত) বিধায় স্থানীয় মানবগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে সৃজনশীল মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন এবং তাদের মধ্যে শিশু শিক্ষাকেন্দ্রিক যে আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের প্রয়োজন তা সৃষ্টিতে তারা এখনও কাক্সিক্ষত সফলতা দেখাতে পারেননি। যদিও তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন যাবৎ নিজ জেলায় কর্মরত থেকেছেন কিংবা আছেন। তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে সাধারণ জনগোষ্ঠীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে জেলা শহরে বসবাস করছেন।

তবে স্থানীয়দের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, ভিলেজ পলিটিক্সে জড়ানো এবং আত্মীয়-শিক্ষকের ছাড় দিয়ে চলার নীতিতে তাদের কারো কারো ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। কাজেই সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারগণকে দ্রুত নিজ জেলার বাইরে বদলি করে তাদের পক্ষপাত শূন্য হয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া সুশাসন আর উন্নয়নের জন্য মঙ্গল। পরিদর্শনে গিয়ে শুধু বিদ্যালয় দর্শন এবং প্রত্যাবর্তনের পর নিজ বাসস্থানে আত্মনিমগ্ন জীবন নয়। তাদের এখন শিশুদের কিভাবে চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব প্রসূত জ্ঞান এবং প্রযুক্তি অর্জনের উপযোগী করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো যায় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যালয়ে মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ ইত্যাদি চলাকালে অভিভাবকরা শিশুকেন্দ্রিক সমস্যা/সম্ভাবনা উপস্থাপনের সুযোগ তেমন পায় না বা পেলেও ঠিকঠাক মতো উপস্থাপন করতে পারে না বা অংশীজন হিসেবে অংশীদারি স্বার্থ আদায় করতে পারে না। সেসব সভা-সমাবেশে থাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা এবং ক্ষমতাসীনদের প্রাধান্য। ফলশ্রুতিতে যার সন্তান তাকেই পড়িয়ে পাশ করিয়ে আনতে হয়। কতিপয় বিদ্যালয় যেন শুধুই সার্টিফিকেট দাতা। এ পদ্ধতির অনতিবিলম্বে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এ পরিবর্তনের সূচনায় প্রথমেই সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের জেলার বাইরে বদলি নিশ্চিত করতে হবে। আসবে অন্য জেলা থেকে নতুন পক্ষপাতহীন সবার অনাত্মীয়, নিরপেক্ষ, নিরলস, সবার প্রতি মিত্রভাবাপন্ন, এলাকার সব বিষয়ে অজ্ঞাত এবং দক্ষ পেশাদার সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার তথা সমাজকর্মী। যার হাত ধরে প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ের সব শিশু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে যাবে।

প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের মাঝে সময়ের ফাঁরাক ছিল গড়ে ৭৫ বছর। আর চলতি চতুর্থ বিপ্লব শুরু হয়েছে মাত্র ২০১১ সালে। ডিজিটাল প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে মনে হয় যে, কয়েক বছরের মধ্যে শুনবো পঞ্চম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। অতএব এখনই সময় আমাদের প্রস্তুত হওয়ার। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণে আমাদের সবাইকে সেভাবেই সচেতন হতে হবে।

[লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ]

ছবি

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সিটিজেনস চার্টার প্রসঙ্গে

ছবি

টেলিকমের বিশ্ব সেরা মেলায়

এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি

চীন-জাপানের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

সরকারি প্রাথমিকে এক শিফট চালু করা কতটা যৌক্তিক

ডোপামিনের কারসাজি ও মুক্তির পথ

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও প্রশ্নহীন প্রণোদনার বীজ

ছবি

ক্ষমতার মোহমুক্ত এক রাজনীতিক

পাবনার বইমেলা

ক্যান্সার সেবায় বৈষম্য নয়

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা

খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ করে লাভ কী

ছবি

মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের দুই বছর

পাঠ্যপুস্তকে বিবর্তনবাদ বিতর্ক

যোগাযোগে নতুন দিনের সূচনা

টেকসই উন্নয়নের জন্য মানসম্মত শিক্ষা

একজন ইউএনওর বিদায়ে মানুষ কাঁদল কেন

ছবি

সাপলুডু খেলার অবসান চাই

কৃষি খাতে যান্ত্রিকীকরণ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে

ধর্মীয় সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা ভালো নেই

বঙ্গবন্ধু, বাংলা ও বাঙালি

ডিসি সম্মেলন : ধান ভানতে শিবের গীত

সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মায়ের স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

নতুন কারিকুলামে ইংরেজি শিখন-শেখানো কেমন হবে

বিপর্যয়ের মুখে ধান ও পাট আবাদ : বিপাকে কৃষককুল

বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস

নগরে আগুন লাগলে দেবালয় কি অক্ষত থাকে

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি

পাঠ্য বইয়ে ডারউইনের তত্ত্ব

ভাঙ্গা-মাওয়া এক্সপ্রেস সড়কে দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থা নিন

প্রাণীর জন্য ভালোবাসা

সন্দেহের বশে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার

শিক্ষকরাই পারেন শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ শেখাতে

ফ্লোর প্রাইস ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার

tab

উপ-সম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব

সন্ধ্যা রানী সাহা

বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২

বিশ্বায়নের এলোপাতাড়ি ঢেউ আর অস্থির অবস্থায় সারা বিশ্বের সাথে আমরাও কিছুটা ঝুঁকির মুখে। আর এ ঝুঁকিকে মোকাবেলার জন্য আমাদের শ্রেণীকক্ষের পাঠদান প্রক্রিয়া বিশ^মানের হওয়া প্রয়োজন। কারণ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান প্রক্রিয়া বা বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রণালির অংশ। তাই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করা আবশ্যক যেন ভর্তিকৃত প্রতিটি শিশু প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নির্ধারিত ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে সৃষ্টিশীল হয়ে উঠে।

কিছু শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এলো, কিছু অনুপস্থিত থাকলো, কেউ কেউ শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলো, বেশিরভাগ পারলো না- এমনভাবে চলতে পারে না। শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে আকর্ষণীয় উপকরণ, উদাহরণ এবং অঙ্গভঙ্গির অবতারণা করলেন না, শ্রেণীকক্ষে মাল্টিমিডিয়া-প্রজেক্টর-ল্যাপটপ ইত্যাদির ব্যবহার করা হলো না, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর শিখনফল অর্জন হলো না ইত্যাদি বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক বিবেচনার কোনো উপায় আর নেই। কারণ প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থরাই পরবর্তীতে কুশিক্ষিত যুবকে পরিণত হয়ে সামাজকে অস্থির করে তুলছে। এসব অস্থির যুবকেরা প্রয়োজনীয় অর্থ অর্জনে সুযোগ সৃষ্টির অক্ষমতার কারণে সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। এখনই এসব বিষয়কে বিবেচনায় না আনতে পারলে ভবিষ্যতে এদের সংখ্যা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি একটি স্কুল-পরিদর্শনকালে শ্রেণীকক্ষে ঢুকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমি প্রশ্ন করলাম- ‘What class are you in?’ শিক্ষার্থীরা একযোগে উত্তর দিল ‘I am in class five’ নির্দিষ্ট কাউকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা ঠিক ছিল।

কিন্তু আমি বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটি করি নাই। আমার দৃষ্টি ছিল সামনে উপবিষ্ট শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার্থীদের উচ্চতা ছাড়িয়ে সামনের দেওয়ালের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে। অর্থাৎ আমি সবার উদ্দেশ্যেই প্রশ্নটি করেছিলাম। তাই We are in class five বলে জবাব দিলে যথাযথ হতো। ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানরত শিক্ষকও বিষয়টিকে ধরতে পারেননি। প্রধান শিক্ষক বললেন, ‘শিক্ষক খুব মেধাবী, রসায়নে অনার্স এবং মাস্টার্স ডিগ্রিধারী কিন্তু জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।’

এ চিত্র যে শুধু একটি বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণীর তা নয়। অথচ আমরা জানি যে, শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের মূল প্রক্রিয়াই হলো প্রশ্ন-উত্তরমূলক কার্যকলাপ। সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনেক বেশি আর প্রধান শিক্ষক তার চেয়ে কম এই চিন্তা করে শ্রেণীকক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে প্রধান শিক্ষককে বিরত হলে চলবে না। শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি থাকলেও শেখানোর যোগ্যতা কম থাকতে পারে। এক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক এবং তৃণমূল পর্যায়ের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের অধিকতর তৎপর হতে হবে। শ্রেণী শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের কার্যাবলী নিয়মিত তদারকি করবেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা।

এতক্ষণ যাদের কথা বলা হলো তারা হলেন সেবা দানকারী ব্যক্তিবর্গের দল। বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আরেকটি দল রয়েছে তা হলো সেবা গ্রহণকারী দল। এ দলে রয়েছে প্রথমত শিক্ষার্থী। অতঃপর অভিভাবক, এলাকাবাসী, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি, জনপ্রতিনিধি, সমাজ, রাষ্ট্র, সকলই। এ সেবাদানকারী এবং সেবা গ্রহণকারী উভয় প্রকার দলের মধ্যে পারস্পারিক বন্ধন এবং একই দলের একে অপরের মধ্যকার যে শিশু-শিক্ষাকেন্দ্রিক মিথস্ক্রিয়া তাই হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক। এভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যালয়টি যথাযথ মর্যাদা পেতে পারে। আবার এর অভাবে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। অতএব সেবাদানকারী এবং সেবা প্রদানকারীর মধ্যে আন্তর্ব্যক্তিক সুসর্ম্পকের ওপরই প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে। আমাদের বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে সমস্ত স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন (সেবাদানকারী এবং সেবাগ্রহণকারী উভয়ই বিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডার বা অংশীজন) তথা ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন তাদের মধ্যকার সুসম্পর্ক অর্থাৎ আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্ক শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সুসম্পর্ক স্থাপনে সহায়তা করতে পারে। আমরা লক্ষ্য করে থাকি যে শিশুরা সাধারণত পিতামাতার কথার তুলনায় শিক্ষকের কথাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আমরা এ কারণে অনেকটা গর্ববোধও করে থাকি।

কিন্তু এমনটি ভাবলে চলবে না। এহেন অবস্থায় বুঝতে হবে যে বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাড়ির অভিভাবকদের মধ্যে সম্পর্কের একটা তিক্ততা তৈরি হয়েছে; যা দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক তার ব্যক্তিগত পছন্দ, অপছন্দ, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদি শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুপ্রবেশ করাতে পারেন। অভিভাবকদের এজন্য শ্রেণী পাঠদান পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকা জরুরি। নির্দিষ্ট দিনে শিক্ষক শ্রেণী-পাঠদান করবেন অভিভাবদের উপস্থিতিতে। শ্রেণীকক্ষে স্থান সংকুলান না হলে বিদ্যালয়ের মাঠে নির্দিষ্ট শ্রেণী-পাঠদান প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগও আর থাকবে না। শিক্ষক এবং অভিভাবকরা পরস্পরকে চিনতে পারবেন। তাদের মধ্যে অধিকতর আন্তর্ব্যক্তিক সুসম্পর্ক স্থাপিত হবার সুযোগ তৈরি হবে। বাস্তবে বর্তমানে অনেক শিক্ষকের সন্তানই ভালো করছে কিন্তু অন্যরা পারছে না। শিক্ষকরা অনুরূপ পক্ষপাতিত্ব থেকে অনায়াসে নিজেদের সরিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ হবেন। তারা বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যের সাথে একাত্ম হয়ে আরও সক্রিয়ভাবে নিজেদের নিবেদিত করে একযোগে বাংলাদেশের সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিতে ব্রতী হবেন। দেশে ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৮৭৩১টি। ২০২০ সালে তা ১,২৯,২৫৮টিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন ১,১৭,২৭৫ জন। ২০২০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭,২১,৮০১ জন। ১৯৭১ সালে শিক্ষক-শিক্ষর্থীর অনুপাত ছিল ১ : ৪৩ এবং ২০২০ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১ : ২৮ এ।

১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০,৯০,০০৩ জন। ২০২০ সালে এ সংখ্যা হয়েছে ২,০১,২২,৩৩৭ জন। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৩১.৮%। ২০২০ সালে তা ৫১.১% হয়। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক ছিলেন ২.২%। ২০২০ তা উন্নীত হয় ৬০.৪% এ। ১৯৭১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ছিল ৫২.০% । ২০২০ সালে ভর্তির হার বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৯৭.৩%। ১৯৭১ সালে ঝরে পড়ার হার ছিল ৭৮.৯%। ২০২০ সালে তা কমে ১৭.৯%। অর্থাৎ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্র্ণজয়ন্তী উদযাপন পর্যন্ত নানাবিধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। চলতি সরকারের সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, সমাজসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে কোনো সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা-প্রাপ্তি নিয়ে আমরা এখনও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নই। অথচ এটি বাংলাদেশের সকল শিশুর সাংবিধানিক অধিকার।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের হাত ধরে মেশিন টুলস, টেক্সটাইল মেশিনারি ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়। এগুলোর বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে ১৭৬০-১৮৪০ সময়ে ইউরোপে শিল্প-বাণিজ্যের যে অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয় তা প্রথম শিল্প বিপ্লব নামে পরিচিত।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষাংশে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে (১৮৭১-১৯১৪) ইলেকট্রিসিটি বা বিদ্যুৎ আবিষ্কারের ফলে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, রেলওয়ে-মোটরকার (১৮৮৬) অ্যারোডিনামিক্স (১৯০৯) ইত্যাদির আবিষ্কার ও ব্যবহার বিশ^কে আরেক দফায় উন্নতির চরম পর্যায়ে পেঁৗঁছে দেয়; যাকে বলা হয় দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শুরু বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি (১৯৫০ এর দশকের শেষদিকে) শুরু কম্পিউটার তথা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে। উৎপাদন প্রক্রিয়াতে কম্পিউটার এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে কারণে যন্ত্রপাতি মানব শক্তির জায়গা দখল করতে শুরু করলো। প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের পর সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দরজায় এসে হাজির হলো আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) বিগ ডেটা, ব্লক-চেইন, ক্লাউড অ্যান্ড কম্পিউটিং, রোবটিকস, ন্যানো টেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ইত্যাদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জ্ঞানভিত্তিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লব।

এমন যুগ সন্ধিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তিতে যেন আমাদের অংশগ্রহণ দ্রুততর হতে পারে এবং বঞ্চিতরা তথ্য প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে পারে সেভাবেই আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনা করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভল্যুশনের প্রভাব, সম্ভব্যতা, চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবেলায় আমাদের করণীয় বিষয়ে ভাবতে হবে। গতানুগতিক মুখস্থ, পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেট-অর্জন নির্ভর সকল তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ পরিহার করে চতুর্থ বা তার পরবর্তী শিল্প বিপ্লব প্রসূত কর্মবাজারে প্রবেশের উপযোগী করে সাজাতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না যে, ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দেশে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান মানব-কর্মীর বদলে রোবটকে কর্মী হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। জ্ঞানভিত্তিক এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিপুূলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারালেও এর বিপরীতে সৃষ্টি হবে নতুন ধারার বহুগুণ কর্মক্ষেত্র। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা না গেলে বাংলাদেশ কিভাবে এই বৈশি^ক পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে? কাজেই বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য মোতাবেক দেশের সকল শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন নিশ্চিত বাংলাদেশকে করতেই হবে।

এক্ষেত্রে তৃণমুল পর্যায়ের কর্মকর্তা অর্থাৎ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা স্থানীয় (নিজ জেলায় কর্মরত) বিধায় স্থানীয় মানবগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে সৃজনশীল মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন এবং তাদের মধ্যে শিশু শিক্ষাকেন্দ্রিক যে আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের প্রয়োজন তা সৃষ্টিতে তারা এখনও কাক্সিক্ষত সফলতা দেখাতে পারেননি। যদিও তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন যাবৎ নিজ জেলায় কর্মরত থেকেছেন কিংবা আছেন। তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে সাধারণ জনগোষ্ঠীর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে জেলা শহরে বসবাস করছেন।

তবে স্থানীয়দের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, ভিলেজ পলিটিক্সে জড়ানো এবং আত্মীয়-শিক্ষকের ছাড় দিয়ে চলার নীতিতে তাদের কারো কারো ভূমিকা লক্ষ্যণীয়। কাজেই সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারগণকে দ্রুত নিজ জেলার বাইরে বদলি করে তাদের পক্ষপাত শূন্য হয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া সুশাসন আর উন্নয়নের জন্য মঙ্গল। পরিদর্শনে গিয়ে শুধু বিদ্যালয় দর্শন এবং প্রত্যাবর্তনের পর নিজ বাসস্থানে আত্মনিমগ্ন জীবন নয়। তাদের এখন শিশুদের কিভাবে চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব প্রসূত জ্ঞান এবং প্রযুক্তি অর্জনের উপযোগী করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো যায় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যালয়ে মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ ইত্যাদি চলাকালে অভিভাবকরা শিশুকেন্দ্রিক সমস্যা/সম্ভাবনা উপস্থাপনের সুযোগ তেমন পায় না বা পেলেও ঠিকঠাক মতো উপস্থাপন করতে পারে না বা অংশীজন হিসেবে অংশীদারি স্বার্থ আদায় করতে পারে না। সেসব সভা-সমাবেশে থাকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা এবং ক্ষমতাসীনদের প্রাধান্য। ফলশ্রুতিতে যার সন্তান তাকেই পড়িয়ে পাশ করিয়ে আনতে হয়। কতিপয় বিদ্যালয় যেন শুধুই সার্টিফিকেট দাতা। এ পদ্ধতির অনতিবিলম্বে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এ পরিবর্তনের সূচনায় প্রথমেই সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের জেলার বাইরে বদলি নিশ্চিত করতে হবে। আসবে অন্য জেলা থেকে নতুন পক্ষপাতহীন সবার অনাত্মীয়, নিরপেক্ষ, নিরলস, সবার প্রতি মিত্রভাবাপন্ন, এলাকার সব বিষয়ে অজ্ঞাত এবং দক্ষ পেশাদার সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার তথা সমাজকর্মী। যার হাত ধরে প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ের সব শিশু চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে যাবে।

প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের মাঝে সময়ের ফাঁরাক ছিল গড়ে ৭৫ বছর। আর চলতি চতুর্থ বিপ্লব শুরু হয়েছে মাত্র ২০১১ সালে। ডিজিটাল প্রযুক্তি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে মনে হয় যে, কয়েক বছরের মধ্যে শুনবো পঞ্চম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। অতএব এখনই সময় আমাদের প্রস্তুত হওয়ার। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণে আমাদের সবাইকে সেভাবেই সচেতন হতে হবে।

[লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ]

back to top