alt

বাংলাদেশ

কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ

শিক্ষকদের অধিকাংশই জীবিকার প্রয়োজনে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন

জাহিদা পারভেজ ছন্দা : শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

‘স্যারের বকা ; কানমলা

তাতেও ছিল সুখ

এখন আর কেউ বকে না

আদর করে ধরে না চিবুক’ - এ কথাগুলো যেন সাত বছর বয়সী ছোট্ট আনায়াহ ইজমার। ইজমাহ যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, এর ঠিক তিন মাসের মধ্যেই স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। পৃথিবী এলামেলো হলো। ইজমাহর ছোট্ট জীবনেও ‘এলামেলোর’ প্রভাব পড়লো। স্কুল বন্ধ, বাইরে যাওয়া বন্ধ, কেউ তাদের বাসায় আসে না, তারাও কোথাও যায় না। ছোট্ট মনে সারাক্ষণ উঁিকঝুকি মারে তিন মাসের বন্ধু আর স্কুলের স্মৃতি। তার স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে সকাল বেলা উঠে স্কুলের পোশাক পড়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে মা’র হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার এক চমৎকার স্মৃতি। স্মৃতিতে আছে, তিন মাসের বন্ধুদের সাথে টিফিন শেয়ার করা, মিসের আদুরে হাতের স্পর্শ, হোয়াইট বোর্ডে আঁকা, প্রেজেন্ট মিস বলা আর মিস ক্লাস শেষ করে যাওয়ার পর সব বন্ধুরা একখানে হয়ে মজার মজার গল্প করা। যা এই দেড় বছর ধরে তার মা-বাবা আর ছোট বোনকে শুনিয়ে আসছে নিয়মিত। আর স্কুল বন্ধের পর থেকে তার একটাই প্রশ্ন ‘কবে স্কুল খুলবে?’

সকল ভাবনাকে মাড়িয়ে সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে স্কুল খুলে গেলেও ইজমার স্কুল আর খোলে না। তার সকল সুখস্মৃতি আবারো ফিরে পাওয়ার কথা থাকলেও নিকট সময়ে তা আর হচ্ছে না। হচ্ছে না ইজমাহর স্কুলে যাওয়া। কারণ তার প্রিয় স্কুলের ওপর করোনার রক্তচক্ষু পড়ায় স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইজমার প্রথম ও প্রিয় ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ স্কুলটিই যে শুধু বন্ধ হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। করোনাকালীন সময়ে সারাদেশে হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গছে। সারাদেশে শুধু মাত্র বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের নিবন্ধনকৃত স্কুলগুলোর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে স্কুলের ব্যয়ভার বহন করতে না পারার জন্য। গত দেড় বছরে সরকারী-বেসরকারী কোনো সহযোগিতা না পেয়ে স্কুলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিক- কর্তৃপক্ষ বলে জানান এসোসিয়েশনের নেতারা। তারা বলেন, এইসব স্কুলের আয়ের একমাত্র উৎসই হলো শিক্ষাথীদের বেতন ও লেখপড়া সংক্রান্ত উপকরণ বিক্রির অর্থ। যা গত দেড় বছর ধরে বন্ধ। এক দুই মাস থেকে ৬ মাস পর্যন্ত অনেকেই ধার দেনা করে, শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে, কখনো না দিয়ে স্কুল টিকিয়ে রাখার প্রানান্ত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু করোনার প্রভাব যে এতোসময় ধরে এভাবে বিস্তৃত হবে বুঝতে পারেন নি। এই অবস্থা থেকে যারা উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না তারা স্কুল বাধ্য হয়েই বন্ধ করে দেন। অভাবের তাড়নায় চোখের জলে প্রিয় স্কুলের বেঞ্চ, চেয়ার টেবিল বিক্রি করে দেন বলেও জানান এই নেতারা।

বন্ধ করে দেওয়া হাজার স্কুলের মধ্যে একটা ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ স্কুল। ২০০৫ এ ধানমন্ডিতে গড়ে ওঠা নামকরা ব্রিটিশ কলম্বিয়া স্কুলটি বেশ নাম করে ফেললেও করোনার রক্তচক্ষুর কাছে তা বন্ধ করে দিতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই স্কুলের একজন শিক্ষক বলেন, ‘করোনার প্রভাব যে এতো দুর যাবে বুঝতে পারিনি’। তিনি বলেন, ‘করোনার সময় স্কুলের শিক্ষার্থীরা টিউশন ফিস দিতো না। নতুন সেশনে ছাত্র-ছাত্রি ভর্তি স্কুলের প্রধান আয়ের উৎস ছিলো। ২০২০ এর মার্চে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলটি প্রথম ৬ মাস চালানো গেলেও পরে আর তা সম্ভব হয়নি। প্রায় ৩৫ জন শিক্ষক, স্কুলের অন্যান্য স্টাফদের বেতন আর স্কুল বিল্ডিং- এর ভাড়া সব মিলিয়ে নাভি:শ্বাস উঠে গিয়েছিলো কর্তৃপক্ষের। অনেক চেষ্টা করেও স্কুলটি টেকানো আর সম্ভব হয়নি। যে কয়জন ছাত্র- ছাত্রি স্কুলটিতে শেষ পর্যন্ত ছিলো তাদের অন্য আরেকটা স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে বন্ধ ঘোষণা করেন ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ স্কুল।’

এই স্কুলেরই ছাত্রী আনায়াহ ইজমার মা ফারহানা ফার্সী বলেন, ‘স্কুলের সব কিছু ভালো ছিলো বলেই বাচ্চা ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু করোনার সময় অনলাইন ক্লাস হয়, হয় না, কখনো বাচ্চাই ক্লাস করতে চায় না, কখনো দূর্বল নেট, ক্লাস বোঝা যায় না এমন নানা ধরনের সমস্যা ছিলো। কিন্তু টিউশন ফি দিতে হতো ৭ হাজার টাকা। যা দেয়াটা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য যেমন ছিলো তেমনি যৌক্তিকও মনে হয়নি। আর আমাদের ব্যবসাও ভালো যাচ্ছিলো না। প্রথম কয়েক মাস বেতন কন্টিনিউ করলেও পড়ে বন্ধ করে দিয়েছি অনলাইন ক্লাস করানোর অবস্থা দেখে। এছাড়া করোনার সময় আমরা তো সবাই বাসায় থাকতাম। কখনো ইজমার বাবা কখনো আমি ওর লেখাপড়া দেখেছি এখনো দেখছি। ’

এখন কোন স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন জানতে চাইলে ফারহানা ফার্সী বলেন, ‘বছরের বাকি আছে আর ৩ মাস, এই কম সময়ের জন্য আর কোন স্কুলে দেব না। একবারে জানুয়ারিতে ২ মেয়েকে একসাথে ভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করাবো ইনশাআল্লাহ। ’

এ অবস্থা শুধু একটা স্কুল বা একজন অভিভাবকের না। অভিভাবকদের অনেকেই ফারহানা ফার্সীর মতো করেই ভাবছেন বলেই হয়তো স্কুল খুলে গেলেও শতভাগ শিক্ষার্থী এখনো কোনো স্কুলে উপস্থিতি নাই।

ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপস্থিতির বিষয়ে একাধিক শিক্ষক ও এসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, করোনা অনেকের জীবনই ওলট-পালট করে দিয়েছে। অনেক অভিভাবক ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। বিশেষ করে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতেন এমন অনেকের চাকরী চলে গেছে। অনেকের কর্মস্থল থেকে বেতন কমিয়ে ফেলেছে। আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা তো আরো করুন। অনেক ব্যবসায়ী তার ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। এমন যাদের অবস্থা তারা ঢাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাবেন তা সম্ভব না হওয়ায় ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যান। আর গ্রামে যাওয়ার এই সংখ্যা নেহায়েতই কম না বলে জানান তারা। আর এ জন্যই এতোদিন পর স্কুল খুললেও শিক্ষার্থী উপস্থিতি এখনো ৫০ শতাংশ। শিক্ষার্থী উপস্থিতি ৮০ ভাগ না হলে স্কুল চালানো কঠিন বলে মনে করেন এই শিক্ষক নেতারা।

হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেনের সাথে জড়িত লাখ লাখ শিক্ষক কর্মচারী কষ্টে জীবন যাপন করছেন বলে জানিয়ে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহাঙ্গীর কবির রানা বলেন, ‘ শিক্ষার্থী উপস্থিতি না বাড়লে আরো অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। গত দেড় বছরের করোনা প্রভাবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সাথে জড়িত প্রায় ৮০ লাখ মানুষ আজ কষ্টে আছেন। মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমি জানি এমন একজন শিক্ষককে যিনি চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। আর কয়টা কিন্ডার গার্টেন স্কুল বন্ধের কথা শুনবেন। বাংলাদেশে ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মধ্যে ১০ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ঢাকা জেলাতেই স্কুল বন্ধের এই সংখ্যা ৫ হাজার। আর যে সব স্কুল চলছে সেটাও চলছে ধুকে ধুকে। আরো কিছু স্কুল বন্ধ হওয়ার অবস্থায় চলে গেছে বলে শুনেছি।’

জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘আমার স্কুলের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিয়েছি স্ত্রীর গয়না আর দেশের বাড়িতে থাকা জমি বিক্রি করে। জানুয়ারীতে অর্ধেক বেতন নিয়ে ৬৪৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেছিলাম। এখন আছে ৩০৯ জন। আমার স্কুলের মতো সব স্কুলের অবস্থাই করুন।

রানা বলেন, ‘আমরাই কোমলমতি শিশুদের প্রথম শিক্ষক অভিভাবক। আমাদের পাশে সরকারী বেসরকারী বিত্তশালীদের দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। সব কিছুর উর্দ্ধে শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক আমাদের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিনি যদি আমাদের পাশে দাঁড়ান তবে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং এর সাথে জড়িত লাখো মানুষ তাদের পেশা ফিরে পাবে। আর শিক্ষার্থীরা পাবে তাদের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন।

২০০৯ এ প্রতিষ্ঠিত ঢাকা আইডিয়াল প্রিপারেটরী স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘স্কুল চালাচ্ছি ধার দেনা করে। আমরা ১৬ জন মিলে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে এ জন্য যে স্কুলটিকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি। ফাউন্ডাররা সবাই মিলে আবার নতুন করে ফান্ড করেছি। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন অর্ধেক করে ফেলেছি। এখন তো দিতেই পারছি না। ’

তিন ফ্লাট নিয়ে এই স্কুলে আগে ছাত্র সংকুলান হতো না বলে আরেকটি বিল্ডিং নেয়ার সকল প্রক্রিয়া শেষ করেছিলেন জানিয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখন নতুন বিল্ডিং তো দূর। আগের একটা ফ্লাট ছেড়ে দিয়েছি। বাসা ভাড়া দিতে পারছি না। আমাদের তো সবকিছুই শিক্ষার্থীদের বেতন, স্কুলের পোশাক, বই- খাতা-পেন্সিল ইত্যাদি উপকরণ বিক্রি করে যা আয় হয় তার ওপরই চলতো। মহল্লার ভেতরে স্কুল হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রি আর আগের মতো নাই। যারা ছিলো তারাও আসছে না। বাচ্চাদের উপস্থিতি একদম কম। ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী অভিভাবকদের সাথে গ্রামে চলে গেছে।’

স্কুল টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে ফেলতে হয়েছে জানিয়ে ঢাকা আইডিয়াল প্রিপারেটরী স্কুলের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান জাহানারা বেগম বলেন, এই স্কুল শুধু আমাদের সন্তানের মতো তাই বলবো না। এই স্কুলই আমাদের আয়ের উৎস। এই স্কুল চালানো এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ। করোনা পরবর্তিতে এই চ্যালেঞ্জে জিততে হলে আমাদের পাশে সরকারকে চাই।’

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনে নিবন্ধদনকৃত কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ৪০হাজার এর বাইরেও আছে বেশ কিছু স্কুল যা নিবন্ধনের বাইরে সেই হিসেবে এই স্কুলের সংখ্যা আরো বেশী বলে মনে করেন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহাঙ্গীর করিন রানা।

ঢাকার বাইরে শুধু কুমিল্লা জেলার পরিসংখ্যান দেখলেই দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের চিত্র অনেকটাই বোঝা যাবে বলেও জানান তিনি।

কুমিল্লার প্রায় দুই হাজার কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রায় ১৮ হাজারের ওপর শিক্ষক-কর্মচারী আছে যারা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বেতন বন্ধ করে দেয়ায় সংসারের দায়িত্ব পালন করতে অনেকে চাকরি ছেড়ে ভিন্ন পেশায় বেছে নিচ্ছেন বলে জানান কুমিল্লা জেলার কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের নেতারা।

কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় নিবন্ধনকৃত কিন্ডার গার্টেন স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৭৮১টি। তবে বর্তমানে এ জেলায় দুই হাজারের মতো কিন্ডার গার্টেন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর বিশেষ করে ক্ষতির মুখে পড়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের টিউশন-ফি এর উপর নির্ভর করে শিক্ষকদের বেতনসহ সার্বিক কার্যক্রম চলে। কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের টিউশন ফি বন্ধ করে দেয়ায় স্কুল শিক্ষকদের বেতনাদি বন্ধ হয়ে গেছে।

কুমিল্লার ব্যক্তি মালিকানার বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে ওঠা অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে যারা শুধুমাত্র স্কুলের বেতনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন তারা বেকার হয়ে গেছেন। জেলার আদর্শ সদর উপজেলার কমলাপুর চাইল্ড হেভেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম জানান, ‘করোনাকাল শুরু হলে স্কুলের ফান্ড থেকে দুই মাস শিক্ষকদের বেতন দিতে পেরেছেন। এরপর আর্থিক সংকটের কারণে বেতন দেয়া সম্ভব হয় নি। এদিকে স্কুল খুললেও সব শিক্ষার্থী ক্লাসে ফেরে নাই।

কুমিল্লা জেলা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামীম হায়দার জানান, এ সংগঠনে জেলায় দুই হাজারের বেশী প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে গড়ে ১০ জনের মতো শিক্ষক আছেন। এ হিসাবে জেলায় কিন্ডার গার্টেন স্কুল শিক্ষকের সংখ্যা অন্তত ১৮ থেকে ২০ হাজার। করোনাকালে অধিকাংশ কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারিরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হওয়ার পথে।

জেলা কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সভাপতি হাসান ইমাম ফটিক জানান, বর্তমানে কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকদের অধিকাংশই জীবিকার প্রয়োজনে তাদের পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। সরকার শিক্ষকদের প্রতি অনেক আন্তরিক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দূরবস্থার কথা বিবেচনা করে সরকারি প্রণোদনার দাবি জানাচ্ছি।

ঠিক কতোটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল সারাদেশে বন্ধ হয়ে গেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন্স) মনীষ চাকমা বলেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো তাদের মতো করে চলে। আমাদের কাছে তাদের কোনো তথ্য নেই।

তবে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে মোট কিন্ডারগার্টেনের ৯৯ শতাংশই বাসা ভাড়া নিয়ে স্কুল চালায়। তারা খবর নিয়ে দেখেছেন, বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমানে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে হয়তো কিছু কিন্ডারগার্টেন আগামী জানুয়ারিতে খুলতে পারে। তবে আরো কয়েক হাজার স্কুল চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, সরকার যদি এই এক কোটি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতো, তাহলে তাদের জন্য নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হতো। শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের ট্রেনিং বেতন-ভাতা বাবদ সরকারকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। আমরা নিজেদের উদ্যোগে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশাল অবদান রাখছি। করোনাকালে সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সরকার আমাদের কোনো সহায়তা করেনি। স্কুলগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের কাছে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ চেয়েও পাইনি।

তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ করে বলেন, কোনোমতে এখনো টিকে থাকা কিন্ডারগার্টেনকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও আমাদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দিলে আবারো আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবো।

ছবি

পানিতে ডুবে মেডিকেল কলেজের ছাত্র ফাইমের মৃত্যু

ছবি

উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে: পরিবেশ মন্ত্রী

ছবি

জাতীয় জাদুঘর শিল্পকলার ধারক-বাহক হিসেবে কাজ করছে: সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

ছবি

বিলাসবহুল ১১০টি গাড়ি নিলামে বিক্রি করবে চট্টগ্রাম কাস্টমস

ছবি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে হবে: তাজুল ইসলাম

ছবি

আশ্বাসই সার, মেলেনা বিধবা ও বয়স্ক ভাতা কার্ড রোকেয়ার

চাটখিলে মুসল্লিদের বিক্ষোভ আটক ৫

রোহিঙ্গা শিবিরে অস্ত্রসহ ১৪ ডাকাত গ্রেপ্তার

আগুনে দগ্ধ প্রসূতি কিশোরীর মৃত্যু

ছবি

পর্যটন কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই

ছবি

৪৫ বছরে কুড়িগ্রাম সীমান্তে হত্যা ৭২, অপহরণ ৫০

ছবি

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি পরিকল্পিতভাবে মন্দিরে হামলা চালিয়েছে: ওবায়দুল কাদের

ছবি

ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিশুসহ ৭ জন নিহত

বোয়ালখালীতে বিদ্যুতে মৃত্যু যুবকের

ধোবাউড়ায় এম্বুলেন্স দুর্ঘটনার শিকার রোগী নিহত

চৌমুহনীতে আরো এক ব্যাক্তির লাশ উদ্ধার, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিক্ষোভ মিছিল

চিতলমারীতে কালি মন্দিরের প্রতিমা ভাংচুর

ছবি

বেনাপোল বন্দর দিয়ে ফের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য শুরু

নওগাঁয় ফাতেমা ধানে’র ফলন বিঘায় ৫০মণ

ছবি

নিত্যপণ্যের দাম কমানোর দাবিতে মানববন্ধন

ছবি

চট্টগ্রাম জেলায় আধাবেলা হরতাল পালিত

ছবি

জয়পুরহাটের কাজীপাড়া পাখির কলকাকলিতে মুখরিত

ছবি

নোয়াখালীতে ১৪৪ ধারা জারি

ছবি

বঙ্গোসাগরে লঘুচাপ, নদীবন্দরে সতর্কতা

অচেনা হামলাকারীদের সঙ্গে ছিল মই হাতুড়ি পাথর

ছবি

সিলেটের পুলিশ সুপারের মায়ের মৃত্যু

ছবি

ঢামেকে নবজাতক মুমূর্ষ রোগীদের এনআইসিউতে ভর্তি করলেই আয়াদের দিতে হয় ঘুষ

ছবি

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে হবে: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

ছবি

সার্বিয়ার পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রীর সাথে ড. মোমেনের বৈঠক

ছবি

নারী,শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য ঢামেকের বর্হিবিভাগে আধুনিক টয়লেট

ছবি

প্রতিমা বিসর্জনে হাজার-হাজার মানুষের ঢল

ছবি

চট্টগ্রামে প্রশাসনের অনুরোধে প্রতিমা বিসর্জন

ছবি

পূজামণ্ডপে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়: জাফরুল্লাহ চৌধুরী

ছবি

মাগুরায় দু’গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ৪, আহত ২৫

সম্প্রীতির মিলনমেলা কক্সবাজার সৈকতে

ছবি

নদীবন্দর সমূহকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত

tab

বাংলাদেশ

কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ

শিক্ষকদের অধিকাংশই জীবিকার প্রয়োজনে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন

জাহিদা পারভেজ ছন্দা

শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

‘স্যারের বকা ; কানমলা

তাতেও ছিল সুখ

এখন আর কেউ বকে না

আদর করে ধরে না চিবুক’ - এ কথাগুলো যেন সাত বছর বয়সী ছোট্ট আনায়াহ ইজমার। ইজমাহ যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করলো, এর ঠিক তিন মাসের মধ্যেই স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। পৃথিবী এলামেলো হলো। ইজমাহর ছোট্ট জীবনেও ‘এলামেলোর’ প্রভাব পড়লো। স্কুল বন্ধ, বাইরে যাওয়া বন্ধ, কেউ তাদের বাসায় আসে না, তারাও কোথাও যায় না। ছোট্ট মনে সারাক্ষণ উঁিকঝুকি মারে তিন মাসের বন্ধু আর স্কুলের স্মৃতি। তার স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে সকাল বেলা উঠে স্কুলের পোশাক পড়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে মা’র হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার এক চমৎকার স্মৃতি। স্মৃতিতে আছে, তিন মাসের বন্ধুদের সাথে টিফিন শেয়ার করা, মিসের আদুরে হাতের স্পর্শ, হোয়াইট বোর্ডে আঁকা, প্রেজেন্ট মিস বলা আর মিস ক্লাস শেষ করে যাওয়ার পর সব বন্ধুরা একখানে হয়ে মজার মজার গল্প করা। যা এই দেড় বছর ধরে তার মা-বাবা আর ছোট বোনকে শুনিয়ে আসছে নিয়মিত। আর স্কুল বন্ধের পর থেকে তার একটাই প্রশ্ন ‘কবে স্কুল খুলবে?’

সকল ভাবনাকে মাড়িয়ে সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে স্কুল খুলে গেলেও ইজমার স্কুল আর খোলে না। তার সকল সুখস্মৃতি আবারো ফিরে পাওয়ার কথা থাকলেও নিকট সময়ে তা আর হচ্ছে না। হচ্ছে না ইজমাহর স্কুলে যাওয়া। কারণ তার প্রিয় স্কুলের ওপর করোনার রক্তচক্ষু পড়ায় স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেছে। ইজমার প্রথম ও প্রিয় ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ স্কুলটিই যে শুধু বন্ধ হয়ে গেছে তা কিন্তু নয়। করোনাকালীন সময়ে সারাদেশে হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গছে। সারাদেশে শুধু মাত্র বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের নিবন্ধনকৃত স্কুলগুলোর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে স্কুলের ব্যয়ভার বহন করতে না পারার জন্য। গত দেড় বছরে সরকারী-বেসরকারী কোনো সহযোগিতা না পেয়ে স্কুলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিক- কর্তৃপক্ষ বলে জানান এসোসিয়েশনের নেতারা। তারা বলেন, এইসব স্কুলের আয়ের একমাত্র উৎসই হলো শিক্ষাথীদের বেতন ও লেখপড়া সংক্রান্ত উপকরণ বিক্রির অর্থ। যা গত দেড় বছর ধরে বন্ধ। এক দুই মাস থেকে ৬ মাস পর্যন্ত অনেকেই ধার দেনা করে, শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে, কখনো না দিয়ে স্কুল টিকিয়ে রাখার প্রানান্ত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু করোনার প্রভাব যে এতোসময় ধরে এভাবে বিস্তৃত হবে বুঝতে পারেন নি। এই অবস্থা থেকে যারা উঠে দাঁড়াতে পারছিলেন না তারা স্কুল বাধ্য হয়েই বন্ধ করে দেন। অভাবের তাড়নায় চোখের জলে প্রিয় স্কুলের বেঞ্চ, চেয়ার টেবিল বিক্রি করে দেন বলেও জানান এই নেতারা।

বন্ধ করে দেওয়া হাজার স্কুলের মধ্যে একটা ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ স্কুল। ২০০৫ এ ধানমন্ডিতে গড়ে ওঠা নামকরা ব্রিটিশ কলম্বিয়া স্কুলটি বেশ নাম করে ফেললেও করোনার রক্তচক্ষুর কাছে তা বন্ধ করে দিতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই স্কুলের একজন শিক্ষক বলেন, ‘করোনার প্রভাব যে এতো দুর যাবে বুঝতে পারিনি’। তিনি বলেন, ‘করোনার সময় স্কুলের শিক্ষার্থীরা টিউশন ফিস দিতো না। নতুন সেশনে ছাত্র-ছাত্রি ভর্তি স্কুলের প্রধান আয়ের উৎস ছিলো। ২০২০ এর মার্চে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলটি প্রথম ৬ মাস চালানো গেলেও পরে আর তা সম্ভব হয়নি। প্রায় ৩৫ জন শিক্ষক, স্কুলের অন্যান্য স্টাফদের বেতন আর স্কুল বিল্ডিং- এর ভাড়া সব মিলিয়ে নাভি:শ্বাস উঠে গিয়েছিলো কর্তৃপক্ষের। অনেক চেষ্টা করেও স্কুলটি টেকানো আর সম্ভব হয়নি। যে কয়জন ছাত্র- ছাত্রি স্কুলটিতে শেষ পর্যন্ত ছিলো তাদের অন্য আরেকটা স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে বন্ধ ঘোষণা করেন ‘ব্রিটিশ কলম্বিয়া’ স্কুল।’

এই স্কুলেরই ছাত্রী আনায়াহ ইজমার মা ফারহানা ফার্সী বলেন, ‘স্কুলের সব কিছু ভালো ছিলো বলেই বাচ্চা ভর্তি করিয়েছিলাম। কিন্তু করোনার সময় অনলাইন ক্লাস হয়, হয় না, কখনো বাচ্চাই ক্লাস করতে চায় না, কখনো দূর্বল নেট, ক্লাস বোঝা যায় না এমন নানা ধরনের সমস্যা ছিলো। কিন্তু টিউশন ফি দিতে হতো ৭ হাজার টাকা। যা দেয়াটা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য যেমন ছিলো তেমনি যৌক্তিকও মনে হয়নি। আর আমাদের ব্যবসাও ভালো যাচ্ছিলো না। প্রথম কয়েক মাস বেতন কন্টিনিউ করলেও পড়ে বন্ধ করে দিয়েছি অনলাইন ক্লাস করানোর অবস্থা দেখে। এছাড়া করোনার সময় আমরা তো সবাই বাসায় থাকতাম। কখনো ইজমার বাবা কখনো আমি ওর লেখাপড়া দেখেছি এখনো দেখছি। ’

এখন কোন স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন জানতে চাইলে ফারহানা ফার্সী বলেন, ‘বছরের বাকি আছে আর ৩ মাস, এই কম সময়ের জন্য আর কোন স্কুলে দেব না। একবারে জানুয়ারিতে ২ মেয়েকে একসাথে ভালো কোনো স্কুলে ভর্তি করাবো ইনশাআল্লাহ। ’

এ অবস্থা শুধু একটা স্কুল বা একজন অভিভাবকের না। অভিভাবকদের অনেকেই ফারহানা ফার্সীর মতো করেই ভাবছেন বলেই হয়তো স্কুল খুলে গেলেও শতভাগ শিক্ষার্থী এখনো কোনো স্কুলে উপস্থিতি নাই।

ছাত্র-ছাত্রীদের অনুপস্থিতির বিষয়ে একাধিক শিক্ষক ও এসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, করোনা অনেকের জীবনই ওলট-পালট করে দিয়েছে। অনেক অভিভাবক ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। বিশেষ করে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতেন এমন অনেকের চাকরী চলে গেছে। অনেকের কর্মস্থল থেকে বেতন কমিয়ে ফেলেছে। আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা তো আরো করুন। অনেক ব্যবসায়ী তার ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। এমন যাদের অবস্থা তারা ঢাকায় বাসা ভাড়া দিয়ে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাবেন তা সম্ভব না হওয়ায় ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যান। আর গ্রামে যাওয়ার এই সংখ্যা নেহায়েতই কম না বলে জানান তারা। আর এ জন্যই এতোদিন পর স্কুল খুললেও শিক্ষার্থী উপস্থিতি এখনো ৫০ শতাংশ। শিক্ষার্থী উপস্থিতি ৮০ ভাগ না হলে স্কুল চালানো কঠিন বলে মনে করেন এই শিক্ষক নেতারা।

হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেনের সাথে জড়িত লাখ লাখ শিক্ষক কর্মচারী কষ্টে জীবন যাপন করছেন বলে জানিয়ে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহাঙ্গীর কবির রানা বলেন, ‘ শিক্ষার্থী উপস্থিতি না বাড়লে আরো অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। গত দেড় বছরের করোনা প্রভাবে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সাথে জড়িত প্রায় ৮০ লাখ মানুষ আজ কষ্টে আছেন। মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমি জানি এমন একজন শিক্ষককে যিনি চা বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। আর কয়টা কিন্ডার গার্টেন স্কুল বন্ধের কথা শুনবেন। বাংলাদেশে ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলের মধ্যে ১০ হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ঢাকা জেলাতেই স্কুল বন্ধের এই সংখ্যা ৫ হাজার। আর যে সব স্কুল চলছে সেটাও চলছে ধুকে ধুকে। আরো কিছু স্কুল বন্ধ হওয়ার অবস্থায় চলে গেছে বলে শুনেছি।’

জাহাঙ্গীর কবির বলেন, ‘আমার স্কুলের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন দিয়েছি স্ত্রীর গয়না আর দেশের বাড়িতে থাকা জমি বিক্রি করে। জানুয়ারীতে অর্ধেক বেতন নিয়ে ৬৪৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেছিলাম। এখন আছে ৩০৯ জন। আমার স্কুলের মতো সব স্কুলের অবস্থাই করুন।

রানা বলেন, ‘আমরাই কোমলমতি শিশুদের প্রথম শিক্ষক অভিভাবক। আমাদের পাশে সরকারী বেসরকারী বিত্তশালীদের দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি। সব কিছুর উর্দ্ধে শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক আমাদের প্রধানমন্ত্রী, তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তিনি যদি আমাদের পাশে দাঁড়ান তবে আমাদের এই প্রতিষ্ঠানগুলো এবং এর সাথে জড়িত লাখো মানুষ তাদের পেশা ফিরে পাবে। আর শিক্ষার্থীরা পাবে তাদের প্রিয় শিক্ষাঙ্গন।

২০০৯ এ প্রতিষ্ঠিত ঢাকা আইডিয়াল প্রিপারেটরী স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘স্কুল চালাচ্ছি ধার দেনা করে। আমরা ১৬ জন মিলে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে এ জন্য যে স্কুলটিকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি। ফাউন্ডাররা সবাই মিলে আবার নতুন করে ফান্ড করেছি। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন অর্ধেক করে ফেলেছি। এখন তো দিতেই পারছি না। ’

তিন ফ্লাট নিয়ে এই স্কুলে আগে ছাত্র সংকুলান হতো না বলে আরেকটি বিল্ডিং নেয়ার সকল প্রক্রিয়া শেষ করেছিলেন জানিয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখন নতুন বিল্ডিং তো দূর। আগের একটা ফ্লাট ছেড়ে দিয়েছি। বাসা ভাড়া দিতে পারছি না। আমাদের তো সবকিছুই শিক্ষার্থীদের বেতন, স্কুলের পোশাক, বই- খাতা-পেন্সিল ইত্যাদি উপকরণ বিক্রি করে যা আয় হয় তার ওপরই চলতো। মহল্লার ভেতরে স্কুল হওয়ায় ছাত্র-ছাত্রি আর আগের মতো নাই। যারা ছিলো তারাও আসছে না। বাচ্চাদের উপস্থিতি একদম কম। ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী অভিভাবকদের সাথে গ্রামে চলে গেছে।’

স্কুল টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের বেতন কমিয়ে ফেলতে হয়েছে জানিয়ে ঢাকা আইডিয়াল প্রিপারেটরী স্কুলের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান জাহানারা বেগম বলেন, এই স্কুল শুধু আমাদের সন্তানের মতো তাই বলবো না। এই স্কুলই আমাদের আয়ের উৎস। এই স্কুল চালানো এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ। করোনা পরবর্তিতে এই চ্যালেঞ্জে জিততে হলে আমাদের পাশে সরকারকে চাই।’

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনে নিবন্ধদনকৃত কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা ৪০হাজার এর বাইরেও আছে বেশ কিছু স্কুল যা নিবন্ধনের বাইরে সেই হিসেবে এই স্কুলের সংখ্যা আরো বেশী বলে মনে করেন বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহাঙ্গীর করিন রানা।

ঢাকার বাইরে শুধু কুমিল্লা জেলার পরিসংখ্যান দেখলেই দেশের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের চিত্র অনেকটাই বোঝা যাবে বলেও জানান তিনি।

কুমিল্লার প্রায় দুই হাজার কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রায় ১৮ হাজারের ওপর শিক্ষক-কর্মচারী আছে যারা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বেতন বন্ধ করে দেয়ায় সংসারের দায়িত্ব পালন করতে অনেকে চাকরি ছেড়ে ভিন্ন পেশায় বেছে নিচ্ছেন বলে জানান কুমিল্লা জেলার কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের নেতারা।

কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় নিবন্ধনকৃত কিন্ডার গার্টেন স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৭৮১টি। তবে বর্তমানে এ জেলায় দুই হাজারের মতো কিন্ডার গার্টেন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর বিশেষ করে ক্ষতির মুখে পড়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের টিউশন-ফি এর উপর নির্ভর করে শিক্ষকদের বেতনসহ সার্বিক কার্যক্রম চলে। কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের টিউশন ফি বন্ধ করে দেয়ায় স্কুল শিক্ষকদের বেতনাদি বন্ধ হয়ে গেছে।

কুমিল্লার ব্যক্তি মালিকানার বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে ওঠা অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এতে যারা শুধুমাত্র স্কুলের বেতনের উপর নির্ভরশীল ছিলেন তারা বেকার হয়ে গেছেন। জেলার আদর্শ সদর উপজেলার কমলাপুর চাইল্ড হেভেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিম জানান, ‘করোনাকাল শুরু হলে স্কুলের ফান্ড থেকে দুই মাস শিক্ষকদের বেতন দিতে পেরেছেন। এরপর আর্থিক সংকটের কারণে বেতন দেয়া সম্ভব হয় নি। এদিকে স্কুল খুললেও সব শিক্ষার্থী ক্লাসে ফেরে নাই।

কুমিল্লা জেলা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামীম হায়দার জানান, এ সংগঠনে জেলায় দুই হাজারের বেশী প্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে গড়ে ১০ জনের মতো শিক্ষক আছেন। এ হিসাবে জেলায় কিন্ডার গার্টেন স্কুল শিক্ষকের সংখ্যা অন্তত ১৮ থেকে ২০ হাজার। করোনাকালে অধিকাংশ কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারিরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হওয়ার পথে।

জেলা কিন্ডারগার্টেন এসোসিয়েশনের সভাপতি হাসান ইমাম ফটিক জানান, বর্তমানে কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকদের অধিকাংশই জীবিকার প্রয়োজনে তাদের পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। সরকার শিক্ষকদের প্রতি অনেক আন্তরিক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের দূরবস্থার কথা বিবেচনা করে সরকারি প্রণোদনার দাবি জানাচ্ছি।

ঠিক কতোটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল সারাদেশে বন্ধ হয়ে গেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পলিসি অ্যান্ড অপারেশন্স) মনীষ চাকমা বলেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো তাদের মতো করে চলে। আমাদের কাছে তাদের কোনো তথ্য নেই।

তবে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে মোট কিন্ডারগার্টেনের ৯৯ শতাংশই বাসা ভাড়া নিয়ে স্কুল চালায়। তারা খবর নিয়ে দেখেছেন, বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমানে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে হয়তো কিছু কিন্ডারগার্টেন আগামী জানুয়ারিতে খুলতে পারে। তবে আরো কয়েক হাজার স্কুল চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।

ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান এম ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, সরকার যদি এই এক কোটি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাতো, তাহলে তাদের জন্য নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হতো। শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের ট্রেনিং বেতন-ভাতা বাবদ সরকারকে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হতো। আমরা নিজেদের উদ্যোগে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশাল অবদান রাখছি। করোনাকালে সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সরকার আমাদের কোনো সহায়তা করেনি। স্কুলগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারের কাছে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ চেয়েও পাইনি।

তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ করে বলেন, কোনোমতে এখনো টিকে থাকা কিন্ডারগার্টেনকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষকদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও আমাদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক লোনের ব্যবস্থা করে দিলে আবারো আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবো।

back to top