রাজধানীর বিজয়নগরে গতকাল শুক্রবার রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মারধরে গুরুতর আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে অচেতন অবস্থায় ছিলেন তিনি। শনিবার,(৩০ আগস্ট ২০২৫) সকালে জ্ঞান ফিরলে চোখ মেলে তাকান। এরপরই তার সিটি স্ক্যান করানো হয়।
৪৮ ঘণ্টার আগে আশঙ্কামুক্ত বলা সম্ভব নয়: ঢামেক পরিচালক
চিকিৎসার খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলের নেতারা
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নুরের মাথার হাড়, নাক ও ডান পাশের চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে। মাথায় আঘাতের কারণে সামান্য রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং এক চোখে মারাত্মক ক্ষতি দেখা দিয়েছে। যদিও তিনি বর্তমানে স্থিতিশীল আছেন, তবে চিকিৎসকেরা ৪৮ ঘণ্টার আগে তাকে শঙ্কামুক্ত বলতে পারছেন না। চিকিৎসার জন্য উচ্চপর্যায়ের ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে নুরের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়া গতকাল শুক্রবার রাতে ও শনিবার নুরকে দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গেছেন সরকারের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা।
ঢামেকের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, গতকাল শুক্রবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে নুরুল হককে হাসপাতালে আনা হয়। সে সময় তার নাক থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং গজ ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রথমে তাকে জরুরি বিভাগের ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে (ওসেক) প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে রাত ১২টার দিকে তাকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
তখনই প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শনিবার সকালে মাথার সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে দেখা গেছে, তার মাথার হাড় ও চোয়ালের হাড় ভেঙেছে। নাকের হাড়ও ভেঙে গেছে। মাথার ভেতরে সামান্য রক্তক্ষরণ রয়েছে। চোখ-মুখ ফুলে গেছে এবং চোখের ভেতরে রক্ত জমেছে। তবে শরীরের অন্য কোথাও আঘাত পাওয়া যায়নি। অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও তা যে কোনো সময় সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। মস্তিষ্ক ও চোখে আঘাত থাকায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, নুরুল হকের চিকিৎসায় উচ্চপর্যায়ের ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে ও জ্ঞান ফিরেছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার আগে নুরুল হক আশঙ্কামুক্ত সেটি বলা সম্ভব নয়।
ঢামেক সূত্রে জানা গেছে, ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডে নিউরো সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, ক্যাজুয়ালটি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হয়েছেন। শনিবার বিকেলে মেডিকেল বোর্ড বৈঠক করে তার চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকেরা মনে করছেন, নুরুল হকের কোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার আপাতত প্রয়োজন হবে না। তবে তার অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হবে।
চিকিৎসার খোঁজ নিলেন
প্রধান উপদেষ্টা
নুরুল হক নুরের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার দুপুর ১টার দিকে নুরকে ফোন করে খোঁজ নেন তিনি। এ সময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন প্রধান উপদেষ্টা। গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ফোন করে নুরুল হক নুরকে দুপুর ১টায় ফোন করে শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। এ সময় নুর প্রধান উপদেষ্টাকে গতকাল শুক্রবার রাতের ঘটনার বিস্তারিত জানান। প্রধান উপদেষ্টা আশ্বস্ত করেছেন, এ ঘটনায় তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
এছাড়া চিকিৎসাধীন নুরুল হককে দেখতে ও তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তারা এ ঘটনার দুঃখ প্রকাশ করেন।
এছাড়া শুক্রবার রাত প্রায় ১২টার দিকে হাসপাতালে নুরুলকে দেখতে এসে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এ সময় গণঅধিকার পরিষদের অসংখ্য নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন। সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন এবং জরুরি বিভাগের সামনে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আইন উপদেষ্টা ঢামেকের জরুরি বিভাগে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে প্রায় আধঘণ্টা আটকে থাকার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ঢামেক বহির বিভাগ গেইট দিয়ে বের হয়ে যান তিনি।
গণধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনের ভাষ্য, তাদের মিছিলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে হামলা করা হয়। এর প্রতিবাদে মশাল মিছিল শেষে সংবাদ সম্মেলনের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের লাঠিপেটা করে। এতে তাদের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নুরসহ আহতদের প্রথমে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে রাতে নুরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
নুরুল হকের ওপর হামলায় অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে শনিবার বিবৃতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নুরুল হককে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার আদায়ের পক্ষে সাহসী ভূমিকা রাখা রাজনীতিবিদ আখ্যা দিয়ে বিবৃতিতে বল হয়, ‘এ ধরনের সহিংসতা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ঐতিহাসিক সংগ্রামে জাতিকে একত্র করা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্পিরিটের ওপরেও আঘাত বলে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার।’ এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রভাব বা পদমর্যাদা যা-ই হোক না কেন, জড়িত কোনো ব্যক্তি জবাবদিহি থেকে রেহাই পাবে না। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সঙ্গে এর বিচার সম্পন্ন করা হবে।’
নুরুল হক এবং তার দলের অন্যান্য আহত সদস্যদের চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষায়িত মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রয়োজনে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে পাঠানো হবে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের ইচ্ছা জয়ী হবে, কোনো অশুভ শক্তিকে গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেয়া হবে না।’
বিচার বিভাগীয় তদন্ত
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে। প্রধান উপদেষ্টা ফোন করে নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সবাইকে সর্বোত্তম চিকিৎসা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জাপা কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি:আইএসপিআর
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, গতকাল শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। এতে কয়েকজন সদস্য আহত হয়।
ঘটনার শুরুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয়পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানায়। তবে বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মীরা তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে।
তারা সংগঠিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। রাত প্রায় ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেয়ারও চেষ্টা চালায়।
এতে বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় ও বাড়ে জনদুর্ভোগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে।
ফলস্বরূপ, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ সদস্য আহত হয়েছে।
সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করছে। সেনাবাহিনীর সরকারের এ সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেছে। জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনয়নে সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে সদ্য প্রস্তুত রয়েছে।
জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বদ্ধপরিকর। আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান এ সব তথ্য জানিয়েছেন।
নুরুল হককে লাঠিপেটা: বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নিন্দা
গতকাল শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকসহ দলটির নেতাকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিপেটার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। একইসঙ্গে বিবৃতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের হামলার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ও নুরুল হকের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে।
বিএনপি
গতকাল শুক্রবার তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে দেয়া এক পোস্টে এ ঘটনার আইনি তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক অত্যন্ত নাজুক সময়ের মধ্যে আছি। যার প্রথম পদক্ষেপ জাতীয় নির্বাচন। সম্মিলিতভাবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, আজকের ঘটনার মতো অস্থিতিশীল ঘটনাগুলো যেন আর না ঘটে এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।’
মবসন্ত্রাসের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সতর্কতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেবল গণতান্ত্রিক পথে জনগণকে ক্ষমতায়িত করা এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার, সাম্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে সফল হওয়া যাবে।’
তাছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাকে ব্যাহত করে, এমন কোনো কর্মকা-কে বিএনপি সমর্থন করে না। সুস্থ ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলাকে আমরা নিন্দা জানাই।’
জামায়াতে ইসলামী
বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের পতনের পরও এমন হামলার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক, অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। আমরা একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করি। জাতি যখন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এ ধরনের হামলা ফ্যাসিবাদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।’
ছাত্রদল
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদল জানিয়েছে, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের সম্মুখসারির নেতারা ও অভ্যুত্থানের পক্ষশক্তির ওপর এ ধরনের নৃশংস হামলা অভাবিত। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
গণসংহতি
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল যৌথ বিবৃতিতে বলেন, নুরুল হকের ওপর যেভাবে নৃশংস কায়দায় হামলা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
নুরুল হকের ওপর হামলার ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের নানা ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশীদ শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, এ হামলা জুলাই শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। বিভিন্ন মহল নানা মোড়কে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের ‘ষড়যন্ত্রে লিপ্ত’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে রিফাত রশীদ বলেন, এর অন্যতম অংশ জাতীয় পার্টি।
ইসলামী আন্দোলন
ইসলামী আন্দোলন বলেছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী একজন নেতাকে রাস্তায় লাঠিপেটা করার ঘটনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান। দলের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিকিৎসায় উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড গঠন
শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, ‘নুরুল হকের মাথায় আঘাত রয়েছে। তার নাকের হাড় ভেঙে গেছে। যে কারণে শনিবার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল। আগেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে ও জ্ঞান ফিরেছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার আগে নুরুল হক আশঙ্কামুক্ত, সেটি বলা সম্ভব নয়।’
শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫
রাজধানীর বিজয়নগরে গতকাল শুক্রবার রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মারধরে গুরুতর আহত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর গুরুতর আহতাবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে অচেতন অবস্থায় ছিলেন তিনি। শনিবার,(৩০ আগস্ট ২০২৫) সকালে জ্ঞান ফিরলে চোখ মেলে তাকান। এরপরই তার সিটি স্ক্যান করানো হয়।
৪৮ ঘণ্টার আগে আশঙ্কামুক্ত বলা সম্ভব নয়: ঢামেক পরিচালক
চিকিৎসার খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলের নেতারা
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নুরের মাথার হাড়, নাক ও ডান পাশের চোয়ালের হাড় ভেঙে গেছে। মাথায় আঘাতের কারণে সামান্য রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং এক চোখে মারাত্মক ক্ষতি দেখা দিয়েছে। যদিও তিনি বর্তমানে স্থিতিশীল আছেন, তবে চিকিৎসকেরা ৪৮ ঘণ্টার আগে তাকে শঙ্কামুক্ত বলতে পারছেন না। চিকিৎসার জন্য উচ্চপর্যায়ের ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে নুরের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়া গতকাল শুক্রবার রাতে ও শনিবার নুরকে দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গেছেন সরকারের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতারা।
ঢামেকের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, গতকাল শুক্রবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে নুরুল হককে হাসপাতালে আনা হয়। সে সময় তার নাক থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং গজ ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রথমে তাকে জরুরি বিভাগের ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি সেন্টারে (ওসেক) প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে রাত ১২টার দিকে তাকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
তখনই প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শনিবার সকালে মাথার সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে দেখা গেছে, তার মাথার হাড় ও চোয়ালের হাড় ভেঙেছে। নাকের হাড়ও ভেঙে গেছে। মাথার ভেতরে সামান্য রক্তক্ষরণ রয়েছে। চোখ-মুখ ফুলে গেছে এবং চোখের ভেতরে রক্ত জমেছে। তবে শরীরের অন্য কোথাও আঘাত পাওয়া যায়নি। অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও তা যে কোনো সময় সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে। মস্তিষ্ক ও চোখে আঘাত থাকায় তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, নুরুল হকের চিকিৎসায় উচ্চপর্যায়ের ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে ও জ্ঞান ফিরেছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার আগে নুরুল হক আশঙ্কামুক্ত সেটি বলা সম্ভব নয়।
ঢামেক সূত্রে জানা গেছে, ৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডে নিউরো সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, ক্যাজুয়ালটি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হয়েছেন। শনিবার বিকেলে মেডিকেল বোর্ড বৈঠক করে তার চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চিকিৎসকেরা মনে করছেন, নুরুল হকের কোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার আপাতত প্রয়োজন হবে না। তবে তার অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হবে।
চিকিৎসার খোঁজ নিলেন
প্রধান উপদেষ্টা
নুরুল হক নুরের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার দুপুর ১টার দিকে নুরকে ফোন করে খোঁজ নেন তিনি। এ সময় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন প্রধান উপদেষ্টা। গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ফোন করে নুরুল হক নুরকে দুপুর ১টায় ফোন করে শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন। এ সময় নুর প্রধান উপদেষ্টাকে গতকাল শুক্রবার রাতের ঘটনার বিস্তারিত জানান। প্রধান উপদেষ্টা আশ্বস্ত করেছেন, এ ঘটনায় তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
এছাড়া চিকিৎসাধীন নুরুল হককে দেখতে ও তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিতে হাসপাতালে গিয়েছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি। তারা এ ঘটনার দুঃখ প্রকাশ করেন।
এছাড়া শুক্রবার রাত প্রায় ১২টার দিকে হাসপাতালে নুরুলকে দেখতে এসে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এ সময় গণঅধিকার পরিষদের অসংখ্য নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন। সেখানে উপস্থিত নেতাকর্মীরা তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন এবং জরুরি বিভাগের সামনে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আইন উপদেষ্টা ঢামেকের জরুরি বিভাগে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে প্রায় আধঘণ্টা আটকে থাকার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ঢামেক বহির বিভাগ গেইট দিয়ে বের হয়ে যান তিনি।
গণধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁনের ভাষ্য, তাদের মিছিলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে হামলা করা হয়। এর প্রতিবাদে মশাল মিছিল শেষে সংবাদ সম্মেলনের সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের লাঠিপেটা করে। এতে তাদের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নুরসহ আহতদের প্রথমে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে রাতে নুরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
নুরুল হকের ওপর হামলায় অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে শনিবার বিবৃতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নুরুল হককে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার আদায়ের পক্ষে সাহসী ভূমিকা রাখা রাজনীতিবিদ আখ্যা দিয়ে বিবৃতিতে বল হয়, ‘এ ধরনের সহিংসতা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ঐতিহাসিক সংগ্রামে জাতিকে একত্র করা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্পিরিটের ওপরেও আঘাত বলে মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার।’ এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রভাব বা পদমর্যাদা যা-ই হোক না কেন, জড়িত কোনো ব্যক্তি জবাবদিহি থেকে রেহাই পাবে না। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সঙ্গে এর বিচার সম্পন্ন করা হবে।’
নুরুল হক এবং তার দলের অন্যান্য আহত সদস্যদের চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষায়িত মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রয়োজনে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশে পাঠানো হবে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই অনুষ্ঠিত হবে। জনগণের ইচ্ছা জয়ী হবে, কোনো অশুভ শক্তিকে গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে দেয়া হবে না।’
বিচার বিভাগীয় তদন্ত
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম শনিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে। প্রধান উপদেষ্টা ফোন করে নুরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সবাইকে সর্বোত্তম চিকিৎসা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। জাপা কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি:আইএসপিআর
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছেন, গতকাল শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। এতে কয়েকজন সদস্য আহত হয়।
ঘটনার শুরুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয়পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানায়। তবে বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মীরা তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে।
তারা সংগঠিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। রাত প্রায় ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেয়ারও চেষ্টা চালায়।
এতে বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় ও বাড়ে জনদুর্ভোগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে।
ফলস্বরূপ, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উল্লেখ্য উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ সদস্য আহত হয়েছে।
সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করছে। সেনাবাহিনীর সরকারের এ সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেছে। জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনয়নে সব ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে সদ্য প্রস্তুত রয়েছে।
জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বদ্ধপরিকর। আইএসপিআরের সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান এ সব তথ্য জানিয়েছেন।
নুরুল হককে লাঠিপেটা: বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নিন্দা
গতকাল শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকসহ দলটির নেতাকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাঠিপেটার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। একইসঙ্গে বিবৃতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের হামলার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ও নুরুল হকের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে।
বিএনপি
গতকাল শুক্রবার তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজে দেয়া এক পোস্টে এ ঘটনার আইনি তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক অত্যন্ত নাজুক সময়ের মধ্যে আছি। যার প্রথম পদক্ষেপ জাতীয় নির্বাচন। সম্মিলিতভাবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, আজকের ঘটনার মতো অস্থিতিশীল ঘটনাগুলো যেন আর না ঘটে এবং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।’
মবসন্ত্রাসের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সতর্কতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেবল গণতান্ত্রিক পথে জনগণকে ক্ষমতায়িত করা এবং সবার জন্য ন্যায়বিচার, সাম্য ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে সফল হওয়া যাবে।’
তাছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চাকে ব্যাহত করে, এমন কোনো কর্মকা-কে বিএনপি সমর্থন করে না। সুস্থ ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলাকে আমরা নিন্দা জানাই।’
জামায়াতে ইসলামী
বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের পতনের পরও এমন হামলার ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক, অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। আমরা একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করি। জাতি যখন নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এ ধরনের হামলা ফ্যাসিবাদের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।’
ছাত্রদল
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্রদল জানিয়েছে, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের সম্মুখসারির নেতারা ও অভ্যুত্থানের পক্ষশক্তির ওপর এ ধরনের নৃশংস হামলা অভাবিত। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
গণসংহতি
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল যৌথ বিবৃতিতে বলেন, নুরুল হকের ওপর যেভাবে নৃশংস কায়দায় হামলা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
নুরুল হকের ওপর হামলার ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের নানা ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশীদ শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, এ হামলা জুলাই শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। বিভিন্ন মহল নানা মোড়কে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের ‘ষড়যন্ত্রে লিপ্ত’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে রিফাত রশীদ বলেন, এর অন্যতম অংশ জাতীয় পার্টি।
ইসলামী আন্দোলন
ইসলামী আন্দোলন বলেছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী একজন নেতাকে রাস্তায় লাঠিপেটা করার ঘটনা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান। দলের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান এক বিবৃতিতে এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চিকিৎসায় উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড গঠন
শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, ‘নুরুল হকের মাথায় আঘাত রয়েছে। তার নাকের হাড় ভেঙে গেছে। যে কারণে শনিবার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল। আগেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়েছে ও জ্ঞান ফিরেছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার আগে নুরুল হক আশঙ্কামুক্ত, সেটি বলা সম্ভব নয়।’