alt

news » campus

জাকসু নির্বাচন: বৈচিত্র্য, বিতর্ক ও আশার আলো

জাবি প্রতিনিধি : শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও আলোচনা চরমে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে মোট ১৭৯ জন প্রার্থী ২৫টি পদের জন্য লড়াই করছেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে ২৯ আগস্ট থেকে এবং চলবে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ হবে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত, এবং ফলাফল ঘোষণা করা হবে সিনেট হলে। এবারের নির্বাচন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ বৈচিত্র্যময় প্যানেল, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব চিত্র উঠে এসেছে মন্তব্য করেছেন শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেল

ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট এবং ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলটি এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় হিসেবে আলোচিত। ২৯ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি-সংলগ্ন ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্যের পাদদেশে ঘোষিত এই ২৫ সদস্যের প্যানেলে ১১ জন নারী প্রার্থী, ৭ জন আদিবাসী (সমতল ও পাহাড়ী), ১৪ জন মুসলিম, ৬ জন হিন্দু, ৩ জন বৌদ্ধ এবং ২ জন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। এটি ঘোষিত প্যানেলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক।

প্যানেলের নেতৃত্বে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে অমর্ত্য রায় (প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ৪৭তম ব্যাচ, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শরণ এহসান (নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ৪৭তম ব্যাচ, সাবেক সভাপতি, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট)। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) ফারিয়া জামান নিকি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) নূর এ তামীম স্রোত, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক সুকান্ত বর্মন, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক সোমা ডুমরী, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আতিকুর রহমান জনি, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাহাতুল ফেরদৌস রাত্রি, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মায়মুনা বিনতে সাইফুল, নাট্য সম্পাদক ইগিমি চাকমা, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) প্রত্যাশা ত্রিপুরা, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) রেংথ্রি ম্রো, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক মো. মাহফুজ আহমেদ, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক আবরার হক বিন সাজেদ, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (নারী) মায়িশা মনি, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) মো. তাজুন ইসলাম, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক লাবিবা মুবাশশিরা ইশাদি, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক সীমান্ত বর্ধন। কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে আরিফা জান্নাত মুক্তা, আনিকা তাবাসসুম ফারাবী, আদৃতা রায় এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে নিহ্লা অং মারমা, সৈকত কুমার কানু, চুই থুই প্রু মারমা, মো. এরফানুল ইসলাম ইফতু।

প্যানেল ঘোষণা শেষে ২৯ দফা ইশতেহার দেন জিএস প্রার্থী শরণ এহসান। ইশতেহারে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো—শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা এবং উপস্থিতি নম্বর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে সীমিত রাখা। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে মৌলিক সংস্কার আনার জন্য ফলাফলনির্ভরতা কমিয়ে গবেষণা ও প্রকাশনাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলা হয়েছে; সেশনজট নিরসন ও শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে উইকেন্ড ও বাণিজ্যিক কোর্স বাতিলের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি বিভাগের ক্লাসরুম সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে; শিক্ষার্থীদের ফিল্ড ওয়ার্কের সম্পূর্ণ ব্যয় বিভাগীয় তহবিল থেকে বহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানোন্নয়ন পরীক্ষার প্রক্রিয়া সহজ করা, ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা এবং সব পরীক্ষার ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়েছে; এ ছাড়া থিসিস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ফলাফলের কঠোর শর্ত শিথিল করা, সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং প্রতিটি বিভাগে পর্যাপ্ত জেনারেল ল্যাব ও শিক্ষার্থীবান্ধব গবেষণা পরিবেশ তৈরির জন্য রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের দাবি তোলা হয়েছে।

ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তর ও স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর করা হবে; হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনে ভর্তুকি বাড়ানো এবং নারী শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি টিএসসি, মুক্তমঞ্চ ও অডিটোরিয়ামের অবকাঠামো সংস্কার, ক্যাম্পাসের ভরাট হয়ে যাওয়া লেক খনন ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য পুনরুদ্ধার, সব রাস্তা সংস্কার এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাত নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নারী হলে সান্ধ্য আইনকে কেন্দ্র করে হয়রানিসহ যেকোনো স্তরের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চলাফেরা ও একাডেমিক সুবিধার্থে সংরক্ষিত কার্ট চালু, ব্রেইল ও শ্রুতিলেখক পদ্ধতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিবাহিত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অংশীজনদের জন্য কার্যকর ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উৎসবে ছুটি, ন্যায্য অধিকার আদায়ে সংহতি, এবং সকল ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয় সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ভিপি প্রার্থী অমর্ত্য রায় বলেন, “সকল মতের পথের মানুষদেরকে নিয়ে আমরা জাকসু নির্বাচনে বেরিয়ে আসতে চাই। সেই বার্তা আপনারা ইতিমধ্যে পেয়েছেন। আমরা এমন একটি জাকসু চাই যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্য বজায় থাকবে, শিক্ষকদের যে একচেটিয়া আধিপত্য সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এবং জাহাঙ্গীরনগরকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন আমরা সেগুলোকে আমাদের ইশতেহারে রাখার চেষ্টা করেছি।”

স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেল

অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুর রশিদ জিতু এবং ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাকিল আলীর নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। ২৯ আগস্ট রাতে বটতলায় জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের পিতা বুলবুল কবির এটি ঘোষণা করেন।

ভিপি পদে আব্দুর রশিদ জিতু, জিএস পদে মো. শাকিল আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) তৌহিদুল ইসলাম নিবিড় ভূঁঞা, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক হাসিবুল হাসান ইমন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক তুর্য কির্তনীয়া, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইফরাত আমিন অক্ষর, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন, নাট্য সম্পাদক মো. এরশাদ মিয়া, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) সৈয়দা আলভী খোরশেদ, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক সৌরভ কুমার বিশ্বাস, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক আইরিন সুলতানা আখি, সহ-সমাজসেবা (নারী) জান্নাতুল ফিরদাউস আনজুম, সহ-সমাজসেবা (পুরুষ) শরিফ মুহাম্মদ, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক মো. রায়হান, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক মো. শামীম। কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে তানজিদ বিশ্বাস রিচ, সুলতানুল মুল্ক শুভ, মোহাম্মদ মাহদী। প্যানেলে ক্রীড়া সম্পাদক পদ খালি রাখা হয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় মাহমুদুল হাসান কিরণের সম্মানে, যিনি স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন।

ভিপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “আমরা বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করবো, প্রশাসনকে চাপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করবো।”

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্যানেল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাবি শাখার প্যানেল ঘোষণা নিয়ে উঠেছে তীব্র বিতর্ক এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ। ২৮ আগস্ট ‘অদম্য-২৪’ স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়া কর্তৃক ঘোষিত এই ২৫ সদস্যের প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে মো. শেখ সাদী হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে তানজিলা হোসাইন বৈশাখীকে মনোনীত করা হয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) আঞ্জুমান আরা ইকরা, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ইয়ামিন হাওলাদার, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক লিখন চন্দ্র রায়, সাংস্কৃতিক সম্পাদক জাহিদ হাসান খান, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. আবিদুর রহমান, নাট্য সম্পাদক মো. পারভেজ হাসান নিশান, ক্রীড়া সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) মো. জাবের হাসান, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) মো. তৌহিদুর রহমান খান, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক শাকিল সরদার, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক কাজী মৌসুমী আফরোজ, সহ-সমাজসেবা (নারী) উজ্জ্বল হাসান, সহ-সমাজসেবা (পুরুষ) রুহুল আমিন সুইট, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক মোস্তফা শাহানাজ পারভীন শানু, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক জাহিরুল ইসলাম, এবং কার্যকরী সদস্যদের মধ্যে মো. মোমিনুল ইসলাম সহ অন্যরা।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে মনোনীত হামিদুল্লাহ সালমান, যিনি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের সভাপতি। সালমান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, যার মধ্যে সালমানও রয়েছেন। তাকে ছয় মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছিল, যা এখন শেষ হয়েছে। সালমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “এটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা, তদন্ত চলছে এবং আমি নির্দোষ প্রমাণিত হবো।” জাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর সালমানের মনোনয়নের পক্ষে বলেছেন, “সালমান জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন এবং অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি।”

অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, লেজুড়বৃত্তি এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগে প্যানেলটি ছাত্রদলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়দের অবহেলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, যেমন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া, যিনি জিএস পদে স্বতন্ত্র লড়ছেন। তিনি বলেন, “প্যানেল শিক্ষার্থীবান্ধব নয়, গ্রুপিংয়ে ব্যস্ত। নতুন রাজনীতি লেজুড়বৃত্তিমুক্ত হতে হবে।” ছাত্রদলের এক সদস্য বলেন, “প্যানেলে অজানা লোক রয়েছে, অনেক কর্মী হতাশ এবং ভোট দিতে অনিচ্ছুক।” বাবর অবশ্য বলেন, “যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়েছে, ৪৮% নারী ভোটার বিবেচনায় জিএস পদে নারী মনোনীত।” এই বিতর্ক প্যানেল ঘোষণাকে বিলম্বিত করেছে এবং ক্যাম্পাসে আলোচনা বাড়িয়েছে।

মেধাবী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ

জাকসু নির্বাচনে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন আশা জাগিয়েছে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ‘বি’ ইউনিটে মেয়েদের মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জনকারী কাজী মৌসুমী আফরোজ (অর্থনীতি বিভাগ) ছাত্রদল প্যানেল থেকে সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে লড়ছেন। একইভাবে, ‘ডি’ ইউনিটে ছেলেদের মেধাতালিকায় প্রথম ইয়ামিন হাওলাদার (বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কাজী মৌসুমী আফরোজ বলেন, “একজন নারী হিসেবে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হই, সেগুলো নিয়ে কাজ করবো। নারীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য কনসালটেন্সি, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়তে প্রয়াসী হবো।” ইয়ামিন হাওলাদার বলেন, “ছাত্রদল আমার মেধা ও যোগ্যতায় আস্থা রেখেছে। নির্বাচিত হলে আধুনিক, মুক্তচিন্তার ক্যাম্পাস গড়বো, গবেষণা সমস্যা সমাধান করবো এবং অটোমেশন ও ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন চালু করবো।”

জাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, “মেধাবী এবং ভালো ফলাফলধারীদের গুরুত্ব দিয়েছি। বিভাগীয় পরিচিতি এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বিবেচনায় তাদের প্যানেলে রাখা হয়েছে।” এই অংশগ্রহণ মেধা-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিতর্কিত প্যানেলের মধ্যেও আশার আলো ছড়াচ্ছে। তবে, সার্বিকভাবে প্যানেলের বিতর্ক এই মেধাবীদের প্রচারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

বিদেশি শিক্ষার্থীর প্রথম অংশগ্রহণ

এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন নেপালি শিক্ষার্থী মো. আবিদ হুসাইন, যিনি স্বতন্ত্রভাবে সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক পদে লড়ছেন। ফার্মেসি বিভাগের এই শিক্ষার্থী নেপালের বারা জেলার বাসিন্দা। তিনি বলেন, “দক্ষতা উন্নয়ন (আইএলটিএস, জিআরই), রক্তদান ডিজিটালাইজেশন এবং ক্যাম্পাস নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত নয়, দক্ষ মানবসম্পদ গড়বে।”

এটি প্রথমবার কোনো বিদেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ। সম্প্রীতির ঐক্যের আবরার হক বিন সাজেদ বলেন, “এটি জাবির বৈশ্বিকতার প্রমাণ, আমরা স্বাগত জানাই।” নির্বাচন কমিশনের অধ্যাপক খো. লুৎফুল এলাহী বলেন, “আবিদ আমাদের ছাত্র, বিদেশি নয়।” নেপালি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও তার এই অংশগ্রহণে গর্বিত এবং শুভকামনা জানিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে ১০ জন (সব পুরুষ), সাধারণ সম্পাদক পদে ৯ জন (২ নারী), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) ৬ জন, (পুরুষ) ১০ জন এবং অন্যান্য পদে বিভিন্ন সংখ্যায় প্রার্থী রয়েছে। ক্যাম্পাসে ৪৮ শতাংশ নারী ভোটার বিবেচনায় নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। তবে বিতর্ক, স্বতন্ত্র প্রার্থিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এই নির্বাচন শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতির নয়, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের ভবিষ্যতের দর্পণ। তাই, জুলাই অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক চর্চা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতা এখানে পরীক্ষিত হবে বলে আশাবাদী শিক্ষার্থীরা।

ছবি

ডাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদের ইশতেহার ঘোষণা

ছবি

জাকসু কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নারী হলে ১৫০ পদের মধ্যে ৫৮ ফাঁকা 

ছবি

জাকসু নির্বাচনে প্রথম বিদেশি প্রার্থী নেপালের আবিদ হুসাইন

ছবি

জাকসু নির্বাচন: হলগুলোতে মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অবস্থান, প্রশাসনের নির্র্দেশনা জারি

ছবি

৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ

ছবি

মাটিতে ফেলে আমাকে বুট দিয়ে লাথি মেরেছে: রাফিদ

ছবি

জাকসু নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ, ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ১০ জন

ছবি

ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী: অপরাধ করলে শিক্ষার্থীরা আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে দেখবে

ছবি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চাকসু নির্বাচনের আচরণবিধি প্রকাশ

ছবি

চাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক

ছবি

জাকসু: ভোটের দিন পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণা

ছবি

ডাকসু: প্রচারণায় সরগরম ক্যাম্পাস

ছবি

বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সুযোগ নেই: আইএসপিআর

ছবি

প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’

ছবি

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত নয়: প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা

ছবি

চলনবিলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে পরিবেশগত ঝুঁকি

ছবি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা

ছবি

বুয়েটে পরীক্ষা বয়কট, ‘কমপ্লিট শাটডাউনে’ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

ছবি

শিক্ষক বরখাস্ত: শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে উত্তাল ভিকারুননিসার বসুন্ধরা শাখা

ছবি

রাকসু: ক্ষোভের মুখে ৯ ঘণ্টার মধ্যে ভোটের তারিখ আবার পরিবর্তন

ছবি

জাকসু: নারী হলে পদের চেয়ে প্রার্থী কম, বামপন্থিদের বিভাজন

ছবি

রাকসু নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন

ছবি

ডাকসু ভিপি প্রার্থী জালাল আহমদকে রুমমেটকে হত্যাচেষ্টার মামলায় কারাগারে পাঠানোর আদেশ

ছবি

ডাকসু নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, সরানো হল প্রার্থীদের ব্যানার

ছবি

ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের অভিযোগ: আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ভোটকেন্দ্রের সমস্যা

ছবি

ঢাবির হল সংসদ নির্বাচনে লড়বেন ১ হাজার ৩৫ প্রার্থী

ছবি

রাকসু: পিছিয়ে গেলো ভোট

ছবি

জাকসু ভোটে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিতর্ক: নিরাপত্তা ঘাটতি আসলে কতটা?

ছবি

ডাকসুর ভিপি প্রার্থী জালালকে পুলিশের হাতে সোপর্দ

ছবি

রুমমেটকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগে ডাকসুর ভিপি প্রার্থী জালাল হল থেকে বহিষ্কৃত

ছবি

জাকসু: অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পরিচিত মুখের ‘অভাবে’ ছাত্রদলের প্যানেল ঘোষণায় বিলম্ব

ছবি

রাকসু নির্বাচন: শেষদিনেও মনোনয়ন নিলো না ছাত্রদল-শিবির, ফরম বিতরণ ৮২

ছবি

৩ দাবিতে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

ছবি

ডাকসু: সেনাবাহিনী নামছে প্রথমবারের মতো

ছবি

ডাকসু নির্বাচনে ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ

ছবি

ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৪৭১ জন

tab

news » campus

জাকসু নির্বাচন: বৈচিত্র্য, বিতর্ক ও আশার আলো

জাবি প্রতিনিধি

শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ও আলোচনা চরমে। আগামী ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে মোট ১৭৯ জন প্রার্থী ২৫টি পদের জন্য লড়াই করছেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে ২৯ আগস্ট থেকে এবং চলবে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ হবে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত, এবং ফলাফল ঘোষণা করা হবে সিনেট হলে। এবারের নির্বাচন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ বৈচিত্র্যময় প্যানেল, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিদেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব চিত্র উঠে এসেছে মন্তব্য করেছেন শিক্ষার্থীরা।

সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেল

ছাত্র ইউনিয়ন (অদ্রি-অর্ক), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট এবং ইন্ডিজেনাস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলটি এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় হিসেবে আলোচিত। ২৯ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৫টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি-সংলগ্ন ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্যের পাদদেশে ঘোষিত এই ২৫ সদস্যের প্যানেলে ১১ জন নারী প্রার্থী, ৭ জন আদিবাসী (সমতল ও পাহাড়ী), ১৪ জন মুসলিম, ৬ জন হিন্দু, ৩ জন বৌদ্ধ এবং ২ জন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রয়েছেন। এটি ঘোষিত প্যানেলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক।

প্যানেলের নেতৃত্বে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে অমর্ত্য রায় (প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ৪৭তম ব্যাচ, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন) এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শরণ এহসান (নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, ৪৭তম ব্যাচ, সাবেক সভাপতি, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট)। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) ফারিয়া জামান নিকি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) নূর এ তামীম স্রোত, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক সুকান্ত বর্মন, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক সোমা ডুমরী, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আতিকুর রহমান জনি, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাহাতুল ফেরদৌস রাত্রি, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মায়মুনা বিনতে সাইফুল, নাট্য সম্পাদক ইগিমি চাকমা, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) প্রত্যাশা ত্রিপুরা, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) রেংথ্রি ম্রো, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক মো. মাহফুজ আহমেদ, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক আবরার হক বিন সাজেদ, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (নারী) মায়িশা মনি, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) মো. তাজুন ইসলাম, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক লাবিবা মুবাশশিরা ইশাদি, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক সীমান্ত বর্ধন। কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে আরিফা জান্নাত মুক্তা, আনিকা তাবাসসুম ফারাবী, আদৃতা রায় এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে নিহ্লা অং মারমা, সৈকত কুমার কানু, চুই থুই প্রু মারমা, মো. এরফানুল ইসলাম ইফতু।

প্যানেল ঘোষণা শেষে ২৯ দফা ইশতেহার দেন জিএস প্রার্থী শরণ এহসান। ইশতেহারে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো—শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা এবং উপস্থিতি নম্বর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে সীমিত রাখা। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে মৌলিক সংস্কার আনার জন্য ফলাফলনির্ভরতা কমিয়ে গবেষণা ও প্রকাশনাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলা হয়েছে; সেশনজট নিরসন ও শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে উইকেন্ড ও বাণিজ্যিক কোর্স বাতিলের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি বিভাগের ক্লাসরুম সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে; শিক্ষার্থীদের ফিল্ড ওয়ার্কের সম্পূর্ণ ব্যয় বিভাগীয় তহবিল থেকে বহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানোন্নয়ন পরীক্ষার প্রক্রিয়া সহজ করা, ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা দূর করা এবং সব পরীক্ষার ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়েছে; এ ছাড়া থিসিস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ফলাফলের কঠোর শর্ত শিথিল করা, সম্পূরক শিক্ষাবৃত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং প্রতিটি বিভাগে পর্যাপ্ত জেনারেল ল্যাব ও শিক্ষার্থীবান্ধব গবেষণা পরিবেশ তৈরির জন্য রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়োগের দাবি তোলা হয়েছে।

ইশতেহারে আরো বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তর ও স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর করা হবে; হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনে ভর্তুকি বাড়ানো এবং নারী শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি টিএসসি, মুক্তমঞ্চ ও অডিটোরিয়ামের অবকাঠামো সংস্কার, ক্যাম্পাসের ভরাট হয়ে যাওয়া লেক খনন ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য পুনরুদ্ধার, সব রাস্তা সংস্কার এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব ফুটপাত নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নারী হলে সান্ধ্য আইনকে কেন্দ্র করে হয়রানিসহ যেকোনো স্তরের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের চলাফেরা ও একাডেমিক সুবিধার্থে সংরক্ষিত কার্ট চালু, ব্রেইল ও শ্রুতিলেখক পদ্ধতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিবাহিত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অংশীজনদের জন্য কার্যকর ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উৎসবে ছুটি, ন্যায্য অধিকার আদায়ে সংহতি, এবং সকল ধর্মাবলম্বীর উপাসনালয় সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ভিপি প্রার্থী অমর্ত্য রায় বলেন, “সকল মতের পথের মানুষদেরকে নিয়ে আমরা জাকসু নির্বাচনে বেরিয়ে আসতে চাই। সেই বার্তা আপনারা ইতিমধ্যে পেয়েছেন। আমরা এমন একটি জাকসু চাই যার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্য বজায় থাকবে, শিক্ষকদের যে একচেটিয়া আধিপত্য সেখান থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এবং জাহাঙ্গীরনগরকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা প্রয়োজন আমরা সেগুলোকে আমাদের ইশতেহারে রাখার চেষ্টা করেছি।”

স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেল

অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুর রশিদ জিতু এবং ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শাকিল আলীর নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেল ঘোষণা করা হয়েছে। ২৯ আগস্ট রাতে বটতলায় জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের পিতা বুলবুল কবির এটি ঘোষণা করেন।

ভিপি পদে আব্দুর রশিদ জিতু, জিএস পদে মো. শাকিল আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) তৌহিদুল ইসলাম নিবিড় ভূঁঞা, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক হাসিবুল হাসান ইমন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক তুর্য কির্তনীয়া, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইফরাত আমিন অক্ষর, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. আনোয়ার হোসেন, নাট্য সম্পাদক মো. এরশাদ মিয়া, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) সৈয়দা আলভী খোরশেদ, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক সৌরভ কুমার বিশ্বাস, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক আইরিন সুলতানা আখি, সহ-সমাজসেবা (নারী) জান্নাতুল ফিরদাউস আনজুম, সহ-সমাজসেবা (পুরুষ) শরিফ মুহাম্মদ, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক মো. রায়হান, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক মো. শামীম। কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে তানজিদ বিশ্বাস রিচ, সুলতানুল মুল্ক শুভ, মোহাম্মদ মাহদী। প্যানেলে ক্রীড়া সম্পাদক পদ খালি রাখা হয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় মাহমুদুল হাসান কিরণের সম্মানে, যিনি স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন।

ভিপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু বলেন, “আমরা বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করবো, প্রশাসনকে চাপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করবো।”

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্যানেল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জাবি শাখার প্যানেল ঘোষণা নিয়ে উঠেছে তীব্র বিতর্ক এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ। ২৮ আগস্ট ‘অদম্য-২৪’ স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়া কর্তৃক ঘোষিত এই ২৫ সদস্যের প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে মো. শেখ সাদী হাসান এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে তানজিলা হোসাইন বৈশাখীকে মনোনীত করা হয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) আঞ্জুমান আরা ইকরা, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ইয়ামিন হাওলাদার, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক লিখন চন্দ্র রায়, সাংস্কৃতিক সম্পাদক জাহিদ হাসান খান, সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. আবিদুর রহমান, নাট্য সম্পাদক মো. পারভেজ হাসান নিশান, ক্রীড়া সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (পুরুষ) মো. জাবের হাসান, সহ-ক্রীড়া সম্পাদক (নারী) মো. তৌহিদুর রহমান খান, তথ্য-প্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক শাকিল সরদার, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক কাজী মৌসুমী আফরোজ, সহ-সমাজসেবা (নারী) উজ্জ্বল হাসান, সহ-সমাজসেবা (পুরুষ) রুহুল আমিন সুইট, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক মোস্তফা শাহানাজ পারভীন শানু, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক জাহিরুল ইসলাম, এবং কার্যকরী সদস্যদের মধ্যে মো. মোমিনুল ইসলাম সহ অন্যরা।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে মনোনীত হামিদুল্লাহ সালমান, যিনি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের সভাপতি। সালমান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামীম মোল্লা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে শামীম মোল্লাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, যার মধ্যে সালমানও রয়েছেন। তাকে ছয় মাসের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছিল, যা এখন শেষ হয়েছে। সালমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “এটি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা, তদন্ত চলছে এবং আমি নির্দোষ প্রমাণিত হবো।” জাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর সালমানের মনোনয়নের পক্ষে বলেছেন, “সালমান জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় ছিলেন এবং অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি।”

অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, লেজুড়বৃত্তি এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগে প্যানেলটি ছাত্রদলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয়দের অবহেলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, যেমন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া, যিনি জিএস পদে স্বতন্ত্র লড়ছেন। তিনি বলেন, “প্যানেল শিক্ষার্থীবান্ধব নয়, গ্রুপিংয়ে ব্যস্ত। নতুন রাজনীতি লেজুড়বৃত্তিমুক্ত হতে হবে।” ছাত্রদলের এক সদস্য বলেন, “প্যানেলে অজানা লোক রয়েছে, অনেক কর্মী হতাশ এবং ভোট দিতে অনিচ্ছুক।” বাবর অবশ্য বলেন, “যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়েছে, ৪৮% নারী ভোটার বিবেচনায় জিএস পদে নারী মনোনীত।” এই বিতর্ক প্যানেল ঘোষণাকে বিলম্বিত করেছে এবং ক্যাম্পাসে আলোচনা বাড়িয়েছে।

মেধাবী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ

জাকসু নির্বাচনে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নতুন আশা জাগিয়েছে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় ‘বি’ ইউনিটে মেয়েদের মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জনকারী কাজী মৌসুমী আফরোজ (অর্থনীতি বিভাগ) ছাত্রদল প্যানেল থেকে সহ-সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে লড়ছেন। একইভাবে, ‘ডি’ ইউনিটে ছেলেদের মেধাতালিকায় প্রথম ইয়ামিন হাওলাদার (বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ) শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কাজী মৌসুমী আফরোজ বলেন, “একজন নারী হিসেবে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হই, সেগুলো নিয়ে কাজ করবো। নারীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য কনসালটেন্সি, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়তে প্রয়াসী হবো।” ইয়ামিন হাওলাদার বলেন, “ছাত্রদল আমার মেধা ও যোগ্যতায় আস্থা রেখেছে। নির্বাচিত হলে আধুনিক, মুক্তচিন্তার ক্যাম্পাস গড়বো, গবেষণা সমস্যা সমাধান করবো এবং অটোমেশন ও ফলাফল পুনর্মূল্যায়ন চালু করবো।”

জাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, “মেধাবী এবং ভালো ফলাফলধারীদের গুরুত্ব দিয়েছি। বিভাগীয় পরিচিতি এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বিবেচনায় তাদের প্যানেলে রাখা হয়েছে।” এই অংশগ্রহণ মেধা-ভিত্তিক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিতর্কিত প্যানেলের মধ্যেও আশার আলো ছড়াচ্ছে। তবে, সার্বিকভাবে প্যানেলের বিতর্ক এই মেধাবীদের প্রচারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

বিদেশি শিক্ষার্থীর প্রথম অংশগ্রহণ

এবারের নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন নেপালি শিক্ষার্থী মো. আবিদ হুসাইন, যিনি স্বতন্ত্রভাবে সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক পদে লড়ছেন। ফার্মেসি বিভাগের এই শিক্ষার্থী নেপালের বারা জেলার বাসিন্দা। তিনি বলেন, “দক্ষতা উন্নয়ন (আইএলটিএস, জিআরই), রক্তদান ডিজিটালাইজেশন এবং ক্যাম্পাস নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত নয়, দক্ষ মানবসম্পদ গড়বে।”

এটি প্রথমবার কোনো বিদেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ। সম্প্রীতির ঐক্যের আবরার হক বিন সাজেদ বলেন, “এটি জাবির বৈশ্বিকতার প্রমাণ, আমরা স্বাগত জানাই।” নির্বাচন কমিশনের অধ্যাপক খো. লুৎফুল এলাহী বলেন, “আবিদ আমাদের ছাত্র, বিদেশি নয়।” নেপালি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও তার এই অংশগ্রহণে গর্বিত এবং শুভকামনা জানিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে ১০ জন (সব পুরুষ), সাধারণ সম্পাদক পদে ৯ জন (২ নারী), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) ৬ জন, (পুরুষ) ১০ জন এবং অন্যান্য পদে বিভিন্ন সংখ্যায় প্রার্থী রয়েছে। ক্যাম্পাসে ৪৮ শতাংশ নারী ভোটার বিবেচনায় নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। তবে বিতর্ক, স্বতন্ত্র প্রার্থিতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এই নির্বাচন শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতির নয়, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের ভবিষ্যতের দর্পণ। তাই, জুলাই অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক চর্চা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকতা এখানে পরীক্ষিত হবে বলে আশাবাদী শিক্ষার্থীরা।

back to top