alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক রচনা : চার

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

: সোমবার, ৩০ আগস্ট ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৫. শরণার্থী

লোকজন পালাচ্ছে। কোথায় পালাচ্ছে? বড়রা বলল ইন্ডিয়ায়। ইন্ডিয়া দেশটা কোথায় আমাদের জানা নেই। তবে কলকাতা আমাদের অনেক পরিচিত শহর। এতো পরিচিত যে মনে হয় যে কোনো একদিন আমরা কলকাতা থেকে ঘুরে আসব। এর কারণ হলো আমার এক নানা কলকাতায় ছিলেন অনেক দিন। তিনি কলকাতা থেকে অনেক খেলনা এনেছিলেন, সেও অনেক আগে। সে খেলনার ভাগ আমার ভাগ্যে কেমন করে যেনো জুটে যায়। আমার নানার সিন্দুক খোলা হলে তার মধ্য থেকে অনেক বিচিত্র জিনিস বের হয়ে আসত। আর সেই বিচিত্র জিনিসের মধ্য ছিল কাছের পিরামিডের কিছু আকৃতি। সে পিরামিডগুলো থেকে লাল,নীল, সবুজ হলুদ নানা রকম আলো বিচ্ছুরিত হতো। সেই বিচ্ছুরিত আলো দেখে আমরা বিমোহিত। অনেক সাধনার পর একমাত্র নাতি হিসেবে আমি পিরামিডগুলোর গর্বিত মালিকানা লাভ করি। এগুলি পেয়ে নিজেকে আমি রাজা-বাদশাহ মনে করতে থাকি আর নানা ভঙ্গিমায় আমি সেগুলো বন্ধুদেরকে দেখাতে থাকি। তারা খুব বিস্মিতিভাব নিয়ে আমার পিরামিডগুলো দেখতে থাকে। এতে আমার অহংকারে যেনো পা পড়ে না। আমি আরো একটা জিনিস পেয়েছিলাম নানার সিন্দুক থেকে। সেটা হলো একটা কিস্তি টুপি। টুপিটা ছিল মখমলের আর ভাজ করা। সেসময় এ ধরনের টুপি খুব কম দেখা যেতো । এ টুপিটাও আমার মেঝো নানা মুজতবা আলি কলকাতা থেকে এনেছিলেন। তিনি তাঁর বড়ভাই অর্থাৎ আমার নানা মুকসেদ আলিকে উপহার দেন। নানা টুপিটা বেশ যতœ করে সিন্দুকে তুলে রাখেন। কিন্তু আমার আবদারের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে তিনি টুপিটা আমাকে উপহার দিয়ে দেন। আমি ঈদে উৎসবে টুপিটা পরে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াই। মুস্তফা আলি নানা কথায় কথায় কলকাতার গল্প জুড়ে দেন। বড়দের সাথে আমরাও সেই গল্প উপভোগ করি। কলকাতাকে তখন খুবই আপন মনে হতে থাকে।

আমি আরো একটা জিনিস পেয়েছিলাম নানার সিন্দুক থেকে। সেটা হলো একটা কিস্তি টুপি। টুপিটা ছিল মখমলের আর ভাঁজ করা। সেসময় এ ধরনের টুপি খুব কম দেখা যেতো

লোকজন ইন্ডিয়ায় যাচ্ছে। ইন্ডিয়া নাকি আমাদের এখান থেকে খুবই কাছে।

আমার বন্ধুদের একজন বলল, ওরা সবাই যাচ্ছে আগরতলায়, ইন্ডিয়ায় নয়। হলেও হতে পারে। আগরতলাতলার নাম শুনেছি। আমাদের কাছে আগরতলাও খুব বিখ্যাত জায়গা। কারণ আগরতলা থেকে প্রচুর কাঁঠাল আসে আমাদের ওখানে। বিশেষ করে যে বছর আগে আগে বাইশ্যা (বর্ষা) আসে। ছিপ নৌকা বোঝাই কাঁঠাল আমাদের চৈয়ারকুড়ি বাজারে এসে লাগে। নৌকাগুলোতো এত বেশি কাঁঠাল থাকতো যে মনে হতো কাঁঠালের ভারে বুঝি নৌকাগুলো ডুবে যাবে। সেই কাঁঠালগুলি ছিল খুবই মিষ্টি।

প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। পশ্চিম অঞ্চল থেকে দলে দলে লোকজন আসতে থাকে। আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকে বেশ দূরে কয়েকটা গ্রাম আছে। গ্রামগুলো হিন্দু প্রধান। এর মধ্যে বাঘি নামের গ্রামটি খুবই বিখ্যাত। গ্রামটিতে শতভাগ হিন্দু। আমাদের নাসিরনগরের অনেকগুলো গ্রামই ছিল হিন্দু প্রধান। তবে শতকরা আশি নব্বইভাগ গ্রামই মুসলিম প্রধান। হিন্দু মুসলিম মিলে মিশেই থাকত। বড় ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। হিন্দু মুসলমানের মধে কোনো গোলমালের খবর আমরা অন্তত শুনিনি। আমরা উপভোগ করতাম হিন্দু সংস্কৃতি। দূর্গাপূজার মূর্তি তৈরির কাজটা হিন্দু ছেলেদের মতই সমান উৎসাহ নিয়ে আমরা দেখতাম। হরিলুটের বাতাসার ভাগও আমাদের ভাগে জুটত।

আমাদের গ্রামের বেশ কয়েকটা গ্রাম পর পূর্ব দিকে ছিল তিলপাড়া, সিংহগ্রাম। ঐ গ্রামটাগুলোতেও শতভাগ হিন্দু বাস করে। আমি আমার বাবার সাথে ঐ গ্রাম দুটির ভিতর দিয়ে আমার ফুফুর বাড়ি রসুলপুর অনেকবার গিয়েছি। আমার বেশ ভালো লেগেছে। রাস্তার উপরে পড়ে থাকা বড়ই কুড়িয়েছি বেশ কয়েকবার। গ্রামের ঘরবাড়ি গুলো বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিল আর নিকানো উঠোন আমাকে বেশ আকর্ষণ করত। আমাদের সাথে পড়ুয়া হিন্দু মেয়েগোলোও স্কুল আসত বেশ সাজগোজ করে। সবকিছু মিলিয়ে আমার বেশ ভালো লাগত তাদেরকে।

সেই হিন্দুরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে! আমাদের গ্রামের উপর দিয়েই যাচ্ছে। আট দশ জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়েই যাচ্ছে তাঁরা। আমরা অবাক হয়ে তাদের যাওয়া দেখছি। হিন্দু হলেই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে?

আমরা যাচ্ছি না কেনো? আমি প্রশ্ন করি।

আমরা যাচ্ছি না, কারণ আমরা মুসলমান। পাকিস্তানী সৈন্যরা মুসলমানদেরকে কিচ্ছু বলবে না। হিন্দুরা মুসলমানী অর্থাৎ খতনা করায় না। মুসলমানী না করায় হিন্দুদের উপর পাকিস্তানী সৈন্যদের বেজায় রাগ। আমাদের এক বন্ধু সুরুজ বলল। সুরুজ আমাদের মাঝে আবার বেশ বুঝদার। অনেক বিষয়েই আমরা তার কথার গুরুত্ব দেই, বিশ্বাস করি।

আমাদেরকেও কি তাহলে মেরে ফেলবে কারণ আমাদেরও তো তখন খতনা হয়নি। আমি সুরুজকে প্রশ্ন করি।

আমাদেরকে মারবে না। আমরা মুসলমানের পোলা। সুরুজের আত্ন-বিশ্বাসী উত্তর আমাকে খুব একটা আশ্বস্ত করতে পানে না। বাবাকে বলে খতনাটা করিয়ে নিতে হবে, মনে মনে ভাবী। কিন্তু নিজের খতনার কথা কীভাবে বাবাকে বলি? এটি তো একটা লজ্জার বিষয়। খতনা দেয়ার বয়স হলে তো বাবা খতনা দিয়েই দিবেন। খতনা সম্পর্কে আমার ভিতরে বেশ একটা ভয় কাজ করে। বাঁশের নেউল দিয়ে হাজাম যাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয় খলিফা ছাত করে বিষেষ অঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া কেটে নিয়ে তেনা পুড়িয়ে তেনার ছাই জায়গাটায় লাগিয়ে দেয়। তারপর কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। কাটার সময় অনেকের রক্ত পড়ে, অনেকে চিৎকার চেঁচামেচি করে পাড়া মাথায় তুলে। তারপর বেশ কয়েকদিন চিৎ হয়ে ঘরে শুয়ে তাকতে হয়। খতনার একটা আনন্দময় দিকও আছে। খতনার সময় আতœীয়-স্বজন বাড়িতে আসে। সাধ্য মতো গরু-ছাগল জবাই করে পাড়া প্রতিবেশীকে খাওয়ানো হয়। দাওয়াত খাওয়ার জন্য কেউ খালি হাতে আসে না। কাপড়-চোপড় এবং নানা উপহার সামগ্রী নিয়ে আসে। পাড়া প্রতিবেশিরা নানা রকম পিঠা-পুলি পাঠায়। বেশ আনন্দঘন একটা পরিবেশ তৈরি হয়। আমি মনে মনে ভাবী আমার একটা খতনা হয়ে যাক। এতে জানটা তো বাঁচবে।

আমার সাথে হিন্দু যারা পড়ে তারা সবাই কি ইন্ডিয়ায় চলে যাবে? সম্পদ, রতন, নৃপেন, নেপাল, রাখি, পাখি খুকু এরা সবাই? একেবারেই যাবে না কি আবার চলে আসবে? এসকল প্রশ্ন আমার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। আমি কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারি না। জিজ্ঞেস করলেও কারও কাছ থেকে সঠিক জবাব পাওয়া যায় না।

দলে দলে লোকজন পালাচ্ছে ঘরবাড়ি, সহায় সম্পদ ফেলে। বিক্রি করার মতো কোনো কিছু থাকলে পানির দামে সেগুলো বিক্রয় করে দিচ্ছে। এসকল পণ্যের মধ্যে গরু ছাগলই প্রধান। আমাদের রঙ্গু চাচা দুইটি দামা নিয়ে এলো বাঘি থেকে কিনে। এতো সুন্দর দামা দুটি! গায়ের রং মাশ-কাজলা। চমৎকার বাঁকানো শিং। সাইজে গরু দুটি বিশাল। এতো বড় গরু আমাদের এলাকায় দেখি নাই। দামা দুটির শরীর চক চক করেছে। তবে তাদের চোখ দুটি কেমন যেনো অশ্রুময়। মালিককে হারিয়ে এরা কি বেদনার্ত? মাত্র ছকুড়ি টাকায় গরু দুটি কেনা হয়েছে। অন্য সময় হলে নাকি গরু দুটি দেড়শ দুইশ টাকায় বিক্রয় হতো।

পলায়নরত লোকজনের মাথায় গাটটি-বুচকা। মহিলাদের কোলে ছোট ছোট বাচ্চা বাদুড়ের মতো ঝুলছে। কারও কারও বুচকার ভিতর থেকে মুরগী কিংবা হাঁসের মাথা উঁকি মারছে। কারও কারও ডোলার ভিতর থেকে কবুতরের বাক্ বাকুম শব্দ বের হয়ে আসছে। ক্লান্ত লোকজন বিশেষ করে বাচ্চা, মহিলা আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা কিছুক্ষণ পরপর জিরোতে চাচ্ছে। পুরুষরা তাদেরকে তাড়া দিচ্ছে। দিনে দিনে নিরাপদ কোনো একটা জায়গায় পৌঁছাতে হবে তাদেরকে। আমাদের গ্রামে কয়েক জায়গায় এ সকল পথিককে সহায়তা করার জন্য স্বেচ্ছা-সেবক প্রস্তুত রয়েছে। তাদের কাজ হলো পিপাসার্ত পথিকদেরকে পানি খাওয়ানো। আমরা দিনভর উৎসাহ নিযে এসব দৃশ্য দেখতে থাকি। কেউ একটা পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে বললে আমরা বর্তে যাই। আমাদের এ উৎসাহে ভাটা পড়ে দুই তিন দিনের মধ্যেই। কারণ, আর লোকজন দল বেঁধে আসছে না। দল বেঁধে বর্ডার পার হতে গিয়ে নাকি অনেক লোক পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে মারা পড়েছে। সে জন্য লোকজন আর প্রকাশ্যে ওপারে যাচ্ছে না। এখন যারা যাচ্ছে তারা অত্যন্ত গোপনে আর রাতের বেলায়। একদল লোক আছে যারা ইন্ডিয়া যাওয়ার পথ-ঘাট চিনে। এরা সীমান্ত পার করে দেয়ার কাজ করছে। এ জন্য তাদেরকে টাকা দিতে হয়।

৬. সরাইল্য দুলাভাই

অন্য গ্রাম থেকে কিছু লোক আমাদের গ্রামে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এর মধ্যে একজন এলো রিক্সা নিয়ে। শুনেছি রিক্সা নামে একটা যান আছে। এটিতে চড়ে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে। কিন্তু রিক্সা চর্ম চক্ষে কখনো দেখা হয়নি। দেখব কেমন করে? আমাদের এলাকায় রিক্সা চলার মত কোনো রাস্তা ছিল না। গ্রাম থেকে থানা সদরের রাস্তাটিই ছিল মূল রাস্তা। শুকনার সময় আমরা হেঁটে কেনো রকমে থানা সদরে যেতে পারতাম। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু ভাঙ্গা ছিল সেই রাস্তা। রিক্সা দূরের কথা সাইকেল চালিয়ে যেতে হলেও অনেক জায়গায় নামতে হতো। একদিন সাইকেল চালিয়ে দুই তিনদিন তাদেরকে বিশ্রাম নিতে হতো নিশ্চয়ই। তখন টেলিভিশন নামক আজব যন্ত্রটাও আমাদের তল্লাটে ছিল না যে টেলিভিশন দেখে দেখে রিক্সা চিনতে পারব। আমাদের হাচু চাচার মেয়ে জামাই আমাদের এই সরাইল্যা দুলাভাই। সরাইল না কালিসীমা থেকে বউ বাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে আমাদের গ্রামে। তাদের গ্রামটা সিএন্ডবি রাস্তার ধারে। যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে পাকিস্তানী সৈন্য। দুলাভাই পায়ে হেঁটে আসেনি। রীতিমত রিক্সায় চেপে বউ-বাচ্চা আর মাল সামান নিয়ে চলে এসেছে। আমি আমাদের এই দুলাভাইকে আগেও বেশ কয়েকবার দেখেছি। লোকটাকে আমার বেশ পছন্দ। গায়ের রং কুচকুচে কালো, মুখে দাগ। অনেকেই বলে এগুলি শীতলার দাগ। শীতলা মানে হলো হিন্দুদের এক দেবী যে দেবী আবার মানুষের গায়ে গুটি বসন্ত নামক এক ভয়াবহ রোগ দেয়। গ্রামাঞ্চলে এ ধরণেরই একটা ধারণা প্রচলিত ছিল। তো, এই দুলা ভাইটার মুল আকর্ষণ ছিল তার পোষাক। যখনই সে শ্বশুর বাড়ি আসত তখন তার পরনে থাকত সাদা পোষাক। উপরে নিচে দুলাভাই দুই টুকরা ধুতির মতো পোষাক পরতেন। তার চুল ছিল বেশ লম্বা অনেকটা মেয়েদের চুলের মত। তার কথা বলার ঢংটাও আমার পছন্দ ছিল। কেমন টেনে টেনে কথা বলত। আমাদের এলাকার লোকজনের তুলনায় দুলাভাই বেশ চাল্লু ছিলেন। তাকে দেখে আমরা ছড়া কাটতাম-

‘সরাইল্যা হরালি,

বৈদা পাড়ে তিনহালি

একটা বৈদা ভুল

সকল হরালি চোর।’

হরালি একটা পাখির নাম। একসাথে এতো ডিম দেয়? ভুলের সাথে চোরের মিল হয় কী করে?

দুলাভাই হাসত।

এই ছড়া কে বানিয়েছিল আমরা তা জানতাম না, এর কোনো মাথামুন্ডু ছিল কিনা তাও জানতাম না। এই ছড়া শুনে আমাদের লম্বা চুলো দুলাভাই ক্ষেপতেন বলে মনে হয় না তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত হতেন। এ ছড়ার মধ্যে একটা অপমানজনক কিছু ছিল বলে অনুমিত হয়।

রিক্সার কথা শুনে পড়িমরি করে দৌড় লাগালাম দেওয়ান আলিদের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখি এলাহী কান্ড। একটা জিনিসকে গোলবেড় দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাড়ার ছেলে-মেয়ে-বুড়ো সবাই। সবাই খুব মজা করে জিনিসটা দেখছে। আমি নিজেকে মনে মনে গালি দিলাম এই দৃশ্য দেখা হতে নিজেকে এতোক্ষণ বঞ্চিত করে রাখার জন্য। মানুষের ভিড়ে কিছুই দেখা যাওয়ার যো নেই। আমি কারো গা ঘেষে, কারো দুপায়ের মাঝ দিয়ে বৃত্ত ভেদ করে নিজেকে রিক্সার সামনে নিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। বাহ! এতো চমৎকার জিনিস। রঙিন হুড, রঙিন সিট। যানটার সারা শরীরে রংয়ের বাহার ছড়িয়ে রয়েছে। সিটের কভারটা এতো সুন্দর যে আমি ভেবে পাচ্ছিলাম মানুষ কেমন করে এতো সুন্দর একটা জিনিসের উপর বসতে পারে। একজন টুংটাং করে ঘন্টা বাজাচ্ছে। রিক্সাটার নিচের দিকে চেয়ে দেখি কেউ একজন উবু হয়ে বসে কিছু একটা করছে। কে ওটা? ভালো করে তাকিয়ে দেখি,ওটা যে আমাদের জাহির চাচা। জাহির চাচা আমাদের তিন চার বছরের সিনিয়র। সম্ভবত তখন হাইস্কুলের নিচের ক্লাসে পড়ে। তখনই বেশ লায়েক হয়ে উঠেছে। লোকজন তাকে উৎসাহ দিচ্ছে আর একটু আর একটু। হয়ে গেছে, আর একটু চেষ্টা কর জাহির। জ্যৈষ্টের গরমে জাহির চাচা গলদগর্ম হয়ে পড়েছে কাজটা করতে গিয়ে। হঠাৎ করে চাচা ’মাই গো, ও মাই গো’ বলে চিৎকার করে উঠল। আমরা চাচার চিৎকারে চমকে গেলাম। কয়েকজন কী অইছে , কী অইছে’ বলে, বলে এক সাথে প্রশ্ন করতে থাকল।

’আমার আঙ্গুল, আমার আঙ্গুল’ বলে বলে তারস্বরে জাহির চাচা চিল্লাচ্ছে। জাহির চাচার আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে দেখি ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে দর দর করে রক্ত ঝরছে আর উঠানের শুকনা সাদা মাটি কালসে হয়ে যাচ্ছে। জাহির চাচা সমানে চিৎকার করছে আর আঙ্গুল টানাটানি করে যাচ্ছে।

আমাদের সরাইল্যা দুলাভাই ছিলেন চালাক লোক। তিনি তার রিক্সাটির চেইন ফেলে রেখে কোথায় যেনো চলে গিয়েছেন। চেইন লাগানো থাকলে আনাড়ি লোকজন এটি চালাতে চাইবে সেজন্যই এ ব্যবস্থা। জাহির চাচা সেই চেইন লাগাতেই গিয়ে তার আঙ্গুল খোয়াতে বসেছে। অনেক চেষ্টা করেও জাহির চাচার আঙ্গুল বের করা সম্ভব হলো না। এর মধ্যেই খবর পেয়ে জাহির চাচার বাবা ছোটন দাদা এসে দেখে ছেলের আঙ্গুল রিক্সার চেইনে আটকে গিয়েছে আর সেই আঙ্গুলের রক্তে উঠান ভেসে যাচ্ছে। ছোটন দাদার মাথা গরম হয়ে যায়। ছোটন দাদা আচ্ছা করে জাহির চাচার গায়ে দু’ঘা বসিয়ে দিয়ে রিক্সাওয়ালার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে। টানাটানি করেই হোক বা যেভাবেই হোক শেষ পর্যনÍ জাহির চাচার আঙ্গুল চেইন থেকে বের করা সম্ভব হয়। সে আঙ্গুল নিয়ে জাহির চাচাকে অনেক দিন ভুগতে হয়েছিল।

পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচার হতে নিস্কৃতি পেতে আমাদের সেই সরাইল্যা দুলা ভাই শ্বশুর বাড়ি এসেছিলেন, আপাত নিস্কৃতি পেয়েছিলেনও বটে। দেশ স্বাধীনের ছয় সাত বছর পর জীবিকার সন্ধানে তাকে সপরিবারে পার্বত্য জেলায় পাড়ি দিতে হয়। পার্বত্য এলাকায় তখন বাঙালি পুনর্ববাসনের কাজ শুরু হয়েছে। সরাইল্যা দুলা ভাই একজন গরীব মানুষ। তার কোনো জমিজমা ছিল না। রিক্সা চালিয়ে তিনি জীবন ধারণ করতেন। তাঁর সংসারও বেশ বড় ছিল। একটু স্বাছন্দ্যের আশায় তিনি পার্বত্য জেলায় পাড়ি দেন বাচ্চা কাচ্চা আর স্ত্রী নিয়ে। স্বাধীন দেশে সেখানে আমাদের সেই সরাইল্যা দুলাভাই শান্তি (?) বাহিনীর হাতে মারা পড়েন। আহা! ক্রমশ...

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

ব্রুকলিন ব্রিজ

ছবি

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

সাহিত্যের ভাষা, ভাব ও রচনারীতি প্রসঙ্গে

ছবি

সাযুজ্য : অগ্রজ নোবেল লরিয়েট

ছবি

আব্দুলরাজাক গুরনাহ

ছবি

গুরনাহর উপন্যাসে ঔপনিবেশিকতা বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসী জীবনের ট্রমা

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক রচনা : চার

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

সোমবার, ৩০ আগস্ট ২০২১

(পূর্ব প্রকাশের পর)

৫. শরণার্থী

লোকজন পালাচ্ছে। কোথায় পালাচ্ছে? বড়রা বলল ইন্ডিয়ায়। ইন্ডিয়া দেশটা কোথায় আমাদের জানা নেই। তবে কলকাতা আমাদের অনেক পরিচিত শহর। এতো পরিচিত যে মনে হয় যে কোনো একদিন আমরা কলকাতা থেকে ঘুরে আসব। এর কারণ হলো আমার এক নানা কলকাতায় ছিলেন অনেক দিন। তিনি কলকাতা থেকে অনেক খেলনা এনেছিলেন, সেও অনেক আগে। সে খেলনার ভাগ আমার ভাগ্যে কেমন করে যেনো জুটে যায়। আমার নানার সিন্দুক খোলা হলে তার মধ্য থেকে অনেক বিচিত্র জিনিস বের হয়ে আসত। আর সেই বিচিত্র জিনিসের মধ্য ছিল কাছের পিরামিডের কিছু আকৃতি। সে পিরামিডগুলো থেকে লাল,নীল, সবুজ হলুদ নানা রকম আলো বিচ্ছুরিত হতো। সেই বিচ্ছুরিত আলো দেখে আমরা বিমোহিত। অনেক সাধনার পর একমাত্র নাতি হিসেবে আমি পিরামিডগুলোর গর্বিত মালিকানা লাভ করি। এগুলি পেয়ে নিজেকে আমি রাজা-বাদশাহ মনে করতে থাকি আর নানা ভঙ্গিমায় আমি সেগুলো বন্ধুদেরকে দেখাতে থাকি। তারা খুব বিস্মিতিভাব নিয়ে আমার পিরামিডগুলো দেখতে থাকে। এতে আমার অহংকারে যেনো পা পড়ে না। আমি আরো একটা জিনিস পেয়েছিলাম নানার সিন্দুক থেকে। সেটা হলো একটা কিস্তি টুপি। টুপিটা ছিল মখমলের আর ভাজ করা। সেসময় এ ধরনের টুপি খুব কম দেখা যেতো । এ টুপিটাও আমার মেঝো নানা মুজতবা আলি কলকাতা থেকে এনেছিলেন। তিনি তাঁর বড়ভাই অর্থাৎ আমার নানা মুকসেদ আলিকে উপহার দেন। নানা টুপিটা বেশ যতœ করে সিন্দুকে তুলে রাখেন। কিন্তু আমার আবদারের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে তিনি টুপিটা আমাকে উপহার দিয়ে দেন। আমি ঈদে উৎসবে টুপিটা পরে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াই। মুস্তফা আলি নানা কথায় কথায় কলকাতার গল্প জুড়ে দেন। বড়দের সাথে আমরাও সেই গল্প উপভোগ করি। কলকাতাকে তখন খুবই আপন মনে হতে থাকে।

আমি আরো একটা জিনিস পেয়েছিলাম নানার সিন্দুক থেকে। সেটা হলো একটা কিস্তি টুপি। টুপিটা ছিল মখমলের আর ভাঁজ করা। সেসময় এ ধরনের টুপি খুব কম দেখা যেতো

লোকজন ইন্ডিয়ায় যাচ্ছে। ইন্ডিয়া নাকি আমাদের এখান থেকে খুবই কাছে।

আমার বন্ধুদের একজন বলল, ওরা সবাই যাচ্ছে আগরতলায়, ইন্ডিয়ায় নয়। হলেও হতে পারে। আগরতলাতলার নাম শুনেছি। আমাদের কাছে আগরতলাও খুব বিখ্যাত জায়গা। কারণ আগরতলা থেকে প্রচুর কাঁঠাল আসে আমাদের ওখানে। বিশেষ করে যে বছর আগে আগে বাইশ্যা (বর্ষা) আসে। ছিপ নৌকা বোঝাই কাঁঠাল আমাদের চৈয়ারকুড়ি বাজারে এসে লাগে। নৌকাগুলোতো এত বেশি কাঁঠাল থাকতো যে মনে হতো কাঁঠালের ভারে বুঝি নৌকাগুলো ডুবে যাবে। সেই কাঁঠালগুলি ছিল খুবই মিষ্টি।

প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামে রাস্তায়। পশ্চিম অঞ্চল থেকে দলে দলে লোকজন আসতে থাকে। আমাদের গ্রামের পশ্চিম দিকে বেশ দূরে কয়েকটা গ্রাম আছে। গ্রামগুলো হিন্দু প্রধান। এর মধ্যে বাঘি নামের গ্রামটি খুবই বিখ্যাত। গ্রামটিতে শতভাগ হিন্দু। আমাদের নাসিরনগরের অনেকগুলো গ্রামই ছিল হিন্দু প্রধান। তবে শতকরা আশি নব্বইভাগ গ্রামই মুসলিম প্রধান। হিন্দু মুসলিম মিলে মিশেই থাকত। বড় ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। হিন্দু মুসলমানের মধে কোনো গোলমালের খবর আমরা অন্তত শুনিনি। আমরা উপভোগ করতাম হিন্দু সংস্কৃতি। দূর্গাপূজার মূর্তি তৈরির কাজটা হিন্দু ছেলেদের মতই সমান উৎসাহ নিয়ে আমরা দেখতাম। হরিলুটের বাতাসার ভাগও আমাদের ভাগে জুটত।

আমাদের গ্রামের বেশ কয়েকটা গ্রাম পর পূর্ব দিকে ছিল তিলপাড়া, সিংহগ্রাম। ঐ গ্রামটাগুলোতেও শতভাগ হিন্দু বাস করে। আমি আমার বাবার সাথে ঐ গ্রাম দুটির ভিতর দিয়ে আমার ফুফুর বাড়ি রসুলপুর অনেকবার গিয়েছি। আমার বেশ ভালো লেগেছে। রাস্তার উপরে পড়ে থাকা বড়ই কুড়িয়েছি বেশ কয়েকবার। গ্রামের ঘরবাড়ি গুলো বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ছিল আর নিকানো উঠোন আমাকে বেশ আকর্ষণ করত। আমাদের সাথে পড়ুয়া হিন্দু মেয়েগোলোও স্কুল আসত বেশ সাজগোজ করে। সবকিছু মিলিয়ে আমার বেশ ভালো লাগত তাদেরকে।

সেই হিন্দুরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে! আমাদের গ্রামের উপর দিয়েই যাচ্ছে। আট দশ জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়েই যাচ্ছে তাঁরা। আমরা অবাক হয়ে তাদের যাওয়া দেখছি। হিন্দু হলেই দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে?

আমরা যাচ্ছি না কেনো? আমি প্রশ্ন করি।

আমরা যাচ্ছি না, কারণ আমরা মুসলমান। পাকিস্তানী সৈন্যরা মুসলমানদেরকে কিচ্ছু বলবে না। হিন্দুরা মুসলমানী অর্থাৎ খতনা করায় না। মুসলমানী না করায় হিন্দুদের উপর পাকিস্তানী সৈন্যদের বেজায় রাগ। আমাদের এক বন্ধু সুরুজ বলল। সুরুজ আমাদের মাঝে আবার বেশ বুঝদার। অনেক বিষয়েই আমরা তার কথার গুরুত্ব দেই, বিশ্বাস করি।

আমাদেরকেও কি তাহলে মেরে ফেলবে কারণ আমাদেরও তো তখন খতনা হয়নি। আমি সুরুজকে প্রশ্ন করি।

আমাদেরকে মারবে না। আমরা মুসলমানের পোলা। সুরুজের আত্ন-বিশ্বাসী উত্তর আমাকে খুব একটা আশ্বস্ত করতে পানে না। বাবাকে বলে খতনাটা করিয়ে নিতে হবে, মনে মনে ভাবী। কিন্তু নিজের খতনার কথা কীভাবে বাবাকে বলি? এটি তো একটা লজ্জার বিষয়। খতনা দেয়ার বয়স হলে তো বাবা খতনা দিয়েই দিবেন। খতনা সম্পর্কে আমার ভিতরে বেশ একটা ভয় কাজ করে। বাঁশের নেউল দিয়ে হাজাম যাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয় খলিফা ছাত করে বিষেষ অঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া কেটে নিয়ে তেনা পুড়িয়ে তেনার ছাই জায়গাটায় লাগিয়ে দেয়। তারপর কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। কাটার সময় অনেকের রক্ত পড়ে, অনেকে চিৎকার চেঁচামেচি করে পাড়া মাথায় তুলে। তারপর বেশ কয়েকদিন চিৎ হয়ে ঘরে শুয়ে তাকতে হয়। খতনার একটা আনন্দময় দিকও আছে। খতনার সময় আতœীয়-স্বজন বাড়িতে আসে। সাধ্য মতো গরু-ছাগল জবাই করে পাড়া প্রতিবেশীকে খাওয়ানো হয়। দাওয়াত খাওয়ার জন্য কেউ খালি হাতে আসে না। কাপড়-চোপড় এবং নানা উপহার সামগ্রী নিয়ে আসে। পাড়া প্রতিবেশিরা নানা রকম পিঠা-পুলি পাঠায়। বেশ আনন্দঘন একটা পরিবেশ তৈরি হয়। আমি মনে মনে ভাবী আমার একটা খতনা হয়ে যাক। এতে জানটা তো বাঁচবে।

আমার সাথে হিন্দু যারা পড়ে তারা সবাই কি ইন্ডিয়ায় চলে যাবে? সম্পদ, রতন, নৃপেন, নেপাল, রাখি, পাখি খুকু এরা সবাই? একেবারেই যাবে না কি আবার চলে আসবে? এসকল প্রশ্ন আমার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। আমি কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারি না। জিজ্ঞেস করলেও কারও কাছ থেকে সঠিক জবাব পাওয়া যায় না।

দলে দলে লোকজন পালাচ্ছে ঘরবাড়ি, সহায় সম্পদ ফেলে। বিক্রি করার মতো কোনো কিছু থাকলে পানির দামে সেগুলো বিক্রয় করে দিচ্ছে। এসকল পণ্যের মধ্যে গরু ছাগলই প্রধান। আমাদের রঙ্গু চাচা দুইটি দামা নিয়ে এলো বাঘি থেকে কিনে। এতো সুন্দর দামা দুটি! গায়ের রং মাশ-কাজলা। চমৎকার বাঁকানো শিং। সাইজে গরু দুটি বিশাল। এতো বড় গরু আমাদের এলাকায় দেখি নাই। দামা দুটির শরীর চক চক করেছে। তবে তাদের চোখ দুটি কেমন যেনো অশ্রুময়। মালিককে হারিয়ে এরা কি বেদনার্ত? মাত্র ছকুড়ি টাকায় গরু দুটি কেনা হয়েছে। অন্য সময় হলে নাকি গরু দুটি দেড়শ দুইশ টাকায় বিক্রয় হতো।

পলায়নরত লোকজনের মাথায় গাটটি-বুচকা। মহিলাদের কোলে ছোট ছোট বাচ্চা বাদুড়ের মতো ঝুলছে। কারও কারও বুচকার ভিতর থেকে মুরগী কিংবা হাঁসের মাথা উঁকি মারছে। কারও কারও ডোলার ভিতর থেকে কবুতরের বাক্ বাকুম শব্দ বের হয়ে আসছে। ক্লান্ত লোকজন বিশেষ করে বাচ্চা, মহিলা আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা কিছুক্ষণ পরপর জিরোতে চাচ্ছে। পুরুষরা তাদেরকে তাড়া দিচ্ছে। দিনে দিনে নিরাপদ কোনো একটা জায়গায় পৌঁছাতে হবে তাদেরকে। আমাদের গ্রামে কয়েক জায়গায় এ সকল পথিককে সহায়তা করার জন্য স্বেচ্ছা-সেবক প্রস্তুত রয়েছে। তাদের কাজ হলো পিপাসার্ত পথিকদেরকে পানি খাওয়ানো। আমরা দিনভর উৎসাহ নিযে এসব দৃশ্য দেখতে থাকি। কেউ একটা পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে বললে আমরা বর্তে যাই। আমাদের এ উৎসাহে ভাটা পড়ে দুই তিন দিনের মধ্যেই। কারণ, আর লোকজন দল বেঁধে আসছে না। দল বেঁধে বর্ডার পার হতে গিয়ে নাকি অনেক লোক পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে মারা পড়েছে। সে জন্য লোকজন আর প্রকাশ্যে ওপারে যাচ্ছে না। এখন যারা যাচ্ছে তারা অত্যন্ত গোপনে আর রাতের বেলায়। একদল লোক আছে যারা ইন্ডিয়া যাওয়ার পথ-ঘাট চিনে। এরা সীমান্ত পার করে দেয়ার কাজ করছে। এ জন্য তাদেরকে টাকা দিতে হয়।

৬. সরাইল্য দুলাভাই

অন্য গ্রাম থেকে কিছু লোক আমাদের গ্রামে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এর মধ্যে একজন এলো রিক্সা নিয়ে। শুনেছি রিক্সা নামে একটা যান আছে। এটিতে চড়ে মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে। কিন্তু রিক্সা চর্ম চক্ষে কখনো দেখা হয়নি। দেখব কেমন করে? আমাদের এলাকায় রিক্সা চলার মত কোনো রাস্তা ছিল না। গ্রাম থেকে থানা সদরের রাস্তাটিই ছিল মূল রাস্তা। শুকনার সময় আমরা হেঁটে কেনো রকমে থানা সদরে যেতে পারতাম। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু ভাঙ্গা ছিল সেই রাস্তা। রিক্সা দূরের কথা সাইকেল চালিয়ে যেতে হলেও অনেক জায়গায় নামতে হতো। একদিন সাইকেল চালিয়ে দুই তিনদিন তাদেরকে বিশ্রাম নিতে হতো নিশ্চয়ই। তখন টেলিভিশন নামক আজব যন্ত্রটাও আমাদের তল্লাটে ছিল না যে টেলিভিশন দেখে দেখে রিক্সা চিনতে পারব। আমাদের হাচু চাচার মেয়ে জামাই আমাদের এই সরাইল্যা দুলাভাই। সরাইল না কালিসীমা থেকে বউ বাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে আমাদের গ্রামে। তাদের গ্রামটা সিএন্ডবি রাস্তার ধারে। যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে পাকিস্তানী সৈন্য। দুলাভাই পায়ে হেঁটে আসেনি। রীতিমত রিক্সায় চেপে বউ-বাচ্চা আর মাল সামান নিয়ে চলে এসেছে। আমি আমাদের এই দুলাভাইকে আগেও বেশ কয়েকবার দেখেছি। লোকটাকে আমার বেশ পছন্দ। গায়ের রং কুচকুচে কালো, মুখে দাগ। অনেকেই বলে এগুলি শীতলার দাগ। শীতলা মানে হলো হিন্দুদের এক দেবী যে দেবী আবার মানুষের গায়ে গুটি বসন্ত নামক এক ভয়াবহ রোগ দেয়। গ্রামাঞ্চলে এ ধরণেরই একটা ধারণা প্রচলিত ছিল। তো, এই দুলা ভাইটার মুল আকর্ষণ ছিল তার পোষাক। যখনই সে শ্বশুর বাড়ি আসত তখন তার পরনে থাকত সাদা পোষাক। উপরে নিচে দুলাভাই দুই টুকরা ধুতির মতো পোষাক পরতেন। তার চুল ছিল বেশ লম্বা অনেকটা মেয়েদের চুলের মত। তার কথা বলার ঢংটাও আমার পছন্দ ছিল। কেমন টেনে টেনে কথা বলত। আমাদের এলাকার লোকজনের তুলনায় দুলাভাই বেশ চাল্লু ছিলেন। তাকে দেখে আমরা ছড়া কাটতাম-

‘সরাইল্যা হরালি,

বৈদা পাড়ে তিনহালি

একটা বৈদা ভুল

সকল হরালি চোর।’

হরালি একটা পাখির নাম। একসাথে এতো ডিম দেয়? ভুলের সাথে চোরের মিল হয় কী করে?

দুলাভাই হাসত।

এই ছড়া কে বানিয়েছিল আমরা তা জানতাম না, এর কোনো মাথামুন্ডু ছিল কিনা তাও জানতাম না। এই ছড়া শুনে আমাদের লম্বা চুলো দুলাভাই ক্ষেপতেন বলে মনে হয় না তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত হতেন। এ ছড়ার মধ্যে একটা অপমানজনক কিছু ছিল বলে অনুমিত হয়।

রিক্সার কথা শুনে পড়িমরি করে দৌড় লাগালাম দেওয়ান আলিদের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখি এলাহী কান্ড। একটা জিনিসকে গোলবেড় দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে পাড়ার ছেলে-মেয়ে-বুড়ো সবাই। সবাই খুব মজা করে জিনিসটা দেখছে। আমি নিজেকে মনে মনে গালি দিলাম এই দৃশ্য দেখা হতে নিজেকে এতোক্ষণ বঞ্চিত করে রাখার জন্য। মানুষের ভিড়ে কিছুই দেখা যাওয়ার যো নেই। আমি কারো গা ঘেষে, কারো দুপায়ের মাঝ দিয়ে বৃত্ত ভেদ করে নিজেকে রিক্সার সামনে নিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। বাহ! এতো চমৎকার জিনিস। রঙিন হুড, রঙিন সিট। যানটার সারা শরীরে রংয়ের বাহার ছড়িয়ে রয়েছে। সিটের কভারটা এতো সুন্দর যে আমি ভেবে পাচ্ছিলাম মানুষ কেমন করে এতো সুন্দর একটা জিনিসের উপর বসতে পারে। একজন টুংটাং করে ঘন্টা বাজাচ্ছে। রিক্সাটার নিচের দিকে চেয়ে দেখি কেউ একজন উবু হয়ে বসে কিছু একটা করছে। কে ওটা? ভালো করে তাকিয়ে দেখি,ওটা যে আমাদের জাহির চাচা। জাহির চাচা আমাদের তিন চার বছরের সিনিয়র। সম্ভবত তখন হাইস্কুলের নিচের ক্লাসে পড়ে। তখনই বেশ লায়েক হয়ে উঠেছে। লোকজন তাকে উৎসাহ দিচ্ছে আর একটু আর একটু। হয়ে গেছে, আর একটু চেষ্টা কর জাহির। জ্যৈষ্টের গরমে জাহির চাচা গলদগর্ম হয়ে পড়েছে কাজটা করতে গিয়ে। হঠাৎ করে চাচা ’মাই গো, ও মাই গো’ বলে চিৎকার করে উঠল। আমরা চাচার চিৎকারে চমকে গেলাম। কয়েকজন কী অইছে , কী অইছে’ বলে, বলে এক সাথে প্রশ্ন করতে থাকল।

’আমার আঙ্গুল, আমার আঙ্গুল’ বলে বলে তারস্বরে জাহির চাচা চিল্লাচ্ছে। জাহির চাচার আঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে দেখি ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে দর দর করে রক্ত ঝরছে আর উঠানের শুকনা সাদা মাটি কালসে হয়ে যাচ্ছে। জাহির চাচা সমানে চিৎকার করছে আর আঙ্গুল টানাটানি করে যাচ্ছে।

আমাদের সরাইল্যা দুলাভাই ছিলেন চালাক লোক। তিনি তার রিক্সাটির চেইন ফেলে রেখে কোথায় যেনো চলে গিয়েছেন। চেইন লাগানো থাকলে আনাড়ি লোকজন এটি চালাতে চাইবে সেজন্যই এ ব্যবস্থা। জাহির চাচা সেই চেইন লাগাতেই গিয়ে তার আঙ্গুল খোয়াতে বসেছে। অনেক চেষ্টা করেও জাহির চাচার আঙ্গুল বের করা সম্ভব হলো না। এর মধ্যেই খবর পেয়ে জাহির চাচার বাবা ছোটন দাদা এসে দেখে ছেলের আঙ্গুল রিক্সার চেইনে আটকে গিয়েছে আর সেই আঙ্গুলের রক্তে উঠান ভেসে যাচ্ছে। ছোটন দাদার মাথা গরম হয়ে যায়। ছোটন দাদা আচ্ছা করে জাহির চাচার গায়ে দু’ঘা বসিয়ে দিয়ে রিক্সাওয়ালার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে থাকে। টানাটানি করেই হোক বা যেভাবেই হোক শেষ পর্যনÍ জাহির চাচার আঙ্গুল চেইন থেকে বের করা সম্ভব হয়। সে আঙ্গুল নিয়ে জাহির চাচাকে অনেক দিন ভুগতে হয়েছিল।

পাকিস্তানী সৈন্যদের অত্যাচার হতে নিস্কৃতি পেতে আমাদের সেই সরাইল্যা দুলা ভাই শ্বশুর বাড়ি এসেছিলেন, আপাত নিস্কৃতি পেয়েছিলেনও বটে। দেশ স্বাধীনের ছয় সাত বছর পর জীবিকার সন্ধানে তাকে সপরিবারে পার্বত্য জেলায় পাড়ি দিতে হয়। পার্বত্য এলাকায় তখন বাঙালি পুনর্ববাসনের কাজ শুরু হয়েছে। সরাইল্যা দুলা ভাই একজন গরীব মানুষ। তার কোনো জমিজমা ছিল না। রিক্সা চালিয়ে তিনি জীবন ধারণ করতেন। তাঁর সংসারও বেশ বড় ছিল। একটু স্বাছন্দ্যের আশায় তিনি পার্বত্য জেলায় পাড়ি দেন বাচ্চা কাচ্চা আর স্ত্রী নিয়ে। স্বাধীন দেশে সেখানে আমাদের সেই সরাইল্যা দুলাভাই শান্তি (?) বাহিনীর হাতে মারা পড়েন। আহা! ক্রমশ...

back to top