alt

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : ষোলো

শিকিবু

আবুল কাসেম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট : সোমবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

ত্রিশ.
ফুজিওয়ারা নো মুনেয়োকে বিয়ে করলেন সেই শোনাগন। নতুন জীবনে উঠে এসে বেশ উচ্ছ্বসিত। দরবারে লোকজন এ নিয়ে কানাকানি করে, তাতে কী? একটা পাত্তা না দেয়ার মনোভাব নিয়ে চলেন তিনি। ভাবেন, বিয়ে করেছেন, ইঝোমির মতো প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছেন না তো।

সম্রাজ্ঞী এ নিয়ে কিছু বললেন না। সম্রাজ্ঞী সন্তানসম্ভবা। তৃতীয় সন্তানের মা হবেন। তা টের পেয়ে গর্বে আছেন। সম্রাজ্ঞী শোশির বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর হয়ে গেছে, কোনো সন্তান নেই। কত ওঝাঁ-বৈদ্যি, শ্রাইন-প্যাগোডায় দৌড়াদৌড়ি। হবে না, বিশ্বাস তার। তার প্রতি যে অন্যায় করেছেন তার চাচা মিচিনাগা, দেবতা কি তার শোধ নেবে না? এসব ভেবে তিনি তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। মিচিনাগা যত ষড়যন্ত্রের জালই বিস্তার করুন না কেন, তার সন্তানই ভবিষ্যৎ সম্রাট। তাই অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এখন আর মাথা ঘামান না। তাতে সেই শোনাগনও সম্ভাব্য ঝামেলামুক্ত মনে করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

দিন তার ভালোই যাচ্ছিল। সম্রাটের প্রাসাদে ক্রমে ক্রমে শক্ত অবস্থান তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতাও বাড়ছে তার। এসব ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা স্তিমিত হয়। তারও তা হয়েছে। কবিতা লেখা বন্ধ হয়েছে প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকাপাকির সঙ্গে সঙ্গে। প্রবন্ধ-নিবন্ধ-পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধকরণও বন্ধ আছে। প্রভাবশালী আমলা স্বামীর সংস্পর্শে এসে ক্ষমতার স্বাদ নিচ্ছেন তিনি।

মিচিনাগা সব খোঁজখবরই রাখেন। তিনি প্রভাব খাটিয়ে মুনেয়োকে সেতসু প্রদেশে গভর্নর করে পাঠিয়ে দিলেন। যাবার আগে মনেয়ো নিজের লোকদের দিয়ে সম্রাটের কাছে বহু চেষ্টা তদ্বির করলেন। কিছুতেই কিছু হলো না। মিচিনগার ক্ষমতার কাছে এ আমলা এক নস্যি। সম্রাজ্ঞী তেইশির কাছে শোনাগন অনুনয় বিনয় করলেও তিনি সম্রাটের কাছে বদলি ঠেকাতে কোনো তদ্বিরই করেননি। তিনি এ বিয়েটা যেমন পছন্দ করেননি, লেখা বাদ দিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে টানাটানিও অপছন্দ করছেন।

তাহলে কি শোনাগন স্বামীর সঙ্গে সেতসু প্রদেশে চলে যাবেন? না, যাবেন না তিনি। প্রাসাদেই থাকবেন। এই প্রাসাদে অবস্থানটাই শুধু তার দরবারী সাহিত্য প্রতিভা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে পারে। তাছাড়া কিয়োটো থেকে সেতসু প্রদেশ খুব দূরে নয়। এ প্রদেশেই ওসামা এবং কোবের মত বড় বড় নগর রয়েছে। আর তার পাশেই রয়েছে ইঝোমি প্রদেশ।

প্রদেশে প্রশাসনিক প্রধান থাকার চেয়ে রাজধানীর কেন্দ্র সম্রাটের দরবারে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মন খারাপ করেই মুনেয়োকে সেতসু প্রদেশে যেতে হলো। সব মন্দের মধ্যে কিছু ভালো থাকে। শোনাগনের কবিতাপত্র লেখা আবার শুরু হলো। বিরহের সব কবিতা। নিবন্ধ-প্রবন্ধ-পর্যবেক্ষণ রচনায়ও যেন বন্যা এলো। তবে সব লেখা পিলুবুকে স্থান পেলো না, কারণ এগুলোয় মিচিনাগা এবং দরবারের সমালোচনা ছিল। রাগের মাথায় লিখেছিলেন, ঠা-া মাথায় ছিঁড়ে ফেললেন।

সম্রাজ্ঞী তেইশি এতে খুশি। কারণ শোনাগনের লেখা আবার প্রাণ পেতে শুরু করেছে। তার দরবার নিষ্প্রভ হতে শুরু করেছিল। এখন আবার আলোকিত হচ্ছে।

মুনেয়োর সংস্পর্শে এসে শোনাগন কিছুটা চীনা ধ্রুপদী ভাষা আয়ত্ত করেছেন। তার মাথায় এলো তার কবিতা এবং গদ্যে এই চীনা ধ্রুপদী ভাষার প্রয়োগ দেখাবেন। তাই করলেন তিনি। কিন্তু তাতে বিপত্তি ঘটলো। কী রকম বিপত্তি ঘটলো তা মুরাসাকির মুখ থেকেই শোনা যাক।

এই ভাষায় বেশ পারদর্শী তিনি। তিনি বলেছেন, তিনি (শোনাগন) চীনাভাষা বৈশিষ্ট্য আরোপ করে লেখাকে অগোছালো করে তোলেন, কাক্সিক্ষত মহৎ বিষয়গুলো দূরে ঠেলে দেন।

তেইশি এসব না বুঝেই শোনাগনের চীনা ধ্রুপদীর ব্যবহারে অত্যধিক খুশি হয়ে ওঠেন। সভাষদ এবং লেডি-ইন ওয়েটিংদের নিয়ে এত নাচানাচি করেন যে, তার গর্ভের সন্তানই নষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ব্যাপারটা সম্রাট ইচিজোর কানে যায়। তিনি তার জ্যেষ্ঠ সম্রাজ্ঞীর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। তেইশির দরবারের সকল লেডি-ইন-ওয়েটিং, কর্মকর্তা-কর্মচারী, দাস-দাসী তার আরোগ্যের জন্য শিন্টু শ্রাইন এবং বৌদ্ধ প্যাগোডায় ছুটতে শুরু করে। তাদের দুশ্চিন্তা এই যে, সম্রাজ্ঞী বেঁচে না থাকলে তারাও নেই।

শোশির দরবারে তখন উৎসব পালনের মনোভাব। তেইশির মৃত্যু হলে একক সম্রাজ্ঞী হবেন শোশি। হেইয়ান সাম্রাজ্যে সাধারণত সম্রাটের সম্রাজ্ঞী থাকেন একজন। মিচিনাগার চাপে সম্রাট ইচিজোকে তার মেয়েকে মাত্র বারো বছর বয়সে সম্রাজ্ঞী করে নিতে হয়। সম্রাটের আরো তিনজন স্ত্রী আছেন কিন্তু এরা কেউ সম্রাজ্ঞীর স্বীকৃতি পাননি।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

সম্রাট স্বয়ং সম্রাজ্ঞী তেইশির চিকিৎসা ও সেবাযত্নের খোঁজখবর নিচ্ছেন। শোশির বাবা প্রধানমন্ত্রীর এসব পছন্দ হচ্ছে না। তিনি সরাসরি কিছু বলতেও পারছেন না, বড় স্পর্শকাতর বিষয়। প্রধান রাজচিকিৎসককে ডেকে পাঠালেন, তার কাছ থেকে অসুস্থ সম্রাজ্ঞীর খোঁজখবর নিলেন। তার মেয়ের সন্তান হচ্ছে না, প্রধান চিকিৎসক কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারছেন না, এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিলেন তিনি তার মেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখতে চাচ্ছেন না। ততদিনে সম্রাজ্ঞী তেইশি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সম্রাট এক আনন্দ উৎসবের ব্যবস্থা করলেন। সম্রাজ্ঞী শোশি, প্রধানমন্ত্রী মিচিনাগা বাধ্য হয়ে দরবারের রীতি মেনে উৎসবে যোগ দিলেন। অন্তরজ্বালা কাউকে বুঝতে দিলেন না। কিন্তু জ্বলে-পুড়ে মরলেন ভেতর ভেতর।

তেইশির দরবারে এখন স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হয়েছে। চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন সেই শোনাগনরা। বড় বিপদ গেছে। কেন যে সম্রাজ্ঞী পেটে বাচ্চা নিয়ে এরকম উল্লাস করতে গেলেন? শোনাগন ভাবলেন, এখন থেকে এমন কোনো বিষয় সম্রাজ্ঞীকে জাননো যাবে না, যা তার ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এ সময়টায় ইমন এবং মুরাসাকি সম্রাজ্ঞী শোশির সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। লেডি সাইশোকে তাদের ভয়। তিনি সম্রাজ্ঞীকে কুমন্ত্রণা দিয়ে প্রিয় থাকার চেষ্টা করেন। সম্রাজ্ঞী তেইশির মারাত্মক ক্ষতি করারও কুপরামর্শ দিতে পারেন। গোপনে দিলেও সম্রাজ্ঞীর তৎপরতা চোখে পড়বে। তারা সম্রাজ্ঞীর হাতে তেইশির মৃত্যুর চান না- যদিও তাদের সঙ্গে তেইশির দরবারের লেডিদের সঙ্গে একটা বিরোধ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। তারা এখন স্বস্তিতে যে ভালোয় ভালোয় সম্রাজ্ঞী তেইশি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তেইশি বেঁচে থাকলে একটা ভারসাম্য রক্ষা হবে, না হয় শোশি বেপরোয়া এবং স্বৈরাচারী হয়ে উঠবেন। এছাড়া মানুষ হত্যা করা ভালো কথা নয়, সম্রাজ্ঞীকে হত্যা তো নয়ই।

সম্রাজ্ঞী তেইশি সুস্থ হয়ে উঠলেন বটে, কিন্তু সন্তান হারাবার জন্য মন খারাপ করে থাকেন। তার কোনো কিছুতেই মন নেই, উৎসাহ নেই। দরবারের সবাই চিন্তিত। সম্রাটও চিন্তাগ্রস্ত। সম্রাট তাকে সত্যিই ভালোবাসেন। তাকে গুরুত্বও দেন। শোশিকে নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে করতে বাধ্য হন। তেইশি তার প্রথম প্রেম। তাকে বুঝালেন সম্রাট। বললেন, তোমার দু’টি সন্তান আছে। তাদের দিকে তাকিয়ে দুঃখভারটা লাঘব কর।

সম্রাজ্ঞী বললেন, আমি আরো সন্তান চাই। অসংখ্য সন্তান। কতজনকে হত্যা করবে ওরা, শত শত সন্তান চাই।

সম্রাট দেখলেন সম্রাজ্ঞীর মাথাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সমস্যাটা আসলে সেখানে। বললেন, ঠিক আছে। প্রতি সপ্তাহে তুমি আমার কক্ষে আসবে, ওরা (চারজন) এখন কম আসবে।

এ সপ্তাহে আমি প্রতিদিন আসব।

বেশ, তাই হবে। তবুও তুমি মন খারাপ করো না।

এদিকে ইঝোমি মানসিকভাবে দারুণ মর্মপীড়া অনুভব করছেন গতরাতের ঘটনাকে মনে করে। প্রতীজ্ঞা করলেন এভাবে প্রিন্সের সঙ্গে রাতে আর বাইরে যাবেন না। প্রিন্স এই বাড়িতে এসে রাত কাটাবেন, নয়ত বিদায় করে দেবেন। আত্মসম্মান এবং জীবনের ভয়ভীতি তাকে অস্থির করে তুলল।

দ্বিতীয় রাতে প্রিন্স অতসুমিচি এলেন এবং একইভাবে বললেন, শকটে ওঠো, তাড়াতাড়ি খুব তাড়াতাড়ি।

অদ্ভুত ব্যাপার। ইঝোমি তাকে কিছুই বলতে পারলেন না। দ্রুত গিয়ে শকটে উঠলেন। একটা রোমাঞ্চিত কামভাব প্রিন্সের সংস্পর্শে এসে যেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করল।

গতকালের মতো ঠিক সে স্থানে উপস্থিত হলো তাদের শকট। কিন্তু এ স্থানটি নিরাপদ মনে হলো না। কারা যেন এখানে কথা বলছে। তাই এরা অন্য একটি অট্টালিকায় গেলেন। উভয়ে রাত কাটাচ্ছেন পরম আনন্দে। একি হায়! তখনই মোরগ ডেকে উঠেছে। প্রিন্স খুবই বিরক্ত। অতৃপ্তি নিয়ে তাকে কাজ সারতে হলো।

এরা তড়িঘড়ি করে শকটে উঠে এলেন। নামার সময় প্রিন্স বললেন, আজকের মতো ঠিক এ সময় প্রতিদিন তুমি আমার সঙ্গে যাবে।

সব সময় তা কীভাবে সম্ভব? বলে ইঝোমি শকট থেকে নামলেন।

দুই-তিন দিন কেটে গেল। প্রিন্স আসছেন না। চাঁদের আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। ইঝোমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের আলো দেখছেন প্রাণভরে। চমৎকার লাগছে সবকিছু। এ সময় প্রিন্সের পত্র এলো। লিখেছেন : তুমি এ মুহূর্তে কী করছ? তুমি কি চাঁদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছো?

সঙ্গে একটি কবিতা :

তুমি কি আমার মতোই ভাবছো

ঐ পর্বতের চূড়ায় জ্যোৎস্না শোভা চাঁদের কথা?

আর স্মরণ করছ সেই সংক্ষিপ্ত মধুর রাত?

আফসোস হচ্ছে, মোরগটা খুব তাড়াতাড়িই জেগেছিল

ইঝোমি উত্তর দিলেন :

সেই রাত?

একই চাঁদ আজও দীপ্তিময়

আমি দেখছি আর ভাবছি

কিন্তু আমার চিত্ত তুষ্ট নয়

এবং চাঁদ দেখে দেখে

আমার চোখও অতৃপ্ত মনে হয়। ক্রমশ...

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

ব্রুকলিন ব্রিজ

ছবি

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

ছবি

সাময়িকী কবিতা

ছবি

সাহিত্যের ভাষা, ভাব ও রচনারীতি প্রসঙ্গে

ছবি

সাযুজ্য : অগ্রজ নোবেল লরিয়েট

ছবি

আব্দুলরাজাক গুরনাহ

ছবি

গুরনাহর উপন্যাসে ঔপনিবেশিকতা বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসী জীবনের ট্রমা

ছবি

শিকিবু

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ইকরাম কবীর নিজেই নিজের গল্পের প্রেরণা

ছবি

বাউল, বাউলেশ্বর আর বাউলবিদ্বেষের অজান খবর

ছবি

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের জীবনানন্দ ভ্রমণ

ছবি

খানসামা

ছবি

মোরগের ডাক

ছবি

নিরন্তর ধুলা ওড়ে

ছবি

ঘুণপোকা

ছবি

শামীম আজাদ-এর কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

করোনার টুকরো খবর

সাময়িকী কবিতা

ছবি

অঘ্রানের গন্ধের মতন : শাহিদ আনোয়ারের কবিতা

ছবি

শাহিদ আনোয়ার ও তাঁর কবিতা

ছবি

তাঁর দীর্ঘ ছায়া

ছবি

‘মেঘের ভিতরে তুমি দ্যাখো কোন পাখির চককর?’

ছবি

বানিয়ে বলা গল্পই হলো অমূল্য সম্ভার

ছবি

নব্বইয়ের দশকের কবিতা: বিশেষত্ব, বৈশিষ্ট্য ও সৃষ্টিশৈলী

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

tab

সাময়িকী

ধারাবাহিক উপন্যাস : ষোলো

শিকিবু

আবুল কাসেম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

সোমবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

ত্রিশ.
ফুজিওয়ারা নো মুনেয়োকে বিয়ে করলেন সেই শোনাগন। নতুন জীবনে উঠে এসে বেশ উচ্ছ্বসিত। দরবারে লোকজন এ নিয়ে কানাকানি করে, তাতে কী? একটা পাত্তা না দেয়ার মনোভাব নিয়ে চলেন তিনি। ভাবেন, বিয়ে করেছেন, ইঝোমির মতো প্রেমিকের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছেন না তো।

সম্রাজ্ঞী এ নিয়ে কিছু বললেন না। সম্রাজ্ঞী সন্তানসম্ভবা। তৃতীয় সন্তানের মা হবেন। তা টের পেয়ে গর্বে আছেন। সম্রাজ্ঞী শোশির বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর হয়ে গেছে, কোনো সন্তান নেই। কত ওঝাঁ-বৈদ্যি, শ্রাইন-প্যাগোডায় দৌড়াদৌড়ি। হবে না, বিশ্বাস তার। তার প্রতি যে অন্যায় করেছেন তার চাচা মিচিনাগা, দেবতা কি তার শোধ নেবে না? এসব ভেবে তিনি তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। মিচিনাগা যত ষড়যন্ত্রের জালই বিস্তার করুন না কেন, তার সন্তানই ভবিষ্যৎ সম্রাট। তাই অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এখন আর মাথা ঘামান না। তাতে সেই শোনাগনও সম্ভাব্য ঝামেলামুক্ত মনে করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

দিন তার ভালোই যাচ্ছিল। সম্রাটের প্রাসাদে ক্রমে ক্রমে শক্ত অবস্থান তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতাও বাড়ছে তার। এসব ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা স্তিমিত হয়। তারও তা হয়েছে। কবিতা লেখা বন্ধ হয়েছে প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ের কথা পাকাপাকির সঙ্গে সঙ্গে। প্রবন্ধ-নিবন্ধ-পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধকরণও বন্ধ আছে। প্রভাবশালী আমলা স্বামীর সংস্পর্শে এসে ক্ষমতার স্বাদ নিচ্ছেন তিনি।

মিচিনাগা সব খোঁজখবরই রাখেন। তিনি প্রভাব খাটিয়ে মুনেয়োকে সেতসু প্রদেশে গভর্নর করে পাঠিয়ে দিলেন। যাবার আগে মনেয়ো নিজের লোকদের দিয়ে সম্রাটের কাছে বহু চেষ্টা তদ্বির করলেন। কিছুতেই কিছু হলো না। মিচিনগার ক্ষমতার কাছে এ আমলা এক নস্যি। সম্রাজ্ঞী তেইশির কাছে শোনাগন অনুনয় বিনয় করলেও তিনি সম্রাটের কাছে বদলি ঠেকাতে কোনো তদ্বিরই করেননি। তিনি এ বিয়েটা যেমন পছন্দ করেননি, লেখা বাদ দিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে টানাটানিও অপছন্দ করছেন।

তাহলে কি শোনাগন স্বামীর সঙ্গে সেতসু প্রদেশে চলে যাবেন? না, যাবেন না তিনি। প্রাসাদেই থাকবেন। এই প্রাসাদে অবস্থানটাই শুধু তার দরবারী সাহিত্য প্রতিভা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করতে পারে। তাছাড়া কিয়োটো থেকে সেতসু প্রদেশ খুব দূরে নয়। এ প্রদেশেই ওসামা এবং কোবের মত বড় বড় নগর রয়েছে। আর তার পাশেই রয়েছে ইঝোমি প্রদেশ।

প্রদেশে প্রশাসনিক প্রধান থাকার চেয়ে রাজধানীর কেন্দ্র সম্রাটের দরবারে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই মন খারাপ করেই মুনেয়োকে সেতসু প্রদেশে যেতে হলো। সব মন্দের মধ্যে কিছু ভালো থাকে। শোনাগনের কবিতাপত্র লেখা আবার শুরু হলো। বিরহের সব কবিতা। নিবন্ধ-প্রবন্ধ-পর্যবেক্ষণ রচনায়ও যেন বন্যা এলো। তবে সব লেখা পিলুবুকে স্থান পেলো না, কারণ এগুলোয় মিচিনাগা এবং দরবারের সমালোচনা ছিল। রাগের মাথায় লিখেছিলেন, ঠা-া মাথায় ছিঁড়ে ফেললেন।

সম্রাজ্ঞী তেইশি এতে খুশি। কারণ শোনাগনের লেখা আবার প্রাণ পেতে শুরু করেছে। তার দরবার নিষ্প্রভ হতে শুরু করেছিল। এখন আবার আলোকিত হচ্ছে।

মুনেয়োর সংস্পর্শে এসে শোনাগন কিছুটা চীনা ধ্রুপদী ভাষা আয়ত্ত করেছেন। তার মাথায় এলো তার কবিতা এবং গদ্যে এই চীনা ধ্রুপদী ভাষার প্রয়োগ দেখাবেন। তাই করলেন তিনি। কিন্তু তাতে বিপত্তি ঘটলো। কী রকম বিপত্তি ঘটলো তা মুরাসাকির মুখ থেকেই শোনা যাক।

এই ভাষায় বেশ পারদর্শী তিনি। তিনি বলেছেন, তিনি (শোনাগন) চীনাভাষা বৈশিষ্ট্য আরোপ করে লেখাকে অগোছালো করে তোলেন, কাক্সিক্ষত মহৎ বিষয়গুলো দূরে ঠেলে দেন।

তেইশি এসব না বুঝেই শোনাগনের চীনা ধ্রুপদীর ব্যবহারে অত্যধিক খুশি হয়ে ওঠেন। সভাষদ এবং লেডি-ইন ওয়েটিংদের নিয়ে এত নাচানাচি করেন যে, তার গর্ভের সন্তানই নষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

ব্যাপারটা সম্রাট ইচিজোর কানে যায়। তিনি তার জ্যেষ্ঠ সম্রাজ্ঞীর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। তেইশির দরবারের সকল লেডি-ইন-ওয়েটিং, কর্মকর্তা-কর্মচারী, দাস-দাসী তার আরোগ্যের জন্য শিন্টু শ্রাইন এবং বৌদ্ধ প্যাগোডায় ছুটতে শুরু করে। তাদের দুশ্চিন্তা এই যে, সম্রাজ্ঞী বেঁচে না থাকলে তারাও নেই।

শোশির দরবারে তখন উৎসব পালনের মনোভাব। তেইশির মৃত্যু হলে একক সম্রাজ্ঞী হবেন শোশি। হেইয়ান সাম্রাজ্যে সাধারণত সম্রাটের সম্রাজ্ঞী থাকেন একজন। মিচিনাগার চাপে সম্রাট ইচিজোকে তার মেয়েকে মাত্র বারো বছর বয়সে সম্রাজ্ঞী করে নিতে হয়। সম্রাটের আরো তিনজন স্ত্রী আছেন কিন্তু এরা কেউ সম্রাজ্ঞীর স্বীকৃতি পাননি।

ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি একাদশ শতকের জাপানের গৌরবময় সাহিত্য-সমৃদ্ধির পটভূমিতে চারজন বিখ্যাত নারী কবি ও ঔপন্যাসিককে নিয়ে রচিত। বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু আছেন এর কেন্দ্রে। আরও আছেন কবি আকাঝুমি ইমন, কবি ইঝোমি শিকিবু এবং বিখ্যাত “দ্য পিলুবুক” রচয়িতা সেইসোনাগান

সম্রাট স্বয়ং সম্রাজ্ঞী তেইশির চিকিৎসা ও সেবাযত্নের খোঁজখবর নিচ্ছেন। শোশির বাবা প্রধানমন্ত্রীর এসব পছন্দ হচ্ছে না। তিনি সরাসরি কিছু বলতেও পারছেন না, বড় স্পর্শকাতর বিষয়। প্রধান রাজচিকিৎসককে ডেকে পাঠালেন, তার কাছ থেকে অসুস্থ সম্রাজ্ঞীর খোঁজখবর নিলেন। তার মেয়ের সন্তান হচ্ছে না, প্রধান চিকিৎসক কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারছেন না, এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিলেন তিনি তার মেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখতে চাচ্ছেন না। ততদিনে সম্রাজ্ঞী তেইশি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সম্রাট এক আনন্দ উৎসবের ব্যবস্থা করলেন। সম্রাজ্ঞী শোশি, প্রধানমন্ত্রী মিচিনাগা বাধ্য হয়ে দরবারের রীতি মেনে উৎসবে যোগ দিলেন। অন্তরজ্বালা কাউকে বুঝতে দিলেন না। কিন্তু জ্বলে-পুড়ে মরলেন ভেতর ভেতর।

তেইশির দরবারে এখন স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হয়েছে। চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন সেই শোনাগনরা। বড় বিপদ গেছে। কেন যে সম্রাজ্ঞী পেটে বাচ্চা নিয়ে এরকম উল্লাস করতে গেলেন? শোনাগন ভাবলেন, এখন থেকে এমন কোনো বিষয় সম্রাজ্ঞীকে জাননো যাবে না, যা তার ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এ সময়টায় ইমন এবং মুরাসাকি সম্রাজ্ঞী শোশির সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। লেডি সাইশোকে তাদের ভয়। তিনি সম্রাজ্ঞীকে কুমন্ত্রণা দিয়ে প্রিয় থাকার চেষ্টা করেন। সম্রাজ্ঞী তেইশির মারাত্মক ক্ষতি করারও কুপরামর্শ দিতে পারেন। গোপনে দিলেও সম্রাজ্ঞীর তৎপরতা চোখে পড়বে। তারা সম্রাজ্ঞীর হাতে তেইশির মৃত্যুর চান না- যদিও তাদের সঙ্গে তেইশির দরবারের লেডিদের সঙ্গে একটা বিরোধ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। তারা এখন স্বস্তিতে যে ভালোয় ভালোয় সম্রাজ্ঞী তেইশি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তেইশি বেঁচে থাকলে একটা ভারসাম্য রক্ষা হবে, না হয় শোশি বেপরোয়া এবং স্বৈরাচারী হয়ে উঠবেন। এছাড়া মানুষ হত্যা করা ভালো কথা নয়, সম্রাজ্ঞীকে হত্যা তো নয়ই।

সম্রাজ্ঞী তেইশি সুস্থ হয়ে উঠলেন বটে, কিন্তু সন্তান হারাবার জন্য মন খারাপ করে থাকেন। তার কোনো কিছুতেই মন নেই, উৎসাহ নেই। দরবারের সবাই চিন্তিত। সম্রাটও চিন্তাগ্রস্ত। সম্রাট তাকে সত্যিই ভালোবাসেন। তাকে গুরুত্বও দেন। শোশিকে নাবালিকা অবস্থায় বিয়ে করতে বাধ্য হন। তেইশি তার প্রথম প্রেম। তাকে বুঝালেন সম্রাট। বললেন, তোমার দু’টি সন্তান আছে। তাদের দিকে তাকিয়ে দুঃখভারটা লাঘব কর।

সম্রাজ্ঞী বললেন, আমি আরো সন্তান চাই। অসংখ্য সন্তান। কতজনকে হত্যা করবে ওরা, শত শত সন্তান চাই।

সম্রাট দেখলেন সম্রাজ্ঞীর মাথাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সমস্যাটা আসলে সেখানে। বললেন, ঠিক আছে। প্রতি সপ্তাহে তুমি আমার কক্ষে আসবে, ওরা (চারজন) এখন কম আসবে।

এ সপ্তাহে আমি প্রতিদিন আসব।

বেশ, তাই হবে। তবুও তুমি মন খারাপ করো না।

এদিকে ইঝোমি মানসিকভাবে দারুণ মর্মপীড়া অনুভব করছেন গতরাতের ঘটনাকে মনে করে। প্রতীজ্ঞা করলেন এভাবে প্রিন্সের সঙ্গে রাতে আর বাইরে যাবেন না। প্রিন্স এই বাড়িতে এসে রাত কাটাবেন, নয়ত বিদায় করে দেবেন। আত্মসম্মান এবং জীবনের ভয়ভীতি তাকে অস্থির করে তুলল।

দ্বিতীয় রাতে প্রিন্স অতসুমিচি এলেন এবং একইভাবে বললেন, শকটে ওঠো, তাড়াতাড়ি খুব তাড়াতাড়ি।

অদ্ভুত ব্যাপার। ইঝোমি তাকে কিছুই বলতে পারলেন না। দ্রুত গিয়ে শকটে উঠলেন। একটা রোমাঞ্চিত কামভাব প্রিন্সের সংস্পর্শে এসে যেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করল।

গতকালের মতো ঠিক সে স্থানে উপস্থিত হলো তাদের শকট। কিন্তু এ স্থানটি নিরাপদ মনে হলো না। কারা যেন এখানে কথা বলছে। তাই এরা অন্য একটি অট্টালিকায় গেলেন। উভয়ে রাত কাটাচ্ছেন পরম আনন্দে। একি হায়! তখনই মোরগ ডেকে উঠেছে। প্রিন্স খুবই বিরক্ত। অতৃপ্তি নিয়ে তাকে কাজ সারতে হলো।

এরা তড়িঘড়ি করে শকটে উঠে এলেন। নামার সময় প্রিন্স বললেন, আজকের মতো ঠিক এ সময় প্রতিদিন তুমি আমার সঙ্গে যাবে।

সব সময় তা কীভাবে সম্ভব? বলে ইঝোমি শকট থেকে নামলেন।

দুই-তিন দিন কেটে গেল। প্রিন্স আসছেন না। চাঁদের আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। ইঝোমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাঁদের আলো দেখছেন প্রাণভরে। চমৎকার লাগছে সবকিছু। এ সময় প্রিন্সের পত্র এলো। লিখেছেন : তুমি এ মুহূর্তে কী করছ? তুমি কি চাঁদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছো?

সঙ্গে একটি কবিতা :

তুমি কি আমার মতোই ভাবছো

ঐ পর্বতের চূড়ায় জ্যোৎস্না শোভা চাঁদের কথা?

আর স্মরণ করছ সেই সংক্ষিপ্ত মধুর রাত?

আফসোস হচ্ছে, মোরগটা খুব তাড়াতাড়িই জেগেছিল

ইঝোমি উত্তর দিলেন :

সেই রাত?

একই চাঁদ আজও দীপ্তিময়

আমি দেখছি আর ভাবছি

কিন্তু আমার চিত্ত তুষ্ট নয়

এবং চাঁদ দেখে দেখে

আমার চোখও অতৃপ্ত মনে হয়। ক্রমশ...

back to top