alt

উপ-সম্পাদকীয়

পানি সংকট মোকাবিলায় করণীয়

জাকিয়া সুলতানা

: বৃহস্পতিবার, ০৮ জুন ২০২৩
image

বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তির বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে

বিশ্বের মোট পানির মাত্র ১% সুপেয় পানি, যার ৯৯% আসে ভূগর্ভস্থ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে। মনুষ্যসৃষ্ট বিবিধ কারণে বিশ্ব আজ মারাত্মক সুপেয় পানির সংকটে। জাতিসংঘের সহযোগী বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডাব্লিউএমও) ‘স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস ২০২১’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬০ কোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। তারা বছরে অন্তত এক মাস এ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ পানি সংকটে ভুগতে পারে বিশ্বের ৫০০ কোটি মানুষ। জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ওয়াটার সিস্টেম প্রজেক্ট’ শীর্ষক এক বৈঠকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৫০০ বিজ্ঞানীর এক যৌথ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মানুষের কর্মকান্ড (যেমন ভূমিধস, দূষণ, নদী খনন ইত্যাদি) বিশুদ্ধ পানির সরবরাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

নদীর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ স্তরের পানিও মানবসৃষ্ট কারণে দূষিত হচ্ছে। এ যৌথ ঘোষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছেন, আগামী এক বা দুই প্রজন্মের মধ্যেই বিশ্বের ৯০০ কোটি মানুষের অধিকংশই বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করবে। ডাব্লিওএইচও এবং ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে ৭৮৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মৌলিক অধিকার হিসেবে পানি সেবা পায় না এবং ৮৮৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারছে না। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষকে নিরাপদ পানি ছাড়াই জীবনযাপন করতে হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে বিশুদ্ধ পানি সংকটকে বৈশ্বিক হুমকির তালিকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শরণার্থী সংকট ও সাইবার আক্রমণের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তির বৈশ্বিক এ সংকট বাংলাদেশেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের ৬৮.৩ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ সরকারের জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম প্রতিবেদন অনুযায়ী এ দেশের শতকরা ৪৪ ভাগ মানুষ নিরাপদ ও সুপেয় পানি হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

পানিতে আর্সেনিকের আধিক্য পানির প্রাপ্যতাকে আরও দুর্লভ করেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬১টি জেলার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৯ মিলিয়ন মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের খুলনা-বাগেরহাট উপকূলীয় এলাকার ৭৩ শতাংশ মানুষের কাছে নিরাপদ খাবার পানি পৌঁছায় না। এই এলাকার মানুষ প্রতি লিটার পানির সঙ্গে গড়ে ১৪২৭-২৪০৬ মিলিগ্রাম লবণাক্ত পানি গ্রহণ করছে, যেখানে গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটারে ১০০০ মিলিগ্রাম।

বিশুদ্ধ পানি প্রপ্তির ক্ষেত্রে স্যানিটেশন সুবিধা না থাকাও একটি বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক গবেষণা মতে, দেশের পাইপলাইনের পানির ৮০ ভাগেই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। পুকুরের পানিতেও একই মাত্রায় এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ৩৮ শতাংশ টিউবওয়েলের পানিতেও এ ক্ষতিকর অনুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। ঢাকায় মাত্র ২০ ভাগ পৃথক স্যুয়ারেজ পাইপ লাইন রয়েছে আর বাকিটা খোলা। সারাদেশে পয়ঃবর্জ্যরে মাত্র ২ ভাগ ট্রিটমেন্ট করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাকি বর্জ্য মূলত পানিতেই মিশে যাচ্ছে। গৃহস্থালির অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ছাড়াও ঢাকার নদীগুলোতে প্রতিদিন ৬০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য নদীর পানি দূষিত করছে।

ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশে পানি সংকট বাড়িয়ে তুলছে। বছরে ৩২ ঘন কিলোমিটার ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয় যার ৯০ ভাগ সেচ কাজে এবং ১০ ভাগ শিল্প ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দেশের দুই মেগাসিটি ঢাকা ও চট্টগ্রামে দৈনিক মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য দৈনিক গড়ে ২৪৫ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হয় যার ৮৭ ভাগ আসে ভূ-গর্ভ থেকে আর বাকি ১৩-১৪ ভাগ আসে নদী থেকে। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় পানি চাহিদা দৈনিক ২২০ কোটি লিটার কিন্তু আরো ২৫ কোটি লিটার পানি অতিরিক্ত উত্তোলন করা হচ্ছে। ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ বস্তিবাসী। দৈনিক গড়ে জনপ্রতি ১৪০ লিটার পানি ব্যবহার হলেও বস্তিবাসী পাচ্ছে মাত্র ২০ লিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ১৯৯০ সালে ১৩০টি গভীর নলকূপ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হতো এবং সেই সময় ২২.৫০ মিটার নিচ থেকে পানি পাওয়া যেত। ২০০৫ সালে নলকূপের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪২৩, পানির স্তর নেমে যায় ৫৪ মিটারে। ২০২০ সালে এসে নলকূপের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। পানির স্তর নেমেছে ৭৪ মিটার। বরেন্দ্র অঞ্চলে কোথাও কোথাও পানির স্তর নেমেছে ১৫০ ফুটেরও নিচে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে শুরু হয় পানির হাহাকার। জমিতে সেচের পানি না পেয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় ২০২২ সালে দুই কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়; যা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

পানি সম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, আহরণ, বিতরণ, ব্যবহার, সুরক্ষা ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে সরকার পানি আইন ও ২০১৮ সালে পানি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এ আইনের ধারা ৩(১) অনুযায়ী এ রাষ্ট্রের সীমানাভুক্ত ভূ-উপরিস্থ পানি, ভূগর্ভস্থ পানি, সামুদ্রিক পানি, বৃষ্টির পানি এবং বায়ুমন্ডলের পানির সবাই অধিকার জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত থাকবে। ধারা ৩(২)-এ বলা হয়েছে- সুপেয় পানি এবং পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ব্যবহার্য পানির অধিকার সর্বাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। এ আইনের ধারা ১৭ অনুযায়ী জলাধার বা পানিধারক স্তরের সুরক্ষার জন্য, যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোনো এলাকা বা এলাকার অংশবিশেষ বা পানিসম্পদ সংশ্লিষ্ট যেকোনো ভূমিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে।

পানি বিধিমালা-২০১৮-এর বিধি ৩ অনুযায়ী জনগণের পানি ব্যবহারের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ ও ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনাক্রমে প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতিদিন সুপেয় পানি, পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা, পানি প্রাপ্তির সীমা ও পানির উৎসের সর্বোচ্চ কাম্য দূরত্ব নির্ধারণ করতে পারবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- দেশে এলাকা ভেদে পানির সংকট চরমে থাকলেও অদ্যাবধি এ আইন ও বিধিমালার আলোকে কোনো এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়নি। ২০১৫ সালের ৪৪০/১৫ নং জনস্বার্থমূলক মামলার রায়ে মহামান্য পানি আইনের ধারা ১৭-এর অধীনে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার চরকানাই, হুলাইন, পাচুরিয়া এবং হাবিলাস দ্বীপ গ্রামগুলোকে (৩৫০টি টিউবওয়েল বিকল হয়ে পড়লে গ্রামগুলোর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়ে) পানি সংকাটাপন্ন এলাকা ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার ৬নং লক্ষ্য হিসেবে শতভাগ নাগরিকের জন্য সুপেয় পানি প্রাপ্তি নিশ্চিতে করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ। পানিসংক্রান্ত মূল সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ডেলটা প্লান ২১০০ গ্রহণ করেছে। পানি নিয়ে প্রণীত ও গৃহীত সরকারের বিভিন্ন নীতি, আইন ও পরিকল্পনা জনমনে আশার সঞ্চার করলেও বাস্তবে পানি সংকট নিরসনে তা কার্যকর নয়। দেশে পানি সংকট নিরসনে আশু করণীয় হিসেবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বর্তমান সময়ের চাহিদা।

পানির চাহিদা ও প্রাপ্যতা বিবেচনায় পানি সংকটপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, পানি আইনের অধীন পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা ও সংকট উত্তরণে করণীয় বিবেচনায় জনমত যাচাইসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে।

পানি সংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকায় পুনর্ভরণযোগ্য ভূ-গর্ভস্থ অগভীর পানিধারক স্তরকে সংরক্ষণ করতে সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা দরকার। বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূ-উপরিস্থ পানির আধার সংরক্ষণ, সংষ্কারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা; পানির সংকটে থাকা এলাকায় সংকটকালীন সময়ে জনগণের পানির চাহিদা মেটাতে সরকার কর্তৃক বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

সরকার পানি বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা যথা- বন্যা, অতি বন্যা, আকস্মিক বন্যা, নদী ভাঙন, নাব্যতা হ্রাস, শুকনো মৌসুমে পানির দু®প্রাপ্যতা, খরা, সুপেয় পানির আধার ভরাট, অবৈধ দখল ও দূষণ, জলাবদ্ধতা, ভূ-গর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক হ্রাস ও দূষণ, সুপেয় পানির দু®প্রাপ্যতা এবং অর্থনীতি ও জনসংখ্যার কারণে পানির ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা ইত্যাদির আলোকে জাতীয় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা হালনাগাদকরণ ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলাধারসমূহ সংরক্ষণে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পানির চাহিদা ও প্রাপ্যতা বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ এবং জনগণকে অবহিত করা জরুরি। ভরাট, অবৈধ দখল ও দূষণ হতে জলাশয় রক্ষায় এবং জলাশয়ের প্রবাহ অটুট রাখতে স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ, সময়োপযোগীকরণ ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

জলাশয়ের প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষার্থে পানির সর্বনিম্ন প্রবাহমাত্রা এবং মানমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। জলাশয়ের প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে এমন সব প্রকল্প পরিহার ও বাধা সৃষ্টিকারী স্থাপনা অপসারণ করা দরকার। পানি দূষণের উৎস চিহ্নিত করা ও তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। হাওর, বাঁওড়, বিল ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় জলাশয় রক্ষায় গৃহীত পরিকল্পনা সময়োপযোগীকরণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

পানি সরবরাহে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানো এবং বিশেষত পানি সংকটাপন্ন এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানি আহরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা দরকার। সীমিত পানি সম্পদের সংরক্ষণ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করিতে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং গবেষণালব্ধ ফলের ভিত্তিতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আর্সেনিক দূষণের বিস্তার এবং লবণাক্ততারোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সব ক্ষেত্রে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পানি বিষয়ে জনগণের প্রথাগত অধিকার এবং ন্যূনতম পানি প্রাপ্যতার অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

[লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী]

বিশ্ব প্রাণী দিবস

গ্যাং কালচারের সমাধান কোথায়

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শিশুদের সংকট বাড়ছে

ডিজিটাল শিল্পযুগ

জলবায়ু ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে, কী করছি আমরা?

পথশিশু : পথই তাদের সব

ভিসানীতিতে আমরা কেন বিচলিত নই

মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদ এড়াতে সতর্ক থাকতে হবে

প্রবীণদের দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রজন্মের ভূমিকা

একটি সুন্দর সমাজের আকুতি

বাংলাদেশের নির্বাচন ও আমেরিকার ভিসানীতি

কূটনীতি : তখন আর এখন

সেতু-কালভার্টে নদীপথে বাড়ছে সংকট

প্রসঙ্গ : দ্রব্যমূল্য

সম্ভাবনাময় ইকোট্যুরিজম

পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা

হিন্দু কন্যা সন্তানদের সমানাধিকার প্রসঙ্গে

ছবি

রাজনীতির দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য প্রক্রিয়া

নারী শিক্ষার গুরুত্ব

জমি জটিলতা ও ভূমি বিভাগ

ভরত থেকে ভারতবর্ষ অতঃপর হিন্দুস্তান ইন্ডিয়া হয়ে ভারত

নিরাপদ অভিবাসন ও রেমিট্যান্স

রপ্তানি বহুমুখীকরণে তথ্যপ্রযুক্তি খাত

আদিবাসীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা ও পুলিশের ভূমিকা

ছবি

ডেঙ্গু রোধে মানসিকতার পরিবর্তন দরকার

ছবি

পিছিয়ে পড়ছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা

অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের সম্ভাবনা

ছবি

নিত্যপণ্যের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না কেন

ছবি

বায়ুদূষণের ক্ষতি

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আর প্রয়োজন আছে কি

জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যাবে অগোচরে

বিশ্ব আলঝেইমার্স দিবস

ছবি

দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট জনজীবন

বৈষম্যমুক্ত নিরাপদ সমাজ গঠন কেন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি

কষ্টে আছে নিম্নবিত্ত মানুষ

কোর্ট ম্যারেজ সম্পর্কে ভুল ধারণা

tab

উপ-সম্পাদকীয়

পানি সংকট মোকাবিলায় করণীয়

জাকিয়া সুলতানা

image

বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তির বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে

বৃহস্পতিবার, ০৮ জুন ২০২৩

বিশ্বের মোট পানির মাত্র ১% সুপেয় পানি, যার ৯৯% আসে ভূগর্ভস্থ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে। মনুষ্যসৃষ্ট বিবিধ কারণে বিশ্ব আজ মারাত্মক সুপেয় পানির সংকটে। জাতিসংঘের সহযোগী বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডাব্লিউএমও) ‘স্টেট অব গ্লোবাল ওয়াটার রিসোর্সেস ২০২১’ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬০ কোটি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে। তারা বছরে অন্তত এক মাস এ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ পানি সংকটে ভুগতে পারে বিশ্বের ৫০০ কোটি মানুষ। জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ওয়াটার সিস্টেম প্রজেক্ট’ শীর্ষক এক বৈঠকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৫০০ বিজ্ঞানীর এক যৌথ ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মানুষের কর্মকান্ড (যেমন ভূমিধস, দূষণ, নদী খনন ইত্যাদি) বিশুদ্ধ পানির সরবরাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

নদীর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ স্তরের পানিও মানবসৃষ্ট কারণে দূষিত হচ্ছে। এ যৌথ ঘোষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছেন, আগামী এক বা দুই প্রজন্মের মধ্যেই বিশ্বের ৯০০ কোটি মানুষের অধিকংশই বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের মধ্যে জীবনযাপন করবে। ডাব্লিওএইচও এবং ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে ৭৮৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মৌলিক অধিকার হিসেবে পানি সেবা পায় না এবং ৮৮৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পানি পান করতে পারছে না। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষকে নিরাপদ পানি ছাড়াই জীবনযাপন করতে হবে।

ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে বিশুদ্ধ পানি সংকটকে বৈশ্বিক হুমকির তালিকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শরণার্থী সংকট ও সাইবার আক্রমণের উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তির বৈশ্বিক এ সংকট বাংলাদেশেও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের ৬৮.৩ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ সরকারের জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম প্রতিবেদন অনুযায়ী এ দেশের শতকরা ৪৪ ভাগ মানুষ নিরাপদ ও সুপেয় পানি হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

পানিতে আর্সেনিকের আধিক্য পানির প্রাপ্যতাকে আরও দুর্লভ করেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬১টি জেলার নলকূপের পানিতে আর্সেনিক রয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৯ মিলিয়ন মানুষ আর্সেনিকের ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের খুলনা-বাগেরহাট উপকূলীয় এলাকার ৭৩ শতাংশ মানুষের কাছে নিরাপদ খাবার পানি পৌঁছায় না। এই এলাকার মানুষ প্রতি লিটার পানির সঙ্গে গড়ে ১৪২৭-২৪০৬ মিলিগ্রাম লবণাক্ত পানি গ্রহণ করছে, যেখানে গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটারে ১০০০ মিলিগ্রাম।

বিশুদ্ধ পানি প্রপ্তির ক্ষেত্রে স্যানিটেশন সুবিধা না থাকাও একটি বড় সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক গবেষণা মতে, দেশের পাইপলাইনের পানির ৮০ ভাগেই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। পুকুরের পানিতেও একই মাত্রায় এ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ৩৮ শতাংশ টিউবওয়েলের পানিতেও এ ক্ষতিকর অনুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। ঢাকায় মাত্র ২০ ভাগ পৃথক স্যুয়ারেজ পাইপ লাইন রয়েছে আর বাকিটা খোলা। সারাদেশে পয়ঃবর্জ্যরে মাত্র ২ ভাগ ট্রিটমেন্ট করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাকি বর্জ্য মূলত পানিতেই মিশে যাচ্ছে। গৃহস্থালির অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ছাড়াও ঢাকার নদীগুলোতে প্রতিদিন ৬০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্য নদীর পানি দূষিত করছে।

ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশে পানি সংকট বাড়িয়ে তুলছে। বছরে ৩২ ঘন কিলোমিটার ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয় যার ৯০ ভাগ সেচ কাজে এবং ১০ ভাগ শিল্প ও গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দেশের দুই মেগাসিটি ঢাকা ও চট্টগ্রামে দৈনিক মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় প্রায় ২ কোটি মানুষের জন্য দৈনিক গড়ে ২৪৫ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হয় যার ৮৭ ভাগ আসে ভূ-গর্ভ থেকে আর বাকি ১৩-১৪ ভাগ আসে নদী থেকে। ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় পানি চাহিদা দৈনিক ২২০ কোটি লিটার কিন্তু আরো ২৫ কোটি লিটার পানি অতিরিক্ত উত্তোলন করা হচ্ছে। ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ বস্তিবাসী। দৈনিক গড়ে জনপ্রতি ১৪০ লিটার পানি ব্যবহার হলেও বস্তিবাসী পাচ্ছে মাত্র ২০ লিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ১৯৯০ সালে ১৩০টি গভীর নলকূপ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হতো এবং সেই সময় ২২.৫০ মিটার নিচ থেকে পানি পাওয়া যেত। ২০০৫ সালে নলকূপের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪২৩, পানির স্তর নেমে যায় ৫৪ মিটারে। ২০২০ সালে এসে নলকূপের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। পানির স্তর নেমেছে ৭৪ মিটার। বরেন্দ্র অঞ্চলে কোথাও কোথাও পানির স্তর নেমেছে ১৫০ ফুটেরও নিচে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে শুরু হয় পানির হাহাকার। জমিতে সেচের পানি না পেয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় ২০২২ সালে দুই কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়; যা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

পানি সম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, আহরণ, বিতরণ, ব্যবহার, সুরক্ষা ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে সরকার পানি আইন ও ২০১৮ সালে পানি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এ আইনের ধারা ৩(১) অনুযায়ী এ রাষ্ট্রের সীমানাভুক্ত ভূ-উপরিস্থ পানি, ভূগর্ভস্থ পানি, সামুদ্রিক পানি, বৃষ্টির পানি এবং বায়ুমন্ডলের পানির সবাই অধিকার জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের ওপর অর্পিত থাকবে। ধারা ৩(২)-এ বলা হয়েছে- সুপেয় পানি এবং পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ব্যবহার্য পানির অধিকার সর্বাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। এ আইনের ধারা ১৭ অনুযায়ী জলাধার বা পানিধারক স্তরের সুরক্ষার জন্য, যথাযথ অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যেকোনো এলাকা বা এলাকার অংশবিশেষ বা পানিসম্পদ সংশ্লিষ্ট যেকোনো ভূমিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে।

পানি বিধিমালা-২০১৮-এর বিধি ৩ অনুযায়ী জনগণের পানি ব্যবহারের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ ও ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনাক্রমে প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতিদিন সুপেয় পানি, পরিচ্ছন্নতা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পানির চাহিদা, পানি প্রাপ্তির সীমা ও পানির উৎসের সর্বোচ্চ কাম্য দূরত্ব নির্ধারণ করতে পারবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে- দেশে এলাকা ভেদে পানির সংকট চরমে থাকলেও অদ্যাবধি এ আইন ও বিধিমালার আলোকে কোনো এলাকাকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়নি। ২০১৫ সালের ৪৪০/১৫ নং জনস্বার্থমূলক মামলার রায়ে মহামান্য পানি আইনের ধারা ১৭-এর অধীনে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার চরকানাই, হুলাইন, পাচুরিয়া এবং হাবিলাস দ্বীপ গ্রামগুলোকে (৩৫০টি টিউবওয়েল বিকল হয়ে পড়লে গ্রামগুলোর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়ে) পানি সংকাটাপন্ন এলাকা ঘোষণার নির্দেশ প্রদান করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার ৬নং লক্ষ্য হিসেবে শতভাগ নাগরিকের জন্য সুপেয় পানি প্রাপ্তি নিশ্চিতে করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ। পানিসংক্রান্ত মূল সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ডেলটা প্লান ২১০০ গ্রহণ করেছে। পানি নিয়ে প্রণীত ও গৃহীত সরকারের বিভিন্ন নীতি, আইন ও পরিকল্পনা জনমনে আশার সঞ্চার করলেও বাস্তবে পানি সংকট নিরসনে তা কার্যকর নয়। দেশে পানি সংকট নিরসনে আশু করণীয় হিসেবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বর্তমান সময়ের চাহিদা।

পানির চাহিদা ও প্রাপ্যতা বিবেচনায় পানি সংকটপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, পানি আইনের অধীন পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা ও সংকট উত্তরণে করণীয় বিবেচনায় জনমত যাচাইসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে।

পানি সংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকায় পুনর্ভরণযোগ্য ভূ-গর্ভস্থ অগভীর পানিধারক স্তরকে সংরক্ষণ করতে সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা দরকার। বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূ-উপরিস্থ পানির আধার সংরক্ষণ, সংষ্কারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা; পানির সংকটে থাকা এলাকায় সংকটকালীন সময়ে জনগণের পানির চাহিদা মেটাতে সরকার কর্তৃক বিশেষ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

সরকার পানি বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা যথা- বন্যা, অতি বন্যা, আকস্মিক বন্যা, নদী ভাঙন, নাব্যতা হ্রাস, শুকনো মৌসুমে পানির দু®প্রাপ্যতা, খরা, সুপেয় পানির আধার ভরাট, অবৈধ দখল ও দূষণ, জলাবদ্ধতা, ভূ-গর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক হ্রাস ও দূষণ, সুপেয় পানির দু®প্রাপ্যতা এবং অর্থনীতি ও জনসংখ্যার কারণে পানির ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা ইত্যাদির আলোকে জাতীয় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা হালনাগাদকরণ ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলাধারসমূহ সংরক্ষণে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পানির চাহিদা ও প্রাপ্যতা বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ এবং জনগণকে অবহিত করা জরুরি। ভরাট, অবৈধ দখল ও দূষণ হতে জলাশয় রক্ষায় এবং জলাশয়ের প্রবাহ অটুট রাখতে স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণ, সময়োপযোগীকরণ ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

জলাশয়ের প্রতিবেশ ব্যবস্থা রক্ষার্থে পানির সর্বনিম্ন প্রবাহমাত্রা এবং মানমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। জলাশয়ের প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করে এমন সব প্রকল্প পরিহার ও বাধা সৃষ্টিকারী স্থাপনা অপসারণ করা দরকার। পানি দূষণের উৎস চিহ্নিত করা ও তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। হাওর, বাঁওড়, বিল ইত্যাদি বৈচিত্র্যময় জলাশয় রক্ষায় গৃহীত পরিকল্পনা সময়োপযোগীকরণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

পানি সরবরাহে ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানো এবং বিশেষত পানি সংকটাপন্ন এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানি আহরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা দরকার। সীমিত পানি সম্পদের সংরক্ষণ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করিতে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং গবেষণালব্ধ ফলের ভিত্তিতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আর্সেনিক দূষণের বিস্তার এবং লবণাক্ততারোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সব ক্ষেত্রে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পানি বিষয়ে জনগণের প্রথাগত অধিকার এবং ন্যূনতম পানি প্রাপ্যতার অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

[লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী]

back to top