আনোয়ারুল হক
আমাদের তারুণ্যের দিনগুলোতে সংগঠনের সম্মেলন বা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটক মঞ্চস্থ করার আয়োজন নিয়ে মনে কি যে আবেগ অনুভূতি সঞ্চারিত হতো তা প্রকাশ করাটা কঠিন। প্রথমত নাটকের নামটিই কেমন একটা টান সৃষ্টি করে। ‘রক্তকরবী’ শব্দটি ফুলের নাম যা একদিকে যেমন সৌন্দর্য্য ও ভালোবাসার প্রতীক, অন্যদিকে রক্তপাতের প্রতীক। আর এ নাটকের চরিত্র নন্দিনী ছিল মূলত মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করার ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে রক্তকরবীর লাল আভায় সবকিছু রঙিন করে দিয়ে সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার এক অভিনব চরিত্র। মানুষের প্রবল লোভ কীভাবে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্য্য ও স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে মানুষকে নিছক যন্ত্রে ও উৎপাদনের উপকরণে পরিণত করেছে এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ কী রূপ ধারণ করছে তারই রূপায়ণ রক্তকরবী নাটকে।
ব্যবস্থা পরিবর্তনের তেমনই এক আকাক্সক্ষা দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে। নিপীড়ন, লাঞ্ছনা, অবমাননার জীবন থেকে শুরু করে তাদের জীবনের প্রতিটি বাস্তবতা নিয়ন্ত্রিত হতো ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদী পরিবেশে। হুকুম আসলেই মিছিলে যেতে হবে। দল না করলেও দলের নামে জয়ধ্বনি দিতে হবে। ঠিক যেন রক্তকরবী নাটকে যক্ষপুরী নগরের রাজার হুকুমে দিনের পর দিন শ্রমিকরা পাতাল থেকে সোনা তুলে আনছে। মানুষ নয় তারা, স্বর্ণলাভের যন্ত্রমাত্র। এখানে কোনো সৃষ্টি নেই, মানবিকতা নেই। আছে শুধু অমানবিক শ্রম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম, গেস্টরুম ব্যবস্থার রাজাদের কাছে সেখানে বসবাসকারীরা ছাত্র নয় ‘মিছিল শ্রমিক’ মাত্র। দীর্ঘকাল যাবৎ রাজা যায়, রাজা আসে। কিন্তু মিছিল শ্রমিকদের দাসত্ব থেকে মুক্তি নেই। এই স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা দীর্ঘকাল যাবতই শিক্ষার্থীরা পোষণ করে আসছিলেন। কোটা আন্দোলনের উপর রাজার বাহিনীর হামলা যেদিন আন্দোলনকারীরা প্রতিহত করতে সক্ষম হ’ল, সেদিন মূহূর্তের মধ্যে ‘মিছিল শ্রমিকেরা’ জেগে উঠে ‘ক্যাম্পাস-রাজাদের’ বিতাড়িত করে দিলো। আর বিদ্রোহের ‘সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে, সবখানে’। দেশের রাজাও হলেন বিতাড়িত।
কিন্তু বিশ্ব মোড়লদের আধিপত্যকে বিতাড়ন কি এতই সহজ? এতদিন বক্তৃতা শুনলাম ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সকল অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে। এক বছরে কিছুই তো বাতিল হ’ল না। পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ভারতীয়দের জন্য সুবিধাজনক শর্তে ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিÑ সবই তো বহাল আছে। তিস্তার পানি নিয়েও মুখ বন্ধ। আগের মতোই ইলিশ, আম ভেট হিসেবে যাচ্ছে। আবার এটাও এখন দেখা যাচ্ছে সকল চুক্তিকে যেভাবে ঢালাও অসম বলে সস্তা ভারত বিরোধিতা করা হতো সেটাও সঠিক নয়। অনেক চুক্তি বা বাণিজ্য আমাদেরও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বটে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিকটবর্তী প্রতিবেশী হিসাবে নিরাপদ সীমান্ত দুই দেশেরই অভিন্ন স্বার্থ। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের যে ধারা চলছিল তা বন্ধ আছে। কিন্তু লাভ কী হলো? আরো বড় মোড়লের পাল্লায় পড়ে গেলাম! বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা এমনি। ছোট মোড়লের হাত থেকে মুক্তি পেতে যেয়ে বড় মোড়লের হাতে পড়লাম। এ মোড়ল আবার উন্মাদ মোড়ল। নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসেই সারা দুনিয়া অস্থির!
তবে পশ্চিমা মোড়ল আমাদের খুবই পছন্দের, আমাদের কাছে গণতন্ত্রের পীঠস্থান! আমাদের ‘সামাজিক ব্যবসা’কে স্বীকৃতি দিয়েছে। নোবেল দিয়েছে। তাইতো আমাদের দেশে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তারা আগাম জানিয়ে দেয়, ‘বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে যাচ্ছে’। আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার সাথে সাথে তারা পাঠিয়ে দেয় তাদের দেশে দীর্ঘকালব্যাপি অবস্থানকারী বেশ কিছু বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ‘বিশেষজ্ঞ’কে। তাদের কারো কারো বিজ্ঞ মত, ‘নতুন স্বাধীনতা বা দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ শুধু শ্লোগান দিলেই হবে না, তা কায়েম করতে হলে “শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এদেশের হিন্দুরা(!) ‘৭১ সালে দেশ স্বাধীন করে” যে সংবিধান তৈরী করেছে তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দেশবাসীকে দুধ দিয়ে গোসল করে পাকসাফ হয়ে ‘নতুন সংবিধান, নতুন রিপাবলিক করতে হবে’। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা যেটুকু নিজেরা বলতে সাহস পান না, সেটা আবার বড় মোড়লপুষ্ট রাজনৈতিক দলের তরুণ তুর্কিদের দিয়ে অথবা পাক প্রেমিক প্রবীণ ধর্ম ব্যবসায়ীদের দিয়ে বলান।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেছেন মানবিক সহায়তা প্রেরণের জন্য মায়ানমার সীমান্তে ভিনদেশী সেনাদের করিডোর সুবিধা আর চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা বিদেশীদের কাছে লিজ প্রদান করলে এ দেশে নাকি দুধের নহর বয়ে যাবে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের অভিভাবক হিসাবে আমরা পরিণত হবো এ অঞ্চলের ছোট মোড়ল। জাতি হিসেবে এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে!
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে নোবেল লরিয়েট দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মানুষ ধারণা করেছিলেন তিনি নিরপেক্ষতার প্রতীক। তিনিও ভাব দেখালেন যে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি সরকার পতনের খবর পান। আগেপিছে সাতপাঁচ কিছুই জানতেন না। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই প্রকাশ পাচ্ছে নানান তথ্য। শুরুতেই নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে তিনি সমন্বয়কদের উৎসাহিত করেন। তার প্রেস সচিব নতুন দলের আহ্বায়ককে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কার্যত তার সরকারকে দলনিরপেক্ষ সরকার বলা যায় না। তার প্রেস সচিব নিয়মিত রাজনৈতিক বয়ান দিয়ে চলেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ‘গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধির’ তদারকি রয়েছে। আর নতুন দল গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা তো সরকারে রয়েছেনই। এরা আবার গাছের ও তলার দুটোই খেতে চান।
সরকারে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে দল গঠনের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করে অতপর সরকার থেকে পদত্যাগ করে একজন দল প্রধানের দায়িত্ব নিলেন। আমরা সবাই তার ক্ষমতা ত্যাগের এবং সরকারকে নিরপেক্ষ রাখার এ মহান প্রচেষ্টা দেখে ধন্য ধন্য করে উঠলাম। এ দেশে কে কবে পদত্যাগের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে! সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ এবং দেশত্যাগ করার পরও এখন আবার বলছেন তিনি পদত্যাগই করেননি। সেখানে স্বেচ্ছায় এ ধরনের পদত্যাগ নিশ্চয়ই ইতিহাস হয়ে থাকবে! শুধু তাই নয় ইতোমধ্যে আরো একজন ঘোষণা দিয়েছেন ওয়েস্টিন আর নীলা মার্কেটে হাঁসের মাংস অনেক খাওয়া হইছে, আর না, এবার পদত্যাগ করে মিন্টো রোডে আসার আগের সেই পুরাতন শেরাটনে আবার ফিরে যাবেন। শেরাটনের হাঁসের মাংসের মানও খারাপ নয় তো!
নতুন দল গড়ার এমন বিলাসী তৎপরতা বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি। সবচেয়ে বিস্ময়ের সাথে মানুষ লক্ষ্য করছে, যে তরুণরা এ আন্দোলনে শহীদ হয়ে যেতে পারতেন তারা আজ গাড়ি, বাড়ি, বিলাসিতায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। ভোগবাদী অর্থনীতি কত অল্প সময়ে মানুষকে পরিবর্তিত করতে পারে সমন্বয়ক ও ছাত্র উপদেষ্টারা তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবেন। একদিকে অর্থলিপ্সা অন্যদিকে প্রতিহিংসা, আক্রোশ এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও আচরণে প্রচলিত রাজনীতির প্রধান দুই দলকেই তারা এই এক বছরে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতি করে শেখ হাসিনা নিজের ও আওয়ামী লীগের কি করুণ পরিণতি ডেকে আনলেন তা থেকে কেউ কোনো শিক্ষা নিলো না। নতুন দলের নেতাদের জেনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিহিংসাকে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দিয়েও কিন্তু পার পাওয়া যায় না। শেখ হাসিনা তো সংবিধানে অনেকগুলো সুরক্ষা বিল সংযোজন করেছিলেন। সুরক্ষা কি পেলেন?
তরুণদের মাঝে মানুষ যে ভরসা খুঁজছিলেন তা আজ হতাশায় পরিণত হয়েছে। এদের কায়কারবার দেখে শহুরে মধ্যবিত্ত এবং জুলাই জাগরণে শামিল হওয়া লাখো লাখো তরুণের কাছে নতুন দলটি এখন এক স্বপ্নভঙ্গের বেদনা হিসাবেই পরিচিতি অর্জন করেছে। একদিকে নতুন দলের কর্তাব্যক্তিদের জন্য সরকারি প্রটোকল, সভাসমাবেশ করার জন্য প্রশাসনিক সহায়তা এবং অন্যদিকে বিগত বছরগুলোতে যারা আর্থিক খাতে লুটপাট করেছে লুটপাটের একটা অংশ এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসছে নতুন দলের কাছে। উপরন্তু পশ্চিমা মদত তো আছেই। পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রাষ্ট্রকেই যখন চলতে হচ্ছে তখন তাদের পরামর্শ অনুযায়ী দল পরিচালনা করতে আর দ্বিধা কিসের!
পশ্চিমা দুনিয়ার মোড়ল হিসেবে মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন একদিকে সরকার অন্যদিকে বিএনপি, জামাত, এনসিপি প্রভৃতি রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার কাজে। বিষয়টি তো একেবারে খুল্লমখুল্লা করে দিয়েছেন জনাব ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে মার্কিন দূতাবাসের পরামর্শ মোতাবেক। অর্থাৎ আমাদের বিরাট উন্নতি হয়েছে! আগে ছিলাম সরাসরি প্রতিবেশী দেশের রাজা- মন্ত্রীদের তত্ত্বাবধানে। আর এখন আছি বড় মোড়লের ছোটখাটো পাইকপেয়াদার তত্ত্বাবধানে। মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন ছাড়াও প্রকাশ্যে আমাদের তত্ত্বাবধানে আছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা, ‘এক/এগারো’ সময়ের রাষ্ট্রদূত জন এফ ড্যানিলোভিজ এবং সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অ্যাকসিলারেট এনার্জির স্ট্র্যাটেজিক উপদেষ্টা পদে যোগ দিয়ে পিটার হাস এ দেশে নিয়মিত যাওয়া আসা এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বজায় রাখছেন। মোজেনা, ড্যানিলোভিজ ও হাস নানা নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক সেমিনার সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করছেন এবং বাংলাদেশ থেকে তরুণ তরুণীদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে সব অনুষ্ঠানে। ফরহাদ মাজহারের সেমিনারের চেয়ে তরুণরা বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন সে সব সেমিনারে অংশ নিতে। হয়তোবা সে কারণেই ফরহাদ মাজহারের কন্ঠে আক্ষেপের সুর!
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তর এং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য মুক্তির যে স্বপ্ন অনেকে দেখেছিলেন তা কি রাজনৈতিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক শক্তির প্রয়াস ও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব? এবারের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে ধরনের কোনো রাজনৈতিক শক্তি কি বিকাশ লাভ করেছে? জনসাধারণের মাঝেও কি ভাসা ভাসা ধারণা ছাড়া মূর্ত কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিলো? একমাত্র মূর্ত কর্মসূচি ছিলো জবরদস্তিমূলকভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা রেজিমের পরিবর্তন। আর তাই শত শত পৃষ্ঠার সংস্কার প্রস্তাবেও অর্থনীতির ন্যূনতম গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নকে পাশ কাটানো সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে এক বিশাল জনগোষ্ঠী যখন পিছিয়ে আছে এবং জীবন-জীবিকা নির্বাহ করাই তাদের জন্য কঠিন তখন এ সব প্রশ্ন এড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার কি সম্ভব?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এবারের গণসংগ্রামের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে উগ্র দক্ষিণপন্থা ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। দক্ষিণ ও মধ্য-দক্ষিণ পন্থার রাজনীতি ১৯৯১ সালে অর্জিত ভোটের গণতন্ত্রটুকুই টিকিয়ে রাখতে না পারায় আজ দেশের বুকে উগ্র ধর্মান্ধ ও নারী বিদ্বেষী শক্তির এক ভয়াবহ উত্থান ঘটেছে। অন্যদিকে নানাভাবে বিভক্ত বামপন্থার দিকে তাকালে মনে হয় প্রায় সকলেই অনেকটা পাথরের মত স্থির হয়ে আছে। অথচ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর জমিদারী শোষণের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখ-ে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থা এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পাকিস্তানি শাসকরা বেআইনি ঘোষণা করার পরেও নতুন করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের সংগ্রামে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বেই মিশে আছে কত শত কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত! আশির দশক জুড়েও একদিকে শ্রেণী আন্দোলন এবং সমান্তরালভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে শামিল থেকে বাম আন্দোলন এক আশাজাগানিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। বামপন্থীদের প্রধান দল কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভক্তি, অন্যান্য বাম দলেও বিভক্তি জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের ভূমিকাকে দূর্বল করে ফেলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্যের কমিশন বামপন্থীদের প্রস্তাবনা সমূহকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয়নি।
তবে একটি বিষয় সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন একমত দ্বিমতসহ যাবতীয় সংস্কার প্রস্তাবনা বা সনদ চূড়ান্ত করার দায়িত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বা পার্লামেন্টের উপর ন্যস্ত করতে হবে। অর্থাৎ ফরমানের মাধ্যমে নয়, বাংলাদেশের ভাগ্য ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। সেটাই গণতন্ত্র। জোরজবরদস্তি করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার ম্যান্ডেট ইউনূস সরকারকে কেউ দেয়নি। এটা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সুপ্রিম কোর্টের যে রেফারেন্স বলে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছে সে রেফারেন্সে কিন্তু দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটাও বিবেচনায় রাখা উচিত, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রহরা ছাড়া সরকারের সমর্থনপুষ্ট নতুন দলের কার্যক্রম পরিচালনা অনেক স্থানেই কঠিন হয়ে পড়ছে। মনে রাখা প্রয়োজন জোরজবরদস্তি করতে যেয়ে এক-এগারো সরকারের কুশীলবদের কিন্তু দেশ ছাড়তে হয়েছে।
সব মিলিয়ে এটা খুবই স্পষ্ট যে, আমাদের মাতৃভূমি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ডানপন্থা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে টেকসই কোনো বিকল্প সমাধান বের করতে পারবে বলে মনে হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারও খেই হারিয়ে ফেলছে। তারা পশ্চিমা মিত্রদের সন্তুষ্ট রেখে সম্মানজনক প্রস্থান পর্বের অনুসন্ধানে আছে। আপাত ব্যবস্থা হিসেবে তারা নির্বাচনের দিকেই অগ্রসর হবে বলে মনে হচ্ছে।
নির্বাচনই হোক আর টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্যই হোক দেশের এই ক্রান্তিকালে বামপন্থী শক্তিসমূহকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দুটি পৃথক বামপন্থী জোট ছাড়াও বিভিন্ন অবস্থানে ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে হলেও বামপন্থী অনেক দল আছে। এত বিভক্তি এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকাটা বামপন্থী শক্তির জন্য শুধু অস্বস্তিকরই নয় জাতীয় রাজনীতিতে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথে অন্তরায়। আবার বামপন্থীদের নানা ছুতমার্গের সাথেও আমরা পরিচিত যা ঐক্যের পথে অন্তরায়। এ পরিস্থিতিতে নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতাসহ এক বৃহত্তর জোটে যাতে সকল বামপন্থী শামিল হতে পারেন সে প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। এ ধরনের ঐক্য দিয়ে শুরু করে খ- খ- নানা সংগ্রামের মাধ্যমে পৌঁছানো যেতে পারে উচ্চতর পর্যায়ের ঐক্যে।
বৈষম্য দূর করে সমাজের সর্বস্তরে সাম্য প্রতিষ্ঠা করাই বামপন্থী আন্দোলনের মূল মন্ত্র। সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য যতদিন থাকবে বামপন্থার প্রয়োজনীয়তা ততদিন নিঃশেষ হবে না। জুলাই জাগরণেও কোটা বিরোধী আওয়াজ এক সময় পরিণত হলো সমাজে সকল ধরনের বৈষম্য অবসানের আকাক্সক্ষা আর আকুতিতে। দেশে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার যে আয়োজন পর্ব চলছে সে আয়োজনে শ্রমজীবী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষেত মজুর হাতে লাল নিশান আর কাঁধে কাস্তে হাতুড়ি প্রতীক নিয়ে যত বেশি সংখ্যায় অগ্রসর হবেন তত ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে কোণঠাসা করে শক্তিশালী কাঠামোর গণতন্ত্র নির্মাণ সম্ভবপর হবে।
বাংলাদেশ রাজনৈতিক শুন্যতার এক মহাসন্ধিক্ষণে। যেখানে দাঁড়িয়ে দেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা উল্লম্ফন করছে, রাজা-উজির মারছে। ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা মরিয়া। ‘ফ্যাসিবাদের প্রতিমা’ ভাঙতে গিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ম্যুরালসহ সব চিহ্ন ধ্বংস করে ফেলছে। বিভিন্ন স্থাপনার নতুন নামকরণের ভেতর দিয়ে একাত্তরকে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে চব্বিশ দিয়ে। আর তাদের পাকিস্তানি প্রভুরা ঔদ্ধত্যের সাথে ঘোষণা করছে, ’৫৪ বছর পর হিসাব-নিকাশের সময় এসেছে। পূর্ব পাকিস্তানকে ফিরে আসতে হবে।’ এরপরেও ইউনূস সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চুপ। এর আগেও ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার পরেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিবাদ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোও নয়। প্রতিবাদী রাজনীতির এমন শুন্যতা বাংলাদেশ আগে দেখেনি।
প্রকৃতি শুন্যতা পছন্দ করে না। এ শুন্যতা পূরনে যেতে হবে ‘রক্তকরবীর নন্দিনীর’ কাছে। নন্দিনীর জয় মানেই তো প্রাণের জয়, প্রেম ও প্রকৃতির জয়, শোষণ, বঞ্চনা, বৈষ্যমের বিরুদ্ধে জয়। পুঁজির লুন্ঠন আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জয়। পাথরের মত স্থির না থেকে জুলাই জাগরণের অভিজ্ঞতায় বামপন্থার নবায়ন হলে এবং অতীতের তিক্ততা ভুলে সকল বামপন্থীরা একত্রিত হয়ে মধ্যবাম, প্রগতিশীল ও উদার গণতন্ত্রীদের সাথে নিয়ে এক বাম- গণতান্ত্রিক মহাজোট গঠনে সক্ষম হলে নতুন পথের ও আজকের যুগের নন্দিনীদের সন্ধান মিলতে পারে। সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যেও জন্ম নেয় নতুন নতুন স্বপ্ন। আশাবাদী মানুষের মত দ্বিধায় দোলাচলে থাকা মানুষও স্বপ্ন দেখতে চায় - রক্তকরবীর লাল আভায় সবকিছু রঙিন করে দিয়ে সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার লড়াইয়ের রূপায়ণ শুধু নাটকে নয় বাস্তবেও করার প্রত্যয়ে দেশের সব বামপন্থীরা একত্রে এগিয়ে আসুক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ছাত্র নেতা]
আনোয়ারুল হক
রোববার, ৩১ আগস্ট ২০২৫
আমাদের তারুণ্যের দিনগুলোতে সংগঠনের সম্মেলন বা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটক মঞ্চস্থ করার আয়োজন নিয়ে মনে কি যে আবেগ অনুভূতি সঞ্চারিত হতো তা প্রকাশ করাটা কঠিন। প্রথমত নাটকের নামটিই কেমন একটা টান সৃষ্টি করে। ‘রক্তকরবী’ শব্দটি ফুলের নাম যা একদিকে যেমন সৌন্দর্য্য ও ভালোবাসার প্রতীক, অন্যদিকে রক্তপাতের প্রতীক। আর এ নাটকের চরিত্র নন্দিনী ছিল মূলত মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করার ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে রক্তকরবীর লাল আভায় সবকিছু রঙিন করে দিয়ে সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার এক অভিনব চরিত্র। মানুষের প্রবল লোভ কীভাবে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্য্য ও স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে মানুষকে নিছক যন্ত্রে ও উৎপাদনের উপকরণে পরিণত করেছে এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ কী রূপ ধারণ করছে তারই রূপায়ণ রক্তকরবী নাটকে।
ব্যবস্থা পরিবর্তনের তেমনই এক আকাক্সক্ষা দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে থাকা শিক্ষার্থীদের মাঝে। নিপীড়ন, লাঞ্ছনা, অবমাননার জীবন থেকে শুরু করে তাদের জীবনের প্রতিটি বাস্তবতা নিয়ন্ত্রিত হতো ভয়ংকর কর্তৃত্ববাদী পরিবেশে। হুকুম আসলেই মিছিলে যেতে হবে। দল না করলেও দলের নামে জয়ধ্বনি দিতে হবে। ঠিক যেন রক্তকরবী নাটকে যক্ষপুরী নগরের রাজার হুকুমে দিনের পর দিন শ্রমিকরা পাতাল থেকে সোনা তুলে আনছে। মানুষ নয় তারা, স্বর্ণলাভের যন্ত্রমাত্র। এখানে কোনো সৃষ্টি নেই, মানবিকতা নেই। আছে শুধু অমানবিক শ্রম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম, গেস্টরুম ব্যবস্থার রাজাদের কাছে সেখানে বসবাসকারীরা ছাত্র নয় ‘মিছিল শ্রমিক’ মাত্র। দীর্ঘকাল যাবৎ রাজা যায়, রাজা আসে। কিন্তু মিছিল শ্রমিকদের দাসত্ব থেকে মুক্তি নেই। এই স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা দীর্ঘকাল যাবতই শিক্ষার্থীরা পোষণ করে আসছিলেন। কোটা আন্দোলনের উপর রাজার বাহিনীর হামলা যেদিন আন্দোলনকারীরা প্রতিহত করতে সক্ষম হ’ল, সেদিন মূহূর্তের মধ্যে ‘মিছিল শ্রমিকেরা’ জেগে উঠে ‘ক্যাম্পাস-রাজাদের’ বিতাড়িত করে দিলো। আর বিদ্রোহের ‘সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে, সবখানে’। দেশের রাজাও হলেন বিতাড়িত।
কিন্তু বিশ্ব মোড়লদের আধিপত্যকে বিতাড়ন কি এতই সহজ? এতদিন বক্তৃতা শুনলাম ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে সকল অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে। এক বছরে কিছুই তো বাতিল হ’ল না। পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ভারতীয়দের জন্য সুবিধাজনক শর্তে ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট চুক্তিÑ সবই তো বহাল আছে। তিস্তার পানি নিয়েও মুখ বন্ধ। আগের মতোই ইলিশ, আম ভেট হিসেবে যাচ্ছে। আবার এটাও এখন দেখা যাচ্ছে সকল চুক্তিকে যেভাবে ঢালাও অসম বলে সস্তা ভারত বিরোধিতা করা হতো সেটাও সঠিক নয়। অনেক চুক্তি বা বাণিজ্য আমাদেরও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বটে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিকটবর্তী প্রতিবেশী হিসাবে নিরাপদ সীমান্ত দুই দেশেরই অভিন্ন স্বার্থ। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের যে ধারা চলছিল তা বন্ধ আছে। কিন্তু লাভ কী হলো? আরো বড় মোড়লের পাল্লায় পড়ে গেলাম! বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা এমনি। ছোট মোড়লের হাত থেকে মুক্তি পেতে যেয়ে বড় মোড়লের হাতে পড়লাম। এ মোড়ল আবার উন্মাদ মোড়ল। নির্বাচিত হওয়ার কয়েক মাসেই সারা দুনিয়া অস্থির!
তবে পশ্চিমা মোড়ল আমাদের খুবই পছন্দের, আমাদের কাছে গণতন্ত্রের পীঠস্থান! আমাদের ‘সামাজিক ব্যবসা’কে স্বীকৃতি দিয়েছে। নোবেল দিয়েছে। তাইতো আমাদের দেশে নতুন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তারা আগাম জানিয়ে দেয়, ‘বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটতে যাচ্ছে’। আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার সাথে সাথে তারা পাঠিয়ে দেয় তাদের দেশে দীর্ঘকালব্যাপি অবস্থানকারী বেশ কিছু বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ‘বিশেষজ্ঞ’কে। তাদের কারো কারো বিজ্ঞ মত, ‘নতুন স্বাধীনতা বা দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ শুধু শ্লোগান দিলেই হবে না, তা কায়েম করতে হলে “শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এদেশের হিন্দুরা(!) ‘৭১ সালে দেশ স্বাধীন করে” যে সংবিধান তৈরী করেছে তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দেশবাসীকে দুধ দিয়ে গোসল করে পাকসাফ হয়ে ‘নতুন সংবিধান, নতুন রিপাবলিক করতে হবে’। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা যেটুকু নিজেরা বলতে সাহস পান না, সেটা আবার বড় মোড়লপুষ্ট রাজনৈতিক দলের তরুণ তুর্কিদের দিয়ে অথবা পাক প্রেমিক প্রবীণ ধর্ম ব্যবসায়ীদের দিয়ে বলান।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলেছেন মানবিক সহায়তা প্রেরণের জন্য মায়ানমার সীমান্তে ভিনদেশী সেনাদের করিডোর সুবিধা আর চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা বিদেশীদের কাছে লিজ প্রদান করলে এ দেশে নাকি দুধের নহর বয়ে যাবে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের অভিভাবক হিসাবে আমরা পরিণত হবো এ অঞ্চলের ছোট মোড়ল। জাতি হিসেবে এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে!
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে নোবেল লরিয়েট দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মানুষ ধারণা করেছিলেন তিনি নিরপেক্ষতার প্রতীক। তিনিও ভাব দেখালেন যে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি সরকার পতনের খবর পান। আগেপিছে সাতপাঁচ কিছুই জানতেন না। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই প্রকাশ পাচ্ছে নানান তথ্য। শুরুতেই নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে তিনি সমন্বয়কদের উৎসাহিত করেন। তার প্রেস সচিব নতুন দলের আহ্বায়ককে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কার্যত তার সরকারকে দলনিরপেক্ষ সরকার বলা যায় না। তার প্রেস সচিব নিয়মিত রাজনৈতিক বয়ান দিয়ে চলেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ‘গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধির’ তদারকি রয়েছে। আর নতুন দল গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারা তো সরকারে রয়েছেনই। এরা আবার গাছের ও তলার দুটোই খেতে চান।
সরকারে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে দল গঠনের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করে অতপর সরকার থেকে পদত্যাগ করে একজন দল প্রধানের দায়িত্ব নিলেন। আমরা সবাই তার ক্ষমতা ত্যাগের এবং সরকারকে নিরপেক্ষ রাখার এ মহান প্রচেষ্টা দেখে ধন্য ধন্য করে উঠলাম। এ দেশে কে কবে পদত্যাগের এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে! সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ এবং দেশত্যাগ করার পরও এখন আবার বলছেন তিনি পদত্যাগই করেননি। সেখানে স্বেচ্ছায় এ ধরনের পদত্যাগ নিশ্চয়ই ইতিহাস হয়ে থাকবে! শুধু তাই নয় ইতোমধ্যে আরো একজন ঘোষণা দিয়েছেন ওয়েস্টিন আর নীলা মার্কেটে হাঁসের মাংস অনেক খাওয়া হইছে, আর না, এবার পদত্যাগ করে মিন্টো রোডে আসার আগের সেই পুরাতন শেরাটনে আবার ফিরে যাবেন। শেরাটনের হাঁসের মাংসের মানও খারাপ নয় তো!
নতুন দল গড়ার এমন বিলাসী তৎপরতা বাংলাদেশ আগে কখনো দেখেনি। সবচেয়ে বিস্ময়ের সাথে মানুষ লক্ষ্য করছে, যে তরুণরা এ আন্দোলনে শহীদ হয়ে যেতে পারতেন তারা আজ গাড়ি, বাড়ি, বিলাসিতায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। ভোগবাদী অর্থনীতি কত অল্প সময়ে মানুষকে পরিবর্তিত করতে পারে সমন্বয়ক ও ছাত্র উপদেষ্টারা তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবেন। একদিকে অর্থলিপ্সা অন্যদিকে প্রতিহিংসা, আক্রোশ এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও আচরণে প্রচলিত রাজনীতির প্রধান দুই দলকেই তারা এই এক বছরে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিহিংসার রাজনীতি করে শেখ হাসিনা নিজের ও আওয়ামী লীগের কি করুণ পরিণতি ডেকে আনলেন তা থেকে কেউ কোনো শিক্ষা নিলো না। নতুন দলের নেতাদের জেনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিহিংসাকে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দিয়েও কিন্তু পার পাওয়া যায় না। শেখ হাসিনা তো সংবিধানে অনেকগুলো সুরক্ষা বিল সংযোজন করেছিলেন। সুরক্ষা কি পেলেন?
তরুণদের মাঝে মানুষ যে ভরসা খুঁজছিলেন তা আজ হতাশায় পরিণত হয়েছে। এদের কায়কারবার দেখে শহুরে মধ্যবিত্ত এবং জুলাই জাগরণে শামিল হওয়া লাখো লাখো তরুণের কাছে নতুন দলটি এখন এক স্বপ্নভঙ্গের বেদনা হিসাবেই পরিচিতি অর্জন করেছে। একদিকে নতুন দলের কর্তাব্যক্তিদের জন্য সরকারি প্রটোকল, সভাসমাবেশ করার জন্য প্রশাসনিক সহায়তা এবং অন্যদিকে বিগত বছরগুলোতে যারা আর্থিক খাতে লুটপাট করেছে লুটপাটের একটা অংশ এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসছে নতুন দলের কাছে। উপরন্তু পশ্চিমা মদত তো আছেই। পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রাষ্ট্রকেই যখন চলতে হচ্ছে তখন তাদের পরামর্শ অনুযায়ী দল পরিচালনা করতে আর দ্বিধা কিসের!
পশ্চিমা দুনিয়ার মোড়ল হিসেবে মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন একদিকে সরকার অন্যদিকে বিএনপি, জামাত, এনসিপি প্রভৃতি রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার কাজে। বিষয়টি তো একেবারে খুল্লমখুল্লা করে দিয়েছেন জনাব ফরহাদ মজহার। তিনি বলেছেন, সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে মার্কিন দূতাবাসের পরামর্শ মোতাবেক। অর্থাৎ আমাদের বিরাট উন্নতি হয়েছে! আগে ছিলাম সরাসরি প্রতিবেশী দেশের রাজা- মন্ত্রীদের তত্ত্বাবধানে। আর এখন আছি বড় মোড়লের ছোটখাটো পাইকপেয়াদার তত্ত্বাবধানে। মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন ছাড়াও প্রকাশ্যে আমাদের তত্ত্বাবধানে আছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা, ‘এক/এগারো’ সময়ের রাষ্ট্রদূত জন এফ ড্যানিলোভিজ এবং সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রদূত পিটার হাস। মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অ্যাকসিলারেট এনার্জির স্ট্র্যাটেজিক উপদেষ্টা পদে যোগ দিয়ে পিটার হাস এ দেশে নিয়মিত যাওয়া আসা এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বজায় রাখছেন। মোজেনা, ড্যানিলোভিজ ও হাস নানা নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক সেমিনার সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করছেন এবং বাংলাদেশ থেকে তরুণ তরুণীদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে সব অনুষ্ঠানে। ফরহাদ মাজহারের সেমিনারের চেয়ে তরুণরা বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন সে সব সেমিনারে অংশ নিতে। হয়তোবা সে কারণেই ফরহাদ মাজহারের কন্ঠে আক্ষেপের সুর!
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তর এং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য মুক্তির যে স্বপ্ন অনেকে দেখেছিলেন তা কি রাজনৈতিক উদ্যোগ, রাজনৈতিক শক্তির প্রয়াস ও জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব? এবারের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সে ধরনের কোনো রাজনৈতিক শক্তি কি বিকাশ লাভ করেছে? জনসাধারণের মাঝেও কি ভাসা ভাসা ধারণা ছাড়া মূর্ত কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচী ছিলো? একমাত্র মূর্ত কর্মসূচি ছিলো জবরদস্তিমূলকভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা রেজিমের পরিবর্তন। আর তাই শত শত পৃষ্ঠার সংস্কার প্রস্তাবেও অর্থনীতির ন্যূনতম গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নকে পাশ কাটানো সম্ভব হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে এক বিশাল জনগোষ্ঠী যখন পিছিয়ে আছে এবং জীবন-জীবিকা নির্বাহ করাই তাদের জন্য কঠিন তখন এ সব প্রশ্ন এড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার কি সম্ভব?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এবারের গণসংগ্রামের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে উগ্র দক্ষিণপন্থা ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উত্থান ঘটেছে। দক্ষিণ ও মধ্য-দক্ষিণ পন্থার রাজনীতি ১৯৯১ সালে অর্জিত ভোটের গণতন্ত্রটুকুই টিকিয়ে রাখতে না পারায় আজ দেশের বুকে উগ্র ধর্মান্ধ ও নারী বিদ্বেষী শক্তির এক ভয়াবহ উত্থান ঘটেছে। অন্যদিকে নানাভাবে বিভক্ত বামপন্থার দিকে তাকালে মনে হয় প্রায় সকলেই অনেকটা পাথরের মত স্থির হয়ে আছে। অথচ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আর জমিদারী শোষণের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই ভূখ-ে কমিউনিস্ট আন্দোলন ও বামপন্থা এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পাকিস্তানি শাসকরা বেআইনি ঘোষণা করার পরেও নতুন করে পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রন অধিকারের সংগ্রামে বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ভাষা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পর্বেই মিশে আছে কত শত কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের শ্রম, ঘাম আর রক্ত! আশির দশক জুড়েও একদিকে শ্রেণী আন্দোলন এবং সমান্তরালভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে শামিল থেকে বাম আন্দোলন এক আশাজাগানিয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। বামপন্থীদের প্রধান দল কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভক্তি, অন্যান্য বাম দলেও বিভক্তি জাতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের ভূমিকাকে দূর্বল করে ফেলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্যের কমিশন বামপন্থীদের প্রস্তাবনা সমূহকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মনে হয়নি।
তবে একটি বিষয় সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন একমত দ্বিমতসহ যাবতীয় সংস্কার প্রস্তাবনা বা সনদ চূড়ান্ত করার দায়িত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বা পার্লামেন্টের উপর ন্যস্ত করতে হবে। অর্থাৎ ফরমানের মাধ্যমে নয়, বাংলাদেশের ভাগ্য ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। সেটাই গণতন্ত্র। জোরজবরদস্তি করে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার ম্যান্ডেট ইউনূস সরকারকে কেউ দেয়নি। এটা বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সুপ্রিম কোর্টের যে রেফারেন্স বলে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছে সে রেফারেন্সে কিন্তু দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এটাও বিবেচনায় রাখা উচিত, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রহরা ছাড়া সরকারের সমর্থনপুষ্ট নতুন দলের কার্যক্রম পরিচালনা অনেক স্থানেই কঠিন হয়ে পড়ছে। মনে রাখা প্রয়োজন জোরজবরদস্তি করতে যেয়ে এক-এগারো সরকারের কুশীলবদের কিন্তু দেশ ছাড়তে হয়েছে।
সব মিলিয়ে এটা খুবই স্পষ্ট যে, আমাদের মাতৃভূমি এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ডানপন্থা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে টেকসই কোনো বিকল্প সমাধান বের করতে পারবে বলে মনে হয় না। অন্তর্বর্তী সরকারও খেই হারিয়ে ফেলছে। তারা পশ্চিমা মিত্রদের সন্তুষ্ট রেখে সম্মানজনক প্রস্থান পর্বের অনুসন্ধানে আছে। আপাত ব্যবস্থা হিসেবে তারা নির্বাচনের দিকেই অগ্রসর হবে বলে মনে হচ্ছে।
নির্বাচনই হোক আর টেকসই গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্যই হোক দেশের এই ক্রান্তিকালে বামপন্থী শক্তিসমূহকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হিসেবে দাঁড়িয়েছে। দুটি পৃথক বামপন্থী জোট ছাড়াও বিভিন্ন অবস্থানে ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে হলেও বামপন্থী অনেক দল আছে। এত বিভক্তি এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে থাকাটা বামপন্থী শক্তির জন্য শুধু অস্বস্তিকরই নয় জাতীয় রাজনীতিতে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখার পথে অন্তরায়। আবার বামপন্থীদের নানা ছুতমার্গের সাথেও আমরা পরিচিত যা ঐক্যের পথে অন্তরায়। এ পরিস্থিতিতে নিজস্ব কৌশলগত লাইন অনুসরণের স্বাধীনতাসহ এক বৃহত্তর জোটে যাতে সকল বামপন্থী শামিল হতে পারেন সে প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। এ ধরনের ঐক্য দিয়ে শুরু করে খ- খ- নানা সংগ্রামের মাধ্যমে পৌঁছানো যেতে পারে উচ্চতর পর্যায়ের ঐক্যে।
বৈষম্য দূর করে সমাজের সর্বস্তরে সাম্য প্রতিষ্ঠা করাই বামপন্থী আন্দোলনের মূল মন্ত্র। সমাজে শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য যতদিন থাকবে বামপন্থার প্রয়োজনীয়তা ততদিন নিঃশেষ হবে না। জুলাই জাগরণেও কোটা বিরোধী আওয়াজ এক সময় পরিণত হলো সমাজে সকল ধরনের বৈষম্য অবসানের আকাক্সক্ষা আর আকুতিতে। দেশে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার যে আয়োজন পর্ব চলছে সে আয়োজনে শ্রমজীবী, কর্মজীবী মানুষ, কৃষক, ক্ষেত মজুর হাতে লাল নিশান আর কাঁধে কাস্তে হাতুড়ি প্রতীক নিয়ে যত বেশি সংখ্যায় অগ্রসর হবেন তত ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে কোণঠাসা করে শক্তিশালী কাঠামোর গণতন্ত্র নির্মাণ সম্ভবপর হবে।
বাংলাদেশ রাজনৈতিক শুন্যতার এক মহাসন্ধিক্ষণে। যেখানে দাঁড়িয়ে দেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা উল্লম্ফন করছে, রাজা-উজির মারছে। ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা মরিয়া। ‘ফ্যাসিবাদের প্রতিমা’ ভাঙতে গিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য, ম্যুরালসহ সব চিহ্ন ধ্বংস করে ফেলছে। বিভিন্ন স্থাপনার নতুন নামকরণের ভেতর দিয়ে একাত্তরকে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে চব্বিশ দিয়ে। আর তাদের পাকিস্তানি প্রভুরা ঔদ্ধত্যের সাথে ঘোষণা করছে, ’৫৪ বছর পর হিসাব-নিকাশের সময় এসেছে। পূর্ব পাকিস্তানকে ফিরে আসতে হবে।’ এরপরেও ইউনূস সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চুপ। এর আগেও ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার পরেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিবাদ করেনি। রাজনৈতিক দলগুলোও নয়। প্রতিবাদী রাজনীতির এমন শুন্যতা বাংলাদেশ আগে দেখেনি।
প্রকৃতি শুন্যতা পছন্দ করে না। এ শুন্যতা পূরনে যেতে হবে ‘রক্তকরবীর নন্দিনীর’ কাছে। নন্দিনীর জয় মানেই তো প্রাণের জয়, প্রেম ও প্রকৃতির জয়, শোষণ, বঞ্চনা, বৈষ্যমের বিরুদ্ধে জয়। পুঁজির লুন্ঠন আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জয়। পাথরের মত স্থির না থেকে জুলাই জাগরণের অভিজ্ঞতায় বামপন্থার নবায়ন হলে এবং অতীতের তিক্ততা ভুলে সকল বামপন্থীরা একত্রিত হয়ে মধ্যবাম, প্রগতিশীল ও উদার গণতন্ত্রীদের সাথে নিয়ে এক বাম- গণতান্ত্রিক মহাজোট গঠনে সক্ষম হলে নতুন পথের ও আজকের যুগের নন্দিনীদের সন্ধান মিলতে পারে। সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যেও জন্ম নেয় নতুন নতুন স্বপ্ন। আশাবাদী মানুষের মত দ্বিধায় দোলাচলে থাকা মানুষও স্বপ্ন দেখতে চায় - রক্তকরবীর লাল আভায় সবকিছু রঙিন করে দিয়ে সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার লড়াইয়ের রূপায়ণ শুধু নাটকে নয় বাস্তবেও করার প্রত্যয়ে দেশের সব বামপন্থীরা একত্রে এগিয়ে আসুক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
[লেখক: সাবেক ছাত্র নেতা]