alt

সাময়িকী

জীবন যখন যেভাবে প্রসঙ্গে

শাজাহান চাকলাদার

image
শুক্রবার, ০২ এপ্রিল ২০২১

‘বই পড়া ও পাঠ-প্রতিক্রিয়া দু-ই ক্ষেত্র বিশেষে পাঠকের স্বাদ ও রুচির প্রতিবেশ-নির্ভর বিষয়’- বঙ্গানুবাদে এই ছিল বিশ শতকের জনৈক জার্মান গ্রন্থকারের উক্তি। বাংলা সাহিত্যের শতবর্ষ-অগ্রণী দশভূজা প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদার খুড়শ্বশুর বাজারে বাংলা বই এলেই নির্বিচারে কিনতেন ও আলমারি ঠেসে রাখতেন। রবি সে সবের দিকে গভীর তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন (‘পয়লা নম্বর’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। এই যে বই সংগ্রহের ও পাঠের আকুল তৃষ্ণা, এটি আমার মতো অতি ক্ষুদ্র পাঠকের কাছে স্বপ্নবিলাস বই নয়। তত্রাপি কিছু বই ফি বছর পাই। এবারে কভিডকালে কুরিয়েরযোগে পেলাম হরষিত বালার ‘জীবন যখন যেভাবে’ (আত্মকথনের গল্প-প্রথম ভাগ) বইখানি। একজন স্বনামধন্য শিক্ষক-অধ্যাপক ও অর্ধশত গ্রন্থপ্রণেতার কাছ থেকে পাওয়া বইখানি আমার ব্যক্তিগত বই-ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে প্রাভাতিক রবিরশ্মির আলোকচ্ছাটায়।

হরষিত বালা পেশায় মূলত শিক্ষক, নেশায় পড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষাগ্রহণ শেখাতে-শেখাতে’। তাঁর এই অনবরুদ্ধ আত্মশ্লাঘার যে রূপ ও রসের ছবি তাঁর বইটিতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, সেটি কি প্রলম্বিত কি অনুভূমিক- উভয় মাত্রায় শুচিস্নিগ্ধ ও রুচিঋদ্ধ। সাদা বাংলায় যাকে আমরা ‘আত্মজৈবনিক’ বলি, এই বইখানি সেই ছকে বাঁধা নয়, বরং প্রতি পাতাতেই পাই মননের কুশলী বিচরণের উজ্জ্বলতর এক ক্যালাইডোস্কোপিক আভা।

‘আমার কথা’য় (পৃ. ১২২) আপনজীবনরথের চলমানতার সৌরভ, গৌরব ও আত্মবিশ্বাসের যে ছবি আমরা পাই, সেখানে তিনি স্বয়ং আপন অভিষেকের নিরাভরণ কিন্তু হিরণ্ময় অনুষ্ঠানের রাজাধিরাজ। বইটিতে ছয়টি অধ্যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে আছে শিরোনাম ও উপ-শিরোনাম। প্রথম অধ্যায়ে দশম পাতায় দ্বাদশ চরণে লেখা ‘মা-কে’ কেবল একটি কবিতা নয়, একটি শাশ্বত আকুল অনুভবের অবিনশ্বর ব্যাকুলতা। এই ব্যাকুল নৈবেদ্য প্রকাশের সাথেই লেখক গল্পের ডালি মেলে ধরেছেন।

বইটিতে স্বারোপিত ও স্বকল্পিত এক নাম ‘নেটুদা’। এটি লেখকের ছদ্মনাম নয়, আলঙ্কারিক বিশেষণে বিশেষ অভিধা। এই নামের অন্তরালে এক অভাবিত বৈচিত্র্যময় চরিত্রের সাথে পাঠকের সাক্ষাৎ হয়। নেটুদার ‘কত কথা কত স্মৃতি’ (পৃ. ২৬-পৃ. ৫০)-তে সাতাশটি ক্ষুদ্রকথন পাই, যার প্রতিটি এক একটি সম্পূর্ণ গল্প-কাঠামোর অঙ্কুর। পাঁচ নম্বরে ‘মনের মানুষ হবে’ (পৃ. ৩০) বেশ দাগ কাটে মনে। সেখানে ঘটনা বর্ণনার আভরণ ও বৈচিত্র্যের রহস্যময়তায় পাঠকের মন যেমন দুলে ওঠে, তেমনি ছিন্নপাতার বিষাদও তাকে বিষণ্ন করে। ‘খণ্ড খণ্ড নেটুদা’ (পৃ. ৫১) ক্রমিক সহযোগে তুলে ধরেছেন আপন কথা ও গল্প। এখানে স্বরবর্ণ সজ্জায় ছোটো কলেবরে গল্পের মালা গেঁথেছেন লেখক। ‘নেটুদার দুষ্টুমি’ (পৃ. ৬০)-তে আছে শৈশব-স্মৃতি।

অন্যত্র ‘নেটুদার বিশ্বাস’ (পৃ. ৭০)। জীবনচাকার ঘূর্ণায়মান গতির ঘাত-সংঘাতে লেখক এখানে বেশ কিছু অভিজ্ঞতায় তাঁর সঞ্চয়-ঝুলি ভারি করেছেন। সেই ভার মননের শাণিত রঙে চিত্রময় হয়ে উঠেছে প্রবচনের আদলে। যেমন- ‘আংশিক সত্য মিথ্যার নামান্তর’/ ‘সুখী সেইজন, আকাক্সক্ষা যার কম’/ ‘অনায়াসলব্ধ ধন, অযতেœ বাঁচে’ / ’ব্যক্তিত্ব-ই অন্তরের সৌন্দর্য’ / ‘অলসতাই অধর্ম’ / ’আত্মাকে উন্নত রাখাই মনুষ্যত্ব’/ ‘আনন্দহীন সত্য অর্থহীন’ / ’যে জীবনে ত্যাগ নাই, তা অগৌরবের’ / ‘সকল দুর্ভোগের একমাত্র কারণ-অশিক্ষা’ ইত্যাদি।

সমবোধে বাংলা ও ইংরেজিতে আরও কিছু বচনামৃত পাই ‘নেটুদার দাদাগিরি’তে (পৃ. ৭৩)। এখানে বিধৃত স্বল্পকথা গভীর জীবন-অভিজ্ঞতাজাত। যেমন- ‘সম্মান দিয়েই সম্মান পেতে হয়’ / ‘শুদ্ধ দান তা-ই, যাতে কোনো প্রত্যাশা থাকে না’ / ‘সুন্দর লোকের সাজতে হয় না’ / ‘একজন অন্ধের কাছে আলোও অন্ধকার’ / ÔThose who speak less, work more’/ ‘Nothing should be kept pending’/ ‘The silent hypocrites are the bureaucrats’/ ‘No evil can exist for long’ ইত্যাদি।

বিভিন্ন বিশিষ্টজনের চোখে ‘নেটুদা’ বিশেষ গুণাবলির এক আধার (পৃ. ৮১)। সেই সব সুবচন লেখকের ব্যক্তিমানস ও পেশাজীবনকে শংসা-সমৃদ্ধ করেছে।

তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত ‘আমার শিক্ষকজীবন’ (পৃ. ৮৫) বইটির সবচেয়ে আলোকিত অংশ, যার মুখ্যভাগ ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকা কলেজ’ ঘিরে। একজন শিক্ষক কি শুধুই ‘চক-ডাস্টার’-এর মূর্ত ছবি, নাকি জীবন-রূপকার, তার শ্রমঘন-ক্লান্তিহীন কর্মচক্রে আবর্তিত লেখক নানা মাত্রায় সেটি প্রকাশ করেছেন এই অধ্যায়ে। লেখক বাগান করেছেন, বাগানে ফুল ফুটিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষকেও বাগান করে তুলেছেন প্রশিক্ষিত বিজ্ঞ মালীর ভূমিকা নিয়ে। ঢাকা কলেজ ঐতিহ্যগতভাবে দেশের সেরা ছাত্রদের জ্ঞানতীর্থের প্রথম সিঁড়ির সেরা সোপান। সেখানে শিক্ষক হিসেবে লেখকের শিক্ষাদান ও জীবিকার সাথে যুগপৎ পরিবেশ সংস্কার-পুনঃসংস্কারে আত্ননিয়োগ একজন পরাক্রম ও নিষ্ঠবান ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব।

আপন কর্মধারার ইতিবৃত্ত যেভাবেই বিবৃত হোক না কেন, লেখকের সবুজ-তারুণ্যে ‘বিপ্লব-স্পন্দিত-বুকে’ স্বদেশপ্রেমও কতখানি দুর্দমনীয় ছিল, সেটি জানতে পারি স্কুল-পড়ুয়া ছেলের মুক্তিযুদ্ধ করার প্রত্যয়ী অভিপ্রায়ে। সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের সাথে সাক্ষাতে ‘too young’ ছেলেটি দেশমাতৃকার ভালোবাসায় প্রাণদানের শপথে আকাশসমান আশ্বাসে মুহূর্তেই পূর্ণ যোদ্ধা হয়ে ওঠে, জলিল বলেন, ‘I’ll give you special training’।

‘আমার শিক্ষকজীবন’ অধ্যায়ে চিত্তাকর্ষক আরেক শিরোনাম ‘বিয়াল্লিশটি বছর ধরে’ (প্র. ১১৪)। ইংরেজ কবি টেনিসনকে তিনি উদ্ধৃত করেছেন অক্লান্ত পথচলার অভিপ্রায়কে মূল্যায়ন করে। কাকতালীয়ভাবে ‘৪২’ সংখ্যাটি জীবনের কতগুলো সফলতার সাথে যুক্ত, তাই তার মূল্যায়নটিও সরস। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, সংখ্যা নির্দেশক এই পদান্ত ‘টি’ লেখক বিয়াল্লিশের সাথে জুড়ে দিয়েছেন সজ্ঞানে। রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’য় দেখি দটা’/ ‘পেট’-অনাদরে আর ‘টি’ আদরের সাথে পদান্তে যুক্ত হয়। সংখ্যার জন্য সম্প্রীতির এই বন্ধন সুলভ নয় সর্বত্র। লেখক সেখানেও নিপুণ।

চতুর্থ অধ্যায়ে লেখকের প্রকাশিত কটি পুস্তক নিয়ে আলোচনা করেছেন বিজ্ঞজনেরা। বলাই বাহুল্য সেখানে আছে প্রশংসার বাণী। এর পর পঞ্চম অধ্যায়ের দুটি ভাগ, প্রথমটি ‘দুদিনের এই খেলাঘরে’ (পৃ. ১৫৫), যার চার পৃষ্ঠায় আছে, দুই, তিন ও চার চরণের ভিন্ন শিরোনামযুক্ত শ্লোক, অর্থ ও তাৎপর্যে যেগুলোর আছে বোধ ও চৈতন্যে নববিন্যাস। যেমন- ‘যাকে দেখি নাই চিনিব কেমনে / সে কোন দেবতা! মানুষ দেখেছি / তাকেই বেসেছি ভালো মন-প্রাণ দিয়া (শিক্ষাগুরু)। দ্বিতীয়াংশে ‘যবে প্রথম জেনেছি’ (পৃ. ১৫৯)। শব্দভাণ্ডারের দীনদশাকে ইঙ্গিত করে জীবনের নানা বাঁকে-পথে পাওয়া নানা শব্দকে লেখক সন্নিবেশ করেছেন, ঋণও স্বীকার করেছেন। বিষয়টি সুখপাঠ্য এবং অভিনবও বটে।

বইটির সর্বশেষ অধ্যায়ের নাম ‘প্রাক-অন্ত্যেষ্টি’। এর প্রথম রচনা লেখকের নিজের। খুব সহজে বলেছেন, ‘Death is a must’-জাতস্য হি ধ্রুবং মৃত্যুঃ’, তবে সহাস্য বদনে, নির্ভয়ে সপ্রেম চিরপ্রস্থান তাঁর কাম্য। এই বিষয়ে আরও একটি নিবন্ধ বইটিতে যুক্ত হয়েছে। লেখক সম্পর্কে বেশ কটি মূল্যবান রচনা ছাড়্ওা লেখকের সাথে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার সংযুক্ত হয়েছে বইটিতে। সবখানেই লেখকের বিদ্যুৎ-চমক প্রতিভা, জ্ঞানতৃষ্ণা ও শৈক্ষিক জীবনের সাফল্যের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি-স্বাক্ষর পাই।

ছাত্রজীবন সমাপনীক্ষণে অধ্যাপক হরষিত বালা লেখেন, ‘I always went my own road and on my own legs where I had a mind to go’, আপন জীবনরথের চাকায় নিরন্তর আবর্তিত তাঁর ঋজুবোধের সজীবতা দৃশ্যান্তরে স্মরণ করিয়ে দেয় মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টকে, যেখানে ‘ইচ্ছা’ ও ‘অঙ্গীকার’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপাঠ গভীর সাগরে চলমান সুউচ্চ কোনো জাহাজের শ্বেত বঙ্কিম গ্রীবায় স্থির ঐশ্বরিক আলোর ঝরনার সাথেই কেবল তুলনীয়। বইখানি শিক্ষিতজন মাত্রই সংগ্রহে রাখবেন, এটি প্রত্যাশিত।

ছবি

পুরাণ ও নদীবর্তী জীবনালেখ্য

ছবি

ইতিহাসের সরোবরে অবাধ অবগাহন

ছবি

শিকিবু

ছবি

প্রতীপ রূপান্তর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

ডাকঘর ডাকে, আমিই অমল

ছবি

চিরনূতন চিরপুরাতন

ছবি

‘নেবে নি, নেবে নি প্রভাতের রবি’ করোনাকালে রবীন্দ্র-অনুভব

মানুষ কিংবা তিনভাগ জল

ছবি

দেশ আমাদের আজও কোনো মাতৃভাষা দেয়নি বলে কবি শঙ্খ ঘোষ একবার বিলাপ করেছিলেন

ছবি

শিকিবু

ছবি

শঙ্খ ঘোষের পাকশী পাকশীর শঙ্খ ঘোষ

ছবি

শঙ্খ ঘোষের গদ্য : মর্মজয়ী মাধুর্য

ছবি

শঙ্খ ঘোষ : আত্মবোধের নিরুক্তলোক

ছবি

শঙ্খ ঘোষের কবিতাভাবনা

ছবি

মাঝে মাঝে কার কাছে যাব?

ছবি

বাঙালি প্রতিভার অন্যতম সেরা আইকন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

পত্রপাঠ

ছবি

মুরাকামির কল্পধাম

ছবি

শিকিবু

ছবি

ফোকলোরচর্চার সেকাল ও একাল

ছবি

এক খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তক

ছবি

শামসুজ্জামান খানের ভাবনায় বাঙালি সংস্কৃতির উদ্যাপন

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের পরতে বইমেলা

ছবি

একটি ইতিহাস একটি আত্মজীবনী

ছবি

বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের অনুপুঙ্খ উপস্থাপনা

ছবি

লজ্জাবতী

ছবি

কালো রঙের আলো অথবা কিছু কোঁকড়ানো চুল

ছবি

কদমের ওম ভর্তি কম্বল এবং অতঃপর

ছবি

শব্দভাণ্ডার প্রায়শই লুট হয়ে যাচ্ছে

ছবি

শিল্পের সুন্দর আর অসুন্দরের শিল্প

ছবি

মৃৎচক্রের দিনগুলো

ছবি

রক্তে রাঙানো বিবাহ বাসর

সাময়িকী কবিতা

tab

সাময়িকী

জীবন যখন যেভাবে প্রসঙ্গে

শাজাহান চাকলাদার

image
শুক্রবার, ০২ এপ্রিল ২০২১

‘বই পড়া ও পাঠ-প্রতিক্রিয়া দু-ই ক্ষেত্র বিশেষে পাঠকের স্বাদ ও রুচির প্রতিবেশ-নির্ভর বিষয়’- বঙ্গানুবাদে এই ছিল বিশ শতকের জনৈক জার্মান গ্রন্থকারের উক্তি। বাংলা সাহিত্যের শতবর্ষ-অগ্রণী দশভূজা প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদার খুড়শ্বশুর বাজারে বাংলা বই এলেই নির্বিচারে কিনতেন ও আলমারি ঠেসে রাখতেন। রবি সে সবের দিকে গভীর তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন (‘পয়লা নম্বর’-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। এই যে বই সংগ্রহের ও পাঠের আকুল তৃষ্ণা, এটি আমার মতো অতি ক্ষুদ্র পাঠকের কাছে স্বপ্নবিলাস বই নয়। তত্রাপি কিছু বই ফি বছর পাই। এবারে কভিডকালে কুরিয়েরযোগে পেলাম হরষিত বালার ‘জীবন যখন যেভাবে’ (আত্মকথনের গল্প-প্রথম ভাগ) বইখানি। একজন স্বনামধন্য শিক্ষক-অধ্যাপক ও অর্ধশত গ্রন্থপ্রণেতার কাছ থেকে পাওয়া বইখানি আমার ব্যক্তিগত বই-ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে প্রাভাতিক রবিরশ্মির আলোকচ্ছাটায়।

হরষিত বালা পেশায় মূলত শিক্ষক, নেশায় পড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘আমার শিক্ষাগ্রহণ শেখাতে-শেখাতে’। তাঁর এই অনবরুদ্ধ আত্মশ্লাঘার যে রূপ ও রসের ছবি তাঁর বইটিতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, সেটি কি প্রলম্বিত কি অনুভূমিক- উভয় মাত্রায় শুচিস্নিগ্ধ ও রুচিঋদ্ধ। সাদা বাংলায় যাকে আমরা ‘আত্মজৈবনিক’ বলি, এই বইখানি সেই ছকে বাঁধা নয়, বরং প্রতি পাতাতেই পাই মননের কুশলী বিচরণের উজ্জ্বলতর এক ক্যালাইডোস্কোপিক আভা।

‘আমার কথা’য় (পৃ. ১২২) আপনজীবনরথের চলমানতার সৌরভ, গৌরব ও আত্মবিশ্বাসের যে ছবি আমরা পাই, সেখানে তিনি স্বয়ং আপন অভিষেকের নিরাভরণ কিন্তু হিরণ্ময় অনুষ্ঠানের রাজাধিরাজ। বইটিতে ছয়টি অধ্যায়। প্রতিটি অধ্যায়ে আছে শিরোনাম ও উপ-শিরোনাম। প্রথম অধ্যায়ে দশম পাতায় দ্বাদশ চরণে লেখা ‘মা-কে’ কেবল একটি কবিতা নয়, একটি শাশ্বত আকুল অনুভবের অবিনশ্বর ব্যাকুলতা। এই ব্যাকুল নৈবেদ্য প্রকাশের সাথেই লেখক গল্পের ডালি মেলে ধরেছেন।

বইটিতে স্বারোপিত ও স্বকল্পিত এক নাম ‘নেটুদা’। এটি লেখকের ছদ্মনাম নয়, আলঙ্কারিক বিশেষণে বিশেষ অভিধা। এই নামের অন্তরালে এক অভাবিত বৈচিত্র্যময় চরিত্রের সাথে পাঠকের সাক্ষাৎ হয়। নেটুদার ‘কত কথা কত স্মৃতি’ (পৃ. ২৬-পৃ. ৫০)-তে সাতাশটি ক্ষুদ্রকথন পাই, যার প্রতিটি এক একটি সম্পূর্ণ গল্প-কাঠামোর অঙ্কুর। পাঁচ নম্বরে ‘মনের মানুষ হবে’ (পৃ. ৩০) বেশ দাগ কাটে মনে। সেখানে ঘটনা বর্ণনার আভরণ ও বৈচিত্র্যের রহস্যময়তায় পাঠকের মন যেমন দুলে ওঠে, তেমনি ছিন্নপাতার বিষাদও তাকে বিষণ্ন করে। ‘খণ্ড খণ্ড নেটুদা’ (পৃ. ৫১) ক্রমিক সহযোগে তুলে ধরেছেন আপন কথা ও গল্প। এখানে স্বরবর্ণ সজ্জায় ছোটো কলেবরে গল্পের মালা গেঁথেছেন লেখক। ‘নেটুদার দুষ্টুমি’ (পৃ. ৬০)-তে আছে শৈশব-স্মৃতি।

অন্যত্র ‘নেটুদার বিশ্বাস’ (পৃ. ৭০)। জীবনচাকার ঘূর্ণায়মান গতির ঘাত-সংঘাতে লেখক এখানে বেশ কিছু অভিজ্ঞতায় তাঁর সঞ্চয়-ঝুলি ভারি করেছেন। সেই ভার মননের শাণিত রঙে চিত্রময় হয়ে উঠেছে প্রবচনের আদলে। যেমন- ‘আংশিক সত্য মিথ্যার নামান্তর’/ ‘সুখী সেইজন, আকাক্সক্ষা যার কম’/ ‘অনায়াসলব্ধ ধন, অযতেœ বাঁচে’ / ’ব্যক্তিত্ব-ই অন্তরের সৌন্দর্য’ / ‘অলসতাই অধর্ম’ / ’আত্মাকে উন্নত রাখাই মনুষ্যত্ব’/ ‘আনন্দহীন সত্য অর্থহীন’ / ’যে জীবনে ত্যাগ নাই, তা অগৌরবের’ / ‘সকল দুর্ভোগের একমাত্র কারণ-অশিক্ষা’ ইত্যাদি।

সমবোধে বাংলা ও ইংরেজিতে আরও কিছু বচনামৃত পাই ‘নেটুদার দাদাগিরি’তে (পৃ. ৭৩)। এখানে বিধৃত স্বল্পকথা গভীর জীবন-অভিজ্ঞতাজাত। যেমন- ‘সম্মান দিয়েই সম্মান পেতে হয়’ / ‘শুদ্ধ দান তা-ই, যাতে কোনো প্রত্যাশা থাকে না’ / ‘সুন্দর লোকের সাজতে হয় না’ / ‘একজন অন্ধের কাছে আলোও অন্ধকার’ / ÔThose who speak less, work more’/ ‘Nothing should be kept pending’/ ‘The silent hypocrites are the bureaucrats’/ ‘No evil can exist for long’ ইত্যাদি।

বিভিন্ন বিশিষ্টজনের চোখে ‘নেটুদা’ বিশেষ গুণাবলির এক আধার (পৃ. ৮১)। সেই সব সুবচন লেখকের ব্যক্তিমানস ও পেশাজীবনকে শংসা-সমৃদ্ধ করেছে।

তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত ‘আমার শিক্ষকজীবন’ (পৃ. ৮৫) বইটির সবচেয়ে আলোকিত অংশ, যার মুখ্যভাগ ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকা কলেজ’ ঘিরে। একজন শিক্ষক কি শুধুই ‘চক-ডাস্টার’-এর মূর্ত ছবি, নাকি জীবন-রূপকার, তার শ্রমঘন-ক্লান্তিহীন কর্মচক্রে আবর্তিত লেখক নানা মাত্রায় সেটি প্রকাশ করেছেন এই অধ্যায়ে। লেখক বাগান করেছেন, বাগানে ফুল ফুটিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষকেও বাগান করে তুলেছেন প্রশিক্ষিত বিজ্ঞ মালীর ভূমিকা নিয়ে। ঢাকা কলেজ ঐতিহ্যগতভাবে দেশের সেরা ছাত্রদের জ্ঞানতীর্থের প্রথম সিঁড়ির সেরা সোপান। সেখানে শিক্ষক হিসেবে লেখকের শিক্ষাদান ও জীবিকার সাথে যুগপৎ পরিবেশ সংস্কার-পুনঃসংস্কারে আত্ননিয়োগ একজন পরাক্রম ও নিষ্ঠবান ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব।

আপন কর্মধারার ইতিবৃত্ত যেভাবেই বিবৃত হোক না কেন, লেখকের সবুজ-তারুণ্যে ‘বিপ্লব-স্পন্দিত-বুকে’ স্বদেশপ্রেমও কতখানি দুর্দমনীয় ছিল, সেটি জানতে পারি স্কুল-পড়ুয়া ছেলের মুক্তিযুদ্ধ করার প্রত্যয়ী অভিপ্রায়ে। সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের সাথে সাক্ষাতে ‘too young’ ছেলেটি দেশমাতৃকার ভালোবাসায় প্রাণদানের শপথে আকাশসমান আশ্বাসে মুহূর্তেই পূর্ণ যোদ্ধা হয়ে ওঠে, জলিল বলেন, ‘I’ll give you special training’।

‘আমার শিক্ষকজীবন’ অধ্যায়ে চিত্তাকর্ষক আরেক শিরোনাম ‘বিয়াল্লিশটি বছর ধরে’ (প্র. ১১৪)। ইংরেজ কবি টেনিসনকে তিনি উদ্ধৃত করেছেন অক্লান্ত পথচলার অভিপ্রায়কে মূল্যায়ন করে। কাকতালীয়ভাবে ‘৪২’ সংখ্যাটি জীবনের কতগুলো সফলতার সাথে যুক্ত, তাই তার মূল্যায়নটিও সরস। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, সংখ্যা নির্দেশক এই পদান্ত ‘টি’ লেখক বিয়াল্লিশের সাথে জুড়ে দিয়েছেন সজ্ঞানে। রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’য় দেখি দটা’/ ‘পেট’-অনাদরে আর ‘টি’ আদরের সাথে পদান্তে যুক্ত হয়। সংখ্যার জন্য সম্প্রীতির এই বন্ধন সুলভ নয় সর্বত্র। লেখক সেখানেও নিপুণ।

চতুর্থ অধ্যায়ে লেখকের প্রকাশিত কটি পুস্তক নিয়ে আলোচনা করেছেন বিজ্ঞজনেরা। বলাই বাহুল্য সেখানে আছে প্রশংসার বাণী। এর পর পঞ্চম অধ্যায়ের দুটি ভাগ, প্রথমটি ‘দুদিনের এই খেলাঘরে’ (পৃ. ১৫৫), যার চার পৃষ্ঠায় আছে, দুই, তিন ও চার চরণের ভিন্ন শিরোনামযুক্ত শ্লোক, অর্থ ও তাৎপর্যে যেগুলোর আছে বোধ ও চৈতন্যে নববিন্যাস। যেমন- ‘যাকে দেখি নাই চিনিব কেমনে / সে কোন দেবতা! মানুষ দেখেছি / তাকেই বেসেছি ভালো মন-প্রাণ দিয়া (শিক্ষাগুরু)। দ্বিতীয়াংশে ‘যবে প্রথম জেনেছি’ (পৃ. ১৫৯)। শব্দভাণ্ডারের দীনদশাকে ইঙ্গিত করে জীবনের নানা বাঁকে-পথে পাওয়া নানা শব্দকে লেখক সন্নিবেশ করেছেন, ঋণও স্বীকার করেছেন। বিষয়টি সুখপাঠ্য এবং অভিনবও বটে।

বইটির সর্বশেষ অধ্যায়ের নাম ‘প্রাক-অন্ত্যেষ্টি’। এর প্রথম রচনা লেখকের নিজের। খুব সহজে বলেছেন, ‘Death is a must’-জাতস্য হি ধ্রুবং মৃত্যুঃ’, তবে সহাস্য বদনে, নির্ভয়ে সপ্রেম চিরপ্রস্থান তাঁর কাম্য। এই বিষয়ে আরও একটি নিবন্ধ বইটিতে যুক্ত হয়েছে। লেখক সম্পর্কে বেশ কটি মূল্যবান রচনা ছাড়্ওা লেখকের সাথে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার সংযুক্ত হয়েছে বইটিতে। সবখানেই লেখকের বিদ্যুৎ-চমক প্রতিভা, জ্ঞানতৃষ্ণা ও শৈক্ষিক জীবনের সাফল্যের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি-স্বাক্ষর পাই।

ছাত্রজীবন সমাপনীক্ষণে অধ্যাপক হরষিত বালা লেখেন, ‘I always went my own road and on my own legs where I had a mind to go’, আপন জীবনরথের চাকায় নিরন্তর আবর্তিত তাঁর ঋজুবোধের সজীবতা দৃশ্যান্তরে স্মরণ করিয়ে দেয় মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টকে, যেখানে ‘ইচ্ছা’ ও ‘অঙ্গীকার’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপাঠ গভীর সাগরে চলমান সুউচ্চ কোনো জাহাজের শ্বেত বঙ্কিম গ্রীবায় স্থির ঐশ্বরিক আলোর ঝরনার সাথেই কেবল তুলনীয়। বইখানি শিক্ষিতজন মাত্রই সংগ্রহে রাখবেন, এটি প্রত্যাশিত।

back to top