alt

জাতীয়

বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঠেকাতে প্রয়োজন স্মার্ট গ্রিড

অতীতেও এমন হয়েছে, ২০১৪ সালে ১৭ ঘণ্টা ব্ল্যাকআউট ছিল

ফয়েজ আহমেদ তুষার : বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২

গ্রিড বিপর্যয়ে আবারও ধাক্কা খেলো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) জাতীয় গ্রিডে ত্রুটির কারণে ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলা দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎহীন ছিল। এ ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও কয়েকবার এ ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছিল ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর, যা ব্ল্যাকআউট হিসেবে অনেকেরই মনে গেঁথে আছে। সে সময় সারাদেশ ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল।

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম। তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি হলেও সঞ্চালন ব্যবস্থার একেবারেই উন্নয়ন হয়নি। এজন্য পিজিসিবি দায় এড়াতে পারে না। তাদের মান্ধাত আমলে অ্যানালগ পদ্ধতির লোড ব্যবস্থাপনাই জাতীয় গ্রিডকে ঝুঁকিপূর্ণ করছে।

গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ

মূলত বিদ্যুৎ প্রবাহের ফ্রিকোয়েন্সিতে (তরঙ্গ) গরমিলের কারণে ব্ল্যাকআউটের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ প্রবাহের পরিমাণ কমবেশি হলে বড় রকমের বিপর্যয় এড়াতে নিজ থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। একে বলে গ্রিড ট্রিপ (বিপর্যয়)।

বিভিন্ন কারণে সঞ্চালনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে ৫০ মেগাহার্টজ তরঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। কেন কারণে এটি বেড়ে গেলে কিংবা কমে গেলে দেখা দেয় গ্রিড ট্রিপ। প্রাথমিক অবস্থায় মঙ্গলবারের ব্ল্যাকআউটের মূল কারণ ছিল এই গ্রিড ট্রিপ। তবে ঠিক কী কারণে এ গ্রিড বিপর্যয় ঘটল, তা এখনও জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ব্যবস্থা এখনও মান্ধাতা আমলের। এতে প্রায়ই ফ্রিকোয়েন্সিতে ভারসাম্যজনিত তারতম্য ঘটে। বড় রকমের হেরফের হলেই গ্রিড ট্রিপ হয়।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি সাবস্টেশনের মাঝখানে যে ইন্টারকানেকশন রয়েছে, সেখানেই মূলত সমস্যা। কিন্তু সমস্যাটা কেন হলো সেটা এখনও জানা যায়নি। তা উদ্ঘাটনের জন্য আমাদের অভিজ্ঞ টিম সেখানে গেছে। তদন্ত কমিটি ফিরে এলে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।’ তবে বিস্তারিত তথ্য পেতে কয়েকদিন সময় লাগবে বলে জানান তিনি।

পিজিসিবির তদন্ত কমিটি

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে গেছেন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী ইয়াকুব এলাহি চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কন্টোল রুম পরিদর্শন করেন। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন মেশিনারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিকেল সাড়ে ৩টায় সেখান থেকে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে রওনা দেন তারা।

তদন্ত কমিটির প্রধান প্রকৌশলী ইয়াকুব এলাহি চৌধুরী স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে দেশের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওয়ার কন্টোল রুমগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সবগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কী কারণে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সেটি জানা যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবারের গ্রিড বিপর্যয়ের পর থেকে ঘোড়াশালে ৫ নম্বর ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ইউনিটটি চালু করতে কাজ চলছে বলে জানান বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম।

২০১৪ সালের নভেম্বরের ব্ল্যাকআউটের পর ঘটনা তদন্তে সরকারি কমিটি হয়েছিল। তদন্ত শেষে কমিটি একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল, যাতে কারিগরি ত্রুটি, দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা এবং নির্দেশ পালনে অবহেলাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল করা, কারিগরি সব ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ২০ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে ৮ বছরেও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এরপর ২০১৭ সালে গ্রিড বিপর্যয়ে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩২ জেলা। সর্বশেষ গত মাসে গ্রিড বিপর্যয়ে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল অঞ্চল চল্লিশ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। এর আগে ২০০২, ২০০৭, ২০০৯ সালেও গ্রিড বিপর্যয় হয়েছিল বলে সংর্শ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম আসাদুল হক বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হলেও যেখান থেকে বা যার মাধ্যমে ট্রান্সমিশন ঘটবে, সেখানকার সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হয়নি। ট্রান্সমিশন ও সরবরাহ লাইনে মানহীন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য বারবার এমন বিপর্যয় ঘটছে। এছাড়া ভোক্তা পর্যায়ে নজরদারি থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক অনেক দুর্বলতা এ ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।’

বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, ‘জেনারেশন, ডিস্ট্রিবিউশনে দুর্বলতা আছে। ফলে সমস্যাটা সামগ্রিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ঘিরে ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টারের (এনএলডিসি) এটাকে কার্যকর করার উদ্যোগ দেখা যায় না। এই বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত।’ তিনি বলেন, যখন গ্রিডের সঙ্গে গ্রিড কোডের নির্দেশনার সমন্বয় ঘটে না, তখন এ ধরনের বিপর্যয় ঘটে। সরবরাহের বিপরীতে চাহিদা যখন মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যায়, তখন জেনারেটরগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই এমন বিপর্যয় ঘটে যায়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনএলডিসি কোন এলাকায় কত ঘণ্টা, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও উৎপাদন হবে, তা এখনও ফোনে ফোনে ঠিক করে দেয়। এতে একটি ছোট বিপর্যয় সামাল দিতেও লেগে যায় দীর্ঘ সময়। এছাড়া নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, দীর্ঘদিনের পুরাতন জেনারেটর ব্যবহার করা বেসরকারি পর্যায়ের রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গ্রিডে সবসময় মানসম্পন্ন (একুরেইট ফ্রিকোয়েন্সি) বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে না পারায় গ্রিডে মানসম্পন্ন বিদ্যুতের ঘাটতি রয়ে গেছে।

স্মার্ট গ্রিড কী

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিক ও সর্বশেষ প্রযুক্তি হচ্ছে স্মার্ট গ্রিড। এই ব্যবস্থায় বিতরণ লাইনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় একজন গ্রাহক নিজে যেমন তার বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তেমনি বিতরণ কোম্পানিও গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারে, সে অনুসারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। এতে সিস্টেম লস কম হয়।

এছাড়া বিতরণ ব্যবস্থায় কোন ত্রুটি থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করে এর সমাধানও জানিয়ে দেয় স্মার্ট গ্রিড।

আশির দশকে প্রযুক্তিবিদরা যখন বিদ্যুতের মিটার আপগ্রেড করার কথা ভাবছিলেন তখন তাতে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার কথা ভাবা হয়। সেই থেকেই স্মার্ট গ্রিড ধারণার উৎপত্তি। চীন, কোরিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত অনেক দেশেই এখন স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম।

অনেক সময় ট্রান্সমিশন (সঞ্চালন) লাইনের ত্রুটি খুঁজে পেতে অনেক সময়ের অপচয় হয়। কিন্তু স্মার্ট গ্রিডে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় সহজেই সমস্যা শনাক্ত করে এর সমাধান করা যায়। এই স্মার্ট গ্রিড পিক টাইম এবং অফ পিক টাইমে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে; এর খরচের আলাদা হিসাব রাখতে পারে। স্মার্ট মিটারের গ্রাহকরাও সহজেই তাদের হিসাব ও খরচ সম্পর্কে জানতে পারেন।

স্মার্ট গ্রিড চালু করতে প্রধান কাজ হচ্ছে পাওয়ার স্টেশন, সাবস্টেশন, ট্রান্সমিশন লাইন, খুঁটি এবং কাস্টমারদের পৃথক অবস্থানের ভৌগোলিক তথ্য বা জিআইএস নির্ণয় করা। স্মার্ট গ্রিডে অনেক ধরনের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সবগুলো একত্রে কাজ করার জন্য প্রয়োজন একটা মেইন ব্রেইন। যাকে এডিএমএস বলে। এডিএমএসের সাহায্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সবকিছু রিয়েল টাইম মনিটরিং করা হয়।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল শতভাগ বিদ্যুতায়ন। সেটা সম্পন্ন হয়েছে। এখন আমাদের দৃষ্টি হচ্ছে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে।’

‘আমরা স্মার্ট গ্রিডে যাওয়ার কাজ আরও আগেই শুরু করেছি। বিভিন্ন এলাকায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পুরো দেশ স্মার্ট গ্রিড করতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। সঞ্চালন ও বিতরণে আমরা সরকারের পাশপাশি প্রাইভেট এবং ফরেন ইনভেস্টমেন্টের কথাও বলছি।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্মার্ট গ্রিড নির্ভরযোগ্য ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও এটি কার্যকর অবদান রাখবে। একই সঙ্গে সময় ও অর্থের সাশ্রয় ঘটবে। আমরা স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার কাজ শুরু করেছি। ক্রমান্বয়ে সারাদেশ স্মার্ট গ্রিডের আওতায় আনা হবে।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) আওতায় রাজধানীর ধানমন্ডি, আজিমপুর, গ্রিনরোড, লালমাটিয়া ও আসাদগেট এলাকায় স্মার্ট গ্রিড স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই পাঁচ এলাকায় নতুন সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া স্মার্ট গ্রিড নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও থাকবে একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এফডিএন) এই প্রকল্পে ১২ মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করবে। এই পাইলট প্রকল্পের সুফল বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে অন্য এলাকায় স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ করা হবে।

পাওয়ার সেল যা বলছে

গ্রিড বিপর্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের পরার্মশক প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন সংবাদকে বলেন, ‘আমরা স্মার্ট গ্রিডে যাওয়ার উদ্যোগ আরও আগেই নিয়েছি। এটা হয়ে গেলে গ্রিডে সমস্যা খুঁজে পেতে এবং তার সমাধান করতে সময় লাগবে না।’

তিনি জানান, ইউএস ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ইউএসটিডিএ)’ এবং বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নের একটি কারিগরি (টেকনিক্যাল) প্রতিবেদন বানিয়ে সরকারকে দিয়েছে। স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগকে কী কী করতে হবে, সে বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে পরামর্শ রয়েছে।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আমরা তাদের (ইউএসটিডিএ এবং বিসিজি) বলেছি স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থায় যেতে সার্বিক সহায়তা করতে। এমনকি অর্থায়নের বিষয়ে তাদের বলা হয়েছে। আমরা প্রথমে ডিপিডিসি এবং পিজিসিবির সামগ্রিক ব্যবস্থা স্মার্ট গ্রিডের আওতায় আনতে কাজ করব।’

ইউএসটিডিএ ও বিসিজির রোডম্যাপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তবে ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলেও এখনও গ্রাহকের জন্য স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। ফলে স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

এ সংক্রান্ত কারিগরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থায় স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। উচ্চতর ফ্রিকোয়েন্সি সংকট, ট্রান্সমিশন লসসহ লোড ব্যবস্থা হবে সর্বাধুনিক। সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল তৈরি করা যাবে অনলাইনে। ‘নন টেকনিক্যাল’ লোকসানও বন্ধ হয়ে যাবে।

ছবি

চট্টগ্রামে ২৯ উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

ছবি

ডিএমপির বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৪৭২

ছবি

তিন বছরে নাগরিকত্ব ছেড়েছেন ৮৬২ বাংলাদেশি

ছবি

এক মাসের ব্যবধানে ফের বাড়লো এলপিজির দাম

ছবি

ভবিষ্যতে বিদ্যুতের সমস্যা হবে না: প্রধানমন্ত্রী

ওয়াসার এমডির নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুমনের রিট

ছবি

নভেম্বরে ৪৬৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৫৪ জনের প্রাণহানি

ছবি

চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি প্যারেডে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

৯ সরকারি হাইস্কুল প্রকল্পে অনিয়ম, অগ্রিম বিল পরিশোধের পর নির্মাণ কাজে স্থবিরতা

‘প্রতিবন্ধী মানুষের নেতৃত্বে আসতে হবে’

ছবি

১৫ বছর পর লাভের মুখ দেখলো বিটিসিএল

ছবি

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টির আভাস

ছবি

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষীণ সম্ভাবনাও দেখি না : সন্তু লারমা

ছবি

পার্বত্য অঞ্চলের শান্তিচুক্তি: বাস্তবায়নে ‘বিশেষ মহল’ অপ্রচার

‘নারীরা সংগ্রাম করলেও ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে কেবল পুরুষরাই’

ছবি

অপরাধীদের দিয়ে পাহাড়কে অশান্ত করেছে জিয়া : সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী

ছবি

প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে পদ সংখ্যা বাড়ছে

ছবি

দেশে প্রথম মেরুদণ্ড জোড়ালাগা দুই শিশু আলাদা করা হবে

প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে ৫২ জনের পদোন্নতি

ছবি

দেশে একবছরে এইডসে মারা গেছেন ২৩২ জন

ছবি

ডিসেম্বরকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস ঘোষণার দাবি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ছবি

‘গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত’

ছবি

বিজয়ের মাস শুরু

ছবি

সব বয়সী মানুষকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী

ছবি

২ কোটি ২০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল কিনবে সরকার

ছবি

সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রস্তুত থাকতে হবে : সেনাপ্রধান

ছবি

বাংলাদেশ সবসময় ভারতের কাছ থেকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায় : ভার্মা

ছবি

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ

ছবি

খালেদা জিয়া সমাবেশে যোগ দিলে দেখবে আদালত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ছবি

দশ দফা দাবিতে ট্রেন আটকে যাত্রীদের অবস্থান কর্মসূচি

ছবি

বিশ্বকাপ আয়োজনে ‘৪০০-৫০০ শ্রমিক’ মারা গেছে, স্বীকার করল কাতার

ছবি

করোনা টিকার ৪র্থ ডোজ দেয়ার সুপারিশ

ছবি

ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান ১৩ বছরে ৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বেতন নিয়েছেন, হাইকোর্টে প্রতিবেদন

ছবি

সংকটকালে ১০ শতাংশ গ্যাস উৎপাদন বাড়ালো এসজিএফএল

সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়েছে

ছবি

কর ব্যবস্থাপনা গণমুখী করতে সবাইকে কাজ করে যেতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

tab

জাতীয়

বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঠেকাতে প্রয়োজন স্মার্ট গ্রিড

অতীতেও এমন হয়েছে, ২০১৪ সালে ১৭ ঘণ্টা ব্ল্যাকআউট ছিল

ফয়েজ আহমেদ তুষার

বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২

গ্রিড বিপর্যয়ে আবারও ধাক্কা খেলো দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) জাতীয় গ্রিডে ত্রুটির কারণে ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলা দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎহীন ছিল। এ ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও কয়েকবার এ ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছিল ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর, যা ব্ল্যাকআউট হিসেবে অনেকেরই মনে গেঁথে আছে। সে সময় সারাদেশ ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন ছিল।

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম। তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রগতি হলেও সঞ্চালন ব্যবস্থার একেবারেই উন্নয়ন হয়নি। এজন্য পিজিসিবি দায় এড়াতে পারে না। তাদের মান্ধাত আমলে অ্যানালগ পদ্ধতির লোড ব্যবস্থাপনাই জাতীয় গ্রিডকে ঝুঁকিপূর্ণ করছে।

গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ

মূলত বিদ্যুৎ প্রবাহের ফ্রিকোয়েন্সিতে (তরঙ্গ) গরমিলের কারণে ব্ল্যাকআউটের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ প্রবাহের পরিমাণ কমবেশি হলে বড় রকমের বিপর্যয় এড়াতে নিজ থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। একে বলে গ্রিড ট্রিপ (বিপর্যয়)।

বিভিন্ন কারণে সঞ্চালনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশে ৫০ মেগাহার্টজ তরঙ্গে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। কেন কারণে এটি বেড়ে গেলে কিংবা কমে গেলে দেখা দেয় গ্রিড ট্রিপ। প্রাথমিক অবস্থায় মঙ্গলবারের ব্ল্যাকআউটের মূল কারণ ছিল এই গ্রিড ট্রিপ। তবে ঠিক কী কারণে এ গ্রিড বিপর্যয় ঘটল, তা এখনও জানায়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও সঞ্চালন ব্যবস্থা এখনও মান্ধাতা আমলের। এতে প্রায়ই ফ্রিকোয়েন্সিতে ভারসাম্যজনিত তারতম্য ঘটে। বড় রকমের হেরফের হলেই গ্রিড ট্রিপ হয়।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি সাবস্টেশনের মাঝখানে যে ইন্টারকানেকশন রয়েছে, সেখানেই মূলত সমস্যা। কিন্তু সমস্যাটা কেন হলো সেটা এখনও জানা যায়নি। তা উদ্ঘাটনের জন্য আমাদের অভিজ্ঞ টিম সেখানে গেছে। তদন্ত কমিটি ফিরে এলে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে।’ তবে বিস্তারিত তথ্য পেতে কয়েকদিন সময় লাগবে বলে জানান তিনি।

পিজিসিবির তদন্ত কমিটি

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে গেছেন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী ইয়াকুব এলাহি চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কন্টোল রুম পরিদর্শন করেন। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন মেশিনারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিকেল সাড়ে ৩টায় সেখান থেকে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে রওনা দেন তারা।

তদন্ত কমিটির প্রধান প্রকৌশলী ইয়াকুব এলাহি চৌধুরী স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে দেশের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওয়ার কন্টোল রুমগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সবগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কী কারণে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সেটি জানা যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবারের গ্রিড বিপর্যয়ের পর থেকে ঘোড়াশালে ৫ নম্বর ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ইউনিটটি চালু করতে কাজ চলছে বলে জানান বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম।

২০১৪ সালের নভেম্বরের ব্ল্যাকআউটের পর ঘটনা তদন্তে সরকারি কমিটি হয়েছিল। তদন্ত শেষে কমিটি একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল, যাতে কারিগরি ত্রুটি, দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা এবং নির্দেশ পালনে অবহেলাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল করা, কারিগরি সব ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ২০ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে ৮ বছরেও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এরপর ২০১৭ সালে গ্রিড বিপর্যয়ে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩২ জেলা। সর্বশেষ গত মাসে গ্রিড বিপর্যয়ে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল অঞ্চল চল্লিশ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। এর আগে ২০০২, ২০০৭, ২০০৯ সালেও গ্রিড বিপর্যয় হয়েছিল বলে সংর্শ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম আসাদুল হক বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো হলেও যেখান থেকে বা যার মাধ্যমে ট্রান্সমিশন ঘটবে, সেখানকার সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা হয়নি। ট্রান্সমিশন ও সরবরাহ লাইনে মানহীন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য বারবার এমন বিপর্যয় ঘটছে। এছাড়া ভোক্তা পর্যায়ে নজরদারি থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক অনেক দুর্বলতা এ ধরনের বিপর্যয়ের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।’

বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, ‘জেনারেশন, ডিস্ট্রিবিউশনে দুর্বলতা আছে। ফলে সমস্যাটা সামগ্রিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে ঘিরে ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টারের (এনএলডিসি) এটাকে কার্যকর করার উদ্যোগ দেখা যায় না। এই বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া উচিত।’ তিনি বলেন, যখন গ্রিডের সঙ্গে গ্রিড কোডের নির্দেশনার সমন্বয় ঘটে না, তখন এ ধরনের বিপর্যয় ঘটে। সরবরাহের বিপরীতে চাহিদা যখন মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যায়, তখন জেনারেটরগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অল্প সময়ের ব্যবধানেই এমন বিপর্যয় ঘটে যায়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনএলডিসি কোন এলাকায় কত ঘণ্টা, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও উৎপাদন হবে, তা এখনও ফোনে ফোনে ঠিক করে দেয়। এতে একটি ছোট বিপর্যয় সামাল দিতেও লেগে যায় দীর্ঘ সময়। এছাড়া নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, দীর্ঘদিনের পুরাতন জেনারেটর ব্যবহার করা বেসরকারি পর্যায়ের রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো গ্রিডে সবসময় মানসম্পন্ন (একুরেইট ফ্রিকোয়েন্সি) বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে না পারায় গ্রিডে মানসম্পন্ন বিদ্যুতের ঘাটতি রয়ে গেছে।

স্মার্ট গ্রিড কী

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিক ও সর্বশেষ প্রযুক্তি হচ্ছে স্মার্ট গ্রিড। এই ব্যবস্থায় বিতরণ লাইনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় একজন গ্রাহক নিজে যেমন তার বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তেমনি বিতরণ কোম্পানিও গ্রাহকের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারে, সে অনুসারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। এতে সিস্টেম লস কম হয়।

এছাড়া বিতরণ ব্যবস্থায় কোন ত্রুটি থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করে এর সমাধানও জানিয়ে দেয় স্মার্ট গ্রিড।

আশির দশকে প্রযুক্তিবিদরা যখন বিদ্যুতের মিটার আপগ্রেড করার কথা ভাবছিলেন তখন তাতে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার কথা ভাবা হয়। সেই থেকেই স্মার্ট গ্রিড ধারণার উৎপত্তি। চীন, কোরিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের উন্নত অনেক দেশেই এখন স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম।

অনেক সময় ট্রান্সমিশন (সঞ্চালন) লাইনের ত্রুটি খুঁজে পেতে অনেক সময়ের অপচয় হয়। কিন্তু স্মার্ট গ্রিডে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত থাকায় সহজেই সমস্যা শনাক্ত করে এর সমাধান করা যায়। এই স্মার্ট গ্রিড পিক টাইম এবং অফ পিক টাইমে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে; এর খরচের আলাদা হিসাব রাখতে পারে। স্মার্ট মিটারের গ্রাহকরাও সহজেই তাদের হিসাব ও খরচ সম্পর্কে জানতে পারেন।

স্মার্ট গ্রিড চালু করতে প্রধান কাজ হচ্ছে পাওয়ার স্টেশন, সাবস্টেশন, ট্রান্সমিশন লাইন, খুঁটি এবং কাস্টমারদের পৃথক অবস্থানের ভৌগোলিক তথ্য বা জিআইএস নির্ণয় করা। স্মার্ট গ্রিডে অনেক ধরনের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সবগুলো একত্রে কাজ করার জন্য প্রয়োজন একটা মেইন ব্রেইন। যাকে এডিএমএস বলে। এডিএমএসের সাহায্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সবকিছু রিয়েল টাইম মনিটরিং করা হয়।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম টার্গেট ছিল শতভাগ বিদ্যুতায়ন। সেটা সম্পন্ন হয়েছে। এখন আমাদের দৃষ্টি হচ্ছে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে।’

‘আমরা স্মার্ট গ্রিডে যাওয়ার কাজ আরও আগেই শুরু করেছি। বিভিন্ন এলাকায় পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পুরো দেশ স্মার্ট গ্রিড করতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। সঞ্চালন ও বিতরণে আমরা সরকারের পাশপাশি প্রাইভেট এবং ফরেন ইনভেস্টমেন্টের কথাও বলছি।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্মার্ট গ্রিড নির্ভরযোগ্য ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়েও এটি কার্যকর অবদান রাখবে। একই সঙ্গে সময় ও অর্থের সাশ্রয় ঘটবে। আমরা স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার কাজ শুরু করেছি। ক্রমান্বয়ে সারাদেশ স্মার্ট গ্রিডের আওতায় আনা হবে।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) আওতায় রাজধানীর ধানমন্ডি, আজিমপুর, গ্রিনরোড, লালমাটিয়া ও আসাদগেট এলাকায় স্মার্ট গ্রিড স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই পাঁচ এলাকায় নতুন সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া স্মার্ট গ্রিড নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও থাকবে একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রান্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এফডিএন) এই প্রকল্পে ১২ মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করবে। এই পাইলট প্রকল্পের সুফল বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে অন্য এলাকায় স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ করা হবে।

পাওয়ার সেল যা বলছে

গ্রিড বিপর্যয় সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের পরার্মশক প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন সংবাদকে বলেন, ‘আমরা স্মার্ট গ্রিডে যাওয়ার উদ্যোগ আরও আগেই নিয়েছি। এটা হয়ে গেলে গ্রিডে সমস্যা খুঁজে পেতে এবং তার সমাধান করতে সময় লাগবে না।’

তিনি জানান, ইউএস ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (ইউএসটিডিএ)’ এবং বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ (বিসিজি) স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নের একটি কারিগরি (টেকনিক্যাল) প্রতিবেদন বানিয়ে সরকারকে দিয়েছে। স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ বিভাগকে কী কী করতে হবে, সে বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে পরামর্শ রয়েছে।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আমরা তাদের (ইউএসটিডিএ এবং বিসিজি) বলেছি স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থায় যেতে সার্বিক সহায়তা করতে। এমনকি অর্থায়নের বিষয়ে তাদের বলা হয়েছে। আমরা প্রথমে ডিপিডিসি এবং পিজিসিবির সামগ্রিক ব্যবস্থা স্মার্ট গ্রিডের আওতায় আনতে কাজ করব।’

ইউএসটিডিএ ও বিসিজির রোডম্যাপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। তবে ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলেও এখনও গ্রাহকের জন্য স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। ফলে স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

এ সংক্রান্ত কারিগরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থায় স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। উচ্চতর ফ্রিকোয়েন্সি সংকট, ট্রান্সমিশন লসসহ লোড ব্যবস্থা হবে সর্বাধুনিক। সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল তৈরি করা যাবে অনলাইনে। ‘নন টেকনিক্যাল’ লোকসানও বন্ধ হয়ে যাবে।

back to top