alt

সাময়িকী

বুলবুল চৌধুরী

বিস্ময় না কাটে

মাহবুব রেজা

: সোমবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

একই দিনে জীবনের যতি টানলেন দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বিশিষ্ট সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী (বাঁয়ে) ও লেখক-অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিম
[বুলবুল চৌধুরী / জন্ম : ১৬ আগস্ট ১৯৪৮; মৃত্যু : ২৮ আগস্ট ২০২১] / [শেখ আবদুল হাকিম / জন্ম : ১৯৪৬; মৃত্যু : ২৮ আগস্ট ২০২১]

পরিচয়ের ক্ষণ থেকে হাড়ে হাড়ে টের পাই, মানুষটার মধ্যে এক ধরনের ঘোর-লাগানিয়া যাদুমন্ত্র আছে। খুবই সাদাসিধে চলন-বলন, আটপৌরে জীবন লতিকায় ছেয়ে যাওয়া পুরোদস্তুর প্রাণ বটে, কিন্তু তারপরও কোথায় যেন একটা স্বাতন্ত্র্যবোধ মানুষটাকে আর দশজন থেকে ভিন্নতায় পৌঁছে দেয়। কথা বলার মধ্যেও অদ্ভুত এক মাদকতাময় ভঙ্গিমা জুড়ে থাকে। তিনি যখন কথা বলেন তখন তা হয়ে দাঁড়ায় মন্ত্রমুগ্ধ ব্যাপারের মতো। জমাটবাধা বুননের মধ্যে গুছিয়ে কথা বলেন এবং সেই কথা বলার মধ্যে থাকা শব্দরাজিও একান্ত তাঁর নিজস্ব গোছের।

গোছের মানেটা কী? খুব পরিষ্কার, তিনি ‘বুলবুলীয়’ শব্দ-মাধুর্যে কথাকে প্রায় ছন্দোবদ্ধ কবিতায় রূপান্তরিত করেন। আমার বিশ্বাস, যার সঙ্গেই তার পরিচয় হয় তার সঙ্গেই প্রথম থেকে তিনি একটা ঘোর, একটা আচ্ছন্নতা তৈরি করে ফেলেন। বুলবুল চৌধুরী আর দশজনের মতো নিজেকে ‘তেলে-জলে’ মেশাতে পারেন না। আমাদের চারপাশে ‘ভাঁজ’ ‘যেখানে যেমন সেখানে তেমন’ কিংবা (যখন যেমন তখন তেমন-মার্কা জীবন পদ্ধতি) দেয়া লোকজনের সংখ্যা যেহারে বেড়ে যাচ্ছে তাতে করে শঙ্কিত হওয়ার ব্যাপার-স্যাপার তো থাকেই। এখন একথা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ভাঁজ দিয়ে চলতে না পারলে জীবনে অনেক হ্যাপা সামলাতে হয়। এটা আমার জীবন থেকে নেয়া যাকে বলে কিনা একেবারে বাস্তব অভিজ্ঞতা। তার সঙ্গে মিলেমিশে অনুভব করি, প্রায় সময়ই বুলবুল ভাই নিজেকে শামুক বানিয়ে চলাফেরা করেন। নিজের মধ্যে গুটিয়ে রাখার এক ঐশ্বরিক গুণ তাঁর আছে। তাঁর মধ্যে নির্বিকার, ভাবলেশহীন আর নির্মোহ একটা ভাব সবসময় প্রবহমান থাকে। প্রথম দেখায় তাঁকে যে কারোরই মনে হবে, আরে! এই মানুষ কি এই পৃথিবীর! না দূর পৃথিবীর!

‘মানুষের মুখ’ তাঁর অসামান্য সৃষ্টি কিংবা এর সাহিত্যমান তৎকালীন সময়কে অতিক্রান্ত করেছে- এ রকম মূল্যায়ন একসময় হয়তো সাহিত্য সমালোচকরা করবেন কিন্তু ‘মানুষের মুখ’ আঁকতে গিয়ে বুলবুল চৌধুরী প্রচলিত রীতি-নীতি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের তোয়াক্কা করেননি। ‘মানুষের মুখ’ দিয়ে নিজের মতো করে বৃত্ত তৈরি করেছেন তিনি

বুলবুল চৌধুরীকে দেখলে মনে হয় তিনি বুঝি ‘ব্রেভ হার্ট’ সিনেমার নায়ক মেল গিবসন। কখনো-সখনো মনে হয়, তিনি বুঝি জন লেনন। লাল গমের মতো শরীরের দ্যুতি, টিকলো নাক, রঙিন মার্বেলের মতো হিরন্ময় চোখ, মসৃণ টানা বারান্দার মতো কপাল আর স্বর্ণলতার মতো চুল মাথার অগ্রভাগ থেকে কায়দা করে পেছনে চলে গেছে। হাঁটার সময় চুলগুলো ‘পাইন্যা’ সাপের মতো নড়েচড়ে ওঠে। চিকন-চাকন গড়ন। শরীরের কোথাও সেন্টিমিটার অধিক মেদ নেই। খাবারের বেলায় তিনি না ভোজনরসিক, না পেটুক, না খানেদার। মানুষ এত দ্রুত খেয়ে উঠতে পারে সেটা বুলবুল চৌধুরীকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কোনো কিছুতেই যেন তার তৃপ্তি নেই। খেতে হবে তাই ক’টা খাওয়া, বাঁচতে হবে তাই কোনমতো বেঁচে থাকা, চলতে হবে তাই কোনোমতে চলাফেরা, সংসার করতে হবে তাই একটু-আধটু সংসারী হওয়া বা না হওয়া- সবকিছুর মধ্যে বুলবুল চৌধুরী বুলবুল চৌধুরী।

জীবনের না মেলানোর হিসাব মেলানোতে আট-দশ বছর ইতালির মিলানোতে ‘কামলা’ দিয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। দেখেছি বিচিত্র মানুষ। দেখেছি তার চেয়েও বিচিত্র মুখ কিন্তু বুলবুল চৌধুরীর ‘মানুষের মুখ’-এর মতো এমন বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর মানুষের মুখ দর্শন আমি আর কোত্থাও করিনি। ‘মানুষের মুখ’ যখন প্রথম জনকণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল তখন আমাদের লেখক বন্ধুরা সব ‘আউলা’ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতি সপ্তাহে বুলবুল চৌধুরী কী অবিনাশী শক্তিমত্তায়, কী অসহ্য সুন্দর ভয়ঙ্কর গদ্যে আমাদের চারপাশের জটিল সব মুখগুলোকে নির্বিঘ্নে চুরমার করে ভেঙে দিচ্ছেন। ‘মানুষের মুখ’ তাঁর অসামান্য সৃষ্টি কিংবা এর সাহিত্যমান তৎকালীন সময়কে অতিক্রান্ত করেছে- এ রকম মূল্যায়ন একসময় হয়তো সাহিত্য সমালোচকরা করবেন কিন্তু ‘মানুষের মুখ’ আঁকতে গিয়ে বুলবুল চৌধুরী প্রচলিত রীতি-নীতি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের তোয়াক্কা করেননি। ‘মানুষের মুখ’ দিয়ে নিজের মতো করে বৃত্ত তৈরি করেছেন তিনি। ‘মানুষের মুখ’ বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে ‘মুখ হয়ে যাই’ শিরোনামের শেষে এসে তিনি লিখেছেন, ‘শেষ দৃশ্যে ধ্রুব এষের প্রবেশ। হঠাৎ দেখি ক্যামেরাম্যান জামিল রহিমকে বোগলদাবা করে ঢাকার পথে। তার নির্দেশে ছবি তোলা হচ্ছিল। অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, কী হবে ধ্রুব এষ?’

‘মানুষের মুখ’-এর প্রচ্ছদ বুলবুল ভাই।

মনে মনে খুশি। ভাবলাম, ভালো। বেশ ভালো। দলে আরেকজন পেলাম। পরমুহূর্তেই নাটকের দৃশ্য ভিন্ন খাতে মোড় নেয়। শিল্পী বললেন, ফিরুন তো, এদিকে ফিরুন।

কী হবে?

ছবি তুলব আপনার।

মুহূর্তেই বদলে যায় নিশ্চয় আমার বরণ। ভীত হয়ে দাঁড়াই। আমিও কি মানুষের মুখ নাকি? ধ্রুবর চরিত্র? পরে ভেবে দেখি কে না এ পৃথিবীতে বিস্ময় রথের যাত্রী? ভিড়ে নিজেও মুখ হয়ে সয়লাব কবেই!’

সাহিত্যের ইঁদুর দৌড়ে কী করে নিজেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায়, কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখা যায়, কী করে নিজেকে অকারণ-মূল্যবান করে তোলা যায়, কী করে নিজেকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আবহাওয়া অফিসের মতো করে ফোর-কাস্ট করা যায়, গাঁটের টাকায় পুরস্কার অর্জন করা যায়- এই যখন চারদিককার অবস্থা তখন ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’র বুলবুল চৌধুরীই পারেন অবলীলায় সয়লাব হয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে!

দুই

বুলবুল চৌধুরীকে নিয়ে কতো কথা, কতো স্মৃতি, যতো ঘটনা মনের গহীনে ডুব যে মেরে আছে! মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ বুলবুল চৌধুরী বুঝি ছাইচাপার মতো চাপা পড়ে গেছেন লেখক বুলবুল চৌধুরীর অতলে। বৈষয়িকভাবে এখনই তাকে অত সচেতন মনে হয়নি কখনো। বোধকরি কোনকালে তিনি ঐ রকম ছিলেনও না। তার মধ্যে সবসময় খেলা করে শিশুর মতো সরলতা, মুগ্ধতা। কাছের মানুষকে অপার বিশ্বাসে বিশ্বাস করে জলাঞ্জলি দিয়েছেন অনেক কিছু। তার সাম্প্রতিক একটা নমুনা দেই। কিছুদিন আগে তার গ্রামের এক কাছের মানুষ তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে অবলীলায় তার নিজের মূল্যবান জমি স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নিয়েছেন। জিজ্ঞেস করে জেনেছি সেই জমির বর্তমান বাজার মূল্য লাখ দশেক টাকা। ঘটনা জানতে পেরে আমার মেজাজ বিগড়ে গেল। খানিকটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, বুলবুল ভাই এই ভুল আপনি কেমনে করলেন!

আমার কথায় বুলবুল চৌধুরী থির, নীরব। বর্ষাকালে বিক্রমপুর অঞ্চলে বউন্না গোটা যেমন পানিতে ডুবে গিয়ে থির হয়ে থাকে তিনিও তেমনতর থির হয়ে আছেন। সার্বক্ষণিক চশমার ভেতর বুজে থাকা চোখ, ধ্যানমগ্ন ঋষির আচ্ছনতায় বিভোর। এখন কী করা যায়- উকিল ধরে কিছু একটা করা যায় কিনা সেটা নিয়ে চিন্তা করছি।

আমার কথায় তিনি বুঝি একটু বিরক্তই হলেন। কথার পুনরাবৃত্তি করতেই বুলবুল ভাই বললেন, জাইন্যা-শুইন্যা ভুল তো মিয়া আমারই হইছে। হুদা কামে পরমাইনষেরে দোষায়া লাভ কী?

বুলবুল ভাইয়ের সহজ-সরল স্বীকারোক্তিতে কী এমন গুণ আছে জানি না মুহূর্তের মধ্যে আমার ভেতরে জমে থাকা রাগ, উত্তেজনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমরা অহরহ না জেনে ভুল করি অথচ কেউ-ই তা স্বীকার করি না। কিন্তু বুলবুল চৌধুরীর সরল স্বীকারোক্তি, জাইন্যা-শুইন্যা তো মিয়া আমিই করছি- পরমাইনষেরে দোষায়া লাভ কী?

পরমাইনষেরে দোষায়া লাভ কী? বুলবুল চৌধুরীর এ কথায় আমার হুঁশ ফেরে। বুকের ভেতর কোথাকার কোন পরমানুষের জন্য কোত্থেকে দুধের বলকের মতো এক ধরনের মায়া আমার ভেতরে উপচে উপচে পড়ে!

বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থেকে একজনমে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে অর্জন করেছি তা লিখতে গেলে তার পরিসর বিশ-পঁচিশ ফর্মাতেও কী সম্ভব? মনে হয় না। তার গল্প, উপন্যাস, রূপকথা, স্মৃতিময় গদ্য, কাব্যময় আর তার একান্ত ‘রূপবান’ ভাষা- সবকিছুরই তুমুল ভক্ত আমি। তাঁর সঙ্গে যখন পথ চলি তখন তাঁকে অন্ধ জাদুকর বলে ভ্রম হয়। মনে হয় এই বুঝি হাঁটতে হাঁটতে তিনি পথের ধূলি হয়ে যাবেন কিংবা ভোজবাজির মতো কোথাও মিলিয়ে যাবেন। হাঁটতে হাঁটতে পরম বিস্ময়ে দেখি তিনি কোথাও মিলিয়ে যান না কিংবা হয়ে যান না পথের ধুলোও। তিনি অবিকল তিনিই থেকে যান। এমনই জাদুময় স্নিগ্ধতা তাকে ঘিরে থাকে সদাই।

তিন

আগে একবার বলেছিলাম মানুষ বুলবুল চৌধুরী বুঝি ছাইচাপা পড়ে গেছেন লেখক বুলবুল চৌধুরীর অতলে। এবার তার সঙ্গে যোগ করি আরও একটু। দেশ স্বাধীনের চার-পাঁচ বছরের মাথায় ‘টুকা কাহিনী’ নামের এক অসাধারণ শ্রেষ্ঠ গল্প লিখে দৌর্দ- প্রতাপে নিজের জায়গাটিকে পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘টুকা কাহিনী’র পর আরও কতো অসাধারণ গল্প আর হৃদয় তোলপাড় করা উপন্যাস লিখে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তার উল্লেখ না করলেও চলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য বুলবুল চৌধুরীর- যখনই কাথাসাহিত্যে তাঁর মূল্যায়নের প্রশ্ন আসে, তার কথা ওঠে তখনই একশ্রেণির সমালোচক, সাহিত্যবোদ্ধাদের বেশ কৌশল করে বিজ্ঞের মতো বলতে শোনা যায়, ‘টুকা কাহিনী’র পর আসলে বুলবুল চৌধুরীর আর না লিখলেও চলত। একথা বলে তাদের কেউ কেউ আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুরও তোলেন। আমি ব্যতিগতভাবে মনে করি (বিশ্বাসও করতে চাই), বুলবুল চৌধুরীকে শুধুমাত্র ‘টুকা কাহিনী’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সমালোচক আর সাহিত্য বোদ্ধাদের এক সৃজনশীল ঘেরাটোপ। ‘কহ কামিনী’, ‘পাপ-পুণ্যি’, ‘মরম বাখানী’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’, ‘তিয়াসের লেখন’, ‘জলটুঙ্গি’, ‘ঘাটের বাও’- প্রত্যেকটি উপন্যাসে বুলবুল চৌধুরী কী বিষয়ে কী চরিত্র চিত্রনে কী আঙ্গিকগত পরিবর্তন- সবকিছুতেই পাঠকের ভেতর চড়কি নাচনের মতো বহুমাত্রিক ভেল্কি লাগিয়ে দিয়েছেন। আর তাঁর গল্প? তাঁর অসংখ্য গল্প আছে যেসব গল্পের ঠাঁই হবে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারিতে।

বুলবুল চৌধুরীর মধ্যে অনেক পাগলামো আছে। তার মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান পাগলামো ছিল নিজের প্রকাশিত গল্পের কাটাকুটি করা। দক্ষ সিভিল সার্জনের মতো তিনি তাঁর প্রকাশিত নির্বাচিত গল্পের প্রতিটি পাতায় কাটাকুটি করে আমূল বদলে ফেলতেন। এসব দেখে একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, প্রকাশিত বইয়ের পাতায় পাতায় এমনভাবে নকশাচিত্র ফুটিয়ে তোলেন কেন? আগে প্রুফ দেখেননি?

বুলবুল চৌধুরী তার স্বভাবসুলভ নির্বিকার ভঙ্গি আর ভালেশহীন চেহারায় অকপট বলেন, আগে তো মিয়া মনে করছিলাম সব ঠিকঅই আছে। পরে দেহি ঠিক নাই।

অবশ্য সবসময় যে তিনি এ রকম করেন, তা নয়। এ প্রবণতা এখন বিস্তর কমেছে। ধ্রুব এষের তীব্র আপত্তি, আপনি যখন ঐ সময় ঐ গল্প লেখছেন তখন এই গল্পটাই ঠিক ছিল। গল্পের সময় যা লিখছেন পরে এটা আর চেঞ্জ করবেন না। এখন আপনে যদি বিশ বছর আগের গল্পের আডডেট করতে গিয়া কাটাছেড়া কইরা পাঠককে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেন, এইটা ঠিক না। গল্পের কোন আপডেট হয় না।

ধ্রুবর কথায় কাজ হয়েছে। বুলবুল চৌধুরী এখন আর ও পথে পা বাড়ান না।

চার

সবশেষ কথা। বুলবুল চৌধুরী যে অসম্ভব চঞ্চল তা প্রথমে কেউ ঠাওর করে উঠতে পারবেন না। এক জায়গায় দু মিনিটি (দু’দণ্ড বললে বোধহয় আরও যুতসই হতো) বসে থাকার মানুষ তিনি কোনকালে ছিলেন না। যে কারণে বুলবুল চৌধুরী জীবনে কোনো চাকরি দীর্ঘদিন করতে পারেননি। তিনি তাঁর কথাবার্তায় আচার-আচরণ, চলন-বলন, সবকিছু নিয়ে আমার কাছে বিস্ময়ের এক আধার। তাকে যত দেখি বিস্ময় না কাটে!

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

tab

সাময়িকী

বুলবুল চৌধুরী

বিস্ময় না কাটে

মাহবুব রেজা

একই দিনে জীবনের যতি টানলেন দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বিশিষ্ট সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী (বাঁয়ে) ও লেখক-অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিম
[বুলবুল চৌধুরী / জন্ম : ১৬ আগস্ট ১৯৪৮; মৃত্যু : ২৮ আগস্ট ২০২১] / [শেখ আবদুল হাকিম / জন্ম : ১৯৪৬; মৃত্যু : ২৮ আগস্ট ২০২১]

সোমবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

পরিচয়ের ক্ষণ থেকে হাড়ে হাড়ে টের পাই, মানুষটার মধ্যে এক ধরনের ঘোর-লাগানিয়া যাদুমন্ত্র আছে। খুবই সাদাসিধে চলন-বলন, আটপৌরে জীবন লতিকায় ছেয়ে যাওয়া পুরোদস্তুর প্রাণ বটে, কিন্তু তারপরও কোথায় যেন একটা স্বাতন্ত্র্যবোধ মানুষটাকে আর দশজন থেকে ভিন্নতায় পৌঁছে দেয়। কথা বলার মধ্যেও অদ্ভুত এক মাদকতাময় ভঙ্গিমা জুড়ে থাকে। তিনি যখন কথা বলেন তখন তা হয়ে দাঁড়ায় মন্ত্রমুগ্ধ ব্যাপারের মতো। জমাটবাধা বুননের মধ্যে গুছিয়ে কথা বলেন এবং সেই কথা বলার মধ্যে থাকা শব্দরাজিও একান্ত তাঁর নিজস্ব গোছের।

গোছের মানেটা কী? খুব পরিষ্কার, তিনি ‘বুলবুলীয়’ শব্দ-মাধুর্যে কথাকে প্রায় ছন্দোবদ্ধ কবিতায় রূপান্তরিত করেন। আমার বিশ্বাস, যার সঙ্গেই তার পরিচয় হয় তার সঙ্গেই প্রথম থেকে তিনি একটা ঘোর, একটা আচ্ছন্নতা তৈরি করে ফেলেন। বুলবুল চৌধুরী আর দশজনের মতো নিজেকে ‘তেলে-জলে’ মেশাতে পারেন না। আমাদের চারপাশে ‘ভাঁজ’ ‘যেখানে যেমন সেখানে তেমন’ কিংবা (যখন যেমন তখন তেমন-মার্কা জীবন পদ্ধতি) দেয়া লোকজনের সংখ্যা যেহারে বেড়ে যাচ্ছে তাতে করে শঙ্কিত হওয়ার ব্যাপার-স্যাপার তো থাকেই। এখন একথা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, ভাঁজ দিয়ে চলতে না পারলে জীবনে অনেক হ্যাপা সামলাতে হয়। এটা আমার জীবন থেকে নেয়া যাকে বলে কিনা একেবারে বাস্তব অভিজ্ঞতা। তার সঙ্গে মিলেমিশে অনুভব করি, প্রায় সময়ই বুলবুল ভাই নিজেকে শামুক বানিয়ে চলাফেরা করেন। নিজের মধ্যে গুটিয়ে রাখার এক ঐশ্বরিক গুণ তাঁর আছে। তাঁর মধ্যে নির্বিকার, ভাবলেশহীন আর নির্মোহ একটা ভাব সবসময় প্রবহমান থাকে। প্রথম দেখায় তাঁকে যে কারোরই মনে হবে, আরে! এই মানুষ কি এই পৃথিবীর! না দূর পৃথিবীর!

‘মানুষের মুখ’ তাঁর অসামান্য সৃষ্টি কিংবা এর সাহিত্যমান তৎকালীন সময়কে অতিক্রান্ত করেছে- এ রকম মূল্যায়ন একসময় হয়তো সাহিত্য সমালোচকরা করবেন কিন্তু ‘মানুষের মুখ’ আঁকতে গিয়ে বুলবুল চৌধুরী প্রচলিত রীতি-নীতি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের তোয়াক্কা করেননি। ‘মানুষের মুখ’ দিয়ে নিজের মতো করে বৃত্ত তৈরি করেছেন তিনি

বুলবুল চৌধুরীকে দেখলে মনে হয় তিনি বুঝি ‘ব্রেভ হার্ট’ সিনেমার নায়ক মেল গিবসন। কখনো-সখনো মনে হয়, তিনি বুঝি জন লেনন। লাল গমের মতো শরীরের দ্যুতি, টিকলো নাক, রঙিন মার্বেলের মতো হিরন্ময় চোখ, মসৃণ টানা বারান্দার মতো কপাল আর স্বর্ণলতার মতো চুল মাথার অগ্রভাগ থেকে কায়দা করে পেছনে চলে গেছে। হাঁটার সময় চুলগুলো ‘পাইন্যা’ সাপের মতো নড়েচড়ে ওঠে। চিকন-চাকন গড়ন। শরীরের কোথাও সেন্টিমিটার অধিক মেদ নেই। খাবারের বেলায় তিনি না ভোজনরসিক, না পেটুক, না খানেদার। মানুষ এত দ্রুত খেয়ে উঠতে পারে সেটা বুলবুল চৌধুরীকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। কোনো কিছুতেই যেন তার তৃপ্তি নেই। খেতে হবে তাই ক’টা খাওয়া, বাঁচতে হবে তাই কোনমতো বেঁচে থাকা, চলতে হবে তাই কোনোমতে চলাফেরা, সংসার করতে হবে তাই একটু-আধটু সংসারী হওয়া বা না হওয়া- সবকিছুর মধ্যে বুলবুল চৌধুরী বুলবুল চৌধুরী।

জীবনের না মেলানোর হিসাব মেলানোতে আট-দশ বছর ইতালির মিলানোতে ‘কামলা’ দিয়েছি। পৃথিবীর অনেক দেশ ঘুরেছি। দেখেছি বিচিত্র মানুষ। দেখেছি তার চেয়েও বিচিত্র মুখ কিন্তু বুলবুল চৌধুরীর ‘মানুষের মুখ’-এর মতো এমন বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর মানুষের মুখ দর্শন আমি আর কোত্থাও করিনি। ‘মানুষের মুখ’ যখন প্রথম জনকণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে বের হচ্ছিল তখন আমাদের লেখক বন্ধুরা সব ‘আউলা’ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতি সপ্তাহে বুলবুল চৌধুরী কী অবিনাশী শক্তিমত্তায়, কী অসহ্য সুন্দর ভয়ঙ্কর গদ্যে আমাদের চারপাশের জটিল সব মুখগুলোকে নির্বিঘ্নে চুরমার করে ভেঙে দিচ্ছেন। ‘মানুষের মুখ’ তাঁর অসামান্য সৃষ্টি কিংবা এর সাহিত্যমান তৎকালীন সময়কে অতিক্রান্ত করেছে- এ রকম মূল্যায়ন একসময় হয়তো সাহিত্য সমালোচকরা করবেন কিন্তু ‘মানুষের মুখ’ আঁকতে গিয়ে বুলবুল চৌধুরী প্রচলিত রীতি-নীতি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের তোয়াক্কা করেননি। ‘মানুষের মুখ’ দিয়ে নিজের মতো করে বৃত্ত তৈরি করেছেন তিনি। ‘মানুষের মুখ’ বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে ‘মুখ হয়ে যাই’ শিরোনামের শেষে এসে তিনি লিখেছেন, ‘শেষ দৃশ্যে ধ্রুব এষের প্রবেশ। হঠাৎ দেখি ক্যামেরাম্যান জামিল রহিমকে বোগলদাবা করে ঢাকার পথে। তার নির্দেশে ছবি তোলা হচ্ছিল। অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, কী হবে ধ্রুব এষ?’

‘মানুষের মুখ’-এর প্রচ্ছদ বুলবুল ভাই।

মনে মনে খুশি। ভাবলাম, ভালো। বেশ ভালো। দলে আরেকজন পেলাম। পরমুহূর্তেই নাটকের দৃশ্য ভিন্ন খাতে মোড় নেয়। শিল্পী বললেন, ফিরুন তো, এদিকে ফিরুন।

কী হবে?

ছবি তুলব আপনার।

মুহূর্তেই বদলে যায় নিশ্চয় আমার বরণ। ভীত হয়ে দাঁড়াই। আমিও কি মানুষের মুখ নাকি? ধ্রুবর চরিত্র? পরে ভেবে দেখি কে না এ পৃথিবীতে বিস্ময় রথের যাত্রী? ভিড়ে নিজেও মুখ হয়ে সয়লাব কবেই!’

সাহিত্যের ইঁদুর দৌড়ে কী করে নিজেকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায়, কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখা যায়, কী করে নিজেকে অকারণ-মূল্যবান করে তোলা যায়, কী করে নিজেকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে আবহাওয়া অফিসের মতো করে ফোর-কাস্ট করা যায়, গাঁটের টাকায় পুরস্কার অর্জন করা যায়- এই যখন চারদিককার অবস্থা তখন ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’র বুলবুল চৌধুরীই পারেন অবলীলায় সয়লাব হয়ে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে!

দুই

বুলবুল চৌধুরীকে নিয়ে কতো কথা, কতো স্মৃতি, যতো ঘটনা মনের গহীনে ডুব যে মেরে আছে! মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ বুলবুল চৌধুরী বুঝি ছাইচাপার মতো চাপা পড়ে গেছেন লেখক বুলবুল চৌধুরীর অতলে। বৈষয়িকভাবে এখনই তাকে অত সচেতন মনে হয়নি কখনো। বোধকরি কোনকালে তিনি ঐ রকম ছিলেনও না। তার মধ্যে সবসময় খেলা করে শিশুর মতো সরলতা, মুগ্ধতা। কাছের মানুষকে অপার বিশ্বাসে বিশ্বাস করে জলাঞ্জলি দিয়েছেন অনেক কিছু। তার সাম্প্রতিক একটা নমুনা দেই। কিছুদিন আগে তার গ্রামের এক কাছের মানুষ তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে অবলীলায় তার নিজের মূল্যবান জমি স্ট্যাম্পে সই করিয়ে নিয়েছেন। জিজ্ঞেস করে জেনেছি সেই জমির বর্তমান বাজার মূল্য লাখ দশেক টাকা। ঘটনা জানতে পেরে আমার মেজাজ বিগড়ে গেল। খানিকটা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করি, বুলবুল ভাই এই ভুল আপনি কেমনে করলেন!

আমার কথায় বুলবুল চৌধুরী থির, নীরব। বর্ষাকালে বিক্রমপুর অঞ্চলে বউন্না গোটা যেমন পানিতে ডুবে গিয়ে থির হয়ে থাকে তিনিও তেমনতর থির হয়ে আছেন। সার্বক্ষণিক চশমার ভেতর বুজে থাকা চোখ, ধ্যানমগ্ন ঋষির আচ্ছনতায় বিভোর। এখন কী করা যায়- উকিল ধরে কিছু একটা করা যায় কিনা সেটা নিয়ে চিন্তা করছি।

আমার কথায় তিনি বুঝি একটু বিরক্তই হলেন। কথার পুনরাবৃত্তি করতেই বুলবুল ভাই বললেন, জাইন্যা-শুইন্যা ভুল তো মিয়া আমারই হইছে। হুদা কামে পরমাইনষেরে দোষায়া লাভ কী?

বুলবুল ভাইয়ের সহজ-সরল স্বীকারোক্তিতে কী এমন গুণ আছে জানি না মুহূর্তের মধ্যে আমার ভেতরে জমে থাকা রাগ, উত্তেজনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমরা অহরহ না জেনে ভুল করি অথচ কেউ-ই তা স্বীকার করি না। কিন্তু বুলবুল চৌধুরীর সরল স্বীকারোক্তি, জাইন্যা-শুইন্যা তো মিয়া আমিই করছি- পরমাইনষেরে দোষায়া লাভ কী?

পরমাইনষেরে দোষায়া লাভ কী? বুলবুল চৌধুরীর এ কথায় আমার হুঁশ ফেরে। বুকের ভেতর কোথাকার কোন পরমানুষের জন্য কোত্থেকে দুধের বলকের মতো এক ধরনের মায়া আমার ভেতরে উপচে উপচে পড়ে!

বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থেকে একজনমে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে অর্জন করেছি তা লিখতে গেলে তার পরিসর বিশ-পঁচিশ ফর্মাতেও কী সম্ভব? মনে হয় না। তার গল্প, উপন্যাস, রূপকথা, স্মৃতিময় গদ্য, কাব্যময় আর তার একান্ত ‘রূপবান’ ভাষা- সবকিছুরই তুমুল ভক্ত আমি। তাঁর সঙ্গে যখন পথ চলি তখন তাঁকে অন্ধ জাদুকর বলে ভ্রম হয়। মনে হয় এই বুঝি হাঁটতে হাঁটতে তিনি পথের ধূলি হয়ে যাবেন কিংবা ভোজবাজির মতো কোথাও মিলিয়ে যাবেন। হাঁটতে হাঁটতে পরম বিস্ময়ে দেখি তিনি কোথাও মিলিয়ে যান না কিংবা হয়ে যান না পথের ধুলোও। তিনি অবিকল তিনিই থেকে যান। এমনই জাদুময় স্নিগ্ধতা তাকে ঘিরে থাকে সদাই।

তিন

আগে একবার বলেছিলাম মানুষ বুলবুল চৌধুরী বুঝি ছাইচাপা পড়ে গেছেন লেখক বুলবুল চৌধুরীর অতলে। এবার তার সঙ্গে যোগ করি আরও একটু। দেশ স্বাধীনের চার-পাঁচ বছরের মাথায় ‘টুকা কাহিনী’ নামের এক অসাধারণ শ্রেষ্ঠ গল্প লিখে দৌর্দ- প্রতাপে নিজের জায়গাটিকে পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘টুকা কাহিনী’র পর আরও কতো অসাধারণ গল্প আর হৃদয় তোলপাড় করা উপন্যাস লিখে তিনি বাংলাদেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তার উল্লেখ না করলেও চলে। কিন্তু দুর্ভাগ্য বুলবুল চৌধুরীর- যখনই কাথাসাহিত্যে তাঁর মূল্যায়নের প্রশ্ন আসে, তার কথা ওঠে তখনই একশ্রেণির সমালোচক, সাহিত্যবোদ্ধাদের বেশ কৌশল করে বিজ্ঞের মতো বলতে শোনা যায়, ‘টুকা কাহিনী’র পর আসলে বুলবুল চৌধুরীর আর না লিখলেও চলত। একথা বলে তাদের কেউ কেউ আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুরও তোলেন। আমি ব্যতিগতভাবে মনে করি (বিশ্বাসও করতে চাই), বুলবুল চৌধুরীকে শুধুমাত্র ‘টুকা কাহিনী’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সমালোচক আর সাহিত্য বোদ্ধাদের এক সৃজনশীল ঘেরাটোপ। ‘কহ কামিনী’, ‘পাপ-পুণ্যি’, ‘মরম বাখানী’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’, ‘তিয়াসের লেখন’, ‘জলটুঙ্গি’, ‘ঘাটের বাও’- প্রত্যেকটি উপন্যাসে বুলবুল চৌধুরী কী বিষয়ে কী চরিত্র চিত্রনে কী আঙ্গিকগত পরিবর্তন- সবকিছুতেই পাঠকের ভেতর চড়কি নাচনের মতো বহুমাত্রিক ভেল্কি লাগিয়ে দিয়েছেন। আর তাঁর গল্প? তাঁর অসংখ্য গল্প আছে যেসব গল্পের ঠাঁই হবে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারিতে।

বুলবুল চৌধুরীর মধ্যে অনেক পাগলামো আছে। তার মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান পাগলামো ছিল নিজের প্রকাশিত গল্পের কাটাকুটি করা। দক্ষ সিভিল সার্জনের মতো তিনি তাঁর প্রকাশিত নির্বাচিত গল্পের প্রতিটি পাতায় কাটাকুটি করে আমূল বদলে ফেলতেন। এসব দেখে একবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, প্রকাশিত বইয়ের পাতায় পাতায় এমনভাবে নকশাচিত্র ফুটিয়ে তোলেন কেন? আগে প্রুফ দেখেননি?

বুলবুল চৌধুরী তার স্বভাবসুলভ নির্বিকার ভঙ্গি আর ভালেশহীন চেহারায় অকপট বলেন, আগে তো মিয়া মনে করছিলাম সব ঠিকঅই আছে। পরে দেহি ঠিক নাই।

অবশ্য সবসময় যে তিনি এ রকম করেন, তা নয়। এ প্রবণতা এখন বিস্তর কমেছে। ধ্রুব এষের তীব্র আপত্তি, আপনি যখন ঐ সময় ঐ গল্প লেখছেন তখন এই গল্পটাই ঠিক ছিল। গল্পের সময় যা লিখছেন পরে এটা আর চেঞ্জ করবেন না। এখন আপনে যদি বিশ বছর আগের গল্পের আডডেট করতে গিয়া কাটাছেড়া কইরা পাঠককে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেন, এইটা ঠিক না। গল্পের কোন আপডেট হয় না।

ধ্রুবর কথায় কাজ হয়েছে। বুলবুল চৌধুরী এখন আর ও পথে পা বাড়ান না।

চার

সবশেষ কথা। বুলবুল চৌধুরী যে অসম্ভব চঞ্চল তা প্রথমে কেউ ঠাওর করে উঠতে পারবেন না। এক জায়গায় দু মিনিটি (দু’দণ্ড বললে বোধহয় আরও যুতসই হতো) বসে থাকার মানুষ তিনি কোনকালে ছিলেন না। যে কারণে বুলবুল চৌধুরী জীবনে কোনো চাকরি দীর্ঘদিন করতে পারেননি। তিনি তাঁর কথাবার্তায় আচার-আচরণ, চলন-বলন, সবকিছু নিয়ে আমার কাছে বিস্ময়ের এক আধার। তাকে যত দেখি বিস্ময় না কাটে!

back to top