alt

মিডিয়া

আহমদুল কবির কখনো প্রাসঙ্গিকতা হারাবেন না

মফিদুল হক : বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৩

আহমদুল কবির বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে ‘সংবাদ’ পত্রিকার নবযাত্রা সূচিত হয়েছিল তার হাতে। ব্যবস্থাপনা ছিল তার দায়িত্ব এবং একঝাঁক প্রতিভাবান নবীন সাংবাদিক সমবেত হয়েছিল ‘সংবাদ’ ঘিরে। আরও ছিল অভিজ্ঞ কয়েকজন পরিপক্ব সাংবাদিক এবং বামপন্থায় সমর্পিত ত্যাগী মানুষেরা।

পাকিস্তান আমলে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে জাতীয় জাগরণে সাংবাদিকতার যে ভূমিকা সেখানে ‘সংবাদ’ অন্যতর ও বিশিষ্ট হিসেবে স্বীকৃত। বামপন্থি আদর্শের পতাকাবাহী এই সংবাদপত্রের অবদানের কান্ডারি ছিলেন আহমদুল কবির। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ পর্বে বিশেষত ১৯৭৫ পরবর্তী কৃষ্ণ সময়ে ‘সংবাদ’ পরিচালনার পাশাপাশি সম্পাদনার দায়িত্ব পালন তিনি গ্রহণ করেন এবং তার ব্যক্তিত্বের মতোই ঝকঝকে আধুনিক চিন্তা ও প্রগতিপন্থার বাহক হিসেবে ‘সংবাদ’ রচনা করে আরেক অধ্যায়।

ইতোমধ্যে দেশে ও সমাজে অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়। বিত্তের শক্তিতে বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবে করপোরেট সত্তা নিয়ে পত্রিকাগোষ্ঠীর আগমন বদলে দেয় সাংবাদিকতার চেহারা, বৈভব শাসিত বিত্ত-তাড়িত এই নতুন জগতে ‘সংবাদ’ হয়তো কিছুটা ম্রিয়মাণ, তবে সংবাদের প্রাণপুরুষ আহমদুল কবিরের অবদান পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ আমাদের জন্য একান্ত জরুরি, সংবাদপত্র ও সমাজের মেলবন্ধন সূত্রে আগামীর বিকাশের প্রয়োজনে। ফলে আহমদুল কবির প্রাসঙ্গিকতা কখনো হারাবেন না এবং নিজেদের প্রয়োজনেই তাকে আমাদের জানতে হবে।

আহমদুল কবির পূর্ববাংলার হিন্দু-মুসলিম সমন্বিত সমাজের শক্তিময়তার অনন্য উদাহরণ। তার জীবনদর্শনে সেকুল্যার দৃষ্টিচিন্তার যে গভীর অবস্থান এবং সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক ন্যায্য বিষয়ে আস্থা, তাতে আজকের পটভূমিকায় তাকে মনে হবে ভবিষ্যৎমুখী এক কর্মবীর, যিনি জীবনের অনেক কিছু প্রত্যাখ্যান করে নিজের অবস্থানে ছিলেন স্থির। তার এই জীবন দর্শনের উৎস খুঁজতে গিয়ে আমি তার তারুণ্যের দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে বিস্ময় বোধ করি।

চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিয়ে যে তরুণেরা নবচিন্তা ও কর্মের পথিকৃৎ হয়েছিলেন আহমদুল কবির সেখানে ছিলেন নেতৃস্থানীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ছিল ধীমান চিন্তাশীল টগবগে তরুণদের সমাবেশস্থল। তিনি ছিলেন এই হল সংসদের নির্বাচিত সহ-সভাপতি, আর ছিলেন অর্থনীতির স্বনামধন্য শিক্ষক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের প্রিয় ছাত্র।

এ কে দাশগুপ্তের সঙ্গে বাংলার তৎকালীন জাগরণের এক বিশেষ যোগ রয়েছে। দেশভাগের পর তিনি ঢাকা ছেড়ে কলকাতা যেতে বাধ্য হন, তার আগে ঢাকায় তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন জ্ঞানসাধক আবদুর রাজ্জাক, আশালতা সেনের পুত্র খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ সমর সেন, পঞ্চাশের দাঙ্গার পর তাকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে হতে হয় দেশান্তরী। পরে কলকাতায় অধ্যাপনাকালে এ কে দাশগুপ্তের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন অমর্ত্য সেন, সুখময় চক্রবর্তী, অশোক মিত্র প্রমুখ; যারা ভারতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ পালাবদলের রূপকার হয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এ কে দাশগুপ্তের আরেক ছাত্র যে ছিলেন আহমদুল কবির, এটা আমি জেনেছি অনেক পরে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এ কে দাশগুপ্তকে আজীবন ‘মাস্টারমশাই’ হিসেবে সম্বোধন করে গেছেন, আর আহমদুল কবিরের কাছে তিনি ছিলেন ‘গুরুদেব’। আমার দুঃখ হয়, আহমদুল কবির, আবদুর রাজ্জাক এবং এ কে দাশগুপ্তের বৃত্তটির তত্ত্ব-তালাশ বিশেষ করিনি, যেটুকু আমার জানা তা রাজ্জাক স্যারের সুবাদেই। স্বাধীনতার পর অধ্যাপক রাজ্জাক যখন প্রথম ভারতে গেলেন তখন মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল দীর্ঘকাল পর। পরে একবার তিনি মাস্টারমশাইকে ঢাকায়ও নিয়ে এসেছিলেন। তখন কিংবা এর আগে-পরে গুরুদেবের সঙ্গে শিষ্য আহমদুল কবিরের দেখা হয়েছিল কিনা- সেটা আর জানা হয়নি। তবে অমিয়কুমার দাশগুপ্তের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে দুই পাতার যে গুরুদক্ষিণা প্রদান করেছিলেন আহমদুল কবির- সেই রচনা তার মিতভাষিতার পরিচয় যেমন বহন করে, তেমনি মেলে ধরে জীবনদীক্ষা।

গুরু-শিষ্য উভয়ের মন-মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় এ সংক্ষিপ্ত লেখায়। ‘আমার সমাজদর্শনের শিক্ষক’ এই শিরোনামের রচনার পুরোটাই উদ্ধৃতিযোগ্য, তবে এখানে সামান্যই উল্লেখ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র অমিয়কুমার দাশগুপ্ত যে ১৯২৬ সালে একই বিশ^বিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সেটা আহমদুল কবিরের লেখা থেকে জানতে পারি। এর মাঝে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে The Conception of Surplus in Theoretical Economics বিষয়ে ডক্টরেট করে আসেন। তার টিউটোরিয়াল ক্লাস সম্পর্কে ছাত্র আহমদুল কবির লিখেছেন- ‘ডক্টর দাশগুপ্ত আলোচনায় সমন্বয় সাধন করতেন এবং পরের ক্লাসের বিষয় বলে দিতেন। এই টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলো করে ও ক্লাসে তার লেকচারগুলো একটু মন দিয়ে শুনে পাঠ্যবইয়ের দিকে খুব বেশি নজর দিতে হয়নি আমাকে। অবশ্য ভাষার দিক দিয়ে প্রায় সাহিত্য বললেও চলে Lord Keynes-Gi General Theory of Employment, Interest and Money. ইংরেজি শেখার জন্য পড়তাম, পরীক্ষার আগে নিজের ও বন্ধু-বান্ধবদের নোটগুলো পড়ে নিয়েই পরীক্ষা দিয়েছি।’

অর্থনীতির একজন শিক্ষার্থী জন মেইনার্ড কেইন্স পড়ছে ইংরেজি ভাষার শক্তি ও মাধুর্য অনুভবের জন্য- এমনই ব্যতিক্রমী দৃষ্টি যে ছাত্রের তার সম্পর্কে আর অধিক কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। তার জীবনবোধের বিস্তারের পরিচয় আমরা পাই এখানে। এরপর তিনি যা লিখেছেন তা আমাকে যুগপৎ বিস্মিত ও অভিভূত করে। আমরা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের পতনের পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খুব বেশি বিশ্লেষণধর্মী হইনি, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বকে যেন দুই দলের হারজিৎ খেলা হিসেবে দেখেছি, আকস্মিক এ মহাপতন যে গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টিপাত করিনি।

আহমদুল কবির লিখেছেন- ‘এম এ ক্লাসে ডক্টর দাশগুপ্ত যে বিষয়টি আমাদের পড়াতেন তা সহজ ভাষায় দাঁড়ায় Socialism বনাম Capitalism, কোনটি মানুষের জীবনে সম্পূর্ণতা এনে দেয়। স্কুলে পড়ার সময় থেকে What is Marxism ও আর একটি চটি বই Dialectical and Historical Materialism প্রায় মুখস্থ ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিনের লেখা বেশ কিছু পড়ে ফেলেছিলাম। ডক্টর দাশগুপ্ত অননুকরণীয় ভাষায় একদিকে যেমন সমাজতন্ত্র বুঝিয়েছেন, তেমনি ধনতন্ত্র বুঝাতেও তার বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি। এই দুই সমাজব্যবস্থার বিশ্লেষণ করে তার মন্তব্য যেটুকু মনে আছে, তা এই- The minimum requirements of a person must be met by the Society through the State, thereafter variety is the spice of life. আমার ষাট বছরের সমাজদর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি গুরুদেবের এই শেষ কথাটির ভিত্তির ওপর। আজ সারা পৃথিবীর দিকে তাকালে সমাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সব দেশেই এ মন্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এটুকু বলে গুরুদেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।’

আহমদুল কবির ঝকঝকে আধুনিক কেতাদুরস্ত মিতভাষী সুদর্শন দীর্ঘদেহী ব্যবসা-সফল ব্যক্তি, তিনি ভিড়ের মাঝেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। তবে পারতপক্ষে তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে উদ্ভাসিত করতে চাইতেন না, আজীবন ছিলেন কিছুটা আড়ালে, আজকের আত্মপ্রচারে নিমজ্জিত সমাজে তার এমন জীবনাচরণ একান্তই বেখাপ্পা ঠেকবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আহমদুল কবির লেখালেখি বিশেষ করেননি, তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে তার কর্মে, রাজনৈতিক সামাজিক উদ্যোগে এবং ‘সংবাদ’-এর চারিত্র্যে, সেকুল্যার ও প্রগতিপন্থি অবস্থানে। রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে অগ্রভূমিকা, তবে মূলত নেপথ্যে, অন্যকে ও সবাইকে এগিয়ে যেতে ভূমিকা পালনে। উদার অসাম্প্রদায়িক আধুনিক জীবনবোধ তিনি আমৃত্যু লালন করেছেন, সমাজে এ মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে পীড়িত বোধ করেছেন। একটি ছোট অথচ তাৎপর্যময় ঘটনা বিবৃত করে তার জীবনদর্শন তুলে ধরা যায়। প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে যোগাযোগ করে নবীন এক রিপোর্টার বণিক দাস এসেছিল তার সাক্ষাৎকার নিতে। ঘরে ঢুকে সেই তরুণ হাত তুলে সালাম করলো আহমদুল কবিরকে। তার আসসালামু আলাইকুম শুনে আহমদুল কবির জানতে চাইলেন এমন সম্ভাষণ করা তার নিজের ধর্মাচারে রয়েছে কিনা। উত্তর আমাদের সবার জানা। আহমদুল কবির সেই তরুণকে পত্রপাঠ বিদায় দিয়ে সবসময়ে স্ব-ধর্ম ও স্ব-আচার অনুসরণের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

বাঙালি সমাজের যা কিছু শ্রেষ্ঠ, সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতার যে সৌন্দর্য, জীবনদর্শনে উদারবাদিতার যে শক্তি, তার প্রতীক ছিলেন আহমদুল কবির। তার কাছ থেকে আমাদের দীক্ষা নেয়ার রয়েছে অনেক।

৭৪ বছরে পদার্পণ সংবাদ-এর

ছবি

জাজিরা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি পলাশ খান, সম্পাদক শাওন বেপারী

ছবি

দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি,বিভিন্ন ভাবে বারবার গণমাধ্যমকে বাঁধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে

ছবি

রংপুরে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন, দুই বছরে ৫ কোটি টাকা ‘হাতিয়ে নেওয়ার’ অভিযোগ

ছবি

সপ্তম বর্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব

ছবি

গাজীপুর প্রেসক্লাবে দোয়া মাহফিল ও ইফতার অনুষ্ঠিত

ছবি

টাঙ্গাইল জেলা সাংবাদিক ফোরামের ইফতার-দোয়া মাহফিল

দেশকে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকরা বড় ভূমিকা পালন করেন : তোফায়েল আহমেদ

ছবি

“এপেক্স ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিস্ট কাউন্সিল”এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের কমিটি গঠিত

ছবি

সাংবাদিক সাব্বিরের ওপর হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার দাবি

ছবি

ডিইউজে নির্বাচন, সভাপতি পদে সমান ভোট সোহেল-তপুর, সাধারণ সম্পাদক আকতার

সাংবাদিক শফিউজ্জামানকে কারাগারে পাঠানোয় সম্পাদক পরিষদের নিন্দা

ছবি

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক ফোরামের নেতৃত্বে সাব্বির-ইকা

ছবি

১০৬ বারের মতো পেছালো সাগর-রুনি হত্যা মামলার প্রতিবেদন

ছবি

মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক কমান্ডের নির্বাচন

ছবি

নোয়াবের নতুন কমিটি, আবারও সভাপতি এ.কে.আজাদ

‘সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ৭০ অনুচ্ছেদ বাধা হবে না’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের এক যুগপূর্তি

মানিক সাহাসহ সাংবাদিক হত্যাকা-ে জড়িতদের চিহ্নিত করতে গণতদন্ত কমিশন গঠনের দাবি

ছবি

উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে ক্র্যাবের ভোটগ্রহণ

ছবি

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুবার্ষিকী কাল

ছবি

নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের নেতৃত্বে মতিন-ফয়সাল

ছবি

অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে নোয়াবের মতবিনিময় সভা

ছবি

শিশুবিষয়ক খবরে গণমাধ্যমকে বেশী গুরুত্ব দেয়ার আহবান

ছবি

নরসিংদী প্রেস ক্লাবের নব নির্বাচিত কার্যনির্বাহী পরিষদের শপথ গ্রহণ

চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের প্রয়াত সাংবাদিকদের স্মরণে সভা

ছবি

গুজব রোধে গণমাধ্যমকর্মীদের কর্মশালা অনুষ্ঠিত

ছবি

সাংবাদিকরা ভুল করলে ৫ লক্ষ টাকা জরিমানা হবে - প্রেস কাউন্সিল চেয়ারম্যান

ছবি

ক্ষমা না চাইলে বিএনপির সংবাদ পরিহারের ডাক ডিইউজের

মাহেলা বেগম

ছবি

বর্ণাঢ্য আয়োজনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

ছবি

সাগর-রুনি হত্যা : ১০২ বার পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে

ছবি

ভিসা নীতিঃ সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ব্যাখ্যা

বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

ছবি

কপিরাইট বিল পাস

tab

মিডিয়া

আহমদুল কবির কখনো প্রাসঙ্গিকতা হারাবেন না

মফিদুল হক

বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৩

আহমদুল কবির বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে ‘সংবাদ’ পত্রিকার নবযাত্রা সূচিত হয়েছিল তার হাতে। ব্যবস্থাপনা ছিল তার দায়িত্ব এবং একঝাঁক প্রতিভাবান নবীন সাংবাদিক সমবেত হয়েছিল ‘সংবাদ’ ঘিরে। আরও ছিল অভিজ্ঞ কয়েকজন পরিপক্ব সাংবাদিক এবং বামপন্থায় সমর্পিত ত্যাগী মানুষেরা।

পাকিস্তান আমলে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে জাতীয় জাগরণে সাংবাদিকতার যে ভূমিকা সেখানে ‘সংবাদ’ অন্যতর ও বিশিষ্ট হিসেবে স্বীকৃত। বামপন্থি আদর্শের পতাকাবাহী এই সংবাদপত্রের অবদানের কান্ডারি ছিলেন আহমদুল কবির। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ পর্বে বিশেষত ১৯৭৫ পরবর্তী কৃষ্ণ সময়ে ‘সংবাদ’ পরিচালনার পাশাপাশি সম্পাদনার দায়িত্ব পালন তিনি গ্রহণ করেন এবং তার ব্যক্তিত্বের মতোই ঝকঝকে আধুনিক চিন্তা ও প্রগতিপন্থার বাহক হিসেবে ‘সংবাদ’ রচনা করে আরেক অধ্যায়।

ইতোমধ্যে দেশে ও সমাজে অনেক পরিবর্তন ঘটে যায়। বিত্তের শক্তিতে বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবে করপোরেট সত্তা নিয়ে পত্রিকাগোষ্ঠীর আগমন বদলে দেয় সাংবাদিকতার চেহারা, বৈভব শাসিত বিত্ত-তাড়িত এই নতুন জগতে ‘সংবাদ’ হয়তো কিছুটা ম্রিয়মাণ, তবে সংবাদের প্রাণপুরুষ আহমদুল কবিরের অবদান পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ আমাদের জন্য একান্ত জরুরি, সংবাদপত্র ও সমাজের মেলবন্ধন সূত্রে আগামীর বিকাশের প্রয়োজনে। ফলে আহমদুল কবির প্রাসঙ্গিকতা কখনো হারাবেন না এবং নিজেদের প্রয়োজনেই তাকে আমাদের জানতে হবে।

আহমদুল কবির পূর্ববাংলার হিন্দু-মুসলিম সমন্বিত সমাজের শক্তিময়তার অনন্য উদাহরণ। তার জীবনদর্শনে সেকুল্যার দৃষ্টিচিন্তার যে গভীর অবস্থান এবং সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক ন্যায্য বিষয়ে আস্থা, তাতে আজকের পটভূমিকায় তাকে মনে হবে ভবিষ্যৎমুখী এক কর্মবীর, যিনি জীবনের অনেক কিছু প্রত্যাখ্যান করে নিজের অবস্থানে ছিলেন স্থির। তার এই জীবন দর্শনের উৎস খুঁজতে গিয়ে আমি তার তারুণ্যের দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে বিস্ময় বোধ করি।

চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিয়ে যে তরুণেরা নবচিন্তা ও কর্মের পথিকৃৎ হয়েছিলেন আহমদুল কবির সেখানে ছিলেন নেতৃস্থানীয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ছিল ধীমান চিন্তাশীল টগবগে তরুণদের সমাবেশস্থল। তিনি ছিলেন এই হল সংসদের নির্বাচিত সহ-সভাপতি, আর ছিলেন অর্থনীতির স্বনামধন্য শিক্ষক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের প্রিয় ছাত্র।

এ কে দাশগুপ্তের সঙ্গে বাংলার তৎকালীন জাগরণের এক বিশেষ যোগ রয়েছে। দেশভাগের পর তিনি ঢাকা ছেড়ে কলকাতা যেতে বাধ্য হন, তার আগে ঢাকায় তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন জ্ঞানসাধক আবদুর রাজ্জাক, আশালতা সেনের পুত্র খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ সমর সেন, পঞ্চাশের দাঙ্গার পর তাকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে হতে হয় দেশান্তরী। পরে কলকাতায় অধ্যাপনাকালে এ কে দাশগুপ্তের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন অমর্ত্য সেন, সুখময় চক্রবর্তী, অশোক মিত্র প্রমুখ; যারা ভারতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ পালাবদলের রূপকার হয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এ কে দাশগুপ্তের আরেক ছাত্র যে ছিলেন আহমদুল কবির, এটা আমি জেনেছি অনেক পরে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক এ কে দাশগুপ্তকে আজীবন ‘মাস্টারমশাই’ হিসেবে সম্বোধন করে গেছেন, আর আহমদুল কবিরের কাছে তিনি ছিলেন ‘গুরুদেব’। আমার দুঃখ হয়, আহমদুল কবির, আবদুর রাজ্জাক এবং এ কে দাশগুপ্তের বৃত্তটির তত্ত্ব-তালাশ বিশেষ করিনি, যেটুকু আমার জানা তা রাজ্জাক স্যারের সুবাদেই। স্বাধীনতার পর অধ্যাপক রাজ্জাক যখন প্রথম ভারতে গেলেন তখন মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল দীর্ঘকাল পর। পরে একবার তিনি মাস্টারমশাইকে ঢাকায়ও নিয়ে এসেছিলেন। তখন কিংবা এর আগে-পরে গুরুদেবের সঙ্গে শিষ্য আহমদুল কবিরের দেখা হয়েছিল কিনা- সেটা আর জানা হয়নি। তবে অমিয়কুমার দাশগুপ্তের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকগ্রন্থে দুই পাতার যে গুরুদক্ষিণা প্রদান করেছিলেন আহমদুল কবির- সেই রচনা তার মিতভাষিতার পরিচয় যেমন বহন করে, তেমনি মেলে ধরে জীবনদীক্ষা।

গুরু-শিষ্য উভয়ের মন-মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায় এ সংক্ষিপ্ত লেখায়। ‘আমার সমাজদর্শনের শিক্ষক’ এই শিরোনামের রচনার পুরোটাই উদ্ধৃতিযোগ্য, তবে এখানে সামান্যই উল্লেখ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র অমিয়কুমার দাশগুপ্ত যে ১৯২৬ সালে একই বিশ^বিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সেটা আহমদুল কবিরের লেখা থেকে জানতে পারি। এর মাঝে তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে The Conception of Surplus in Theoretical Economics বিষয়ে ডক্টরেট করে আসেন। তার টিউটোরিয়াল ক্লাস সম্পর্কে ছাত্র আহমদুল কবির লিখেছেন- ‘ডক্টর দাশগুপ্ত আলোচনায় সমন্বয় সাধন করতেন এবং পরের ক্লাসের বিষয় বলে দিতেন। এই টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলো করে ও ক্লাসে তার লেকচারগুলো একটু মন দিয়ে শুনে পাঠ্যবইয়ের দিকে খুব বেশি নজর দিতে হয়নি আমাকে। অবশ্য ভাষার দিক দিয়ে প্রায় সাহিত্য বললেও চলে Lord Keynes-Gi General Theory of Employment, Interest and Money. ইংরেজি শেখার জন্য পড়তাম, পরীক্ষার আগে নিজের ও বন্ধু-বান্ধবদের নোটগুলো পড়ে নিয়েই পরীক্ষা দিয়েছি।’

অর্থনীতির একজন শিক্ষার্থী জন মেইনার্ড কেইন্স পড়ছে ইংরেজি ভাষার শক্তি ও মাধুর্য অনুভবের জন্য- এমনই ব্যতিক্রমী দৃষ্টি যে ছাত্রের তার সম্পর্কে আর অধিক কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। তার জীবনবোধের বিস্তারের পরিচয় আমরা পাই এখানে। এরপর তিনি যা লিখেছেন তা আমাকে যুগপৎ বিস্মিত ও অভিভূত করে। আমরা রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্রের পতনের পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খুব বেশি বিশ্লেষণধর্মী হইনি, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বকে যেন দুই দলের হারজিৎ খেলা হিসেবে দেখেছি, আকস্মিক এ মহাপতন যে গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টিপাত করিনি।

আহমদুল কবির লিখেছেন- ‘এম এ ক্লাসে ডক্টর দাশগুপ্ত যে বিষয়টি আমাদের পড়াতেন তা সহজ ভাষায় দাঁড়ায় Socialism বনাম Capitalism, কোনটি মানুষের জীবনে সম্পূর্ণতা এনে দেয়। স্কুলে পড়ার সময় থেকে What is Marxism ও আর একটি চটি বই Dialectical and Historical Materialism প্রায় মুখস্থ ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিনের লেখা বেশ কিছু পড়ে ফেলেছিলাম। ডক্টর দাশগুপ্ত অননুকরণীয় ভাষায় একদিকে যেমন সমাজতন্ত্র বুঝিয়েছেন, তেমনি ধনতন্ত্র বুঝাতেও তার বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি। এই দুই সমাজব্যবস্থার বিশ্লেষণ করে তার মন্তব্য যেটুকু মনে আছে, তা এই- The minimum requirements of a person must be met by the Society through the State, thereafter variety is the spice of life. আমার ষাট বছরের সমাজদর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি গুরুদেবের এই শেষ কথাটির ভিত্তির ওপর। আজ সারা পৃথিবীর দিকে তাকালে সমাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক সব দেশেই এ মন্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এটুকু বলে গুরুদেবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।’

আহমদুল কবির ঝকঝকে আধুনিক কেতাদুরস্ত মিতভাষী সুদর্শন দীর্ঘদেহী ব্যবসা-সফল ব্যক্তি, তিনি ভিড়ের মাঝেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম। তবে পারতপক্ষে তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে উদ্ভাসিত করতে চাইতেন না, আজীবন ছিলেন কিছুটা আড়ালে, আজকের আত্মপ্রচারে নিমজ্জিত সমাজে তার এমন জীবনাচরণ একান্তই বেখাপ্পা ঠেকবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আহমদুল কবির লেখালেখি বিশেষ করেননি, তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে তার কর্মে, রাজনৈতিক সামাজিক উদ্যোগে এবং ‘সংবাদ’-এর চারিত্র্যে, সেকুল্যার ও প্রগতিপন্থি অবস্থানে। রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে অগ্রভূমিকা, তবে মূলত নেপথ্যে, অন্যকে ও সবাইকে এগিয়ে যেতে ভূমিকা পালনে। উদার অসাম্প্রদায়িক আধুনিক জীবনবোধ তিনি আমৃত্যু লালন করেছেন, সমাজে এ মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখে পীড়িত বোধ করেছেন। একটি ছোট অথচ তাৎপর্যময় ঘটনা বিবৃত করে তার জীবনদর্শন তুলে ধরা যায়। প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে যোগাযোগ করে নবীন এক রিপোর্টার বণিক দাস এসেছিল তার সাক্ষাৎকার নিতে। ঘরে ঢুকে সেই তরুণ হাত তুলে সালাম করলো আহমদুল কবিরকে। তার আসসালামু আলাইকুম শুনে আহমদুল কবির জানতে চাইলেন এমন সম্ভাষণ করা তার নিজের ধর্মাচারে রয়েছে কিনা। উত্তর আমাদের সবার জানা। আহমদুল কবির সেই তরুণকে পত্রপাঠ বিদায় দিয়ে সবসময়ে স্ব-ধর্ম ও স্ব-আচার অনুসরণের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

বাঙালি সমাজের যা কিছু শ্রেষ্ঠ, সংস্কৃতির সমন্বয়বাদিতার যে সৌন্দর্য, জীবনদর্শনে উদারবাদিতার যে শক্তি, তার প্রতীক ছিলেন আহমদুল কবির। তার কাছ থেকে আমাদের দীক্ষা নেয়ার রয়েছে অনেক।

back to top