alt

সাময়িকী

কবি নূরুল হক তাঁর স্মৃতি ও কবিতা

রহিমা আখতার কল্পনা

: বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১

কবি নূরুল হক / জন্ম : ১৯৪৪; মৃত্যু : ২২ জুলাই ২০২১

পৃথিবীর নানান দেশের মতো বাংলাদেশেও সৃজনশীল রচনার ক্ষেত্রে রচয়িতাকে দশকের বিবেচনায় চিহ্নিত করা হয়। মোটামুটিভাবে লেখকের জন্মতারিখ বা বয়স এবং নিজস্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর বিকাশের সূচনাকালকে ধরে একটা মোটাদাগে তাঁর অস্তিত্বকে দশকওয়ারী একটা পরিচিতি দেওয়া হয়। এই মানদণ্ডের আবিষ্কর্তা যে কে বা কারা, আর কেনইবা এই দশক-গণ্ডি সৃজনশীল ব্যক্তিদের বিশেষত লেখকগোষ্ঠীর জন্য অপরিহার্য- এ এক জটিল জিজ্ঞাসা। আমি অনেক অন্বেষণেও এর উত্তর পাইনি। যাক, ১৯৪২ সালে (কেউ কেউ বলছেন ১৯৪৪ সালে) জন্ম নেওয়া কবি নূরুল হক সম্পর্কে আজ কিছু কথা লিখতে বসে এই প্রবল জিজ্ঞাসাটা আমাকে আবারও আলোড়িত করছে।

কবি নূরুল হকের জন্ম-সমসাময়িক কবিরা বিশ শতকের ষাটের দশকের কবি বলে চিহ্নিত। তাঁদের সৃজনশীলতার সূচনা এবং বিকাশকাল মোটামুটি একই সময়ে, দু’চার বছরের এদিক ওদিক হতে পারে। তাদের মধ্যে অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত কবি, কারো কারো নামের সঙ্গে এক বা একাধিক স্ব-আরোপিত বা পোষ্য ভক্তকুলের আরোপিত পদবি জ্বলজ্বল করছে। সমস্ত স্বীকৃতি, পুরস্কার, পদ-পদবীর পরেও এ আরেক অভিনব বাড়তি প্রাপ্তি। যেন তাঁরা শুধু ‘কবি’ (যা সৃজনের অসামান্য বিস্তারের দ্যোতক) অভিধায় চিহ্নিত হয়ে নিজেকে যথেষ্ট সম্মানিত বা সম্পূর্ণ বোধ করছেন না। কোনো একটি পদবীতে নিজের কবিপ্রতিভাকে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে বন্দি করে, নিজের সুবিশাল কবিপ্রতিভাকে খ-িত করতে ভালোবাসছেন। এসব তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। আমি বলছি তাঁদেরই একজন সমসাময়িক সহযোদ্ধার কথা। যিনি যথেষ্ট ঋদ্ধ, গভীর জীবনদর্শনের কবি, তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর চিন্তার কবি। তাঁর কবিতার ভাষা আশ্চর্যজনকভাবে মেদহীন ও যথাশব্দে পরিমিত। কিন্তু তিনি খুব আলোচিত কবি নন। ‘প্রতিষ্ঠিত’ শব্দটি যদিও আপেক্ষিক, কিন্তু মোটাদাগের বিভাজনে তিনি ‘না-প্রতিষ্ঠিত’দের দলেই পড়বেন। এরকম সৃজনশীলদের সাধারণত মানুষ ‘নিভৃত লেখক বা কবি বা ‘গুণী’ আখ্যা দিয়ে সম্মান জানায়। আমি নিজেও খানিকটা এই গোত্রের। কবি হিসেবে তাঁর যতোখানি মেধা, অন্তত সে মাত্রার খ্যাতি তিনি পাননি।

তাঁর কবিতার ভাষা আশ্চর্যজনকভাবে মেদহীন ও যথাশব্দে পরিমিত। কিন্তু তিনি খুব আলোচিত কবি নন। ‘প্রতিষ্ঠিত’ শব্দটি যদিও আপেক্ষিক, কিন্তু মোটাদাগের বিভাজনে তিনি ‘না-প্রতিষ্ঠিত’দের দলেই পড়বেন। এরকম সৃজনশীলদের সাধারণত মানুষ নিভৃত লেখক বা কবি বা গুণী আখ্যা দিয়ে সম্মান জানায়

কারণ তিনি ভালো কবিতা লেখার পাশাপাশি কবিতাকে সর্বদুয়ারে পৌঁছে দিতে বা এর বাণিজ্যে সফল হতে পারেননি। শোনা যায়, এ ব্যাপারে নাকি তাঁর আগ্রহই ছিলো খুব কম। অতি বিনয়ী এই কবি ভাবতেন যে, তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নতুন কিছু সংযোজন করতে না পারলে কেন সেই কবিতা প্রকাশ করবেন!

এরকম একটা বিষয় সচরাচর ভাবা যায়? বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে জন্ম নেয়া আর একবিংশ শতাব্দীর প্রায় সিকি শতাব্দী ছুঁয়ে ফেলা একজন কবির এতোখানি আত্ম-সংযম!

অনুমান হয় যে, ঠিক এই আত্ম-সংযমের কারণেই তিনি বিশ শতকের ষাটের দশকের সীমানার মানুষ হলেও তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে একুশ শতকের শূন্য দশকে। এখন আমরা তাঁকে কোন শতকের কোন দশকের কবি বলে চিনবো? কবিতার জন্য দশক-বিভাজন জরুরি, নাকি কবিতার বৈশিষ্ট্য? আলোচ্য কবি কিন্তু দীর্ঘকালের ব্যবধানে এই চমকিত (এবং জটিলভাবে অ-গতানুগতিক) আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে তাঁর স্বতন্ত্র স্বরটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সহজেই পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন তাঁর রচনার বিশিষ্টতাও। তাঁর কবিতা সম্পর্কে কয়েকজন লেখকের মূল্যায়ন-

“নূরুল হক আমাদের কবিতাজগতের এক স্বতন্ত্র নাম। গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশের কবিতায় তাঁর উজ্জ্বল আবির্ভাব। ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’-সহ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থে কবি হিসেবে নূরুল হকের অনন্যতার স্বাক্ষর রয়েছে।” -মুহম্মদ নূরুল হুদা, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।

“২০২০-এর বইমেলা।... চৈতন্যের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আমি। কিছু করার নেই। বই দেখছি। একটা বই চোখে পড়ল। নান্দনিক প্রচ্ছদ। কবি নূরুল হকের ‘কবিতাসমগ্র’। নাম শুনিনি কখনো।... পাতা উল্টাতেই বিস্ময়! এমন মেদহীন, ভারি ভারি শব্দের বাহুল্যহীন, ছিপছিপে আঙ্গিকের কবিতা এই কবি লিখে গেছেন! স্পেসের ব্যবহার তো অতুলনীয়! কবিতা পড়ছি আর মনে হচ্ছে এই সময়ের লেখা বা সময়ের আগেই কবি লিখে গেছেন। সহজিয়া স্বরে গভীর দর্শনের আভাস...” -ইশরাত তানিয়া, তরুণ কথাসাহিত্যিক।

“যদিও এ নামের কোনও কবির কবিতা আমি কখনও পড়িনি, নামও কখনও শুনিনি।... উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে নূরুল হকের একগুচ্ছ কবিতা পেলাম। একটু পড়েই চমকে উঠলাম, আরেব্বাস, এ তো একদম আত্মার গভীরে নাড়া দেয়!” কবি নূরুল হক/ নকীব ফিরোজ।

কবি নূরুল হকের প্রথম কবিতার বই ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে, তাঁর ৬৫/৬৩ বছর বয়সে। তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য বই ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’, ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প’, ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’, ‘এ জীবন খসড়া জীবন’, ‘কবিতাসমগ্র’ এবং ‘কবিতার দিকে একজন; শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়’।

প্রথম কাব্য ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ থেকেই তাঁর স্বতন্ত্র স্বরের সন্ধান মেলে। তাঁর কাব্যভাষা সমসাময়িক কবিদের তুলনায় আলাদা এবং লক্ষযোগ্যভাবে পরিমিত। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে কবির একান্ত কবিতা-চর্চার প্রথম ফসল এই কাব্যে তিনি নিজেকে, নিজের আত্মার ক্রন্দনকে উন্মোচিত করেন এভাবে-

“সবই জানি, তোমার অন্তর্গত শব্দ

আর ছিন্নভিন্ন শরীর

এখন মলিন ধুলোয় ঢাকা।

এখন সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়, শিরায়।

মাটির নীচে লুকিয়েছিল যে বিষ

তা ক্রমে ওপরে উঠে আসছে।”

(জানি/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’ এসে তাঁর স্বাতন্ত্র্য আরো স্পষ্ট। এখানে খুবই ব্যতিক্রম তাঁর কবিতার নামায়ন। ‘কলেমায়ে জুম্মাবার’। এই কবিতায় তাঁর উপলব্ধি-

“দুপুরবেলার রোদ

কোথাও ঢালভূমি খুঁজছে

জুম্মার নামাজের পর।

গাছগাছালির নীচে

এক এক খ- ছায়া

যেন এক একটি দোয়া।

যেন শান্তি, স্নিগ্ধতা

আর আয়াত দিয়ে

তৈরি

পালক

ভাসিয়ে উড়ছে একটা পাখি

নীল রৌদ্রে।”

কবি নূরুল হকের একান্ত নিজস্ব উচ্চারণ-

“ভোরবেলাটা আমার শাকভাত,

প্রতিদিন পাই

গরিবের ঘরে।”

কী আশ্চর্য পরিমিতির ভেতরে কতো গভীর জীবন-উপলব্ধির কথা বলেছেন তিনি! সহজে পাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য কী মোক্ষম উপমায় জীবনের মৌলিক প্রাপ্তির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। এই ভোরবেলা, এই শাকভাত আমারও সহজে পাওয়া ধন, কিন্তু কখনও কি ভেবেছি এই ভোরবেলাটার সর্বচারিতার কথা, এর সর্বজনীনতার মাহাত্ম্য! এই অপার্থিব ভোর নিরন্নজনের থালায় অন্ন হয়ে প্রতিদিন আলো ছড়িয়ে দেয়। এই কবিতা তখন বড়ো কাছের, বড়ো সহজেই আত্মীয়তায় বেঁধে ফেলে পাঠককে।

কবি নূরুল হকের আরেকটি দারুণ অর্থবহ কবিতা ‘জীবন এক অপূর্ব দৃশ্য’তে তিনি বলছেন-

“জীবন এক অপূর্ব দৃশ্য,

যা দেখে মানুষ

বাড়ি ফেরার কথা

ভুলে যায়।”

এই ‘অপূর্ব দৃশ্য’ আজীবন খোঁজে সৃজনশীল মানুষ। দীর্ঘ এক জীবনের কোন মাহেন্দ্রক্ষণে এই হতাশা-ভুলানিয়া, দৈন্য-তারণ রূপময় দৃশ্য তার চোখে ধরা দেবে, কেউ জানে না। তবে কবি নূরুল হক জীবনের এই অপূর্ব দৃশ্যের দেখা পেয়েছেন বলে মনে হয়। আর তাই তাঁর অনুভবে ঋদ্ধ এই কবিতা পড়ামাত্র গ্লানিময় জীবনেও অপূর্ব দৃশ্য মিলে যাওয়ার আশা জাগে। এই দীন দীর্ণ বেদনার্ত জীবনও হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ। হয়ে ওঠে আশা ভালোবাসাময়।

তাঁর আরো কিছু মন্ময় কবিতাংশ-

*বুদ্ধপূর্ণিমা

‘আগুনমুখায়

এই মহানদীর পারে

একদিকে বুদ্ধের চাঁদ

অন্যদিকে আমি,

মাঝখানে থ্রি-পিস জগৎ

আকাশ, জমিন এবং মৃত্যুলোক।

তবে কি মানুষের জীবনটাই

একটা পরমার্থিক ভ্রমণ।’

*দূরত্ব

‘এমনভাবে কথা বলছিলে

যেন তোমার ঠোঁট থেকে পৃথক

হয়ে-যাওয়া শব্দগুলো

আঙুরগুচ্ছের মতো

থোকায়

থোকায়

বাতাসে দুলছিল

এবং দুলছিল।

সবদিকে পাতা নড়ছিল জীবনের।

তক্ষুনি

কোথা থেকে একটা চতুষ্পদ কী যেন এসে

আস্তে করে ওই শব্দগুলোর ওপর দিয়ে

হর্ন বাজিয়ে চলে গেল।’

“আত্মজীবনী” কবিতায় তাঁর দীর্ঘ যাপিত জীবনের নির্যাস-

“যে বিষয় আমি জানি না

সে বিষয়ে আমি

কাটিয়ে দিয়েছি

জীবন।

কত কাঁটা-ভরা দিন আমাকে

জাবড়ে ধরেছে

আর পিছলে গিয়েছি

মানুষ থেকে

মানুষে।”

মৃত্যু-বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মনোভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে ‘সমস্যা’ কবিতায়-

“মৃত্যুতে আমার কোনো সমস্যা নেই

কারণ

জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে

তাতেই তো বসবাস করি

তাই

মৃত্যুতে আমার কোনো গড়িমসি নেই

যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি

কিন্তু

মৃত্যু হলে

পৃথিবীটা ঠিকঠাক চলছে কিনা

তা জানব কী করে?

এই যা সমস্যা।”

মৃত্যুতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরেও এই ভালোবাসার পৃথিবীটার কুশল জানতে উদগ্রীব কবি। এ যেন জন্মান্তরের তৃষ্ণা। আজকের বাস্তবতায় দুঃখী, অসুস্থ, বিশ্বমারী-আক্রান্ত আমাদের এই পৃথিবীর বড়ো প্রয়োজন ছিলো তাঁর মতো স্থিরচিত্ত, প্রাজ্ঞ মানুষের। অথচ তিনি বিদায় নিলেন নির্মম মহামারীরই ছোবলে।

কবি নূরুল হকের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে যারা লিখছেন, তাঁদের বেশিরভাগই ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে চিনতেন না বা তেমন একটা জানতেন না বলে জানাচ্ছেন। তাঁর কবিতাই তাঁর পরিচয়। এটা একজন লেখকের জন্য সম্মানের বিষয়। তবে আমি তাঁকে দীর্ঘকাল আগে থেকে চিনি, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁর সঙ্গে সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক-সূত্রে কিছু কথা বলছি।

মানুষ হিসেবে কবি নূরুল হক শ্রদ্ধার্হ। নিরহংকার, নির্বিরোধ ও অমায়িক।

মূলত এই ব্যক্তি-মানুষটাকে নিয়ে খানিকটা আলোচনা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করবো। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি, করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২২ জুলাই ২০২১ বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া চারটায় ৭৭ বছর বয়সে মারা গেছেন কবি নূরুল হক। তাঁর সম্পর্কে কিছু আবশ্যিক তথ্য দেই।

১৯৪৪ সালে নেত্রকোনার মদন উপজেলার বালালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি নূরুল হক। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে একটি বামপন্থী গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অবদান রাখেন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন সরকারি কলেজের সফল ও সম্মানিত শিক্ষক।

১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতায় কাটে দীর্ঘ কর্মজীবন। এরই মধ্যে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে ঢাকার ইডেন সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে ২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর-উত্তর সময়ে তিনি সাহিত্য-চর্চায় নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়েছিলেন।

কবি নূরুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। তিনি আমার বড়ো ভাই অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী ভূঁইয়ার বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তাঁকে চিনতাম। তবে উনার সঙ্গে সরাসরি গবেষণা-কাজের সুযোগ হয় ১৯৮৭ সালে, বাংলা একাডেমি পরিচালিত ‘ন্যাশনাল ফোকলোর ওয়ার্কশপ’-এ অংশ নেয়ার সুবাদে। তিন সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত সেই ওয়ার্কশপে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোর-বিশারদগণ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ফিনল্যান্ড থেকে প্রফেসর লাওরি হংকো, আমেরিকা থেকে তৎকালে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর (বর্তমানে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর) হেনরি গ্লাসি, প্রফেসর অ্যালেন ডান্ডেস, ভারতের মাইসোর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জওহরলাল হান্ডু, প্রফেসর তুষার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। সকলেই বিশ্বমানের অধ্যাপক। সঙ্গে বাংলাদেশের ফোকলোর বিষয়ের সকল পণ্ডিত ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, ডঃ মযহারুল ইসলাম, প্রফেসর ওয়াকিল আহমেদ, অধ্যাপক যতীন সরকার, শামসুজ্জামান খান, মোহাম্মদ সাইদুর, ডঃ হামিদা হোসেন, নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, পারভীন আহমেদ প্রমুখ।

এই ওয়ার্কশপে প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকগণ, রেডিও এবং টেলিভিশনের নির্বাচিত কিছুসংখ্যক প্রডিউসার ও প্রোগ্রাম অর্গানাইজার, কিছুসংখ্যক সিলেক্টেড সাংবাদিক এবং অতি অল্পসংখ্যক স্কলার ছাত্রছাত্রী। আমি নির্বাচিত হয়েছিলাম শেষোক্ত ক্যাটাগরিতে, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে সদ্য অনার্স পাস করেছি। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিভাগের অনার্সে শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র হিসাবে কর্তৃপক্ষ আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। ওই ওয়ার্কশপে নূরুল হক ভাই অংশ নেন সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে। ওয়ার্কশপের শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থী টিমকে তখন সরেজমিন (প্র্যাকটিক্যাল) ক্লাস এবং ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো। অত্যন্ত আনন্দঘন সেই দিনগুলোতে আমরা প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষকেরা একটা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হই। তখনকার একটা ছবি হাতের কাছে পেয়েছি, দিলাম। ঠিক সামনের সারিতে নিচে বসা আছেন কবি নূরুল হক (বাম দিক থেকে তৃতীয়)।

পরের বছর ১৯৮৮ সালের ‘দ্বিতীয় জাতীয় ফোকলোর কর্মশালা’তেও নূরুল হক ভাই অংশ নেন। আমিও। সেসময়কার অনেক কথা মনে পড়ছে আজ। ১৯৮৮-র কর্মশালার কিছুকাল পরে এম. এ পাস করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেই। তারপরও অনেকবারই নূরুল হক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে তিনি বাংলা একাডেমিতে আসতেন। নেত্রকোনা সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান থাকাকালেও এসেছেন। কিন্তু নানা পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ফোকলোর বিষয়ে কাজ করার জন্য কেন যেন তিনি আর তেমন আগ্রহী বা সক্রিয় ছিলেন না। নিজের কবিতা নিয়েও খুব একটা আলোচনা করতেন না। গত কয়েক বছর যাবত তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিলো না। আজ সেই নিভৃতচারী কবি, অগ্রজতুল্য নূরুল হক ভাইয়ের কবিতার সামান্য আলোচনা আর তাঁর স্মৃতি নিয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

কবি নূরুল হক তাঁর স্মৃতি ও কবিতা

রহিমা আখতার কল্পনা

কবি নূরুল হক / জন্ম : ১৯৪৪; মৃত্যু : ২২ জুলাই ২০২১

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১

পৃথিবীর নানান দেশের মতো বাংলাদেশেও সৃজনশীল রচনার ক্ষেত্রে রচয়িতাকে দশকের বিবেচনায় চিহ্নিত করা হয়। মোটামুটিভাবে লেখকের জন্মতারিখ বা বয়স এবং নিজস্ব সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর বিকাশের সূচনাকালকে ধরে একটা মোটাদাগে তাঁর অস্তিত্বকে দশকওয়ারী একটা পরিচিতি দেওয়া হয়। এই মানদণ্ডের আবিষ্কর্তা যে কে বা কারা, আর কেনইবা এই দশক-গণ্ডি সৃজনশীল ব্যক্তিদের বিশেষত লেখকগোষ্ঠীর জন্য অপরিহার্য- এ এক জটিল জিজ্ঞাসা। আমি অনেক অন্বেষণেও এর উত্তর পাইনি। যাক, ১৯৪২ সালে (কেউ কেউ বলছেন ১৯৪৪ সালে) জন্ম নেওয়া কবি নূরুল হক সম্পর্কে আজ কিছু কথা লিখতে বসে এই প্রবল জিজ্ঞাসাটা আমাকে আবারও আলোড়িত করছে।

কবি নূরুল হকের জন্ম-সমসাময়িক কবিরা বিশ শতকের ষাটের দশকের কবি বলে চিহ্নিত। তাঁদের সৃজনশীলতার সূচনা এবং বিকাশকাল মোটামুটি একই সময়ে, দু’চার বছরের এদিক ওদিক হতে পারে। তাদের মধ্যে অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত কবি, কারো কারো নামের সঙ্গে এক বা একাধিক স্ব-আরোপিত বা পোষ্য ভক্তকুলের আরোপিত পদবি জ্বলজ্বল করছে। সমস্ত স্বীকৃতি, পুরস্কার, পদ-পদবীর পরেও এ আরেক অভিনব বাড়তি প্রাপ্তি। যেন তাঁরা শুধু ‘কবি’ (যা সৃজনের অসামান্য বিস্তারের দ্যোতক) অভিধায় চিহ্নিত হয়ে নিজেকে যথেষ্ট সম্মানিত বা সম্পূর্ণ বোধ করছেন না। কোনো একটি পদবীতে নিজের কবিপ্রতিভাকে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে বন্দি করে, নিজের সুবিশাল কবিপ্রতিভাকে খ-িত করতে ভালোবাসছেন। এসব তাঁদের নিজস্ব ব্যাপার। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। আমি বলছি তাঁদেরই একজন সমসাময়িক সহযোদ্ধার কথা। যিনি যথেষ্ট ঋদ্ধ, গভীর জীবনদর্শনের কবি, তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর চিন্তার কবি। তাঁর কবিতার ভাষা আশ্চর্যজনকভাবে মেদহীন ও যথাশব্দে পরিমিত। কিন্তু তিনি খুব আলোচিত কবি নন। ‘প্রতিষ্ঠিত’ শব্দটি যদিও আপেক্ষিক, কিন্তু মোটাদাগের বিভাজনে তিনি ‘না-প্রতিষ্ঠিত’দের দলেই পড়বেন। এরকম সৃজনশীলদের সাধারণত মানুষ ‘নিভৃত লেখক বা কবি বা ‘গুণী’ আখ্যা দিয়ে সম্মান জানায়। আমি নিজেও খানিকটা এই গোত্রের। কবি হিসেবে তাঁর যতোখানি মেধা, অন্তত সে মাত্রার খ্যাতি তিনি পাননি।

তাঁর কবিতার ভাষা আশ্চর্যজনকভাবে মেদহীন ও যথাশব্দে পরিমিত। কিন্তু তিনি খুব আলোচিত কবি নন। ‘প্রতিষ্ঠিত’ শব্দটি যদিও আপেক্ষিক, কিন্তু মোটাদাগের বিভাজনে তিনি ‘না-প্রতিষ্ঠিত’দের দলেই পড়বেন। এরকম সৃজনশীলদের সাধারণত মানুষ নিভৃত লেখক বা কবি বা গুণী আখ্যা দিয়ে সম্মান জানায়

কারণ তিনি ভালো কবিতা লেখার পাশাপাশি কবিতাকে সর্বদুয়ারে পৌঁছে দিতে বা এর বাণিজ্যে সফল হতে পারেননি। শোনা যায়, এ ব্যাপারে নাকি তাঁর আগ্রহই ছিলো খুব কম। অতি বিনয়ী এই কবি ভাবতেন যে, তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নতুন কিছু সংযোজন করতে না পারলে কেন সেই কবিতা প্রকাশ করবেন!

এরকম একটা বিষয় সচরাচর ভাবা যায়? বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে জন্ম নেয়া আর একবিংশ শতাব্দীর প্রায় সিকি শতাব্দী ছুঁয়ে ফেলা একজন কবির এতোখানি আত্ম-সংযম!

অনুমান হয় যে, ঠিক এই আত্ম-সংযমের কারণেই তিনি বিশ শতকের ষাটের দশকের সীমানার মানুষ হলেও তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে একুশ শতকের শূন্য দশকে। এখন আমরা তাঁকে কোন শতকের কোন দশকের কবি বলে চিনবো? কবিতার জন্য দশক-বিভাজন জরুরি, নাকি কবিতার বৈশিষ্ট্য? আলোচ্য কবি কিন্তু দীর্ঘকালের ব্যবধানে এই চমকিত (এবং জটিলভাবে অ-গতানুগতিক) আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে তাঁর স্বতন্ত্র স্বরটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সহজেই পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন তাঁর রচনার বিশিষ্টতাও। তাঁর কবিতা সম্পর্কে কয়েকজন লেখকের মূল্যায়ন-

“নূরুল হক আমাদের কবিতাজগতের এক স্বতন্ত্র নাম। গত শতকের ষাটের দশকে বাংলাদেশের কবিতায় তাঁর উজ্জ্বল আবির্ভাব। ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’-সহ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থে কবি হিসেবে নূরুল হকের অনন্যতার স্বাক্ষর রয়েছে।” -মুহম্মদ নূরুল হুদা, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।

“২০২০-এর বইমেলা।... চৈতন্যের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আমি। কিছু করার নেই। বই দেখছি। একটা বই চোখে পড়ল। নান্দনিক প্রচ্ছদ। কবি নূরুল হকের ‘কবিতাসমগ্র’। নাম শুনিনি কখনো।... পাতা উল্টাতেই বিস্ময়! এমন মেদহীন, ভারি ভারি শব্দের বাহুল্যহীন, ছিপছিপে আঙ্গিকের কবিতা এই কবি লিখে গেছেন! স্পেসের ব্যবহার তো অতুলনীয়! কবিতা পড়ছি আর মনে হচ্ছে এই সময়ের লেখা বা সময়ের আগেই কবি লিখে গেছেন। সহজিয়া স্বরে গভীর দর্শনের আভাস...” -ইশরাত তানিয়া, তরুণ কথাসাহিত্যিক।

“যদিও এ নামের কোনও কবির কবিতা আমি কখনও পড়িনি, নামও কখনও শুনিনি।... উল্টেপাল্টে দেখতে গিয়ে নূরুল হকের একগুচ্ছ কবিতা পেলাম। একটু পড়েই চমকে উঠলাম, আরেব্বাস, এ তো একদম আত্মার গভীরে নাড়া দেয়!” কবি নূরুল হক/ নকীব ফিরোজ।

কবি নূরুল হকের প্রথম কবিতার বই ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে, তাঁর ৬৫/৬৩ বছর বয়সে। তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য বই ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’, ‘মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প’, ‘শাহবাগ থেকে মালোপাড়া’, ‘এ জীবন খসড়া জীবন’, ‘কবিতাসমগ্র’ এবং ‘কবিতার দিকে একজন; শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়’।

প্রথম কাব্য ‘সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়’ থেকেই তাঁর স্বতন্ত্র স্বরের সন্ধান মেলে। তাঁর কাব্যভাষা সমসাময়িক কবিদের তুলনায় আলাদা এবং লক্ষযোগ্যভাবে পরিমিত। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে কবির একান্ত কবিতা-চর্চার প্রথম ফসল এই কাব্যে তিনি নিজেকে, নিজের আত্মার ক্রন্দনকে উন্মোচিত করেন এভাবে-

“সবই জানি, তোমার অন্তর্গত শব্দ

আর ছিন্নভিন্ন শরীর

এখন মলিন ধুলোয় ঢাকা।

এখন সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়, শিরায়।

মাটির নীচে লুকিয়েছিল যে বিষ

তা ক্রমে ওপরে উঠে আসছে।”

(জানি/সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায়)

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘একটি গাছের পদপ্রান্তে’ এসে তাঁর স্বাতন্ত্র্য আরো স্পষ্ট। এখানে খুবই ব্যতিক্রম তাঁর কবিতার নামায়ন। ‘কলেমায়ে জুম্মাবার’। এই কবিতায় তাঁর উপলব্ধি-

“দুপুরবেলার রোদ

কোথাও ঢালভূমি খুঁজছে

জুম্মার নামাজের পর।

গাছগাছালির নীচে

এক এক খ- ছায়া

যেন এক একটি দোয়া।

যেন শান্তি, স্নিগ্ধতা

আর আয়াত দিয়ে

তৈরি

পালক

ভাসিয়ে উড়ছে একটা পাখি

নীল রৌদ্রে।”

কবি নূরুল হকের একান্ত নিজস্ব উচ্চারণ-

“ভোরবেলাটা আমার শাকভাত,

প্রতিদিন পাই

গরিবের ঘরে।”

কী আশ্চর্য পরিমিতির ভেতরে কতো গভীর জীবন-উপলব্ধির কথা বলেছেন তিনি! সহজে পাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য কী মোক্ষম উপমায় জীবনের মৌলিক প্রাপ্তির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। এই ভোরবেলা, এই শাকভাত আমারও সহজে পাওয়া ধন, কিন্তু কখনও কি ভেবেছি এই ভোরবেলাটার সর্বচারিতার কথা, এর সর্বজনীনতার মাহাত্ম্য! এই অপার্থিব ভোর নিরন্নজনের থালায় অন্ন হয়ে প্রতিদিন আলো ছড়িয়ে দেয়। এই কবিতা তখন বড়ো কাছের, বড়ো সহজেই আত্মীয়তায় বেঁধে ফেলে পাঠককে।

কবি নূরুল হকের আরেকটি দারুণ অর্থবহ কবিতা ‘জীবন এক অপূর্ব দৃশ্য’তে তিনি বলছেন-

“জীবন এক অপূর্ব দৃশ্য,

যা দেখে মানুষ

বাড়ি ফেরার কথা

ভুলে যায়।”

এই ‘অপূর্ব দৃশ্য’ আজীবন খোঁজে সৃজনশীল মানুষ। দীর্ঘ এক জীবনের কোন মাহেন্দ্রক্ষণে এই হতাশা-ভুলানিয়া, দৈন্য-তারণ রূপময় দৃশ্য তার চোখে ধরা দেবে, কেউ জানে না। তবে কবি নূরুল হক জীবনের এই অপূর্ব দৃশ্যের দেখা পেয়েছেন বলে মনে হয়। আর তাই তাঁর অনুভবে ঋদ্ধ এই কবিতা পড়ামাত্র গ্লানিময় জীবনেও অপূর্ব দৃশ্য মিলে যাওয়ার আশা জাগে। এই দীন দীর্ণ বেদনার্ত জীবনও হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ। হয়ে ওঠে আশা ভালোবাসাময়।

তাঁর আরো কিছু মন্ময় কবিতাংশ-

*বুদ্ধপূর্ণিমা

‘আগুনমুখায়

এই মহানদীর পারে

একদিকে বুদ্ধের চাঁদ

অন্যদিকে আমি,

মাঝখানে থ্রি-পিস জগৎ

আকাশ, জমিন এবং মৃত্যুলোক।

তবে কি মানুষের জীবনটাই

একটা পরমার্থিক ভ্রমণ।’

*দূরত্ব

‘এমনভাবে কথা বলছিলে

যেন তোমার ঠোঁট থেকে পৃথক

হয়ে-যাওয়া শব্দগুলো

আঙুরগুচ্ছের মতো

থোকায়

থোকায়

বাতাসে দুলছিল

এবং দুলছিল।

সবদিকে পাতা নড়ছিল জীবনের।

তক্ষুনি

কোথা থেকে একটা চতুষ্পদ কী যেন এসে

আস্তে করে ওই শব্দগুলোর ওপর দিয়ে

হর্ন বাজিয়ে চলে গেল।’

“আত্মজীবনী” কবিতায় তাঁর দীর্ঘ যাপিত জীবনের নির্যাস-

“যে বিষয় আমি জানি না

সে বিষয়ে আমি

কাটিয়ে দিয়েছি

জীবন।

কত কাঁটা-ভরা দিন আমাকে

জাবড়ে ধরেছে

আর পিছলে গিয়েছি

মানুষ থেকে

মানুষে।”

মৃত্যু-বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মনোভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে ‘সমস্যা’ কবিতায়-

“মৃত্যুতে আমার কোনো সমস্যা নেই

কারণ

জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে

তাতেই তো বসবাস করি

তাই

মৃত্যুতে আমার কোনো গড়িমসি নেই

যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি

কিন্তু

মৃত্যু হলে

পৃথিবীটা ঠিকঠাক চলছে কিনা

তা জানব কী করে?

এই যা সমস্যা।”

মৃত্যুতে বিলীন হয়ে যাওয়ার পরেও এই ভালোবাসার পৃথিবীটার কুশল জানতে উদগ্রীব কবি। এ যেন জন্মান্তরের তৃষ্ণা। আজকের বাস্তবতায় দুঃখী, অসুস্থ, বিশ্বমারী-আক্রান্ত আমাদের এই পৃথিবীর বড়ো প্রয়োজন ছিলো তাঁর মতো স্থিরচিত্ত, প্রাজ্ঞ মানুষের। অথচ তিনি বিদায় নিলেন নির্মম মহামারীরই ছোবলে।

কবি নূরুল হকের মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে যারা লিখছেন, তাঁদের বেশিরভাগই ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে চিনতেন না বা তেমন একটা জানতেন না বলে জানাচ্ছেন। তাঁর কবিতাই তাঁর পরিচয়। এটা একজন লেখকের জন্য সম্মানের বিষয়। তবে আমি তাঁকে দীর্ঘকাল আগে থেকে চিনি, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁর সঙ্গে সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক-সূত্রে কিছু কথা বলছি।

মানুষ হিসেবে কবি নূরুল হক শ্রদ্ধার্হ। নিরহংকার, নির্বিরোধ ও অমায়িক।

মূলত এই ব্যক্তি-মানুষটাকে নিয়ে খানিকটা আলোচনা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করবো। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি, করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২২ জুলাই ২০২১ বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া চারটায় ৭৭ বছর বয়সে মারা গেছেন কবি নূরুল হক। তাঁর সম্পর্কে কিছু আবশ্যিক তথ্য দেই।

১৯৪৪ সালে নেত্রকোনার মদন উপজেলার বালালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি নূরুল হক। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে একটি বামপন্থী গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অবদান রাখেন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন সরকারি কলেজের সফল ও সম্মানিত শিক্ষক।

১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতায় কাটে দীর্ঘ কর্মজীবন। এরই মধ্যে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করেন। কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে ঢাকার ইডেন সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে ২০০৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর-উত্তর সময়ে তিনি সাহিত্য-চর্চায় নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়েছিলেন।

কবি নূরুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। তিনি আমার বড়ো ভাই অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী ভূঁইয়ার বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তাঁকে চিনতাম। তবে উনার সঙ্গে সরাসরি গবেষণা-কাজের সুযোগ হয় ১৯৮৭ সালে, বাংলা একাডেমি পরিচালিত ‘ন্যাশনাল ফোকলোর ওয়ার্কশপ’-এ অংশ নেয়ার সুবাদে। তিন সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত সেই ওয়ার্কশপে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোর-বিশারদগণ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ফিনল্যান্ড থেকে প্রফেসর লাওরি হংকো, আমেরিকা থেকে তৎকালে পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর (বর্তমানে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি’র প্রফেসর) হেনরি গ্লাসি, প্রফেসর অ্যালেন ডান্ডেস, ভারতের মাইসোর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর জওহরলাল হান্ডু, প্রফেসর তুষার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। সকলেই বিশ্বমানের অধ্যাপক। সঙ্গে বাংলাদেশের ফোকলোর বিষয়ের সকল পণ্ডিত ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী, ডঃ মযহারুল ইসলাম, প্রফেসর ওয়াকিল আহমেদ, অধ্যাপক যতীন সরকার, শামসুজ্জামান খান, মোহাম্মদ সাইদুর, ডঃ হামিদা হোসেন, নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, পারভীন আহমেদ প্রমুখ।

এই ওয়ার্কশপে প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং সরকারি কলেজের শিক্ষকগণ, রেডিও এবং টেলিভিশনের নির্বাচিত কিছুসংখ্যক প্রডিউসার ও প্রোগ্রাম অর্গানাইজার, কিছুসংখ্যক সিলেক্টেড সাংবাদিক এবং অতি অল্পসংখ্যক স্কলার ছাত্রছাত্রী। আমি নির্বাচিত হয়েছিলাম শেষোক্ত ক্যাটাগরিতে, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে সদ্য অনার্স পাস করেছি। দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিভাগের অনার্সে শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র হিসাবে কর্তৃপক্ষ আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। ওই ওয়ার্কশপে নূরুল হক ভাই অংশ নেন সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে। ওয়ার্কশপের শিক্ষক-প্রশিক্ষণার্থী টিমকে তখন সরেজমিন (প্র্যাকটিক্যাল) ক্লাস এবং ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো। অত্যন্ত আনন্দঘন সেই দিনগুলোতে আমরা প্রশিক্ষণার্থী ও শিক্ষকেরা একটা আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হই। তখনকার একটা ছবি হাতের কাছে পেয়েছি, দিলাম। ঠিক সামনের সারিতে নিচে বসা আছেন কবি নূরুল হক (বাম দিক থেকে তৃতীয়)।

পরের বছর ১৯৮৮ সালের ‘দ্বিতীয় জাতীয় ফোকলোর কর্মশালা’তেও নূরুল হক ভাই অংশ নেন। আমিও। সেসময়কার অনেক কথা মনে পড়ছে আজ। ১৯৮৮-র কর্মশালার কিছুকাল পরে এম. এ পাস করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেই। তারপরও অনেকবারই নূরুল হক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে তিনি বাংলা একাডেমিতে আসতেন। নেত্রকোনা সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান থাকাকালেও এসেছেন। কিন্তু নানা পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও ফোকলোর বিষয়ে কাজ করার জন্য কেন যেন তিনি আর তেমন আগ্রহী বা সক্রিয় ছিলেন না। নিজের কবিতা নিয়েও খুব একটা আলোচনা করতেন না। গত কয়েক বছর যাবত তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিলো না। আজ সেই নিভৃতচারী কবি, অগ্রজতুল্য নূরুল হক ভাইয়ের কবিতার সামান্য আলোচনা আর তাঁর স্মৃতি নিয়ে এই লেখার মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

back to top