alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : বার

শিকিবু

আবুল কাসেম

: বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বাইশ.

মুরাসাকির বাবা ইচিঝেন প্রদেশ থেকে এসেছেন। মুরাসাকি ইমনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বলেছিলেন। বাবা এলে সংবাদ পাঠাবেন। সংবাদ পেয়ে ইমন এসেছেন।

ইমনকে বাবা তামেতোকি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো অনেক দিন এঁদের সঙ্গে আছো, কী মনে হয় তাদের?

এক সময় এদের এত প্রভাব ছিল না। আপনি তা জানেন। তবে এখন বেশ প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী। আমার ব্যাপারটা হচ্ছে দীর্ঘদিন এদের সঙ্গে আছি, তাই সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি।

সম্রাজ্ঞী বয়স খুবই কম এবং জেদি প্রকৃতির বলে শুনেছি।

আপনি ঠিকই শুনেছেন। তবে আমার মনে হয় তাকাকুও বেশ মানিয়ে নিতে পারবে। কারণ সে বুদ্ধিমতি এবং তাঁর প্রতিভা রয়েছে। আমাদের মতো আরো বেশ কজন লেডি-ইন-ওয়েটিং রয়েছে, তারা তাদের কাজ করে। তাকাকুকে নেয়া হচ্ছে সম্রাজ্ঞী শোশির দরবারের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। যিনি দরবারের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, নিশ্চয়ই সম্রাজ্ঞী তাকে মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হবেন না।

মাসামুনের মেয়ে ইঝোমি সেখানে আছে শুনেছি।

সে আসলে নেই। ব্যক্তিগত নানা ঝামেলা, এখন আসছে না। সম্রাজ্ঞী অবশ্য এখনো দরবারে আনতে তাকে মরিয়া। মনে হয় না সে আসবে।

এলে মন্দ হতো না, সে সমবয়সী ছিল।

এবারে কথা বললেন মুরাসাকি। বললেন, সম্রাটের প্রাসাদ দেখতে বেশ সুন্দর কিন্তু ভেতরে নানা ষড়যন্ত্র, কোন্দল, কাঁদা ছোড়াছুড়ি। এ ব্যাপারটায়ই আমার আপত্তি।

বাবা বললেন, দেখো আমরা যে সমাজে বাস করি তা অভিজাত বটে। কিন্তু আভিজাত্য অর্জন এবং তা রক্ষার জন্য যে ক্ষমতার লড়াই তা নোংরা। এটা আভিজাত্যের সঙ্গে লেগেই আছে। তুমি তোমার নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে, পরিচালিত করবে তা তোমার নিজের ওপর; তবে আমি যে জিনিসটার জন্য উৎসাহিত এবং তোমাকে উৎসাহ দেব তা হচ্ছে তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ। সম্রাটের প্রাসাদ এবং ছোট সম্রাজ্ঞীর দরবারে তোমার অবস্থান তার ভাগ্য খুলে দিতে পারে।

ইমন বললেন, সে কথাই আমি তাকে বলেছি। এছাড়া যে কাজটি করে সে সুনামের অধিকারী, তার জন্য বড় একটা প্ল্যাটফর্মের দরকার।

তামেতোকি বললেন, তুমি আছো, আমি তাই ভরসা পাচ্ছি।

পরদিন তামেতোকি মুরাসাকিকে নিয়ে সম্রাটের প্রাসাদে গেলেন। তবে তিনি সম্রাজ্ঞী শোশির দরবারে গেলেন না। মুরাসাকিকে ইমন সম্রাজ্ঞীর দরবারে নিয়ে গেলেন। তিনি গেলেন তার পুরোনো কর্মস্থলে, সম্রাটের উৎসব অনুষ্ঠান বিভাগে। এ দপ্তরের জন্যই আলাদা একটা প্রাসাদ রয়েছে।

সকল প্রাসাদই এখানে কাষ্ঠ নির্মিত। প্রাসাদগুলোর শৈল্পিক নির্মাণশৈলী এবং স্থাপত্যকীর্তি বড়ই নান্দনিক। ওকগাছের বাকল দিয়ে প্রাসাদের চাল নির্মাণ করা হয়েছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। বিশাল এলাকাজুড়ে ইম্পোরিয়াল প্যালেস। অনেকগুলো প্রাসাদ সেখানে। কয়েকবার পুড়ে গেছে সম্রাটের প্রাসাদ। আবার নির্মিত হয়েছে নান্দনিকভাবে।

নানা রকম ফুলের বাগন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় ফুল ক্রাইসানথ্যমম। গাছগুলো শুধু সবুজ নয়, লাল, হলুদ, শোভাবর্ধক। প্রাসাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বাগান সাজানো। ফুলের রঙ ও পাতার রঙে নানা বৈচিত্র্য। নির্জন স্থানও রয়েছে প্রাসাদ এলাকায়। সম্রাট এখানে নির্জনতা উপভোগ করেন। আশপাশে রয়েছে জলাশয়। একটির সঙ্গে অন্যটির স্রোতধারা বহমান। নগর পরিকল্পনা করা হয়েছে এমনভাবে যে, এ জলধারায় গরমে শীতলতা এবং শীতে উষ্ণতা অনুভূত হয়। ঝিলে নানা পাখি বিচরণ করে। পাখি হেইয়ান সাম্রাজ্যে আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। সম্রাটের প্রাসাদের চূড়ায় এক ধরনের পাখির স্বর্ণমূর্তি রয়েছে। তা রয়েছে প্রাসাদ অভ্যন্তরে রাজকীয় আচার নিষ্ঠ কর্মকা- সম্পাদনের গৃহআচ্ছাদনের ম-প প্রতীম অবকাঠামোর শীর্ষদেশেও। এই পাখি বাস্তবে দেখা যায় না, ঋদ্ধ ঋষিশিল্পীর কল্পনায় ছিল।

জাপানে সম্রাট পবিত্রতার প্রতীক, শ্রদ্ধেয় স্পিরিচুয়াল জাপানের প্রতিমূর্তি। পরিবেশটা সেরকমভাবেই তৈরি করা, মুরাসাকি এ প্রাসাদে নতুন আসেননি। আগে বাবার কর্মস্থল হিসেবে অনেকবার এসেছেন। বিয়ের পর এসেছিলেন সাহিত্যের অনুষ্ঠানে।

আজকের আসাটা ভিন্নরকম। তাকে দেখেই সম্রাজ্ঞী শোশি বলে উঠলেন, তাকে তো আমি চিনি। কবিতা পড়েছিল। আমি তোমার ‘গেঞ্জি’ পড়ে অভিভূত। তুমি আমার দরবার অলংকৃত করবে। এটাই চাওয়া। আর আমাকে সঙ্গ দেবে। ইমনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি তার জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করো, এখানে, আমার এবং তোমার কাছে হলে ভালো হয়।

মুরাসাকির লেখার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। তার কথা শুনে লেডিদের অনেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তাকে স্বাগত জানালেন। লেখার প্রশংসা করলেন। পরবর্তী অংশ কখন পাওয়া যাবে, এ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কেউ কেউ কাহিনী, চরিত্র এসব নিয়েও প্রশ্ন করলেন।

মুরাসাকি বিরক্ত নয়, বরং তাতে উৎসাহিত বোধ করলেন। প্রেরণা পেলেন। এত দিন শুধু ইমনের কাছে শুনে আসছেন তার লেখার জনপ্রিয়তার কথা, এখন চোখে দেখলেন। মুহূর্তগুলো উপভোগ্য হয়ে উঠলো।

নিয়ম হলো লেডি-ইন-ওয়েটিংরা প্রাসাদে সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন। আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ইশিয়ামা ডেরা ছেড়ে আসার জন্য সময়ের প্রয়োজন। বিশাল সম্পত্তি রেখে গেছেন নোবুতাকা। এগুলো দেখাশুনার জন্য লোক রেখেছেন। প্রচুর লোক কাজ করছে। তাদের দেখভাল বা তত্ত্বাবধান কঠিন হয়ে পড়ল। বাবার পক্ষেও সম্ভব নয়। তিনি থাকেন ইচিঝেন প্রদেশে। বহুদূর। নোবুনোরি আছে। এখন বড় হয়েছে কিন্তু বিষয়বুদ্ধি হয়নি। আসলেই সমস্যা। সম্পদ ও সম্পত্তি উপার্জনের চাইতে রক্ষা করা সত্যিই কঠিন। বাবা হয়ত এখন একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবেন। দায়িত্বটা তাকেই পালন করতে হবে।

সম্রাজ্ঞী শোশি পরদিন দরবার ডেকেছেন। উদ্দেশ্য তার দরবারের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেয়া। আর গৌরবের সঙ্গে বলা যে, তাকাকু, লেখিকা তাকাকু এখন তার দরবারে নিয়মিত একজন লেডি-ইন-ওয়েটিং।

দরবারে তিনি তার বাবা প্রধানমন্ত্রী মিচিনাগাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মিচিনাগা একা না, গোটা পরিবার নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। সমস্যা হচ্ছে তিনি যেখানে উপস্থিত থাকেন সেখানে অন্য কারো কথা বলার সুযোগ থাকে না। এমন কি সম্রাটকেও কথা বলার জন্য সামান্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। এখানেও একই অবস্থা। সম্রাজ্ঞী তো তারই মেয়ে তিনি কথা বলবেন কী। তাই দরবারটাই মুরাসাকি কেন্দ্রিক না হয়ে মিচিনাগা কেন্দ্রিক হয়ে উঠল।

মিচিনাগা বললেন, তাকাকু আমার কাছে কয়েকদিন সময় চেয়েছিল। তাই মনে হয় ভেবে চিন্তেই এসেছে। আমি খুশি হয়েছি।

মুরাসাকি স্বল্পভাষী এবং গম্ভীর প্রকৃতির। তিনি জবাবে কিছু বললেন না।

মিচিনাগা আবার বললেন, তোমার লেখার সুখ্যাতি ব্যাপক। আকাঝোমি ইমনরা কী যেন লিখছে আমাকে নিয়ে আশা করি সেখানে তোমার অবদান থাকবে।

মিচিনাগার স্ত্রী রিনশি বললেন, ও তো তোমার সম্পর্কে কিছু জানে না, কী লিখবে।

আস্তে আস্তে নিশ্চয়ই জানবে। তখন লিখবে। বলে হাসলেন তিনি। পরে বললেন, তোমার দু’চারটা বাক্য আমার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেবে। বলে আবার হাসলেন।

দরবার শুদ্ধ সবাই তার ওপর বিরক্ত। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। তাকে সবাই ভয় পায়। সম্রাজ্ঞী শোশি তার মেয়ে, বাবাকে অতটা ভয়ের কারণ মনে করেন না। বললেন, বাবা, আমাদের সবার মাথার মণি সম্রাটের মাতা এবং আপনার বড় বোন ফুজিয়ারা- নো সেনশি এখানে আমন্ত্রিত হয়ে এসে আমাদের সম্মানিত করেছেন, অনুগ্রহ করে তাকে কিছু বলতে দিন।

নিশ্চয়, নিশ্চয়। সম্রাটের মাতা বলে কথা। বলুন, আপনি কিছু বলুন।

সম্রাটের প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাকে বাদ দিয়ে কিছু বলা কি শোভনীয়?

আপনার যারা অনুগত প্রত্যহ আপনার দরবারে এসে কৃতার্থ বোধ করেন, এরা এবং আপনি না চাইলে আমার প্রধানমন্ত্রিত্ব ধুলার মতো উড়ে যাবে। এখন আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে।

তোমার আর্জি?

না, না আমার জন্য না। আপনার স্নেহভাজন শোশির জন্য, একে আপনি আপনার পর্যায়ে তুলে নেবার মন্ত্র এবং দীক্ষা দিন।

তুমি তোমার কন্যাকে অনেক ভালোবাসো জানি এবং প্রচুর ক্ষমতাও রাখো। কিন্তু কি জানো, তোমার আমার সাহায্য, মন্ত্র বা দীক্ষা ছাড়াই সে এগোতে পারবে, আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে। তার আলামত আমাদের সামনেই আছে।

যেমন?

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

তার দরবারে বেছে বেছে সে যে গুণী নারীদের আনছে, তা-ই প্রমাণ করছে তার উচ্চাশার দৌড় কোথায়। তখন আমি হয়ত থাকবো না, তুমিও থাকবে কিনা জানি না, কিন্তু এখানে উপস্থিত কেউ কেউ থাকবে, তারা দেখবে। সে প্রসঙ্গ থাক। আমি যেদিন তাকাকুর মুখে কবিতা শুনেছিলাম সেদিনই মেয়েটাকে মনে ধরেছিল। আমার মনে হয়েছে তার প্রতিভা আছে। সেও অনেক দূর যাবে এবং এ দরবার ও সম্রাজ্ঞীকে আলোকিত করবে। বিদগ্ধ রমণী হবে এরা। সে আলামত আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি। তবে তাদের পথ খুব মসৃণ নয়। ক্রমশ...

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

ছবি

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : বার

শিকিবু

আবুল কাসেম

বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বাইশ.

মুরাসাকির বাবা ইচিঝেন প্রদেশ থেকে এসেছেন। মুরাসাকি ইমনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বলেছিলেন। বাবা এলে সংবাদ পাঠাবেন। সংবাদ পেয়ে ইমন এসেছেন।

ইমনকে বাবা তামেতোকি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো অনেক দিন এঁদের সঙ্গে আছো, কী মনে হয় তাদের?

এক সময় এদের এত প্রভাব ছিল না। আপনি তা জানেন। তবে এখন বেশ প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী। আমার ব্যাপারটা হচ্ছে দীর্ঘদিন এদের সঙ্গে আছি, তাই সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি।

সম্রাজ্ঞী বয়স খুবই কম এবং জেদি প্রকৃতির বলে শুনেছি।

আপনি ঠিকই শুনেছেন। তবে আমার মনে হয় তাকাকুও বেশ মানিয়ে নিতে পারবে। কারণ সে বুদ্ধিমতি এবং তাঁর প্রতিভা রয়েছে। আমাদের মতো আরো বেশ কজন লেডি-ইন-ওয়েটিং রয়েছে, তারা তাদের কাজ করে। তাকাকুকে নেয়া হচ্ছে সম্রাজ্ঞী শোশির দরবারের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। যিনি দরবারের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, নিশ্চয়ই সম্রাজ্ঞী তাকে মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হবেন না।

মাসামুনের মেয়ে ইঝোমি সেখানে আছে শুনেছি।

সে আসলে নেই। ব্যক্তিগত নানা ঝামেলা, এখন আসছে না। সম্রাজ্ঞী অবশ্য এখনো দরবারে আনতে তাকে মরিয়া। মনে হয় না সে আসবে।

এলে মন্দ হতো না, সে সমবয়সী ছিল।

এবারে কথা বললেন মুরাসাকি। বললেন, সম্রাটের প্রাসাদ দেখতে বেশ সুন্দর কিন্তু ভেতরে নানা ষড়যন্ত্র, কোন্দল, কাঁদা ছোড়াছুড়ি। এ ব্যাপারটায়ই আমার আপত্তি।

বাবা বললেন, দেখো আমরা যে সমাজে বাস করি তা অভিজাত বটে। কিন্তু আভিজাত্য অর্জন এবং তা রক্ষার জন্য যে ক্ষমতার লড়াই তা নোংরা। এটা আভিজাত্যের সঙ্গে লেগেই আছে। তুমি তোমার নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবে, পরিচালিত করবে তা তোমার নিজের ওপর; তবে আমি যে জিনিসটার জন্য উৎসাহিত এবং তোমাকে উৎসাহ দেব তা হচ্ছে তোমার মেয়ের ভবিষ্যৎ। সম্রাটের প্রাসাদ এবং ছোট সম্রাজ্ঞীর দরবারে তোমার অবস্থান তার ভাগ্য খুলে দিতে পারে।

ইমন বললেন, সে কথাই আমি তাকে বলেছি। এছাড়া যে কাজটি করে সে সুনামের অধিকারী, তার জন্য বড় একটা প্ল্যাটফর্মের দরকার।

তামেতোকি বললেন, তুমি আছো, আমি তাই ভরসা পাচ্ছি।

পরদিন তামেতোকি মুরাসাকিকে নিয়ে সম্রাটের প্রাসাদে গেলেন। তবে তিনি সম্রাজ্ঞী শোশির দরবারে গেলেন না। মুরাসাকিকে ইমন সম্রাজ্ঞীর দরবারে নিয়ে গেলেন। তিনি গেলেন তার পুরোনো কর্মস্থলে, সম্রাটের উৎসব অনুষ্ঠান বিভাগে। এ দপ্তরের জন্যই আলাদা একটা প্রাসাদ রয়েছে।

সকল প্রাসাদই এখানে কাষ্ঠ নির্মিত। প্রাসাদগুলোর শৈল্পিক নির্মাণশৈলী এবং স্থাপত্যকীর্তি বড়ই নান্দনিক। ওকগাছের বাকল দিয়ে প্রাসাদের চাল নির্মাণ করা হয়েছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। বিশাল এলাকাজুড়ে ইম্পোরিয়াল প্যালেস। অনেকগুলো প্রাসাদ সেখানে। কয়েকবার পুড়ে গেছে সম্রাটের প্রাসাদ। আবার নির্মিত হয়েছে নান্দনিকভাবে।

নানা রকম ফুলের বাগন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় ফুল ক্রাইসানথ্যমম। গাছগুলো শুধু সবুজ নয়, লাল, হলুদ, শোভাবর্ধক। প্রাসাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বাগান সাজানো। ফুলের রঙ ও পাতার রঙে নানা বৈচিত্র্য। নির্জন স্থানও রয়েছে প্রাসাদ এলাকায়। সম্রাট এখানে নির্জনতা উপভোগ করেন। আশপাশে রয়েছে জলাশয়। একটির সঙ্গে অন্যটির স্রোতধারা বহমান। নগর পরিকল্পনা করা হয়েছে এমনভাবে যে, এ জলধারায় গরমে শীতলতা এবং শীতে উষ্ণতা অনুভূত হয়। ঝিলে নানা পাখি বিচরণ করে। পাখি হেইয়ান সাম্রাজ্যে আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। সম্রাটের প্রাসাদের চূড়ায় এক ধরনের পাখির স্বর্ণমূর্তি রয়েছে। তা রয়েছে প্রাসাদ অভ্যন্তরে রাজকীয় আচার নিষ্ঠ কর্মকা- সম্পাদনের গৃহআচ্ছাদনের ম-প প্রতীম অবকাঠামোর শীর্ষদেশেও। এই পাখি বাস্তবে দেখা যায় না, ঋদ্ধ ঋষিশিল্পীর কল্পনায় ছিল।

জাপানে সম্রাট পবিত্রতার প্রতীক, শ্রদ্ধেয় স্পিরিচুয়াল জাপানের প্রতিমূর্তি। পরিবেশটা সেরকমভাবেই তৈরি করা, মুরাসাকি এ প্রাসাদে নতুন আসেননি। আগে বাবার কর্মস্থল হিসেবে অনেকবার এসেছেন। বিয়ের পর এসেছিলেন সাহিত্যের অনুষ্ঠানে।

আজকের আসাটা ভিন্নরকম। তাকে দেখেই সম্রাজ্ঞী শোশি বলে উঠলেন, তাকে তো আমি চিনি। কবিতা পড়েছিল। আমি তোমার ‘গেঞ্জি’ পড়ে অভিভূত। তুমি আমার দরবার অলংকৃত করবে। এটাই চাওয়া। আর আমাকে সঙ্গ দেবে। ইমনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি তার জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করো, এখানে, আমার এবং তোমার কাছে হলে ভালো হয়।

মুরাসাকির লেখার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। তার কথা শুনে লেডিদের অনেকেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তাকে স্বাগত জানালেন। লেখার প্রশংসা করলেন। পরবর্তী অংশ কখন পাওয়া যাবে, এ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কেউ কেউ কাহিনী, চরিত্র এসব নিয়েও প্রশ্ন করলেন।

মুরাসাকি বিরক্ত নয়, বরং তাতে উৎসাহিত বোধ করলেন। প্রেরণা পেলেন। এত দিন শুধু ইমনের কাছে শুনে আসছেন তার লেখার জনপ্রিয়তার কথা, এখন চোখে দেখলেন। মুহূর্তগুলো উপভোগ্য হয়ে উঠলো।

নিয়ম হলো লেডি-ইন-ওয়েটিংরা প্রাসাদে সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন। আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। ইশিয়ামা ডেরা ছেড়ে আসার জন্য সময়ের প্রয়োজন। বিশাল সম্পত্তি রেখে গেছেন নোবুতাকা। এগুলো দেখাশুনার জন্য লোক রেখেছেন। প্রচুর লোক কাজ করছে। তাদের দেখভাল বা তত্ত্বাবধান কঠিন হয়ে পড়ল। বাবার পক্ষেও সম্ভব নয়। তিনি থাকেন ইচিঝেন প্রদেশে। বহুদূর। নোবুনোরি আছে। এখন বড় হয়েছে কিন্তু বিষয়বুদ্ধি হয়নি। আসলেই সমস্যা। সম্পদ ও সম্পত্তি উপার্জনের চাইতে রক্ষা করা সত্যিই কঠিন। বাবা হয়ত এখন একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবেন। দায়িত্বটা তাকেই পালন করতে হবে।

সম্রাজ্ঞী শোশি পরদিন দরবার ডেকেছেন। উদ্দেশ্য তার দরবারের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেয়া। আর গৌরবের সঙ্গে বলা যে, তাকাকু, লেখিকা তাকাকু এখন তার দরবারে নিয়মিত একজন লেডি-ইন-ওয়েটিং।

দরবারে তিনি তার বাবা প্রধানমন্ত্রী মিচিনাগাকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মিচিনাগা একা না, গোটা পরিবার নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। সমস্যা হচ্ছে তিনি যেখানে উপস্থিত থাকেন সেখানে অন্য কারো কথা বলার সুযোগ থাকে না। এমন কি সম্রাটকেও কথা বলার জন্য সামান্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। এখানেও একই অবস্থা। সম্রাজ্ঞী তো তারই মেয়ে তিনি কথা বলবেন কী। তাই দরবারটাই মুরাসাকি কেন্দ্রিক না হয়ে মিচিনাগা কেন্দ্রিক হয়ে উঠল।

মিচিনাগা বললেন, তাকাকু আমার কাছে কয়েকদিন সময় চেয়েছিল। তাই মনে হয় ভেবে চিন্তেই এসেছে। আমি খুশি হয়েছি।

মুরাসাকি স্বল্পভাষী এবং গম্ভীর প্রকৃতির। তিনি জবাবে কিছু বললেন না।

মিচিনাগা আবার বললেন, তোমার লেখার সুখ্যাতি ব্যাপক। আকাঝোমি ইমনরা কী যেন লিখছে আমাকে নিয়ে আশা করি সেখানে তোমার অবদান থাকবে।

মিচিনাগার স্ত্রী রিনশি বললেন, ও তো তোমার সম্পর্কে কিছু জানে না, কী লিখবে।

আস্তে আস্তে নিশ্চয়ই জানবে। তখন লিখবে। বলে হাসলেন তিনি। পরে বললেন, তোমার দু’চারটা বাক্য আমার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেবে। বলে আবার হাসলেন।

দরবার শুদ্ধ সবাই তার ওপর বিরক্ত। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। তাকে সবাই ভয় পায়। সম্রাজ্ঞী শোশি তার মেয়ে, বাবাকে অতটা ভয়ের কারণ মনে করেন না। বললেন, বাবা, আমাদের সবার মাথার মণি সম্রাটের মাতা এবং আপনার বড় বোন ফুজিয়ারা- নো সেনশি এখানে আমন্ত্রিত হয়ে এসে আমাদের সম্মানিত করেছেন, অনুগ্রহ করে তাকে কিছু বলতে দিন।

নিশ্চয়, নিশ্চয়। সম্রাটের মাতা বলে কথা। বলুন, আপনি কিছু বলুন।

সম্রাটের প্রধানমন্ত্রীর সামনে তাকে বাদ দিয়ে কিছু বলা কি শোভনীয়?

আপনার যারা অনুগত প্রত্যহ আপনার দরবারে এসে কৃতার্থ বোধ করেন, এরা এবং আপনি না চাইলে আমার প্রধানমন্ত্রিত্ব ধুলার মতো উড়ে যাবে। এখন আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে।

তোমার আর্জি?

না, না আমার জন্য না। আপনার স্নেহভাজন শোশির জন্য, একে আপনি আপনার পর্যায়ে তুলে নেবার মন্ত্র এবং দীক্ষা দিন।

তুমি তোমার কন্যাকে অনেক ভালোবাসো জানি এবং প্রচুর ক্ষমতাও রাখো। কিন্তু কি জানো, তোমার আমার সাহায্য, মন্ত্র বা দীক্ষা ছাড়াই সে এগোতে পারবে, আমাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে। তার আলামত আমাদের সামনেই আছে।

যেমন?

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

তার দরবারে বেছে বেছে সে যে গুণী নারীদের আনছে, তা-ই প্রমাণ করছে তার উচ্চাশার দৌড় কোথায়। তখন আমি হয়ত থাকবো না, তুমিও থাকবে কিনা জানি না, কিন্তু এখানে উপস্থিত কেউ কেউ থাকবে, তারা দেখবে। সে প্রসঙ্গ থাক। আমি যেদিন তাকাকুর মুখে কবিতা শুনেছিলাম সেদিনই মেয়েটাকে মনে ধরেছিল। আমার মনে হয়েছে তার প্রতিভা আছে। সেও অনেক দূর যাবে এবং এ দরবার ও সম্রাজ্ঞীকে আলোকিত করবে। বিদগ্ধ রমণী হবে এরা। সে আলামত আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি। তবে তাদের পথ খুব মসৃণ নয়। ক্রমশ...

back to top