alt

opinion » post-editorial

তৃতীয় শক্তির জন্য জায়গা খালি : বামপন্থীরা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারে না

আনোয়ারুল হক

: মঙ্গলবার, ০১ জুলাই ২০২৫
image

‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ ব্যানারে বামপন্থীদের ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চ কর্মসূচি

আমাদের দেশ এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নতুন পথের সন্ধান করছে। এক অভূতপূর্ব জনজাগরণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় এবং জেলা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দেশত্যাগ করেন অথবা আত্মগোপনে চলে যান। নেতাকর্মীদের একাংশ কারাগারেও আছেন। কর্মী-সমর্থকরা দলের ভুলত্রুটি বা অন্যায় বুঝলেও মনে করেন সবকিছুই একটা ষড়যন্ত্রের ফল। তাদের মাঝে অনুশোচনা নেই বরং মনে করেন তারা ভোট করার সুযোগ পেলে প্রমাণ করতে পারবেন যে, তারা জনবিচ্ছিন্ন নয়। এত কিছুর পরেও আওয়ামী লীগাররা আওয়ামী লীগেই আছেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় দেশের বর্তমান রাজনীতিতে প্রায় নিরঙ্কুশ প্রাধান্য সৃষ্টিকারী দল বিএনপির অবস্থাও একই রকম। দীর্ঘ সময় যাবত বিরোধী অবস্থানে থেকে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েও কখনো সরবে কখনো নীরবে দলের সঙ্গেই ছিলেন। এখন একচেটিয়া প্রাধান্য থাকলেও ২০২৩ এর শেষভাগ জুড়ে জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপি যে শক্তিমত্তা ও জনসমর্থন নিয়ে রাজপথে ছিলো সেখানে কিছুটা ভাটার টান আছে। ৫ আগস্ট বিকেল থেকেই দেশজুড়ে দখলদারীত্বের যে ভূমিকা বিএনপি নেতাকর্মীরা দেখিয়েছেন এবং যা আজো অব্যাহত আছে তা মানুষকে আশাহত করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা এটিও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মতোই দুর্নীতিগ্রস্ত। তবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি অটুট আছে।

এত বড় জাগরণ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও দেশে চলে আসা দ্বিদলীয় রাজনীতির মেরুকরণ একটা ধাক্কা খেলেও প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তা রয়েই গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশেষত প্রধান উপদেষ্টার উৎসাহ ও সমর্থনে জুলাই জাগরণে ছাত্র নেতৃত্বের সম্মুখ সারিতে থাকা একটা বড় অংশ যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে তা শহরকেন্দ্রিক কিছু মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেললেও সরকারের এবং ধর্মীয় সংগঠনের সমর্থন ছাড়া স্বাধীনভাবে এই দ্বিদলীয় মেরূকরণের কাছাকাছি বা ছোট খাটো বিকল্প হওয়ার সামর্থ্য রাখে না। বিশেষ করে দলের নেতৃত্বের একাংশ মুখে ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আওয়াজ আর অন্তরে ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী প্রবনতার ধারক হওয়ায় এবং তাদের কারণে দেশজুড়ে ‘মব জাস্টিস’ আর ‘মবোল্লাসের সংস্কৃতি’ কায়েম হওয়ায় জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছরের মধ্যেই তাদের পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। আধুনিকমনষ্ক কিছু চৌকশ তরুণ-তরুণী এই দলে থাকলেও দলের অনেক কর্মকান্ড তাদের ঘোষিত মধ্যমপন্থার সাথে যায় না। সবকিছুর মধ্যেই তারা আওয়ামী ভূত দেখেন। এমনকি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের মূল নীতিসমূহসহ যা কিছু ইতিবাচক অর্জন তা বাতিলের দাবি তুলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ করছে। দলের একাংশের তরুণ বয়সেই অর্থবিত্ত, বাড়ি-গাড়ি ও ক্ষমতার প্রতি যে মোহ দেখা যাচ্ছে তা মানুষকে হতাশ করেছে। নতুন দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় রূপায়ন টাওয়ার হলেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হেয়ার রোডে। গুরুত্বপূর্ণ সকল রাজনৈতিক ও কর্মসূচিগত সিদ্ধান্ত এবং পদ-পদবি বণ্টনের তালিকা আসে হেয়ার রোডের পাড়া থেকে। দলটি কিংস পার্টির তকমা থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না, আসতে চায়ও না। কারণ ওই পরিচয়ের কারনেরই ৫৬ ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে প্রশাসনিক নিরাপত্তায় থেকে ‘যখন যা খুশি এ মন চায়’ জাতীয় মব উল্লম্ফন করা যায়। দলটি শহুরে মধ্যবিত্ত এবং জুলাই জাগরনে শামিল হওয়া লাখো লাখো তরুণের কাছে এখন এক স্বপ্নভঙ্গের বেদনা হিসাবেই পরিচিতি অর্জন করেছে।

তাই দ্বিদলীয় রাজনীতির বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির তৃতীয় শক্তি উত্থানের ক্ষেত্রে কার্যত দেশের বুকে এক শূন্যতা রয়েছে। দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এবং বামপন্থীদের প্রধান জোট পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় যুক্তিনির্ভর আকর্ষণীয় বক্তব্য ও যুঁতসই কর্মসূচি হাজির করতে পারছে না। বিশেষত ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্তের মাঝে এক উদার ও মানবিক সমাজ বিনির্মানের যে আকাক্সক্ষা জাগরিত হয়েছিল তাকে ধারণ করে অগ্রসর হওয়ার মত গনতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিমুখীন সব রাজনৈতিক সামাজিক শক্তি সমূহকে একত্রিত করে পথবিকল্প রচনা করার কাজটি অগ্রসর হচ্ছে বলে এখনও মনে হয় না।

অথচ পুঁজির শৃঙ্খল আর লুণ্ঠন মানুষের জীবনকে যে ভাবে রক্তাক্ত করে, তার বিপরীতে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতেই তো রাজনীতিতে বামপন্থার আবির্ভাব। আজকে কেন ছাত্র-তরুণদের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলোর সৌন্দর্যকে বামপন্থীরা ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না?

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর জমিদারী শোষণের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখ-ে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থা এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দেশভাগের পর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদ নীতি অবলম্বন করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কর্মীদের একটা বড় অংশকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। যাদেরকে বিতাড়িত করা সম্ভব হয়নি তাদেরকে পুরা হয় জেলে অথবা তাদের থাকতে হয় আত্মগোপনে। বামপন্থা দূর্বল হয়ে পড়লেও এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনকে শাসকরা বেআইনি ঘোষণা করার পরেও নতুন করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রামে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বেই মিশে আছে কত শত কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত! এ সব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সে আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সাথে ঐক্য ও মৈত্রী। বাংলাদেশের স্বাধিকার,স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে এ মৈত্রী হবে না তো ’৭১-এর গোলাম আজমের সঙ্গে মৈত্রী হবে? এই ঐক্য ও মৈত্রীর শক্তিকে যতই ‘ওরা’ মুজিববাদী ঐক্যের ট্যাগ দিয়ে চোখ রাংগাক কিচ্ছু যায় আসে না, বরং মুক্তিযুদ্ধের উজ্জ্বল আলোয় ‘ওদের’ চোখ ঝলসে যাবে।

তবে স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা পর্বে বামপন্থীদের প্রধান দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে ঐক্য ও সংগ্রামের নীতিতে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারায় এবং এক পর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একদলীয় শাসনব্যবস্থার অংশীদার হওয়ায় ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়। এ বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মসমালোচনাও আছে। তবে কমিউনিস্ট পার্টি গোপন কাঠামো রক্ষা করায় সাংগঠনিকভাবে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ওই সময়ে বামপন্থী দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও একই ধরনের নীতি ও কৌশল গ্রহণ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময়ে গড়ে ওঠা ন্যাপের জনভিত্তি সংকুচিত হয়ে যায়। ’৭৫-এর নৃশংস হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সংঘটিত হওয়ার পর দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা চালু হলে ন্যাপে একাধিকবার বিভক্তি সৃষ্টি হওয়ায় ন্যাপ আর পূর্বের রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরে আসতে পারেনি এবং সংগঠন শক্তি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তবে কমিউনিস্ট পার্টি আশির দশকজুড়ে একদিকে শ্রেণী আন্দোলন এবং সমান্তরালভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে শামিল থেকে বাম আন্দোলনে এক আশাজাগানিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেও আওয়ামী লীগসহ অপরাপর বাম ও গনতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে সিপিবি জোটবদ্ধ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে যুগপৎ কর্মসূচির আন্দোলনে ছিল। তাহলে এরশাদ বিরোধী এ আন্দোলনকেও কি মুজিববাদী বা জিয়াবাদী আন্দোলন বলা হবে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সিপিবিতে বিভক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতৃবৃন্দ সহ বিভক্ত একটি অংশ অবশেষে নিজেদেরকে বিলুপ্ত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ায় পার্টির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধিত হয়। ওই সময়ের পার্টির সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশ সংখ্যাগুরু কর্মীদের সমর্থন নিয়ে পার্টিকে পুনরায় সংগঠিত করতে সফল হলেও পূর্বের সেই শক্তি, ধার, প্রভাব আর নেই। তারপরেও সিপিবি বামপন্থীদের প্রধান দল। তবে বাইরে থেকে সিপিবিকে রাজনৈতিকভাবে খুব একটা সংহত মনে হয় না।

স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের একটি র‌্যাডিকাল অংশ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাসদ নামে বামপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে। প্রধানত মুজিববিরোধিতার রাজনীতিই তারা সামনে নিয়ে আসায় মুজিব হত্যাকা-ের পরে জাসদের গুরুত্ব কমে যায় এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার প্রচেষ্টার মধ্যেই জেনারেল জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তার মতো করে বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলে জাসদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং জাসদ নেতৃত্বকে কারাগারে যেতে হয়। বহুদলীয় রাজনীতি শুরু হওয়ার পরে জাসদ নেতৃত্ব কারাগার থেকে বের হয়ে আসলেও বারবার বিভক্তিতে জাসদের শক্তি সামর্থ্য কমে যায়। জাসদ ভেঙে বাসদ হওয়ার পরে ছাত্রদের বড় অংশই বাসদের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। জাসদ অনেকটা মধ্য বাম নীতি নেয়। বামপন্থী সংগঠন হিসেবে বাসদই পরিচিতি পায়। এবং তত্ত্বগত চর্চায়ও তারা এগিয়ে থাকে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে বাসদেও বিভক্তি সৃষ্টি হওয়ায় বাসদের শক্তিও হ্রাস পেয়েছে। উভয় অংশেই তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী কিছু ভালো সংগঠক আছেন এবং ছাত্র ও কিছু এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যেও সাংগঠনিক শক্তি আছে।

মূল বামপন্থীদের ভিন্ন ধারা যেটা পিকিংপন্থী ধারা হিসেবে পরিচিত ছিলো পাকিস্তান আমল থেকেই ভাংগনের শুরু এবং স্বাধীনতার পরেও নানা বিভক্তির পর রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টিই প্রধান ধারা হিসেবে ছিল। ২০০৪ সালে সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টি ই উদ্যোগ গ্রহণ করে বাম-মধ্য বামসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল সমূহের পৃথক শক্তি সমাবেশ গড়ে তুলতে। বামপন্থী জোট গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে ওয়ার্কার্স পার্টি নিজ দলে ভাঙনের ঝুঁকি নিয়েও অধিকাংশ জোট সংগী সহ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গড়ে তোলে ১৪ দলীয় জোট। মণি সিংহ, অমল সেন, মো. ফরহাদের জীবন অবসানের পরে এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়লে রাশেদ খান মেনন ছিলেন ওই সময়ের প্রবীণ বামপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে বহুল পরিচিত। তার এবং তার দলের এই সিদ্ধান্ত বৃহত্তর বাম ঐক্য বিকশিত হওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগকে নস্যাৎ করে দেয়। রাশেদ খান মেনন প্রগতিশীল মহলে নিন্দিত হন, তার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়। পার্টিও বিভক্ত হয়ে যায়। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নামে পৃথক দল গঠিত হয়, যে দল গণতান্ত্রিক ঐক্য মঞ্চ নামে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জোটে এবং বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র হিসেবে আছে। বর্তমানে সিপিবি, বাসদ এবং আরো কয়েকটি দল মিলে বামপন্থীদের যে প্রধান জোট তার বাইরেও ভিন্ন জোটে এবং বিভিন্ন অবস্থানে ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে হলেও আরো বামপন্থী অনেক দল আছে। অবশ্যই এত বিভক্তি এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকাটা বামপন্থী শক্তির জন্য শুধু অস্বস্তিকরই নয় জাতীয় রাজনীতিতে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথে অন্তরায়।

জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান ও অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হলে বাম শক্তিকে একমঞ্চে সমবেত হতে হবে এবং সম্ভবমত অপরাপর গনতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গেও গড়ে তুলতে হবে সমঝোতা। বিরাজমান পরিস্থিতি ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান পর্যায়ে বাম ঐক্য এমন একটি জোটের চরিত্র নিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে প্রতিটি দলেরই তাদের নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতা থাকবে। আবার অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসাথে চলার জন্য সকলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। প্রাথমিকভাবে এ ধরনের নমনীয় কৌশল গ্রহণ না করতে পারলে সকল বামপন্থী দল/গ্রুপ কে এক ছাতার নিচে আনা কঠিন হবে।

নিউমুরিং টার্মিনালসহ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে না দেয়ার দাবীতে ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ ব্যানারে যে যাত্রা শুরু হলো তাকে আরো রাজনৈতিক রূপ দিয়ে যে সমস্ত বামপন্থী ও মধ্য বামপন্থী দল এ কর্মসূচিতে অংশ নেননি ভবিষ্যতে তারাও নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতা সহ এক বৃহত্তর জোটে যাতে শামিল হতে পারেন সে প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। এ ধরনের ঐক্য দিয়ে শুরু করে সংগ্রামের মাধ্যমে পৌঁছানো যেতে পারে উচ্চতর পর্যায়ের ঐক্যে।

বৈষম্য দূর করে সমাজের সর্বস্তরে সাম্য প্রতিষ্ঠা করাই বামপন্থী আন্দোলনের মূল মন্ত্র। সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য যতদিন থাকবে বামপন্থার প্রয়োজনীয়তা ততদিন নিঃশেষ হবে না। জুলাই জাগরণেও কোটাবিরোধী আওয়াজ এক সময় পরিণত হলো সমাজে সব ধরনের বৈষম্য অবসানের আকাক্সক্ষা আর আকুতিতে। দেশে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার যে আয়োজন পর্ব চলছে সে আয়োজনে শ্রমজীবী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষেতমজুর হাতে লাল নিশান আর কাঁধে কাস্তে হাতুড়ি প্রতীক নিয়ে যত বেশি সংখ্যায় অগ্রসর হবেন তত শক্তিশালী কাঠামোর গণতন্ত্র নির্মাণ সম্ভবপর হবে। ডানপন্থা তো ১৯৯১ সালে অর্জিত ভোটের গণতন্ত্রটুকুই টিকিয়ে রাখতে পারলো না। বরং তাদের কর্মফলে আজ দেশের বুকে উগ্র ধর্মান্ধ ও নারীবিদ্বেষী শক্তির এক ভয়াবহ উত্থান ঘটেছে। তাদের কাছে আর বেশি আশা করে কী হবে! বরং জুলাই জাগরণের অভিজ্ঞতায় বামপন্থার নবায়ন হলে এবং অতীতের তিক্ততা ভুলে সব বামপন্থীরা মধ্যবাম ও প্রগতিশীলদের সাথে নিয়ে এক বামপন্থী মহাজোট গঠনে সক্ষম হলে নতুন পথের সন্ধান মিলতে পারে, সমতা হবে যার সুর। সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যেও জন্ম নেয় নতুন নতুন স্বপ্ন। আশাবাদী মানুষের মত দ্বিধায় দোলাচলে থাকা মানুষও তাকিয়ে আছে - ‘নূতন উষার স্বর্ণদ্বার খুলিতে বিলম্ব কত আর’!

[লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা]

নিষিদ্ধ জালের অভিশাপে হুমকির মুখে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য

আধিপত্যবাদের শৃঙ্খল এবং পুঁজির লুন্ঠন যাদের রক্তাক্ত করে, তাদের চাই একজোটে

জার্মানি : কৃচ্ছসাধনের বোঝা জনগণের কাঁধে

পাট চাষের সংকট ও সম্ভাবনা

সামাজিক-প্রযুক্তিগত কল্পনা: বাংলাদেশের উন্নয়ন চিন্তার নতুন দিগন্ত

অগ্রক্রয় মোকদ্দমায় উভয় পক্ষের আইনি ডিফেন্স

পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম

এক সাংবাদিকের খোলা চিঠি

বাংলাদেশের দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

ক্লাউডবার্স্ট: মৃত্যুর বার্তা নিয়ে, আকাশ যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে

রম্যগদ্য:“কবি এখন জেলে...”

কারা কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা ও ‘কারেকশন সার্ভিস’-এর বাস্তবতা

ছবি

বাংলাদেশের শহর পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ছবি

‘আজ ফির তুমপে পেয়ার আয়া হ্যায়’

স্বপ্নের দক্ষিণ কোরিয়া; বাংলাদেশে আন্দোলন, ভিয়েতনামের সাফল্য

ডাকসু নির্বাচন ও জাতীয় রাজনীতি

ঢাকা শহরের উষ্ণতা: সবুজ হারানোর মূল্য

তিন বাহিনী প্রধানদের আশা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

গনমাধ্যম জগতও নিষ্ঠুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে!

মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা: জাপান এক অনুসরণীয় আদর্শ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন ট্র্যাজেডি

হোক সবুজ বিপ্লব

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি : একজন বিধায়কের জামিন

নিউটনের আপেল : পতনের ভেতরে জাগরণের গল্প

বায়ুদূষণ গবেষণার প্রসার ও তরুণদের ভূমিকা : প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা আহমদ

চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি

ছবি

একাত্তরের গণহত্যা : সংখ্যার বিতর্ক নাকি দায় হালকা করার চেষ্টা?

রম্যগদ্য : ‘দালাল-ধন্বন্তরি-জীবন রক্ষাকারী...’

সাদা পাথর লুটে সর্বদলীয় ঐক্য

গণিতের বহুমুখী ব্যবহার : আধুনিক বিজ্ঞানের চালিকাশক্তি

প্রসঙ্গ : পেঁপের রিং স্পট ভাইরাস

ছবি

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা : রাজনৈতিক বিভেদের অমোচনীয় ক্ষত

ছবি

আলফ্রেড সরেন হত্যা : বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

কারাম উৎসব : বাংলার প্রাচীন কৃষি ও সংস্কৃতির ধারক

ছবি

আলাস্কা বৈঠক : শান্তির দেখা কি মিলল?

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কতদূর?

tab

opinion » post-editorial

তৃতীয় শক্তির জন্য জায়গা খালি : বামপন্থীরা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারে না

আনোয়ারুল হক

image

‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ ব্যানারে বামপন্থীদের ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডমার্চ কর্মসূচি

মঙ্গলবার, ০১ জুলাই ২০২৫

আমাদের দেশ এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নতুন পথের সন্ধান করছে। এক অভূতপূর্ব জনজাগরণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় এবং জেলা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দেশত্যাগ করেন অথবা আত্মগোপনে চলে যান। নেতাকর্মীদের একাংশ কারাগারেও আছেন। কর্মী-সমর্থকরা দলের ভুলত্রুটি বা অন্যায় বুঝলেও মনে করেন সবকিছুই একটা ষড়যন্ত্রের ফল। তাদের মাঝে অনুশোচনা নেই বরং মনে করেন তারা ভোট করার সুযোগ পেলে প্রমাণ করতে পারবেন যে, তারা জনবিচ্ছিন্ন নয়। এত কিছুর পরেও আওয়ামী লীগাররা আওয়ামী লীগেই আছেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় দেশের বর্তমান রাজনীতিতে প্রায় নিরঙ্কুশ প্রাধান্য সৃষ্টিকারী দল বিএনপির অবস্থাও একই রকম। দীর্ঘ সময় যাবত বিরোধী অবস্থানে থেকে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েও কখনো সরবে কখনো নীরবে দলের সঙ্গেই ছিলেন। এখন একচেটিয়া প্রাধান্য থাকলেও ২০২৩ এর শেষভাগ জুড়ে জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপি যে শক্তিমত্তা ও জনসমর্থন নিয়ে রাজপথে ছিলো সেখানে কিছুটা ভাটার টান আছে। ৫ আগস্ট বিকেল থেকেই দেশজুড়ে দখলদারীত্বের যে ভূমিকা বিএনপি নেতাকর্মীরা দেখিয়েছেন এবং যা আজো অব্যাহত আছে তা মানুষকে আশাহত করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ধারণা এটিও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মতোই দুর্নীতিগ্রস্ত। তবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি অটুট আছে।

এত বড় জাগরণ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও দেশে চলে আসা দ্বিদলীয় রাজনীতির মেরুকরণ একটা ধাক্কা খেলেও প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তা রয়েই গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশেষত প্রধান উপদেষ্টার উৎসাহ ও সমর্থনে জুলাই জাগরণে ছাত্র নেতৃত্বের সম্মুখ সারিতে থাকা একটা বড় অংশ যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে তা শহরকেন্দ্রিক কিছু মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেললেও সরকারের এবং ধর্মীয় সংগঠনের সমর্থন ছাড়া স্বাধীনভাবে এই দ্বিদলীয় মেরূকরণের কাছাকাছি বা ছোট খাটো বিকল্প হওয়ার সামর্থ্য রাখে না। বিশেষ করে দলের নেতৃত্বের একাংশ মুখে ফ্যাসিবাদ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আওয়াজ আর অন্তরে ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী প্রবনতার ধারক হওয়ায় এবং তাদের কারণে দেশজুড়ে ‘মব জাস্টিস’ আর ‘মবোল্লাসের সংস্কৃতি’ কায়েম হওয়ায় জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছরের মধ্যেই তাদের পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। আধুনিকমনষ্ক কিছু চৌকশ তরুণ-তরুণী এই দলে থাকলেও দলের অনেক কর্মকান্ড তাদের ঘোষিত মধ্যমপন্থার সাথে যায় না। সবকিছুর মধ্যেই তারা আওয়ামী ভূত দেখেন। এমনকি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের মূল নীতিসমূহসহ যা কিছু ইতিবাচক অর্জন তা বাতিলের দাবি তুলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির প্রতি তাদের পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ করছে। দলের একাংশের তরুণ বয়সেই অর্থবিত্ত, বাড়ি-গাড়ি ও ক্ষমতার প্রতি যে মোহ দেখা যাচ্ছে তা মানুষকে হতাশ করেছে। নতুন দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় রূপায়ন টাওয়ার হলেও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হেয়ার রোডে। গুরুত্বপূর্ণ সকল রাজনৈতিক ও কর্মসূচিগত সিদ্ধান্ত এবং পদ-পদবি বণ্টনের তালিকা আসে হেয়ার রোডের পাড়া থেকে। দলটি কিংস পার্টির তকমা থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না, আসতে চায়ও না। কারণ ওই পরিচয়ের কারনেরই ৫৬ ইঞ্চি ছাতি ফুলিয়ে প্রশাসনিক নিরাপত্তায় থেকে ‘যখন যা খুশি এ মন চায়’ জাতীয় মব উল্লম্ফন করা যায়। দলটি শহুরে মধ্যবিত্ত এবং জুলাই জাগরনে শামিল হওয়া লাখো লাখো তরুণের কাছে এখন এক স্বপ্নভঙ্গের বেদনা হিসাবেই পরিচিতি অর্জন করেছে।

তাই দ্বিদলীয় রাজনীতির বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির তৃতীয় শক্তি উত্থানের ক্ষেত্রে কার্যত দেশের বুকে এক শূন্যতা রয়েছে। দেশের বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এবং বামপন্থীদের প্রধান জোট পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় যুক্তিনির্ভর আকর্ষণীয় বক্তব্য ও যুঁতসই কর্মসূচি হাজির করতে পারছে না। বিশেষত ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্তের মাঝে এক উদার ও মানবিক সমাজ বিনির্মানের যে আকাক্সক্ষা জাগরিত হয়েছিল তাকে ধারণ করে অগ্রসর হওয়ার মত গনতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিমুখীন সব রাজনৈতিক সামাজিক শক্তি সমূহকে একত্রিত করে পথবিকল্প রচনা করার কাজটি অগ্রসর হচ্ছে বলে এখনও মনে হয় না।

অথচ পুঁজির শৃঙ্খল আর লুণ্ঠন মানুষের জীবনকে যে ভাবে রক্তাক্ত করে, তার বিপরীতে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতেই তো রাজনীতিতে বামপন্থার আবির্ভাব। আজকে কেন ছাত্র-তরুণদের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা স্বপ্নগুলোর সৌন্দর্যকে বামপন্থীরা ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না?

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর জমিদারী শোষণের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখ-ে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থা এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দেশভাগের পর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক ভেদ-বিভেদ নীতি অবলম্বন করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব ও কর্মীদের একটা বড় অংশকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। যাদেরকে বিতাড়িত করা সম্ভব হয়নি তাদেরকে পুরা হয় জেলে অথবা তাদের থাকতে হয় আত্মগোপনে। বামপন্থা দূর্বল হয়ে পড়লেও এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনকে শাসকরা বেআইনি ঘোষণা করার পরেও নতুন করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রামে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বেই মিশে আছে কত শত কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত! এ সব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং সে আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবর রহমানের সাথে ঐক্য ও মৈত্রী। বাংলাদেশের স্বাধিকার,স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে এ মৈত্রী হবে না তো ’৭১-এর গোলাম আজমের সঙ্গে মৈত্রী হবে? এই ঐক্য ও মৈত্রীর শক্তিকে যতই ‘ওরা’ মুজিববাদী ঐক্যের ট্যাগ দিয়ে চোখ রাংগাক কিচ্ছু যায় আসে না, বরং মুক্তিযুদ্ধের উজ্জ্বল আলোয় ‘ওদের’ চোখ ঝলসে যাবে।

তবে স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা পর্বে বামপন্থীদের প্রধান দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে ঐক্য ও সংগ্রামের নীতিতে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারায় এবং এক পর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একদলীয় শাসনব্যবস্থার অংশীদার হওয়ায় ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়। এ বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মসমালোচনাও আছে। তবে কমিউনিস্ট পার্টি গোপন কাঠামো রক্ষা করায় সাংগঠনিকভাবে বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। ওই সময়ে বামপন্থী দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিও একই ধরনের নীতি ও কৌশল গ্রহণ করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময়ে গড়ে ওঠা ন্যাপের জনভিত্তি সংকুচিত হয়ে যায়। ’৭৫-এর নৃশংস হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সংঘটিত হওয়ার পর দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা চালু হলে ন্যাপে একাধিকবার বিভক্তি সৃষ্টি হওয়ায় ন্যাপ আর পূর্বের রাজনৈতিক অবস্থানে ফিরে আসতে পারেনি এবং সংগঠন শক্তি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তবে কমিউনিস্ট পার্টি আশির দশকজুড়ে একদিকে শ্রেণী আন্দোলন এবং সমান্তরালভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে শামিল থেকে বাম আন্দোলনে এক আশাজাগানিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভোটের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেও আওয়ামী লীগসহ অপরাপর বাম ও গনতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে সিপিবি জোটবদ্ধ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে যুগপৎ কর্মসূচির আন্দোলনে ছিল। তাহলে এরশাদ বিরোধী এ আন্দোলনকেও কি মুজিববাদী বা জিয়াবাদী আন্দোলন বলা হবে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সিপিবিতে বিভক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতৃবৃন্দ সহ বিভক্ত একটি অংশ অবশেষে নিজেদেরকে বিলুপ্ত করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ায় পার্টির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সাধিত হয়। ওই সময়ের পার্টির সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশ সংখ্যাগুরু কর্মীদের সমর্থন নিয়ে পার্টিকে পুনরায় সংগঠিত করতে সফল হলেও পূর্বের সেই শক্তি, ধার, প্রভাব আর নেই। তারপরেও সিপিবি বামপন্থীদের প্রধান দল। তবে বাইরে থেকে সিপিবিকে রাজনৈতিকভাবে খুব একটা সংহত মনে হয় না।

স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগের একটি র‌্যাডিকাল অংশ দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাসদ নামে বামপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে। প্রধানত মুজিববিরোধিতার রাজনীতিই তারা সামনে নিয়ে আসায় মুজিব হত্যাকা-ের পরে জাসদের গুরুত্ব কমে যায় এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলার প্রচেষ্টার মধ্যেই জেনারেল জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তার মতো করে বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিলে জাসদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং জাসদ নেতৃত্বকে কারাগারে যেতে হয়। বহুদলীয় রাজনীতি শুরু হওয়ার পরে জাসদ নেতৃত্ব কারাগার থেকে বের হয়ে আসলেও বারবার বিভক্তিতে জাসদের শক্তি সামর্থ্য কমে যায়। জাসদ ভেঙে বাসদ হওয়ার পরে ছাত্রদের বড় অংশই বাসদের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে। জাসদ অনেকটা মধ্য বাম নীতি নেয়। বামপন্থী সংগঠন হিসেবে বাসদই পরিচিতি পায়। এবং তত্ত্বগত চর্চায়ও তারা এগিয়ে থাকে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে বাসদেও বিভক্তি সৃষ্টি হওয়ায় বাসদের শক্তিও হ্রাস পেয়েছে। উভয় অংশেই তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী কিছু ভালো সংগঠক আছেন এবং ছাত্র ও কিছু এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যেও সাংগঠনিক শক্তি আছে।

মূল বামপন্থীদের ভিন্ন ধারা যেটা পিকিংপন্থী ধারা হিসেবে পরিচিত ছিলো পাকিস্তান আমল থেকেই ভাংগনের শুরু এবং স্বাধীনতার পরেও নানা বিভক্তির পর রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টিই প্রধান ধারা হিসেবে ছিল। ২০০৪ সালে সিপিবি ও ওয়ার্কার্স পার্টি ই উদ্যোগ গ্রহণ করে বাম-মধ্য বামসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল সমূহের পৃথক শক্তি সমাবেশ গড়ে তুলতে। বামপন্থী জোট গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে ওয়ার্কার্স পার্টি নিজ দলে ভাঙনের ঝুঁকি নিয়েও অধিকাংশ জোট সংগী সহ আওয়ামী লীগের সঙ্গে গড়ে তোলে ১৪ দলীয় জোট। মণি সিংহ, অমল সেন, মো. ফরহাদের জীবন অবসানের পরে এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়লে রাশেদ খান মেনন ছিলেন ওই সময়ের প্রবীণ বামপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে বহুল পরিচিত। তার এবং তার দলের এই সিদ্ধান্ত বৃহত্তর বাম ঐক্য বিকশিত হওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগকে নস্যাৎ করে দেয়। রাশেদ খান মেনন প্রগতিশীল মহলে নিন্দিত হন, তার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হয়। পার্টিও বিভক্ত হয়ে যায়। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নামে পৃথক দল গঠিত হয়, যে দল গণতান্ত্রিক ঐক্য মঞ্চ নামে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জোটে এবং বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের মিত্র হিসেবে আছে। বর্তমানে সিপিবি, বাসদ এবং আরো কয়েকটি দল মিলে বামপন্থীদের যে প্রধান জোট তার বাইরেও ভিন্ন জোটে এবং বিভিন্ন অবস্থানে ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে হলেও আরো বামপন্থী অনেক দল আছে। অবশ্যই এত বিভক্তি এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকাটা বামপন্থী শক্তির জন্য শুধু অস্বস্তিকরই নয় জাতীয় রাজনীতিতে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথে অন্তরায়।

জাতীয় রাজনীতিতে দৃশ্যমান ও অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হলে বাম শক্তিকে একমঞ্চে সমবেত হতে হবে এবং সম্ভবমত অপরাপর গনতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গেও গড়ে তুলতে হবে সমঝোতা। বিরাজমান পরিস্থিতি ও বাম রাজনৈতিক দলগুলোর নানামুখী অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান পর্যায়ে বাম ঐক্য এমন একটি জোটের চরিত্র নিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব হতে পারে, যেখানে প্রতিটি দলেরই তাদের নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতা থাকবে। আবার অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসাথে চলার জন্য সকলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। প্রাথমিকভাবে এ ধরনের নমনীয় কৌশল গ্রহণ না করতে পারলে সকল বামপন্থী দল/গ্রুপ কে এক ছাতার নিচে আনা কঠিন হবে।

নিউমুরিং টার্মিনালসহ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে না দেয়ার দাবীতে ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ’ ব্যানারে যে যাত্রা শুরু হলো তাকে আরো রাজনৈতিক রূপ দিয়ে যে সমস্ত বামপন্থী ও মধ্য বামপন্থী দল এ কর্মসূচিতে অংশ নেননি ভবিষ্যতে তারাও নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতা সহ এক বৃহত্তর জোটে যাতে শামিল হতে পারেন সে প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। এ ধরনের ঐক্য দিয়ে শুরু করে সংগ্রামের মাধ্যমে পৌঁছানো যেতে পারে উচ্চতর পর্যায়ের ঐক্যে।

বৈষম্য দূর করে সমাজের সর্বস্তরে সাম্য প্রতিষ্ঠা করাই বামপন্থী আন্দোলনের মূল মন্ত্র। সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য যতদিন থাকবে বামপন্থার প্রয়োজনীয়তা ততদিন নিঃশেষ হবে না। জুলাই জাগরণেও কোটাবিরোধী আওয়াজ এক সময় পরিণত হলো সমাজে সব ধরনের বৈষম্য অবসানের আকাক্সক্ষা আর আকুতিতে। দেশে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার যে আয়োজন পর্ব চলছে সে আয়োজনে শ্রমজীবী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষেতমজুর হাতে লাল নিশান আর কাঁধে কাস্তে হাতুড়ি প্রতীক নিয়ে যত বেশি সংখ্যায় অগ্রসর হবেন তত শক্তিশালী কাঠামোর গণতন্ত্র নির্মাণ সম্ভবপর হবে। ডানপন্থা তো ১৯৯১ সালে অর্জিত ভোটের গণতন্ত্রটুকুই টিকিয়ে রাখতে পারলো না। বরং তাদের কর্মফলে আজ দেশের বুকে উগ্র ধর্মান্ধ ও নারীবিদ্বেষী শক্তির এক ভয়াবহ উত্থান ঘটেছে। তাদের কাছে আর বেশি আশা করে কী হবে! বরং জুলাই জাগরণের অভিজ্ঞতায় বামপন্থার নবায়ন হলে এবং অতীতের তিক্ততা ভুলে সব বামপন্থীরা মধ্যবাম ও প্রগতিশীলদের সাথে নিয়ে এক বামপন্থী মহাজোট গঠনে সক্ষম হলে নতুন পথের সন্ধান মিলতে পারে, সমতা হবে যার সুর। সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যেও জন্ম নেয় নতুন নতুন স্বপ্ন। আশাবাদী মানুষের মত দ্বিধায় দোলাচলে থাকা মানুষও তাকিয়ে আছে - ‘নূতন উষার স্বর্ণদ্বার খুলিতে বিলম্ব কত আর’!

[লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা]

back to top