alt

opinion » post-editorial

ক্লাউডবার্স্ট: মৃত্যুর বার্তা নিয়ে, আকাশ যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে

জাহিদুল ইসলাম

: বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫

হঠাৎ নেমে আসা কালো মেঘ। বজ্রের গর্জন আর অবিরাম বর্ষণ এ যেন শুধু আকাশের কান্না নয়, মানুষের নিয়তিরও এক ভয়াবহ রূপ। প্রকৃতির এই রূপকে বাংলার সাহিত্যিকরাও যেমন ধরেছেন, তেমনি বিশ্ব সাহিত্যের মহৎ কণ্ঠগুলোও তুলে এনেছেন মানুষের অসহায়ত্ব, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার তীব্র আকাক্সক্ষা। বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে আমরা দেখি জেলেদের জীবনের সঙ্গে বন্যার চিরন্তন লড়াই। কুবেরের মুখে উচ্চারিত সংলাপ ‘হায় পদ্মা, তুই কত প্রাণ খেয়ে লইলি!’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন ‘বন্যা, তোমার দ্বার খুলিয়া দাও, আমরা আসি প্রার্থনা করিতে।’ তার প্রার্থনা আসলে মানুষের বিনয়, যে মানুষ জানে প্রকৃতির সামনে তার শক্তি কত ক্ষুদ্র।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’-তে সান্তিয়াগো সমুদ্রকে বলেন ‘ সমুদ্র বিপজ্জনক, প্রতিটি ঝড়ও তাই। কিন্তু সে আমাদের জীবনও দেয়।’ প্রকৃতির দ্বৈত রূপকেই তুলে ধরে। ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজেরাবল’-এ ঝড়ো বৃষ্টিকে তিনি বর্ণনা করেন যেন আকাশ নিজেই কাঁদছে: ‘মুষলধারে বৃষ্টি নামছে, যেন স্বর্গ নিজেই হতভাগ্যদের জন্য কাঁদছে।’ প্রকৃতি যেন মানুষের দুঃখকেও বহন করে। আর কোলরিজের ‘দ্যা রাইম অব এনশিয়েন্ট মেরিনার’-এ ঝড় বৃষ্টির মধ্যে জলই হয়ে ওঠে অভিশাপ ‘পানি, সবজায়গায় পানি, পান করার জন্য এক ফোঁটাও নেই।’

এসব সাহিত্যকর্মে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য পাওয়া যায়, বাংলাদেশের পদ্মা বা তিতাসের বন্যা হোক, কিংবা ইউরোপের ঝড়ো সমুদ্র, কিংবা নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন প্রকৃতির প্রলয় সবসময় মানুষের ক্ষুদ্রতাকে মনে করিয়ে দেয়। সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তানের কয়েকটি জায়গায় ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বর্ষণের খবর প্রায় সকল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বেশন্ত্রি গ্রামে দাফনের মতো লোকও আর অবশিষ্ট নেই। পাকিস্তানের সরকারি হিসাবে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে ৩ দিনে ৫ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ আগস্ট ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের কিশটওয়ার জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে একই কারণে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে দ্বিতীয় ধাপে আবারও ক্লাউডবার্স্ট হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৮ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।

প্রথমে জানা দরকার ক্লাউডবার্স্ট কী? ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি বা মেঘের বিস্ফোরণ। এটি হলো এক ধরনের অতিবৃষ্টি, যেখানে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ও ছোট এলাকায় (সাধারণত ১০ থেকে ২০ বর্গ কিলোমিটার) অস্বাভাবিক ও তীব্র বৃষ্টিপাত হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, অধিকাংশ ক্লাউডবার্স্ট বজ্রঝড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ঝড়ে বায়ুর প্রবল ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়, যা অনেক সময় ঘনীভূত হওয়া জলকণাকে মাটিতে পড়তে বাধা দেয়। ফলে প্রচুর পরিমাণ পানি মেঘের উচ্চস্তরে জমা হয়ে যায়। যখন এই ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন একসঙ্গে সেই সঞ্চিত পানি প্রবল বর্ষণ আকারে নেমে আসে। যদি এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হয়, তবে তাকে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি বা মেঘ বিস্ফোরণ বলা হয়। বেশ কিছু কারণে ক্লাউডবার্স্ট তৈরি হতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে-

১. কোনো এলাকায় যদি প্রচুর পরিমাণে জলীয়বাষ্প জমা হয় এবং বাতাসের ওঠা-নামার কারণে সেটি মেঘে ঘনীভূত হয়, তখন মেঘ দ্রুত ভারী হয়ে ওঠে। এতে কিউমুলোনিম্বাস নামক বিশাল আকারের মেঘ তৈরি হয়, যা প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধারণ করে। এতে একসাথে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি নেমে আসে।

২. অনেক সময় গরম বাতাসের শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী স্রোত বৃষ্টির ফোঁটাকে নিচে নামতে বাধা দেয়। ফলে মেঘের মধ্যে জলীয় বাষ্প এবং জলের ফোঁটা জমতে থাকে। যখন মেঘটি আর জলের ভার ধরে রাখতে পারে না, তখন এটি হঠাৎ করে ফেটে যায়।

৩. পাহাড় বা উঁচু জায়গার কারণে আর্দ্র বাতাস আরও দ্রুত উপরে উঠে যায়, যা মেঘ তৈরিতে সাহায্য করে। এতে মেঘের ঘনত্ব ও জল ধারণ ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে ক্লাউডবার্স্ট ঘটতে পারে কি?

বাংলাদেশে সরাসরি ক্লাউডবার্স্ট ঘটার প্রমাণ খুবই সীমিত। এর প্রধান কারণ হলো আমাদের ভূ-প্রকৃতি বেশ সমতল এবং ক্লাউডবার্স্ট সাধারণত হিমালয়, নেপাল, উত্তর ভারত বা কাশ্মীরের মতো পাহাড়ি এলাকায় বেশি ঘটে। তবে বাংলাদেশে মৌসুমি বৃষ্টি, বজ্রঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় খুব স্বল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময় ক্লাউডবার্স্টের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু আবহাওয়াবিদরা এগুলোকে সাধারণত স্বল্পমেয়াদী প্রবল বৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করেন, ক্লাউডবার্স্ট হিসেবে নয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ক্লাউডবার্স্ট রেকর্ড করা হয়নি, তবে কিছু প্রবল স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টিকে অনেকেই তুলনা করেন ক্লাউডবার্স্টের সাথে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কম সময়ে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে রংপুরে, মাত্র ১২ ঘন্টায় ৪৩৩ মিলিমিটার (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০)। যা নিকট অতীতে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিস্ময়কর পরিমাণ বৃষ্টি।

তাছাড়া বাংলাদেশ মূলত সমতল এলাকা। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটের পাহাড়ি ঢল: ভারতের হিমালয় বা মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় ক্লাউডবার্স্ট হলে বৃষ্টির জল পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশের নদী ও ঢলপ্রবণ এলাকা যেমন কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, সিলেট অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে। উদাহরণ: ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি ঢল।

নদীর উজান থেকে আসা পানি: ভারত ও নেপাল হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলে পদ্মা, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পায় এবং আকস্মিক বন্যা হয়।

আঞ্চলিক আবহাওয়াগত কারণে: দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল বা হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঝড়ো বাতাস মিলিত হলে স্থানীয়ভাবে ‘ফ্লাশ ফ্লাড’ ঘটতে পারে। গ্রামীণ অঞ্চল বা ছোট নদী খাল দিয়ে পানি দ্রুত নেমে আসলে শহর বা গ্রাম ভেসে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি

বাংলাদেশে সরাসরি ক্লাউডবার্স্ট কম হলেও পার্শ্ববর্তী ভারতের হিমালয় ও মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আসা আকস্মিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের কিছু অঞ্চল, বিশেষকরে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, রাঙামাটি ও বান্দরবান ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য নি¤œলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে: আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নেওয়া, দুর্ঘটনা ঘটার আগে মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সময় দেওয়া, ক্লাউডবার্স্ট বা পাহাড়ি ঢল হঠাৎ আসে, তাই দ্রুত সতর্কতা প্রদান করা, আবহাওয়া বিভাগ ও নদী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে রিয়েল-টাইম আবহাওয়া ও নদীর পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা, মোবাইল এসএমএস, রেডিও ও সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার ও গ্রামের প্রধানদের সঙ্গে সমন্বয় করে দূর্গম এলাকা থেকে তাড়াতাড়ি উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করা, প্রভৃতি।

এছাড়া, নদী ভাঙন রোধে তীর সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ এবং জনগণকে আত্মনির্ভর নিরাপদ স্থান, দ্রুত স্থানান্তর পদ্ধতি, খাদ্য ও পানি সংগ্রহ সম্পর্কে শেখানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আকর্ষিক বন্যা থেকে বাঁচার জন্য। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দল তৈরি, যারা বিপর্যয়ের সময় তৎপরতার সঙ্গে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম চালাতে পারে।

প্রকৃতির এই হঠাৎ প্রলয় ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি মানুষকে সর্বদা মনে করিয়ে দেয় আমাদের অনিশ্চয়তা এবং ন্যূনতম প্রস্তুতির গুরুত্ব। এক মুহূর্তে ফুঁড়ে যায় ঘরবাড়ি, ভেসে যায় ফসল, নিঃস্ব হয়ে যায় জীবিকার সব সূত্র; শিশুদের কোল খালি থাকে, বয়স্করা আতঙ্কে কাঁদে। এসব দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতির শক্তি কতটা নির্দয় ও অপ্রত্যাশিত। তবে এই প্রলয়েও লুকিয়ে থাকে মানবতার সম্ভাবনা সহায়তার হাত বাড়ানো, আশ্রয় প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের প্রস্তুতি, সতর্কতা ও একে অপরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি হলে এই ভয়াবহ বৃষ্টিতেও জীবনকে সংরক্ষণ করা সম্ভব। প্রকৃতির অশ্রু যেমন ভাঙে পাহাড়ি ঢল, তেমনি আমাদের হৃদয়ও তা স্পর্শ করে, মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।

[লেখক: শিক্ষক, বাংলাদেশ স্টাডিজ অ্যান্ড জিওগ্রাফি, মানাারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ঢাকা]

বাংলাদেশের দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

রম্যগদ্য:“কবি এখন জেলে...”

কারা কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা ও ‘কারেকশন সার্ভিস’-এর বাস্তবতা

ছবি

বাংলাদেশের শহর পরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ছবি

‘আজ ফির তুমপে পেয়ার আয়া হ্যায়’

স্বপ্নের দক্ষিণ কোরিয়া; বাংলাদেশে আন্দোলন, ভিয়েতনামের সাফল্য

ডাকসু নির্বাচন ও জাতীয় রাজনীতি

ঢাকা শহরের উষ্ণতা: সবুজ হারানোর মূল্য

তিন বাহিনী প্রধানদের আশা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা

গনমাধ্যম জগতও নিষ্ঠুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে!

মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা: জাপান এক অনুসরণীয় আদর্শ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন ট্র্যাজেডি

হোক সবুজ বিপ্লব

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি : একজন বিধায়কের জামিন

নিউটনের আপেল : পতনের ভেতরে জাগরণের গল্প

বায়ুদূষণ গবেষণার প্রসার ও তরুণদের ভূমিকা : প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা আহমদ

চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি

ছবি

একাত্তরের গণহত্যা : সংখ্যার বিতর্ক নাকি দায় হালকা করার চেষ্টা?

রম্যগদ্য : ‘দালাল-ধন্বন্তরি-জীবন রক্ষাকারী...’

সাদা পাথর লুটে সর্বদলীয় ঐক্য

গণিতের বহুমুখী ব্যবহার : আধুনিক বিজ্ঞানের চালিকাশক্তি

প্রসঙ্গ : পেঁপের রিং স্পট ভাইরাস

ছবি

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা : রাজনৈতিক বিভেদের অমোচনীয় ক্ষত

ছবি

আলফ্রেড সরেন হত্যা : বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে

কারাম উৎসব : বাংলার প্রাচীন কৃষি ও সংস্কৃতির ধারক

ছবি

আলাস্কা বৈঠক : শান্তির দেখা কি মিলল?

বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কতদূর?

মবের উন্মাদনা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অধিকার

জীবন থেকে নেয়া শিক্ষাগুলোই এগিয়ে দেয় জীবনকে

রাজনৈতিক কর্মসূচি, যানজট ও আচরণগত অর্থনীতি

সম্পদের অভিশাপ : সিলেটের সাদাপাথরে সংঘাতের সমাজতত্ত্ব ও নীতি-সংকট

নির্বাচন সুষ্ঠু হবে তো

মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার জরুরি

ছবি

সাদাপাথরের নীলাভ দেশ : ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য ও সংকট

একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সমাজতত্ত্ব

বেইজিংয়ের সঙ্গে নয়াদিল্লির নতুন ভূরাজনীতি

tab

opinion » post-editorial

ক্লাউডবার্স্ট: মৃত্যুর বার্তা নিয়ে, আকাশ যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে

জাহিদুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট ২০২৫

হঠাৎ নেমে আসা কালো মেঘ। বজ্রের গর্জন আর অবিরাম বর্ষণ এ যেন শুধু আকাশের কান্না নয়, মানুষের নিয়তিরও এক ভয়াবহ রূপ। প্রকৃতির এই রূপকে বাংলার সাহিত্যিকরাও যেমন ধরেছেন, তেমনি বিশ্ব সাহিত্যের মহৎ কণ্ঠগুলোও তুলে এনেছেন মানুষের অসহায়ত্ব, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার তীব্র আকাক্সক্ষা। বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে আমরা দেখি জেলেদের জীবনের সঙ্গে বন্যার চিরন্তন লড়াই। কুবেরের মুখে উচ্চারিত সংলাপ ‘হায় পদ্মা, তুই কত প্রাণ খেয়ে লইলি!’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্যার সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন ‘বন্যা, তোমার দ্বার খুলিয়া দাও, আমরা আসি প্রার্থনা করিতে।’ তার প্রার্থনা আসলে মানুষের বিনয়, যে মানুষ জানে প্রকৃতির সামনে তার শক্তি কত ক্ষুদ্র।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি’-তে সান্তিয়াগো সমুদ্রকে বলেন ‘ সমুদ্র বিপজ্জনক, প্রতিটি ঝড়ও তাই। কিন্তু সে আমাদের জীবনও দেয়।’ প্রকৃতির দ্বৈত রূপকেই তুলে ধরে। ভিক্টর হুগোর ‘লা মিজেরাবল’-এ ঝড়ো বৃষ্টিকে তিনি বর্ণনা করেন যেন আকাশ নিজেই কাঁদছে: ‘মুষলধারে বৃষ্টি নামছে, যেন স্বর্গ নিজেই হতভাগ্যদের জন্য কাঁদছে।’ প্রকৃতি যেন মানুষের দুঃখকেও বহন করে। আর কোলরিজের ‘দ্যা রাইম অব এনশিয়েন্ট মেরিনার’-এ ঝড় বৃষ্টির মধ্যে জলই হয়ে ওঠে অভিশাপ ‘পানি, সবজায়গায় পানি, পান করার জন্য এক ফোঁটাও নেই।’

এসব সাহিত্যকর্মে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য পাওয়া যায়, বাংলাদেশের পদ্মা বা তিতাসের বন্যা হোক, কিংবা ইউরোপের ঝড়ো সমুদ্র, কিংবা নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবন প্রকৃতির প্রলয় সবসময় মানুষের ক্ষুদ্রতাকে মনে করিয়ে দেয়। সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তানের কয়েকটি জায়গায় ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বর্ষণের খবর প্রায় সকল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বেশন্ত্রি গ্রামে দাফনের মতো লোকও আর অবশিষ্ট নেই। পাকিস্তানের সরকারি হিসাবে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে ৩ দিনে ৫ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।

এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ আগস্ট ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের কিশটওয়ার জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে একই কারণে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে দ্বিতীয় ধাপে আবারও ক্লাউডবার্স্ট হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৮ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।

প্রথমে জানা দরকার ক্লাউডবার্স্ট কী? ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি বা মেঘের বিস্ফোরণ। এটি হলো এক ধরনের অতিবৃষ্টি, যেখানে খুব অল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ও ছোট এলাকায় (সাধারণত ১০ থেকে ২০ বর্গ কিলোমিটার) অস্বাভাবিক ও তীব্র বৃষ্টিপাত হয়। আবহাওয়াবিদদের মতে, অধিকাংশ ক্লাউডবার্স্ট বজ্রঝড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ঝড়ে বায়ুর প্রবল ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়, যা অনেক সময় ঘনীভূত হওয়া জলকণাকে মাটিতে পড়তে বাধা দেয়। ফলে প্রচুর পরিমাণ পানি মেঘের উচ্চস্তরে জমা হয়ে যায়। যখন এই ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন একসঙ্গে সেই সঞ্চিত পানি প্রবল বর্ষণ আকারে নেমে আসে। যদি এক ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত হয়, তবে তাকে মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি বা মেঘ বিস্ফোরণ বলা হয়। বেশ কিছু কারণে ক্লাউডবার্স্ট তৈরি হতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে-

১. কোনো এলাকায় যদি প্রচুর পরিমাণে জলীয়বাষ্প জমা হয় এবং বাতাসের ওঠা-নামার কারণে সেটি মেঘে ঘনীভূত হয়, তখন মেঘ দ্রুত ভারী হয়ে ওঠে। এতে কিউমুলোনিম্বাস নামক বিশাল আকারের মেঘ তৈরি হয়, যা প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধারণ করে। এতে একসাথে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টি নেমে আসে।

২. অনেক সময় গরম বাতাসের শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী স্রোত বৃষ্টির ফোঁটাকে নিচে নামতে বাধা দেয়। ফলে মেঘের মধ্যে জলীয় বাষ্প এবং জলের ফোঁটা জমতে থাকে। যখন মেঘটি আর জলের ভার ধরে রাখতে পারে না, তখন এটি হঠাৎ করে ফেটে যায়।

৩. পাহাড় বা উঁচু জায়গার কারণে আর্দ্র বাতাস আরও দ্রুত উপরে উঠে যায়, যা মেঘ তৈরিতে সাহায্য করে। এতে মেঘের ঘনত্ব ও জল ধারণ ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে ক্লাউডবার্স্ট ঘটতে পারে কি?

বাংলাদেশে সরাসরি ক্লাউডবার্স্ট ঘটার প্রমাণ খুবই সীমিত। এর প্রধান কারণ হলো আমাদের ভূ-প্রকৃতি বেশ সমতল এবং ক্লাউডবার্স্ট সাধারণত হিমালয়, নেপাল, উত্তর ভারত বা কাশ্মীরের মতো পাহাড়ি এলাকায় বেশি ঘটে। তবে বাংলাদেশে মৌসুমি বৃষ্টি, বজ্রঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় খুব স্বল্প সময়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, যা অনেক সময় ক্লাউডবার্স্টের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু আবহাওয়াবিদরা এগুলোকে সাধারণত স্বল্পমেয়াদী প্রবল বৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করেন, ক্লাউডবার্স্ট হিসেবে নয়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ক্লাউডবার্স্ট রেকর্ড করা হয়নি, তবে কিছু প্রবল স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টিকে অনেকেই তুলনা করেন ক্লাউডবার্স্টের সাথে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কম সময়ে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে রংপুরে, মাত্র ১২ ঘন্টায় ৪৩৩ মিলিমিটার (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০)। যা নিকট অতীতে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিস্ময়কর পরিমাণ বৃষ্টি।

তাছাড়া বাংলাদেশ মূলত সমতল এলাকা। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেটের পাহাড়ি ঢল: ভারতের হিমালয় বা মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় ক্লাউডবার্স্ট হলে বৃষ্টির জল পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশের নদী ও ঢলপ্রবণ এলাকা যেমন কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, সিলেট অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে। উদাহরণ: ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি ঢল।

নদীর উজান থেকে আসা পানি: ভারত ও নেপাল হিমালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টি হলে পদ্মা, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পায় এবং আকস্মিক বন্যা হয়।

আঞ্চলিক আবহাওয়াগত কারণে: দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল বা হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঝড়ো বাতাস মিলিত হলে স্থানীয়ভাবে ‘ফ্লাশ ফ্লাড’ ঘটতে পারে। গ্রামীণ অঞ্চল বা ছোট নদী খাল দিয়ে পানি দ্রুত নেমে আসলে শহর বা গ্রাম ভেসে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি

বাংলাদেশে সরাসরি ক্লাউডবার্স্ট কম হলেও পার্শ্ববর্তী ভারতের হিমালয় ও মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আসা আকস্মিক বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে দেশের কিছু অঞ্চল, বিশেষকরে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, রাঙামাটি ও বান্দরবান ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য নি¤œলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। এরমধ্যে রয়েছে: আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নেওয়া, দুর্ঘটনা ঘটার আগে মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সময় দেওয়া, ক্লাউডবার্স্ট বা পাহাড়ি ঢল হঠাৎ আসে, তাই দ্রুত সতর্কতা প্রদান করা, আবহাওয়া বিভাগ ও নদী নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে রিয়েল-টাইম আবহাওয়া ও নদীর পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা, মোবাইল এসএমএস, রেডিও ও সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করা, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বাজার ও গ্রামের প্রধানদের সঙ্গে সমন্বয় করে দূর্গম এলাকা থেকে তাড়াতাড়ি উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করা, প্রভৃতি।

এছাড়া, নদী ভাঙন রোধে তীর সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ এবং জনগণকে আত্মনির্ভর নিরাপদ স্থান, দ্রুত স্থানান্তর পদ্ধতি, খাদ্য ও পানি সংগ্রহ সম্পর্কে শেখানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আকর্ষিক বন্যা থেকে বাঁচার জন্য। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী দল তৈরি, যারা বিপর্যয়ের সময় তৎপরতার সঙ্গে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম চালাতে পারে।

প্রকৃতির এই হঠাৎ প্রলয় ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি মানুষকে সর্বদা মনে করিয়ে দেয় আমাদের অনিশ্চয়তা এবং ন্যূনতম প্রস্তুতির গুরুত্ব। এক মুহূর্তে ফুঁড়ে যায় ঘরবাড়ি, ভেসে যায় ফসল, নিঃস্ব হয়ে যায় জীবিকার সব সূত্র; শিশুদের কোল খালি থাকে, বয়স্করা আতঙ্কে কাঁদে। এসব দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতির শক্তি কতটা নির্দয় ও অপ্রত্যাশিত। তবে এই প্রলয়েও লুকিয়ে থাকে মানবতার সম্ভাবনা সহায়তার হাত বাড়ানো, আশ্রয় প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের প্রস্তুতি, সতর্কতা ও একে অপরের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি হলে এই ভয়াবহ বৃষ্টিতেও জীবনকে সংরক্ষণ করা সম্ভব। প্রকৃতির অশ্রু যেমন ভাঙে পাহাড়ি ঢল, তেমনি আমাদের হৃদয়ও তা স্পর্শ করে, মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের মানবিক দায়বদ্ধতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।

[লেখক: শিক্ষক, বাংলাদেশ স্টাডিজ অ্যান্ড জিওগ্রাফি, মানাারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ঢাকা]

back to top