alt

সাময়িকী

স্মৃতিগদ্য : ৩

দিনান্তবেলায়

অঞ্জনা সাহা

: বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১

বাংলা ১৪২৩ ও ইংরেজি ২০১৭ সালে কলকাতার বিশ্ববাংলা সংগঠনের ‘চোখ’ পত্রিকার ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কার’ পান কবি অসীম সাহা। এ-উপলক্ষে নন্দন চত্বরে বাংলা আকাদেমি সভাঘরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমন্ত্রিত হয়ে আমিও কবির সহযাত্রী হই। সকালে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে’ কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। পৌঁছাই সন্ধ্যায়। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল নিউমার্কেট-সংলগ্ন ‘গুলশান লজে’। এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সেজন্যে খাবার খেতে বাইরে যেতে হয়। জার্নির পর আমরা দুজন বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম। রিকশায় কিছুদূর যেতেই বাংলা হোটেল পেয়ে গেলাম। চারাপোনা, ডালভাত ও ভাজি দিয়ে বেশ পেট পুরে খেয়ে লজে ফিরলাম।

পরের দিন বিকেলে ট্যাক্সি নিয়ে রবীন্দ্রসদনে পৌঁছে গেলাম। বহু পরিচিত রবীন্দ্রসদন। সেখানেই বাংলা আকাদেমি সভাঘরে যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করলেন বাংলা ভাষার কিংবদন্তি কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি ইলেকট্রিক সুইচ টিপে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করলেন। তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “আজকাল সবই ডিজিটাল-প্রক্রিয়ায় চলে। দেশলাইয়ের কোনো দরকারই হয় না! সুইচ চেপে দিলেই হলো!”

এবার উত্তরীয় এবং ফুল দিয়ে বরণ করার পালা। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন ও কবি অসীম সাহা! শঙ্খ ঘোষ তো ছিলেনই। এ-ছাড়া কলকাতার বিশিষ্ট লেখক ও কবিগণের কেউ কেউ ছিলেন। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ‘চোখ’ পত্রিকার সম্পাদক মানিক দে। সার্বিক সহ্য়াতায় ছিলেন কবি শ্যামলকান্তি দাশ ও আরও অনেকে। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উপদূতাবাসের প্রেস সচিব মোফাখখারুল ইসলাম ইকবাল। ইকবালের কন্যা অভ্র নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ে আমার খুবই প্রিয় ছাত্রী ছিল।

এ-ছাড়া কলকাতার বাইরের কোন্নগর থেকে এসেছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানলেখক তপন চক্রবর্তী। আমাদের প্রিয় তপনদা। তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গে ছেলেদের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

সভাঘরটি ছিল দর্শক-শ্রোতায় কানায় কানায় পূর্ণ। পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠান এগিয়ে চলল। উদ্বোধনীপর্ব শেষ হওয়ার পর শঙ্খদা মঞ্চ থেকে নেমে এলেন বাড়ি ফিরবেন বলে। দর্শকের প্রথম সারিতে আমি বসে ছিলাম। আসন ছেড়ে দ্রুত কাছে গেলাম। তাঁর হাত দুটি দুহাতে জড়িয়ে নিয়ে কিছু কথা বললাম। ছবিও তুললাম। আমাদের সঙ্গের অনেকে শঙ্খদার কাছে না পৌঁছাতে পেরে বিরূপ মন্তব্য ছুড়ে দিল। যেমন : “বৌদি একাই শঙ্খদাকে দখল করে নিয়েছেন!” তাদের নাম উল্লেখ করতে চাই না। আমার সঙ্গে শঙ্খদার কতদিনের পরিচয়, তা তো ওরা জানে না! আমি মনে মনে হাসলাম। শঙ্খদা চলে যাওয়ার পর জমজমাট অনুষ্ঠানমঞ্চে একে একে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই কবিতা পড়ল। একসময় কবিতা পড়ার সুযোগ হলো আমারও। কবিতাপাঠ করে মঞ্চ থেকে নেমে এলে কবি শ্যামলকান্তি দাশ কাছে এসে বললেন, “বৌদি, ছোট ছোট দুটি কবিতা হলেও চমৎকার।” আমি মৃদু হাসলাম। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমাদের প্রিয় তপনদা বললেন, “চলো ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খাই।” তপনদা ফিসরোল আর চা খাওয়ালেন। অসীম অনেক বেছে খায়। তাই ফিসরোলের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হলো। আমি আর তপনদা পরম তৃপ্তি নিয়ে আয়েশ করে ঐ সময়টুকু উপভোগ করলাম। জীবনের এই মুহূর্ত- এটাও এক মহার্ঘ প্রাপ্তি!

আবার ফিরি শঙ্খদার কথায়। সন্জীদা খাতুনের আমন্ত্রণে ছায়ানটের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সেবার। সালটা মনে নেই। অনুষ্ঠান দেখা হলো শঙ্খদার সাথে। সন্জীদা আপা তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন থেকেই আমি আপার প্রিয় ছাত্রী ও কবি হিসেবে শঙ্খদার সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি ঢাকায় এলে যে বাড়িতে উঠতেন, সে-বাড়িতে এক সন্ধ্যায় আমি আর অসীম গিয়ে দেখা করে কিছুটা সময় কাটিয়ে এলাম। আমার প্রথম কবিতার বই ‘অভিমানী মেঘ’ উপহার দিলাম। স্বল্পভাষী শঙ্খদা মৃদু হেসে সে-বই হাত পেতে গ্রহণ করলেন।

এরপর ২০১৩ সাল। আমার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র বই শঙ্খদাকে উৎসর্গ করি। সে-বছর আমরা কলকাতায় গেলে কবি সৈয়দ হাসমত জালাল ও কবি অভিজিৎ পালচৌধুরীর সহায়তায় শঙ্খদার সল্ট লেকের বাড়িতে পৌঁছে যাই। সেদিন তাঁর হাতে বই দিয়ে আমি ধন্য হই! বাইরের ঘরে কাজের মেয়েটা আমাদের চা-জলখাবার দিয়ে যায়। শঙ্খদার পাশেই বসে ছিলাম। স্বভাবসুলভ মৃদু কণ্ঠে আমার কানে কানে বলেন, “ঐ মিষ্টিটা খাও। ওটা খেতে বেশি ভালো।” আমিও সেই মিষ্টিটাই তুলে নিলাম। খেয়ে বুঝলাম, ওটার স্বাদ কতটা ভালো! কথোপকথন চলল। একফাঁকে আমার বরমশাই বললেন, “শঙ্খদা, অঞ্জনা কিন্তু বেশ ভালো লেখে। স্বল্পবাক মানুষটি দৃঢ় স্বরে বললেন, “হ্যাঁ, তা তো লেখেই।” আমি লজ্জা পেলাম। একটু হাসির রেখা দেখা দিল মুখে।

আরও কিছুক্ষণ আড্ডা চলল। এবার ফিরে যাবার পালা। আমি প্রণাম করলাম পায়ে হাত দিয়ে। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। এত বড় একজন মানুষ ফিরে আসবার সময় দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন। এরপর যতবার, যে অনুষ্ঠানে গিয়েছি, ততবার শঙ্খদার বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা না করে ফিরে আসিনি।

করোনাকাল শুরু হবার আগে আমরা সপরিবারে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমি, অসীম, আমার ছোট ছেলে অর্র্ঘ্য সাহা, পুত্রবধূ নীপা সাহা ও আমাদের একমাত্র নাতনি অদ্বিতীয়া রাই। সেদিন ছিল রোববার। তাঁর বসবার ঘরটি দর্শনার্থীদের ভিড়ে ঠাসা। ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল, টেবিলের মাঝখানে খবরের কাগজ পেতে মুড়ি-চানাচুরের ছোটখাটো পাহাড় করে রাখা। সেখান থেকে সকলে হাত বাড়িয়ে মুঠি ভরে নিয়ে খাচ্ছে! সঙ্গে লাল চা হাতে হাতে ঘুরে যাচ্ছে! চলছে জমাট আড্ডা। আমরা তাঁর চারপাশ ঘিরে বসা! সুযোগমতো আমার কাব্যগ্রন্থ ‘বিষণ্ন পারাবার’ তুলে দিলাম তাঁর হাতে। অসীম তার ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ উপহার দিলে তিনি তার প্রকাশনা সৌকর্য দেখে প্রশংসা করলেন মৃদু স্বরে। আর বললেন, “তুমি, এ কী কাজ করেছো!’ তার চোখে বিস্ময়! ফিরে আসবার সময় আমি আর নীপা প্রণাম করলাম। আমার নাতনির মাথায় হাত রেখে তার চুল নেড়ে নেড়ে আদরের ভঙ্গিতে খেলা করতে করতে যেন আশীর্বাদ করলেন। আমাদের দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আমার পুত্রবধূ অভিভূত হলো তাঁর এই হার্দিক ব্যবহারে। আমরা একবুক ভালো লাগা নিয়ে আমাদের গন্তব্যস্থল ক্যালকাটা লজে ফিরে এলাম।

এরপর শুরু হলো বৈশ্বিক মহামারি করোনাকাল। এ-সময়ে আমরা কতো প্রিয় মানুষ হারালাম, তা হিসেব করা মুশকিল। এর মাঝে জানলাম শঙ্খদা অসুস্থ। করোনাক্রান্ত। বেল ভিউ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এই হাসপাতালে সুচিত্রা সেনও ভর্তি ছিলেন। মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকলাম। বুঝলাম, শঙ্খদার সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না। যেদিন খবর পেলাম, তিনি নেই, চোখ জ্বালা করে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল। সারাদিন বিষণœ হয়ে রইলাম। এখনও ভাবতে পারি না, কলকাতায় গেলে শঙ্খদার বাড়িতে আর যাওয়া হবে না! আর তার সঙ্গে দেখা হবে না!

২৭শে আষাঢ় ১৪২৮ / ১৩ই জুলাই ২০২১

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

স্মৃতিগদ্য : ৩

দিনান্তবেলায়

অঞ্জনা সাহা

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১

বাংলা ১৪২৩ ও ইংরেজি ২০১৭ সালে কলকাতার বিশ্ববাংলা সংগঠনের ‘চোখ’ পত্রিকার ‘বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কার’ পান কবি অসীম সাহা। এ-উপলক্ষে নন্দন চত্বরে বাংলা আকাদেমি সভাঘরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আমন্ত্রিত হয়ে আমিও কবির সহযাত্রী হই। সকালে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে’ কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। পৌঁছাই সন্ধ্যায়। আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল নিউমার্কেট-সংলগ্ন ‘গুলশান লজে’। এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সেজন্যে খাবার খেতে বাইরে যেতে হয়। জার্নির পর আমরা দুজন বেশ ক্ষুধার্ত ছিলাম। রিকশায় কিছুদূর যেতেই বাংলা হোটেল পেয়ে গেলাম। চারাপোনা, ডালভাত ও ভাজি দিয়ে বেশ পেট পুরে খেয়ে লজে ফিরলাম।

পরের দিন বিকেলে ট্যাক্সি নিয়ে রবীন্দ্রসদনে পৌঁছে গেলাম। বহু পরিচিত রবীন্দ্রসদন। সেখানেই বাংলা আকাদেমি সভাঘরে যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করলেন বাংলা ভাষার কিংবদন্তি কবি শঙ্খ ঘোষ। তিনি ইলেকট্রিক সুইচ টিপে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করলেন। তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “আজকাল সবই ডিজিটাল-প্রক্রিয়ায় চলে। দেশলাইয়ের কোনো দরকারই হয় না! সুইচ চেপে দিলেই হলো!”

এবার উত্তরীয় এবং ফুল দিয়ে বরণ করার পালা। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন ও কবি অসীম সাহা! শঙ্খ ঘোষ তো ছিলেনই। এ-ছাড়া কলকাতার বিশিষ্ট লেখক ও কবিগণের কেউ কেউ ছিলেন। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ‘চোখ’ পত্রিকার সম্পাদক মানিক দে। সার্বিক সহ্য়াতায় ছিলেন কবি শ্যামলকান্তি দাশ ও আরও অনেকে। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উপদূতাবাসের প্রেস সচিব মোফাখখারুল ইসলাম ইকবাল। ইকবালের কন্যা অভ্র নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ে আমার খুবই প্রিয় ছাত্রী ছিল।

এ-ছাড়া কলকাতার বাইরের কোন্নগর থেকে এসেছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানলেখক তপন চক্রবর্তী। আমাদের প্রিয় তপনদা। তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গে ছেলেদের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন।

সভাঘরটি ছিল দর্শক-শ্রোতায় কানায় কানায় পূর্ণ। পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠান এগিয়ে চলল। উদ্বোধনীপর্ব শেষ হওয়ার পর শঙ্খদা মঞ্চ থেকে নেমে এলেন বাড়ি ফিরবেন বলে। দর্শকের প্রথম সারিতে আমি বসে ছিলাম। আসন ছেড়ে দ্রুত কাছে গেলাম। তাঁর হাত দুটি দুহাতে জড়িয়ে নিয়ে কিছু কথা বললাম। ছবিও তুললাম। আমাদের সঙ্গের অনেকে শঙ্খদার কাছে না পৌঁছাতে পেরে বিরূপ মন্তব্য ছুড়ে দিল। যেমন : “বৌদি একাই শঙ্খদাকে দখল করে নিয়েছেন!” তাদের নাম উল্লেখ করতে চাই না। আমার সঙ্গে শঙ্খদার কতদিনের পরিচয়, তা তো ওরা জানে না! আমি মনে মনে হাসলাম। শঙ্খদা চলে যাওয়ার পর জমজমাট অনুষ্ঠানমঞ্চে একে একে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেকেই কবিতা পড়ল। একসময় কবিতা পড়ার সুযোগ হলো আমারও। কবিতাপাঠ করে মঞ্চ থেকে নেমে এলে কবি শ্যামলকান্তি দাশ কাছে এসে বললেন, “বৌদি, ছোট ছোট দুটি কবিতা হলেও চমৎকার।” আমি মৃদু হাসলাম। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমাদের প্রিয় তপনদা বললেন, “চলো ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খাই।” তপনদা ফিসরোল আর চা খাওয়ালেন। অসীম অনেক বেছে খায়। তাই ফিসরোলের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হলো। আমি আর তপনদা পরম তৃপ্তি নিয়ে আয়েশ করে ঐ সময়টুকু উপভোগ করলাম। জীবনের এই মুহূর্ত- এটাও এক মহার্ঘ প্রাপ্তি!

আবার ফিরি শঙ্খদার কথায়। সন্জীদা খাতুনের আমন্ত্রণে ছায়ানটের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন সেবার। সালটা মনে নেই। অনুষ্ঠান দেখা হলো শঙ্খদার সাথে। সন্জীদা আপা তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। তখন থেকেই আমি আপার প্রিয় ছাত্রী ও কবি হিসেবে শঙ্খদার সঙ্গে পরিচিত হই। তিনি ঢাকায় এলে যে বাড়িতে উঠতেন, সে-বাড়িতে এক সন্ধ্যায় আমি আর অসীম গিয়ে দেখা করে কিছুটা সময় কাটিয়ে এলাম। আমার প্রথম কবিতার বই ‘অভিমানী মেঘ’ উপহার দিলাম। স্বল্পভাষী শঙ্খদা মৃদু হেসে সে-বই হাত পেতে গ্রহণ করলেন।

এরপর ২০১৩ সাল। আমার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র বই শঙ্খদাকে উৎসর্গ করি। সে-বছর আমরা কলকাতায় গেলে কবি সৈয়দ হাসমত জালাল ও কবি অভিজিৎ পালচৌধুরীর সহায়তায় শঙ্খদার সল্ট লেকের বাড়িতে পৌঁছে যাই। সেদিন তাঁর হাতে বই দিয়ে আমি ধন্য হই! বাইরের ঘরে কাজের মেয়েটা আমাদের চা-জলখাবার দিয়ে যায়। শঙ্খদার পাশেই বসে ছিলাম। স্বভাবসুলভ মৃদু কণ্ঠে আমার কানে কানে বলেন, “ঐ মিষ্টিটা খাও। ওটা খেতে বেশি ভালো।” আমিও সেই মিষ্টিটাই তুলে নিলাম। খেয়ে বুঝলাম, ওটার স্বাদ কতটা ভালো! কথোপকথন চলল। একফাঁকে আমার বরমশাই বললেন, “শঙ্খদা, অঞ্জনা কিন্তু বেশ ভালো লেখে। স্বল্পবাক মানুষটি দৃঢ় স্বরে বললেন, “হ্যাঁ, তা তো লেখেই।” আমি লজ্জা পেলাম। একটু হাসির রেখা দেখা দিল মুখে।

আরও কিছুক্ষণ আড্ডা চলল। এবার ফিরে যাবার পালা। আমি প্রণাম করলাম পায়ে হাত দিয়ে। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। এত বড় একজন মানুষ ফিরে আসবার সময় দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন। এরপর যতবার, যে অনুষ্ঠানে গিয়েছি, ততবার শঙ্খদার বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা না করে ফিরে আসিনি।

করোনাকাল শুরু হবার আগে আমরা সপরিবারে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমি, অসীম, আমার ছোট ছেলে অর্র্ঘ্য সাহা, পুত্রবধূ নীপা সাহা ও আমাদের একমাত্র নাতনি অদ্বিতীয়া রাই। সেদিন ছিল রোববার। তাঁর বসবার ঘরটি দর্শনার্থীদের ভিড়ে ঠাসা। ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল, টেবিলের মাঝখানে খবরের কাগজ পেতে মুড়ি-চানাচুরের ছোটখাটো পাহাড় করে রাখা। সেখান থেকে সকলে হাত বাড়িয়ে মুঠি ভরে নিয়ে খাচ্ছে! সঙ্গে লাল চা হাতে হাতে ঘুরে যাচ্ছে! চলছে জমাট আড্ডা। আমরা তাঁর চারপাশ ঘিরে বসা! সুযোগমতো আমার কাব্যগ্রন্থ ‘বিষণ্ন পারাবার’ তুলে দিলাম তাঁর হাতে। অসীম তার ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ উপহার দিলে তিনি তার প্রকাশনা সৌকর্য দেখে প্রশংসা করলেন মৃদু স্বরে। আর বললেন, “তুমি, এ কী কাজ করেছো!’ তার চোখে বিস্ময়! ফিরে আসবার সময় আমি আর নীপা প্রণাম করলাম। আমার নাতনির মাথায় হাত রেখে তার চুল নেড়ে নেড়ে আদরের ভঙ্গিতে খেলা করতে করতে যেন আশীর্বাদ করলেন। আমাদের দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আমার পুত্রবধূ অভিভূত হলো তাঁর এই হার্দিক ব্যবহারে। আমরা একবুক ভালো লাগা নিয়ে আমাদের গন্তব্যস্থল ক্যালকাটা লজে ফিরে এলাম।

এরপর শুরু হলো বৈশ্বিক মহামারি করোনাকাল। এ-সময়ে আমরা কতো প্রিয় মানুষ হারালাম, তা হিসেব করা মুশকিল। এর মাঝে জানলাম শঙ্খদা অসুস্থ। করোনাক্রান্ত। বেল ভিউ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এই হাসপাতালে সুচিত্রা সেনও ভর্তি ছিলেন। মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকলাম। বুঝলাম, শঙ্খদার সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না। যেদিন খবর পেলাম, তিনি নেই, চোখ জ্বালা করে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ল। সারাদিন বিষণœ হয়ে রইলাম। এখনও ভাবতে পারি না, কলকাতায় গেলে শঙ্খদার বাড়িতে আর যাওয়া হবে না! আর তার সঙ্গে দেখা হবে না!

২৭শে আষাঢ় ১৪২৮ / ১৩ই জুলাই ২০২১

back to top