alt

সাময়িকী

শহরের শেষ রোদ

সৈয়দ নূরুল আলম

: রোববার, ২২ আগস্ট ২০২১

শিল্পী : এ্যাসেল পান্ডেরা

শীতের রাত। কয়েকদিন ধরে শীত জেঁকে বসেছে। শীতের সাথে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। রাত তখন আড়াইটা। একটা মেয়ে রোকেয়া হলের গেটের সামনে পড়ে আছে। এত রাতে আশেপাশে তেমন কোনো মানুষ নেই, যে কিনা মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে ছুটে আসবে। একটা টহল পুলিশের গাড়ি ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল, মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে গাড়ি থামে। গাড়ি থেকে একজন পুলিশ অফিসার নেমে আসে, সঙ্গে তার দু’জন জুনিয়র কলিগ। মেয়েটি উবুড় হয়ে পড়ে আছে। অফিসার মেয়েটিকে টেনে চিৎ করে। কপাল কেটে রক্ত বের হয়েছে, নাক থেতলে গেছে। রাস্তার বালু মুখের এখানে ওখানে। চশমা ভেঙে পাশে পড়ে আছে। মেয়েটি বেঁচে আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য অফিসার প্রথমে মেয়েটির নাকের কাছে ডান হাতের আঙ্গুল নিয়ে নিশ্বাস দেখে। নিশ্বাস পায় না। পরে পাল্স আছে কিনা পরীক্ষা করার জন্য মেয়েটির হাতের কব্জি কয়েক সেকেন্ড টিপে ধরে রাখে। অফিসার পাল্স পায় না। অফিসারের মুখ দিয়ে ‘মাইগড’ শব্দ বের হয়। মেয়েটি সত্যি সত্যি মারা গেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অফিসার তার জুনিয়র সহকর্মীকে বলে, ‘মেয়েটিকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে চল, কুইক।’

কুষ্টিয়া শহর থেকে দেড় কিলো দূরে, ধলপুর গ্রামে, হাসেম আলী স্ত্রী আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকে। নিম্ন মধ্যবিত্তের পরিবার। হাসেম আলী বাজারে চালের মিলে কাজ করে। ধানের মৌসুমে ব্যস্ত সময় কাটে। কাজের চাপে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যায়। অনেক দিন দুপুরে বাড়ি যেয়ে খেতে পারে না। বাজারে শিঙাড়া-পুরি আর এককাপ দুধচা খেয়ে কাটিয়ে দেয়। মিল মালিক হাসেম আলীর এই কাজের প্রতি আগ্রহ দেখে খুশি হয়। দিন হাড়া মজুরীর বাইরেও মাঝেমধ্যে হাসেম আলিকে বাড়তি কিছু টাকাপয়সা দিয়ে থাকে। এই বাড়তি টাকা নিতে হাসেম আলী কুণ্ঠাবোধ করে, কিন্তু না নিয়ে পারে না। সংসারে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। দুটো মেয়ে পড়াশোনা করে। বড় মেয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে, ছোট মেয়ে ক্লাস টেনে।

পুলিশের গাড়ি একটা মেয়েকে নিয়ে ইমারজেন্সিতে এসেছে, সে খবর পেয়ে কর্তব্যরত ডাক্তার অন্য কাজ ফেলে ছুটে আসে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে ডাক্তার বলে, ‘মেয়েটি দু’ঘণ্টা আগেই মারা গেছে।’

পুলিশ অফিসার ইমরান এ ধরনের কেস অনেক ডিল করেছে, তাই সে ঘাবড়ায় না। ডাক্তারকে বলে, ‘লাশটা হিম ঘরে রাখার ব্যবস্থা করেন, আমি রোকেয়া হলে যেয়ে দেখি, হলের কোনো ছাত্রী বা হলের আবাসিক শিক্ষক মেয়েটিকে শনাক্ত করতে পারে কিনা। কিন্তু এত রাতে তো সম্ভব হবে না। সকাল ছাড়া তো কিছুই করা যাবে না। চিন্তা করবেন না। সকালে আমি নিজে আসব। নিশ্চয় একটা ক্লু পাওয়া যাবে।’

ডাক্তার বুঝতে পারে, আইনের লোকের সাথে আইন দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। তাই একটা কাগজে খস খস করে কিছু একটা লিখে ইমরানের সামনে দিয়ে বলে, স্যার এখানে একটা সই করে দিন। ফোন নম্বরটাও দেবেন।

ইমরান একবার ডাক্তারের দিকে তাকায়, তারপরে কাগজে কী লিখেছে, তা না পড়েই কাগজটার নিচে সই করে, নিজের নাম লেখে। ডাক্তারের কথা মতো ফোন নম্বরটা দিতেও ভুলে না।

হাসেম আলির মেয়ে দুটো বেশ লক্ষ্মী হয়েছে। ওদের পেছনে তেমন কোনো বাড়তি খরচ করতে হয় না। জামা-কাপড়, সাজগোজে ওদের তেমন কোনো চাহিদা নেই। বড় মেয়েটা বরাবর বৃত্তি নিয়ে পড়েছে। তারপরেও হাসেম আলির একার পক্ষে মেয়েদের এতটা পথ টেনে আনা সম্ভব ছিল না, এটা একমাত্র সম্ভব হয়েছে হাসেম আলির স্ত্রী রাহেলার জন্য, সংসারের সব কাজ করার পরে রাহেলা যতটুকু সময় পায়, সেটা সেলাইয়ের কাজে লাগায়। মহল্লার আশেপাশের মহিলাদের ব্লাউজ-সালোয়ার-কামিজ সেলাইয়ের কাজ করে। এ থেকে যে আয় হয়, তা মেয়েদের লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করে।

বড় মেয়েটাকে নিয়ে রাহেলা খুব চিন্তা করে। এই যুগে এত সহজ সরল মানুষ হয়! কারও বই হারায়ে গেলে নিজের বই তাকে দিয়ে দেবে। কলেজে নিজে নোট তৈরি করে আগে বন্ধবীদের দিয়ে বলবে- ফটোকপি করে নে। অনেকে আবার মূল নোটটা ফেরতই দেয় না। এর পরেও মেয়েটা বান্ধবীদের সাথে রাগ করে না, ঝগড়া করে না। দ্বিতীয়বার নোট করতে বসে যায়। নিজেদের টানাটানির সংসার, তার পরেও বান্ধবিরা যদি বলে, বৃত্তির টাকা পেলি, আমাদের কিছু খাওয়াবি না? তখন তাদের কথা ফেলতে পারে না। সবাইকে নিয়ে কলেজ মোড়ে কিসমত মিয়ার গ্রীলের দোকানে যেয়ে বলবে, ‘নে তোরা যত পারিস খা।’

এসব কারণে কলেজের সবাই ওকে ‘জলপাতা’ বলে ডাকে। জলের মতো সহজ, সরল, তরল।

এ যুগে ভালো মানুষের জায়গা নেই। তারা পদে পদে বিপদে পড়ে, মা একথাটা মেয়েকে কিছুতেই বোঝাতে পারে না। তাই সারাক্ষণ রাহেলা চিন্তার আগুনে জ্বলতে থাকে। একে তো সোজা, তার ওপর মেয়েটা মাশাল্লা দেখতে শুনতে ভালো। গায়ের রঙ একেবারে ফর্সা না হলেও, একবার কেউ দেখলে সবাই তাকে রূপবতী বলবে। টানা টানা চোখ, কলার মোচার মতো নাক। জোড়া ভুরু। সব মিলে, ভারি একটা মিষ্টি চেহারা। এ নিয়ে রাহেলা বেগম মনে মনে গর্ববোধ করে, আবার অজানা ভয়ও তাকে খামচে ধরে।

পুলিশ অফিসার ইমরান কাজের প্রতি সব সময় সজাগ। সে মনে করে আগে প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব পালন, তারপর ব্যক্তিগত জীবন। এ জন্যে সে তিন বছরে দুটো প্রমোশন পেয়েছে। তাই দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করে, ভোরেই ইমরান ছুটে এসেছে রোকেয়া হলে। সকালে দুটো মেয়ে মর্নিংওয়াক করার জন্য গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, তারা গেটে পুলিশের গাড়ি দেখে আর বের হয় না। পুলিশের গাড়ি, পুলিশ, এসব দেখে ওদের মুখ ভয়ার্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে গত রাতের সব কথা শুনে, ওরা-ই হলের অন্য মেয়েদের খবর দেয়, পুলিশ আসার কারণটা জানায়। হল সংসদের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন মেয়ে এগিয়ে এলে ইমরান বলে, ‘গত রাত দুইটার দিকে একটা মেয়ে গেটের কাছে পড়ে ছিল। মেয়েটি মোটামুটি লম্বা, চুল ঘাড় পর্যন্ত, স্বাস্থ্য ভালো, চোখে চশমা পরে, সে সময় মেয়েটি শাড়ি পরা ছিল, সবুজ টিয়া রঙের শাড়ি। কপালে শাড়ির রঙের টিপ।’ এভাবে ইমরান মেয়েটির বর্ণনা দেয়। বর্ণনা শুনে মেয়েরা একে অন্যের দিকে তাকায়। বর্ণনার সাথে কাউকে মেলাতে পারে না।

ইমরান একটু থেমে, লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে আবার বলে, ‘মেয়েটি মারা গেছে। লাশ ঢাকা মেডিক্যালে রাখা আছে। আপনারা কয়েকজন চলেন, দেখবেন, শনাক্ত করতে পারেন কিনা। আমি আপনাদের হলের আবাসিক শিক্ষক হাসনা ইসলামকে ফোনে সব বলেছি, উনি বাসা থেকে সরাসরি হাসপাতালে যাচ্ছেন।’

হাসেম আলির মেয়ে দুটো তার কাছে জানের জান। ওদের সাথে আম্মাজান ছাড়া কথা বলে না। আপনি আপনি করে কথা বলে। ছোট সময় আদর করে বলত, আম্মাজান আপনি খেয়েছেন? আপনি ঘুমাবেন না? সেই আপনি বলা আর ছাড়তে পারেনি।

এই আহ্লাদী আহ্লাদী ভাব রাহেলার পছন্দ না। রাহেলার কথা, মেয়েদের আদরের পাশাপাশি শাসনও করতে হয় কিন্তু হাসেম আলি সেটা বুঝতে চায় না। নিজে বছরের ছ’মাস কাজ করে, আর ছ’মাস গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়ায়। দিন নাই, রাত নাই বাজারে পড়ে থেকে তাস খেলে। আড্ডা দেয়।

সেদিন খেতে খেতে হাসেম আলি বড় মেয়েকে বলে, ‘বড় আম্মাজান আপনি নাকি ঢাকা যাবেন? ঢাকা চেনে না, জানেন না, কীভাবে যাবেন?’

বাবার একথা শুনে বড় মেয়ে পাতা টাশকি খায়। মনের কথা বাবা জানল কীভাবে!

বাবা যখন জেনে গেছে, তখন আর পাতা লুকায় না। বলে, ‘বাবা, আমার খুব ইচ্ছে আমি ঢাকা ভার্সিটিতে ইকোনোমিক্স নিয়ে পড়ব। কিছু দিন পরে তো ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট দেবে। ভাবছি তার আগে ভার্সিটি-হল একটু চিনে আসি।’

‘কথাটা মন্দ বলেননি আম্মাজান। তয় ঢাকায় কোথায় উঠবেন?’

‘বাবা আমিন বাজার খালার বাসায় ওঠব। ওখান থেকে খালাতো ভাই নয়নকে নিয়ে ভার্সিটিতে যাব।’

মেয়ের একথা শোনার পর হাসেম আলি আর কিছু বলেনি। এসময় খাবার টেবিলে ছোট মেয়ে শাপলাও ছিল। ও কিছু না বলে, মিটিমিটি হাসে। বড় বোনের ঢাকা যাওয়ার কথাটা যে ও বাবার কানে লাগিয়েছে, সে কথাটা পাতাকে বলে কী করে!

দু’দিন আগে পাতা যখন আদনানের সাথে ফোনে কথা বলে, তখন শাপলা দরজার পাশ থেকে আড়ি পেতে সব কথা শুনেছে। সেটা-ই চালান করে দিয়েছে বাবার কাছে। এখনও পাতা বাবাকে একটা মিথ্যে কথা বলল। ও খালার বাসা যাবে না। ও যাবে আদনানের সাথে দেখা করতে। একথাটা শাপলা আর বাবার কানে দেয় না। দিলে, পাতা দু’দিন মুখ কালো করে থাকবে। ভালো মতো কথা বলবে না। তাছাড়া শাপলার সব আবদার তো বড় আপাই মেটায়। বড় আপার টিউশনির টাকার বড় অংশটা তো শাপলার হাত দিয়ে-ই খরচ হয়। এসব ভেবে শাপলা বাবাকে আসল খবরটা দেয় না। এর বিনিময়ে শাপলা ভেবে রেখেছে, বড় আপা ঢাকা যাওয়ার সময় কানে কানে বলে দেবে, ওর নিজস্ব কিছু জিনিস আনতে। যে জিনিস সবার সামনে উচু স্বরে বলা যায় না।

হাসপাতাল মর্গে যেয়ে মেয়েটাকে কেউ শনাক্ত করতে পারে না। যারা মর্গে গিয়েছিল তারা শত ভাগ নিশ্চিত- ওদের হলের মেয়ে না। ইমরান মেয়েদের গাড়িতে করে আবার হলে দিয়ে যায়। যাবার সময় বলে, ‘স্যরি, এই সাতসকালে আপনাদের কষ্ট দেয়া হলো। তবে আপনারা বেঁচে গেলেন, আপনাদের হলের মেয়ে হলে, আরও অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। এমনকি থানা পর্যন্তও যেতে হতে পারত।’ কিন্তু ইমরান বুঝতে পারে না, মেয়েটাকে মেরে রোকেয়া হলের সামনে ফেলে রাখার কারণ কী! আর কারা-ইবা মারল?

মাস ছয়েক আগে, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেয়ার পরে, আদনানের সাথে পাতার ফেসবুকে পরিচয় হয়। আদনান ওর ফেসবুক বন্ধু। এর আগে পাতার ফেসবুক একাউন্ট-ই ছিল না। কলেজের বন্ধুরা যখন ভার্চুয়ালি বা সরাসরি ছেলে বন্ধুদের সাথে গড়াগড়ি খেয়ে, আনন্দ-উল্লাসে সময় কাটাচ্ছিল, পাতা তখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। ওকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। সংসারের হাল ধরে, বাবা-মা’র মুখে হাসি ফোটাতে হবে, সব সময় এই চিন্তা পাতার মাথার ঘুরপাক খেত।

আদনানের সাথে পাতার বন্ধুত্বটা দ্রুতই জমে যায়। সেটা হয়ত পাতার ‘জলপাতা’ নামের কারণে অথবা এতদিন কোনো বন্ধু ছিল না, জীবনে প্রথম একটা বন্ধু পেল, সে কারণে। ছ’মাসের মধ্যে দু’জনেরই জন্মদিন চলে আসে। দু’জনই একে অপরকে কুরিয়ার করে গিফট পাঠায়। আদনান আড়ং থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে একসেট গয়না কিনে পাঠায়। চমৎকার গয়নার সেটটা পেয়ে পাতা তো মহাখুশি- এত দামি, এত সুন্দর একটা গিফট তাকে পাঠাল! সে তুলনায় আদনানকে পাঠানো গিফট একটু কম দামি হওয়ায়, পাতার মন বেশ কিছু দিন খুঁতখুঁত করেছে।

ঢাকা আসার প্রস্তাবটা আদনানই পাতাকে দিয়ে বলেছিল, ‘দু’দিন পরে ঢাকা তো আসবেই। তার আগে একবার আসো- ভার্সিটি, কার্জন হল, যাদুঘর, নিউমার্কেট, ঢাকা শহরে যা যা দেখার আছে, তোমাকে দেখিয়ে দিই।’

এ প্রস্তাব পেয়ে পাতা ফড়িঙের মতো আনন্দে নেচে ওঠে। আদনান কোথায় থাকে, কীভাবে থাকে এতটা আর তলিয়ে দেখেনি। বাবাকে মিথ্যে বলে, মাকে না জানিয়ে, ছোট বোনের কাছে গোপন করে, ও ঢাকা আসে।

কথা ছিল পাতা কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সরাসরি বাসে এসে গাবতলি নামবে, ওখান থেকে আদনান তাকে নিয়ে আসবে। কুষ্টিয়া থেকে বাস ঠিক সময় ছাড়ে। এবং পথে তেমন একটা যানজট না থাকায় বাসটা ঠিক সময় গাবতলি এসে পৌঁছায়।

আজ আদনানের ঈদের দিন। মাঝে মাঝে ওর ঈদের দিন আসে। এদিনগুলো কখনো ও একা উপভোগ করে, কখনো বন্ধুরা আসে, তাদের সাথে উপভোগ করে।

পাতা বাস থেকে নেমে দেখে, বিরাট একটা হোন্ডা নিয়ে আদনান তার জন্য অপেক্ষা করছে। রওনা দেয়ার আগে পাতা ফোনে আদনানকে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে চিনবো কী করে? ফেসবুকের মানুষটা আর আসল মানুষটা কী এক?’

‘আমার হোন্ডটা নিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। হোন্ডা দেখে তুমি আমাকে চিনে নিও।’

মানুষ সাধারণত প্রথম দেখার ক্ষেত্রে বলে, আমি ওই রঙের শার্ট বা আমি ওই রঙের শাড়ি পরে আসব। কিন্তু এরা সে ধরনের কিছু বলেনি। অথচ কাকতালীয়ভাবে আদনান জিনস প্যান্টের সাথে লাল গেঞ্জি আর পাতা পরেছে লাল সালোয়ার কামিজ। দু’জনের রঙ মিলে যাওয়াতে পাতা অবাক হয়ে ভাবে, এর নাম কী টান। যে টানে ও ছুটে এসেছে!

আদনানের হোন্ডাটা দেখতে বাঘের মতো। আদনান পাতাকে বলে, ‘আমার মাজাটা ভালো করে পেঁচিয়ে ধরে, শক্ত হয়ে বসো। পাতার হোন্ডা চড়ার বেশ অভ্যেস আছে। তার চাচাতো ভাই আকিবের একটা হোন্ডা আছে। সে হোন্ডায় ও কতো চড়েছে। আকিবের পেছনে যেভাবে বসত, সেভাবে একহাতে আদনানকে ধরে বসে। অন্য হাতে পাতার হাত ব্যাগ। ব্যাগে পাতা একটা মাত্র বাড়তি ড্রেস নিয়েছে।

‘সেই সকালে বাসা থেকে রওনা দিয়েছ, নিশ্চয় খিদে পেয়েছে, চলো, এখান থেকে কিছু খেয়ে নিই।’

আদনানের একথায় পাতার মধ্যে মুগ্ধতা ছড়ায়। ভাবে, আদনান কতোটা কেয়ারিং!

ওরা শাহবাগ মোড়ে ‘ডেংগুলি’ হোটেল থেকে পেটপুড়ে খেয়ে প্রথমে কলা ভবনে আসে।

কলাভবনে আম গাছের নিচে একটা নিরিবিলি জায়গায় ওরা বসে। পাতা বাড়ি থেকে ছোট একটা বোয়েমে করে আমের আচার নিয়ে এসেছিল, ব্যাগ থেকে আচার বের করে আদনানকে খেতে দেয়। আচার খেতে খেতে আদনান বলে, ‘তুমি একটা বোকা মেয়ে। একটা ছেলের সাথে ফেসবুকে মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়, সে ডাকল, আর তুমি চলে আসলে?’

পাতা আদনানের মুখের দিকে তাকায়, ওর মুখটা পড়তে চেষ্টা করে।

আদনান আচার খাওয়া শেষ করে, আঙুল চুষতে চুষতে আবার বলে, আমার যে ফেসবুক আইডি দেখেছ, সেটা তো, ঠিক না-ও হতে পারে। আজকাল অনেকে মিথ্যে ইনফর্মেশন দিয়ে আইডি খোলে, সেটা ছেলে হোক, কি মেয়ে হোক, তুমি সেটা জান না?

পাতা আদনানের কথা বুঝতে পারে না। আর বুঝতেও চায় না। ও ফেসবুকে চ্যাট করতে করতে আদনানকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে। সত্য হোক, মিথ্যে হোক, কোনো কথা-ই ওকে টলাতে পারবে না। ওর বিশ্বাসে ঘুন ধরবে না।

ওরা ওখান থেকে কার্জন হলে যায়। বিকেল শেষে সন্ধে নেমেছে। কার্জন হলের বড় বড় গাছ থেকে একটা-দুটো পাখি ওড়া শুরু হয়েছে। অন্ধকার একটু ঘন হওয়ায় গুচ্ছে গুচ্ছে ছেলেমেয়েরা ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। আদনানরা একটা পছন্দ মতো জায়গা বেছে নেয়। আশেপাশে চোখ যেতেই পাতার অস্বস্তি লাগে। আদনান অবশ্য পাতার থেকে একটু দূরত্ব রেখেই বসে। আদনান একটা ঘাসের ডগা ছিঁড়ে চিবোতে চিবোতে বলে, ‘আসলে এতদিন তুমি যা জেনেছ, আমি তা নই। আমার আইডিতে সব মিথ্যে লেখা। আমি মানুষটা-ই মিথ্যে ভরা। এর পরেও তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, আমার কিছু বলার নেই।

পাতা আদনানের এসব কথা ঠেলে ফেলে দিয়ে বলে, ‘আপনাকে আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে হবে না। কোথায় যাবেন চলুন, ওঠা যাক।’

‘তুমি কোথায় যাবে বলো।’

‘আমি তো বাড়িতে বলে এসেছি, আমিন বাজার আমার খালার বাসায় যাচ্ছি। বাবা বিশ্বাস করলেও, ছোট বোন শাপলা বিশ্বাস করেনি। ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে- আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।’

কথা বলতে বলতে কখন যে আদনান পাতার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়েছে বুঝতেই পারেনি। পাতার হাতটা বেশ গরম। পাতার হাত থেকে উত্তাপ শুষে নিয়ে, সেই উত্তাপে আদনান পুড়তে পুড়তে বলে, ‘তা হলে চলো আমার বাসায় যাই। বাসা বলতে- শান্তিনগর, পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের অর্ধেক ছাদজুড়ে ছোট একটা ফ্লাট, ওখানে থাকি।’

পাতা কোনো কথা না বলে, আগপাছ কিছু না ভেবে, আদনানের হোন্ডার পেছনে উঠে বসে। হোন্ডা শান্তিনগরের দিকে ছুটতে থাকে।

হোন্ডায় বসে আদনান পাতাকে বলে, ‘তোমাকে একটু কৌশল করে বাসায় ঢুকতে হবে। গেটে দারোয়ান আছে তো! আমি তোমাকে একটু আগে নামিয়ে দেব। তারপর আমি যেয়ে দারোয়ানের সাথে গল্প জুড়ে দেব, তুমি এই ফাঁকে দারোয়ানের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যাবে।’

মেয়ের লাশটা দু’দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে। কেউ কোনো খোঁজ নেয় না। ইমরান ঘটনার দিনই নিজের থানায় একটা সাধারণ ডায়রি করে রেখেছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইমরানের সাথে ফোনে কথা বলে, তার পর লাশটা আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে তুলে দেয়।

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

ব্রুকলিন ব্রিজ

ছবি

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

সাহিত্যের ভাষা, ভাব ও রচনারীতি প্রসঙ্গে

ছবি

সাযুজ্য : অগ্রজ নোবেল লরিয়েট

ছবি

আব্দুলরাজাক গুরনাহ

ছবি

গুরনাহর উপন্যাসে ঔপনিবেশিকতা বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসী জীবনের ট্রমা

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

tab

সাময়িকী

শহরের শেষ রোদ

সৈয়দ নূরুল আলম

শিল্পী : এ্যাসেল পান্ডেরা

রোববার, ২২ আগস্ট ২০২১

শীতের রাত। কয়েকদিন ধরে শীত জেঁকে বসেছে। শীতের সাথে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। রাত তখন আড়াইটা। একটা মেয়ে রোকেয়া হলের গেটের সামনে পড়ে আছে। এত রাতে আশেপাশে তেমন কোনো মানুষ নেই, যে কিনা মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে ছুটে আসবে। একটা টহল পুলিশের গাড়ি ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিল, মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে গাড়ি থামে। গাড়ি থেকে একজন পুলিশ অফিসার নেমে আসে, সঙ্গে তার দু’জন জুনিয়র কলিগ। মেয়েটি উবুড় হয়ে পড়ে আছে। অফিসার মেয়েটিকে টেনে চিৎ করে। কপাল কেটে রক্ত বের হয়েছে, নাক থেতলে গেছে। রাস্তার বালু মুখের এখানে ওখানে। চশমা ভেঙে পাশে পড়ে আছে। মেয়েটি বেঁচে আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য অফিসার প্রথমে মেয়েটির নাকের কাছে ডান হাতের আঙ্গুল নিয়ে নিশ্বাস দেখে। নিশ্বাস পায় না। পরে পাল্স আছে কিনা পরীক্ষা করার জন্য মেয়েটির হাতের কব্জি কয়েক সেকেন্ড টিপে ধরে রাখে। অফিসার পাল্স পায় না। অফিসারের মুখ দিয়ে ‘মাইগড’ শব্দ বের হয়। মেয়েটি সত্যি সত্যি মারা গেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য অফিসার তার জুনিয়র সহকর্মীকে বলে, ‘মেয়েটিকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে চল, কুইক।’

কুষ্টিয়া শহর থেকে দেড় কিলো দূরে, ধলপুর গ্রামে, হাসেম আলী স্ত্রী আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকে। নিম্ন মধ্যবিত্তের পরিবার। হাসেম আলী বাজারে চালের মিলে কাজ করে। ধানের মৌসুমে ব্যস্ত সময় কাটে। কাজের চাপে নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যায়। অনেক দিন দুপুরে বাড়ি যেয়ে খেতে পারে না। বাজারে শিঙাড়া-পুরি আর এককাপ দুধচা খেয়ে কাটিয়ে দেয়। মিল মালিক হাসেম আলীর এই কাজের প্রতি আগ্রহ দেখে খুশি হয়। দিন হাড়া মজুরীর বাইরেও মাঝেমধ্যে হাসেম আলিকে বাড়তি কিছু টাকাপয়সা দিয়ে থাকে। এই বাড়তি টাকা নিতে হাসেম আলী কুণ্ঠাবোধ করে, কিন্তু না নিয়ে পারে না। সংসারে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। দুটো মেয়ে পড়াশোনা করে। বড় মেয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে, ছোট মেয়ে ক্লাস টেনে।

পুলিশের গাড়ি একটা মেয়েকে নিয়ে ইমারজেন্সিতে এসেছে, সে খবর পেয়ে কর্তব্যরত ডাক্তার অন্য কাজ ফেলে ছুটে আসে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে ডাক্তার বলে, ‘মেয়েটি দু’ঘণ্টা আগেই মারা গেছে।’

পুলিশ অফিসার ইমরান এ ধরনের কেস অনেক ডিল করেছে, তাই সে ঘাবড়ায় না। ডাক্তারকে বলে, ‘লাশটা হিম ঘরে রাখার ব্যবস্থা করেন, আমি রোকেয়া হলে যেয়ে দেখি, হলের কোনো ছাত্রী বা হলের আবাসিক শিক্ষক মেয়েটিকে শনাক্ত করতে পারে কিনা। কিন্তু এত রাতে তো সম্ভব হবে না। সকাল ছাড়া তো কিছুই করা যাবে না। চিন্তা করবেন না। সকালে আমি নিজে আসব। নিশ্চয় একটা ক্লু পাওয়া যাবে।’

ডাক্তার বুঝতে পারে, আইনের লোকের সাথে আইন দেখিয়ে কোনো লাভ হবে না। তাই একটা কাগজে খস খস করে কিছু একটা লিখে ইমরানের সামনে দিয়ে বলে, স্যার এখানে একটা সই করে দিন। ফোন নম্বরটাও দেবেন।

ইমরান একবার ডাক্তারের দিকে তাকায়, তারপরে কাগজে কী লিখেছে, তা না পড়েই কাগজটার নিচে সই করে, নিজের নাম লেখে। ডাক্তারের কথা মতো ফোন নম্বরটা দিতেও ভুলে না।

হাসেম আলির মেয়ে দুটো বেশ লক্ষ্মী হয়েছে। ওদের পেছনে তেমন কোনো বাড়তি খরচ করতে হয় না। জামা-কাপড়, সাজগোজে ওদের তেমন কোনো চাহিদা নেই। বড় মেয়েটা বরাবর বৃত্তি নিয়ে পড়েছে। তারপরেও হাসেম আলির একার পক্ষে মেয়েদের এতটা পথ টেনে আনা সম্ভব ছিল না, এটা একমাত্র সম্ভব হয়েছে হাসেম আলির স্ত্রী রাহেলার জন্য, সংসারের সব কাজ করার পরে রাহেলা যতটুকু সময় পায়, সেটা সেলাইয়ের কাজে লাগায়। মহল্লার আশেপাশের মহিলাদের ব্লাউজ-সালোয়ার-কামিজ সেলাইয়ের কাজ করে। এ থেকে যে আয় হয়, তা মেয়েদের লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করে।

বড় মেয়েটাকে নিয়ে রাহেলা খুব চিন্তা করে। এই যুগে এত সহজ সরল মানুষ হয়! কারও বই হারায়ে গেলে নিজের বই তাকে দিয়ে দেবে। কলেজে নিজে নোট তৈরি করে আগে বন্ধবীদের দিয়ে বলবে- ফটোকপি করে নে। অনেকে আবার মূল নোটটা ফেরতই দেয় না। এর পরেও মেয়েটা বান্ধবীদের সাথে রাগ করে না, ঝগড়া করে না। দ্বিতীয়বার নোট করতে বসে যায়। নিজেদের টানাটানির সংসার, তার পরেও বান্ধবিরা যদি বলে, বৃত্তির টাকা পেলি, আমাদের কিছু খাওয়াবি না? তখন তাদের কথা ফেলতে পারে না। সবাইকে নিয়ে কলেজ মোড়ে কিসমত মিয়ার গ্রীলের দোকানে যেয়ে বলবে, ‘নে তোরা যত পারিস খা।’

এসব কারণে কলেজের সবাই ওকে ‘জলপাতা’ বলে ডাকে। জলের মতো সহজ, সরল, তরল।

এ যুগে ভালো মানুষের জায়গা নেই। তারা পদে পদে বিপদে পড়ে, মা একথাটা মেয়েকে কিছুতেই বোঝাতে পারে না। তাই সারাক্ষণ রাহেলা চিন্তার আগুনে জ্বলতে থাকে। একে তো সোজা, তার ওপর মেয়েটা মাশাল্লা দেখতে শুনতে ভালো। গায়ের রঙ একেবারে ফর্সা না হলেও, একবার কেউ দেখলে সবাই তাকে রূপবতী বলবে। টানা টানা চোখ, কলার মোচার মতো নাক। জোড়া ভুরু। সব মিলে, ভারি একটা মিষ্টি চেহারা। এ নিয়ে রাহেলা বেগম মনে মনে গর্ববোধ করে, আবার অজানা ভয়ও তাকে খামচে ধরে।

পুলিশ অফিসার ইমরান কাজের প্রতি সব সময় সজাগ। সে মনে করে আগে প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব পালন, তারপর ব্যক্তিগত জীবন। এ জন্যে সে তিন বছরে দুটো প্রমোশন পেয়েছে। তাই দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করে, ভোরেই ইমরান ছুটে এসেছে রোকেয়া হলে। সকালে দুটো মেয়ে মর্নিংওয়াক করার জন্য গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, তারা গেটে পুলিশের গাড়ি দেখে আর বের হয় না। পুলিশের গাড়ি, পুলিশ, এসব দেখে ওদের মুখ ভয়ার্ত হয়ে ওঠে। পরে পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে গত রাতের সব কথা শুনে, ওরা-ই হলের অন্য মেয়েদের খবর দেয়, পুলিশ আসার কারণটা জানায়। হল সংসদের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন মেয়ে এগিয়ে এলে ইমরান বলে, ‘গত রাত দুইটার দিকে একটা মেয়ে গেটের কাছে পড়ে ছিল। মেয়েটি মোটামুটি লম্বা, চুল ঘাড় পর্যন্ত, স্বাস্থ্য ভালো, চোখে চশমা পরে, সে সময় মেয়েটি শাড়ি পরা ছিল, সবুজ টিয়া রঙের শাড়ি। কপালে শাড়ির রঙের টিপ।’ এভাবে ইমরান মেয়েটির বর্ণনা দেয়। বর্ণনা শুনে মেয়েরা একে অন্যের দিকে তাকায়। বর্ণনার সাথে কাউকে মেলাতে পারে না।

ইমরান একটু থেমে, লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে আবার বলে, ‘মেয়েটি মারা গেছে। লাশ ঢাকা মেডিক্যালে রাখা আছে। আপনারা কয়েকজন চলেন, দেখবেন, শনাক্ত করতে পারেন কিনা। আমি আপনাদের হলের আবাসিক শিক্ষক হাসনা ইসলামকে ফোনে সব বলেছি, উনি বাসা থেকে সরাসরি হাসপাতালে যাচ্ছেন।’

হাসেম আলির মেয়ে দুটো তার কাছে জানের জান। ওদের সাথে আম্মাজান ছাড়া কথা বলে না। আপনি আপনি করে কথা বলে। ছোট সময় আদর করে বলত, আম্মাজান আপনি খেয়েছেন? আপনি ঘুমাবেন না? সেই আপনি বলা আর ছাড়তে পারেনি।

এই আহ্লাদী আহ্লাদী ভাব রাহেলার পছন্দ না। রাহেলার কথা, মেয়েদের আদরের পাশাপাশি শাসনও করতে হয় কিন্তু হাসেম আলি সেটা বুঝতে চায় না। নিজে বছরের ছ’মাস কাজ করে, আর ছ’মাস গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়ায়। দিন নাই, রাত নাই বাজারে পড়ে থেকে তাস খেলে। আড্ডা দেয়।

সেদিন খেতে খেতে হাসেম আলি বড় মেয়েকে বলে, ‘বড় আম্মাজান আপনি নাকি ঢাকা যাবেন? ঢাকা চেনে না, জানেন না, কীভাবে যাবেন?’

বাবার একথা শুনে বড় মেয়ে পাতা টাশকি খায়। মনের কথা বাবা জানল কীভাবে!

বাবা যখন জেনে গেছে, তখন আর পাতা লুকায় না। বলে, ‘বাবা, আমার খুব ইচ্ছে আমি ঢাকা ভার্সিটিতে ইকোনোমিক্স নিয়ে পড়ব। কিছু দিন পরে তো ইন্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট দেবে। ভাবছি তার আগে ভার্সিটি-হল একটু চিনে আসি।’

‘কথাটা মন্দ বলেননি আম্মাজান। তয় ঢাকায় কোথায় উঠবেন?’

‘বাবা আমিন বাজার খালার বাসায় ওঠব। ওখান থেকে খালাতো ভাই নয়নকে নিয়ে ভার্সিটিতে যাব।’

মেয়ের একথা শোনার পর হাসেম আলি আর কিছু বলেনি। এসময় খাবার টেবিলে ছোট মেয়ে শাপলাও ছিল। ও কিছু না বলে, মিটিমিটি হাসে। বড় বোনের ঢাকা যাওয়ার কথাটা যে ও বাবার কানে লাগিয়েছে, সে কথাটা পাতাকে বলে কী করে!

দু’দিন আগে পাতা যখন আদনানের সাথে ফোনে কথা বলে, তখন শাপলা দরজার পাশ থেকে আড়ি পেতে সব কথা শুনেছে। সেটা-ই চালান করে দিয়েছে বাবার কাছে। এখনও পাতা বাবাকে একটা মিথ্যে কথা বলল। ও খালার বাসা যাবে না। ও যাবে আদনানের সাথে দেখা করতে। একথাটা শাপলা আর বাবার কানে দেয় না। দিলে, পাতা দু’দিন মুখ কালো করে থাকবে। ভালো মতো কথা বলবে না। তাছাড়া শাপলার সব আবদার তো বড় আপাই মেটায়। বড় আপার টিউশনির টাকার বড় অংশটা তো শাপলার হাত দিয়ে-ই খরচ হয়। এসব ভেবে শাপলা বাবাকে আসল খবরটা দেয় না। এর বিনিময়ে শাপলা ভেবে রেখেছে, বড় আপা ঢাকা যাওয়ার সময় কানে কানে বলে দেবে, ওর নিজস্ব কিছু জিনিস আনতে। যে জিনিস সবার সামনে উচু স্বরে বলা যায় না।

হাসপাতাল মর্গে যেয়ে মেয়েটাকে কেউ শনাক্ত করতে পারে না। যারা মর্গে গিয়েছিল তারা শত ভাগ নিশ্চিত- ওদের হলের মেয়ে না। ইমরান মেয়েদের গাড়িতে করে আবার হলে দিয়ে যায়। যাবার সময় বলে, ‘স্যরি, এই সাতসকালে আপনাদের কষ্ট দেয়া হলো। তবে আপনারা বেঁচে গেলেন, আপনাদের হলের মেয়ে হলে, আরও অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। এমনকি থানা পর্যন্তও যেতে হতে পারত।’ কিন্তু ইমরান বুঝতে পারে না, মেয়েটাকে মেরে রোকেয়া হলের সামনে ফেলে রাখার কারণ কী! আর কারা-ইবা মারল?

মাস ছয়েক আগে, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেয়ার পরে, আদনানের সাথে পাতার ফেসবুকে পরিচয় হয়। আদনান ওর ফেসবুক বন্ধু। এর আগে পাতার ফেসবুক একাউন্ট-ই ছিল না। কলেজের বন্ধুরা যখন ভার্চুয়ালি বা সরাসরি ছেলে বন্ধুদের সাথে গড়াগড়ি খেয়ে, আনন্দ-উল্লাসে সময় কাটাচ্ছিল, পাতা তখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। ওকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। সংসারের হাল ধরে, বাবা-মা’র মুখে হাসি ফোটাতে হবে, সব সময় এই চিন্তা পাতার মাথার ঘুরপাক খেত।

আদনানের সাথে পাতার বন্ধুত্বটা দ্রুতই জমে যায়। সেটা হয়ত পাতার ‘জলপাতা’ নামের কারণে অথবা এতদিন কোনো বন্ধু ছিল না, জীবনে প্রথম একটা বন্ধু পেল, সে কারণে। ছ’মাসের মধ্যে দু’জনেরই জন্মদিন চলে আসে। দু’জনই একে অপরকে কুরিয়ার করে গিফট পাঠায়। আদনান আড়ং থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে একসেট গয়না কিনে পাঠায়। চমৎকার গয়নার সেটটা পেয়ে পাতা তো মহাখুশি- এত দামি, এত সুন্দর একটা গিফট তাকে পাঠাল! সে তুলনায় আদনানকে পাঠানো গিফট একটু কম দামি হওয়ায়, পাতার মন বেশ কিছু দিন খুঁতখুঁত করেছে।

ঢাকা আসার প্রস্তাবটা আদনানই পাতাকে দিয়ে বলেছিল, ‘দু’দিন পরে ঢাকা তো আসবেই। তার আগে একবার আসো- ভার্সিটি, কার্জন হল, যাদুঘর, নিউমার্কেট, ঢাকা শহরে যা যা দেখার আছে, তোমাকে দেখিয়ে দিই।’

এ প্রস্তাব পেয়ে পাতা ফড়িঙের মতো আনন্দে নেচে ওঠে। আদনান কোথায় থাকে, কীভাবে থাকে এতটা আর তলিয়ে দেখেনি। বাবাকে মিথ্যে বলে, মাকে না জানিয়ে, ছোট বোনের কাছে গোপন করে, ও ঢাকা আসে।

কথা ছিল পাতা কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সরাসরি বাসে এসে গাবতলি নামবে, ওখান থেকে আদনান তাকে নিয়ে আসবে। কুষ্টিয়া থেকে বাস ঠিক সময় ছাড়ে। এবং পথে তেমন একটা যানজট না থাকায় বাসটা ঠিক সময় গাবতলি এসে পৌঁছায়।

আজ আদনানের ঈদের দিন। মাঝে মাঝে ওর ঈদের দিন আসে। এদিনগুলো কখনো ও একা উপভোগ করে, কখনো বন্ধুরা আসে, তাদের সাথে উপভোগ করে।

পাতা বাস থেকে নেমে দেখে, বিরাট একটা হোন্ডা নিয়ে আদনান তার জন্য অপেক্ষা করছে। রওনা দেয়ার আগে পাতা ফোনে আদনানকে বলেছিল, ‘আমি তোমাকে চিনবো কী করে? ফেসবুকের মানুষটা আর আসল মানুষটা কী এক?’

‘আমার হোন্ডটা নিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। হোন্ডা দেখে তুমি আমাকে চিনে নিও।’

মানুষ সাধারণত প্রথম দেখার ক্ষেত্রে বলে, আমি ওই রঙের শার্ট বা আমি ওই রঙের শাড়ি পরে আসব। কিন্তু এরা সে ধরনের কিছু বলেনি। অথচ কাকতালীয়ভাবে আদনান জিনস প্যান্টের সাথে লাল গেঞ্জি আর পাতা পরেছে লাল সালোয়ার কামিজ। দু’জনের রঙ মিলে যাওয়াতে পাতা অবাক হয়ে ভাবে, এর নাম কী টান। যে টানে ও ছুটে এসেছে!

আদনানের হোন্ডাটা দেখতে বাঘের মতো। আদনান পাতাকে বলে, ‘আমার মাজাটা ভালো করে পেঁচিয়ে ধরে, শক্ত হয়ে বসো। পাতার হোন্ডা চড়ার বেশ অভ্যেস আছে। তার চাচাতো ভাই আকিবের একটা হোন্ডা আছে। সে হোন্ডায় ও কতো চড়েছে। আকিবের পেছনে যেভাবে বসত, সেভাবে একহাতে আদনানকে ধরে বসে। অন্য হাতে পাতার হাত ব্যাগ। ব্যাগে পাতা একটা মাত্র বাড়তি ড্রেস নিয়েছে।

‘সেই সকালে বাসা থেকে রওনা দিয়েছ, নিশ্চয় খিদে পেয়েছে, চলো, এখান থেকে কিছু খেয়ে নিই।’

আদনানের একথায় পাতার মধ্যে মুগ্ধতা ছড়ায়। ভাবে, আদনান কতোটা কেয়ারিং!

ওরা শাহবাগ মোড়ে ‘ডেংগুলি’ হোটেল থেকে পেটপুড়ে খেয়ে প্রথমে কলা ভবনে আসে।

কলাভবনে আম গাছের নিচে একটা নিরিবিলি জায়গায় ওরা বসে। পাতা বাড়ি থেকে ছোট একটা বোয়েমে করে আমের আচার নিয়ে এসেছিল, ব্যাগ থেকে আচার বের করে আদনানকে খেতে দেয়। আচার খেতে খেতে আদনান বলে, ‘তুমি একটা বোকা মেয়ে। একটা ছেলের সাথে ফেসবুকে মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়, সে ডাকল, আর তুমি চলে আসলে?’

পাতা আদনানের মুখের দিকে তাকায়, ওর মুখটা পড়তে চেষ্টা করে।

আদনান আচার খাওয়া শেষ করে, আঙুল চুষতে চুষতে আবার বলে, আমার যে ফেসবুক আইডি দেখেছ, সেটা তো, ঠিক না-ও হতে পারে। আজকাল অনেকে মিথ্যে ইনফর্মেশন দিয়ে আইডি খোলে, সেটা ছেলে হোক, কি মেয়ে হোক, তুমি সেটা জান না?

পাতা আদনানের কথা বুঝতে পারে না। আর বুঝতেও চায় না। ও ফেসবুকে চ্যাট করতে করতে আদনানকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছে। সত্য হোক, মিথ্যে হোক, কোনো কথা-ই ওকে টলাতে পারবে না। ওর বিশ্বাসে ঘুন ধরবে না।

ওরা ওখান থেকে কার্জন হলে যায়। বিকেল শেষে সন্ধে নেমেছে। কার্জন হলের বড় বড় গাছ থেকে একটা-দুটো পাখি ওড়া শুরু হয়েছে। অন্ধকার একটু ঘন হওয়ায় গুচ্ছে গুচ্ছে ছেলেমেয়েরা ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। আদনানরা একটা পছন্দ মতো জায়গা বেছে নেয়। আশেপাশে চোখ যেতেই পাতার অস্বস্তি লাগে। আদনান অবশ্য পাতার থেকে একটু দূরত্ব রেখেই বসে। আদনান একটা ঘাসের ডগা ছিঁড়ে চিবোতে চিবোতে বলে, ‘আসলে এতদিন তুমি যা জেনেছ, আমি তা নই। আমার আইডিতে সব মিথ্যে লেখা। আমি মানুষটা-ই মিথ্যে ভরা। এর পরেও তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, আমার কিছু বলার নেই।

পাতা আদনানের এসব কথা ঠেলে ফেলে দিয়ে বলে, ‘আপনাকে আর বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে হবে না। কোথায় যাবেন চলুন, ওঠা যাক।’

‘তুমি কোথায় যাবে বলো।’

‘আমি তো বাড়িতে বলে এসেছি, আমিন বাজার আমার খালার বাসায় যাচ্ছি। বাবা বিশ্বাস করলেও, ছোট বোন শাপলা বিশ্বাস করেনি। ও ঠিকই বুঝতে পেরেছে- আমি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।’

কথা বলতে বলতে কখন যে আদনান পাতার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়েছে বুঝতেই পারেনি। পাতার হাতটা বেশ গরম। পাতার হাত থেকে উত্তাপ শুষে নিয়ে, সেই উত্তাপে আদনান পুড়তে পুড়তে বলে, ‘তা হলে চলো আমার বাসায় যাই। বাসা বলতে- শান্তিনগর, পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের অর্ধেক ছাদজুড়ে ছোট একটা ফ্লাট, ওখানে থাকি।’

পাতা কোনো কথা না বলে, আগপাছ কিছু না ভেবে, আদনানের হোন্ডার পেছনে উঠে বসে। হোন্ডা শান্তিনগরের দিকে ছুটতে থাকে।

হোন্ডায় বসে আদনান পাতাকে বলে, ‘তোমাকে একটু কৌশল করে বাসায় ঢুকতে হবে। গেটে দারোয়ান আছে তো! আমি তোমাকে একটু আগে নামিয়ে দেব। তারপর আমি যেয়ে দারোয়ানের সাথে গল্প জুড়ে দেব, তুমি এই ফাঁকে দারোয়ানের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তরতর করে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যাবে।’

মেয়ের লাশটা দু’দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে। কেউ কোনো খোঁজ নেয় না। ইমরান ঘটনার দিনই নিজের থানায় একটা সাধারণ ডায়রি করে রেখেছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইমরানের সাথে ফোনে কথা বলে, তার পর লাশটা আঞ্জুমান মফিদুলের কাছে তুলে দেয়।

back to top