alt

সাময়িকী

মান্টোর সঙ্গে একদিন

আদনান সৈয়দ

: বৃহস্পতিবার, ০১ জুলাই ২০২১

সাদাত হাসান মান্টো

উর্দু কথাসাহিত্যিক হিসেবে সাদাত হাসান মান্টো দুনিয়া জুড়ে বিখ্যাত। একজন প্রতিবাদী লেখক হিসেবে তিনি পরিচিত। সমাজের অনাচার, নারী অধিকার, ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, মানব চরিত্রের বীভৎসতা, দেশ ভাগের আর্তনাদ তাঁর গ্রন্থে উঠে এসেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অশ্লীলতার দায়ে মান্টোকে ভারত এবং পাকিস্তানের আদালতে কাঠগড়ায় কয়েকবার দাঁড়াতে হয়েছিল। গত বছর কয়েক আগে বিবিসির জরিপে পৃথিবীর সেরা একশোটি গল্পের মধ্যে এ উপমহাদেশের লেখক সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ও স্থান পেয়েছে। সন্দেহ নেই এটি আমাদের জন্যে আনন্দের একটি ঘটনা। হোমারের ওডেসি, হেরিয়েট বেচার স্টোর ‘আংকল টমস কেবিন’, জর্জ ওরয়েল এর ‘নাইনটিন এইটিফোর’, শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর পাশে সাদাত হাসান মান্টোর গল্প পশ্চিমা বাঘা বাঘা সাহিত্যের মাঝে জায়গা করে নেওয়া মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়।

আগেই বলেছি, যে গল্পগুলো মানুষকে ভাবায়, সমাজকে নতুন রূপে গড়তে সাহায্য করে- সেই মাপকাঠিতে মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ গল্পটি নির্বাচিত হওয়া খুব সময় উপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। বিবিসি শিল্প-সাহিত্য বিভাগকে সাধুবাদ জানাই এমন একটি মহতী উদ্যোগ হাতে নেওয়ার জন্যে। খুব জানতে ইচ্ছে করে, পশ্চিমা বিশ্ব মান্টোকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করলেও আমাদের উপমহাদেশে মান্টো কেমন আছেন? মান্টো তাঁর গল্পে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা বলেছেন, নারী অধিকার নিয়ে তাঁর লেখায় সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। কিন্তু সমাজ পরিবর্তন করতে যে লড়াইকে তিনি তাঁর গল্পের মূল সারবস্তু তৈরি করেছিলেন সেই লড়াইয়ে তিনি কতটুকু জিততে পেরেছেন, তাও এক প্রশ্ন বৈকি! মান্টোর মৃত্যুর বহু বছর পরেও আমাদের সমাজ কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে এটাও ভাববার বিষয়। নারী অধিকার নিয়ে মান্টো তাঁর সাহিত্যের প্রতিটা শব্দে যে সরব হয়ে উঠেছিলেন তার কতটুকু তিনি সফল হয়েছেন সেটিও ভেবে দেখার সময় এখন।

সাদাত হাসান মান্টো জন্মগ্রহণ করেন ১৯১২ সালে। আর ১৯৫৫ সালে মহাপ্রস্থান। মাত্র ৪৩ বছরের জীবন তাঁর। সময়ের দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে সেটি ছিল আমাদের উপমহাদেশের জন্যে অশান্ত এক সময়। একদিকে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, ধর্মের নামে নারীদের উপর নির্যাতন- সব মিলিয়ে মান্টোর জন্ম সময়টা খুব একটা ভালো সময় ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই কুৎসিত সমাজের ছায়া পড়েছিল মান্টোর সাহিত্যেও। দেশ বিভাগের দাঙ্গা, আমাদের বুর্জোয়া সমাজের ভণ্ডামি এবং তাদের অপকর্ম নিয়ে মান্টো সারা জীবন লড়াই করেছেন, মান্টোর সাহিত্য অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছে এবং এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিনি ভারত এবং পাকিস্তানের আদালতের কাঠগড়ায় পর্যন্ত দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কখনো নতি স্বীকার করেননি। সালমান রুশদি তাঁকে আধুনিক ভারতীয় ছোটগল্পের অবিতর্কিত শ্রেষ্ঠ রূপকার (undisputed master of modern Indian short story) বলে শ্রদ্ধা জনিয়েছেন। লেখক খালিদ হাসান বলেছেন, ‘মান্টো শুধু আমাদের দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের নয়, সারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লেখকদের একজন।’ তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে রয়েছে টোবাটেক সিং, তামাসা, ঠাণ্ডা গোস্ত, সালোয়ারের ফিতেয়, কালি সালোয়ার, খালি বোতল, ধোঁয়া ইত্যাদি। তাঁর রচনায় দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাংগা, মানব চরিত্রের বীভৎসতার চিত্র বার বার ঘুরেফিরে এসেছে। তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রগিতিশীল চিন্তায় উজ্জীবিত হয়ে নতুন এক সমাজ। যে সমাজকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছুঁতে পারবে না, যে সমাজে মানুষ হবে মুখ্য। প্রগতিশীল এই চিন্তাচেতনা তাঁর সাহিত্যে প্রবলভাবে চলে আসে। শুধু কথাসাহিত্য নয়, পাশাপাশি মান্টো চলচ্চিত্রেও নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। দেখতে পাই মুম্বাই চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রয়েছে।

বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, ধর্মের নামে নারীদের উপর নির্যাতন- সব মিলিয়ে মান্টোর জন্ম-সময়টা খুব একটা ভালো ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই কুৎসিত সমাজের ছায়া পড়েছিল মান্টোর সাহিত্যেও

এবার আসল কথায় আসি। সেদিন কাকতালীয়ভাবেই ঘটনা ঘটলো। মান্টোর সঙ্গে সাক্ষাত। সেটাও কী সম্ভব? সেদিন ম্যানহাটন ফিফথ এভিনিউর একটি জমজমাট পাবে বসে একা একাই গলা ভিজাচ্ছি। ঠিক তখনই ঘটলো ঘটানাটা। চোখের সামনেই দেখি হন হন করে এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোক হেঁটে পাবে ঢুকছেন। তার মুখটি দেখতে অবিকল ঠিক সেই চেনা মুখটির মতোই। চোখে হালকা কালো ফ্রেমের চশমা। মাঝারি গড়ন। গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা। পায়ে কালো চামড়ায় ফিতে আঁটা চপ্পল। আর কাঁধে সেই পরিচিত ঝোলা ব্যাগ। আমাদের চোখাচোখি হতেই বলে ফেললাম, “মান্টো না? সাদাত হাসান মান্টো?” নিজের নাম শুনে ভদ্রলোক যেন একটু আঁতকে উঠলেন! সম্ভবত এই ম্যানহাটনের ফিরিঙ্গি পাড়ায় এভাবে কেউ মান্টো বলে চিৎকার দিবে তিনি তা ভাবতেও পারেননি। তিনি আমার দিকে মুখ গম্ভীর করে কপাল কুঁচকে খুব আস্তে মাথা ঝাঁকিয়ে শুধু বললেন, “হ্যাঁ, আমিই মান্টো। কিন্তু আপনি কে?” আমি এবার উঠে দাঁড়িয়ে মান্টোকে অভিবাদন জানালাম এবং আমার টেবিলের কোনার চেয়ারটায় বসার জন্যে ইঙ্গিত দিলাম। মান্টো কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন, তারপর আবারো সেই গম্ভীরমুখো হয়ে সোজা আমার টেবিলে এসে বসলেন। এবার আমরা মুখোমুখি। বুঝতে পারলাম কোনো কারণে তিনি খুব চিন্তিত বা মন খারাপ। এমনিতেই তাঁর অস্থির মন তার উপর নিশ্চয়ই কোনো বাজে রকম কিছু একটা ঘটেছে হয়তো। খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম “চলবে?”

মান্টো কোন শব্দ না করে শুধু বার কয়েক মাথা ঝাকালেন।

আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো এভাবেই।

ধর্মকে নিয়ে মানুষে মানুষে বৈষম্য আপনি দেখেছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ‘টোবাটেক সিং’ও লিখলেন। বর্তমান এই সময়ে আপনার সেই ধারনার পরিবর্তন ঘটেছে কি সাদাত হাসান মান্টো?

আমার প্রশ্ন শুনে মান্টো প্রথমে যেন একটু রেগে গেলেন! কিন্তু কী যেন একটা ভেবে তিনি মুচকি হেসে দিলেন। তারপর গলায় এক প্যাগ চালান দিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে হাসালেন। আগে বলুন ধর্ম নিয়ে আমি সেই ১৯৪৩ সালে- যা লিখেছিলাম আমার সেই কথাগুলো এখন পর্যন্ত খাঁটি কিনা। এখন পর্যন্ত ধর্মই মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আমাদের গোটা উপমহাদেশের প্রায় সবকটা দেশের অবস্থাই এক রকম। ধর্ম নিয়ে মরামারি, ব্যবসা, কাটাকাটি আগেও ছিল, এখনও ঠিক আগের মতোই আছে। তবে আগের চেয়ে সমস্যাটা আরো প্রকট হয়েছে। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে মানুষ আগের চেয়েও বর্বর হয়ে গেছে। আগে হত্যাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। আর এখন হত্যা করা হয় ধর্মীও দোহাই দিয়ে। দেখুন, সিরিয়া ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, ইয়ামেন ধ্বংসস্তূপের শহর। খোদ ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় একদল উঠেপড়ে লেগেছে। সব দেখেশুনে আমি প্রায় সময়ই নিজেকে বলি, ‘মান্টো, তুই এই বদমাশদের থেকে অনেক আগেই ভেগেছিস, বেশ ভালো কাজটিই করেছিস।’ বাংলাদেশেও দেখি কাঠমোল্লাদের লম্ফ-ঝম্ফ। পাকিস্তান তো অনেক আগেই পচে গেছে। তবে আপনাদের এই যুগে আমি যদি বেঁচে থাকতাম তাহলে নির্ঘাৎ কাঠমোল্লাদের হাতেই আমার কল্লাটি যেত। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আচ্ছা, আপনার গল্পের নায়ক সবসময়ই নির্যাতিতদের পক্ষে কথা বলে, মধ্যবিত্তদের অন্তরে পোষণ করা জ্বালাযন্ত্রণাকে যেন উগরে দেয়। প্রখ্যাত উর্দু লেখক আলি সর্দার জাফরির এই মন্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন?

দেখুন, আমার গল্প নিয়ে তেমন কথা বলতে চাই না। তবে আপনার আগ্রহ প্রবল দেখেই বলছি। আমি বহুবার বহু জায়গায় এই কথাটি বলেছি। আবারো বলছি। এই গল্পগুলোর চরিত্র, জীবনযুদ্ধ, ভাষা সবই আমার খুব কাছ থেকে দেখা। বুঝলেন? আমার চোখের সামনে মানুষ খুন হতে দেখেছি। যে জীবন আমি জানি না সেই জীবন নিয়ে গল্প হয় কী করে? যে কারণে আমার গল্পের নায়ক-নায়িকারা যুদ্ধংদেহি। তারা সবসময় মারমুখো। তাদের মুখের ভাষা এই আপরনাদের ভদ্র সমাজের মানুষদের মতো ঠিক পরিশীলিত না। তারা রাস্তায় ঘুমায়, ফুলবাবু হয়ে গাড়িতে চড়ার লোভ তাদের হয় কিন্তু সুযোগ কখনো ঘটে না। সর্দার জাফরির সঙ্গে একমত না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।

তাহলে প্রশ্ন একটা থেকেই যায় প্রিয় লেখক! আপনার গল্পের পাত্র-পাত্রী এরা সবাই এত মারমুখো কেন? পাশাপাশি খুবই প্রতিশোধকামীও। একজন দালাল বেশ্যাদের অপমান করে নিজের ঝাল মেটায়, একজন হতাশাগ্রস্ত যুবক জীবনে কিছু না পেয়ে শুধুমাত্র কল্পনায় একজন প্রেমিকার ছবি আঁকেন। অবাক হই যখন এই বিক্ষিপ্ত চিত্রগুলো কোলাজ হয়ে আপনার গল্পের ফাঁদে এসে ধরা পড়ে।

গলায় আরেক প্যাগ ঢালতে ঢালতে মান্টো এবার চেয়ারে ঢেলান দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর দুই চোখের মোহনায় নাকের উৎসস্থল কুঞ্চিত করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “উপরে যতই শান্ত থাকুন না কেন, মনের ভেতরে যে দ্রোহটা নিত্য দাউ দাউ করে জ্বলছে সেটি কি সত্য নয়? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো দেখি এই সমাজ, রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র উৎপাদিত কলকব্জায় আপনি বা আমি বন্দি না? আপনার কি বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে না? এই সমাজকে ভেংগে নতুন করে গড়তে ইচ্ছে করে না? দেখুন, এই শতাব্দিতে যখন আপনারা নিজেদের সভ্য বলছেন তখন আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো উগ্রবাদী লোক প্রেসিডেন্ট হচ্ছে। ভারতের মতো দেশে বিজেপি ক্ষমতায় বসছে! এসব কিসের লক্ষণ? গোটা পৃথিবী কি এখন এই দোজখের আগুনে পুড়ছে না? তখন যে কোনো বিবেকবান মানুষ কি প্রতিবাদী হবে না? আপনি হবেন না?”

লক্ষ্য করলাম মান্টো এবার যেন বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। তিনি যদি একবার রেগে যান তাহলে তাকে আর বশ মানানো যাবে না। সোজা উঠে হন হন করে হাঁটা দিবেন। তাই এবার অন্য রকম একটি প্রশ্ন করি। আচ্ছা! আপনাকে কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হলো? বয়স আর কতইবা হয়েছিল? মাত্র ৪৩। নিজের শরীরের কোনো খেয়াল আপনি করেননি। প্রচুর উল্টোপাল্টো গিলেছেন। হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই। এত পলায়ন ছিল আপনার মধ্যে?

মান্টোর গলা এখন ভারি হয়ে গেছে। মাথা দুলিয়ে এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “ঠিক এবার আসল জায়গায় আপনি ঝাকি দিয়েছেন। নাহ! প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি। নেশা করে শালার এই কুলাঙ্গার সমাজটা থেকে দূরে থাকতে চাইতাম। মনে হতো পলায়নই মুক্তির উপায়। কিন্তু মৃত্যু বিষয়টা যে এত ভয়াবহ তা আমি উপলব্ধি করতে পারিনি। বিশ্বাস করুন জীবনকে আমি ভালোবাসি। আমার স্ত্রীকে আমি ভালোবাসি। আমার কন্যাকে ভালোবাসি। আমি কেন মৃতু্যুকে ধীরে ধীরে আমার শরীরে বাসা বাঁধতে দিব? অথচ আমাকে কিনা চলে যেতে হলো? কিন্তু কাজ ছিল অনেক বাকি! একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম। অথচ কোনো কাজই হলো না। আফসোস! বেশ মনে আছে আমি যখন হাসপাতালে তখন আমি বেশি পরিমাণ জীবনবাদী হয়ে গিয়েছিলাম। বাঁচার সাধ জাগতো। মেয়েটাকে দেখতাম। তাকে নিয়ে কত কল্পনা আমার! হায়! কী কঠিন এই জীবন। তারপরও মৃত্যুর কিছুদিন আগে স্ত্রীকে বলেছিলাম, “যদি জানতাম এত তাড়াতাড়ি আমি মৃত্যুর দিকে চলে যাবো তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করতাম না। তোমার এই দুর্দশার জন্যে শুধু আমিই দায়ী। আমাকে ক্ষমা করে দাও। তবে আমার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আমার টাঙ্গাঘোড়ার যতœ নিও। আর চান্নির মাথায় হাত বুলিয়ে বলো ওর বাবা ওকে অনেক ভালোবাসতো।” মান্টোর চোখে তখন জল।

আমরা দুজনই এবার কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গেলাম। এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা আমাদের দুজনের কাঁধেই যেন ভর করলো। আমি আবার সচল হয়ে উঠলাম। আবার প্রশ্ন। নারী অধিকারের চেয়ে বড় কথা হলো একজন মানুষের অধিকার। এই অধিকার নিয়ে আপনি আপনার গল্পে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। যে সমাজ নারীকে পণ্য ছাড়া আর কিছুই মনে করতো না সেই সমাজে আপনি নারীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। আপনার ‘লাইসেন্স’ গল্পে বলেছেন, “মেয়েরা আজকাল অফিসে যায়, তারপর আবার বাড়িতেও হাজার কাজ করে। খেটেই তো খাব, এতে অসুবিধা কোথায়?” আপনার এই লেখার প্রায় ৭০ বছর পর আপনার এই মন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু?

প্রশ্নটা শুনে মান্টো একটু উদাস হয়ে গেলেন! কেন এমন উদাস হলেন কে জানে? নিশ্চয়ই কোনো স্মৃতি তার সামনে জ্বল জ্বল করে জ্বলে উঠছিল! হুম! নারী স্বাধীনতা! দেখুন সেদিনও পাকিস্তানের পাঞ্জাবের এক মুসলিম নারীকে কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে তার স্বামী বেদম প্রহার করে তাকে তালাক দিয়ে দিল। ভারত বলুন, বাংলাদেশ বলুন সর্বত্রই সেই একই দৃশ্য। বিষয়টা এমন যে কন্যা শিশু জন্ম দেওয়ার অপরাধ নারীর। পুরুষদের মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে। এ কথাও সত্য। তবে কেন জানি মনে হয় ভেতর থেকে যেভাবে পুরষোচিত মনোভাবের মূল উৎপাটন হওয়া উচিত ছিল সেভাবে এখনো হয়নি। এ যুগের হ্যাস মি ঠু (# Me too) আন্দোলন সেই কথাই প্রমাণ করে। ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশকে বাইরে রেখেও এ হিসাব কষতে অসুবিধা হয় না। নারীদের জীবনে সত্যিকার অর্থে কোনো স্বাধীনতা আসে নি। আপনি ঠিকই ধরেছেন। সবার আগে মানুষ তারপর নারী অথবা পুরুষ। আমি মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ধর্মের আগে মানুষ। মানুষের আগে ধর্ম নয়। কিন্তু নারীকে পুরুষ সমাজ কখনোই ভালো কোনো পদে দেখতে রাজি ছিল না। সেই আমাদের যুগে নয়, এমনকি এ যুগেও না। বর্তমান সময়েও দেখি নারীকে একটি বড় পদ বাগাতে কত যুদ্ধই না করতে হয়। কত কষ্টই না সহ্য করত হয়। অথচ আমরা এ যুগে অনেক বড় বড় কথা বলি। নারীবাদে উজ্জীবিত হয়ে মাইক ফাটাই। কিন্তু কি অবাক কাণ্ড! আমি আমার ‘লাইসেন্স’ উপন্যসে সেই আজ থেকে ৮৫ বছর আগে যে কথা বলেছিলাম, সে কথার পুনোরাবৃত্তি হচ্ছে এই আপানাদের আধুনিক যুগেও। লজ্জাজনক বটে!

‘লাইসেন্স’-এর সেই ডায়লগ এখনো আমাদের মনে দাগ কেটে আছে। আপনার লেখা থেকে একটু পড়ে শোনানোর লোভ সামলাতে পারছি না মান্টো- “হুজুর আমার টাঙ্গা-ঘোড়া সব কেড়ে নিন। কিন্তু আমাকে বলুন মেয়েরা যদি চরকা চালাতে পারে, কয়লা কাটতে পারে, ঝুড়ি বুনতে পারে তাহলে আমি টাঙ্গা চালালে অসুবিধা কোথায়? হুজুর আমার ওপর দয়া করুন, এভাবে আমার রুটি কেড়ে নেবেন না। আমি কীভাবে রোজগার করব তা দয়া করে বলুন!” শহরের কমিটি তাকে উত্তর দিল, “বাজারে গিয়ে ধান্দা শুরু কর। ওতে রোজগার অনেক বেশি।”

মান্টো এবার হাসলেন। আপনাদের বর্তমান অবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে বুঝি? আপনারা মি ঠু আন্দোলন করছেন সেটি আশার কথা। তবে নরীদেরকে পণ্য বানানোর সব রকম প্রক্রিয়া সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আপনার সুকৌশলে তৈরি করে রেখেছেন। শুধু আমাদের উপমহাদেশ বলে নয়, গোটা পৃথিবীতেই নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে এখনো আপনারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। মনে রাখতে হবে আমি যখন ‘লাইসেন্স’ লিখি তখন পাক ভারতে হিন্দু মুসলমান সমস্যা, নারীদের প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে হিসেবটিও আপনার মাথায় রাখতে হবে।

আপনাকে তো ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান হওয়ার পরও ‘ঠাণ্ডা গোশত’সহ আরো কয়েকটি গল্পের জন্যে অশ্লীলতার অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। আইনের বিশেষ ২৯২ ধারায় আপনাকে আদালতে উঠতে হয়েছিল। সেই দশা থেকে দেশের কতটা উত্তরণ ঘটেছে?

মান্টোকে দেখে এবার খুব উদাসীন মনে হলো। তিনি মাথা নিচু করে নিজের মাথাটি বার বার নাড়ছিলেন। শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন “ব্রিটিশদের কাছ থেকে দেশ স্বাধীন করে শালার কোনো লাভ হলো না। আমরা সেই ঠিক আগের জায়গাতেই রয়ে গেলাম। আমরা এখনো সভ্য হতে পারিনি। এখনো আমরা ধর্মের নামে মানুষ খুন করি। হিন্দু মুসলমান মারামারি কাটাকাটি লেগেই আছে। উগ্রবাদী মওলানারা ইসলামের দোহাই দিয়ে নিত্য নতুন ফতোয়া দিয়েই যাচ্ছে। ধর্মের নাম করে মেয়েদেরকে পুড়িয়ে মারছে। ওয়াহাবিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। লাথি মারি শালার এই স্বাধীনতাকে।”

আমি চোখ বন্ধ করে মান্টোর কথাগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ চোখ খুললাম। দেখি মান্টো নেই। তিনি আমার চোখের সামনে থেকে হঠাৎ করেই যেন উধাও হয়ে গেলেন। আমি হঠাৎ খুব অসহায় বোধ করলাম। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আমাকেও। দেখতে পেলাম আমি যেন দেখতে অবিকল এক স্বপ্নহীন রক্তশূন্য গিরগিটি! আমার গায়ে কোনো শক্তি নেই। প্রতিদিন পৃথিবীর সব নোংরামোকে হজম করে চলেছি। প্রতিদিন ভোর হয় আর আমিও যেন প্রমিথিউসের মতো নতুন জীবন খুঁজে পাই। তারপর আবার হিংস্র ঈগল আমাকে কুরে কুরে খায়। আমি আবার জীবনের কাছে নতজানু হয়ে প্রাণভিক্ষা করি। কী অসহনীয় আর যন্ত্রণাদায়ক জীবন আমার! আমি মানুষ হতে পারি না। আমি উন্মাদের মতো মান্টোকে খুঁজতে থাকি!

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

মান্টোর সঙ্গে একদিন

আদনান সৈয়দ

সাদাত হাসান মান্টো

বৃহস্পতিবার, ০১ জুলাই ২০২১

উর্দু কথাসাহিত্যিক হিসেবে সাদাত হাসান মান্টো দুনিয়া জুড়ে বিখ্যাত। একজন প্রতিবাদী লেখক হিসেবে তিনি পরিচিত। সমাজের অনাচার, নারী অধিকার, ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, মানব চরিত্রের বীভৎসতা, দেশ ভাগের আর্তনাদ তাঁর গ্রন্থে উঠে এসেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অশ্লীলতার দায়ে মান্টোকে ভারত এবং পাকিস্তানের আদালতে কাঠগড়ায় কয়েকবার দাঁড়াতে হয়েছিল। গত বছর কয়েক আগে বিবিসির জরিপে পৃথিবীর সেরা একশোটি গল্পের মধ্যে এ উপমহাদেশের লেখক সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ও স্থান পেয়েছে। সন্দেহ নেই এটি আমাদের জন্যে আনন্দের একটি ঘটনা। হোমারের ওডেসি, হেরিয়েট বেচার স্টোর ‘আংকল টমস কেবিন’, জর্জ ওরয়েল এর ‘নাইনটিন এইটিফোর’, শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর পাশে সাদাত হাসান মান্টোর গল্প পশ্চিমা বাঘা বাঘা সাহিত্যের মাঝে জায়গা করে নেওয়া মোটেও চাট্টিখানি কথা নয়।

আগেই বলেছি, যে গল্পগুলো মানুষকে ভাবায়, সমাজকে নতুন রূপে গড়তে সাহায্য করে- সেই মাপকাঠিতে মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ গল্পটি নির্বাচিত হওয়া খুব সময় উপযোগী এবং গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। বিবিসি শিল্প-সাহিত্য বিভাগকে সাধুবাদ জানাই এমন একটি মহতী উদ্যোগ হাতে নেওয়ার জন্যে। খুব জানতে ইচ্ছে করে, পশ্চিমা বিশ্ব মান্টোকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করলেও আমাদের উপমহাদেশে মান্টো কেমন আছেন? মান্টো তাঁর গল্পে সমাজে পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা বলেছেন, নারী অধিকার নিয়ে তাঁর লেখায় সবসময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। কিন্তু সমাজ পরিবর্তন করতে যে লড়াইকে তিনি তাঁর গল্পের মূল সারবস্তু তৈরি করেছিলেন সেই লড়াইয়ে তিনি কতটুকু জিততে পেরেছেন, তাও এক প্রশ্ন বৈকি! মান্টোর মৃত্যুর বহু বছর পরেও আমাদের সমাজ কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে এটাও ভাববার বিষয়। নারী অধিকার নিয়ে মান্টো তাঁর সাহিত্যের প্রতিটা শব্দে যে সরব হয়ে উঠেছিলেন তার কতটুকু তিনি সফল হয়েছেন সেটিও ভেবে দেখার সময় এখন।

সাদাত হাসান মান্টো জন্মগ্রহণ করেন ১৯১২ সালে। আর ১৯৫৫ সালে মহাপ্রস্থান। মাত্র ৪৩ বছরের জীবন তাঁর। সময়ের দিক থেকে সন্দেহাতীতভাবে সেটি ছিল আমাদের উপমহাদেশের জন্যে অশান্ত এক সময়। একদিকে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, ধর্মের নামে নারীদের উপর নির্যাতন- সব মিলিয়ে মান্টোর জন্ম সময়টা খুব একটা ভালো সময় ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই কুৎসিত সমাজের ছায়া পড়েছিল মান্টোর সাহিত্যেও। দেশ বিভাগের দাঙ্গা, আমাদের বুর্জোয়া সমাজের ভণ্ডামি এবং তাদের অপকর্ম নিয়ে মান্টো সারা জীবন লড়াই করেছেন, মান্টোর সাহিত্য অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ হয়েছে এবং এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিনি ভারত এবং পাকিস্তানের আদালতের কাঠগড়ায় পর্যন্ত দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু কখনো নতি স্বীকার করেননি। সালমান রুশদি তাঁকে আধুনিক ভারতীয় ছোটগল্পের অবিতর্কিত শ্রেষ্ঠ রূপকার (undisputed master of modern Indian short story) বলে শ্রদ্ধা জনিয়েছেন। লেখক খালিদ হাসান বলেছেন, ‘মান্টো শুধু আমাদের দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের নয়, সারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লেখকদের একজন।’ তাঁর বিখ্যাত গল্পের মধ্যে রয়েছে টোবাটেক সিং, তামাসা, ঠাণ্ডা গোস্ত, সালোয়ারের ফিতেয়, কালি সালোয়ার, খালি বোতল, ধোঁয়া ইত্যাদি। তাঁর রচনায় দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, দাংগা, মানব চরিত্রের বীভৎসতার চিত্র বার বার ঘুরেফিরে এসেছে। তাঁর স্বপ্ন ছিল প্রগিতিশীল চিন্তায় উজ্জীবিত হয়ে নতুন এক সমাজ। যে সমাজকে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছুঁতে পারবে না, যে সমাজে মানুষ হবে মুখ্য। প্রগতিশীল এই চিন্তাচেতনা তাঁর সাহিত্যে প্রবলভাবে চলে আসে। শুধু কথাসাহিত্য নয়, পাশাপাশি মান্টো চলচ্চিত্রেও নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। দেখতে পাই মুম্বাই চলচ্চিত্র জগতেও তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে। আট দিন, চল চলরে নওজোয়ান, মির্জা গালিব ইত্যাদি সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রয়েছে।

বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, ধর্মের নামে নারীদের উপর নির্যাতন- সব মিলিয়ে মান্টোর জন্ম-সময়টা খুব একটা ভালো ছিল না। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই কুৎসিত সমাজের ছায়া পড়েছিল মান্টোর সাহিত্যেও

এবার আসল কথায় আসি। সেদিন কাকতালীয়ভাবেই ঘটনা ঘটলো। মান্টোর সঙ্গে সাক্ষাত। সেটাও কী সম্ভব? সেদিন ম্যানহাটন ফিফথ এভিনিউর একটি জমজমাট পাবে বসে একা একাই গলা ভিজাচ্ছি। ঠিক তখনই ঘটলো ঘটানাটা। চোখের সামনেই দেখি হন হন করে এক মধ্য বয়সী ভদ্রলোক হেঁটে পাবে ঢুকছেন। তার মুখটি দেখতে অবিকল ঠিক সেই চেনা মুখটির মতোই। চোখে হালকা কালো ফ্রেমের চশমা। মাঝারি গড়ন। গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা। পায়ে কালো চামড়ায় ফিতে আঁটা চপ্পল। আর কাঁধে সেই পরিচিত ঝোলা ব্যাগ। আমাদের চোখাচোখি হতেই বলে ফেললাম, “মান্টো না? সাদাত হাসান মান্টো?” নিজের নাম শুনে ভদ্রলোক যেন একটু আঁতকে উঠলেন! সম্ভবত এই ম্যানহাটনের ফিরিঙ্গি পাড়ায় এভাবে কেউ মান্টো বলে চিৎকার দিবে তিনি তা ভাবতেও পারেননি। তিনি আমার দিকে মুখ গম্ভীর করে কপাল কুঁচকে খুব আস্তে মাথা ঝাঁকিয়ে শুধু বললেন, “হ্যাঁ, আমিই মান্টো। কিন্তু আপনি কে?” আমি এবার উঠে দাঁড়িয়ে মান্টোকে অভিবাদন জানালাম এবং আমার টেবিলের কোনার চেয়ারটায় বসার জন্যে ইঙ্গিত দিলাম। মান্টো কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন, তারপর আবারো সেই গম্ভীরমুখো হয়ে সোজা আমার টেবিলে এসে বসলেন। এবার আমরা মুখোমুখি। বুঝতে পারলাম কোনো কারণে তিনি খুব চিন্তিত বা মন খারাপ। এমনিতেই তাঁর অস্থির মন তার উপর নিশ্চয়ই কোনো বাজে রকম কিছু একটা ঘটেছে হয়তো। খুব বিনয়ের সঙ্গে বললাম “চলবে?”

মান্টো কোন শব্দ না করে শুধু বার কয়েক মাথা ঝাকালেন।

আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো এভাবেই।

ধর্মকে নিয়ে মানুষে মানুষে বৈষম্য আপনি দেখেছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ‘টোবাটেক সিং’ও লিখলেন। বর্তমান এই সময়ে আপনার সেই ধারনার পরিবর্তন ঘটেছে কি সাদাত হাসান মান্টো?

আমার প্রশ্ন শুনে মান্টো প্রথমে যেন একটু রেগে গেলেন! কিন্তু কী যেন একটা ভেবে তিনি মুচকি হেসে দিলেন। তারপর গলায় এক প্যাগ চালান দিয়ে বললেন, “আপনি আমাকে হাসালেন। আগে বলুন ধর্ম নিয়ে আমি সেই ১৯৪৩ সালে- যা লিখেছিলাম আমার সেই কথাগুলো এখন পর্যন্ত খাঁটি কিনা। এখন পর্যন্ত ধর্মই মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আমাদের গোটা উপমহাদেশের প্রায় সবকটা দেশের অবস্থাই এক রকম। ধর্ম নিয়ে মরামারি, ব্যবসা, কাটাকাটি আগেও ছিল, এখনও ঠিক আগের মতোই আছে। তবে আগের চেয়ে সমস্যাটা আরো প্রকট হয়েছে। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে মানুষ আগের চেয়েও বর্বর হয়ে গেছে। আগে হত্যাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। আর এখন হত্যা করা হয় ধর্মীও দোহাই দিয়ে। দেখুন, সিরিয়া ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, ইয়ামেন ধ্বংসস্তূপের শহর। খোদ ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় একদল উঠেপড়ে লেগেছে। সব দেখেশুনে আমি প্রায় সময়ই নিজেকে বলি, ‘মান্টো, তুই এই বদমাশদের থেকে অনেক আগেই ভেগেছিস, বেশ ভালো কাজটিই করেছিস।’ বাংলাদেশেও দেখি কাঠমোল্লাদের লম্ফ-ঝম্ফ। পাকিস্তান তো অনেক আগেই পচে গেছে। তবে আপনাদের এই যুগে আমি যদি বেঁচে থাকতাম তাহলে নির্ঘাৎ কাঠমোল্লাদের হাতেই আমার কল্লাটি যেত। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আচ্ছা, আপনার গল্পের নায়ক সবসময়ই নির্যাতিতদের পক্ষে কথা বলে, মধ্যবিত্তদের অন্তরে পোষণ করা জ্বালাযন্ত্রণাকে যেন উগরে দেয়। প্রখ্যাত উর্দু লেখক আলি সর্দার জাফরির এই মন্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন?

দেখুন, আমার গল্প নিয়ে তেমন কথা বলতে চাই না। তবে আপনার আগ্রহ প্রবল দেখেই বলছি। আমি বহুবার বহু জায়গায় এই কথাটি বলেছি। আবারো বলছি। এই গল্পগুলোর চরিত্র, জীবনযুদ্ধ, ভাষা সবই আমার খুব কাছ থেকে দেখা। বুঝলেন? আমার চোখের সামনে মানুষ খুন হতে দেখেছি। যে জীবন আমি জানি না সেই জীবন নিয়ে গল্প হয় কী করে? যে কারণে আমার গল্পের নায়ক-নায়িকারা যুদ্ধংদেহি। তারা সবসময় মারমুখো। তাদের মুখের ভাষা এই আপরনাদের ভদ্র সমাজের মানুষদের মতো ঠিক পরিশীলিত না। তারা রাস্তায় ঘুমায়, ফুলবাবু হয়ে গাড়িতে চড়ার লোভ তাদের হয় কিন্তু সুযোগ কখনো ঘটে না। সর্দার জাফরির সঙ্গে একমত না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।

তাহলে প্রশ্ন একটা থেকেই যায় প্রিয় লেখক! আপনার গল্পের পাত্র-পাত্রী এরা সবাই এত মারমুখো কেন? পাশাপাশি খুবই প্রতিশোধকামীও। একজন দালাল বেশ্যাদের অপমান করে নিজের ঝাল মেটায়, একজন হতাশাগ্রস্ত যুবক জীবনে কিছু না পেয়ে শুধুমাত্র কল্পনায় একজন প্রেমিকার ছবি আঁকেন। অবাক হই যখন এই বিক্ষিপ্ত চিত্রগুলো কোলাজ হয়ে আপনার গল্পের ফাঁদে এসে ধরা পড়ে।

গলায় আরেক প্যাগ ঢালতে ঢালতে মান্টো এবার চেয়ারে ঢেলান দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর দুই চোখের মোহনায় নাকের উৎসস্থল কুঞ্চিত করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “উপরে যতই শান্ত থাকুন না কেন, মনের ভেতরে যে দ্রোহটা নিত্য দাউ দাউ করে জ্বলছে সেটি কি সত্য নয়? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো দেখি এই সমাজ, রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র উৎপাদিত কলকব্জায় আপনি বা আমি বন্দি না? আপনার কি বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে করে না? এই সমাজকে ভেংগে নতুন করে গড়তে ইচ্ছে করে না? দেখুন, এই শতাব্দিতে যখন আপনারা নিজেদের সভ্য বলছেন তখন আমেরিকায় ট্রাম্পের মতো উগ্রবাদী লোক প্রেসিডেন্ট হচ্ছে। ভারতের মতো দেশে বিজেপি ক্ষমতায় বসছে! এসব কিসের লক্ষণ? গোটা পৃথিবী কি এখন এই দোজখের আগুনে পুড়ছে না? তখন যে কোনো বিবেকবান মানুষ কি প্রতিবাদী হবে না? আপনি হবেন না?”

লক্ষ্য করলাম মান্টো এবার যেন বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। তিনি যদি একবার রেগে যান তাহলে তাকে আর বশ মানানো যাবে না। সোজা উঠে হন হন করে হাঁটা দিবেন। তাই এবার অন্য রকম একটি প্রশ্ন করি। আচ্ছা! আপনাকে কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হলো? বয়স আর কতইবা হয়েছিল? মাত্র ৪৩। নিজের শরীরের কোনো খেয়াল আপনি করেননি। প্রচুর উল্টোপাল্টো গিলেছেন। হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই। এত পলায়ন ছিল আপনার মধ্যে?

মান্টোর গলা এখন ভারি হয়ে গেছে। মাথা দুলিয়ে এবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, “ঠিক এবার আসল জায়গায় আপনি ঝাকি দিয়েছেন। নাহ! প্রথম প্রথম বুঝতে পারিনি। নেশা করে শালার এই কুলাঙ্গার সমাজটা থেকে দূরে থাকতে চাইতাম। মনে হতো পলায়নই মুক্তির উপায়। কিন্তু মৃত্যু বিষয়টা যে এত ভয়াবহ তা আমি উপলব্ধি করতে পারিনি। বিশ্বাস করুন জীবনকে আমি ভালোবাসি। আমার স্ত্রীকে আমি ভালোবাসি। আমার কন্যাকে ভালোবাসি। আমি কেন মৃতু্যুকে ধীরে ধীরে আমার শরীরে বাসা বাঁধতে দিব? অথচ আমাকে কিনা চলে যেতে হলো? কিন্তু কাজ ছিল অনেক বাকি! একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট প্রায় শেষ করে ফেলেছিলাম। অথচ কোনো কাজই হলো না। আফসোস! বেশ মনে আছে আমি যখন হাসপাতালে তখন আমি বেশি পরিমাণ জীবনবাদী হয়ে গিয়েছিলাম। বাঁচার সাধ জাগতো। মেয়েটাকে দেখতাম। তাকে নিয়ে কত কল্পনা আমার! হায়! কী কঠিন এই জীবন। তারপরও মৃত্যুর কিছুদিন আগে স্ত্রীকে বলেছিলাম, “যদি জানতাম এত তাড়াতাড়ি আমি মৃত্যুর দিকে চলে যাবো তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করতাম না। তোমার এই দুর্দশার জন্যে শুধু আমিই দায়ী। আমাকে ক্ষমা করে দাও। তবে আমার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আমার টাঙ্গাঘোড়ার যতœ নিও। আর চান্নির মাথায় হাত বুলিয়ে বলো ওর বাবা ওকে অনেক ভালোবাসতো।” মান্টোর চোখে তখন জল।

আমরা দুজনই এবার কিছুক্ষণ চুপ হয়ে গেলাম। এক ভয়ানক নিস্তব্ধতা আমাদের দুজনের কাঁধেই যেন ভর করলো। আমি আবার সচল হয়ে উঠলাম। আবার প্রশ্ন। নারী অধিকারের চেয়ে বড় কথা হলো একজন মানুষের অধিকার। এই অধিকার নিয়ে আপনি আপনার গল্পে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। যে সমাজ নারীকে পণ্য ছাড়া আর কিছুই মনে করতো না সেই সমাজে আপনি নারীদের পক্ষ নিয়েছিলেন। আপনার ‘লাইসেন্স’ গল্পে বলেছেন, “মেয়েরা আজকাল অফিসে যায়, তারপর আবার বাড়িতেও হাজার কাজ করে। খেটেই তো খাব, এতে অসুবিধা কোথায়?” আপনার এই লেখার প্রায় ৭০ বছর পর আপনার এই মন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু?

প্রশ্নটা শুনে মান্টো একটু উদাস হয়ে গেলেন! কেন এমন উদাস হলেন কে জানে? নিশ্চয়ই কোনো স্মৃতি তার সামনে জ্বল জ্বল করে জ্বলে উঠছিল! হুম! নারী স্বাধীনতা! দেখুন সেদিনও পাকিস্তানের পাঞ্জাবের এক মুসলিম নারীকে কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে তার স্বামী বেদম প্রহার করে তাকে তালাক দিয়ে দিল। ভারত বলুন, বাংলাদেশ বলুন সর্বত্রই সেই একই দৃশ্য। বিষয়টা এমন যে কন্যা শিশু জন্ম দেওয়ার অপরাধ নারীর। পুরুষদের মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে। এ কথাও সত্য। তবে কেন জানি মনে হয় ভেতর থেকে যেভাবে পুরষোচিত মনোভাবের মূল উৎপাটন হওয়া উচিত ছিল সেভাবে এখনো হয়নি। এ যুগের হ্যাস মি ঠু (# Me too) আন্দোলন সেই কথাই প্রমাণ করে। ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশকে বাইরে রেখেও এ হিসাব কষতে অসুবিধা হয় না। নারীদের জীবনে সত্যিকার অর্থে কোনো স্বাধীনতা আসে নি। আপনি ঠিকই ধরেছেন। সবার আগে মানুষ তারপর নারী অথবা পুরুষ। আমি মানুষের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ধর্মের আগে মানুষ। মানুষের আগে ধর্ম নয়। কিন্তু নারীকে পুরুষ সমাজ কখনোই ভালো কোনো পদে দেখতে রাজি ছিল না। সেই আমাদের যুগে নয়, এমনকি এ যুগেও না। বর্তমান সময়েও দেখি নারীকে একটি বড় পদ বাগাতে কত যুদ্ধই না করতে হয়। কত কষ্টই না সহ্য করত হয়। অথচ আমরা এ যুগে অনেক বড় বড় কথা বলি। নারীবাদে উজ্জীবিত হয়ে মাইক ফাটাই। কিন্তু কি অবাক কাণ্ড! আমি আমার ‘লাইসেন্স’ উপন্যসে সেই আজ থেকে ৮৫ বছর আগে যে কথা বলেছিলাম, সে কথার পুনোরাবৃত্তি হচ্ছে এই আপানাদের আধুনিক যুগেও। লজ্জাজনক বটে!

‘লাইসেন্স’-এর সেই ডায়লগ এখনো আমাদের মনে দাগ কেটে আছে। আপনার লেখা থেকে একটু পড়ে শোনানোর লোভ সামলাতে পারছি না মান্টো- “হুজুর আমার টাঙ্গা-ঘোড়া সব কেড়ে নিন। কিন্তু আমাকে বলুন মেয়েরা যদি চরকা চালাতে পারে, কয়লা কাটতে পারে, ঝুড়ি বুনতে পারে তাহলে আমি টাঙ্গা চালালে অসুবিধা কোথায়? হুজুর আমার ওপর দয়া করুন, এভাবে আমার রুটি কেড়ে নেবেন না। আমি কীভাবে রোজগার করব তা দয়া করে বলুন!” শহরের কমিটি তাকে উত্তর দিল, “বাজারে গিয়ে ধান্দা শুরু কর। ওতে রোজগার অনেক বেশি।”

মান্টো এবার হাসলেন। আপনাদের বর্তমান অবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে বুঝি? আপনারা মি ঠু আন্দোলন করছেন সেটি আশার কথা। তবে নরীদেরকে পণ্য বানানোর সব রকম প্রক্রিয়া সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আপনার সুকৌশলে তৈরি করে রেখেছেন। শুধু আমাদের উপমহাদেশ বলে নয়, গোটা পৃথিবীতেই নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে এখনো আপনারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন। মনে রাখতে হবে আমি যখন ‘লাইসেন্স’ লিখি তখন পাক ভারতে হিন্দু মুসলমান সমস্যা, নারীদের প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল সে হিসেবটিও আপনার মাথায় রাখতে হবে।

আপনাকে তো ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান হওয়ার পরও ‘ঠাণ্ডা গোশত’সহ আরো কয়েকটি গল্পের জন্যে অশ্লীলতার অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল। আইনের বিশেষ ২৯২ ধারায় আপনাকে আদালতে উঠতে হয়েছিল। সেই দশা থেকে দেশের কতটা উত্তরণ ঘটেছে?

মান্টোকে দেখে এবার খুব উদাসীন মনে হলো। তিনি মাথা নিচু করে নিজের মাথাটি বার বার নাড়ছিলেন। শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন “ব্রিটিশদের কাছ থেকে দেশ স্বাধীন করে শালার কোনো লাভ হলো না। আমরা সেই ঠিক আগের জায়গাতেই রয়ে গেলাম। আমরা এখনো সভ্য হতে পারিনি। এখনো আমরা ধর্মের নামে মানুষ খুন করি। হিন্দু মুসলমান মারামারি কাটাকাটি লেগেই আছে। উগ্রবাদী মওলানারা ইসলামের দোহাই দিয়ে নিত্য নতুন ফতোয়া দিয়েই যাচ্ছে। ধর্মের নাম করে মেয়েদেরকে পুড়িয়ে মারছে। ওয়াহাবিরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। লাথি মারি শালার এই স্বাধীনতাকে।”

আমি চোখ বন্ধ করে মান্টোর কথাগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ চোখ খুললাম। দেখি মান্টো নেই। তিনি আমার চোখের সামনে থেকে হঠাৎ করেই যেন উধাও হয়ে গেলেন। আমি হঠাৎ খুব অসহায় বোধ করলাম। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আমাকেও। দেখতে পেলাম আমি যেন দেখতে অবিকল এক স্বপ্নহীন রক্তশূন্য গিরগিটি! আমার গায়ে কোনো শক্তি নেই। প্রতিদিন পৃথিবীর সব নোংরামোকে হজম করে চলেছি। প্রতিদিন ভোর হয় আর আমিও যেন প্রমিথিউসের মতো নতুন জীবন খুঁজে পাই। তারপর আবার হিংস্র ঈগল আমাকে কুরে কুরে খায়। আমি আবার জীবনের কাছে নতজানু হয়ে প্রাণভিক্ষা করি। কী অসহনীয় আর যন্ত্রণাদায়ক জীবন আমার! আমি মানুষ হতে পারি না। আমি উন্মাদের মতো মান্টোকে খুঁজতে থাকি!

back to top