alt

সাময়িকী

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

মো. আনিসুজ্জামান

: রোববার, ২১ নভেম্বর ২০২১

হাসান আজিজুল হক কথাসাহিত্যিক, দর্শনের অধ্যাপক এবং দর্শনচর্চা করছেন। দর্শন নিয়ে তাঁর রয়েছে স্বতন্ত্র মতাদর্শ। অর্থাৎ হাসানের রয়েছে নিজস্ব জীবনদর্শন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে হাসানের পরিচিতি বৃহৎ বঙ্গের সীমা অতিক্রম করে বহির্বিশ্বে স্থান করে নিলেও তাঁর দর্শন ভাবনাকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। প্রথমত দর্শন ছাড়া কথাসাহিত্য ‘কত কথায়’ পরিণত হয়। এই সাহিত্য সমাজ মানসে স্থায়ী আসন লাভ করে না। হাসান এখানে ব্যতিক্রম। তাঁর কথাসাহিত্যের মধ্যে মানুষের জীবনবোধ বিশেষ করে বৃহৎ বঙ্গের নিম্নবর্গের মানুষের কঠিন সংগ্রামী জীবনের ঘটনা প্রবাহ স্পষ্ট দেখা যায়। ‘পরবাসী’ গল্পে তিনি লিখেছেন, ‘ঐ কটা ধান বাপু-উ আর কতক্ষণ লাগবে? দ্যাড় বিঘে জমির ধান-উ শালো কাটলেও তিন মাস, না কাটলেও তিন মাস। মরশুমের পেরথম তো, কদিন না হয় মুনিষই খাটি।’ বৃহৎবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের সরল জীবনের বর্ণনা। এই মানুষ বেঁচে থাকে, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় কিন্তু নিজেদের জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে না। হাসানের গল্পে নিম্নবর্গের মানুষের স্বপ্ন নেই। ‘ওয়াজদ্দির’ মতো এরা ধান কাটলেও তিন মাস যায় না কাটলেও একই রকম। শ্রম বিক্রি এদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। শ্রমই এদের বেঁচে থাকার একমাত্র এবং প্রধান অবলম্বন।

সমাজের নানা অসঙ্গতি-অপ্রাপ্তি হাসানের লেখার মূল বিষয়বস্তু। বঞ্চনা এবং মাতৃভূমি থেকে বিতাড়নের অসম্ভব বেদনা তাঁর জীবন দর্শনে বারবার ফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে মুক্তির স্বাদ হাসানের গল্পে-প্রবন্ধে ভিন্ন মাত্রায় স্থান করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবস্থানের নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায় হাসানের গল্পে-প্রবন্ধে। তাঁর গল্প এবং প্রবন্ধ দুটোর মধ্যে ছেদ টানা মুশকিল। নিজের লেখা সর্ম্পকে তিনি লিখেছেন, ‘তৈরি করে গল্প আমি কোনোদিনই লিখতে পারি না। আপন ভাবনা চিন্তা উদ্বেগ আশা মিলিয়ে কিছু বক্তব্য থাকলে যেমন কেউ প্রবন্ধ লেখে, আমিও প্রায় একই উদ্দেশ্যে গল্প লিখি।’ হাসানের নিজের বক্তব্য থেকেই বলা যায়, হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা নিয়ে লিখতে হলে তাঁর গল্প, প্রবন্ধ এবং দর্শন বিষয়ক লেখাগুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এর কোনো অংশ বাদ দিলে লেখার মধ্যে অসঙ্গতি-অসম্পূর্ণ থাকা স্বাভাবিক। এই প্রবন্ধে তাঁর দর্শন বিষয়ক লেখাগুলোর ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

হাসান জীবনকে দেখেছেন নির্দিষ্ট কোনো ছকবাঁধা দর্শনের সাহায্যে নয়। নিজের মতো করে তিনি ভেবেছন, দেখেছেন, লিখেছেন। এই লেখার মধ্যে দিয়ে তাঁর দর্শনচিন্তা বিকশিত হয়েছে। তিনি দর্শনের বই এবং বিশুদ্ধ দর্শন বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। গল্প, উপন্যাস লিখলেও হাসান দর্শনের জন্য আলাদা জায়গা চেয়েছেন। বাংলাদেশ দর্শন নামে এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘দর্শনের জন্য আমি আলাদা জায়গা রাখতে চাই, এমন একটি সুরক্ষিত জায়গা যেখানে সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ধর্ম প্রতিনিয়ত অনধিকার প্রবেশের দাবি জানাবে না। ইতিমধ্যে দর্শন আপন সাম্রাজ্যের অধিকাংশ জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, এখন অন্তত একটুখানি ক্ষেত্র তাকে আপন অধিকারে রাখতে দিতে হবে।’

তাই তাঁর গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধের মধ্যে দর্শন থাকলেও বাংলাদেশ দর্শন, মার্কসীয় দর্শন, মানবকল্যাণ নিয়ে তিনি লিখেছেন। গণিত ও অধিবিদ্যা : কান্ট নিয়ে হাসানের রয়েছে স্বতন্ত্র চিন্তা। আরজ আলী মাতুব্বরের উপর তিনি লিখেছেন। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের উপর হাসানের একটি মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। সক্রেটিস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে হাসানের নিজের অভিব্যক্তিই যেন ফুটে উঠেছে। রাজশক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে সক্রেটিস সত্যকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। সক্রেটিস জ্ঞানের কথা বলেছেন। তিনি জ্ঞান চর্চার কথা বলেছেন। এখানেই শাসকদের আপত্তি। শাসকরা চায় তাদের ছকে বাঁধা মানুষ। বৃত্তের বাইরে গেলে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করা কঠিন। সক্রেটিসের মতো হাসানকেও আপোস করতে দেখা যায় না। ন্যায়ের পক্ষে তাঁর সংগ্রাম অবিচল। সক্রেটিস গ্রন্থের ভূমিকায় হাসান লিখেছেন ‘মানুষের আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার বিশাল ওজনের খানিকটা চিরকালের বহনকারী টাইটানিক এই মানুষটি সক্রেটিস।’

দার্শনিক দেশ এবং কালে অবস্থান করেন। কোনো চিন্তা দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করলেও তার মধ্যেও সময় এবং স্থানের ছাপ থেকে যায়। হাসান একথা স্বীকার করে লিখেছেন, ‘মানুষের জীবন সমাজ, দেশ ও কালে স্থিত। এজন্য অন্যান্য সব কর্মের মতোই তার মনন-কর্মও শেষ পর্যন্ত বিশেষ দেশ ও কালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে যায়।’ হাসান আজিজুল হক বৃহৎবঙ্গের মানুষ। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে এসেছেন। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে তিনি মনেপ্রাণে গ্রহণ করেননি। তাঁর মন বৃহৎ বঙ্গের।

দেশভাগের কারণে উদ্বাস্তু বিপন্ন মানুষের করুণ আর্তনাদ হাসানের গল্পে এবং প্রবন্ধে নানাভাবে স্থান পেয়েছে। হাসানের গল্পের বিপন্ন মানুষগুলো স্বপ্ন দেখতে পারে না। তারা শুধু নিজেদের জীবনের কথা বলে যায়। এই মানুষ বিপন্ন মানুষ। বিপন্ন মানুষের কোনো স্বপ্ন থাকে না। ‘উত্তরবসন্তে’ গল্পে তিনি বাণীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, ‘আমরা সবাই অসুস্থ। আমাদের লোভি করতে নেই। আমাদের কোনো অধিকার নেই জীবনে।’ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে স্বপ্ন থাকে না। তাদের স্বপ্ন কোনো রকমে খেয়ে না থেকে বেঁচে থাকার। চরম দারিদ্র্য অবস্থায় তারা জীবনের স্বপ্ন দেখতেও কখনো কখনো ভুলে যায়।

বিপন্ন আশ্রয়হীন মানুষ দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ‘মানুষকে গরিব করে রাখলে গণতন্ত্র হয় না। জাস্টিস হয় না।’ অনুন্নত দেশে গণতন্ত্রও উন্নত হয় না। উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রও উন্নয়নশীল। হাসানের গল্প প্রবন্ধের মানুষগুলো অনুন্নত বিশ্বের। এদের স্বপ্নের রেখা সীমাবদ্ধ এবং বৃত্তের মধ্যে। তাই হাসান আজিজুল হকের গল্পের মানুষ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে পারে না। এরা স্বপ্নহীন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকে। মানুষ না বলে এদেরকে মানবেতর প্রাণি হিসেবে অভিহিত করা হলে মানুষের যে সংজ্ঞা রয়েছে তা অসম্মান করা হবে না। হাসানের গল্পের মানুষ সমাজে-রাষ্ট্রে নানা কর্মে-অপকর্মে জড়িয়ে যায় শুধু মানবেতর প্রাণি হিসাবে বেঁচে থাকার জন্যে। সামাজিক-নীতিনৈতিকতা স্খলিত মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে না। এরা নিজেকে বিক্রি করে। বিক্রি করে নিজের সন্তানের শরীর। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পে দেখা যায় এক বৃদ্ধ জীবনের অর্থনৈতিক নিরপাত্তার কথা চিন্তা করে পাক পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করে কিন্তু এখানে এসে জীবনের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় যুবতী মেয়ের শরীর। তিন পকেটমার ও গুণ্ডা দুই টাকা করে দিয়ে বৃদ্ধের যুবতী মেয়ের শরীরের উত্তাপ নেয়। পাক পাকিস্তানে আদিম অসামাজিক কাজ নিষিদ্ধ হয়নি। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাক পাকিস্তানে হাসানের গল্পের মানুষ ধর্ম রাষ্ট্র পাকিস্তানে এসে মানবেতর প্রাণিতে পারিণত হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের আগে এরা ছিল মানুষ।

হাসানের গল্পের নায়ক-নায়িকা শুধু নয়, তিনি নিজেও এদেশের মানুষ এবং এদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দ্বিধান্বিত। বাংলাদেশে দর্শন চর্চা নিয়েও তিনি আশাবাদী নন। এ-সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের পণ্ডিতদের একমাত্র কাজ ইয়োরোপীয় দর্শনের টীকাভাষ্য রচনা করা, বুলি কপচানো, প্রয়োগহীন শুকনো জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যাওয়া, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ইয়োরোপীয় দর্শনের কঙ্কাল নিয়ে নাড়াচাড়া করা। আর করণীয়বা কী আছে! আধুনিক দর্শনের যে প্রাসঙ্গিকতা, ইয়োরোপে বা আমেরিকায় আছে, বাংলাদেশে তা নেই।’ পরাধীন ভারতবর্ষে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চা দেখে হাসানের এই উচ্চারণ কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বাংলাদেশে রয়েছে সমৃদ্ধ দর্শন চর্চার উত্তরাধিকার।

প্রাচীনকালে এদেশে সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা হয়েছে। অতীশ দীপঙ্কর, শীলভদ্র, রতœাকর শান্তি, প্রজ্ঞাকরমতি জেতারি, অভয়গুপ্ত এদের মহাযান বৌদ্ধ দর্শন বাঙালির নিজস্ব দর্শন। ষোল শতকের শেষের দিকে শুরু হয় নবদ্বীপে নব্য ন্যায়ের চর্চা। এই ধারা অব্যাহত থাকে আঠারো শতক পর্যন্ত। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে দার্শনিক তত্ত্বে সমৃদ্ধ। মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যের মধ্যে জীবন জিজ্ঞাসা সমৃদ্ধ। মধ্যযুগের মুসলিম কবিদের কাব্যে নীতিশাস্ত্র বিশেষ স্থান পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এদেশে প্রতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চার বিকাশ ঘটে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলাদেশে ভাববাদী দর্শন চর্চায় বিশেষ অবদান রাখেন স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, হীরালাল হালদার, হরিদাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ।

প্রতিষ্ঠানের বাইরে এদেশে দর্শনের চর্চা আদিকালে ছিল এখনও আছে। আহমদ শরীফের মতে, এদেশে ‘মৈথুনতত্ত্ব ভিত্তি করে শাস্ত্র ও দর্শন গড়ে ওঠে।’ বাউল দর্শনও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিকশিত হয়েছে। আরজ আলী মাতব্বর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চা করেননি। কিন্তু তিনি এদেশের একজন মৌলিক দার্শনিক। আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক বলেছেন, ‘মৌলিকভাবে ভাবনা করতে পারে এমন একজন মানুষকেই দার্শনিক বলতে পারি। এরকম একজন মানুষ আরজ আলী মাতুব্বর। তিনি মৌলিকভাবেই চিন্তাভাবনা করেছেন।’ আরজ আলী মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান গ্রন্থের অপর একটি নাম লৌকিক দর্শন। এই গ্রন্থকে অনেকে তুলনামূল ধর্মতত্ত্বের আকর গ্রন্থ হিসাবে অভিহিত করেছেন।

হাসান আজিজুল হক মার্কসীয় দর্শনের অনুরাগী। মার্কসবাদের সঙ্গে হাসানের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। মার্কসীয দর্শন দিয়ে তিনি অনুপ্রাণিত। কার্ল মার্কস সম্পর্কে হাসান লিখেছেন, ‘দার্শনিকদের মধ্যে তিনি অন্য ধরনের দার্শনিক এবং শুধু দার্শনিকই নন। অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি পৃথিবীর একমাত্র শ্রেষ্ঠদের সঙ্গেই তুলনীয়।’ মার্কস্বাদ দ্বারা হাসান প্রভাবিত হলেও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের জীবনাদর্শ হাসানকে অনুপ্রাণিত করে। অন্ধ মার্কস্বাদীদের মতো হাসান বলেননি যে, কার্ল মার্ক্স পৃথিবীর একমাত্র শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। মার্কসের পর আর কোনো চিন্তাবিদের জন্ম হবে না। মার্কসই শেষ এবং শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। এই ধরনের বিশ্বাসীদের সঙ্গে হাসান সহমত পোষণ করেন না। মার্কসের পদ্ধতি নিয়ে হাসানের দ্বিমত নেই। তিনি লিখেছেন, ‘বিকাশের মূলে আছে দ্বন্দ্বে, সংঘর্ষে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়; প্রকৃতি বা বস্তু জগতে এই দ্বন্দ্বের নিয়মই কাজ করে, মানব সমাজেও তাই। কেন পরিবর্তন ঘটে, কেন বদলায় কেন পুরনো বিদায় নেয়, কেন নতুন জন্ম নেয়- এসব প্রশ্নের জবাব পরম ভাবের মধ্যে মিলবে না, মিলবে বস্তুর আন্তর দ্বন্দ্বের নিয়মের মধ্যে। প্রাণ ও চেতনা যাদের বস্তু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে হয়, তাদেরও জন্ম বস্তুর দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে। বস্তুর বিকাশের এই নিয়ম মার্কস্ বা অন্য কোনো দার্শনিক ভেবেচিন্তে বার করেননি, সে নিয়ম বস্তুরই, মার্কস্ তাকে আবিষ্কার করতে পেরেছেন এইমাত্র।’

হাসান আজিজুল হক গোবিন্দ চন্দ্র দেব-এর গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। ড. দেবকে তিনি এদেশের একমাত্র দার্শনিক হিসাবে অভিহিত করেছেন। এ-সম্পর্কে তিনি লিখেছন, ‘এদেশের সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যাঁর প্রতি ‘দার্শনিক’ শব্দটি আক্ষরিক ও আভিধানিক অর্থে ব্যবহার করা যায়।’ ড. দেবের চিন্তা ও কর্ম সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক লিখেছেন, ‘বিভিন্ন বিজ্ঞান-পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, প্রাণি বিজ্ঞান ইত্যাদি নানা মানববিদ্যা- শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি সংখ্যাহীন স্বতন্ত্র বিদ্যা এক সময় দর্শন বলেই চিহ্নিত হতো। আজ তাদের আলাদা আলাদা সীমানা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়ে যাবার ফলে দর্শনের নিজের বিষয় নির্দিষ্টভাবে নির্দেশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দর্শনকে এখন সব রকম জ্ঞানবিদ্যার সারাৎসার বলা হচ্ছে। বলার যুক্তিও আছে। কারণ নানা বিদ্যার লক্ষ্য আলাদা হলেও জ্ঞানলাভ করা প্রত্যেকেরই অভীষ্ট। এজন্যই দর্শনকে সর্ববিদ্যার সারাৎসার বলা ছাড়া উপায় নেই। ড. দেব দর্শনের এই মূল প্রকৃতিটি ধরার চেষ্টা করেছেন এবং সব রকম জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।’

গোবিন্দচন্দ্র দেবকে এদেশের একমাত্র দার্শনিক হিসাবে অভিহিত করলেও হাসান আজিজুল হক কোথাও বলেননি যে ড. দেবের দর্শন কী। দর্শনের কোন শাখায় ড. দেবের বিচরণ তার বর্ণনা হাসানের লেখায় পাওয়া যায় না। আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শনকে হাসান আজিজুল হক ‘কা-জ্ঞানের দার্শন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু কেন আরজ আলী মাতুব্বরকে কা-জ্ঞানের দার্শনিক বলছেন তাঁর কা-জ্ঞানের দর্শন : আরজ আলী মাতুব্বর-এ পাওয়া যায় না। Common Sense Philosophy-এর বাংলা প্রতিশব্দ যদি কা-জ্ঞানের দর্শন হিসাবে অভিহিত করা হয় তাহলে এর অর্থ অন্যরকম দাঁড়ায়। আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শনচিন্তায় দর্শনের মৌলিক বিষয় অধিবিদ্যা, জ্ঞানবিদ্যা, মূল্যবিদ্যা এবং মানবতাবাদ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। হাসান আজিজুল হক আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শনের মৌলিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ না করেই মাতুব্বরের দর্শনকে কা-জ্ঞানের দর্শন হিসাবে অভিহিত করেছেন। আরজ আলী মাতুব্বর সাধারণ মানুষের প্রচলিত বিশ্বাসগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্বাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ তিনি করে নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। কা-জ্ঞানের সাহায্যে তিনি নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানের চেষ্টা করেননি। সংশয় আরজ আলী মাতুব্বরের পদ্ধতি, দর্শন নয়।

উনিশ শতকে ইউরোপীয় দর্শনের প্রভাবে বাংলাদেশে যেসব দার্শনিক মতবাদ গড়ে উঠেছে তার কোনোটি দ্বারাই হাসানের দর্শন চিন্তা প্রভাবিত নয়। প্রত্যক্ষবাদী, উপযোগবাদী -এসব কোনো মতবাদ দিয়ে হাসানের সৃষ্টকর্ম যাচাই করা যায় না। নৈরাশ্যবাদ বা হতাশাবাদীও তিনি নন। দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে এমনকি কথাসাহিত্যে মানুষের মুক্তির কথা তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন। মানুষ নামের মানবেতর প্রাণিকে তিনি মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করেতে চেয়েছেন। মানুষকে কোনো বিশ্বাসী মানুষ হিসাবে নয়, মানুষের স্বরূপেই মানুষকে তিনি দেখতে চেয়েছেন। হাসানের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে বড় করে দেখা হলে তাঁর দর্শন চিন্তায় অস্তিত্ববাদের ছাপ স্পষ্ট। এখানে হাসান অস্তিবত্ববাদী কিয়ার্কেগার্ডের চেয়ে জাঁ পল সার্ত্র দিয়েই বেশি প্রভাবিত।

হাসান আজিজুল হককে বাংলাদেশের রেনেসাঁসের ফসল হিসাবে বলা হলে মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না। রেনেসাঁস যে মানুষের মুক্তির কথা বলেছে হাসান তা-ই বলেছেন। রেনেসাঁস মানবতার কথা বলেছে। এ-অর্থে হাসান মানবতাবাদী। মানবতাবাদকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে হাসান কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের কথা বলেছেন। তিনি ব্যক্তি মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। এই ব্যক্তি মানুষ অস্তিত্ববাদী কিয়াকেগার্ডের মানুষ নয়। এই মানুষ দেশ ভাগের মানুষ।

ব্যক্তি মানুষ সমাজ বিচ্ছিন্ন প্রাণি নয়। কাজেই ব্যক্তির মুক্তির জন্য আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র সবার আগে প্রয়োজন। এজন্য সমাজের পরিবর্তন অপরিহার্য। হাসানের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিপ্লবীর ভূমিকায় দেখা যায় না। তারা শুধু জীবনের কথা বলে যায় বেঁচে থাকার এক অসম্ভব আকুতি নিয়ে।

ছবি

শিকিবু

ছবি

খালেদ হামিদী : জীবন-পিরিচে স্বপ্নের উৎসব

সাময়িকী কবিতা

ছবি

কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

ছবি

এক বাউল জীবনের কথা

ছবি

স্পর্শের ওপারে স্বনির্মিত হাসান আজিজুল হক

ছবি

‘প্রবৃত্তির তাড়নাতেই লেখক সত্তার জন্ম’

ছবি

পৃষ্ঠাজুড়ে কবিতা

ছবি

সিজোফ্রেনিক রাখালবালিকায় কবিতার নতুন নন্দন

ছবি

গণমানুষের ছড়াকার মনজুরুল আহসান বুলবুল

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

বাংলা কবিতার প্রকৃত পরহেজগার

ছবি

মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের ফোকলোর সাধনা

ছবি

সৃজনশীল কাব্যগ্রন্থ ‘অজ্ঞাত আগুন’

ছবি

‘ভিন্নচোখ’-এর ‘বাংলাবিশ্ব কবিতাসংখ্যা’

ছবি

কালের প্রেক্ষাপটে চিরসখা অন্নদাশঙ্কর রায়

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

আনোয়ারা সৈয়দ হকের সত্যভাষণের শিল্প

ছবি

জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু

ছবি

পদাবলি : হেমন্ত প্রান্তরে

সাময়িকী কবিতা

ছবি

বৃত্তের ভিতরে

ছবি

আব্দুল্লাহ জামিলের ‘স্বনির্বাচন’

ছবি

বিমল গুহর একগুচ্ছ কবিতা

ছবি

শিকিবু

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

মধুর তোমার শেষ যে না পাই

ছবি

নাগরিকতাকে অতিক্রম করে মানুষের কবি হয়ে ওঠা

ছবি

শুদ্ধ সংস্কৃতির মানুষ আবুল হাসনাত

ছবি

মুষলধারে বর্ষিত, সাবলীল সহজিয়া উচ্চারণ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

ব্রুকলিন ব্রিজ

ছবি

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

tab

সাময়িকী

হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা

মো. আনিসুজ্জামান

রোববার, ২১ নভেম্বর ২০২১

হাসান আজিজুল হক কথাসাহিত্যিক, দর্শনের অধ্যাপক এবং দর্শনচর্চা করছেন। দর্শন নিয়ে তাঁর রয়েছে স্বতন্ত্র মতাদর্শ। অর্থাৎ হাসানের রয়েছে নিজস্ব জীবনদর্শন। কথাসাহিত্যিক হিসেবে হাসানের পরিচিতি বৃহৎ বঙ্গের সীমা অতিক্রম করে বহির্বিশ্বে স্থান করে নিলেও তাঁর দর্শন ভাবনাকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। প্রথমত দর্শন ছাড়া কথাসাহিত্য ‘কত কথায়’ পরিণত হয়। এই সাহিত্য সমাজ মানসে স্থায়ী আসন লাভ করে না। হাসান এখানে ব্যতিক্রম। তাঁর কথাসাহিত্যের মধ্যে মানুষের জীবনবোধ বিশেষ করে বৃহৎ বঙ্গের নিম্নবর্গের মানুষের কঠিন সংগ্রামী জীবনের ঘটনা প্রবাহ স্পষ্ট দেখা যায়। ‘পরবাসী’ গল্পে তিনি লিখেছেন, ‘ঐ কটা ধান বাপু-উ আর কতক্ষণ লাগবে? দ্যাড় বিঘে জমির ধান-উ শালো কাটলেও তিন মাস, না কাটলেও তিন মাস। মরশুমের পেরথম তো, কদিন না হয় মুনিষই খাটি।’ বৃহৎবঙ্গের শ্রমজীবী মানুষের সরল জীবনের বর্ণনা। এই মানুষ বেঁচে থাকে, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় কিন্তু নিজেদের জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে না। হাসানের গল্পে নিম্নবর্গের মানুষের স্বপ্ন নেই। ‘ওয়াজদ্দির’ মতো এরা ধান কাটলেও তিন মাস যায় না কাটলেও একই রকম। শ্রম বিক্রি এদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। শ্রমই এদের বেঁচে থাকার একমাত্র এবং প্রধান অবলম্বন।

সমাজের নানা অসঙ্গতি-অপ্রাপ্তি হাসানের লেখার মূল বিষয়বস্তু। বঞ্চনা এবং মাতৃভূমি থেকে বিতাড়নের অসম্ভব বেদনা তাঁর জীবন দর্শনে বারবার ফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে মুক্তির স্বাদ হাসানের গল্পে-প্রবন্ধে ভিন্ন মাত্রায় স্থান করে নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবস্থানের নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায় হাসানের গল্পে-প্রবন্ধে। তাঁর গল্প এবং প্রবন্ধ দুটোর মধ্যে ছেদ টানা মুশকিল। নিজের লেখা সর্ম্পকে তিনি লিখেছেন, ‘তৈরি করে গল্প আমি কোনোদিনই লিখতে পারি না। আপন ভাবনা চিন্তা উদ্বেগ আশা মিলিয়ে কিছু বক্তব্য থাকলে যেমন কেউ প্রবন্ধ লেখে, আমিও প্রায় একই উদ্দেশ্যে গল্প লিখি।’ হাসানের নিজের বক্তব্য থেকেই বলা যায়, হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা নিয়ে লিখতে হলে তাঁর গল্প, প্রবন্ধ এবং দর্শন বিষয়ক লেখাগুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এর কোনো অংশ বাদ দিলে লেখার মধ্যে অসঙ্গতি-অসম্পূর্ণ থাকা স্বাভাবিক। এই প্রবন্ধে তাঁর দর্শন বিষয়ক লেখাগুলোর ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

হাসান জীবনকে দেখেছেন নির্দিষ্ট কোনো ছকবাঁধা দর্শনের সাহায্যে নয়। নিজের মতো করে তিনি ভেবেছন, দেখেছেন, লিখেছেন। এই লেখার মধ্যে দিয়ে তাঁর দর্শনচিন্তা বিকশিত হয়েছে। তিনি দর্শনের বই এবং বিশুদ্ধ দর্শন বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। গল্প, উপন্যাস লিখলেও হাসান দর্শনের জন্য আলাদা জায়গা চেয়েছেন। বাংলাদেশ দর্শন নামে এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘দর্শনের জন্য আমি আলাদা জায়গা রাখতে চাই, এমন একটি সুরক্ষিত জায়গা যেখানে সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ধর্ম প্রতিনিয়ত অনধিকার প্রবেশের দাবি জানাবে না। ইতিমধ্যে দর্শন আপন সাম্রাজ্যের অধিকাংশ জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, এখন অন্তত একটুখানি ক্ষেত্র তাকে আপন অধিকারে রাখতে দিতে হবে।’

তাই তাঁর গল্প, উপন্যাস প্রবন্ধের মধ্যে দর্শন থাকলেও বাংলাদেশ দর্শন, মার্কসীয় দর্শন, মানবকল্যাণ নিয়ে তিনি লিখেছেন। গণিত ও অধিবিদ্যা : কান্ট নিয়ে হাসানের রয়েছে স্বতন্ত্র চিন্তা। আরজ আলী মাতুব্বরের উপর তিনি লিখেছেন। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের উপর হাসানের একটি মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। সক্রেটিস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে হাসানের নিজের অভিব্যক্তিই যেন ফুটে উঠেছে। রাজশক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে সক্রেটিস সত্যকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। সক্রেটিস জ্ঞানের কথা বলেছেন। তিনি জ্ঞান চর্চার কথা বলেছেন। এখানেই শাসকদের আপত্তি। শাসকরা চায় তাদের ছকে বাঁধা মানুষ। বৃত্তের বাইরে গেলে শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করা কঠিন। সক্রেটিসের মতো হাসানকেও আপোস করতে দেখা যায় না। ন্যায়ের পক্ষে তাঁর সংগ্রাম অবিচল। সক্রেটিস গ্রন্থের ভূমিকায় হাসান লিখেছেন ‘মানুষের আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার বিশাল ওজনের খানিকটা চিরকালের বহনকারী টাইটানিক এই মানুষটি সক্রেটিস।’

দার্শনিক দেশ এবং কালে অবস্থান করেন। কোনো চিন্তা দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করলেও তার মধ্যেও সময় এবং স্থানের ছাপ থেকে যায়। হাসান একথা স্বীকার করে লিখেছেন, ‘মানুষের জীবন সমাজ, দেশ ও কালে স্থিত। এজন্য অন্যান্য সব কর্মের মতোই তার মনন-কর্মও শেষ পর্যন্ত বিশেষ দেশ ও কালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে যায়।’ হাসান আজিজুল হক বৃহৎবঙ্গের মানুষ। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তানে এসেছেন। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে তিনি মনেপ্রাণে গ্রহণ করেননি। তাঁর মন বৃহৎ বঙ্গের।

দেশভাগের কারণে উদ্বাস্তু বিপন্ন মানুষের করুণ আর্তনাদ হাসানের গল্পে এবং প্রবন্ধে নানাভাবে স্থান পেয়েছে। হাসানের গল্পের বিপন্ন মানুষগুলো স্বপ্ন দেখতে পারে না। তারা শুধু নিজেদের জীবনের কথা বলে যায়। এই মানুষ বিপন্ন মানুষ। বিপন্ন মানুষের কোনো স্বপ্ন থাকে না। ‘উত্তরবসন্তে’ গল্পে তিনি বাণীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, ‘আমরা সবাই অসুস্থ। আমাদের লোভি করতে নেই। আমাদের কোনো অধিকার নেই জীবনে।’ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে স্বপ্ন থাকে না। তাদের স্বপ্ন কোনো রকমে খেয়ে না থেকে বেঁচে থাকার। চরম দারিদ্র্য অবস্থায় তারা জীবনের স্বপ্ন দেখতেও কখনো কখনো ভুলে যায়।

বিপন্ন আশ্রয়হীন মানুষ দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ‘মানুষকে গরিব করে রাখলে গণতন্ত্র হয় না। জাস্টিস হয় না।’ অনুন্নত দেশে গণতন্ত্রও উন্নত হয় না। উন্নয়নশীল বিশ্বের গণতন্ত্রও উন্নয়নশীল। হাসানের গল্প প্রবন্ধের মানুষগুলো অনুন্নত বিশ্বের। এদের স্বপ্নের রেখা সীমাবদ্ধ এবং বৃত্তের মধ্যে। তাই হাসান আজিজুল হকের গল্পের মানুষ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে পারে না। এরা স্বপ্নহীন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকে। মানুষ না বলে এদেরকে মানবেতর প্রাণি হিসেবে অভিহিত করা হলে মানুষের যে সংজ্ঞা রয়েছে তা অসম্মান করা হবে না। হাসানের গল্পের মানুষ সমাজে-রাষ্ট্রে নানা কর্মে-অপকর্মে জড়িয়ে যায় শুধু মানবেতর প্রাণি হিসাবে বেঁচে থাকার জন্যে। সামাজিক-নীতিনৈতিকতা স্খলিত মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে না। এরা নিজেকে বিক্রি করে। বিক্রি করে নিজের সন্তানের শরীর। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পে দেখা যায় এক বৃদ্ধ জীবনের অর্থনৈতিক নিরপাত্তার কথা চিন্তা করে পাক পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করে কিন্তু এখানে এসে জীবনের একমাত্র আয়ের অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় যুবতী মেয়ের শরীর। তিন পকেটমার ও গুণ্ডা দুই টাকা করে দিয়ে বৃদ্ধের যুবতী মেয়ের শরীরের উত্তাপ নেয়। পাক পাকিস্তানে আদিম অসামাজিক কাজ নিষিদ্ধ হয়নি। ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাক পাকিস্তানে হাসানের গল্পের মানুষ ধর্ম রাষ্ট্র পাকিস্তানে এসে মানবেতর প্রাণিতে পারিণত হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের আগে এরা ছিল মানুষ।

হাসানের গল্পের নায়ক-নায়িকা শুধু নয়, তিনি নিজেও এদেশের মানুষ এবং এদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দ্বিধান্বিত। বাংলাদেশে দর্শন চর্চা নিয়েও তিনি আশাবাদী নন। এ-সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশের পণ্ডিতদের একমাত্র কাজ ইয়োরোপীয় দর্শনের টীকাভাষ্য রচনা করা, বুলি কপচানো, প্রয়োগহীন শুকনো জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যাওয়া, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ইয়োরোপীয় দর্শনের কঙ্কাল নিয়ে নাড়াচাড়া করা। আর করণীয়বা কী আছে! আধুনিক দর্শনের যে প্রাসঙ্গিকতা, ইয়োরোপে বা আমেরিকায় আছে, বাংলাদেশে তা নেই।’ পরাধীন ভারতবর্ষে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চা দেখে হাসানের এই উচ্চারণ কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বাংলাদেশে রয়েছে সমৃদ্ধ দর্শন চর্চার উত্তরাধিকার।

প্রাচীনকালে এদেশে সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা হয়েছে। অতীশ দীপঙ্কর, শীলভদ্র, রতœাকর শান্তি, প্রজ্ঞাকরমতি জেতারি, অভয়গুপ্ত এদের মহাযান বৌদ্ধ দর্শন বাঙালির নিজস্ব দর্শন। ষোল শতকের শেষের দিকে শুরু হয় নবদ্বীপে নব্য ন্যায়ের চর্চা। এই ধারা অব্যাহত থাকে আঠারো শতক পর্যন্ত। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে দার্শনিক তত্ত্বে সমৃদ্ধ। মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যের মধ্যে জীবন জিজ্ঞাসা সমৃদ্ধ। মধ্যযুগের মুসলিম কবিদের কাব্যে নীতিশাস্ত্র বিশেষ স্থান পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এদেশে প্রতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চার বিকাশ ঘটে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলাদেশে ভাববাদী দর্শন চর্চায় বিশেষ অবদান রাখেন স্যার ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, হীরালাল হালদার, হরিদাশ ভট্টাচার্য প্রমুখ।

প্রতিষ্ঠানের বাইরে এদেশে দর্শনের চর্চা আদিকালে ছিল এখনও আছে। আহমদ শরীফের মতে, এদেশে ‘মৈথুনতত্ত্ব ভিত্তি করে শাস্ত্র ও দর্শন গড়ে ওঠে।’ বাউল দর্শনও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিকশিত হয়েছে। আরজ আলী মাতব্বর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দর্শন চর্চা করেননি। কিন্তু তিনি এদেশের একজন মৌলিক দার্শনিক। আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক বলেছেন, ‘মৌলিকভাবে ভাবনা করতে পারে এমন একজন মানুষকেই দার্শনিক বলতে পারি। এরকম একজন মানুষ আরজ আলী মাতুব্বর। তিনি মৌলিকভাবেই চিন্তাভাবনা করেছেন।’ আরজ আলী মাতুব্বরের সত্যের সন্ধান গ্রন্থের অপর একটি নাম লৌকিক দর্শন। এই গ্রন্থকে অনেকে তুলনামূল ধর্মতত্ত্বের আকর গ্রন্থ হিসাবে অভিহিত করেছেন।

হাসান আজিজুল হক মার্কসীয় দর্শনের অনুরাগী। মার্কসবাদের সঙ্গে হাসানের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। মার্কসীয দর্শন দিয়ে তিনি অনুপ্রাণিত। কার্ল মার্কস সম্পর্কে হাসান লিখেছেন, ‘দার্শনিকদের মধ্যে তিনি অন্য ধরনের দার্শনিক এবং শুধু দার্শনিকই নন। অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি পৃথিবীর একমাত্র শ্রেষ্ঠদের সঙ্গেই তুলনীয়।’ মার্কস্বাদ দ্বারা হাসান প্রভাবিত হলেও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষের জীবনাদর্শ হাসানকে অনুপ্রাণিত করে। অন্ধ মার্কস্বাদীদের মতো হাসান বলেননি যে, কার্ল মার্ক্স পৃথিবীর একমাত্র শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। মার্কসের পর আর কোনো চিন্তাবিদের জন্ম হবে না। মার্কসই শেষ এবং শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ। এই ধরনের বিশ্বাসীদের সঙ্গে হাসান সহমত পোষণ করেন না। মার্কসের পদ্ধতি নিয়ে হাসানের দ্বিমত নেই। তিনি লিখেছেন, ‘বিকাশের মূলে আছে দ্বন্দ্বে, সংঘর্ষে, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায়; প্রকৃতি বা বস্তু জগতে এই দ্বন্দ্বের নিয়মই কাজ করে, মানব সমাজেও তাই। কেন পরিবর্তন ঘটে, কেন বদলায় কেন পুরনো বিদায় নেয়, কেন নতুন জন্ম নেয়- এসব প্রশ্নের জবাব পরম ভাবের মধ্যে মিলবে না, মিলবে বস্তুর আন্তর দ্বন্দ্বের নিয়মের মধ্যে। প্রাণ ও চেতনা যাদের বস্তু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে হয়, তাদেরও জন্ম বস্তুর দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে। বস্তুর বিকাশের এই নিয়ম মার্কস্ বা অন্য কোনো দার্শনিক ভেবেচিন্তে বার করেননি, সে নিয়ম বস্তুরই, মার্কস্ তাকে আবিষ্কার করতে পেরেছেন এইমাত্র।’

হাসান আজিজুল হক গোবিন্দ চন্দ্র দেব-এর গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। ড. দেবকে তিনি এদেশের একমাত্র দার্শনিক হিসাবে অভিহিত করেছেন। এ-সম্পর্কে তিনি লিখেছন, ‘এদেশের সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যাঁর প্রতি ‘দার্শনিক’ শব্দটি আক্ষরিক ও আভিধানিক অর্থে ব্যবহার করা যায়।’ ড. দেবের চিন্তা ও কর্ম সম্পর্কে হাসান আজিজুল হক লিখেছেন, ‘বিভিন্ন বিজ্ঞান-পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, প্রাণি বিজ্ঞান ইত্যাদি নানা মানববিদ্যা- শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি সংখ্যাহীন স্বতন্ত্র বিদ্যা এক সময় দর্শন বলেই চিহ্নিত হতো। আজ তাদের আলাদা আলাদা সীমানা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয়ে যাবার ফলে দর্শনের নিজের বিষয় নির্দিষ্টভাবে নির্দেশ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দর্শনকে এখন সব রকম জ্ঞানবিদ্যার সারাৎসার বলা হচ্ছে। বলার যুক্তিও আছে। কারণ নানা বিদ্যার লক্ষ্য আলাদা হলেও জ্ঞানলাভ করা প্রত্যেকেরই অভীষ্ট। এজন্যই দর্শনকে সর্ববিদ্যার সারাৎসার বলা ছাড়া উপায় নেই। ড. দেব দর্শনের এই মূল প্রকৃতিটি ধরার চেষ্টা করেছেন এবং সব রকম জ্ঞানবিজ্ঞানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।’

গোবিন্দচন্দ্র দেবকে এদেশের একমাত্র দার্শনিক হিসাবে অভিহিত করলেও হাসান আজিজুল হক কোথাও বলেননি যে ড. দেবের দর্শন কী। দর্শনের কোন শাখায় ড. দেবের বিচরণ তার বর্ণনা হাসানের লেখায় পাওয়া যায় না। আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শনকে হাসান আজিজুল হক ‘কা-জ্ঞানের দার্শন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু কেন আরজ আলী মাতুব্বরকে কা-জ্ঞানের দার্শনিক বলছেন তাঁর কা-জ্ঞানের দর্শন : আরজ আলী মাতুব্বর-এ পাওয়া যায় না। Common Sense Philosophy-এর বাংলা প্রতিশব্দ যদি কা-জ্ঞানের দর্শন হিসাবে অভিহিত করা হয় তাহলে এর অর্থ অন্যরকম দাঁড়ায়। আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শনচিন্তায় দর্শনের মৌলিক বিষয় অধিবিদ্যা, জ্ঞানবিদ্যা, মূল্যবিদ্যা এবং মানবতাবাদ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। হাসান আজিজুল হক আরজ আলী মাতুব্বরের দর্শনের মৌলিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ না করেই মাতুব্বরের দর্শনকে কা-জ্ঞানের দর্শন হিসাবে অভিহিত করেছেন। আরজ আলী মাতুব্বর সাধারণ মানুষের প্রচলিত বিশ্বাসগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্বাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ তিনি করে নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। কা-জ্ঞানের সাহায্যে তিনি নিশ্চিত সত্যে পৌঁছানের চেষ্টা করেননি। সংশয় আরজ আলী মাতুব্বরের পদ্ধতি, দর্শন নয়।

উনিশ শতকে ইউরোপীয় দর্শনের প্রভাবে বাংলাদেশে যেসব দার্শনিক মতবাদ গড়ে উঠেছে তার কোনোটি দ্বারাই হাসানের দর্শন চিন্তা প্রভাবিত নয়। প্রত্যক্ষবাদী, উপযোগবাদী -এসব কোনো মতবাদ দিয়ে হাসানের সৃষ্টকর্ম যাচাই করা যায় না। নৈরাশ্যবাদ বা হতাশাবাদীও তিনি নন। দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে এমনকি কথাসাহিত্যে মানুষের মুক্তির কথা তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন। মানুষ নামের মানবেতর প্রাণিকে তিনি মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করেতে চেয়েছেন। মানুষকে কোনো বিশ্বাসী মানুষ হিসাবে নয়, মানুষের স্বরূপেই মানুষকে তিনি দেখতে চেয়েছেন। হাসানের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে বড় করে দেখা হলে তাঁর দর্শন চিন্তায় অস্তিত্ববাদের ছাপ স্পষ্ট। এখানে হাসান অস্তিবত্ববাদী কিয়ার্কেগার্ডের চেয়ে জাঁ পল সার্ত্র দিয়েই বেশি প্রভাবিত।

হাসান আজিজুল হককে বাংলাদেশের রেনেসাঁসের ফসল হিসাবে বলা হলে মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না। রেনেসাঁস যে মানুষের মুক্তির কথা বলেছে হাসান তা-ই বলেছেন। রেনেসাঁস মানবতার কথা বলেছে। এ-অর্থে হাসান মানবতাবাদী। মানবতাবাদকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে হাসান কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের কথা বলেছেন। তিনি ব্যক্তি মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। এই ব্যক্তি মানুষ অস্তিত্ববাদী কিয়াকেগার্ডের মানুষ নয়। এই মানুষ দেশ ভাগের মানুষ।

ব্যক্তি মানুষ সমাজ বিচ্ছিন্ন প্রাণি নয়। কাজেই ব্যক্তির মুক্তির জন্য আধুনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র সবার আগে প্রয়োজন। এজন্য সমাজের পরিবর্তন অপরিহার্য। হাসানের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের সমাজ পরিবর্তনের জন্য বিপ্লবীর ভূমিকায় দেখা যায় না। তারা শুধু জীবনের কথা বলে যায় বেঁচে থাকার এক অসম্ভব আকুতি নিয়ে।

back to top