alt

উপ-সম্পাদকীয়

মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের দুই বছর

ডোরিন চৌধুরি

: বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
image

দুই বছর আগে মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে

পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পূর্ণ হলো মায়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। অভ্যুত্থানটি দেশটিকে একটি কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নিয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। গত বছরে দীর্ঘ সংঘর্ষ এবং দেশব্যাপী সহিংসতার ফলে গৃহযুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার টের পাওয়া যাচ্ছে। পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) এবং অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি সুসংহত হওয়ায় জান্তা সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল থেকে যথার্থ প্রতিক্রিয়ার অভাব মায়ানমারের নির্মম পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত খারাপ হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা এবং প্রহসনমূলক আইন ও আদালত এ মুহূর্তে মায়ানমারের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাই এই হঠকারী ঘটনার দুই বছর পরও মায়ানমার একটি সংঘাতপ্রবণ ও নির্মমতার চিত্র হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।

পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে মায়ানমারের সামরিক বাহিনী, যা তাতমাদো এবং জান্তা নামেও পরিচিত- নির্বাচনে তথাকথিত কারচুপির অভিযোগ এনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সুচি সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটায়। তাতমাদো, অং সান সু চিসহ বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করে এবং দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করে। মায়ানমারের আপামর জনগণ এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং আন্দোলন শুরু করে, যা দ্রুত অবাধ্যতা আন্দোলন বা সিভিল ডিজওবিডিয়েন্স মুভমেন্টে (সিডিএম) রূপ নেয়। আন্দোলন দমাতে জান্তা সরকার সহিংস পন্থা ও ধরপাকড়ের পথ বেছে নেয় যা হতাহতের ঘটনার জন্ম দিয়েছিল। এরই পরবর্তী রাজনৈতিক গোলযোগ এবং জান্তা সরকারের নির্মমতা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছে। জান্তা সরকারের চাপিয়ে দেয়া স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে জাতীয় ঐক্য সরকার বা এনইউজি গঠিত হয়েছে এবং এর সশস্ত্র শাখা, পিপলস ডিফেন্স ফোর্স বা পিডিএফ ইতোমধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

গত দুই বছরে বছরে, পিডিএফ অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে এবং সদস্য সংখ্যা ব্যপকহারে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সসস্ত্র সংগঠনগুলোও জান্তার বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে এ সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে মায়ানমারের মাত্র সতেরো শতাংশ ভূখন্ডের ওপর জান্তা সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে; যা ইঙ্গিত করে যে গৃহযুদ্ধের গতিপথ এখন গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে অনুকূল।

গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো যত বেশি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, জান্তা সরকার ততই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। গৃহযুদ্ধ ছাড়াও মায়ানমারে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে এবং অর্থনীতি ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে। সংঘাতের শুরু থেকেই তাতমাদো তার বিরোধীদের দমন করার জন্য দমনমূলক নীতি অনুসরণ করছে। গত দুই বছরে এই দমনের মুখে জান্তা সরকার ২৮৯০ জনকে হত্যা করেছে। এদের মধ্যে অন্তত ৭৬৭ জন প্রথমে আটক ও এরপর বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। গত দুই বছরে জান্তা ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। সংঘাতের কারণে প্রায় ১২ লাখ নাগরিক অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং সত্তর হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন। এই উদ্বাস্তুদের অনেকেই পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ড ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে বিপজ্জনক নৌকা পাড়ি দিয়েছেন।

গত দুই বছরে বাড়িঘর, স্কুল, প্রার্থনা হলসহ ৩৪ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এমনকি জান্তা সরকারের বর্তমান বিমান হামলা পদ্ধতিও বেসামরিক নাগরিকদের জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে ফেলছে। ক্যু পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার সাধারণ মানুষকে আরও প্রভাবিত করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। বর্তমানে মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দ্বন্দ্বের কারণে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাও মিয়ানমারের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি তাতমাদো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন শুরু করেছে।

অভ্যুত্থানের পরপরই জান্তা সরকার সুচির দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। ক্যু-এর পরপরই সু চিকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে জান্তা সরকার একটি প্রহসনমূলক আদালত চালু করেন এবং সু চির বিরুদ্ধে একতরফা অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার শুরু হয়। গত দুই বছরে সু চি কথিত দুর্নীতি, অবৈধ জবরদখল এবং কোভিড বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাকে মোট ৩৩ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক মহলের নিষ্ক্রিয়তার কারণে গত দুই বছর ধরে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে মায়ানমারে। প্রায় সব ক্ষমতাধর দেশগুলোই তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখার জন্য প্রায় ‘গা বাঁচানো’ প্রতিক্রিয়া নীতি গ্রহণ করেছিল। এ সময় জান্তার ওপর কোন উল্লেখযোগ্য চাপ দেখেনি বিশ্ববাসী। তবে গত এক বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে কার্যকরি হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মায়ানমারে নৃশংসতা বন্ধের দাবিতে প্রথম প্রস্তাব গ্রহণে সফল হয়েছে। জোট সংস্থা আসিয়ান জান্তা সরকারের সাথে একটি পাঁচ দফা ঐকমত্য নিয়েও আলোচনা করেছে এবং জান্তা এই পাঁচ দফা মেনে নিয়েছে। তবে সেই ঐকমত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়- সমস্ত সহিংসতা বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তার জন্য মায়ানমার খুলে দেয়ার বিষয়টি জান্তা সরকার এখনও পূরণ করেনি।

মায়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পৃক্ততাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে গত বছর। মায়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘বার্মা অ্যাক্ট’ও পাশ করেছে। সামনের দিনগুলোতে মায়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সহিংস গৃহযুদ্ধ এখন আর মায়ানমারের জন্য একক বিষয় নয়, কারণ এর প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও। সম্প্রতি মায়ানমার তার প্রতিবেশীদের আকাশসীমা লাগাতার লঙ্ঘন করেছে। এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বারবার ভারতীয় এবং থাই আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। ভারত ও থাইল্যান্ড ছাড়াও মায়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন।

মায়ানমার প্রায়ই আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে এবং তুমব্রু সীমান্তে গোলাবর্ষণ করে। কিছু গোলা বাংলাদেশেও পড়েছে এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। শরণার্থীদের আগমন চাপ বাড়াচ্ছে ভারত ও থাইল্যান্ডের ওপরও। মায়ানমারের অস্থিরতা রোহিঙ্গা সংকটেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জান্তা সরকারের অভ্যুত্থানের পর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও এ সম্পর্কিত আলোচনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। রাখাইনে পুনরায় সংঘাতের ফলে নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীও তৈরি হয়েছে; যারা বর্তমানে তুমব্রু সীমান্তে নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাস করছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ রাখাইনকেও অস্থিতিশীল করে তুলেছে যা নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

সম্ভবত এনইউজির রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করাই গত দুই বছরে একমাত্র ইতিবাচক অগ্রগতি। এনইউজির স্বীকৃতি রোহিঙ্গা নাগরিক অধিকারের ইতিহাসে প্রথম। এনইউজি বিজয়ী হলে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এনইউজি ছাড়াও রাখাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সামরিক শক্তি আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাদের রাখাইনের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছে।

অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ ছাড়া মায়ানমারের পরিস্থিতি উন্নয়নের খুব একটা সম্ভাবনা নেই। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং অর্থনীতির নিম্নগমন ঠেকাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। আর বিশ্ব সম্প্রদাইয়েরও দায়িত্ব হবে এ সহিংসতাকে আর দীর্ঘায়িত করতে না দেয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত এবং আসিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও সংস্থা সংঘাত প্রশমনে এবং একটি গণতান্ত্রিক মায়ানমার পুনঃনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মায়ানমারের নাগরিকদের ব্যর্থ করেছে। ফলে চলছে সংঘাত, বিরাজ করছে অরাজকতা। তৃতীয় বছরে এটি চলতে দেয়া উচিত হবে না।

[লেখক : ডক্টরাল গবেষক, গ্রোনিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস]

খুলনায় একুশে বইমেলার মুগ্ধতা

মধুরতম ভাষা ও রক্তাক্ত বাংলা

উৎসব ও প্রথার বিবর্তন

চুরমার ফিলিস্তিন ও খাদ্য রাজনীতি

কুষ্ঠজনিত মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে করণীয়

যুব ক্ষমতায়ন স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণকে ত্বরান্বিত করবে

লাইব্রেরির ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যতের লাইব্রেরি

একজীবনে অনেক বছর বেঁচে থেকেও নিজেকে চেনা হয়ে ওঠে না

“ছুরি-কাঁটা ও নব্যধনী”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সন্দেশখালি লাইন

শিশুরও হতে পারে ক্যান্সার, প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

চিকিৎসা নিতে কেন ভারতে গিয়েছিলাম

ইসরায়েলের গণহত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার মামলা

বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু গণিত

ছবি

সুন্দরবন কি আরেকটু বেশি মনোযোগ পেতে পারে না

নিজেকে বরং নিজেই প্রশ্ন করতে শিখুন

গড়ে উঠুক সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

ছবি

বিদ্যা দেবী মা সরস্বতী

বিশ্ব বেতার দিবস ও বাংলাদেশ বেতার

কৃষিবিদ দিবস

ছয় বছরের অর্জন ও প্রত্যাশা

জলবায়ু সম্মেলন এবং নয়া উদারবাদী কর্তৃত্ব

জিআই সনদের সন্ধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ

নির্বাচন ও সামাজিক অস্থিরতা

ছবি

খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরোনোর পথ কী

ছবি

ট্রাম্প দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন, তবে পথ মসৃণ নয়

দুর্নীতিবাজদের খতম করা যাবে কি?

মূল্যস্ফীতি কমবে কীভাবে

শিক্ষা হচ্ছে জগতের আলো

ছবি

জ্ঞানবাপী মসজিদ বিতর্ক

আমেরিকার উন্নতির ভিত্তি

সড়ক পরিবহন আইন ও ট্রাফিক পুলিশ

‘বলদ কবে চালাক হবে’

রক্তপিছল ফিলিস্তিন, অস্ত্রবাণিজ্য এবং মিথ্যা জলবায়ু অঙ্গীকার

ভারতে মসজিদ-মন্দির বির্তক ও খল রাজনীতি

ব্যাংক খাতের রোগ সারাতে রোডম্যাপ

tab

উপ-সম্পাদকীয়

মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের দুই বছর

ডোরিন চৌধুরি

image

দুই বছর আগে মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে

বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পূর্ণ হলো মায়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। অভ্যুত্থানটি দেশটিকে একটি কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে নিয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে। গত বছরে দীর্ঘ সংঘর্ষ এবং দেশব্যাপী সহিংসতার ফলে গৃহযুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ার টের পাওয়া যাচ্ছে। পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) এবং অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো আগের চেয়ে আরও বেশি সুসংহত হওয়ায় জান্তা সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল থেকে যথার্থ প্রতিক্রিয়ার অভাব মায়ানমারের নির্মম পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত খারাপ হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা এবং প্রহসনমূলক আইন ও আদালত এ মুহূর্তে মায়ানমারের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাই এই হঠকারী ঘটনার দুই বছর পরও মায়ানমার একটি সংঘাতপ্রবণ ও নির্মমতার চিত্র হিসেবেই রয়ে গিয়েছে।

পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে মায়ানমারের সামরিক বাহিনী, যা তাতমাদো এবং জান্তা নামেও পরিচিত- নির্বাচনে তথাকথিত কারচুপির অভিযোগ এনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সুচি সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটায়। তাতমাদো, অং সান সু চিসহ বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করে এবং দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করে। মায়ানমারের আপামর জনগণ এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং আন্দোলন শুরু করে, যা দ্রুত অবাধ্যতা আন্দোলন বা সিভিল ডিজওবিডিয়েন্স মুভমেন্টে (সিডিএম) রূপ নেয়। আন্দোলন দমাতে জান্তা সরকার সহিংস পন্থা ও ধরপাকড়ের পথ বেছে নেয় যা হতাহতের ঘটনার জন্ম দিয়েছিল। এরই পরবর্তী রাজনৈতিক গোলযোগ এবং জান্তা সরকারের নির্মমতা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছে। জান্তা সরকারের চাপিয়ে দেয়া স্বৈরতন্ত্রের বিপক্ষে জাতীয় ঐক্য সরকার বা এনইউজি গঠিত হয়েছে এবং এর সশস্ত্র শাখা, পিপলস ডিফেন্স ফোর্স বা পিডিএফ ইতোমধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

গত দুই বছরে বছরে, পিডিএফ অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে এবং সদস্য সংখ্যা ব্যপকহারে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সসস্ত্র সংগঠনগুলোও জান্তার বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে এ সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে মায়ানমারের মাত্র সতেরো শতাংশ ভূখন্ডের ওপর জান্তা সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে; যা ইঙ্গিত করে যে গৃহযুদ্ধের গতিপথ এখন গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে অনুকূল।

গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো যত বেশি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, জান্তা সরকার ততই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। গৃহযুদ্ধ ছাড়াও মায়ানমারে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে এবং অর্থনীতি ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে। সংঘাতের শুরু থেকেই তাতমাদো তার বিরোধীদের দমন করার জন্য দমনমূলক নীতি অনুসরণ করছে। গত দুই বছরে এই দমনের মুখে জান্তা সরকার ২৮৯০ জনকে হত্যা করেছে। এদের মধ্যে অন্তত ৭৬৭ জন প্রথমে আটক ও এরপর বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। গত দুই বছরে জান্তা ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। সংঘাতের কারণে প্রায় ১২ লাখ নাগরিক অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং সত্তর হাজার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন। এই উদ্বাস্তুদের অনেকেই পার্শ্ববর্তী থাইল্যান্ড ও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে বিপজ্জনক নৌকা পাড়ি দিয়েছেন।

গত দুই বছরে বাড়িঘর, স্কুল, প্রার্থনা হলসহ ৩৪ হাজার বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এমনকি জান্তা সরকারের বর্তমান বিমান হামলা পদ্ধতিও বেসামরিক নাগরিকদের জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে ফেলছে। ক্যু পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার সাধারণ মানুষকে আরও প্রভাবিত করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বাড়ছে। বর্তমানে মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দ্বন্দ্বের কারণে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাও মিয়ানমারের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পাশাপাশি তাতমাদো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন শুরু করেছে।

অভ্যুত্থানের পরপরই জান্তা সরকার সুচির দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। ক্যু-এর পরপরই সু চিকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে জান্তা সরকার একটি প্রহসনমূলক আদালত চালু করেন এবং সু চির বিরুদ্ধে একতরফা অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার শুরু হয়। গত দুই বছরে সু চি কথিত দুর্নীতি, অবৈধ জবরদখল এবং কোভিড বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাকে মোট ৩৩ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক মহলের নিষ্ক্রিয়তার কারণে গত দুই বছর ধরে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে মায়ানমারে। প্রায় সব ক্ষমতাধর দেশগুলোই তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখার জন্য প্রায় ‘গা বাঁচানো’ প্রতিক্রিয়া নীতি গ্রহণ করেছিল। এ সময় জান্তার ওপর কোন উল্লেখযোগ্য চাপ দেখেনি বিশ্ববাসী। তবে গত এক বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে কার্যকরি হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ মায়ানমারে নৃশংসতা বন্ধের দাবিতে প্রথম প্রস্তাব গ্রহণে সফল হয়েছে। জোট সংস্থা আসিয়ান জান্তা সরকারের সাথে একটি পাঁচ দফা ঐকমত্য নিয়েও আলোচনা করেছে এবং জান্তা এই পাঁচ দফা মেনে নিয়েছে। তবে সেই ঐকমত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়- সমস্ত সহিংসতা বন্ধ করা এবং মানবিক সহায়তার জন্য মায়ানমার খুলে দেয়ার বিষয়টি জান্তা সরকার এখনও পূরণ করেনি।

মায়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সম্পৃক্ততাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার স্বীকৃতি দিয়েছে গত বছর। মায়ানমারের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘বার্মা অ্যাক্ট’ও পাশ করেছে। সামনের দিনগুলোতে মায়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সহিংস গৃহযুদ্ধ এখন আর মায়ানমারের জন্য একক বিষয় নয়, কারণ এর প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও। সম্প্রতি মায়ানমার তার প্রতিবেশীদের আকাশসীমা লাগাতার লঙ্ঘন করেছে। এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বারবার ভারতীয় এবং থাই আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। ভারত ও থাইল্যান্ড ছাড়াও মায়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন।

মায়ানমার প্রায়ই আকাশসীমা লঙ্ঘন করছে এবং তুমব্রু সীমান্তে গোলাবর্ষণ করে। কিছু গোলা বাংলাদেশেও পড়েছে এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। শরণার্থীদের আগমন চাপ বাড়াচ্ছে ভারত ও থাইল্যান্ডের ওপরও। মায়ানমারের অস্থিরতা রোহিঙ্গা সংকটেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জান্তা সরকারের অভ্যুত্থানের পর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও এ সম্পর্কিত আলোচনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। রাখাইনে পুনরায় সংঘাতের ফলে নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীও তৈরি হয়েছে; যারা বর্তমানে তুমব্রু সীমান্তে নো-ম্যানস ল্যান্ডে বসবাস করছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ রাখাইনকেও অস্থিতিশীল করে তুলেছে যা নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

সম্ভবত এনইউজির রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করাই গত দুই বছরে একমাত্র ইতিবাচক অগ্রগতি। এনইউজির স্বীকৃতি রোহিঙ্গা নাগরিক অধিকারের ইতিহাসে প্রথম। এনইউজি বিজয়ী হলে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এনইউজি ছাড়াও রাখাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সামরিক শক্তি আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাদের রাখাইনের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছে।

অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও মনে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ ছাড়া মায়ানমারের পরিস্থিতি উন্নয়নের খুব একটা সম্ভাবনা নেই। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং অর্থনীতির নিম্নগমন ঠেকাতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের বিকল্প এ মুহূর্তে নেই। আর বিশ্ব সম্প্রদাইয়েরও দায়িত্ব হবে এ সহিংসতাকে আর দীর্ঘায়িত করতে না দেয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত এবং আসিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও সংস্থা সংঘাত প্রশমনে এবং একটি গণতান্ত্রিক মায়ানমার পুনঃনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। গত দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মায়ানমারের নাগরিকদের ব্যর্থ করেছে। ফলে চলছে সংঘাত, বিরাজ করছে অরাজকতা। তৃতীয় বছরে এটি চলতে দেয়া উচিত হবে না।

[লেখক : ডক্টরাল গবেষক, গ্রোনিয়েন বিশ্ববিদ্যালয়, নেদারল্যান্ডস]

back to top