alt

সাময়িকী

একজন মায়াতরুর গল্প

মহিবুল আলম

: রোববার, ২২ আগস্ট ২০২১

এক.

ভদ্রমহিলা হাতের কনুই এবং কপালে তুলো ও স্যাভলন দিয়ে মুছে দুটো ব্যান্ড-এইড লাগিয়ে দিয়ে বললেন, যাক বাবা, ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করেছেন। তোমাকে প্রথমে যে অবস্থায় দেখেছি, তাতে মনে হয়েছিল অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

আবিদ কিছু বলল না। সে বুঝতে পারছিল এ অবস্থায় ভদ্রমহিলাকে সৌজন্যমূলক কিছু বলা প্রয়োজন। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। সে শুধু ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।

ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার শরীরে আর কোথাও কেটেছে বলে মনে হচ্ছে?

আবিদ মাথা নেড়ে বলল, না।

- শরীরের কোথাও ব্যথা?

- জি, ব্যথা সামান্য আছে। হাতের কনুই আর কপালে।

- আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমাকে দুটো পেইন কিলার দিচ্ছি।

আবিদ সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকাল।

ভদ্রমহিলা ফাস্টএইডের বাক্সটা গোছাতে গোছাতে বললেন, তুমি একটু সুস্থির হয়ে বসো। আমি উপর থেকে আসছি।

আবিদ আবারও মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল।

ভদ্রমহিলা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন।

আবিদ ভদ্রমহিলার গমনপথের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ আগের দুর্ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে বসল। তার এতটুকু খেয়াল আছে, সে খুব একটা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল না। তবে প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছিল। গাড়ির হেডলাইটের হাত কয়েক পরই সে ঝাপসা দেখছিল। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পিচের রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ার কারণে, নাকি রাস্তার বাঁকটা বেশি ছিল? সে হঠাৎ বুঝতে পারে, গাড়িটা সে ব্রেক চেপেও আয়ত্বে রাখতে পারছে না। গাড়িটা রাস্তা থেকে ছিটকে গিয়ে কাঁটাতারের বেড়া ছিঁড়ে একটা খামারের দিকে ছুটছে। তারপর সে কয়েকটা গরুকে এলোমেলো ছুটতে দেখে। একটা বিদ্যুতের খাম্বা। বিকট একটা শব্দ। একটা গরুর ডাক- হাম্বা-অ-অ।

আবিদ একটু দ্বিধায় আছে, তারপর সে কি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল? আর জ্ঞান হারালে তা কতক্ষণের জন্য? সে হঠাৎ অনুভব করে, একটা টর্চলাইটের আলো তার চেহারায় এসে পড়ছে। হলুদ রেইনকোট পরা কে একজন ঝুঁকে তাকে দেখছে। তারপর গাড়ির দরজা খোলার শব্দ- ক্যা-য়ে-ত।

দুই

নিউজিল্যান্ডের বৃষ্টি এমনই। একবার শুরু হলে আর থামতে চায় না। এখন বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়োহাওয়া বইছে। বাইরে থেকে শব্দ আসছে- শন শন, শন শন। বৃষ্টির জল ছিটকে এসে কাচের দরজায় পড়ছে।

ভদ্রমহিলা উপর থেকে নেমে এলেন। তার গায়ে এখন কফি রংয়ের একটা ভারি স্লিপিং গাউন। হাতে প্যান্ট, শার্ট আর একটা সবুজ-লালের দুই রঙা চক্রাবক্রা সুয়েটার। তিনি এগুলো আবিদের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, তুমি ভেজা কাপড়ে এভাবে কতক্ষণ থাকবে? এই কাপড়গুলো পরো। আমি তোমার কাপড়গুলো ড্রাইয়ারে শুকিয়ে দিচ্ছি।

আবিদ হাত বাড়িয়ে নিল।

ভদ্রমহিলা নিজ থেকেই বললেন, এগুলো আমার ছেলের। সে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকে। এখানে এলে পরে। তুমি ওদিকে চলে যাও। ওটাই গেস্টরুম। ওটার পাশে বাথরুম আছে।

আবিদ মাথা ঝাঁকিয়ে গেস্টরুমের পাশের বাথরুমে চলে গেল। ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে শুকনো কাপড়গুলো পরে আবার যখন লাউঞ্জে এল ততক্ষণে ভদ্রমহিলা কিচেনে কিছু একটা করছেন। তাকে দেখেই ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, তোমার জন্য ক্যানের টুনা ফিস হালকা তেলে ভেজে নিচ্ছি। স্যান্ডউইচ বানাব।

আবিদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, কেন?

ভদ্রমহিলা বললেন, তুমি কখন না কখন খেয়ে বের হয়েছ। তোমাকে পেইন কিলার ট্যাবলেট খেতে হবে। পেইন কিলার ট্যাবলেট খাওয়ার আগে কিছু একটা খেয়ে নিতে হয়।

আবিদ স্মিত হাসল। কিছু বলল না। সে লাউঞ্জে একটা সোফায় বসে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।

কিচেনে ভদ্রমহিলা খানিকটা কুঁজো হয়ে টুনা ফিস ভাজছেন। ফ্রাইপেনে তাঁর চামচ নাড়ার শব্দ হচ্ছে- খয়চ-খয়চ-খয়চ। পাশেই এক বোতল ক্যানোলা তেল। তিনি সরু ধোঁয়া ওঠা ফ্রাইপেনের দিকে ঝুঁকে কিছু একটা দেখে বোতল থেকে ফ্রাইপেনে আরও তেল ঢালতে গিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন, তা দেখে আবিদ খানিকটা চমকে উঠল। এই চমকে ওঠার কারণ আর কিছু নয়, তার মাকে ভেবে। তার মা যে এমনই একটা ভঙ্গি করে রান্না করতেন।

আবিদ মুগ্ধ হয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল। তার তৎক্ষণাৎ তার গ্রামের কথা মনে পড়ে গেল। তার গ্রামের নাম সাহেবপুর। একেবারে অজপাড়া গাঁ। তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। সে যখন কলেজে পড়ত বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গ্রামে আসত, তখন গ্রামের ছোট্ট বাজারে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেত। মা ঘরের দাওয়ায় বসে থাকতেন। ঘরের ভেতর থেকে হাট দরজা দিয়ে কুপির আলো এসে পড়ত ঘরের দাওয়ার অনেকটা অবধি। মার একটা দিঘল ছায়া হতো। সে বাড়ি ফিরলেই মা পাশের দুচালা ছনের ঘরটায় যেতেন ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া তরকারিগুলো চুলায় গরম করতে। তিনি চুলায় পাটখড়ি ও শুকনো লতাপাতা ঠেলে চুলা জ্বালাতেন। তরকারি যখন কড়াইতে গরম হয়ে সরু রেখা করে ধোঁয়া তুলত, তখন মা কুপির কাত করা আলোয় তরকারি ঠিকমতো গরম হয়েছে কি না দেখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মার বয়সী চোখ। তিনি কুপি কাত করে যখন তরকারির গরম হওয়া দেখতেন, তখন প্রায়ই কুপি থেকে ফোঁটা ফোঁটা কেরোসিন তরকারির কড়াইতে পড়ে যেত। মা টেরই পেতেন না।

আবিদ খেতে বসে টের পেত। সে টের পেলেও কখনও মাকে বলত না।

ভদ্রমহিলা একটা প্লেটে সুন্দর করে টুনা ফিসের স্যান্ডউইচ সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে বললেন, তুমি স্যান্ডউইচটা খাও। আমি তোমাকে পেইন কিলার ট্যাবলেট দিচ্ছি। ও হো, তোমার নামটা তো আমার জানা হয়নি। কী নাম তোমার?

আবিদ বলল, আমার নাম আবিদুল হাসান।

ভদ্রমহিলা বললেন, আমার নাম মিসেস এলিরা মার্গারেট স্মিথ। তুমি আমাকে মিসেস এলিরা বলেই ডাকতে পার।

আবিদ স্মিত হেসে সায় দিল।

তিন

আবিদ লাউঞ্জের এপাশ-ওপাশ দেখল। এমনিই। দেয়ালে একটা ঘড়ি চলছে- টিকটিক, টিকটিক। ফায়ারপ্লেসে কাঠ পোড়ার শব্দ- ফ্যাসফ্যাস, ফ্যাসফ্যাস। জানালায় দুধ-সাদা পর্দার হালকা দুলুনি। বাইরে ঝড়োশব্দ ছাপিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে বেশি।

মিসেস এলিরা পাশের সোফায় বসে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন বোধ করছ?

আবিদ বলল, জি, বেশ ভালো বোধ করছি।

মিসেস এলিরা বললেন, মনে করো না তুমিই এখানে প্রথম গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছ। এখানে প্রতিবছরই একটা-দুটো অ্যাক্সিডেন্ট হয়। আমার ফার্মের পাশের হাইওয়ের বাঁকটা একটা বেশি তো।

আবিদ মাথা ঝাঁকাল। কিছু বলল না।

মিসেস এলিরা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় থেকে ফিরছিলে?

আবিদ বলল, অকল্যান্ড থেকে।

- কোথায় যাচ্ছিলে?

- তাওরাঙ্গা শহরে।

- ওখানে কেন?

- ওখানে সকালে আমার একটা অ্যাপোয়েনমেন্ট আছে। আমি একটা কনসালটেন্টসি ফার্মে চাকরি করি। ভেবেছিলাম রাতে চলে যাই। বন্ধুর বাসায় থাকব। তাই এতরাতে রওনা হয়েছিলাম।

- তোমার দেরি দেখে বন্ধু তো তাহলে চিন্তায় থাকবে।

- জি, নিশ্চয়ই এরই মধ্যে কয়েকবার ফোন করে ফেলেছে।

- তুমি ফোন করে দাও।

- আমার মোবাইলটা গাড়িতে রয়ে গেছে।

মিসেস এলিরা বললেন, ও, আচ্ছা। তুমি আমার মোবাইল থেকে ফোন দাও।

আবিদ বলল, আমি বরং মোবাইলটা গাড়ি থেকে নিয়ে আসি। বৃষ্টিতে মোবাইলটা নষ্ট হয়ে যাতে পারে। এছাড়া জরুরি ফোনও আসতে পারে।

মিসেস এলিরা সায় দিয়ে বললেন, আচ্ছা। তবে টর্চলাইট আর ছাতাটা নিয়ে যাও। বাইরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে।

আবিদ বলল, জি।

বাসার ভেতরে বসে যত জোরে বৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল বাইরে এসে আবিদ সেরকম বৃষ্টি পায়নি। টর্চলাইট জ্বেলে ছাতা মাথায় সে খামারের উঁচু ঘাস মাড়িয়ে গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। গাড়িটার কাছে এসে তার মন খারাপ হয়ে গেল। মাত্র কিছুদিন আগেই সে কোম্পানি থেকে নতুন গাড়িটা পেয়েছে। গাড়িটা বিদ্যুতের থামে গেলে সামনাটা একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে।

মোবাইলটা নিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকতেই মিসেস এলিরা বললেন, আবিদ, তুমি বরং তোমার বন্ধুকে সকালে আসতে বলে দাও। এত রাতে তোমার বন্ধু সেই তাওরাঙ্গা থেকে ওয়াহিতে একশো দশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আসবে। এছাড়া ঝড়-বাদলের রাত। রাত তো কম হয়নি। তুমি রাতটা এখানেই কাটিয়ে যাও।

আবিদ জিজ্ঞেস করল, আপনার অসুবিধা হবে না? আমি এমনিতেই আপনাকে অনেক ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি।

মিসেস এলিরা বললেন, কী বলো, কীসের ঝামেলা?

- ঝামেলাই তো। গাড়ি দিয়ে আপনার খামার ভেঙেছি।

- ও কিছু নয়। ওটা তো ইনস্যুরেন্সই কভার করবে।

- আপনাকে এত রাতে বিরক্ত করছি। আপনি এসে না উদ্ধার করলে কী যে হতো?

- কিছুই হতো না। তুমি নিজেই একটা ব্যবস্থা করে নিতে। আর মানুষ তো মানুষের জন্যই।

আবিদ বলল, তা অবশ্য ঠিক। খুব মূল্যবান কথা। মানুষ তো মানুষের জন্যই।

মিসেস এলিরা হাসলেন। বললেন, তুমি আমার ছেলের বয়সী। আমার এত বড় বাড়ি। একাই থাকি। তুমি এখন আছ বলে আমিও তো তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারছি। এটাইবা কম কী? আর নাতো বাড়িটা এসময় ভুতুড়ে হয়ে থাকে। আচ্ছা, তুমি কফি খাবে? আমার এক কাপ কফি খেতে ইচ্ছে করছে।

আবিদ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, জি, অসুবিধা নেই। কিন্তু আপনি আবার কষ্ট করবেন? আমাকে বলুন, আমি কফি বানাই।

মিসেস এলিরা একটা দিঘল হাসি দিয়ে বললেন, কী যে বলো! কফি বানাতে আবার কিসের কষ্ট? ইনস্ট্যান্ট কফি আছে। আর হটওয়াটার জগ অন করলেই হলো। তুমি কফিতে কয় চামচ চিনি খাও?

আবিদ বলল, দুই চামচ।

চার

আবিদ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে মিসেস এলিরা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে কান পাতল। বাইরের বৃষ্টিটা আবার বেড়ে গেছে। এখন ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে। যদিও জানালা বন্ধ, তারপরও দুধ-সাদা পর্দায় দুলুনি একটু বেড়ে গেছে।

মিসেস এলিরা বললেন, তোমার গায়ে সুয়েটারটা খুব সুন্দর মানিয়েছে।

আবিদ জানালার পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে হেসে বলল, সুয়েটারটা খুব সুন্দর।

- আমি নিজে ওল দিয়ে বানিয়েছি।

- তাই নাকি? দারুণ!

- হ্যাঁ, কিন্তু আমার ছেলে অবশ্য খুব একটা পছন্দ করেনি। বলে কী জানো, এসব চক্রবক্রা সুয়েটার কেন বানিয়েছি। আজকাল সুয়েটার নাকি কেউ পরে না।

আবিদ হাসল। বলল, এটা অবশ্য ভুল কথা। অনেকেই পরে। সুয়েটারটা সত্যি খুব সুন্দর বানিয়েছেন। একটা কথা কী, আমার মা অবশ্য আমার জন্য সুয়েটার বানাতেন না। বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে উল এত সহজে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন মা আমার জন্য সুন্দর করে কাঁথা সেলাই করে পাটাতেন। কাঁথাগুলোতে রং-বেরংয়ের সুতোর কাজ থাকত। এমন রং-বেরংয়ের সুতোর কাজ করা কাঁথা দেখে আমার খুব বিরক্ত লাগত। আসলে এই নিউজিল্যান্ডে এসে বুঝি মার সেলাই করা কাথাগুলো কী মূল্যবান ছিল।

মিসেস এলিরা হাসলেন। বেশ মিষ্টি হাসি। বললেন, সত্যিই তাই। আমি আমার ছেলের জন্য আরও অনেক কিছুই বানাই। আমার হাতে তো এখন অফুরন্ত সময়। ছেলে একবছর পরপর ক্রিস্টমাসে মেলবোর্ন থেকে বাড়িতে আসে।

আবিদ জিজ্ঞেস করল, আপনি মেলবোর্ন যান না?

- গিয়েছি। কয়েকবারই গিয়েছি। কিন্তু ওখানে আমার মন টিকে না। আমি কান্ট্রি গার্ল তো। সেই পঞ্চাশ বছর ধরে খামারটায় আছি। আমি আর আমার স্বামী মিলে তিলতিল করে খামারটা গড়ে তুলেছি। এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকতে ইচ্ছে করে না। যেখানেই যাই স্বামীর স্মৃতি আমাকে টানে।

- আপনার স্বামী?

- সে তিন বছর আগে মারা গেছে।

- এই খামার কে দেখাশোনা করে?

- একজন লোক রেখে দিয়েছি। সেই-ই আমার গরুর ফার্মটা দেখাশোনা করে। বলেই তিনি কী ভেবে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কোথায় যেন ক্ষয়ে গেলেন।

আবিদ কফির কাপে চুমুক দিয়ে মিসেস এলিরার দিকে তাকিয়ে রইল। সত্তর বছর বয়স্কা একজন মহিলা। বয়স আরও বেশিও হতে পারে। এখানকার সবার বয়স তো ঠিক বোঝা যায় না। তিনি একাকী নির্জন একটা বাড়িতে।

আবিদ ভাবল, তার মা তো মিসেস এলিরার সমবয়সীই হবেন। বাংলাদেশের একটা ছোট্ট গ্রামের নির্জন বাড়িতে তার মা-ও একা থাকেন। মা তার একমাত্র মায়াতরু। কতদিন তার বাড়িতে যাওয়া হয় না!

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

ব্রুকলিন ব্রিজ

ছবি

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

সাহিত্যের ভাষা, ভাব ও রচনারীতি প্রসঙ্গে

ছবি

সাযুজ্য : অগ্রজ নোবেল লরিয়েট

ছবি

আব্দুলরাজাক গুরনাহ

ছবি

গুরনাহর উপন্যাসে ঔপনিবেশিকতা বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসী জীবনের ট্রমা

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

tab

সাময়িকী

একজন মায়াতরুর গল্প

মহিবুল আলম

রোববার, ২২ আগস্ট ২০২১

এক.

ভদ্রমহিলা হাতের কনুই এবং কপালে তুলো ও স্যাভলন দিয়ে মুছে দুটো ব্যান্ড-এইড লাগিয়ে দিয়ে বললেন, যাক বাবা, ঈশ্বর তোমাকে রক্ষা করেছেন। তোমাকে প্রথমে যে অবস্থায় দেখেছি, তাতে মনে হয়েছিল অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

আবিদ কিছু বলল না। সে বুঝতে পারছিল এ অবস্থায় ভদ্রমহিলাকে সৌজন্যমূলক কিছু বলা প্রয়োজন। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। সে শুধু ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।

ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার শরীরে আর কোথাও কেটেছে বলে মনে হচ্ছে?

আবিদ মাথা নেড়ে বলল, না।

- শরীরের কোথাও ব্যথা?

- জি, ব্যথা সামান্য আছে। হাতের কনুই আর কপালে।

- আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমাকে দুটো পেইন কিলার দিচ্ছি।

আবিদ সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকাল।

ভদ্রমহিলা ফাস্টএইডের বাক্সটা গোছাতে গোছাতে বললেন, তুমি একটু সুস্থির হয়ে বসো। আমি উপর থেকে আসছি।

আবিদ আবারও মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল।

ভদ্রমহিলা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলেন।

আবিদ ভদ্রমহিলার গমনপথের দিকে তাকিয়ে থেকে কিছুক্ষণ আগের দুর্ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে বসল। তার এতটুকু খেয়াল আছে, সে খুব একটা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল না। তবে প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছিল। গাড়ির হেডলাইটের হাত কয়েক পরই সে ঝাপসা দেখছিল। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পিচের রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ার কারণে, নাকি রাস্তার বাঁকটা বেশি ছিল? সে হঠাৎ বুঝতে পারে, গাড়িটা সে ব্রেক চেপেও আয়ত্বে রাখতে পারছে না। গাড়িটা রাস্তা থেকে ছিটকে গিয়ে কাঁটাতারের বেড়া ছিঁড়ে একটা খামারের দিকে ছুটছে। তারপর সে কয়েকটা গরুকে এলোমেলো ছুটতে দেখে। একটা বিদ্যুতের খাম্বা। বিকট একটা শব্দ। একটা গরুর ডাক- হাম্বা-অ-অ।

আবিদ একটু দ্বিধায় আছে, তারপর সে কি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল? আর জ্ঞান হারালে তা কতক্ষণের জন্য? সে হঠাৎ অনুভব করে, একটা টর্চলাইটের আলো তার চেহারায় এসে পড়ছে। হলুদ রেইনকোট পরা কে একজন ঝুঁকে তাকে দেখছে। তারপর গাড়ির দরজা খোলার শব্দ- ক্যা-য়ে-ত।

দুই

নিউজিল্যান্ডের বৃষ্টি এমনই। একবার শুরু হলে আর থামতে চায় না। এখন বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়োহাওয়া বইছে। বাইরে থেকে শব্দ আসছে- শন শন, শন শন। বৃষ্টির জল ছিটকে এসে কাচের দরজায় পড়ছে।

ভদ্রমহিলা উপর থেকে নেমে এলেন। তার গায়ে এখন কফি রংয়ের একটা ভারি স্লিপিং গাউন। হাতে প্যান্ট, শার্ট আর একটা সবুজ-লালের দুই রঙা চক্রাবক্রা সুয়েটার। তিনি এগুলো আবিদের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, তুমি ভেজা কাপড়ে এভাবে কতক্ষণ থাকবে? এই কাপড়গুলো পরো। আমি তোমার কাপড়গুলো ড্রাইয়ারে শুকিয়ে দিচ্ছি।

আবিদ হাত বাড়িয়ে নিল।

ভদ্রমহিলা নিজ থেকেই বললেন, এগুলো আমার ছেলের। সে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকে। এখানে এলে পরে। তুমি ওদিকে চলে যাও। ওটাই গেস্টরুম। ওটার পাশে বাথরুম আছে।

আবিদ মাথা ঝাঁকিয়ে গেস্টরুমের পাশের বাথরুমে চলে গেল। ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে শুকনো কাপড়গুলো পরে আবার যখন লাউঞ্জে এল ততক্ষণে ভদ্রমহিলা কিচেনে কিছু একটা করছেন। তাকে দেখেই ভদ্রমহিলা হেসে বললেন, তোমার জন্য ক্যানের টুনা ফিস হালকা তেলে ভেজে নিচ্ছি। স্যান্ডউইচ বানাব।

আবিদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, কেন?

ভদ্রমহিলা বললেন, তুমি কখন না কখন খেয়ে বের হয়েছ। তোমাকে পেইন কিলার ট্যাবলেট খেতে হবে। পেইন কিলার ট্যাবলেট খাওয়ার আগে কিছু একটা খেয়ে নিতে হয়।

আবিদ স্মিত হাসল। কিছু বলল না। সে লাউঞ্জে একটা সোফায় বসে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল।

কিচেনে ভদ্রমহিলা খানিকটা কুঁজো হয়ে টুনা ফিস ভাজছেন। ফ্রাইপেনে তাঁর চামচ নাড়ার শব্দ হচ্ছে- খয়চ-খয়চ-খয়চ। পাশেই এক বোতল ক্যানোলা তেল। তিনি সরু ধোঁয়া ওঠা ফ্রাইপেনের দিকে ঝুঁকে কিছু একটা দেখে বোতল থেকে ফ্রাইপেনে আরও তেল ঢালতে গিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন, তা দেখে আবিদ খানিকটা চমকে উঠল। এই চমকে ওঠার কারণ আর কিছু নয়, তার মাকে ভেবে। তার মা যে এমনই একটা ভঙ্গি করে রান্না করতেন।

আবিদ মুগ্ধ হয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রইল। তার তৎক্ষণাৎ তার গ্রামের কথা মনে পড়ে গেল। তার গ্রামের নাম সাহেবপুর। একেবারে অজপাড়া গাঁ। তখনও গ্রামে বিদ্যুৎ আসেনি। সে যখন কলেজে পড়ত বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গ্রামে আসত, তখন গ্রামের ছোট্ট বাজারে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেত। মা ঘরের দাওয়ায় বসে থাকতেন। ঘরের ভেতর থেকে হাট দরজা দিয়ে কুপির আলো এসে পড়ত ঘরের দাওয়ার অনেকটা অবধি। মার একটা দিঘল ছায়া হতো। সে বাড়ি ফিরলেই মা পাশের দুচালা ছনের ঘরটায় যেতেন ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া তরকারিগুলো চুলায় গরম করতে। তিনি চুলায় পাটখড়ি ও শুকনো লতাপাতা ঠেলে চুলা জ্বালাতেন। তরকারি যখন কড়াইতে গরম হয়ে সরু রেখা করে ধোঁয়া তুলত, তখন মা কুপির কাত করা আলোয় তরকারি ঠিকমতো গরম হয়েছে কি না দেখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু মার বয়সী চোখ। তিনি কুপি কাত করে যখন তরকারির গরম হওয়া দেখতেন, তখন প্রায়ই কুপি থেকে ফোঁটা ফোঁটা কেরোসিন তরকারির কড়াইতে পড়ে যেত। মা টেরই পেতেন না।

আবিদ খেতে বসে টের পেত। সে টের পেলেও কখনও মাকে বলত না।

ভদ্রমহিলা একটা প্লেটে সুন্দর করে টুনা ফিসের স্যান্ডউইচ সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর রেখে বললেন, তুমি স্যান্ডউইচটা খাও। আমি তোমাকে পেইন কিলার ট্যাবলেট দিচ্ছি। ও হো, তোমার নামটা তো আমার জানা হয়নি। কী নাম তোমার?

আবিদ বলল, আমার নাম আবিদুল হাসান।

ভদ্রমহিলা বললেন, আমার নাম মিসেস এলিরা মার্গারেট স্মিথ। তুমি আমাকে মিসেস এলিরা বলেই ডাকতে পার।

আবিদ স্মিত হেসে সায় দিল।

তিন

আবিদ লাউঞ্জের এপাশ-ওপাশ দেখল। এমনিই। দেয়ালে একটা ঘড়ি চলছে- টিকটিক, টিকটিক। ফায়ারপ্লেসে কাঠ পোড়ার শব্দ- ফ্যাসফ্যাস, ফ্যাসফ্যাস। জানালায় দুধ-সাদা পর্দার হালকা দুলুনি। বাইরে ঝড়োশব্দ ছাপিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে বেশি।

মিসেস এলিরা পাশের সোফায় বসে জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন বোধ করছ?

আবিদ বলল, জি, বেশ ভালো বোধ করছি।

মিসেস এলিরা বললেন, মনে করো না তুমিই এখানে প্রথম গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছ। এখানে প্রতিবছরই একটা-দুটো অ্যাক্সিডেন্ট হয়। আমার ফার্মের পাশের হাইওয়ের বাঁকটা একটা বেশি তো।

আবিদ মাথা ঝাঁকাল। কিছু বলল না।

মিসেস এলিরা জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় থেকে ফিরছিলে?

আবিদ বলল, অকল্যান্ড থেকে।

- কোথায় যাচ্ছিলে?

- তাওরাঙ্গা শহরে।

- ওখানে কেন?

- ওখানে সকালে আমার একটা অ্যাপোয়েনমেন্ট আছে। আমি একটা কনসালটেন্টসি ফার্মে চাকরি করি। ভেবেছিলাম রাতে চলে যাই। বন্ধুর বাসায় থাকব। তাই এতরাতে রওনা হয়েছিলাম।

- তোমার দেরি দেখে বন্ধু তো তাহলে চিন্তায় থাকবে।

- জি, নিশ্চয়ই এরই মধ্যে কয়েকবার ফোন করে ফেলেছে।

- তুমি ফোন করে দাও।

- আমার মোবাইলটা গাড়িতে রয়ে গেছে।

মিসেস এলিরা বললেন, ও, আচ্ছা। তুমি আমার মোবাইল থেকে ফোন দাও।

আবিদ বলল, আমি বরং মোবাইলটা গাড়ি থেকে নিয়ে আসি। বৃষ্টিতে মোবাইলটা নষ্ট হয়ে যাতে পারে। এছাড়া জরুরি ফোনও আসতে পারে।

মিসেস এলিরা সায় দিয়ে বললেন, আচ্ছা। তবে টর্চলাইট আর ছাতাটা নিয়ে যাও। বাইরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে।

আবিদ বলল, জি।

বাসার ভেতরে বসে যত জোরে বৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল বাইরে এসে আবিদ সেরকম বৃষ্টি পায়নি। টর্চলাইট জ্বেলে ছাতা মাথায় সে খামারের উঁচু ঘাস মাড়িয়ে গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। গাড়িটার কাছে এসে তার মন খারাপ হয়ে গেল। মাত্র কিছুদিন আগেই সে কোম্পানি থেকে নতুন গাড়িটা পেয়েছে। গাড়িটা বিদ্যুতের থামে গেলে সামনাটা একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে।

মোবাইলটা নিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকতেই মিসেস এলিরা বললেন, আবিদ, তুমি বরং তোমার বন্ধুকে সকালে আসতে বলে দাও। এত রাতে তোমার বন্ধু সেই তাওরাঙ্গা থেকে ওয়াহিতে একশো দশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আসবে। এছাড়া ঝড়-বাদলের রাত। রাত তো কম হয়নি। তুমি রাতটা এখানেই কাটিয়ে যাও।

আবিদ জিজ্ঞেস করল, আপনার অসুবিধা হবে না? আমি এমনিতেই আপনাকে অনেক ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি।

মিসেস এলিরা বললেন, কী বলো, কীসের ঝামেলা?

- ঝামেলাই তো। গাড়ি দিয়ে আপনার খামার ভেঙেছি।

- ও কিছু নয়। ওটা তো ইনস্যুরেন্সই কভার করবে।

- আপনাকে এত রাতে বিরক্ত করছি। আপনি এসে না উদ্ধার করলে কী যে হতো?

- কিছুই হতো না। তুমি নিজেই একটা ব্যবস্থা করে নিতে। আর মানুষ তো মানুষের জন্যই।

আবিদ বলল, তা অবশ্য ঠিক। খুব মূল্যবান কথা। মানুষ তো মানুষের জন্যই।

মিসেস এলিরা হাসলেন। বললেন, তুমি আমার ছেলের বয়সী। আমার এত বড় বাড়ি। একাই থাকি। তুমি এখন আছ বলে আমিও তো তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারছি। এটাইবা কম কী? আর নাতো বাড়িটা এসময় ভুতুড়ে হয়ে থাকে। আচ্ছা, তুমি কফি খাবে? আমার এক কাপ কফি খেতে ইচ্ছে করছে।

আবিদ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, জি, অসুবিধা নেই। কিন্তু আপনি আবার কষ্ট করবেন? আমাকে বলুন, আমি কফি বানাই।

মিসেস এলিরা একটা দিঘল হাসি দিয়ে বললেন, কী যে বলো! কফি বানাতে আবার কিসের কষ্ট? ইনস্ট্যান্ট কফি আছে। আর হটওয়াটার জগ অন করলেই হলো। তুমি কফিতে কয় চামচ চিনি খাও?

আবিদ বলল, দুই চামচ।

চার

আবিদ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে মিসেস এলিরা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে কান পাতল। বাইরের বৃষ্টিটা আবার বেড়ে গেছে। এখন ঝমঝম করে বৃষ্টি হচ্ছে। যদিও জানালা বন্ধ, তারপরও দুধ-সাদা পর্দায় দুলুনি একটু বেড়ে গেছে।

মিসেস এলিরা বললেন, তোমার গায়ে সুয়েটারটা খুব সুন্দর মানিয়েছে।

আবিদ জানালার পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে হেসে বলল, সুয়েটারটা খুব সুন্দর।

- আমি নিজে ওল দিয়ে বানিয়েছি।

- তাই নাকি? দারুণ!

- হ্যাঁ, কিন্তু আমার ছেলে অবশ্য খুব একটা পছন্দ করেনি। বলে কী জানো, এসব চক্রবক্রা সুয়েটার কেন বানিয়েছি। আজকাল সুয়েটার নাকি কেউ পরে না।

আবিদ হাসল। বলল, এটা অবশ্য ভুল কথা। অনেকেই পরে। সুয়েটারটা সত্যি খুব সুন্দর বানিয়েছেন। একটা কথা কী, আমার মা অবশ্য আমার জন্য সুয়েটার বানাতেন না। বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে উল এত সহজে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন মা আমার জন্য সুন্দর করে কাঁথা সেলাই করে পাটাতেন। কাঁথাগুলোতে রং-বেরংয়ের সুতোর কাজ থাকত। এমন রং-বেরংয়ের সুতোর কাজ করা কাঁথা দেখে আমার খুব বিরক্ত লাগত। আসলে এই নিউজিল্যান্ডে এসে বুঝি মার সেলাই করা কাথাগুলো কী মূল্যবান ছিল।

মিসেস এলিরা হাসলেন। বেশ মিষ্টি হাসি। বললেন, সত্যিই তাই। আমি আমার ছেলের জন্য আরও অনেক কিছুই বানাই। আমার হাতে তো এখন অফুরন্ত সময়। ছেলে একবছর পরপর ক্রিস্টমাসে মেলবোর্ন থেকে বাড়িতে আসে।

আবিদ জিজ্ঞেস করল, আপনি মেলবোর্ন যান না?

- গিয়েছি। কয়েকবারই গিয়েছি। কিন্তু ওখানে আমার মন টিকে না। আমি কান্ট্রি গার্ল তো। সেই পঞ্চাশ বছর ধরে খামারটায় আছি। আমি আর আমার স্বামী মিলে তিলতিল করে খামারটা গড়ে তুলেছি। এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও থাকতে ইচ্ছে করে না। যেখানেই যাই স্বামীর স্মৃতি আমাকে টানে।

- আপনার স্বামী?

- সে তিন বছর আগে মারা গেছে।

- এই খামার কে দেখাশোনা করে?

- একজন লোক রেখে দিয়েছি। সেই-ই আমার গরুর ফার্মটা দেখাশোনা করে। বলেই তিনি কী ভেবে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কোথায় যেন ক্ষয়ে গেলেন।

আবিদ কফির কাপে চুমুক দিয়ে মিসেস এলিরার দিকে তাকিয়ে রইল। সত্তর বছর বয়স্কা একজন মহিলা। বয়স আরও বেশিও হতে পারে। এখানকার সবার বয়স তো ঠিক বোঝা যায় না। তিনি একাকী নির্জন একটা বাড়িতে।

আবিদ ভাবল, তার মা তো মিসেস এলিরার সমবয়সীই হবেন। বাংলাদেশের একটা ছোট্ট গ্রামের নির্জন বাড়িতে তার মা-ও একা থাকেন। মা তার একমাত্র মায়াতরু। কতদিন তার বাড়িতে যাওয়া হয় না!

back to top