আরাকান আর্মি -এএফপি
মায়ানমারের কৌশলগত পশ্চিমাঞ্চলের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কাছাকাছি রয়েছে সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ)। এতে এ অঞ্চলের রাখাইন রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ একমুহূর্তের মধ্যে রয়েছে। আরাকান আর্মির এই অগ্রগতি মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সংজ্ঞা বদলে দিতে পারে। মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার যখন দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বেদখল হওয়া ভূখণ্ড নতুন করে উদ্ধার করছে, তখন রাখাইনের ১৭টির মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আরাকান আর্মির হাতে। এই রাজ্যটি মিয়ানমারের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। বাংলাদেশের সঙ্গে রাজ্যটির সীমানা রয়েছে।
সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয়ের পর এখন রাখাইনের বাকি এলাকাগুলো দখলের বিষয়ে এককাট্টা আরাকান আর্মি। এই বাকি এলাকাগুলোর মধ্যে রাজ্যটির রাজধানী সিত্তে, ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর প্রকল্প, জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের শহর কিয়াউকফিউ এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আরাকান আর্মির সামনে রাখাইন রাজ্যের বাকি এলাকাগুলো দখলের সুযোগ রয়েছে। তবে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির লড়াইয়ের জেরে গভীর একটি মানবিক সংকট সামনে আসছে। রাখাইনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এরই মধ্যে আবার রাখাইনে বিভিন্ন সরঞ্জামের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এতে ঐতিহাসিকভাবে আরাকান নামে পরিচিত অঞ্চলটিতে সংকট আরও গভীর হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, সেখানে ২০ লাখের বেশি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছিল, রাখাইনের মধ্যাঞ্চলে ৫৭ শতাংশের বেশি পরিবার ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারছে না। গত ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৩৩ শতাংশ।
রাখাইনে আরাকান আর্মি যখন অগ্রগতি পাচ্ছে, তখন সেখানে আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে সামরিক সরকার। ২০২১ সালে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এই কৌশল কাজে লাগানো হচ্ছে।আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের (ইউএলএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত আকাশপথে সামরিক বাহিনীর হামলায় ৪০২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৬টি শিশু রয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছর স্থলমাইন, গোলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে আরও ২৬ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইউএলএর একজন মুখপাত্র আল–জাজিরাকে বলেন, বেসামরিক লোকজনের ওপর আকাশ পথে হামলা বাস্তবিক অর্থে সামরিক সাফল্য আনে না। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর থেকে যে দেশে ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে এ ধরনের কৌশল ‘সন্ত্রাসবাদ’। চলমান তীব্র সংঘাতের মধ্যে আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের সামরিক সরকার—দুই পক্ষই নিজেদের শক্তি বাড়াতে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ চালু করেছে। গত মে মাস থেকে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী নারীদের নিজেদের দলে যুক্ত করছে আরাকান আর্মি। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করছে তারা। অন্যদিকে সেনাবাহিনী নিজেদের ১৬ মাসের অভিযানে আনুমানিক ৭০ হাজার নতুন সদস্য বাহিনীতে যুক্ত করেছে।
রাখাইনে ভারতেরও স্বার্থ রয়েছে। এই স্বার্থ কালাদান পরিবহন প্রকল্প। এই প্রকল্প বাংলাদেশকে এড়িয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের একটি বিকল্প বাণিজ্য পথ তৈরির সুযোগ করে দেবে। জাতিগত সহিংসতার কারণেও বিপর্যস্ত হয়েছে রাখাইন। এই সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের সময়। ওই সময়ে ৭ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেই সময়ের নৃশংস ঘটনাগুলো এখন সন্দেহভাজন গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারাধীন।
মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমানা এলাকার শরণার্থী শিবিরগুলোয় এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত ১৮ মাসে নতুন করে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।রাখাইনের রাজধানী সিত্তের দক্ষিণে কিয়াউকফিউকে কেন্দ্র করে একটি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এই এলাকাটি জ্বালানি তেল-গ্যাসের পাইপলাইন এবং একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে মিয়ানমারকে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই প্রকল্পটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ।
ব্যাংককভিত্তিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রকাশনা জেনেসের বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের ধারণা, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে বর্ষার সময় হামলা শুরু করতে পারে আরাকান আর্মি। এ সময় মেঘলা আকাশের কারণে সেনাবাহিনী যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে পারবে না। এতে করে আরাকন আর্মির কিয়াকফিউ দখলের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যদি আরাকান আর্মি রাখাইনের উপকূলীয় বন্দরগুলোর দখল নিতে সফল হয়, তাহলে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি চীন ও ভারত—দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও বাণিজ্য পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
আরাকান আর্মি -এএফপি
শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫
মায়ানমারের কৌশলগত পশ্চিমাঞ্চলের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কাছাকাছি রয়েছে সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ)। এতে এ অঞ্চলের রাখাইন রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ একমুহূর্তের মধ্যে রয়েছে। আরাকান আর্মির এই অগ্রগতি মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সংজ্ঞা বদলে দিতে পারে। মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার যখন দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বেদখল হওয়া ভূখণ্ড নতুন করে উদ্ধার করছে, তখন রাখাইনের ১৭টির মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আরাকান আর্মির হাতে। এই রাজ্যটি মিয়ানমারের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। বাংলাদেশের সঙ্গে রাজ্যটির সীমানা রয়েছে।
সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয়ের পর এখন রাখাইনের বাকি এলাকাগুলো দখলের বিষয়ে এককাট্টা আরাকান আর্মি। এই বাকি এলাকাগুলোর মধ্যে রাজ্যটির রাজধানী সিত্তে, ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর প্রকল্প, জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের শহর কিয়াউকফিউ এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি গভীর সমুদ্রবন্দর রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আরাকান আর্মির সামনে রাখাইন রাজ্যের বাকি এলাকাগুলো দখলের সুযোগ রয়েছে। তবে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির লড়াইয়ের জেরে গভীর একটি মানবিক সংকট সামনে আসছে। রাখাইনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এরই মধ্যে আবার রাখাইনে বিভিন্ন সরঞ্জামের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এতে ঐতিহাসিকভাবে আরাকান নামে পরিচিত অঞ্চলটিতে সংকট আরও গভীর হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, সেখানে ২০ লাখের বেশি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। চলতি মাসের শুরুতে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছিল, রাখাইনের মধ্যাঞ্চলে ৫৭ শতাংশের বেশি পরিবার ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারছে না। গত ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৩৩ শতাংশ।
রাখাইনে আরাকান আর্মি যখন অগ্রগতি পাচ্ছে, তখন সেখানে আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে সামরিক সরকার। ২০২১ সালে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এই কৌশল কাজে লাগানো হচ্ছে।আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকানের (ইউএলএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত আকাশপথে সামরিক বাহিনীর হামলায় ৪০২ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৬টি শিশু রয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছর স্থলমাইন, গোলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে আরও ২৬ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইউএলএর একজন মুখপাত্র আল–জাজিরাকে বলেন, বেসামরিক লোকজনের ওপর আকাশ পথে হামলা বাস্তবিক অর্থে সামরিক সাফল্য আনে না। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর থেকে যে দেশে ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, সেখানে এ ধরনের কৌশল ‘সন্ত্রাসবাদ’। চলমান তীব্র সংঘাতের মধ্যে আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের সামরিক সরকার—দুই পক্ষই নিজেদের শক্তি বাড়াতে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ চালু করেছে। গত মে মাস থেকে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী নারীদের নিজেদের দলে যুক্ত করছে আরাকান আর্মি। নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করছে তারা। অন্যদিকে সেনাবাহিনী নিজেদের ১৬ মাসের অভিযানে আনুমানিক ৭০ হাজার নতুন সদস্য বাহিনীতে যুক্ত করেছে।
রাখাইনে ভারতেরও স্বার্থ রয়েছে। এই স্বার্থ কালাদান পরিবহন প্রকল্প। এই প্রকল্প বাংলাদেশকে এড়িয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের একটি বিকল্প বাণিজ্য পথ তৈরির সুযোগ করে দেবে। জাতিগত সহিংসতার কারণেও বিপর্যস্ত হয়েছে রাখাইন। এই সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের সময়। ওই সময়ে ৭ লাখ ৩০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। সেই সময়ের নৃশংস ঘটনাগুলো এখন সন্দেহভাজন গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারাধীন।
মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমানা এলাকার শরণার্থী শিবিরগুলোয় এখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত ১৮ মাসে নতুন করে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।রাখাইনের রাজধানী সিত্তের দক্ষিণে কিয়াউকফিউকে কেন্দ্র করে একটি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এই এলাকাটি জ্বালানি তেল-গ্যাসের পাইপলাইন এবং একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে মিয়ানমারকে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই প্রকল্পটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ।
ব্যাংককভিত্তিক প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রকাশনা জেনেসের বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের ধারণা, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে বর্ষার সময় হামলা শুরু করতে পারে আরাকান আর্মি। এ সময় মেঘলা আকাশের কারণে সেনাবাহিনী যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে পারবে না। এতে করে আরাকন আর্মির কিয়াকফিউ দখলের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যদি আরাকান আর্মি রাখাইনের উপকূলীয় বন্দরগুলোর দখল নিতে সফল হয়, তাহলে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি চীন ও ভারত—দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও বাণিজ্য পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।