alt

সাময়িকী

শিল্পের সুন্দর আর অসুন্দরের শিল্প

লেখা ও ছবি : সঞ্জয় দে রিপন

image
শুক্রবার, ০২ এপ্রিল ২০২১

সুন্দর নিয়ে চর্চা করাটা মানুষের ধর্ম। মানুষ সুন্দরকে পূজা করে কথাটা সত্য তবে এরও আগে মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে শক্তিকে। শক্তি এবং সুন্দর এই দুটোকেই মানুষ পূজা করে। কারণ এর মধ্যে জীবনের সত্য ও বাস্তবতার আনন্দকে অনুভূতিময় করে তোলা যায়। বর্তমান সময়ে জঙ্গিবাদকে মানুষ ঘৃণা করে। অনেকে বলতে পারেন কেন? কারণ জঙ্গিবাদীদেরও শক্তির পরীক্ষা রয়েছে এবং তারা প্রমাণ করেছে যে তারা শক্তিশালী। কিন্তু এই শক্তি মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়, পৃথিবীতে এই শক্তি প্রয়োগ হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, একটি যুদ্ধবিগ্রহের সমাজ প্রতিষ্ঠায় তারা লিপ্ত। তাই এই শক্তিকে মানুষ পছন্দ করে না। এই শক্তির অবসান ঘটুক যে কোন মূল্যে- এটা পৃথিবীর সব শান্তিপ্রিয় মানুষ চায়। কিন্তু মানুষ পছন্দ করে সেই শক্তিকে যে শক্তি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োগ করা হয়। এখন কথা হচ্ছে শক্তি এবং সুন্দরের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে কোথায়। শক্তিকে মানুষ শ্রদ্ধা করে, সন্দুরকেও মানুষ শ্রদ্ধা করে। আবার ওই সনাতন মিলে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই ভয় থেকে ভক্তি এবং ভক্তি থেকে পূজা বিষয়গুলি এসেছে। দেবী দুর্গা, দুর্গতি নাশিনী, এই দেবী এসেছিলেন অসুরকে বধ করার জন্য। মহিশাষুর তিনিও ছিলেন অনেক শক্তিধর। এবং আপন ক্ষমতা বলে দেবলোক নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। কারণ তিনি বর পেয়েছিলেন শিবের কাছ থেকে। এই শক্তিকে বধ করতে এবং দেবলোকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব। আর মর্তলোকের মানুষ এই দেবীকে পূজা করে থাকে কারণ তার অপার শক্তি, যে শক্তিকে তিনি দেবলোকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োগ করেছেন। কথিত দেবী দুর্গা অনেক সুন্দরী ছিলেন যার চোখ ছিল তিনটি, তাই তাকে ত্রিনয়নী বলা হয়। পরমা সুন্দরী বলতে যা বোঝায় দেবী দুর্গা তাই ছিলেন। অর্থাৎ এশিয়ার বৃহৎ সনাতনী জনগোষ্ঠী এই শক্তি ও সুন্দরকে পূজা করে। তারা পূজা করে মূলত শক্তি ও সুন্দরের প্রতীককে যা মানুষের শান্তিকল্পে প্রয়োগ হবে। তাহলে আমরা বলতে পারি সুন্দর হচ্ছে একটা শক্তি। আর যারা এই সুন্দরকে ভালোবাসে বা শ্রদ্ধা করে তা এক ধরনের ভয় থেকে। অর্থাৎ সুন্দরের কোন মসৃণ বিষয়ে তারা চলবে না। যেমন গোলাপ একটি সুন্দর ফুল, কিন্তু এর অনেক কাটা রয়েছে। আর সুন্দরকে মানুষ ভয় পায় বলেই এর প্রতি মানুষের এত ভক্তি, এত প্রেম এবং ভালোবাসা। সত্যিকারের যে বিষয় তা হচ্ছে সুন্দর অনেক কঠিন। কোন কিছু সৃষ্টির জন্য এই চিরন্তন সত্যকে আগে আবিষ্কার করতে হবে।

সত্য ও সুন্দরের সম্পর্কটা কেমন। অনেকেই বলে থাকেন সত্যই সুন্দর। অর্থাৎ যা সত্য তাই সুন্দর। কিন্তু বিষয়টি এত সহজভাবে বলা যায় কি?

আকাশ দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু আকাশ একটা হলেও এর বিভিন্ন রূপ রয়েছে। সব রূপের আকাশ সবসময় সবার কাছে ভালো লাগা তৈরি করে কি?

সাদা মেঘের আকাশ যেমন, সাদা মেঘের আকাশ দেখার পর যে অনুভূতি হয়, কালো মেঘের আকাশ দেখলে কি সেই অনুভূতি হয়? আবার নীল আকাশজুড়ে শুধু নীল আর নীল থাকে তখনকার অনুভূতিটা কিন্তু আরও অন্যরকম। আকাশের সব রূপই সত্য। কিন্তু সব রূপের অনুভূতিই কি আনন্দদায়ক? না কোনটা উদাস ভাব, কোনটা ক্লান্তিময় অথবা কোনটা বিমর্ষতাকে অনুভবে নিয়ে আসতে পারে। তৈরি করতে ভালো লাগা আবার খারাপ লাগাও।

ভালো লাগাটা যেমন সত্য খারাপ লাগাটাও কিন্তু সত্য। কিন্তু এই রূপগত সত্য দুটির সৌন্দর্য এক নয়। কোন একটি কখনও কখনও অসুন্দরও মনে হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে প্রকৃতির সব সত্যই যে সবসময় সার্বজনীনভাবে সুন্দর হবে এমনটি বলা বা ভাবা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, এর সুন্দর রয়েছে তবে তা আবিষ্কার করতে হবে।

এই যে প্রকৃতিগত সত্যের মধ্য থেকে সুন্দরকে আবিষ্কার করা এটাই খুব জরুরি। আর এই আবিষ্কারটাই শিল্প। অর্থাৎ সুন্দরের আবিষ্কারের যে প্রক্রিয়া এটাই সৃষ্টি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্যক্তিসত্তা শিল্পী সত্তায় উত্তীর্ণ হয় যেখান থেকে মাস্তিষ্ক এবং অনুভূতির যোগাযোগটা দৃঢ় হয় বা একীভূত হয়, অতঃপর সেই ধারাবাহিকতায় সৃষ্টিকর্ম সম্পাদিত হয়।

সুন্দর হচ্ছে একটা অনুভূতি আবার বলা যায় সুন্দর কখনও কোন কিছুর স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এখন একটি মুখাবয়ব সুন্দর মনে হলে তা যে সারাজীবন সুন্দর মনে হবে তা কিন্তু নয়। এক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক প্রভাবও একটা বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু একজন শিল্পী যে কাজটি করেন তা হচ্ছে সুন্দর আবিষ্কার করে তা ধারণ করেন এবং সৃষ্ট কর্মের মাধ্যমে তা স্থায়ীকরণ করেন হয়তো সব অনুভূতির অলক্ষ্যেই।

সুন্দর সৃষ্টির জন্য একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি হচ্ছে ‘অসুন্দর’। সুন্দর নয় এমন বিষয় সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকা দরকার। সৃষ্টি সুধা পান করার জন্য যে পাত্র দরকার তা সেই পাত্র নির্ধারণ করার জন্যও অসুন্দরের ক্ষেত্রে সৃষ্টি সত্তাকে উজার করে দিতে হয়। জীবন ও ধর্ম, সৃষ্টি ও আনন্দ সুন্দরের একই সূত্রবদ্ধ পাঠ।

সুন্দর ও শিল্পের মধ্যে অভিন্নতাবোধ রয়েছে। যা সুন্দর তাই শিল্প আর যা সুন্দর নয় তা শিল্পও নয় এমন বোধ হয় ইতিহাস প্রমাণ করতে পারে না। পৃথিবীব্যাপী শিল্পের প্রকৃত স্বরূপের কথা মনে রেখে যদি বিচার করি তাহলে দেখা যায় সবসময় সুন্দর জিনিসকেই শিল্প বলে আখ্যায়িত করা হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা সৌন্দর্যশূন্য।

শিল্প হচ্ছে ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি এবং রূপগড়নের বিন্যাসের অভিব্যক্তি মাত্র। এই অভিব্যক্তিতে বর্ণ, ছন্দ, রং, রেখা, গতি সবকিছুই যে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমনটি নয়। তবে অভিব্যক্তি যদি দর্শকের কাছে যোগাযোগ নির্ভর হয়ে থাকে, তবে তা শিল্প হয়ে ওঠে।

এ উপলব্ধির ধরনটাই শিল্পের মধ্যে আবর্তন করতে থাকে এবং শিল্পীর শিল্পকর্ম হচ্ছে উপলব্ধির রূপবিন্যাস। এখানে বিস্তাবৃত্তের কাঠামোটা সাজানো থাকে। এই কাঠামোর মধ্যে রূপগড়নের বিন্যাস প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। এবং একই কাঠামোবদ্ধ বিন্যাসে সুন্দরের উপস্থাপনা থাকে আবার নাও থাকতে পারে। সুন্দর হচ্ছে শিল্পের কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এই অংশ যদি দৃশ্যকল্পের সাথে যুক্ত না হয়ে চিত্তকল্পের সাথে যুক্ত থাকে, অথবা শিল্পী তার শিল্পকর্মের বিষয় বিচেনায় সুন্দরের উপস্থিতি নিশ্চিত না করেন তবে সেই কর্ম শিল্প হয়ে উঠবে না এমনটি নয়।

সুন্দর আর অসুন্দর নিয়ে বহুবার অনেকের মধ্যে তর্কযুদ্ধ হয়েছে। আলোচনা হয়েছে কিন্তু সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জোর প্রয়াস সংগঠিত হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই।

প্রথমত যা কিছু আমার মনের মতো হবে না, তা যত সুন্দরই হোক আমার মনের মধ্যে কিন্তু ভালোলাগার কোন ক্রিয়াই সম্পাদন করতে পারবে না। যখন এমনটি ঘটবে তখন ওই বস্তুগত বা বিষয়গত চিন্তার আদলটা আমার কাছে অসুন্দর বলে বিবেচিত হবে। তাহলে আমি যা অসুন্দর ভেবে দূরে ঠেলে দিচ্ছি তা কি সত্যিই অসুন্দর?

সুন্দর আর অসুন্দরের এই বিরোধপূর্ণ অবস্থানটা কোন যুক্তির মাপকাঠিতে নির্ণয় হয়নি বরং পুরো বিষয়টাই একটা আলোচনা প্রসূত রসালো জ্ঞান গরিমার মধ্যে অবস্থান করছে।

যে দৃশ্যমান বস্তুটিকে অনেকে অসুন্দর বলে খারিজ করে দিচ্ছে তা আবার অনেকেই সুন্দর ভেবে সাদরে গ্রহণ করছে। সর্বত্রই এমনটি ঘটেছে। এখন দৃশ্যশিল্পের বেলাতেও কিন্তু এর বিপরীত কিছু ঘটে না। বরং এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। বাংলাদেশের গঠিতকলার জগতে অনেক সৃষ্টিকর্মই আছে বা হচ্ছে যা সব দর্শক বা শিল্পবোদ্ধার সুন্দর চেতনার অবয়বকে ধারণ করে না। তাই বলে কি একজন শিল্পীর নিরলস শ্রম এবং ভাবনা অসুন্দর হয়ে যাবে? নিশ্চয়ই নয়। এখানেই শিল্পের ভাব এবং ভাবের ভাষা সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। মনের যাবতীয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। সব ভাষাই কিন্তু আবার এক রকম নয়। মানুষের ভাষা আর পাখির ভাষা এক রকম নয়; বাংলা ভাষা আর ফারসি ভাষাও এক রকম নয়। ঠিক তেমনি শিল্পেরও ভাষা রয়েছে তার সব শিল্পের ভাষা প্রকাশের সার্বলীলতা বা স্বতঃস্ফূর্ততা এক রকম নয়। আর শিল্পের ভাষা প্রকাশের ধরনের ওপর এর সুন্দর বিস্তার সঠিক প্রকাশটা অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে।

অর্থাৎ একটি চিত্রকর্ম যত পরিষ্কারভাবে তার ভাষাটা প্রকাশ করতে পারে এবং যত দৃঢ়ভাবে চেতনায় প্রণোদনা সৃষ্টি করতে পারে সেই চিত্রকর্ম ততবেশি সুন্দর মনে হয়।

ছবির যদি ভাষা তৈরি না হয় তাহলে দর্শক কেন শিল্পী নিজেও সেই সঠিক কর্মের সাথে ভাব বিনিময় করতে পারবেন না; ফলে সেই সুন্দর ছবি শিল্পীর দৃষ্টিতেও সুন্দর হয়ে উঠবে না।

আসলে যা কিছু সুন্দর মনে হবে তাকে অসুন্দর বলা হয়। আসলে এখানে সুন্দরের সাথে কিছু অসুন্দরের বিরোধ নেই।

যেমন আমরা যখন আমাদের লোকসাহিত্যের শিল্পী আব্দুস শাকুরের চিত্রকর্ম দেখি তখন কি মনে হয়।

মনে হয় ছবির মানুষগুলো, পাখিগুলো যেন আমাদের অতিপরিচিত। আবার পাশে কবিতার দু’চারটা লাইন লিখে দেয়া। এই যে, চিত্রের ভাবের সাথে রঙের মাত্রার সাথে ভাষাকে মূর্ত করে ফুটিয়ে তোলা; এই গুণের জন্যই চিত্রের ভাবাটাকে আত্মস্থ করতে আমাদের খুব সুবিধা হয়। আমাদের চিন্তার রাজ্যে শিল্পী আব্দুস শাকুরের চিত্রপটগুলো এতবেশি মূর্ত এবং ভাবময়, ফলে দেখেই আমরা সুন্দর ভেবে অভিভূত হই। অর্থাৎ চিত্রের ভাষা যতবেশি মূর্ত হয়ে ওঠে সেই চিত্রকর্ম ততবেশি সুন্দর মনে হয়। আর অপরাপর ক্ষেত্রে কোন চিত্রকর্মের ভাষা যদি মূর্তমান না হয়, ভাব যদি আবদ্ধ থাকে তবে কিন্তু তা শিল্পের বিচারে সঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে না আর তখনই সেই চিত্রকর্মকে অসুন্দর বলা হয়।

অনেকে আবার শিল্পের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেও সুন্দর ও অসুন্দরের মাত্রা নির্ণয় করে থাকেন। দৃশ্যকলার ক্ষেত্রে যে শিল্পকর্মে আনুপাতিক হয় না সেই শিল্পকর্মকে অনেকে অসুন্দর বলে কিন্তু এমনটা করাও তো আবার সঠিক নয়। এক্ষেত্রে বলা যায়, ম্যানরিস্ট শিল্প আন্দোলনের সময় শিল্পীরা ইচ্ছে করেই ফিগারকে প্রমাণুপাতিক না রেখে একটু লম্বাটে করে হাত-ঘাড় এঁকেছেন, তাহলে সেই সময়কার চিত্রকর্মকে কি আমরা অসুন্দর বলব, বার্ণিনীর ভাস্কর্যকে আমরা অসুন্দর বলব না। কারণ ম্যানরিস্টরা তাদের ভাব এবং ভাষাকে পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশ করতে পেরেছেন।

অর্থাৎ শিল্পের সুন্দর নির্ভর করে ভাব প্রকাশের ওপর। ভাষাই এক্ষেত্রে প্রধান।

নির্মাল্য নাগ তার শিল্পাচেতনা গ্রন্থের ‘ভাবের ভাষা’ প্রবন্ধে বলেছেন-

‘আধুনিক সমাজে দৃশ্য ও শ্রুতি এই দুই অর্থাৎ দেখা ও শোনাকে গণসংযোগে সর্বাধিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে রূপের ভাষার সামাজিক মূল্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।’

এই যে রূপের ভাষাই শিল্পের ভাষা এবং একে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরো বলেছেন যে-

বস্তুতপক্ষে সমস্ত ভাষাই রূপকল্প নির্মাণ করে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে। ভাষা ভিন্ন হলেও সমস্ত ভাষাই ছবি আঁকে।

ভাষার সঠিক প্রয়োগ বা প্রকাশ ছাড়া শিল্পের সুন্দর রূপ পরিস্ফুটিত হয় না বা শিল্পের বিকাশও সেক্ষেত্রে সম্ভব নয়; তাইতো ভাষা নির্মাণ করাটাই শিল্পের সৌন্দর্যকে স্পর্শ করার অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

ছবি

পুরাণ ও নদীবর্তী জীবনালেখ্য

ছবি

ইতিহাসের সরোবরে অবাধ অবগাহন

ছবি

শিকিবু

ছবি

প্রতীপ রূপান্তর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

ডাকঘর ডাকে, আমিই অমল

ছবি

চিরনূতন চিরপুরাতন

ছবি

‘নেবে নি, নেবে নি প্রভাতের রবি’ করোনাকালে রবীন্দ্র-অনুভব

মানুষ কিংবা তিনভাগ জল

ছবি

দেশ আমাদের আজও কোনো মাতৃভাষা দেয়নি বলে কবি শঙ্খ ঘোষ একবার বিলাপ করেছিলেন

ছবি

শিকিবু

ছবি

শঙ্খ ঘোষের পাকশী পাকশীর শঙ্খ ঘোষ

ছবি

শঙ্খ ঘোষের গদ্য : মর্মজয়ী মাধুর্য

ছবি

শঙ্খ ঘোষ : আত্মবোধের নিরুক্তলোক

ছবি

শঙ্খ ঘোষের কবিতাভাবনা

ছবি

মাঝে মাঝে কার কাছে যাব?

ছবি

বাঙালি প্রতিভার অন্যতম সেরা আইকন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

পত্রপাঠ

ছবি

মুরাকামির কল্পধাম

ছবি

শিকিবু

ছবি

ফোকলোরচর্চার সেকাল ও একাল

ছবি

এক খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তক

ছবি

শামসুজ্জামান খানের ভাবনায় বাঙালি সংস্কৃতির উদ্যাপন

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের পরতে বইমেলা

ছবি

একটি ইতিহাস একটি আত্মজীবনী

ছবি

বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের অনুপুঙ্খ উপস্থাপনা

ছবি

লজ্জাবতী

ছবি

কালো রঙের আলো অথবা কিছু কোঁকড়ানো চুল

ছবি

কদমের ওম ভর্তি কম্বল এবং অতঃপর

ছবি

শব্দভাণ্ডার প্রায়শই লুট হয়ে যাচ্ছে

ছবি

জীবন যখন যেভাবে প্রসঙ্গে

ছবি

মৃৎচক্রের দিনগুলো

ছবি

রক্তে রাঙানো বিবাহ বাসর

সাময়িকী কবিতা

tab

সাময়িকী

শিল্পের সুন্দর আর অসুন্দরের শিল্প

লেখা ও ছবি : সঞ্জয় দে রিপন

image
শুক্রবার, ০২ এপ্রিল ২০২১

সুন্দর নিয়ে চর্চা করাটা মানুষের ধর্ম। মানুষ সুন্দরকে পূজা করে কথাটা সত্য তবে এরও আগে মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে শক্তিকে। শক্তি এবং সুন্দর এই দুটোকেই মানুষ পূজা করে। কারণ এর মধ্যে জীবনের সত্য ও বাস্তবতার আনন্দকে অনুভূতিময় করে তোলা যায়। বর্তমান সময়ে জঙ্গিবাদকে মানুষ ঘৃণা করে। অনেকে বলতে পারেন কেন? কারণ জঙ্গিবাদীদেরও শক্তির পরীক্ষা রয়েছে এবং তারা প্রমাণ করেছে যে তারা শক্তিশালী। কিন্তু এই শক্তি মানুষের জন্য কল্যাণকর নয়, পৃথিবীতে এই শক্তি প্রয়োগ হচ্ছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, একটি যুদ্ধবিগ্রহের সমাজ প্রতিষ্ঠায় তারা লিপ্ত। তাই এই শক্তিকে মানুষ পছন্দ করে না। এই শক্তির অবসান ঘটুক যে কোন মূল্যে- এটা পৃথিবীর সব শান্তিপ্রিয় মানুষ চায়। কিন্তু মানুষ পছন্দ করে সেই শক্তিকে যে শক্তি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োগ করা হয়। এখন কথা হচ্ছে শক্তি এবং সুন্দরের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে কোথায়। শক্তিকে মানুষ শ্রদ্ধা করে, সন্দুরকেও মানুষ শ্রদ্ধা করে। আবার ওই সনাতন মিলে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই ভয় থেকে ভক্তি এবং ভক্তি থেকে পূজা বিষয়গুলি এসেছে। দেবী দুর্গা, দুর্গতি নাশিনী, এই দেবী এসেছিলেন অসুরকে বধ করার জন্য। মহিশাষুর তিনিও ছিলেন অনেক শক্তিধর। এবং আপন ক্ষমতা বলে দেবলোক নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। কারণ তিনি বর পেয়েছিলেন শিবের কাছ থেকে। এই শক্তিকে বধ করতে এবং দেবলোকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব। আর মর্তলোকের মানুষ এই দেবীকে পূজা করে থাকে কারণ তার অপার শক্তি, যে শক্তিকে তিনি দেবলোকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োগ করেছেন। কথিত দেবী দুর্গা অনেক সুন্দরী ছিলেন যার চোখ ছিল তিনটি, তাই তাকে ত্রিনয়নী বলা হয়। পরমা সুন্দরী বলতে যা বোঝায় দেবী দুর্গা তাই ছিলেন। অর্থাৎ এশিয়ার বৃহৎ সনাতনী জনগোষ্ঠী এই শক্তি ও সুন্দরকে পূজা করে। তারা পূজা করে মূলত শক্তি ও সুন্দরের প্রতীককে যা মানুষের শান্তিকল্পে প্রয়োগ হবে। তাহলে আমরা বলতে পারি সুন্দর হচ্ছে একটা শক্তি। আর যারা এই সুন্দরকে ভালোবাসে বা শ্রদ্ধা করে তা এক ধরনের ভয় থেকে। অর্থাৎ সুন্দরের কোন মসৃণ বিষয়ে তারা চলবে না। যেমন গোলাপ একটি সুন্দর ফুল, কিন্তু এর অনেক কাটা রয়েছে। আর সুন্দরকে মানুষ ভয় পায় বলেই এর প্রতি মানুষের এত ভক্তি, এত প্রেম এবং ভালোবাসা। সত্যিকারের যে বিষয় তা হচ্ছে সুন্দর অনেক কঠিন। কোন কিছু সৃষ্টির জন্য এই চিরন্তন সত্যকে আগে আবিষ্কার করতে হবে।

সত্য ও সুন্দরের সম্পর্কটা কেমন। অনেকেই বলে থাকেন সত্যই সুন্দর। অর্থাৎ যা সত্য তাই সুন্দর। কিন্তু বিষয়টি এত সহজভাবে বলা যায় কি?

আকাশ দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু আকাশ একটা হলেও এর বিভিন্ন রূপ রয়েছে। সব রূপের আকাশ সবসময় সবার কাছে ভালো লাগা তৈরি করে কি?

সাদা মেঘের আকাশ যেমন, সাদা মেঘের আকাশ দেখার পর যে অনুভূতি হয়, কালো মেঘের আকাশ দেখলে কি সেই অনুভূতি হয়? আবার নীল আকাশজুড়ে শুধু নীল আর নীল থাকে তখনকার অনুভূতিটা কিন্তু আরও অন্যরকম। আকাশের সব রূপই সত্য। কিন্তু সব রূপের অনুভূতিই কি আনন্দদায়ক? না কোনটা উদাস ভাব, কোনটা ক্লান্তিময় অথবা কোনটা বিমর্ষতাকে অনুভবে নিয়ে আসতে পারে। তৈরি করতে ভালো লাগা আবার খারাপ লাগাও।

ভালো লাগাটা যেমন সত্য খারাপ লাগাটাও কিন্তু সত্য। কিন্তু এই রূপগত সত্য দুটির সৌন্দর্য এক নয়। কোন একটি কখনও কখনও অসুন্দরও মনে হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে প্রকৃতির সব সত্যই যে সবসময় সার্বজনীনভাবে সুন্দর হবে এমনটি বলা বা ভাবা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, এর সুন্দর রয়েছে তবে তা আবিষ্কার করতে হবে।

এই যে প্রকৃতিগত সত্যের মধ্য থেকে সুন্দরকে আবিষ্কার করা এটাই খুব জরুরি। আর এই আবিষ্কারটাই শিল্প। অর্থাৎ সুন্দরের আবিষ্কারের যে প্রক্রিয়া এটাই সৃষ্টি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্যক্তিসত্তা শিল্পী সত্তায় উত্তীর্ণ হয় যেখান থেকে মাস্তিষ্ক এবং অনুভূতির যোগাযোগটা দৃঢ় হয় বা একীভূত হয়, অতঃপর সেই ধারাবাহিকতায় সৃষ্টিকর্ম সম্পাদিত হয়।

সুন্দর হচ্ছে একটা অনুভূতি আবার বলা যায় সুন্দর কখনও কোন কিছুর স্থায়ী বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এখন একটি মুখাবয়ব সুন্দর মনে হলে তা যে সারাজীবন সুন্দর মনে হবে তা কিন্তু নয়। এক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক প্রভাবও একটা বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু একজন শিল্পী যে কাজটি করেন তা হচ্ছে সুন্দর আবিষ্কার করে তা ধারণ করেন এবং সৃষ্ট কর্মের মাধ্যমে তা স্থায়ীকরণ করেন হয়তো সব অনুভূতির অলক্ষ্যেই।

সুন্দর সৃষ্টির জন্য একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি হচ্ছে ‘অসুন্দর’। সুন্দর নয় এমন বিষয় সম্পর্কে কিছু ধারণা থাকা দরকার। সৃষ্টি সুধা পান করার জন্য যে পাত্র দরকার তা সেই পাত্র নির্ধারণ করার জন্যও অসুন্দরের ক্ষেত্রে সৃষ্টি সত্তাকে উজার করে দিতে হয়। জীবন ও ধর্ম, সৃষ্টি ও আনন্দ সুন্দরের একই সূত্রবদ্ধ পাঠ।

সুন্দর ও শিল্পের মধ্যে অভিন্নতাবোধ রয়েছে। যা সুন্দর তাই শিল্প আর যা সুন্দর নয় তা শিল্পও নয় এমন বোধ হয় ইতিহাস প্রমাণ করতে পারে না। পৃথিবীব্যাপী শিল্পের প্রকৃত স্বরূপের কথা মনে রেখে যদি বিচার করি তাহলে দেখা যায় সবসময় সুন্দর জিনিসকেই শিল্প বলে আখ্যায়িত করা হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা সৌন্দর্যশূন্য।

শিল্প হচ্ছে ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি এবং রূপগড়নের বিন্যাসের অভিব্যক্তি মাত্র। এই অভিব্যক্তিতে বর্ণ, ছন্দ, রং, রেখা, গতি সবকিছুই যে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমনটি নয়। তবে অভিব্যক্তি যদি দর্শকের কাছে যোগাযোগ নির্ভর হয়ে থাকে, তবে তা শিল্প হয়ে ওঠে।

এ উপলব্ধির ধরনটাই শিল্পের মধ্যে আবর্তন করতে থাকে এবং শিল্পীর শিল্পকর্ম হচ্ছে উপলব্ধির রূপবিন্যাস। এখানে বিস্তাবৃত্তের কাঠামোটা সাজানো থাকে। এই কাঠামোর মধ্যে রূপগড়নের বিন্যাস প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়। এবং একই কাঠামোবদ্ধ বিন্যাসে সুন্দরের উপস্থাপনা থাকে আবার নাও থাকতে পারে। সুন্দর হচ্ছে শিল্পের কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এই অংশ যদি দৃশ্যকল্পের সাথে যুক্ত না হয়ে চিত্তকল্পের সাথে যুক্ত থাকে, অথবা শিল্পী তার শিল্পকর্মের বিষয় বিচেনায় সুন্দরের উপস্থিতি নিশ্চিত না করেন তবে সেই কর্ম শিল্প হয়ে উঠবে না এমনটি নয়।

সুন্দর আর অসুন্দর নিয়ে বহুবার অনেকের মধ্যে তর্কযুদ্ধ হয়েছে। আলোচনা হয়েছে কিন্তু সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জোর প্রয়াস সংগঠিত হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই।

প্রথমত যা কিছু আমার মনের মতো হবে না, তা যত সুন্দরই হোক আমার মনের মধ্যে কিন্তু ভালোলাগার কোন ক্রিয়াই সম্পাদন করতে পারবে না। যখন এমনটি ঘটবে তখন ওই বস্তুগত বা বিষয়গত চিন্তার আদলটা আমার কাছে অসুন্দর বলে বিবেচিত হবে। তাহলে আমি যা অসুন্দর ভেবে দূরে ঠেলে দিচ্ছি তা কি সত্যিই অসুন্দর?

সুন্দর আর অসুন্দরের এই বিরোধপূর্ণ অবস্থানটা কোন যুক্তির মাপকাঠিতে নির্ণয় হয়নি বরং পুরো বিষয়টাই একটা আলোচনা প্রসূত রসালো জ্ঞান গরিমার মধ্যে অবস্থান করছে।

যে দৃশ্যমান বস্তুটিকে অনেকে অসুন্দর বলে খারিজ করে দিচ্ছে তা আবার অনেকেই সুন্দর ভেবে সাদরে গ্রহণ করছে। সর্বত্রই এমনটি ঘটেছে। এখন দৃশ্যশিল্পের বেলাতেও কিন্তু এর বিপরীত কিছু ঘটে না। বরং এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। বাংলাদেশের গঠিতকলার জগতে অনেক সৃষ্টিকর্মই আছে বা হচ্ছে যা সব দর্শক বা শিল্পবোদ্ধার সুন্দর চেতনার অবয়বকে ধারণ করে না। তাই বলে কি একজন শিল্পীর নিরলস শ্রম এবং ভাবনা অসুন্দর হয়ে যাবে? নিশ্চয়ই নয়। এখানেই শিল্পের ভাব এবং ভাবের ভাষা সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। মনের যাবতীয় ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। সব ভাষাই কিন্তু আবার এক রকম নয়। মানুষের ভাষা আর পাখির ভাষা এক রকম নয়; বাংলা ভাষা আর ফারসি ভাষাও এক রকম নয়। ঠিক তেমনি শিল্পেরও ভাষা রয়েছে তার সব শিল্পের ভাষা প্রকাশের সার্বলীলতা বা স্বতঃস্ফূর্ততা এক রকম নয়। আর শিল্পের ভাষা প্রকাশের ধরনের ওপর এর সুন্দর বিস্তার সঠিক প্রকাশটা অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে।

অর্থাৎ একটি চিত্রকর্ম যত পরিষ্কারভাবে তার ভাষাটা প্রকাশ করতে পারে এবং যত দৃঢ়ভাবে চেতনায় প্রণোদনা সৃষ্টি করতে পারে সেই চিত্রকর্ম ততবেশি সুন্দর মনে হয়।

ছবির যদি ভাষা তৈরি না হয় তাহলে দর্শক কেন শিল্পী নিজেও সেই সঠিক কর্মের সাথে ভাব বিনিময় করতে পারবেন না; ফলে সেই সুন্দর ছবি শিল্পীর দৃষ্টিতেও সুন্দর হয়ে উঠবে না।

আসলে যা কিছু সুন্দর মনে হবে তাকে অসুন্দর বলা হয়। আসলে এখানে সুন্দরের সাথে কিছু অসুন্দরের বিরোধ নেই।

যেমন আমরা যখন আমাদের লোকসাহিত্যের শিল্পী আব্দুস শাকুরের চিত্রকর্ম দেখি তখন কি মনে হয়।

মনে হয় ছবির মানুষগুলো, পাখিগুলো যেন আমাদের অতিপরিচিত। আবার পাশে কবিতার দু’চারটা লাইন লিখে দেয়া। এই যে, চিত্রের ভাবের সাথে রঙের মাত্রার সাথে ভাষাকে মূর্ত করে ফুটিয়ে তোলা; এই গুণের জন্যই চিত্রের ভাবাটাকে আত্মস্থ করতে আমাদের খুব সুবিধা হয়। আমাদের চিন্তার রাজ্যে শিল্পী আব্দুস শাকুরের চিত্রপটগুলো এতবেশি মূর্ত এবং ভাবময়, ফলে দেখেই আমরা সুন্দর ভেবে অভিভূত হই। অর্থাৎ চিত্রের ভাষা যতবেশি মূর্ত হয়ে ওঠে সেই চিত্রকর্ম ততবেশি সুন্দর মনে হয়। আর অপরাপর ক্ষেত্রে কোন চিত্রকর্মের ভাষা যদি মূর্তমান না হয়, ভাব যদি আবদ্ধ থাকে তবে কিন্তু তা শিল্পের বিচারে সঠিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে না আর তখনই সেই চিত্রকর্মকে অসুন্দর বলা হয়।

অনেকে আবার শিল্পের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেও সুন্দর ও অসুন্দরের মাত্রা নির্ণয় করে থাকেন। দৃশ্যকলার ক্ষেত্রে যে শিল্পকর্মে আনুপাতিক হয় না সেই শিল্পকর্মকে অনেকে অসুন্দর বলে কিন্তু এমনটা করাও তো আবার সঠিক নয়। এক্ষেত্রে বলা যায়, ম্যানরিস্ট শিল্প আন্দোলনের সময় শিল্পীরা ইচ্ছে করেই ফিগারকে প্রমাণুপাতিক না রেখে একটু লম্বাটে করে হাত-ঘাড় এঁকেছেন, তাহলে সেই সময়কার চিত্রকর্মকে কি আমরা অসুন্দর বলব, বার্ণিনীর ভাস্কর্যকে আমরা অসুন্দর বলব না। কারণ ম্যানরিস্টরা তাদের ভাব এবং ভাষাকে পূর্ণ মাত্রায় প্রকাশ করতে পেরেছেন।

অর্থাৎ শিল্পের সুন্দর নির্ভর করে ভাব প্রকাশের ওপর। ভাষাই এক্ষেত্রে প্রধান।

নির্মাল্য নাগ তার শিল্পাচেতনা গ্রন্থের ‘ভাবের ভাষা’ প্রবন্ধে বলেছেন-

‘আধুনিক সমাজে দৃশ্য ও শ্রুতি এই দুই অর্থাৎ দেখা ও শোনাকে গণসংযোগে সর্বাধিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে রূপের ভাষার সামাজিক মূল্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।’

এই যে রূপের ভাষাই শিল্পের ভাষা এবং একে গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরো বলেছেন যে-

বস্তুতপক্ষে সমস্ত ভাষাই রূপকল্প নির্মাণ করে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে। ভাষা ভিন্ন হলেও সমস্ত ভাষাই ছবি আঁকে।

ভাষার সঠিক প্রয়োগ বা প্রকাশ ছাড়া শিল্পের সুন্দর রূপ পরিস্ফুটিত হয় না বা শিল্পের বিকাশও সেক্ষেত্রে সম্ভব নয়; তাইতো ভাষা নির্মাণ করাটাই শিল্পের সৌন্দর্যকে স্পর্শ করার অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।

back to top