alt

আন্তর্জাতিক

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

জন ওয়্যার

: বুধবার, ০৯ জুন ২০২১

http://sangbad.net.bd/images/2021/June/09Jun21/news/diana-1.jpg

বিবিসির জনপ্রিয় অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরমায় প্রিন্সেস ডায়ানার সাক্ষাৎকার দেয়ার একটি মুহূর্ত

বিবিসির জনপ্রিয় অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরমায় প্রিন্সেস ডায়ানার একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। সেখানে তিনি ব্যক্তি ও দাম্পত্য জীবন এবং রাজপরিবার নিয়ে অকপটে অনেক কথাই বলেছিলেন। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন বিবিসির সাংবাদিক মার্টিন বশির। প্রিন্সেস ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেনসার তখন বলেছিলেন, সাংবাদিক বশির কিছু জাল দলিলপত্র দেখিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। বশিরের ‘প্রতারণামূলক’ কৌশলের ঘটনা বিবিসি ধামাচাপা দিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। সাবেক বিচারপতি লর্ড ডাইসনকে দিয়ে বিবিসি সম্প্রতি একটি তদন্ত করায়। সেই তদন্তের পর বশিরকে ‘অনির্ভরযোগ্য’, ‘প্রতারণাপূর্ণ’ ও ‘অসৎ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এরপর ২৫ বছর আগের সেই সাক্ষাৎকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিবিসি কি সে সময় তাদের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী চলতে পেরেছিল? এ নিয়ে লিখেছেন বিবিসির প্রতিবেদক জন ওয়্যার। সংবাদ-এর পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রকাশ করা হলো।

২৫ বছর আগে বিবিসি প্যানারোমা প্রিন্সেস ডায়ানার একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করে। সেসময় বিশ্বের যে কোন গণমাধ্যমের জন্যই সেটি ছিল এক ঈর্ষণীয় ব্যাপার। অনুষ্ঠানটি ২ কোটি ৩০ লাখের মানুষ টিভিতে দেখেছে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী মার্টিন বশিরের জীবনেও সাংবাদিক হিসেবে তা ছিল এক অনন্য অর্জন।

কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে সেই অনুষ্ঠান নিয়ে অভূতপূর্ব অভিযোগ জানান তার ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম। তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য ডায়ানাকে ভুল বুঝিয়েছিলেন এমন অভিযোগ আসার পর সাবেক বিচারপতি লর্ড ডাইসনকে দিয়ে একটি তদন্ত করায় বিবিসি। ডাইসন সেই তদন্তের পর বশিরকে ‘অনির্ভরযোগ্য’, ‘প্রতারণাপূর্ণ’ ও ‘অসৎ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

সাক্ষাৎকারটি প্রচারের অব্যবহিত পরেও একটি তদন্ত করেছিল বিবিসি। টনি হল, যিনি পরে বিবিসির ডিরেক্টর জেনারেল হয়েছিলেন, তদন্তটা করেছিলেন। কিন্তু তার মনে হয়েছিল, বশির ‘সৎ’। আর হলের সেই তদন্তকে এখন ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অকার্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন ডাইসন।

এসব সত্ত্বেও ২৫ বছর আগে কী ঘটেছিল তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিংশ শতকের অন্যতম স্মরণীয় টিভি অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত সেই সাক্ষাৎকারে ডায়ানা তার স্বামীর বিবাহবহির্ভূত প্রেম, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, তার [ডায়ানার নিজের] মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে কথা বলেন। একই সঙ্গে চার্লস যে রাজার দায়িত্ব পালনে অযোগ্য সে কথাও বলেন। এ সময় যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজা প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে বিচ্ছেদপূর্ব পৃথক বাসে ছিলেন তিনি।

ওই সাক্ষাৎকারের ডায়ানাকে বশির প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কি সত্যি মনে করেন আপনার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে? ডায়ানা তার সদর্থক উত্তর দিয়েছিলেন।

কিন্তু এখন যে অভিযোগটি উঠেছে সেটা হচ্ছে, আসলে বশিরই সাক্ষাৎকার দেয়ার আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে ডায়ানার মাথায় ষড়যন্ত্রের ধারণাটা ঢুকিয়েছিলেন। বশিরই তাকে বলেছিলেন কীভাবে সাংবাদিক ও রাজপ্রাসাদের মানুষজন, গোয়েন্দা এমনকি তার বন্ধুরাও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর সাক্ষাৎকারটি প্রচারের সময়ই এসব কথা শোনা গিয়েছিল। বশির নাকি এই সাক্ষাৎকারের জন্য কিছু চালাকির আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তখন, তদন্ত করেও এর চেয়ে বেশি কিছু জানা যায়নি।

কিন্তু সেই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে অভিযোগগুলো সামনে আসতে থাকে গত বছরের শেষ দিকে। তার সেই সাক্ষাৎকারের ২৫ বছর পূর্তির সময়ে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এবার ডাইসনকে দিয়ে তদন্ত করায় বিবিসি। এই তদন্তে ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেন্সারসহ যাদের সঙ্গেই ডাইসন কথা বলেছেন তাদের সবার কাছেই ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চায় বিবিসি। তাদের কাছ থেকে পাওয়া এমন কিছু তথ্য প্রতিষ্ঠানটি আইটিভি ও চ্যানেল ফোরকে দেয় যা সাংবাদিকেরা এত বছর ধরে খুঁজছিল।

এবার লর্ড ডাইসনের মতো বিবিসিও তাদের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ঘেঁটে বলছে বশির যে শুধু ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা বলে গেছে তা-ই নয়, সাংবাদিকের নৈতিকতা ও বিবিসির নিয়মেরও মারাত্মক লঙ্ঘন করেছে।

ডাইসন বলছেন এগুলো যে বশির ঝোঁকের বশে করেছেন তা নয়, বরং আগে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা অনুসারেই করেছেন। খুবই সতর্কভাবে সেই পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আর্ল স্পেন্সারের সঙ্গে বশিরের যোগাযোগ

বশিরের পরিকল্পনার মধ্যে প্রথমে ছিল ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেন্সারকে বিশ্বাস করানো যে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, যা তিনি চার্লস ও ডায়ানার কাছের মানুষদের কাছ থেকে এবং উচ্চপর্যায়ের লোকজনের কাছ থেকে জেনেছেন।

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট স্পেন্সারের সহকারীকে ফোন করে বশির বলেন কোন সাক্ষাৎকার বা তথ্য নয়, শুধু ১৫ মিনিটের জন্য স্পেন্সারের সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি। এরপর তিনি তাদের একটি চিঠি পাঠান। এতে তিনি লেখেন গত তিন মাস ধরে তিনি গণমাধ্যমের আচরণ লক্ষ করছেন এবং অনুসন্ধানে স্পেন্সারের পরিবারের ব্যাপারে তাদের অতি আগ্রহের বিষয়ে অনেক কিছুই জানতে পেরেছেন। যদিও এই তিন মাস বশির আসলে প্যানারোমার অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।

বশিরের ভাবখানা এমন ছিল যে তিনি নিজেও সংবাদামাধ্যমের বিরুদ্ধে লড়ছেন। যদিবা স্পেন্সারেরা তার প্রস্তাব লুফৈ নেয় সেই হিসেব থেকেই তিনি তাদের বলেন যে তার কাছে এমন কিছু তথ্য আছে যেগুলোর বিষয়ে তারা আগ্রহী হতে পারেন। চিঠির কোন উত্তর না পেয়ে বশির আবার তাদের ২৯ আগস্ট কল করেন। তখন ডায়ানার ভাই তাকে বলেন ৬টার সময় তাদের দেখা হতে পারে।

স্পেন্সারের কাছ থেকে হঠাৎ করে এমন সাড়া পাওয়ায় নিশ্চয়ই অবাক হয়েছিলেন বশির। ডায়ানার সঙ্গে দেখার করার সুযোগ পেতে স্পেন্সারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেই কিনা বশির বানিয়ে বানিয়ে বলেন, আপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীর সাবেক প্রধান সাবেক সেনাসদস্য অ্যালান ওয়ালারকে ধনকুবের রুপার্ড মারডকের নিউজ ইন্টারন্যাশনাল এবং গোয়ন্দাসংস্থাগুলো নিয়মিত পয়সা দিচ্ছে আপনাদের পরিবারের তথ্য দেয়ার জন্য। এ বিষয়ে স্পেন্সারকে প্রমাণাদি দেখানোর কথাও বলেন বশির। ওই মিটিংয়ে দেখাতে পারেননি, কারণ তখনো তা তৈরি হয়নি।

সেই তথ্য প্রমাণ ঠিক কবে বশির তৈরি করেছিলেন তা নিশ্চিত হতে পারেননি ডাইসন। তবে বিবিসির নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে স্পেন্সারের সঙ্গে সাক্ষাতের পরপরই বশির তৈরি করেছিলেন সেই তথ্যপ্রমাণ। সেই সাক্ষাতে স্পেন্সার সম্মত হন আলাপ চলতে পারে। তাদের পরবর্তী সাক্ষাতের তারিখ ধার্য হয় আলথর্পে। দুদিন পরে, অর্থাৎ ৩১ আগস্ট সাড়ে ১১টায়।

ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট

সেই তথ্যপ্রমাণের জন্য মার্টিন বশির যোগাযোগ করেন তার এক সাবেক সহকর্মী ম্যাট উইসলারেরর সঙ্গে। উইসলারকে বশির বলেন, হাতে যা কাজকর্ম আছে তা রেখে দিতে। কেননা তার কাজটা করতে হবে আগে। হাতে সময় নেই। তবে বশির তাকে এ বিষয়ে প্রথম কবে ফোন দিয়েছিলেন তা মনে করতে পারেননি। শুধু বলেছেন, সময়টা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হবে।

উইসলারের ব্যবসায়িক অংশীদার বিবিসিকে জানান এটা নটিং হিলস কার্নিভালের কাছাকাছি সময় হবে। ওই কার্নিভাল শেষ হয় ২৮ তারিখে।

তিনি জানান বশির কাজটির জন্য প্রথম তার সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু এক রাতের মধ্যেই করতে হবে বলে রাজি হননি উইলারের ওই ব্যবসায়িক অংশীদার। তিনিই বশিরকে উইসলারের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেন।

উইসলার ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার দুজনেই পরিষ্কারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কল করেন বশির। যেহেতু স্পেন্সারের ডায়েরিতে উল্লেখ আছে, বশিরের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল ২৯ তারিখ সন্ধ্যায়। তার মানে হচ্ছে স্পেন্সারের সঙ্গে সেই সাক্ষাতের পরপরই বশির তাদের কল করেনে।

উইসলার বলেন, বশির তার ফ্ল্যাটে আসেন। বলেন, অ্যালান ওয়ালারের দুটো ব্যাংক স্টেটমেন্ট তিনি দেখেছেন একটা ৮ মার্চের - চার হাজার পাউন্ড, নিউজ ইন্টারন্যাশনাল থেকে পাওয়া। আরেকটা ৬৫০০ পাউন্ডের, জার্সিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেনফোল্ডস কনসাল্টেন্ট দিয়েছে।

উইসলারকে বশির বলেননি যে তিনি প্রিন্সেস ডায়ানাকে নিয়ে কোন কাজ করছেন। শুধু বলেছেন তিনি যা করতে যাচ্ছেন তা অনেক বড় ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ডিজাইনার উইসলার তখন ধরেই নিয়েছিলেন বশির হয়তো ওয়ালারের সত্যিকারের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখেছেন। বশিরকে উইসলার বলেন, কাজটি করতে তার পুরো রাত লেগে যাবে। উইসলার বিবিসিকে বলেন বশির তাকে বলেন পরের দিন বিমানে করে তিনি এক জায়গায় যাবেন। তাই উইসলার যেন গ্রাফিক্সের কাজটি করে সকালে ৭টার দিকে মধ্যে তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। অনুমান করা যায় বশির এগুলো আলথর্পে স্পেনসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার আগেই হাতে পেতে চান। সেই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে স্পেন্সারের নোটে লেখা আছে, বশির তাকে ওয়ালারের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখান যেখানে ওই দুটি লেনদেনের উল্লেখ আছে। স্পেন্সারকে বশির বলেন পেনফোল্ডসকে সামনে রেখে কাজ করে গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ।

তবে বশিরকে স্পেন্সার বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন চার্লসের ব্যক্তিগত সহকারী কমান্ডার রিচার্ড আয়লার্ড ডায়ানার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন এটা শোনার পর। স্পেনসারের নোটে টুকে রাখা আছে, বশির তাকে বলেছেন আয়লার্ড তাদের কথাবার্তা গোপনে হস্তান্তর করেছেন। তিনি সাংবাদিক জনাথন ডিম্বেলেলেকে বলেছেন, আমরা চার্লস-ডায়ানার ব্যাপারটা একদম শেষ করতে চলেছি। এস্পার-ওস্পার কিছু একটা হবে।

তবে বশিরের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো অন্যরকম ঠেকে স্পেন্সারের কাছে। সেজন্যই পরে তিনি প্যানারোমার স্টিভ হিউলেটের সঙ্গে যোগযোগ করেন। তাকে জিজ্ঞেস করেন বশিরকে বিশ্বাস করা যায় কিনা। তখন হিউলেট তাকে জানান বশির প্যানারোমার ‘অন্যতম সেরা’ কর্মী।

ডায়ানার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো বশিরকে

১৪ সেপ্টেম্বর বশির এবং স্পেন্সারের দেখা হলো আলথর্পে। তখন বশির একে একে সব অভিযোগ তুলে ধরলেন। যেমন, ডায়ানার ব্যক্তিগত সহকারী প্যাট্রিক জেফসনের সঙ্গে আয়লার্ডের যোগসাজশ। ডায়ানার গতিবিধির ওপর নজরদারি রাখার জন্য আয়লার্ড ও জেফসন যে গোয়েন্দাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তার প্রমাণ হিসেবে এফোর সাইজের কাগজের নথি বের করে দেখালেন বশির।

তবে ডাইসনের কাছে এসব কাগজ দেখানোর কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন বশির। তবে বশিরের সঙ্গে সাক্ষাতে স্পেন্সার যে নোট নেন, সেখানে কিন্তু ঠিকই লেখা আছে বশির তাকে বলছেন প্যাট্রিক জেফসন আয়লার্ডের ভালো বন্ধু, তাদের মধ্যে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল ইত্যাদি। ডায়ানা তার স্বামীর পক্ষের লোকজনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যেসব ভীতির কথা বলতেন, তার সঙ্গে তাদেরকে বশিরের কাছ থেকে স্পেন্সার যেসব কথা শুনেছেন বলে দাবি করছেন তার সঙ্গে মিলে যায়।

বশিরের কাছ থেকে যেসব ষড়যন্ত্রের কথা শুনছিলেন তা নিয়ে কোনো কিছু ভাবতে পারছিলেন না ধারণাই করতে পারছিল না স্পেন্সার। তার কাছে মনে হলো তার বোনেরই বরং সরাসরি এগুলো শোনা উচিত বশিরের কাছ থেকে। তাই টেলিফোন করে ডায়ানাকে বশিরের সঙ্গে বসার পরামর্শ দিলেন তিনি। পরে ডায়ানা তার ভাইকে একটি চিরকূটে লিখে পাঠান, প্রিয় কার্লোস (ঘরে এই নামেই ডাকা হয় আর্ল স্পেন্সারকে), আজ সকালে তুমি ফোনে আমাকে যে বিষয়গুলো বললে, সেগেুলো আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমার চারপাশে এগুলোই হচ্ছে। তারা স্পেন্সারদের দুর্বল ভেবেছে। অনেক স্নেহ রইল।

স্পেন্সার বিবিসিকে বলেন, সে বছর ডায়ানার মধ্যে এই ভয় ভর করে যে উচু পর্যায়ে তার শত্রু আছে। তাই তিনি খুব বিপন্ন আর অস্থির বোধ করতেন সে সময়। কেন এসব হচ্ছে সে সময় তিনি তা বুঝতে চাইছিলেন।

১৯ সেপ্টেম্বর, ডায়ানার সঙ্গে বশিরকে পরিচয় করিয়ে দেন স্পেন্সার। সেই বৈঠকে বশিরের ৩০টির মতো অভিযোগ তুলে ধরেন স্পেন্সার। যার মধ্যে জেফসনও যে ষড়যন্ত্রের অংশ- তাও তুলে ধরেন তিনি।

স্পেন্সার বিবিসিকে জানান সেই বৈঠকের শেষে তার খুব সন্দেহ ঠেকছিল। বৈঠকের পর ডায়ানাকে তিনি সে কথা বলেওছিলেন যে, গল্পগুলো ঠিক মেলানো যাচ্ছে না।

তবে বশির কিন্তু বলছেন, যেসব কথা তখন হয়েছিল বলে এখন বলা হচ্ছে তার অধিকাংশই এসেছিল ডায়ানার কাছ থেকে। তবু ডাইসনের কাছে মনে হয়েছে, ডায়ানা নয়, সিংহভাগই বশিরের কথা।

মার্টিন বশিরের বক্তব্য একদম ভিন্ন। লর্ড ডাইসন তার সম্পর্কে মতামত দেয়ার পরও। বশির তার অবস্থানেই অটল রয়েছেন।

ডায়ানার সঙ্গে এরপর তার অনেক বৈঠক হয়েছে বশিরের। ১৯৯৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ডায়ানা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। তবে সে বছর নভেম্বরের ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত ওই সাক্ষাৎকারের আগে তার সঙ্গে তার যে বন্ধুদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, তারা এ বিষয়ে ডায়ানার মধ্য অনেক পরিবর্তন দেখেছিলেন। জেফসন বলেন, মার্টিন বশিরের জায়গা থেকে আমি ছিলাম বড় বাধা। কারণ আমি থাকলে ডায়ানাকে সাক্ষাৎকার না দেয়ার পরামর্শ দিতাম।

http://sangbad.net.bd/images/2021/June/09Jun21/news/diana-3.jpg

ডায়ানার বন্ধু রোজা মঙ্কটন লিখেছেন, সবাই জানতো কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু আমরা কেউ ভুলটা দেখিয়ে দিতে পারিনি।

ডায়ানা অক্টোবরের ৩০ তারিখে বশিরকে সাক্ষাৎকার দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেন তার আইনজীবী লর্ড মিশকনের সঙ্গে কথা বলে। তার কাছে ডায়ানা তার বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে সন্দেহ করেন তার একটা বিবরণ দেন।

ডায়ানাকে যখন এসব তথ্যের উৎস সম্পর্কে তার আইনজীবী জিজ্ঞেস করেন, ডায়ানা তখন তার তথ্যদাতা বেশ নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। সূত্র জিসিএইচকিউর, বলেন ডায়ানা।

তবে ডায়ানার বিরুদ্ধে যখন গোয়েন্দারা লেগেছিল তখন তাদের কারো কারো সঙ্গে বশিরের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন বশির নিজেই। তবে এটাও ঠিক গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত কোন কর্মকর্তার এভাবে কারোর ফোনে আড়িপাতার তথ্য কোন সাংবাদিককে দেয়ার কথা না।

তবে বিবিসির মধ্যে যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে, বা বিচারপতি ডাইসনের কাছেও যেটি একটি প্রশ্ন, সেটি হচ্ছে, বশিরের অভিসন্ধি বা এসব তৎপরতা কীভাবে সেই সময়কার বিবিসির কর্তাব্যক্তিদের চোখ এড়ালো। বিশেষ করে, যখন কোন কিছু সন্দেহ হবে তা তলিয়ে দেখাই বিবিসির ঘোষিত নীতি।

১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরেই বিবিসির বোঝার কথা যে, কিছু একটা হয়েছে। অর্থাৎ সাক্ষাৎকারটি প্রচারের এক মাসের মাথায়। যখন ডিজাইনার উইসলার বিবিসির কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের টিম গার্ডাম ও টিম সুটারকে জানিয়েছিলেন যে তাকে দিয়ে বশির একটা ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট বানিয়ে নিয়েছে। সাক্ষাৎকারটি প্রচারের পরই তিনি বুঝতে পেরেছেন সেটা কী কাজে করানো হয়েছিল। বিবিসির এই দুজনকে উইসলার জানান এর আগে প্যানারোমার এডিটর স্টিভ হিউলেটকে তিনি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাকে বলেছেন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। হিউলেট ২০১৭ সালে মারা যান ক্যান্সারে। তিনি বেঁচে তাকলে হয়তো লর্ড ডাইসন তাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন বশিরকে এ প্রক্রিয়ায় তিনি কোন ধরনের সহায়তা করেছিলেন কিনা। কেননা হিউলেট কেন ভুয়া আর্থিক লেনদেনের কাগজপত্র তৈরির কথা জানার পরও কর্তৃপক্ষকে জানালেন না?

প্রমাণ রয়েছে হিউলেট প্রথম ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টের কথা জানতে পারে উইসলার ফ্যাক্সের মাধ্যমে প্যানারোমা প্রযোজক মার্ক কিলিককে বিষয়টি জানানোর পর। উইসলার এর আগে কিলিকের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিলিক পেনফোল্ডস কনসালটেন্ট নাম দেখেই চিনতে পারেন। কেননা এর আগে প্যানারোমার দুটো পর্বে এই প্রতিষ্ঠিানটির নাম আসে। ওই দুটো পর্ব ছিল যুক্তরাজ্যের সাবেক ফুটবল ম্যানেজার টেরি ভেনাবেলসের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড নিয়ে। কিলিক তখন ধন্ধে পড়ে যান পেনফোল্ডস কেন আর্ল স্পেনসারের সহকারীকে টাকা দিতে যাবে।

কিলিকের সঙ্গে বশিরের এই নিয়ে পরে তর্কাতর্কি হয় বিবিসির ক্যান্টিনে। সংক্ষিপ্ত ও তিক্ত সেই আলাপে কিলিককে বশির জানিয়ে দেন এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই তার।

এরপর কিলিক তার দুই সহকর্মী প্যানারোমার সাবেক ডেপুটি এডিটর হ্যারি ডীন এবং রিপোর্টার টম ম্যানগোল্ডকে নিয়ে হিউলেটের সঙ্গে দেখা করতে যান। এই তিনজনেরই মনে আছে, সেই সময় তাদের এডিটর তাদের বলে দেন যে এটা তাদের ভাবার বিষয় না। ডীন তাকে জিজ্ঞেস করেন তিনি ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলোর কথা জানেন কিনা। উত্তরে হিউলেট তাদের বলেন তা তার মনে পড়ছে না। তবে সেখান থেকে চলে আসার আগে হিউলেটকে স্পেন্সারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন কিলিক। স্পেন্সার হিউলেটকে কল করেছিলেন। কিন্তু হিউলেট বা বিবিসির অন্য কেউই বিষয়টি আর খতিয়ে দেখেননি। বিবিসির এই ব্যর্থতাটাকেই বড় করে দেখছেন লর্ড ডাইসন।

লর্ড ডাইসন বলছেন, পুরো চিত্রটা অনেকাংশেই বদলে যেতো যদি তাদের কেউ আর্ল স্পেনসারের সঙ্গে একটু কথা বলার প্রয়োজন মনে করতেন।

ডীনের মনে পড়ে হিউলেট পরে তাকে বলেছিলেন ওই ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানোর তথ্যগুলো সঠিক ছিল। তিনি ডীনকে বলেন ব্যাংক স্টেটমেন্টে যেসব নাম এসেছে সেগুলো এক ধরনের কাকতাল। আর এই কথাটিই, ধারণা করা হচ্ছে বশিরের বানানো।

বশিরের বারবার অবস্থান বদল

বিবিসি প্যানারোমার সাবেক প্রডিউসার পিটার মলয় স্মরণ করেন প্যানারোমার ক্রিসমাস পার্টিতে উইসলার খুবই কাঁপছিলেন। তিনি বিবিসিকে জানান তার বাসায় কেউ একজন ঢুকেছিল এবং ভূয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টের গ্রাফিক্সটি যে ডিস্কে ছিল তা পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আরেকটা বিষয় পরিস্কার হয় হিউলেট আগে এ বিষয়ে তার লাইন ম্যানেজার টিম গারডামকে কিছুই জানাননি। তাদের সহকর্মী টিম সুটার ২০০১ সালে বলেন, গারডাম এ নিয়ে রাগলেও দায়িত্বশীল আচরণ করে গেছেন। হিউলেট তাদের বলেছিলেন, ডায়ানার সাক্ষাৎকার নিয়ৈ কোনো অনিয়ম হয়নি।

এরপর বশিরের সঙ্গে কথা বলেন গারডাম, হিউলেট ও সুটার। বশির তাদের আশ্বস্ত করেন ওই ব্যাংক স্টেটমেন্ট ডায়ানা বা অন্য কাউকে দেখানো হয়নি। তিনি বলেন, এগুলো দিয়ে ডায়ানাকে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি করানো যেতো না। বরং এসব তথ্য স্বয়ং ডায়ানাই দিয়েছিলেন, বলেন বশির।

বশিরের সঙ্গে ওই মিটিং সম্পর্কে গারডামের নোটে দেখা যায়, গারডাম খুবই বিভ্রান্ত হন কেন তাহলে বশির সেগুলো বানানোর ঝামেলাতে গেলেন তা ভেবে। তারা বশিরের কাছে জানতে চান তিনি এ বিষয়ে ডায়ানার কাছ থেকে একটা লিখিত এনে দিতে পারবেন কিনা। পরের দিন বশির ডায়ানার কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে আসেন বশির, যেটিতে লেখা ছিল, আমি নিশ্চিত করছি, সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আমার ওপর কোনো চাপ ছিল না। আমাকে বশিরের পক্ষ থেকে এমন কোনো ডকুমেন্ট দেখানো হয়নি যা আমি আগে দেখিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট এবং আমি এর পক্ষে আছি।

ডায়ানার এই চিঠির কারণে বিবিসি কর্তৃপক্ষের সন্দেহ স্তিমিত হয়। সাড়া জাগানো সেই অনুষ্ঠান নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে শুরু করে তারা। কিন্তু তারপরও সেখানে মার্টিন বশির যে মিথ্যা বলে থাকতে পারেন তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

গারডামকে বশির বলেছিলেন যে তার সঙ্গে ডায়ানার প্রথম সাক্ষাৎ হয় সেপ্টেম্বরেরর শেষ দিকে। টনি হলের কাছে যে ঘটনার যে বিবরণী দেওয়া হয়েছিল তাতে এটা আছে। কিন্তু গারডামকে তো ম্যাট উইসলার বলেছিলেন, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট তিনি বানিয়েছিলেন আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে। মানে তারও তিন সপ্তাহ আগে।

যদিও বশির তাদের ঘ্টনার তারিখগুলো দিয়েছে, তবুও হিউলেট বা বিবিসি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লক্ষ্য করেননি ডায়ানার কাছ থেকে বশিরের তথ্যগুলো জানার কথা না। কেননা আগে তাদের তাদের দেখাই হয়নি। এমনকি এই ফাঁকটা গারডামও ধরতে পারেননি। পারলে বশিরের কাছে সে বিষয়ে জানতে চাইতে পারতেন বলে বিবিসির কাছে আফসোস করেন তিনি। বশির এই নথিগুলো ডায়ানাকে সাক্ষাৎকারে দিতে রাজি করানোর কাজে ব্যবহার করেছেন, উইসলারের এই অভিযোগের ওপরই গুরুত্ব দিয়েছিলেন গারডাম। আর বশিরেরর মাথায় হয়তো ছিল তিনি যদি তার তথ্যগুলোর উৎস হিসেবে ডায়ানার কথা বলেন তাহলে বিষয়টি নিয়ে আর এগোবে না বিবিসি। হয়েছিলও তাই।

পেনফোল্ডের নাম মিথ্যেমিথ্যি বসিয়েও বশির বিবিসির সন্দেহ এড়াতে পেরেছিলেন। তার অজুহাত ছিল যে দুটো প্রতিষ্ঠান ওয়ালারকে ডায়ানার ওপর নজরদারি করার জন্য টাকা দিচ্ছে, তার একটি জার্সিতে অবস্থিত। পেনফোল্ডও যেহেতু জার্সিভিত্তিক, তাই বশির সেই নামটি ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

বশিরের জানা থাকার কথা এবাবে পেনফোল্ডসের নাম ব্যবহার করে পার পাওয়া যাবে না, কেননা এই প্রতিষ্ঠানের নাম আাগের অনুষ্ঠানেই এসেছে। তাহলে কেন হিউলেট হ্যারি ডীনকে আশ্বস্ত করেছিলেন কোনো অনিয়ম হয়নি? গারডামের নোটেও উল্লেখ নেই হিউলেটের এই স্ববিরোধের কথা।

বশিরকে গারডাম জিজ্ঞেস করেছিলেন তাহলে কেনইবা তিনি ওই গ্রাফিক্সগুলো করিয়েছিলেন। বশির তাকে বলেছেন, সেগুলো শুধুই তথ্যগুলো সংরক্ষণ করার জন্য। তাহলে শুধু এর জন্য একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে সারারাত কাজ করানোর হলো কেন? যথেষ্ট ব্যাখ্যার নেই এর জবাবেও। বিশেষ করে ২৫০ পাউন্ড খরচ করে এই গ্রাফিক্স করানো, তারপর উইলারকে দিয়ে সেই কাগজ হিথ্রো বিমানবন্দরে কুরিয়ার করার ব্যবস্থা – কেন? এসব তথ্য তার নিজের নোটবুকে টুকে রাখাই যথেষ্ট ছিল।

যাই হোক, যত অসম্ভবই মনে হোক না কেনো আজকের দিনে, ডায়ানার চিঠিতে কিন্তু বিবিসি কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত হয়েছিল। সেই চিঠি আসার পর সুটার হাফ ছেঁড়ে বলেছিলেন, যাক আমরা পরের ক্রিসমাসের ভালভাবে পালন করতে পারবো। তিনি বিবিসিকে বলেন, আমাদের একটা ভয় ছিল, কিন্তু তা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু বিবিসিকে ক্ষমা করতে পারেননি আর্ল স্পেন্সার। তিনি বলেন, ডায়ানার সঙ্গে মিথ্যা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি জানতেন না যে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটিই মিথ্যার মাধ্যমে করা হয়েছিল এবং তাকে বিপন্ন করে তোলা হয়েছিল।

যাই হোক, বিবিসি কর্তৃপক্ষ যদি ভেবে থাকে যে ঘটনা সেখানেই শেষ তাহলে তারা ভুল করেছিল। কেননা সেই ঘটনা আবার নাড়াচাড়া দেয় মেইল অন সানডে পত্রিকা। গত গত ২১ মার্চ তারা যোগাযোগ করে আর্ল স্পেন্সারের সঙ্গে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় কীভাবে মার্টিন বশির তার বোনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল এবং সেই সাক্ষাৎকারটি পেয়েছিল তা নিয়ে তারা [মেইল] তদন্ত করছে। তারা স্পেন্সারকে আরো জানায় মার্টিন বশির তাদের ভূয়া সরকারি কাগজপত্র দেখিয়েছিল এবং প্রাসাদের ফোনের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছিল। বিবিসির মতে, মেইল কিছু একটা করতে চেয়েছে এটা পরিস্কার, কিন্তু তারা মার্টিন বশিরের দেখানো নথি সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছে তা ভুল ছিল।

ট্যাবলয়েডের কথাবার্তা বিশ্বাস না হওয়ায় স্পেন্সার তখন বিবিসিতে ফোন করে। বিষয়টির গভীরে আরো কী আছে তা তদন্ত করে দেখার জন্য। স্পেন্সারকে তখন হিউলেটকে ধরিয়ে দেওয়া হয়। স্পেনসার তাকে বলেন মার্টিন বশিরকে তিনি ডায়ানার সঙ্গে ১৯ সেপ্টেম্বর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বশির তখন ভয়াবহ সব অভিযোগ করেছিলেন, অনেক প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও সাংবাদিক, সেন্ট জেমস প্যালেসের প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ, এবং গোয়েন্দা সংস্থায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে।

http://sangbad.net.bd/images/2021/June/09Jun21/news/diana-6.jpg

তখন হিউলেটের সুযোগ ছিল স্পেন্সারকে জিজ্ঞেস করা বশির তাকে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখিয়েছিলেন কিনা। তিনি তা করেছিলেন কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে মেইল যেহেতু জালিয়াতির কথা বলেছে হিউলেটকে গারডাম এ বিষয়ে মার্টিন বশিরকে জিজ্ঞেস করতে বলেন।

আবারও বশির অস্বীকার করেন তিনি এরকম কিছিুই কাউকে দেখাননি, এমনকি স্পেনসারকেও না।

পরের বছর ২৩শে মার্চ মেইলের পক্ষ থেকে গারডামকে ফোন করা হয়। তারপর তার সঙ্গে দেখা করতে আসে তারা। গারডাম আবার বশিরকে ফোন করেন, তিনি কি স্পেন্সারকে কোনো কাগজ দেখিয়েছিলেন। বশির তা আবার অস্বীকার করেন। গারডাম ও হিউলেট দুজনের কাছেই। গারডাম আবার জিজ্ঞেস করে বিকেলে। গণমাধ্যমে খোঁড়াখুঁড়ির ভয়ে বশির কিছুটা আড়ালে চলে যান। পরে তিনি স্বীকার করেন তিনি দেখিয়েছিলেন। চারবার তার সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি একথা স্বীকার করলেন। রেগেমেগে বশিরকে গারডাম বললেন বিবিসি এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার অবস্থান পর্যালোচনা করতে হবে।

আর কদিন পরই বিবিসি ছাড়েন গারডাম। বশির যেসব মিথ্যে বলেছিলেন তার একটি তালিকা তিনি দিয়ে যান। তাতে টনি হল ও তিনি যে প্রাথমিকভাবে এতটুকু একমত হয়েছেন যে বশির তাদের বিভ্রান্ত করেছিল এবং অনৈতিক কাজ করেছেন এবং বিবিসির নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন সে কথারও উল্লেখ রয়েছে।

তবে বিবিসি যে তদন্ত করেছিল তাতে আসল সত্য আসেনি তা বলাই বাহুল্য। তার ওপর তাদের ওপর থেকে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর বিবৃতিও দেওয়া হয়েছিল অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে।

এদিকে মেইল অন সানডে এ নিয়ে সংবাদ না করলেও সে বছর এপ্রিলে তারা বশিরের সেই ভূয়া নথিগুলো ছেপে দেয়। তখন হল ও হিউলেটের স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি দেওয়া হয় বিবিসির পক্ষ থেকে, যাতে বলা হয় এসবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ডায়ানার সাক্ষাৎকারের। কিন্তু যেহেতু বশির স্বীকার করে নিয়েছিলেন ততদিনে যে স্পেন্সারের ঘনিষ্ঠ হতে তিনি সেই নথিগুলো তাকে দেখিয়েছিলেন, তাহলে তো দাঁড়ায় যে এগুলোর সঙ্গে আসলে সেই সাক্ষাৎকারের সম্পর্ক রয়েছে।

লর্ড ডাইসনের অভিমত, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে বিবিসি তখন যা করছে সেটা বিবিসির মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

যাই হোক, গারডামের স্থলাভিষিক্ত হলেন অ্যান স্লোম্যান। হলও তার কথিত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করলেন বিবিসির পক্ষ থেকে। তবে সেই তদন্তে ডায়ানার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথাটা যে বশির মিথ্যা বলেছে সেটা সেভাবে আসলো না।

ডিসেম্বরে গারডাম যেমন পারেননি, তেমনি হল ও স্লোম্যানও ধরতে পারলেন না ডায়ানার কাছ থেকে বশিরের তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল না কেননা তাদের দেখা হওয়ার আগেই উইসলারকে দিয়ে গ্রাফিক্সটা করিয়েছিলেন বশির। এই ধরনের কোনো কথাই আসেনি সেই তদন্তে।

তবে লর্ড ডাইসন সেজন্য বিবিসিকে দায়ী করেননি। তার কাছে বরং অবিশ্বাস্য ঠেকেছে বশির যে দাবি করেছে ডায়ানা তাকে তথ্য দিয়েছে সেটা।

হল-স্লোম্যানের যে তদন্ত তাতে একটি জিনিস হয়েছে, এই সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেসব ঘটনা এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং কারা এই খবর বাইরে নিয়েছে সেটাই হয়ে উঠেছিল তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। কোনো পর্যায়েই বশির যে মিথ্যা কথা বলেছিল তা তাদের তদন্তে আসেনি। স্লোম্যানের চোখে বরং বড় হয়ে গিয়েছিল পেশাগত ঈর্ষা। তিনি তার সহকর্মীদেরও বলেছেন। ২০০২ সালে বিবিসির প্যানারোমার ইতিহাস নিয়ে রিপোর্টার লিন্ডসলে’র যে বই বেরোয় সেখানেও তিনি সমালোচনা করেন, সহকর্মীদের নামে বাজারে কথা পাচারের।

আর্ল স্পেন্সারও সেসময় তার এই অভিযোগগুলো তোলেননি। তিনি জানতেন না বিবিসি যে একটা তদন্ত করছে। এছাড়া তিনি ডায়ানার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে চাননি। তাছাড়া তখনও তিনি জানতেন না বশিরের দেখানো আর্থিক লেনদেনের ওই নথি ভুয়া ছিল।

তারপর বিবিসি যখন এটাকে সহকর্মীদের ঈর্ষা হিসেবে বর্ণনা করলো তখন মেইল অন সানডেও একটু দিশাহারা হয়ে গেলো। বশিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ চাপা পড়ে গেলো।

মেইল অন সানডেতে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল তার পক্ষকাল পরে সে বিষয়ে অ্যান স্লোম্যান বিবিসি কর্তৃপক্ষকে লিখেছিলেন, ডায়ানাকে নিয়ে কথাবার্তা শেষ, যদি না আর্ল স্পেনার এ নিয়ে কথা বলে। মনে হচ্ছে না তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলবেন।

এদিকে বশির আগে তো ডায়ানাকে বলেছিলেন ব্যাংক লেনদেনের বিষয়ে তার তথ্যের উৎস। এবার তিনি আর্ল স্পেন্সারকে নিয়েও একই কথা বললেন। তবে গত বছরের আগে আর্ল বিবিসির ভেতরকার সেই কথা জানতেন না। যখন জানলেন, তিনি তা অস্বীকার করলেন এবং বিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি তদন্ত করাতে বললেন। এই তখন লর্ড ডাইসনকে দিয়ে তদন্ত করানো হলো।

ডাইসনের মূল্যায়ন, এই দুজনের মধ্যে নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে আর্ল স্পেন্সার নিশ্চিতভাবেই বিজয়ী।

লিন্ডলের বইয়ে অ্যান স্লোম্যানকে উদ্ধৃত করা হয়েছে এভাবে - হল বিস্তারিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বশিরকে। অবশ্যই বশির নথিগুলো জালিয়াতি করেছে। এটা খুবই বোকার মতো কাজ হয়েছে। এটি দিয়ে তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিষয়টা তা নয়। তারপরও সে এটা কেন করলো, ঈশ্বর শুধু জানেন।

তবে প্রমাণাদি অনুযায়ী, এগুলো দেখিয়েই স্পেন্সার পরিবারের চৌহদ্দিতে পা রাখতে পেরেছিলেন বশির। তাই লর্ড ডাইসন নিশ্চিত যে এই কাগজগুলো ডায়ানার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই আর্ল স্পেন্সারকে দেখিয়েছেন বশির।

১৯৯৬ সালের ২৫ শে এপ্রিল টনি হল এ বিষয়ে তার রিপোর্ট বিবিসির পরিচালনা পর্ষদের কাছে জমা দেন। তাতে তিনি বশিরের দোষ দেননি। তিনি বলেছেন, এইটুকু ঘাটতি হয়েছে। তা বাদে তিনি একজন সৎ ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। ততদিনে যদিও হল জানতেন শুধু স্পেন্সার বা ডায়ানার সঙ্গে নয়, ইতোমধ্যে বশির বিবিসির সঙ্গেও মিথ্যা কথা বলেছেন। হল তার রিপোর্টে বশিরকে মৃদু ভর্ৎসনা করা হয়েছে অসতর্কতা ও জ্ঞানহীনের মতো কাজের জন্য। তবে দ্ব্যর্থহীনভাবেই তিনি বলেছেন বশির কোনো অনিয়ম করেননি।

লর্ড ডাইসন বলেন, বশিরের কাজকে ভুল বা বোকামো হিসেবে ব্যাখ্যা করে সুবিচার করা হয়নি। বিবিসি কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে আলোচনায় বসার তিনদিন আগে বশিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা উল্লেখ করে বিবিসির পরিচালনা পর্ষদের কাছে একটি চিঠি দেয়।

হল বলেন, বশিরকে খুব ভর্ৎসনা করা হয়েছিল এবং তাকে খুব কাছ থেকে নজরে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ এপ্রিল বিবিসি থেকে বশিরকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এতে তাকে জানানো হয়, তিনি ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট বানানো এবং তা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করতে ব্যর্থতার মাধ্যমে বিবিসির নীতির লঙ্ঘন করেছেন। আপনি যা ঘটিয়েছেন তা আমরা মারাত্মক হিসেবে বিবেচনা করছি এবং এই চিঠিতে এ বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট অসন্তোষ সম্পর্কে আপনার কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

তবে আসলেই এ চিঠি পাঠানো হয়েছিল বা বশিরকে ভর্ৎসনা করা হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ পাননি লর্ড ডাইসন। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের কথা জানা নেই বিবিসি প্যানারোমার তৎকালীন ডেপুটি এডিটর ক্লাইভ এডওয়ার্ডস। তিনি বলেন, এমন একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে বা চিঠি দেওয়া হয়েছে তা আমি জানি না এটা হতে পারে না। কেননা তা হয়ে থাকলে সেটা আমার হাত দিয়ে হওয়ার কথা।

বশির বিবিসিতে ছিলেন ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত, তারপর তিনি আইটিভিতে যোগ দেন।

[লেখক : বিবিসি’র প্রতিবেদক]

(ভাষান্তর: মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক)

ছবি

করোনায় বিশ্বে মৃত্যু ৩৯ লাখ ছুঁইছুঁই

ছবি

মালয়েশিয়ায় ১০২ বাংদেশিসহ আটক ৩০৯

ছবি

মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় আসাম সরকার

ছবি

মিয়ানমার নিয়ে জাতিসংঘের রেজুলেশনে হতাশ বাংলাদেশ

ছবি

সম্পাদকে গ্রেপ্তারের পর অ্যাপল ডেইলির গ্রাহক বেড়েছে চার লাখ

ছবি

ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ইব্রাহিম রায়েসি

ছবি

মায়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আহ্বান জাতিসংঘের

ছবি

বিশ্বে মহামারীর মধ্যেও বাস্তুচ্যুত রেকর্ডসংখ্যক মানুষ: জাতিসংঘ

ছবি

‘ইসরায়েলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের পরও ইহুদিরা আমাকে ভোট দেয়নি’

ছবি

নেপালে ভূমিধস ও বন্যায় ১১ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ২৫

ছবি

যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় ফের ইসরায়েলের বিমান হামলা

ছবি

বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃত্যু ৪০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে: রয়টার্স

ছবি

বঙ্গবন্ধুশেখ মুজিবুর রহমানের ‘কারাগারের রোজনামচা-এর ফরাসি সংস্করণ এর মোড়ক উন্মোচন

ছবি

ভারতে করোনায় মৃত্যু ১৫৮৭, শনাক্ত ৬২ হাজার

ছবি

আরব আমিরাতে বহুতল ভবনে আগুন

ছবি

ভারতে সংক্রমণ বাড়লেও সামান্য কমেছে মৃত্যু

ছবি

বৈঠক ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক, বললেন বাইডেন-পুতিন

ছবি

বিশ্বে করোনায় আরও ৯ হাজারের বেশি মৃত্যু

ছবি

দিল্লির এমস হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড

ছবি

শিয়া তরুণের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলো সৌদি আবর

ছবি

ভারতে ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে আক্রান্ত, কমেছে মৃত্যু

ছবি

সোমালিয়ায় আত্মঘাতী বোমা হামলা, নিহত ১৫

ছবি

বিশ্বজুড়ে করোনায় মৃত্যু ও শনাক্ত আবারও বেড়েছে

ছবি

দ্রুত ছড়াচ্ছে ডেল্টা ধরন, ৭৪ দেশে শনাক্ত

জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে ‘বঙ্গবন্ধু লাউঞ্জ’ উদ্বোধন

ছবি

সু চির বিচার শুরু হচ্ছে আজ

ছবি

সোমালিয়ায় সেনা অভিযানে ৫০ আল-শাবাব জঙ্গি নিহত

ছবি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনেটের শপথ

ছবি

আক্রান্ত বেড়ে ১৭ কোটি ৬৭ লাখ

ছবি

ভারতে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন করোনা শনাক্ত

ছবি

মৃত্যু ৩৮ লাখ ১০ হাজার ছাড়াল

ছবি

নাইজেরিয়ায় বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত ৫৩

ছবি

যে কারণে জনসনের ৬ কোটি করোনা টিকা ফেলে দিতে হবে

ছবি

চার বছর পর বিজেপি ছেড়ে ফের তৃণমূলে পুত্রসহ মুকুল রায়

ছবি

দুর্ভিক্ষের কবলে ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চল

ছবি

ফাইজার, মডার্নার করোনার টিকায় তরুণদের হৃদযন্ত্রে প্রদাহ: সিডিসি

tab

আন্তর্জাতিক

ডায়ানার সাক্ষাৎকার বিতর্ক : ঘটনা ও তদন্ত

জন ওয়্যার

বুধবার, ০৯ জুন ২০২১

http://sangbad.net.bd/images/2021/June/09Jun21/news/diana-1.jpg

বিবিসির জনপ্রিয় অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরমায় প্রিন্সেস ডায়ানার সাক্ষাৎকার দেয়ার একটি মুহূর্ত

বিবিসির জনপ্রিয় অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান প্যানোরমায় প্রিন্সেস ডায়ানার একটি সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। সেখানে তিনি ব্যক্তি ও দাম্পত্য জীবন এবং রাজপরিবার নিয়ে অকপটে অনেক কথাই বলেছিলেন। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন বিবিসির সাংবাদিক মার্টিন বশির। প্রিন্সেস ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেনসার তখন বলেছিলেন, সাংবাদিক বশির কিছু জাল দলিলপত্র দেখিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। বশিরের ‘প্রতারণামূলক’ কৌশলের ঘটনা বিবিসি ধামাচাপা দিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। সাবেক বিচারপতি লর্ড ডাইসনকে দিয়ে বিবিসি সম্প্রতি একটি তদন্ত করায়। সেই তদন্তের পর বশিরকে ‘অনির্ভরযোগ্য’, ‘প্রতারণাপূর্ণ’ ও ‘অসৎ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এরপর ২৫ বছর আগের সেই সাক্ষাৎকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিবিসি কি সে সময় তাদের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী চলতে পেরেছিল? এ নিয়ে লিখেছেন বিবিসির প্রতিবেদক জন ওয়্যার। সংবাদ-এর পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রকাশ করা হলো।

২৫ বছর আগে বিবিসি প্যানারোমা প্রিন্সেস ডায়ানার একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করে। সেসময় বিশ্বের যে কোন গণমাধ্যমের জন্যই সেটি ছিল এক ঈর্ষণীয় ব্যাপার। অনুষ্ঠানটি ২ কোটি ৩০ লাখের মানুষ টিভিতে দেখেছে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী মার্টিন বশিরের জীবনেও সাংবাদিক হিসেবে তা ছিল এক অনন্য অর্জন।

কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে সেই অনুষ্ঠান নিয়ে অভূতপূর্ব অভিযোগ জানান তার ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম। তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য ডায়ানাকে ভুল বুঝিয়েছিলেন এমন অভিযোগ আসার পর সাবেক বিচারপতি লর্ড ডাইসনকে দিয়ে একটি তদন্ত করায় বিবিসি। ডাইসন সেই তদন্তের পর বশিরকে ‘অনির্ভরযোগ্য’, ‘প্রতারণাপূর্ণ’ ও ‘অসৎ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

সাক্ষাৎকারটি প্রচারের অব্যবহিত পরেও একটি তদন্ত করেছিল বিবিসি। টনি হল, যিনি পরে বিবিসির ডিরেক্টর জেনারেল হয়েছিলেন, তদন্তটা করেছিলেন। কিন্তু তার মনে হয়েছিল, বশির ‘সৎ’। আর হলের সেই তদন্তকে এখন ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অকার্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন ডাইসন।

এসব সত্ত্বেও ২৫ বছর আগে কী ঘটেছিল তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিংশ শতকের অন্যতম স্মরণীয় টিভি অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত সেই সাক্ষাৎকারে ডায়ানা তার স্বামীর বিবাহবহির্ভূত প্রেম, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, তার [ডায়ানার নিজের] মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতা ইত্যাদি সম্পর্কে কথা বলেন। একই সঙ্গে চার্লস যে রাজার দায়িত্ব পালনে অযোগ্য সে কথাও বলেন। এ সময় যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজা প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে বিচ্ছেদপূর্ব পৃথক বাসে ছিলেন তিনি।

ওই সাক্ষাৎকারের ডায়ানাকে বশির প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কি সত্যি মনে করেন আপনার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে? ডায়ানা তার সদর্থক উত্তর দিয়েছিলেন।

কিন্তু এখন যে অভিযোগটি উঠেছে সেটা হচ্ছে, আসলে বশিরই সাক্ষাৎকার দেয়ার আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে ডায়ানার মাথায় ষড়যন্ত্রের ধারণাটা ঢুকিয়েছিলেন। বশিরই তাকে বলেছিলেন কীভাবে সাংবাদিক ও রাজপ্রাসাদের মানুষজন, গোয়েন্দা এমনকি তার বন্ধুরাও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর সাক্ষাৎকারটি প্রচারের সময়ই এসব কথা শোনা গিয়েছিল। বশির নাকি এই সাক্ষাৎকারের জন্য কিছু চালাকির আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু তখন, তদন্ত করেও এর চেয়ে বেশি কিছু জানা যায়নি।

কিন্তু সেই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে অভিযোগগুলো সামনে আসতে থাকে গত বছরের শেষ দিকে। তার সেই সাক্ষাৎকারের ২৫ বছর পূর্তির সময়ে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এবার ডাইসনকে দিয়ে তদন্ত করায় বিবিসি। এই তদন্তে ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেন্সারসহ যাদের সঙ্গেই ডাইসন কথা বলেছেন তাদের সবার কাছেই ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চায় বিবিসি। তাদের কাছ থেকে পাওয়া এমন কিছু তথ্য প্রতিষ্ঠানটি আইটিভি ও চ্যানেল ফোরকে দেয় যা সাংবাদিকেরা এত বছর ধরে খুঁজছিল।

এবার লর্ড ডাইসনের মতো বিবিসিও তাদের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ঘেঁটে বলছে বশির যে শুধু ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা বলে গেছে তা-ই নয়, সাংবাদিকের নৈতিকতা ও বিবিসির নিয়মেরও মারাত্মক লঙ্ঘন করেছে।

ডাইসন বলছেন এগুলো যে বশির ঝোঁকের বশে করেছেন তা নয়, বরং আগে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা অনুসারেই করেছেন। খুবই সতর্কভাবে সেই পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আর্ল স্পেন্সারের সঙ্গে বশিরের যোগাযোগ

বশিরের পরিকল্পনার মধ্যে প্রথমে ছিল ডায়ানার ভাই আর্ল স্পেন্সারকে বিশ্বাস করানো যে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, যা তিনি চার্লস ও ডায়ানার কাছের মানুষদের কাছ থেকে এবং উচ্চপর্যায়ের লোকজনের কাছ থেকে জেনেছেন।

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট স্পেন্সারের সহকারীকে ফোন করে বশির বলেন কোন সাক্ষাৎকার বা তথ্য নয়, শুধু ১৫ মিনিটের জন্য স্পেন্সারের সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি। এরপর তিনি তাদের একটি চিঠি পাঠান। এতে তিনি লেখেন গত তিন মাস ধরে তিনি গণমাধ্যমের আচরণ লক্ষ করছেন এবং অনুসন্ধানে স্পেন্সারের পরিবারের ব্যাপারে তাদের অতি আগ্রহের বিষয়ে অনেক কিছুই জানতে পেরেছেন। যদিও এই তিন মাস বশির আসলে প্যানারোমার অনুষ্ঠান নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।

বশিরের ভাবখানা এমন ছিল যে তিনি নিজেও সংবাদামাধ্যমের বিরুদ্ধে লড়ছেন। যদিবা স্পেন্সারেরা তার প্রস্তাব লুফৈ নেয় সেই হিসেব থেকেই তিনি তাদের বলেন যে তার কাছে এমন কিছু তথ্য আছে যেগুলোর বিষয়ে তারা আগ্রহী হতে পারেন। চিঠির কোন উত্তর না পেয়ে বশির আবার তাদের ২৯ আগস্ট কল করেন। তখন ডায়ানার ভাই তাকে বলেন ৬টার সময় তাদের দেখা হতে পারে।

স্পেন্সারের কাছ থেকে হঠাৎ করে এমন সাড়া পাওয়ায় নিশ্চয়ই অবাক হয়েছিলেন বশির। ডায়ানার সঙ্গে দেখার করার সুযোগ পেতে স্পেন্সারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেই কিনা বশির বানিয়ে বানিয়ে বলেন, আপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীর সাবেক প্রধান সাবেক সেনাসদস্য অ্যালান ওয়ালারকে ধনকুবের রুপার্ড মারডকের নিউজ ইন্টারন্যাশনাল এবং গোয়ন্দাসংস্থাগুলো নিয়মিত পয়সা দিচ্ছে আপনাদের পরিবারের তথ্য দেয়ার জন্য। এ বিষয়ে স্পেন্সারকে প্রমাণাদি দেখানোর কথাও বলেন বশির। ওই মিটিংয়ে দেখাতে পারেননি, কারণ তখনো তা তৈরি হয়নি।

সেই তথ্য প্রমাণ ঠিক কবে বশির তৈরি করেছিলেন তা নিশ্চিত হতে পারেননি ডাইসন। তবে বিবিসির নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে স্পেন্সারের সঙ্গে সাক্ষাতের পরপরই বশির তৈরি করেছিলেন সেই তথ্যপ্রমাণ। সেই সাক্ষাতে স্পেন্সার সম্মত হন আলাপ চলতে পারে। তাদের পরবর্তী সাক্ষাতের তারিখ ধার্য হয় আলথর্পে। দুদিন পরে, অর্থাৎ ৩১ আগস্ট সাড়ে ১১টায়।

ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট

সেই তথ্যপ্রমাণের জন্য মার্টিন বশির যোগাযোগ করেন তার এক সাবেক সহকর্মী ম্যাট উইসলারেরর সঙ্গে। উইসলারকে বশির বলেন, হাতে যা কাজকর্ম আছে তা রেখে দিতে। কেননা তার কাজটা করতে হবে আগে। হাতে সময় নেই। তবে বশির তাকে এ বিষয়ে প্রথম কবে ফোন দিয়েছিলেন তা মনে করতে পারেননি। শুধু বলেছেন, সময়টা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হবে।

উইসলারের ব্যবসায়িক অংশীদার বিবিসিকে জানান এটা নটিং হিলস কার্নিভালের কাছাকাছি সময় হবে। ওই কার্নিভাল শেষ হয় ২৮ তারিখে।

তিনি জানান বশির কাজটির জন্য প্রথম তার সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু এক রাতের মধ্যেই করতে হবে বলে রাজি হননি উইলারের ওই ব্যবসায়িক অংশীদার। তিনিই বশিরকে উইসলারের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলেন।

উইসলার ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার দুজনেই পরিষ্কারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কল করেন বশির। যেহেতু স্পেন্সারের ডায়েরিতে উল্লেখ আছে, বশিরের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল ২৯ তারিখ সন্ধ্যায়। তার মানে হচ্ছে স্পেন্সারের সঙ্গে সেই সাক্ষাতের পরপরই বশির তাদের কল করেনে।

উইসলার বলেন, বশির তার ফ্ল্যাটে আসেন। বলেন, অ্যালান ওয়ালারের দুটো ব্যাংক স্টেটমেন্ট তিনি দেখেছেন একটা ৮ মার্চের - চার হাজার পাউন্ড, নিউজ ইন্টারন্যাশনাল থেকে পাওয়া। আরেকটা ৬৫০০ পাউন্ডের, জার্সিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেনফোল্ডস কনসাল্টেন্ট দিয়েছে।

উইসলারকে বশির বলেননি যে তিনি প্রিন্সেস ডায়ানাকে নিয়ে কোন কাজ করছেন। শুধু বলেছেন তিনি যা করতে যাচ্ছেন তা অনেক বড় ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ডিজাইনার উইসলার তখন ধরেই নিয়েছিলেন বশির হয়তো ওয়ালারের সত্যিকারের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখেছেন। বশিরকে উইসলার বলেন, কাজটি করতে তার পুরো রাত লেগে যাবে। উইসলার বিবিসিকে বলেন বশির তাকে বলেন পরের দিন বিমানে করে তিনি এক জায়গায় যাবেন। তাই উইসলার যেন গ্রাফিক্সের কাজটি করে সকালে ৭টার দিকে মধ্যে তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। অনুমান করা যায় বশির এগুলো আলথর্পে স্পেনসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার আগেই হাতে পেতে চান। সেই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে স্পেন্সারের নোটে লেখা আছে, বশির তাকে ওয়ালারের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখান যেখানে ওই দুটি লেনদেনের উল্লেখ আছে। স্পেন্সারকে বশির বলেন পেনফোল্ডসকে সামনে রেখে কাজ করে গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ।

তবে বশিরকে স্পেন্সার বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন চার্লসের ব্যক্তিগত সহকারী কমান্ডার রিচার্ড আয়লার্ড ডায়ানার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন এটা শোনার পর। স্পেনসারের নোটে টুকে রাখা আছে, বশির তাকে বলেছেন আয়লার্ড তাদের কথাবার্তা গোপনে হস্তান্তর করেছেন। তিনি সাংবাদিক জনাথন ডিম্বেলেলেকে বলেছেন, আমরা চার্লস-ডায়ানার ব্যাপারটা একদম শেষ করতে চলেছি। এস্পার-ওস্পার কিছু একটা হবে।

তবে বশিরের কাছ থেকে শোনা কথাগুলো অন্যরকম ঠেকে স্পেন্সারের কাছে। সেজন্যই পরে তিনি প্যানারোমার স্টিভ হিউলেটের সঙ্গে যোগযোগ করেন। তাকে জিজ্ঞেস করেন বশিরকে বিশ্বাস করা যায় কিনা। তখন হিউলেট তাকে জানান বশির প্যানারোমার ‘অন্যতম সেরা’ কর্মী।

ডায়ানার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো বশিরকে

১৪ সেপ্টেম্বর বশির এবং স্পেন্সারের দেখা হলো আলথর্পে। তখন বশির একে একে সব অভিযোগ তুলে ধরলেন। যেমন, ডায়ানার ব্যক্তিগত সহকারী প্যাট্রিক জেফসনের সঙ্গে আয়লার্ডের যোগসাজশ। ডায়ানার গতিবিধির ওপর নজরদারি রাখার জন্য আয়লার্ড ও জেফসন যে গোয়েন্দাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তার প্রমাণ হিসেবে এফোর সাইজের কাগজের নথি বের করে দেখালেন বশির।

তবে ডাইসনের কাছে এসব কাগজ দেখানোর কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন বশির। তবে বশিরের সঙ্গে সাক্ষাতে স্পেন্সার যে নোট নেন, সেখানে কিন্তু ঠিকই লেখা আছে বশির তাকে বলছেন প্যাট্রিক জেফসন আয়লার্ডের ভালো বন্ধু, তাদের মধ্যে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল ইত্যাদি। ডায়ানা তার স্বামীর পক্ষের লোকজনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যেসব ভীতির কথা বলতেন, তার সঙ্গে তাদেরকে বশিরের কাছ থেকে স্পেন্সার যেসব কথা শুনেছেন বলে দাবি করছেন তার সঙ্গে মিলে যায়।

বশিরের কাছ থেকে যেসব ষড়যন্ত্রের কথা শুনছিলেন তা নিয়ে কোনো কিছু ভাবতে পারছিলেন না ধারণাই করতে পারছিল না স্পেন্সার। তার কাছে মনে হলো তার বোনেরই বরং সরাসরি এগুলো শোনা উচিত বশিরের কাছ থেকে। তাই টেলিফোন করে ডায়ানাকে বশিরের সঙ্গে বসার পরামর্শ দিলেন তিনি। পরে ডায়ানা তার ভাইকে একটি চিরকূটে লিখে পাঠান, প্রিয় কার্লোস (ঘরে এই নামেই ডাকা হয় আর্ল স্পেন্সারকে), আজ সকালে তুমি ফোনে আমাকে যে বিষয়গুলো বললে, সেগেুলো আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আমার চারপাশে এগুলোই হচ্ছে। তারা স্পেন্সারদের দুর্বল ভেবেছে। অনেক স্নেহ রইল।

স্পেন্সার বিবিসিকে বলেন, সে বছর ডায়ানার মধ্যে এই ভয় ভর করে যে উচু পর্যায়ে তার শত্রু আছে। তাই তিনি খুব বিপন্ন আর অস্থির বোধ করতেন সে সময়। কেন এসব হচ্ছে সে সময় তিনি তা বুঝতে চাইছিলেন।

১৯ সেপ্টেম্বর, ডায়ানার সঙ্গে বশিরকে পরিচয় করিয়ে দেন স্পেন্সার। সেই বৈঠকে বশিরের ৩০টির মতো অভিযোগ তুলে ধরেন স্পেন্সার। যার মধ্যে জেফসনও যে ষড়যন্ত্রের অংশ- তাও তুলে ধরেন তিনি।

স্পেন্সার বিবিসিকে জানান সেই বৈঠকের শেষে তার খুব সন্দেহ ঠেকছিল। বৈঠকের পর ডায়ানাকে তিনি সে কথা বলেওছিলেন যে, গল্পগুলো ঠিক মেলানো যাচ্ছে না।

তবে বশির কিন্তু বলছেন, যেসব কথা তখন হয়েছিল বলে এখন বলা হচ্ছে তার অধিকাংশই এসেছিল ডায়ানার কাছ থেকে। তবু ডাইসনের কাছে মনে হয়েছে, ডায়ানা নয়, সিংহভাগই বশিরের কথা।

মার্টিন বশিরের বক্তব্য একদম ভিন্ন। লর্ড ডাইসন তার সম্পর্কে মতামত দেয়ার পরও। বশির তার অবস্থানেই অটল রয়েছেন।

ডায়ানার সঙ্গে এরপর তার অনেক বৈঠক হয়েছে বশিরের। ১৯৯৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত ডায়ানা টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন। তবে সে বছর নভেম্বরের ৫ তারিখে অনুষ্ঠিত ওই সাক্ষাৎকারের আগে তার সঙ্গে তার যে বন্ধুদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, তারা এ বিষয়ে ডায়ানার মধ্য অনেক পরিবর্তন দেখেছিলেন। জেফসন বলেন, মার্টিন বশিরের জায়গা থেকে আমি ছিলাম বড় বাধা। কারণ আমি থাকলে ডায়ানাকে সাক্ষাৎকার না দেয়ার পরামর্শ দিতাম।

http://sangbad.net.bd/images/2021/June/09Jun21/news/diana-3.jpg

ডায়ানার বন্ধু রোজা মঙ্কটন লিখেছেন, সবাই জানতো কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু আমরা কেউ ভুলটা দেখিয়ে দিতে পারিনি।

ডায়ানা অক্টোবরের ৩০ তারিখে বশিরকে সাক্ষাৎকার দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেন তার আইনজীবী লর্ড মিশকনের সঙ্গে কথা বলে। তার কাছে ডায়ানা তার বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে সন্দেহ করেন তার একটা বিবরণ দেন।

ডায়ানাকে যখন এসব তথ্যের উৎস সম্পর্কে তার আইনজীবী জিজ্ঞেস করেন, ডায়ানা তখন তার তথ্যদাতা বেশ নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। সূত্র জিসিএইচকিউর, বলেন ডায়ানা।

তবে ডায়ানার বিরুদ্ধে যখন গোয়েন্দারা লেগেছিল তখন তাদের কারো কারো সঙ্গে বশিরের সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন বশির নিজেই। তবে এটাও ঠিক গোয়েন্দা সংস্থায় কর্মরত কোন কর্মকর্তার এভাবে কারোর ফোনে আড়িপাতার তথ্য কোন সাংবাদিককে দেয়ার কথা না।

তবে বিবিসির মধ্যে যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে, বা বিচারপতি ডাইসনের কাছেও যেটি একটি প্রশ্ন, সেটি হচ্ছে, বশিরের অভিসন্ধি বা এসব তৎপরতা কীভাবে সেই সময়কার বিবিসির কর্তাব্যক্তিদের চোখ এড়ালো। বিশেষ করে, যখন কোন কিছু সন্দেহ হবে তা তলিয়ে দেখাই বিবিসির ঘোষিত নীতি।

১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরেই বিবিসির বোঝার কথা যে, কিছু একটা হয়েছে। অর্থাৎ সাক্ষাৎকারটি প্রচারের এক মাসের মাথায়। যখন ডিজাইনার উইসলার বিবিসির কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের টিম গার্ডাম ও টিম সুটারকে জানিয়েছিলেন যে তাকে দিয়ে বশির একটা ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট বানিয়ে নিয়েছে। সাক্ষাৎকারটি প্রচারের পরই তিনি বুঝতে পেরেছেন সেটা কী কাজে করানো হয়েছিল। বিবিসির এই দুজনকে উইসলার জানান এর আগে প্যানারোমার এডিটর স্টিভ হিউলেটকে তিনি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাকে বলেছেন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। হিউলেট ২০১৭ সালে মারা যান ক্যান্সারে। তিনি বেঁচে তাকলে হয়তো লর্ড ডাইসন তাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন বশিরকে এ প্রক্রিয়ায় তিনি কোন ধরনের সহায়তা করেছিলেন কিনা। কেননা হিউলেট কেন ভুয়া আর্থিক লেনদেনের কাগজপত্র তৈরির কথা জানার পরও কর্তৃপক্ষকে জানালেন না?

প্রমাণ রয়েছে হিউলেট প্রথম ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টের কথা জানতে পারে উইসলার ফ্যাক্সের মাধ্যমে প্যানারোমা প্রযোজক মার্ক কিলিককে বিষয়টি জানানোর পর। উইসলার এর আগে কিলিকের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিলিক পেনফোল্ডস কনসালটেন্ট নাম দেখেই চিনতে পারেন। কেননা এর আগে প্যানারোমার দুটো পর্বে এই প্রতিষ্ঠিানটির নাম আসে। ওই দুটো পর্ব ছিল যুক্তরাজ্যের সাবেক ফুটবল ম্যানেজার টেরি ভেনাবেলসের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড নিয়ে। কিলিক তখন ধন্ধে পড়ে যান পেনফোল্ডস কেন আর্ল স্পেনসারের সহকারীকে টাকা দিতে যাবে।

কিলিকের সঙ্গে বশিরের এই নিয়ে পরে তর্কাতর্কি হয় বিবিসির ক্যান্টিনে। সংক্ষিপ্ত ও তিক্ত সেই আলাপে কিলিককে বশির জানিয়ে দেন এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই তার।

এরপর কিলিক তার দুই সহকর্মী প্যানারোমার সাবেক ডেপুটি এডিটর হ্যারি ডীন এবং রিপোর্টার টম ম্যানগোল্ডকে নিয়ে হিউলেটের সঙ্গে দেখা করতে যান। এই তিনজনেরই মনে আছে, সেই সময় তাদের এডিটর তাদের বলে দেন যে এটা তাদের ভাবার বিষয় না। ডীন তাকে জিজ্ঞেস করেন তিনি ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলোর কথা জানেন কিনা। উত্তরে হিউলেট তাদের বলেন তা তার মনে পড়ছে না। তবে সেখান থেকে চলে আসার আগে হিউলেটকে স্পেন্সারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন কিলিক। স্পেন্সার হিউলেটকে কল করেছিলেন। কিন্তু হিউলেট বা বিবিসির অন্য কেউই বিষয়টি আর খতিয়ে দেখেননি। বিবিসির এই ব্যর্থতাটাকেই বড় করে দেখছেন লর্ড ডাইসন।

লর্ড ডাইসন বলছেন, পুরো চিত্রটা অনেকাংশেই বদলে যেতো যদি তাদের কেউ আর্ল স্পেনসারের সঙ্গে একটু কথা বলার প্রয়োজন মনে করতেন।

ডীনের মনে পড়ে হিউলেট পরে তাকে বলেছিলেন ওই ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানোর তথ্যগুলো সঠিক ছিল। তিনি ডীনকে বলেন ব্যাংক স্টেটমেন্টে যেসব নাম এসেছে সেগুলো এক ধরনের কাকতাল। আর এই কথাটিই, ধারণা করা হচ্ছে বশিরের বানানো।

বশিরের বারবার অবস্থান বদল

বিবিসি প্যানারোমার সাবেক প্রডিউসার পিটার মলয় স্মরণ করেন প্যানারোমার ক্রিসমাস পার্টিতে উইসলার খুবই কাঁপছিলেন। তিনি বিবিসিকে জানান তার বাসায় কেউ একজন ঢুকেছিল এবং ভূয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টের গ্রাফিক্সটি যে ডিস্কে ছিল তা পাওয়া যাচ্ছে না। তখন আরেকটা বিষয় পরিস্কার হয় হিউলেট আগে এ বিষয়ে তার লাইন ম্যানেজার টিম গারডামকে কিছুই জানাননি। তাদের সহকর্মী টিম সুটার ২০০১ সালে বলেন, গারডাম এ নিয়ে রাগলেও দায়িত্বশীল আচরণ করে গেছেন। হিউলেট তাদের বলেছিলেন, ডায়ানার সাক্ষাৎকার নিয়ৈ কোনো অনিয়ম হয়নি।

এরপর বশিরের সঙ্গে কথা বলেন গারডাম, হিউলেট ও সুটার। বশির তাদের আশ্বস্ত করেন ওই ব্যাংক স্টেটমেন্ট ডায়ানা বা অন্য কাউকে দেখানো হয়নি। তিনি বলেন, এগুলো দিয়ে ডায়ানাকে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি করানো যেতো না। বরং এসব তথ্য স্বয়ং ডায়ানাই দিয়েছিলেন, বলেন বশির।

বশিরের সঙ্গে ওই মিটিং সম্পর্কে গারডামের নোটে দেখা যায়, গারডাম খুবই বিভ্রান্ত হন কেন তাহলে বশির সেগুলো বানানোর ঝামেলাতে গেলেন তা ভেবে। তারা বশিরের কাছে জানতে চান তিনি এ বিষয়ে ডায়ানার কাছ থেকে একটা লিখিত এনে দিতে পারবেন কিনা। পরের দিন বশির ডায়ানার কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে আসেন বশির, যেটিতে লেখা ছিল, আমি নিশ্চিত করছি, সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আমার ওপর কোনো চাপ ছিল না। আমাকে বশিরের পক্ষ থেকে এমন কোনো ডকুমেন্ট দেখানো হয়নি যা আমি আগে দেখিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট এবং আমি এর পক্ষে আছি।

ডায়ানার এই চিঠির কারণে বিবিসি কর্তৃপক্ষের সন্দেহ স্তিমিত হয়। সাড়া জাগানো সেই অনুষ্ঠান নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে শুরু করে তারা। কিন্তু তারপরও সেখানে মার্টিন বশির যে মিথ্যা বলে থাকতে পারেন তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

গারডামকে বশির বলেছিলেন যে তার সঙ্গে ডায়ানার প্রথম সাক্ষাৎ হয় সেপ্টেম্বরেরর শেষ দিকে। টনি হলের কাছে যে ঘটনার যে বিবরণী দেওয়া হয়েছিল তাতে এটা আছে। কিন্তু গারডামকে তো ম্যাট উইসলার বলেছিলেন, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট তিনি বানিয়েছিলেন আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে। মানে তারও তিন সপ্তাহ আগে।

যদিও বশির তাদের ঘ্টনার তারিখগুলো দিয়েছে, তবুও হিউলেট বা বিবিসি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি লক্ষ্য করেননি ডায়ানার কাছ থেকে বশিরের তথ্যগুলো জানার কথা না। কেননা আগে তাদের তাদের দেখাই হয়নি। এমনকি এই ফাঁকটা গারডামও ধরতে পারেননি। পারলে বশিরের কাছে সে বিষয়ে জানতে চাইতে পারতেন বলে বিবিসির কাছে আফসোস করেন তিনি। বশির এই নথিগুলো ডায়ানাকে সাক্ষাৎকারে দিতে রাজি করানোর কাজে ব্যবহার করেছেন, উইসলারের এই অভিযোগের ওপরই গুরুত্ব দিয়েছিলেন গারডাম। আর বশিরেরর মাথায় হয়তো ছিল তিনি যদি তার তথ্যগুলোর উৎস হিসেবে ডায়ানার কথা বলেন তাহলে বিষয়টি নিয়ে আর এগোবে না বিবিসি। হয়েছিলও তাই।

পেনফোল্ডের নাম মিথ্যেমিথ্যি বসিয়েও বশির বিবিসির সন্দেহ এড়াতে পেরেছিলেন। তার অজুহাত ছিল যে দুটো প্রতিষ্ঠান ওয়ালারকে ডায়ানার ওপর নজরদারি করার জন্য টাকা দিচ্ছে, তার একটি জার্সিতে অবস্থিত। পেনফোল্ডও যেহেতু জার্সিভিত্তিক, তাই বশির সেই নামটি ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্টে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

বশিরের জানা থাকার কথা এবাবে পেনফোল্ডসের নাম ব্যবহার করে পার পাওয়া যাবে না, কেননা এই প্রতিষ্ঠানের নাম আাগের অনুষ্ঠানেই এসেছে। তাহলে কেন হিউলেট হ্যারি ডীনকে আশ্বস্ত করেছিলেন কোনো অনিয়ম হয়নি? গারডামের নোটেও উল্লেখ নেই হিউলেটের এই স্ববিরোধের কথা।

বশিরকে গারডাম জিজ্ঞেস করেছিলেন তাহলে কেনইবা তিনি ওই গ্রাফিক্সগুলো করিয়েছিলেন। বশির তাকে বলেছেন, সেগুলো শুধুই তথ্যগুলো সংরক্ষণ করার জন্য। তাহলে শুধু এর জন্য একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে সারারাত কাজ করানোর হলো কেন? যথেষ্ট ব্যাখ্যার নেই এর জবাবেও। বিশেষ করে ২৫০ পাউন্ড খরচ করে এই গ্রাফিক্স করানো, তারপর উইলারকে দিয়ে সেই কাগজ হিথ্রো বিমানবন্দরে কুরিয়ার করার ব্যবস্থা – কেন? এসব তথ্য তার নিজের নোটবুকে টুকে রাখাই যথেষ্ট ছিল।

যাই হোক, যত অসম্ভবই মনে হোক না কেনো আজকের দিনে, ডায়ানার চিঠিতে কিন্তু বিবিসি কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত হয়েছিল। সেই চিঠি আসার পর সুটার হাফ ছেঁড়ে বলেছিলেন, যাক আমরা পরের ক্রিসমাসের ভালভাবে পালন করতে পারবো। তিনি বিবিসিকে বলেন, আমাদের একটা ভয় ছিল, কিন্তু তা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু বিবিসিকে ক্ষমা করতে পারেননি আর্ল স্পেন্সার। তিনি বলেন, ডায়ানার সঙ্গে মিথ্যা বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি জানতেন না যে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার গোটা প্রক্রিয়াটিই মিথ্যার মাধ্যমে করা হয়েছিল এবং তাকে বিপন্ন করে তোলা হয়েছিল।

যাই হোক, বিবিসি কর্তৃপক্ষ যদি ভেবে থাকে যে ঘটনা সেখানেই শেষ তাহলে তারা ভুল করেছিল। কেননা সেই ঘটনা আবার নাড়াচাড়া দেয় মেইল অন সানডে পত্রিকা। গত গত ২১ মার্চ তারা যোগাযোগ করে আর্ল স্পেন্সারের সঙ্গে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় কীভাবে মার্টিন বশির তার বোনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল এবং সেই সাক্ষাৎকারটি পেয়েছিল তা নিয়ে তারা [মেইল] তদন্ত করছে। তারা স্পেন্সারকে আরো জানায় মার্টিন বশির তাদের ভূয়া সরকারি কাগজপত্র দেখিয়েছিল এবং প্রাসাদের ফোনের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছিল। বিবিসির মতে, মেইল কিছু একটা করতে চেয়েছে এটা পরিস্কার, কিন্তু তারা মার্টিন বশিরের দেখানো নথি সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছে তা ভুল ছিল।

ট্যাবলয়েডের কথাবার্তা বিশ্বাস না হওয়ায় স্পেন্সার তখন বিবিসিতে ফোন করে। বিষয়টির গভীরে আরো কী আছে তা তদন্ত করে দেখার জন্য। স্পেন্সারকে তখন হিউলেটকে ধরিয়ে দেওয়া হয়। স্পেনসার তাকে বলেন মার্টিন বশিরকে তিনি ডায়ানার সঙ্গে ১৯ সেপ্টেম্বর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বশির তখন ভয়াবহ সব অভিযোগ করেছিলেন, অনেক প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ও সাংবাদিক, সেন্ট জেমস প্যালেসের প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ, এবং গোয়েন্দা সংস্থায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে।

http://sangbad.net.bd/images/2021/June/09Jun21/news/diana-6.jpg

তখন হিউলেটের সুযোগ ছিল স্পেন্সারকে জিজ্ঞেস করা বশির তাকে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখিয়েছিলেন কিনা। তিনি তা করেছিলেন কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে মেইল যেহেতু জালিয়াতির কথা বলেছে হিউলেটকে গারডাম এ বিষয়ে মার্টিন বশিরকে জিজ্ঞেস করতে বলেন।

আবারও বশির অস্বীকার করেন তিনি এরকম কিছিুই কাউকে দেখাননি, এমনকি স্পেনসারকেও না।

পরের বছর ২৩শে মার্চ মেইলের পক্ষ থেকে গারডামকে ফোন করা হয়। তারপর তার সঙ্গে দেখা করতে আসে তারা। গারডাম আবার বশিরকে ফোন করেন, তিনি কি স্পেন্সারকে কোনো কাগজ দেখিয়েছিলেন। বশির তা আবার অস্বীকার করেন। গারডাম ও হিউলেট দুজনের কাছেই। গারডাম আবার জিজ্ঞেস করে বিকেলে। গণমাধ্যমে খোঁড়াখুঁড়ির ভয়ে বশির কিছুটা আড়ালে চলে যান। পরে তিনি স্বীকার করেন তিনি দেখিয়েছিলেন। চারবার তার সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি একথা স্বীকার করলেন। রেগেমেগে বশিরকে গারডাম বললেন বিবিসি এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার অবস্থান পর্যালোচনা করতে হবে।

আর কদিন পরই বিবিসি ছাড়েন গারডাম। বশির যেসব মিথ্যে বলেছিলেন তার একটি তালিকা তিনি দিয়ে যান। তাতে টনি হল ও তিনি যে প্রাথমিকভাবে এতটুকু একমত হয়েছেন যে বশির তাদের বিভ্রান্ত করেছিল এবং অনৈতিক কাজ করেছেন এবং বিবিসির নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন সে কথারও উল্লেখ রয়েছে।

তবে বিবিসি যে তদন্ত করেছিল তাতে আসল সত্য আসেনি তা বলাই বাহুল্য। তার ওপর তাদের ওপর থেকে বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর বিবৃতিও দেওয়া হয়েছিল অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে।

এদিকে মেইল অন সানডে এ নিয়ে সংবাদ না করলেও সে বছর এপ্রিলে তারা বশিরের সেই ভূয়া নথিগুলো ছেপে দেয়। তখন হল ও হিউলেটের স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি দেওয়া হয় বিবিসির পক্ষ থেকে, যাতে বলা হয় এসবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই ডায়ানার সাক্ষাৎকারের। কিন্তু যেহেতু বশির স্বীকার করে নিয়েছিলেন ততদিনে যে স্পেন্সারের ঘনিষ্ঠ হতে তিনি সেই নথিগুলো তাকে দেখিয়েছিলেন, তাহলে তো দাঁড়ায় যে এগুলোর সঙ্গে আসলে সেই সাক্ষাৎকারের সম্পর্ক রয়েছে।

লর্ড ডাইসনের অভিমত, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে বিবিসি তখন যা করছে সেটা বিবিসির মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

যাই হোক, গারডামের স্থলাভিষিক্ত হলেন অ্যান স্লোম্যান। হলও তার কথিত পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করলেন বিবিসির পক্ষ থেকে। তবে সেই তদন্তে ডায়ানার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথাটা যে বশির মিথ্যা বলেছে সেটা সেভাবে আসলো না।

ডিসেম্বরে গারডাম যেমন পারেননি, তেমনি হল ও স্লোম্যানও ধরতে পারলেন না ডায়ানার কাছ থেকে বশিরের তথ্য পাওয়ার সুযোগ ছিল না কেননা তাদের দেখা হওয়ার আগেই উইসলারকে দিয়ে গ্রাফিক্সটা করিয়েছিলেন বশির। এই ধরনের কোনো কথাই আসেনি সেই তদন্তে।

তবে লর্ড ডাইসন সেজন্য বিবিসিকে দায়ী করেননি। তার কাছে বরং অবিশ্বাস্য ঠেকেছে বশির যে দাবি করেছে ডায়ানা তাকে তথ্য দিয়েছে সেটা।

হল-স্লোম্যানের যে তদন্ত তাতে একটি জিনিস হয়েছে, এই সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেসব ঘটনা এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং কারা এই খবর বাইরে নিয়েছে সেটাই হয়ে উঠেছিল তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। কোনো পর্যায়েই বশির যে মিথ্যা কথা বলেছিল তা তাদের তদন্তে আসেনি। স্লোম্যানের চোখে বরং বড় হয়ে গিয়েছিল পেশাগত ঈর্ষা। তিনি তার সহকর্মীদেরও বলেছেন। ২০০২ সালে বিবিসির প্যানারোমার ইতিহাস নিয়ে রিপোর্টার লিন্ডসলে’র যে বই বেরোয় সেখানেও তিনি সমালোচনা করেন, সহকর্মীদের নামে বাজারে কথা পাচারের।

আর্ল স্পেন্সারও সেসময় তার এই অভিযোগগুলো তোলেননি। তিনি জানতেন না বিবিসি যে একটা তদন্ত করছে। এছাড়া তিনি ডায়ানার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে চাননি। তাছাড়া তখনও তিনি জানতেন না বশিরের দেখানো আর্থিক লেনদেনের ওই নথি ভুয়া ছিল।

তারপর বিবিসি যখন এটাকে সহকর্মীদের ঈর্ষা হিসেবে বর্ণনা করলো তখন মেইল অন সানডেও একটু দিশাহারা হয়ে গেলো। বশিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ চাপা পড়ে গেলো।

মেইল অন সানডেতে যে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল তার পক্ষকাল পরে সে বিষয়ে অ্যান স্লোম্যান বিবিসি কর্তৃপক্ষকে লিখেছিলেন, ডায়ানাকে নিয়ে কথাবার্তা শেষ, যদি না আর্ল স্পেনার এ নিয়ে কথা বলে। মনে হচ্ছে না তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলবেন।

এদিকে বশির আগে তো ডায়ানাকে বলেছিলেন ব্যাংক লেনদেনের বিষয়ে তার তথ্যের উৎস। এবার তিনি আর্ল স্পেন্সারকে নিয়েও একই কথা বললেন। তবে গত বছরের আগে আর্ল বিবিসির ভেতরকার সেই কথা জানতেন না। যখন জানলেন, তিনি তা অস্বীকার করলেন এবং বিবিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি তদন্ত করাতে বললেন। এই তখন লর্ড ডাইসনকে দিয়ে তদন্ত করানো হলো।

ডাইসনের মূল্যায়ন, এই দুজনের মধ্যে নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে আর্ল স্পেন্সার নিশ্চিতভাবেই বিজয়ী।

লিন্ডলের বইয়ে অ্যান স্লোম্যানকে উদ্ধৃত করা হয়েছে এভাবে - হল বিস্তারিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন বশিরকে। অবশ্যই বশির নথিগুলো জালিয়াতি করেছে। এটা খুবই বোকার মতো কাজ হয়েছে। এটি দিয়ে তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিষয়টা তা নয়। তারপরও সে এটা কেন করলো, ঈশ্বর শুধু জানেন।

তবে প্রমাণাদি অনুযায়ী, এগুলো দেখিয়েই স্পেন্সার পরিবারের চৌহদ্দিতে পা রাখতে পেরেছিলেন বশির। তাই লর্ড ডাইসন নিশ্চিত যে এই কাগজগুলো ডায়ানার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই আর্ল স্পেন্সারকে দেখিয়েছেন বশির।

১৯৯৬ সালের ২৫ শে এপ্রিল টনি হল এ বিষয়ে তার রিপোর্ট বিবিসির পরিচালনা পর্ষদের কাছে জমা দেন। তাতে তিনি বশিরের দোষ দেননি। তিনি বলেছেন, এইটুকু ঘাটতি হয়েছে। তা বাদে তিনি একজন সৎ ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। ততদিনে যদিও হল জানতেন শুধু স্পেন্সার বা ডায়ানার সঙ্গে নয়, ইতোমধ্যে বশির বিবিসির সঙ্গেও মিথ্যা কথা বলেছেন। হল তার রিপোর্টে বশিরকে মৃদু ভর্ৎসনা করা হয়েছে অসতর্কতা ও জ্ঞানহীনের মতো কাজের জন্য। তবে দ্ব্যর্থহীনভাবেই তিনি বলেছেন বশির কোনো অনিয়ম করেননি।

লর্ড ডাইসন বলেন, বশিরের কাজকে ভুল বা বোকামো হিসেবে ব্যাখ্যা করে সুবিচার করা হয়নি। বিবিসি কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে আলোচনায় বসার তিনদিন আগে বশিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা উল্লেখ করে বিবিসির পরিচালনা পর্ষদের কাছে একটি চিঠি দেয়।

হল বলেন, বশিরকে খুব ভর্ৎসনা করা হয়েছিল এবং তাকে খুব কাছ থেকে নজরে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ এপ্রিল বিবিসি থেকে বশিরকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এতে তাকে জানানো হয়, তিনি ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট বানানো এবং তা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করতে ব্যর্থতার মাধ্যমে বিবিসির নীতির লঙ্ঘন করেছেন। আপনি যা ঘটিয়েছেন তা আমরা মারাত্মক হিসেবে বিবেচনা করছি এবং এই চিঠিতে এ বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট অসন্তোষ সম্পর্কে আপনার কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

তবে আসলেই এ চিঠি পাঠানো হয়েছিল বা বশিরকে ভর্ৎসনা করা হয়েছিল এমন কোনো প্রমাণ পাননি লর্ড ডাইসন। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের কথা জানা নেই বিবিসি প্যানারোমার তৎকালীন ডেপুটি এডিটর ক্লাইভ এডওয়ার্ডস। তিনি বলেন, এমন একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে বা চিঠি দেওয়া হয়েছে তা আমি জানি না এটা হতে পারে না। কেননা তা হয়ে থাকলে সেটা আমার হাত দিয়ে হওয়ার কথা।

বশির বিবিসিতে ছিলেন ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত, তারপর তিনি আইটিভিতে যোগ দেন।

[লেখক : বিবিসি’র প্রতিবেদক]

(ভাষান্তর: মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক)

back to top