ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
শাক-সবজিসহ বিভিন্ন কাঁচাপণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরেই বাড়তি ছিল। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছিল সংসার চালাতে। এবার তাদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে নতুন সমস্যা হাজির হলো। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচাপণ্যের দাম তো কমেইনি বরং অন্যান্য মুদিপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে মসুর ডাল ও আটা-ময়দার। বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ভোক্তাপর্যায়ে আলুর দামও বাড়তে পারে কারণ হিমাগার পর্যায়ে আলুর দাম বাড়ানো হয়েছে। শুক্রবার,(২৯ আগস্ট ২০২৫) রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ডাল ও আটা-ময়দার
আগের বাড়তি
দামেই বিক্রি হচ্ছে শাক-সবজি
কয়েকদিন পর আলুর দাম বাড়তির আশঙ্কা
মুরগি, ডিম, মাছ-মাংসের দাম দীর্ঘদিন ধরেই বাড়তি রয়েছে
শুক্রবার সরজমিনে দেখা যায়, বাজারে তিন-চারদিন আগেও প্যাকেটজাত এক কেজি আটা কোম্পানিভেদে ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি হতো। এখন দাম বেড়ে হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। অন্যদিকে, খোলা আটার দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায়। একইভাবে কোম্পানিভেদে ময়দার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭০ টাকায়।
বাজারে ভালো মানের মসুর ডালের দাম ১৩৫-১৪০ টাকা বিক্রি হলেও এখন দাম ওঠেছে ১৪৫-১৫০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। একইভাবে বড় দানার মসুর ডালের দাম বেড়ে ১২৫-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে, চড়া দামে আটকে থাকা সবজির দামে গত সপ্তাহের ব্যবধানে খুব একটা হেরফের নেই। এক কেজি বেগুন এখনও ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। করলা প্রতি কেজি ৯০-১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০-১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০-৮০ টাকা, কচুর মুখি ৮০-৯০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০ টাকা, চিচিংগা-ঝিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকায়। কাঁচামরিচ ২০০-২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
পেঁয়াজ আমদানি বাড়লেও বাজারে দাম তেমন কমেনি। এখনও প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮৫ টাকা কেজি দরে। কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেখানে দেশি পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭২ টাকায়।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আহসান আলি। তিনি বলেন, ‘সরকার বাজারে মনিটরিং করে বলে আমার মনে হয় না। যদি করতো তাহলে এভাবে দাম বাড়তো না। আশা করেছিলাম সরকার পরিবর্তন হলে আমরা অন্তত কিছুটা স্বস্থি পাব। কিন্তু তা আর হলো না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বাড়তি দামে পণ্য কিনেছি, এ সরকারের আমলেও কিনছি।’
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ার ফলে গত কয়েকমাস ধরে লোকসানে আলু বিক্রি করছিলেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার আলুর দাম হিমাগার পর্যায়ে ন্যূনতম মূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। তবে এখনও আলুর দাম সেভাবে বাড়েনি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
তারা বলছেন, এতদিন ১২-১৫ টাকা কেজি দরে হিমাগারে আলু বিক্রি হয়ে আসছিল। এখন হিমাগার পর্যায়ে ৭-১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে খুচরা বাজারে। বর্তমানে খুচরায় যেখানে ২৫-৩০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে সেই দামে হয়তো ভোক্তারা আর আলু কিনতে পারবেন না।
গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি শাখা থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে আলুর হিমাগার গেটে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে খুচরায় সর্বোচ্চ কত টাকা দরে আলু বিক্রি হবে সেটা ঠিক করে দেয়নি সরকার। ফলে বাজারেই আসলে নির্ধারণ হবে আলুর দাম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণের পরও সামান্য একটু বেড়েছে। এখন তারা সাড়ে ১৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন। যখন হিমাগার গেটে ২২ টাকায় আলু বিক্রি হবে তখন এটা পাইকারি থেকে কিনতে হবে কমপক্ষে ২৪ টাকায়। অন্যসব খরচ মিলিয়ে তখন বিক্রি হতে পারে ২৭-২৮ টাকা কেজি দরে। এর প্রভাব খুচরায় পড়বে এবং দাম কিছুটা বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।’
তারা আরও বলছেন, খুচরায় ৩৫-৪০ টাকা উঠে যেতে পারে আলুর দাম। তবে সরকার যদি সরবরাহ চেইনে ঠিকঠাক মনিটরিং করে তবে খুচরাপর্যায়ে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আলুর দাম এখনও সেভাবে বাড়েনি। এখনও আগের দাম ২৫-৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য সবজির দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন শাকের দামও বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও হাতিরপুলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি আঁটি পুঁইশাক ৫০-৬০ টাকা, ডাটাশাক ২০-৩০, কলমি শাক ২০ টাকা পর্যন্ত, লাল শাক ২৫-৩০, লাউশাক ৪০-৬০, পাটশাক ২০-২৫ এবং কচুশাক ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর অন্যান্য বাজারেও সবজির সঙ্গে শাকের দামও চড়া। সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পাতে নিয়মিত ওঠা শাক এখন ২০ টাকার নিচে মিলছে না। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, বৃষ্টির কারণে ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় শাকের উৎপাদন কমেছে। তবে ক্রেতারা বলছেন, কার্যকর বাজার নজরদারির অভাবেই শাকের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাজধানীর বাজারে দিন দিন মাছ- মাংসের দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাজার করতে গিয়ে খেটে-খাওয়া মানুষ পড়ছেন বিপাকে। গরু ও মুরগির মাংসের দাম দ্রুত কমার কোনো ইঙ্গিত নেই, আবার মাছের বাজারেও যেন লেগেছে আগুন। এদিকে গরু ও খাসির দাম স্থির থাকলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের পকেটে চাপ বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক মাসে মুরগি ও মাছের দামে ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, অথচ গরু-খাসির দাম স্থির থাকলেও সেটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাজারে বিক্রেতারা যেখানে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন, সেখানে ক্রেতারা বলছেন, যতদিন পর্যন্ত কার্যকর বাজার তদারকি না হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে মুরগি ও মাছের দাম ক্রমবর্ধমাণ। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়ে ১৮০-২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি কেজিতে এখন ২৯০-৩২০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ টাকার ওপরে। এছাড়া আজকের বাজারে গরুর মাংস কেজি ৭৫০-৭৬০ টাকায় এবং খাসির মাংস কেজি ১,১০০-১,১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে গত এক মাসে এ দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
মাছের বাজারেও একই চিত্র। বাইলা মাছ কেজি ৮৫০ টাকা, ট্যাংরা ৮০০, চিংড়ি ১,০০০, পাবদা ৪০০, তেলাপিয়া ২৫০ এবং পাঙাস ২০০-২৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে বাইলা ছিল ৭৫০, টেংরা ৭৫০, পাবদা ৩৫০, চিংড়ি ৯০০, তেলাপিয়া ২১০-২২০, আর পাঙাস ১৮০-১৯০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে অধিকাংশ মাছের দাম কেজিতে ৪০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চট্টগ্রামে কাঁচাবাজারেও আগুন
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মহানগরের সব বাজারেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সবজি। মাছ থেকে মাংস। মুরগি-ডিম থেকে সবজির বাজার। কোথাও যেন স্বস্তির লক্ষণ নেই। সবখানেই বাড়তি দামেই চলছে বিক্রি। তবে চালের পড়তি দাম-কিছুটা হলেও হাসি ফোটাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মুখে।
নগরীর বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার ও দুই নম্বর গেইটের কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজারে ঘুরে দেখা যায় আলু ছাড়া প্রায় সবজিই বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকার ওপরে। মরিচের কেজি এখনও দেড়শ’ টাকার আশপাশে। স্বস্তি ফেরেনি মাছ-মুরগির বাজারেও। রুই-কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৪৫০ টাকা পর্যন্ত। চিংড়ি প্রকারভেদে ৭০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছের দাম আরও চড়া। এখনও ইলিশের দাম নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পাতে পড়ার অবস্থায় যেন ফেরেনি। আকারভেদে এখনও ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯০০-২০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মুরগির দাম সেই যে আশুরায় বেড়েছে আর কমার কোনো লক্ষণ নেই। ব্রয়লার ১৫০-১৬০, সোনালি ২৮০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দামও ১৩৫-১৪০ টাকায় পৌঁছে স্থির হয়ে আছে। স্বস্তি নেই পেঁয়াজেও। মাঝখানে আমদানির খবরে কিছুটা কমলেও এখন ফের খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।
কর্ণফুলী কমপ্লেক্স কাঁচাবাজারে বাজার করতে ঢুকে বড় নিঃশ্বাস ফেললেন খুদে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। তিনি আফসোস নিয়ে বলেন, বাজারে আসলে কাঁদার উপক্রম হয়। সবকিছুরই দাম বাড়তি। এটা-ওটা শুধু দরদাম করি, দাম শুনে কেনার সাহস হয় না।
চালে স্বস্তি: এতদিন ধরে অস্থির ছিল চালের দামও। তবে ভারতীয় চালের আমদানি বাড়ার কারণে কমছে সব ধরনের চালের দাম। কয়েক দিনের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) কমেছে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ কেজিপ্রতিই ছয় টাকা কমেছে দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার চাল আমদানির অনুমতি দেয়ায় দেশের স্থলবন্দরগুলো দিয়ে প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় চাল প্রবেশ করেছে। এ কারণে দামও কমেছে। তবে পাইকারি বাজারে কমলেও এখনও খুচরা বাজারে সেটির প্রভাব তেমন একটা পড়েনি।
নগরীর চালের আড়ত চাক্তাইয়ের চালপট্টি ও পাহাড়তলীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে নাজিরশাইল সিদ্ধ, জিরাশাইল সিদ্ধ, মিনিকেট আতপ, কাটারিভোগ আতপ চালের দাম বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বর্তমানে জিরাশাইল সিদ্ধ ৩ হাজার ৬৫০ টাকায়, মিনিকেট সিদ্ধ ২ হাজার ৮০০ টাকা, পাইজাম সিদ্ধ ২ হাজার ৮৫০ টাকা, কাটারিভোগ সিদ্ধ (২৫ কেজি বস্তা) ১ হাজার ৮০০ টাকা, কাটারিভোগ আতপ ৩ হাজার ৮০০ টাকা, মিনিকেট আতপ ৩ হাজার টাকা, নাজিরশাইল সিদ্ধ (২৫ কেজি বস্তা) ১ হাজার ৮৫০ টাকা, দেশি নাজিরশাইল সিদ্ধ ২ হাজার টাকা, স্বর্ণা সিদ্ধ ২ হাজার ৭৫০ টাকা, বেতী আতপ ২ হাজার ৭০০ টাকা এবং মোটা সিদ্ধ ২ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫
শাক-সবজিসহ বিভিন্ন কাঁচাপণ্যের দাম দীর্ঘদিন ধরেই বাড়তি ছিল। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছিল সংসার চালাতে। এবার তাদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে নতুন সমস্যা হাজির হলো। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচাপণ্যের দাম তো কমেইনি বরং অন্যান্য মুদিপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে মসুর ডাল ও আটা-ময়দার। বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ভোক্তাপর্যায়ে আলুর দামও বাড়তে পারে কারণ হিমাগার পর্যায়ে আলুর দাম বাড়ানো হয়েছে। শুক্রবার,(২৯ আগস্ট ২০২৫) রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ডাল ও আটা-ময়দার
আগের বাড়তি
দামেই বিক্রি হচ্ছে শাক-সবজি
কয়েকদিন পর আলুর দাম বাড়তির আশঙ্কা
মুরগি, ডিম, মাছ-মাংসের দাম দীর্ঘদিন ধরেই বাড়তি রয়েছে
শুক্রবার সরজমিনে দেখা যায়, বাজারে তিন-চারদিন আগেও প্যাকেটজাত এক কেজি আটা কোম্পানিভেদে ৫০-৫৫ টাকায় বিক্রি হতো। এখন দাম বেড়ে হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। অন্যদিকে, খোলা আটার দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকায়। একইভাবে কোম্পানিভেদে ময়দার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭০ টাকায়।
বাজারে ভালো মানের মসুর ডালের দাম ১৩৫-১৪০ টাকা বিক্রি হলেও এখন দাম ওঠেছে ১৪৫-১৫০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। একইভাবে বড় দানার মসুর ডালের দাম বেড়ে ১২৫-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে, চড়া দামে আটকে থাকা সবজির দামে গত সপ্তাহের ব্যবধানে খুব একটা হেরফের নেই। এক কেজি বেগুন এখনও ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। করলা প্রতি কেজি ৯০-১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০-১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৭০-৮০ টাকা, কচুর মুখি ৮০-৯০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০ টাকা, চিচিংগা-ঝিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকায়। কাঁচামরিচ ২০০-২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
পেঁয়াজ আমদানি বাড়লেও বাজারে দাম তেমন কমেনি। এখনও প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮৫ টাকা কেজি দরে। কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেখানে দেশি পেঁয়াজও বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭২ টাকায়।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আহসান আলি। তিনি বলেন, ‘সরকার বাজারে মনিটরিং করে বলে আমার মনে হয় না। যদি করতো তাহলে এভাবে দাম বাড়তো না। আশা করেছিলাম সরকার পরিবর্তন হলে আমরা অন্তত কিছুটা স্বস্থি পাব। কিন্তু তা আর হলো না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বাড়তি দামে পণ্য কিনেছি, এ সরকারের আমলেও কিনছি।’
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ার ফলে গত কয়েকমাস ধরে লোকসানে আলু বিক্রি করছিলেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার আলুর দাম হিমাগার পর্যায়ে ন্যূনতম মূল্য ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। তবে এখনও আলুর দাম সেভাবে বাড়েনি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে তা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
তারা বলছেন, এতদিন ১২-১৫ টাকা কেজি দরে হিমাগারে আলু বিক্রি হয়ে আসছিল। এখন হিমাগার পর্যায়ে ৭-১০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে খুচরা বাজারে। বর্তমানে খুচরায় যেখানে ২৫-৩০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে সেই দামে হয়তো ভোক্তারা আর আলু কিনতে পারবেন না।
গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি শাখা থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে আলুর হিমাগার গেটে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তবে খুচরায় সর্বোচ্চ কত টাকা দরে আলু বিক্রি হবে সেটা ঠিক করে দেয়নি সরকার। ফলে বাজারেই আসলে নির্ধারণ হবে আলুর দাম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণের পরও সামান্য একটু বেড়েছে। এখন তারা সাড়ে ১৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন। যখন হিমাগার গেটে ২২ টাকায় আলু বিক্রি হবে তখন এটা পাইকারি থেকে কিনতে হবে কমপক্ষে ২৪ টাকায়। অন্যসব খরচ মিলিয়ে তখন বিক্রি হতে পারে ২৭-২৮ টাকা কেজি দরে। এর প্রভাব খুচরায় পড়বে এবং দাম কিছুটা বেড়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।’
তারা আরও বলছেন, খুচরায় ৩৫-৪০ টাকা উঠে যেতে পারে আলুর দাম। তবে সরকার যদি সরবরাহ চেইনে ঠিকঠাক মনিটরিং করে তবে খুচরাপর্যায়ে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। রাজধানীর খুচরা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, আলুর দাম এখনও সেভাবে বাড়েনি। এখনও আগের দাম ২৫-৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যান্য সবজির দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন শাকের দামও বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মিরপুর, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া ও হাতিরপুলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি আঁটি পুঁইশাক ৫০-৬০ টাকা, ডাটাশাক ২০-৩০, কলমি শাক ২০ টাকা পর্যন্ত, লাল শাক ২৫-৩০, লাউশাক ৪০-৬০, পাটশাক ২০-২৫ এবং কচুশাক ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর অন্যান্য বাজারেও সবজির সঙ্গে শাকের দামও চড়া। সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পাতে নিয়মিত ওঠা শাক এখন ২০ টাকার নিচে মিলছে না। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, বৃষ্টির কারণে ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় শাকের উৎপাদন কমেছে। তবে ক্রেতারা বলছেন, কার্যকর বাজার নজরদারির অভাবেই শাকের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রাজধানীর বাজারে দিন দিন মাছ- মাংসের দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাজার করতে গিয়ে খেটে-খাওয়া মানুষ পড়ছেন বিপাকে। গরু ও মুরগির মাংসের দাম দ্রুত কমার কোনো ইঙ্গিত নেই, আবার মাছের বাজারেও যেন লেগেছে আগুন। এদিকে গরু ও খাসির দাম স্থির থাকলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের পকেটে চাপ বাড়ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক মাসে মুরগি ও মাছের দামে ২০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, অথচ গরু-খাসির দাম স্থির থাকলেও সেটি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাজারে বিক্রেতারা যেখানে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন, সেখানে ক্রেতারা বলছেন, যতদিন পর্যন্ত কার্যকর বাজার তদারকি না হবে, ততদিন সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে মুরগি ও মাছের দাম ক্রমবর্ধমাণ। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা বেড়ে ১৮০-২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি কেজিতে এখন ২৯০-৩২০ টাকা, দেশি মুরগি ৬৫০ টাকার ওপরে। এছাড়া আজকের বাজারে গরুর মাংস কেজি ৭৫০-৭৬০ টাকায় এবং খাসির মাংস কেজি ১,১০০-১,১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে গত এক মাসে এ দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
মাছের বাজারেও একই চিত্র। বাইলা মাছ কেজি ৮৫০ টাকা, ট্যাংরা ৮০০, চিংড়ি ১,০০০, পাবদা ৪০০, তেলাপিয়া ২৫০ এবং পাঙাস ২০০-২৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত মাসে বাইলা ছিল ৭৫০, টেংরা ৭৫০, পাবদা ৩৫০, চিংড়ি ৯০০, তেলাপিয়া ২১০-২২০, আর পাঙাস ১৮০-১৯০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে অধিকাংশ মাছের দাম কেজিতে ৪০-৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
চট্টগ্রামে কাঁচাবাজারেও আগুন
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মহানগরের সব বাজারেই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে সবজি। মাছ থেকে মাংস। মুরগি-ডিম থেকে সবজির বাজার। কোথাও যেন স্বস্তির লক্ষণ নেই। সবখানেই বাড়তি দামেই চলছে বিক্রি। তবে চালের পড়তি দাম-কিছুটা হলেও হাসি ফোটাচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মুখে।
নগরীর বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার ও দুই নম্বর গেইটের কর্ণফুলী কমপ্লেক্স বাজারে ঘুরে দেখা যায় আলু ছাড়া প্রায় সবজিই বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকার ওপরে। মরিচের কেজি এখনও দেড়শ’ টাকার আশপাশে। স্বস্তি ফেরেনি মাছ-মুরগির বাজারেও। রুই-কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৪৫০ টাকা পর্যন্ত। চিংড়ি প্রকারভেদে ৭০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছের দাম আরও চড়া। এখনও ইলিশের দাম নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পাতে পড়ার অবস্থায় যেন ফেরেনি। আকারভেদে এখনও ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৯০০-২০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মুরগির দাম সেই যে আশুরায় বেড়েছে আর কমার কোনো লক্ষণ নেই। ব্রয়লার ১৫০-১৬০, সোনালি ২৮০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দামও ১৩৫-১৪০ টাকায় পৌঁছে স্থির হয়ে আছে। স্বস্তি নেই পেঁয়াজেও। মাঝখানে আমদানির খবরে কিছুটা কমলেও এখন ফের খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।
কর্ণফুলী কমপ্লেক্স কাঁচাবাজারে বাজার করতে ঢুকে বড় নিঃশ্বাস ফেললেন খুদে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। তিনি আফসোস নিয়ে বলেন, বাজারে আসলে কাঁদার উপক্রম হয়। সবকিছুরই দাম বাড়তি। এটা-ওটা শুধু দরদাম করি, দাম শুনে কেনার সাহস হয় না।
চালে স্বস্তি: এতদিন ধরে অস্থির ছিল চালের দামও। তবে ভারতীয় চালের আমদানি বাড়ার কারণে কমছে সব ধরনের চালের দাম। কয়েক দিনের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) কমেছে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ কেজিপ্রতিই ছয় টাকা কমেছে দাম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার চাল আমদানির অনুমতি দেয়ায় দেশের স্থলবন্দরগুলো দিয়ে প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় চাল প্রবেশ করেছে। এ কারণে দামও কমেছে। তবে পাইকারি বাজারে কমলেও এখনও খুচরা বাজারে সেটির প্রভাব তেমন একটা পড়েনি।
নগরীর চালের আড়ত চাক্তাইয়ের চালপট্টি ও পাহাড়তলীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে নাজিরশাইল সিদ্ধ, জিরাশাইল সিদ্ধ, মিনিকেট আতপ, কাটারিভোগ আতপ চালের দাম বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বর্তমানে জিরাশাইল সিদ্ধ ৩ হাজার ৬৫০ টাকায়, মিনিকেট সিদ্ধ ২ হাজার ৮০০ টাকা, পাইজাম সিদ্ধ ২ হাজার ৮৫০ টাকা, কাটারিভোগ সিদ্ধ (২৫ কেজি বস্তা) ১ হাজার ৮০০ টাকা, কাটারিভোগ আতপ ৩ হাজার ৮০০ টাকা, মিনিকেট আতপ ৩ হাজার টাকা, নাজিরশাইল সিদ্ধ (২৫ কেজি বস্তা) ১ হাজার ৮৫০ টাকা, দেশি নাজিরশাইল সিদ্ধ ২ হাজার টাকা, স্বর্ণা সিদ্ধ ২ হাজার ৭৫০ টাকা, বেতী আতপ ২ হাজার ৭০০ টাকা এবং মোটা সিদ্ধ ২ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।