alt

উপ-সম্পাদকীয়

ফিরে দেখা : একাত্তরে কিছু গণহত্যার কথা

সাদেকুর রহমান

: বুধবার, ৩১ মে ২০২৩

দখল প্রতিষ্ঠা রাখতে মরিয়া পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ কালরাতে এ দেশে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। কোথাও কোথাও তা চলমান ছিল আত্মসমর্পণের পরও। দীর্ঘ তেইশ বছরের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পেতে গর্জে উঠা বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে রোম শিউরে উঠা বহু ঘটনা ঘটায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা। একাত্তরের মার্চে শুরু হওয়া এক দফা স্বাধীনতা-আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে এ দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের সঙ্গে সঙ্গে নরহত্যায় মেতে উঠে হানাদারের দল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জুন মাসেও এ ভূখন্ডে বিভিন্ন স্থানে কাপুরোষোচিত গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী।

১৯৭১ সালের ১০ জুন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, আন্তর্জাতিক মহলের বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবি থেকে গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নানা তৎপরতা উঠে আসে।

১০ জুন কানাডার দৈনিক ‘মন্ট্রিল স্ট্রিট’ পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকার ব্যাপক গণহত্যা পরিকল্পনায় স্বয়ং ইয়াহিয়া খানসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব জেনারেল জড়িত ছিল। মূলত গৃহযুদ্ধ দমনের পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় এই জেনারেলরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এ হত্যাকান্ড কেবল টিক্কা খানের নিজস্ব ও একক উদ্যোগ নয়- এটি আসলে খুব সতর্কতা ও সাবধানতার সঙ্গে সংঘটিত একটি মিলিটারি অভিযান। বাঙালি হত্যার সামরিক আদেশ সেনাবাহিনীর সবাই ইউনিট কমান্ডারের কাছে যাতে প্রত্যক্ষভাবে এবং লিখিতভাবে পৌঁছে সেজন্য প্রেসিডেন্ট ২৫ মার্চ বেলা ২টা পর্যন্ত নিজেই খোঁজখবর নিয়েছেন। সন্ধ্যা ৭টায় প্রেসিডেন্ট বিমানবন্দরের উদ্দেশে বাসভবন ত্যাগ করেন। রাত ১১টায় ট্যাঙ্ক, কামান, মর্টারগানসহ ভারি ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু হয়।’

১০ জুন হংকংয়ের প্রসিদ্ধ ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’ পত্রিকায় এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, ‘দৈনিক ডন এবং দৈনিক পাকিস্তান টাইমসসহ পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রপত্রিকাও স্বীকার করেছিল যে- প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আলোচনা চলাকালে সমঝোতায় এসেছিলেন। ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ এ কথাও প্রচার করেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের চারটি যুক্তিসঙ্গত দাবি মেনে নিয়েছেন। দাবিগুলো মেনে নেয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার আগেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গোপনে পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যায় বিমানযোগে করাচি ফিরে গেলেন এবং আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা করেন ও পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর সশস্ত্র সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এর কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও প্রেসিডেন্ট দিতে পারলেন না। এতে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে ইয়াহিয়া খান পূর্ববাংলায় গণহত্যা চালানোর সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছিলেন।’

১০ জুন ডেইলি জাপান টাইমস এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছে- ‘পূর্ববাংলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণেই এই রক্তক্ষয়ী অভিযান চলছে।’

১০ জুন জাপানের ‘আসাহি শিমবুন’ পত্রিকা এক সম্পাদকীয়তে বলে, ‘বাংলাদেশে নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও সেখানে যে নির্বিচারে গণহত্যা চলছে, তা নজিরবিহীন। পূর্ববাংলায় যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালাচ্ছে এবং জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে তাতে বাংলাদেশের নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষের প্রতি বিশ্ববাসী সহানুভূতি দেখিয়েছেন। মুক্তিকামী জনতাকে এভাবে হত্যার ফলে পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক চিরতরে তিক্ত হয়ে গেল। বাংলাদেশে ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনীর কান্ডকারখানার দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়ে গেছে যে- পূর্ববাংলার মানুষ স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এবং তারা প্রাণ দিচ্ছেও।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিয়ে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আসেন দেশটির কয়েকজন সাংবাদিক। সেনা তত্ত্বাবধানে ঢাকা ও কুমিল্লার বেশ কয়েকটি স্থান তাদের ঘুরে দেখানো হয়। দশ দিনের সফর শেষে তাদের বলা হয় ‘অ্যাসানমেন্ট’ অনুযায়ী প্রতিবেদন লিখতে। কেবল একজন সাংবাদিকের মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে দেখে যাওয়া প্রকৃত পরিস্থিতি প্রকাশ করতে না পারলে সারাজীবন গ্লানি বয়ে বেড়াতে হবে তাকে। পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিবারসহ লন্ডনে চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ফাঁস করে দেন। আর এ কাজ করা এই মহান সাংবাদিক ব্যক্তিত্বটি হলেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। পাকিস্তানে ‘গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা পেলেও তিনি বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

১৩ জুন ১৯৭১। যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয় মি. ম্যাসকারেনহাসের সেই এতিহাসিক প্রতিবেদন। সম্পাদকীয় পাতার দুই পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয় সেই প্রতিবেদন, সঙ্গে ছিল বিশাল হরফের শিরোনাম- ‘জেনোসাইড’। এক শব্দের সেই শিরোনামেই প্রথমবারের মতো ফাঁস হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার ব্যাপকতা।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেই সাড়া জাগানো প্রতিবেদন। বিশ্ব জনমতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিতে এবং ভারতকে মুক্তিযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহ জোগায় প্রতিবেদনটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের তৎকালীন সম্পাদক হ্যারল্ড ইভানসকে বলেছিলেন- ‘ওই প্রতিবেদনটি তাকে এতটাই হতবাক করে দেয় যে, তিনি ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের ভিত্তি তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজধানী ও মস্কোতে ব্যক্তিগত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন।’

১৪ জুন বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজ উইক ’অনিশ্চিত আশ্রয়’ শিরোনামে টনি ক্লিফটনের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ রিপোর্টে বলা হয়- ‘পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগত লাখ লাখ শরণার্থী স্রোতের মতো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢুকছে। অন্যদিকে তাদের অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করার ফলশ্রুতিতে শুরু হওয়া পাশবিক দমননীতি থেকে পালিয়ে, ব্যাধি এবং অপরিচ্ছন্নতার মাঝে তারা এক অনিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।’

১৯৭১ সালের জুন মাসে বাংলার নানা প্রান্তে পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা গণহত্যা সংঘটিত হয়। নানা সীমাবদ্ধতায় সেসবের অনেক গণহত্যার কথাই হয়তো আমরা জানতে পারিনি। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দীকাল পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন এ মাসে সংঘটিত যেসব গণহত্যার কথা গোচরে এসেছে সেসব সম্পর্কে আলোকপাত করার প্রয়াসে বর্তমান রচনা। (চলবে)

অধরার হাতে সমর্পিত ক্ষমতা

প্রসঙ্গ : কোটাবিরোধী আন্দোলন

রম্যগদ্য : যে করিবে চালাকি, বুঝিবে তার জ্বালা কী

একটি মিথ্যা ধর্ষণ মামলার পরিণতি

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা কেন শ্রেণীকক্ষের বাইরে

মেধা নিয়ে কম মেধাবীর ভাবনা

প্রজাতন্ত্রের সেবক কেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বনে যান

ছবি

বাইডেন কি দলে বোঝা হয়ে যাচ্ছেন?

ছবি

দুই যুগের পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সাপ উপকারী প্রাণীও বটে!

ছবি

বাস্তববাদী রাজনীতিক জ্যোতি বসু

কোটাবিরোধী আন্দোলন ও শিক্ষকদের পেনশন সংকট

মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা : এই নাটকের শেষ কোথায়?

আড্ডাকে অবহেলা নয়

অবাসযোগ্য ঢাকার গোপন রহস্য

ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর পর্যটনে গুরুত্ব দিন

রথযাত্রা উৎসব

মুসলিম আইনে জমি অগ্রক্রয়ের অধিকার বনাম বাস্তবতা

শিক্ষকের ভালোবাসা : এক নীরব বিপ্লব

পণ্য বয়কট : বিশ্ব রাজনীতির বড় হাতিয়ার

বিদেশি বিনিয়োগ কমছে কেন

একজন উদ্যোগী গবেষকের কথা

জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে প্রয়োজন পুকুর খনন

নীল আর্মস্ট্রংয়ের স্পেস স্যুট

কোটাব্যবস্থা ও আজকের বাস্তবতা

রম্যগদ্য : ‘যঃ পলায়তিঃ স্বঃ জীবতিঃ...’

দুর্নীতি প্রতিরোধ সময়ের দাবি

লিগ্যাল অ্যানালাইটিক্স ও আধুনিক প্রযুক্তি যেভাবে আইন পেশাকে বদলে দিচ্ছে

বাইডেন-ট্রাম্প প্রথম বিতর্ক শেষ : ডেমোক্রেট শিবিরে আতঙ্ক

সাঁওতাল বিদ্রোহের চেতনা

ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ব্যারোমিটার

বেঁটে নারকেল গাছ নিয়ে কিছু কথা

রাসেলস ভাইপার : আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

ব্যাংকিং সেক্টরের অনিয়ম দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে

হুমকিতে সমুদ্র, ঝুঁকিতে উন্নয়নশীল দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থকে কি জলাঞ্জলি দিয়েছে মোদি প্রশাসন

tab

উপ-সম্পাদকীয়

ফিরে দেখা : একাত্তরে কিছু গণহত্যার কথা

সাদেকুর রহমান

বুধবার, ৩১ মে ২০২৩

দখল প্রতিষ্ঠা রাখতে মরিয়া পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ কালরাতে এ দেশে পরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। কোথাও কোথাও তা চলমান ছিল আত্মসমর্পণের পরও। দীর্ঘ তেইশ বছরের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে মুক্তি পেতে গর্জে উঠা বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে রোম শিউরে উঠা বহু ঘটনা ঘটায় পশ্চিম পাকিস্তানিরা। একাত্তরের মার্চে শুরু হওয়া এক দফা স্বাধীনতা-আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে এ দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের সঙ্গে সঙ্গে নরহত্যায় মেতে উঠে হানাদারের দল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জুন মাসেও এ ভূখন্ডে বিভিন্ন স্থানে কাপুরোষোচিত গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী।

১৯৭১ সালের ১০ জুন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা, আন্তর্জাতিক মহলের বাংলাদেশের স্বীকৃতির দাবি থেকে গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নানা তৎপরতা উঠে আসে।

১০ জুন কানাডার দৈনিক ‘মন্ট্রিল স্ট্রিট’ পত্রিকায় এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকার ব্যাপক গণহত্যা পরিকল্পনায় স্বয়ং ইয়াহিয়া খানসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব জেনারেল জড়িত ছিল। মূলত গৃহযুদ্ধ দমনের পরিকল্পনা, তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় এই জেনারেলরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এ হত্যাকান্ড কেবল টিক্কা খানের নিজস্ব ও একক উদ্যোগ নয়- এটি আসলে খুব সতর্কতা ও সাবধানতার সঙ্গে সংঘটিত একটি মিলিটারি অভিযান। বাঙালি হত্যার সামরিক আদেশ সেনাবাহিনীর সবাই ইউনিট কমান্ডারের কাছে যাতে প্রত্যক্ষভাবে এবং লিখিতভাবে পৌঁছে সেজন্য প্রেসিডেন্ট ২৫ মার্চ বেলা ২টা পর্যন্ত নিজেই খোঁজখবর নিয়েছেন। সন্ধ্যা ৭টায় প্রেসিডেন্ট বিমানবন্দরের উদ্দেশে বাসভবন ত্যাগ করেন। রাত ১১টায় ট্যাঙ্ক, কামান, মর্টারগানসহ ভারি ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ শুরু হয়।’

১০ জুন হংকংয়ের প্রসিদ্ধ ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’ পত্রিকায় এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, ‘দৈনিক ডন এবং দৈনিক পাকিস্তান টাইমসসহ পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রপত্রিকাও স্বীকার করেছিল যে- প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আলোচনা চলাকালে সমঝোতায় এসেছিলেন। ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ এ কথাও প্রচার করেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের চারটি যুক্তিসঙ্গত দাবি মেনে নিয়েছেন। দাবিগুলো মেনে নেয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার আগেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গোপনে পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যায় বিমানযোগে করাচি ফিরে গেলেন এবং আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা করেন ও পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর সশস্ত্র সৈন্য লেলিয়ে দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। এর কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও প্রেসিডেন্ট দিতে পারলেন না। এতে পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল যে, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে ইয়াহিয়া খান পূর্ববাংলায় গণহত্যা চালানোর সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছিলেন।’

১০ জুন ডেইলি জাপান টাইমস এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছে- ‘পূর্ববাংলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণেই এই রক্তক্ষয়ী অভিযান চলছে।’

১০ জুন জাপানের ‘আসাহি শিমবুন’ পত্রিকা এক সম্পাদকীয়তে বলে, ‘বাংলাদেশে নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও সেখানে যে নির্বিচারে গণহত্যা চলছে, তা নজিরবিহীন। পূর্ববাংলায় যে নৃশংস হত্যাকান্ড চালাচ্ছে এবং জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে তাতে বাংলাদেশের নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষের প্রতি বিশ্ববাসী সহানুভূতি দেখিয়েছেন। মুক্তিকামী জনতাকে এভাবে হত্যার ফলে পূর্ববাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক চিরতরে তিক্ত হয়ে গেল। বাংলাদেশে ইয়াহিয়া খানের সেনাবাহিনীর কান্ডকারখানার দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয়ে গেছে যে- পূর্ববাংলার মানুষ স্বাধীনতার জন্য অকাতরে প্রাণ দিতে পারে এবং তারা প্রাণ দিচ্ছেও।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিয়ে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) আসেন দেশটির কয়েকজন সাংবাদিক। সেনা তত্ত্বাবধানে ঢাকা ও কুমিল্লার বেশ কয়েকটি স্থান তাদের ঘুরে দেখানো হয়। দশ দিনের সফর শেষে তাদের বলা হয় ‘অ্যাসানমেন্ট’ অনুযায়ী প্রতিবেদন লিখতে। কেবল একজন সাংবাদিকের মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে দেখে যাওয়া প্রকৃত পরিস্থিতি প্রকাশ করতে না পারলে সারাজীবন গ্লানি বয়ে বেড়াতে হবে তাকে। পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরিবারসহ লন্ডনে চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ফাঁস করে দেন। আর এ কাজ করা এই মহান সাংবাদিক ব্যক্তিত্বটি হলেন অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। পাকিস্তানে ‘গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা পেলেও তিনি বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

১৩ জুন ১৯৭১। যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয় মি. ম্যাসকারেনহাসের সেই এতিহাসিক প্রতিবেদন। সম্পাদকীয় পাতার দুই পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয় সেই প্রতিবেদন, সঙ্গে ছিল বিশাল হরফের শিরোনাম- ‘জেনোসাইড’। এক শব্দের সেই শিরোনামেই প্রথমবারের মতো ফাঁস হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার ব্যাপকতা।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সেই সাড়া জাগানো প্রতিবেদন। বিশ্ব জনমতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিতে এবং ভারতকে মুক্তিযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে উৎসাহ জোগায় প্রতিবেদনটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের তৎকালীন সম্পাদক হ্যারল্ড ইভানসকে বলেছিলেন- ‘ওই প্রতিবেদনটি তাকে এতটাই হতবাক করে দেয় যে, তিনি ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের ভিত্তি তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর রাজধানী ও মস্কোতে ব্যক্তিগত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন।’

১৪ জুন বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজ উইক ’অনিশ্চিত আশ্রয়’ শিরোনামে টনি ক্লিফটনের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এ রিপোর্টে বলা হয়- ‘পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগত লাখ লাখ শরণার্থী স্রোতের মতো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢুকছে। অন্যদিকে তাদের অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করার ফলশ্রুতিতে শুরু হওয়া পাশবিক দমননীতি থেকে পালিয়ে, ব্যাধি এবং অপরিচ্ছন্নতার মাঝে তারা এক অনিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।’

১৯৭১ সালের জুন মাসে বাংলার নানা প্রান্তে পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা গণহত্যা সংঘটিত হয়। নানা সীমাবদ্ধতায় সেসবের অনেক গণহত্যার কথাই হয়তো আমরা জানতে পারিনি। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দীকাল পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন এ মাসে সংঘটিত যেসব গণহত্যার কথা গোচরে এসেছে সেসব সম্পর্কে আলোকপাত করার প্রয়াসে বর্তমান রচনা। (চলবে)

back to top