alt

সাময়িকী

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

হাসান আজিজুল হক

: শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

http://sangbad.net.bd/images/2021/September/11Sep21/news/shahidul-jahir-1.jpg

শহীদুল জহিরের লেখার শৈশব বাল্যকাল বলে কিছু নেই। তেইশ বছর বয়সে প্রথম গল্পের প্রকাশ, প্রায় কাছাকাছি সময়েই আর একটি বড় আকারের গল্প : তারপর সাতাশ বছর বয়সে তৈরি একটি ছোটগল্প সংগ্রহের পাণ্ডুলিপি। সেটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে যখন তিনি চৌত্রিশ। ছোটগল্প সংগ্রহ ‘পারাপার’-এর সব গল্প আমার পড়া নেই, মনে হয় বেশিরভাগই পড়িনি। এর কয়েক বছর পর, যখন তাঁর আটত্রিশে পা, ১৯৮৯ সালে বেরুল উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। একেবারে প্রদীপ্ত যৌবনের রচনা। না কোনো খোকামি, না কোনো বালখিল্যতা, প্রখর পরিণত লেখকের লেখা উপন্যাস। বলতে ইচ্ছে হয়, এই লেখাটি আর তিনি কোনোদিনই অতিক্রম করতে পারেননি, (ছোটগল্পের কথা এখানে হিসেবে ধরছি না) এমনি সুপরিণত, এমনি আবেগ আর বুদ্ধির টান টান ভারসাম্যে তা বাঁধা। লেখক হিসেবে জন্মেই টলমলে পায়ে হাঁটা নয়, একেবারে সেই মুহূর্ত থেকেই ঋজু মেরুদ-, খাড়া ঘাড়, খরদৃষ্টি। এইভাবেই আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল শহীদুলের। না, শহীদুলের নয়, তাঁর রচনার। লেখক নামে যে মানুষটি থাকে, জীবনযাপন করে, কাজে যায়, কাজে আসে, সেই মানুষ শহীদুল কোনোদিন আত্মপ্রকাশ করেন নি। সংগোপনে জীবনযাপন করেছেন তিনি, চলেও গেছেন প্রায় সকলের অজান্তেই। শুধু তাঁর লেখাগুলি যেভাবে নিঃসংকোচে আত্মপ্রকাশ করেছিল, বাংলা সাহিত্যে বিনা আড়ম্বরে একটা শক্ত মজবুত আসন দাবি করেছিল, সেই দাবি এখন অনপেক্ষ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।

http://sangbad.net.bd/images/2021/September/11Sep21/news/shahidul-jahir-2.jpg

শহীদুলের নজর ছিল মানব-বাস্তবের দিকে। নতুন কথা কিছু নয়, লেখক অলেখক সব মানুষেরই তাই থাকে। এই বাস্তব সৃষ্ট নয়, প্রদত্ত : আকাক্সক্ষা অনাকাক্সক্ষার বিষয় নয়- সব সময়ই হাজির, সদাই বিদ্যমান, অস্তিত্বের, চেতনার শর্ত। সেজন্য মানব-অস্তিত্ব জীবন কালের জন্য একটা সমগ্র- সময়, কাল, বস্তু, পট, প্রকৃতি, জীবজগত, জড়জগত সবকিছু নিয়ে এই সমগ্র। আমাদের অস্তিত্বে সেই সমগ্রের দখলই শেষ কথা। সব কাজ, সব চিন্তা, সব আচরণ, সব আবেগ আর প্রবৃত্তির চূড়ান্ত আভিমুখ্য এই সমগ্রের দিকে আর সমগ্র থেকে। বাস্তববাদী নয় কে? সবাই বাস্তববাদী, লেখকও তাই, অবাস্তববাদী লেখক নেই। কোদালকে সরাসরি কোদাল বলতে চান যে লেখক তাঁকে আমরা বাস্তবপন্থী, জীবন ঘনিষ্ঠ, জীবনবাদী বলতে চাইলেও এটা আমাদের খেয়াল থাকে না যে, বাস্তবের প্রতিবাস্তবও আছে, চেতনার ভেতর দিয়ে তা নির্মিত, মানুষসহ সব চেতনজীবীরই আছে এই বাস্তব। আসলে দুই বাস্তব- বহির্বাস্তব আর আন্তর-বাস্তব পরস্পর সম্পর্কিত হতে পারে আবার হতেই যে পারে তা প্রমাণ করা যায় না- অথচ এরা জুজুধান, সম্পর্কিত, সমন্বিত, মিশ্রিত জটিল কুটিল নানা অলিগলিতে বাঁধা আছে। এই দ্বিতীয় বাস্তব আমাদের মনোজগত, একান্তভাবে ব্যক্তিজগত, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত মনোভূমি। আমরা প্রত্যক্ষভাবে এখানেই বাঁচি, এখানেই মরি, এখানেই চিন্তা করি, এখানেই আবেগ ভালোবাসা ঘৃণা জন্মায়, কল্পনা সৃষ্টি প্রেম অপ্রেম এখানেই ওঠে পড়ে। এখানেই বহির্বাস্তবের অবিকলতা তৈরি হয়, অবিকলতার বিভ্রমও দেখা দেয়। বিভ্রান্তি, ভুল, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, একই বাস্তবের অগণ্য ভিন্নতা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির ভিন্নতা থেকেই তৈরি হয়। সব শিল্পের শিকড় কা- শাখা প্রশাখা ফুল ফল কাঁটা বিষের উৎস এখানেই।

বোধহয় একরকমে একটা প্রচণ্ড বিরোধিতার প্রসঙ্গই তোলা হলো। মিলবে না, মেলানো যাবে না। শিল্পের জমি, শিল্পের আকাশ একই সাথে পরস্পর জুড়ে আছে। স্থান আর স্থান থেকে প্রস্থান। চেতনার সঙ্গে সম্পর্কশূন্য বাইরের বাস্তব আর চেতনার সঙ্গে সংকর্ষণউপজাত ব্যক্তির প্রাতিস্বিকবাস্তব। একবার বলেছি, শহীদুল জহিরের নজর ছিল মানব বাস্তবের দিকে- প্রকৃতিলিপ্ত, সমাজ রাষ্ট্র দেশ সময়লগ্ন বহির্বাস্তব। এই বাস্তব কঠিন সত্য, আমাদের সকলের জন্য অনন্যোপায় সত্য অথচ এটা মাত্রই আধখানা। রাসেলের নিরপেক্ষ বস্তুজাত উপাত্ত তত্ত্ব- নিউট্রাল মনিজম-এর মতো। একদিকে মানব চেতনার সঙ্গে সম্পর্কশূন্য বস্তু-উপাত্ত, অন্যদিকে সেই উপাত্তজাত চেতনা আর বোধের অধিগত বাস্তব। দুই আধখানায় পুরো বাস্তব। বহির্বাস্তবের দিকে শহীদুলের কঠিন একরোখা নজর থাকলেও আধখানা সত্যটিও যেন দুভাগ হয়ে গিয়ে মাত্র সিকিতে দাঁড়িয়েছে; তাঁর সাহিত্যের বাকি তিন ভাগই যেন আন্তর্বাস্তবের খেলা। সাহিত্যের সেই আন্তর্বাস্তব বাড়ে কমে, স্থির হয়ে দাঁড়ায়, অস্থির হয়, অর্থ বা অর্থহীনতায় ভরে ওঠে, ভেঙে যায়, গড়ে ওঠে, অলীক অবাস্তব অশরীরী বা কঠিন তির্যক সত্যের থেকে সত্য বাস্তব থেকে বাস্তবতর হয়ে ওঠে। কিন্তু সিকি ভাগ কঠিন বাস্তব সত্যটুকু কখনোই অলীক হয়ে ওঠে না, দৃষ্টির মনোযোগের বাইরে যায় না, চষবার জমি হিসেবে চিরকাল মানবজমিন থেকে যায়- এতটুকু নড়চড় হয় না। তখন বুঝতে পারা যায়, একই বাস্তব সবাই দেখে বটে, চর্মচক্ষুসহ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দেখা সবারই এক কিন্তু সেই দেখা সকলের বোধে নেই, বুদ্ধিতে নেই, আলোয় নেই, দীপ্তিতে নেই। সেই জন্যই সবাই লেখক নয়, সব লেখকও লেখক নয়, কোনো লেখকই কোনো লেখকের মতো নয়, সেই জন্যই পাই-পয়সা লেখক আনা আনা লেখক যেমন পাওয়া যায়, ক্বচিৎ কখনো প্রায় ষোলো আনা লেখকও মেলে। হিসেব করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় শহীদুল জহির কত আনার লেখক ছিলেন। তিন ভাগ অবাস্তব-বাস্তবকে মিলিয়ে যিনি সিকি ভাগ বাস্তবকে তীব্র তির্যক তীক্ষ্ণ করে তুলতে পেরেছিলেন, তিনি খুব সামান্য লেখক নিশ্চই ছিলেন না।

হিসেব করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় শহীদুল জহির কত আনার লেখক ছিলেন। তিন ভাগ অবাস্তব-বাস্তবকে মিলিয়ে যিনি সিকি ভাগ বাস্তবকে তীব্র তির্যক তীক্ষ্ণ করে তুলতে পেরেছিলেন, তিনি খুব সামান্য লেখক নিশ্চয়ই ছিলেন না

গোটা বাংলা কথাসাহিত্যেই এই ধারা প্রায় অনুপস্থিত, তার সূত্রপাতও বেশিদিনের নয়। এই ধারা এখনও ক্ষীণ। বরং অনর্থক, অপটু, বোধহীন, উদ্দেশ্যহীন চর্চার ফলে প্রচুর জঞ্জাল আজকাল বাড়ছে আর বেড়েই চলেছে। বঙ্কিমে, রবীন্দ্রনাথে এই তৃতীয় নয়নের দৃষ্টিপাত মেলে, ধুর্জটিপ্রসাদে আছে সচেতন আড়ষ্টচর্চা, সতীনাথেও তা দেখি। তবে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ লিখে মানিক অসাধারণ শুরু করেছিলেন ও সফলতাও পেয়েছিলেন। শুরু করেই তিনি ছেড়ে দেন বটে, তবে কুণ্ডলি পাকানো সাপের মতো তাঁর সারা জীবনের সমস্ত লেখায় এটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েও থাকে। বাংলাদেশের সাহিত্যে একেবারেই আলাদা একটা জায়গা থেকে- সমাজ-বীক্ষণ, ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমাজ আর সমাজের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি- শুরু করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। শহীদুল জহির হয়ে ওঠেন তাঁর প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। তবে উত্তরসূরি তার বেশি কিছু নয়, ছায়া প্রতিচ্ছায়া নয়, ধ্বনির প্রতিধ্বনি নয়, এক নতুন ওয়ালীউল্লাহ নয়, বরং ওয়ালীউল্লাহর ভিতর দিয়ে এক শহীদুল জহির, মৌলিক, ছাপিয়ে যাওয়া, চূড়ান্ত স্বতন্ত্র এক শহীদুল।

‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ঠিক কবে প্রথম পড়েছিলাম মনে নেই। ’৮৮-তে বেরুনোর পর কোনো একসময়ে হবে- ছ’মাসের মধ্যেও হতে পারে, বছর খানেকের ভেতরেও পারে। গাধার কাছে সোনার পিণ্ডের চেয়ে ঘাস বেশি পছন্দ, আমি অনেকটা সেইরকম ঘাসের দিকেই মনোযোগ দিয়েছিলাম। একে তো বইয়ের ম্যাড়মেড়ে সাদামাটা একটা নাম, হতে পারে বইটা একটা রাজনৈতিক প্রবন্ধ। বিচ্ছিরি রকম সস্তা সাদা মফস্বলি মলাটের ওপর হাতের লেখায় বইয়ের নামটা লেখা; মাঝখানে সাদা ফুটোওয়ালা একটা কালো পাথরে কাঁচা হাতের আঁকা দুটি পাতার জলজ কুসুমের ডাঁটি। সেয়ানা পাঠকও কখনো কখনো বোকাটে চোখে কোনো বইয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। উপন্যাস দেখে পড়ে ফেলেছিলাম বটে, কিন্তু হয়তো সময় ছিল না, মন ছিল না, হয়তো তৈরিই ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল নতুন লেখা, সামান্য নড়েচড়ে বসার মতো, একটু চমকে উঠতে হয়, আচ্ছা, সময় করে আবার কখনো পড়া যাবে- এই হলো তখনকার প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয় পাঠের আগে বোধেও এলো না যে, এই বই এক আবির্ভাব। তৃতীয় পাঠে এসে মনে হলো আমার এই মত কোনোদিন আর বদলাবার প্রয়োজন নেই।

লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আব্দুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেলের ফিতে রায়সাবাজারের দিকে যেতে নবাবপুর সড়কের ওপর উঠতেই ফট করে ছিঁড়ে যায় এবং মাত্র বাহান্ন পৃষ্ঠা পরে এই উপন্যাসের শেষে আব্দুল মজিদ দৈনিক ইত্তেফাকে একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে তার বাড়িটি বিক্রি করে লক্ষ্মীবাজার থেকে বাস উঠিয়ে চলে যায়, ফলে যেনবা তার অস্তিত্বই মুছে যায়। আরম্ভে আর শেষে দুটি খবর মাত্র। প্রথম খবরটি তুচ্ছ, উদ্ভট, একেবারেই গুরুত্বহীন- ফট করে স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া আর দ্বিতীয় খবরটিতে যা আছে তা তো হরহামেশাই ঘটে থাকে, বাড়ি বেচে আর কোথাও চলে যাওয়া। এমন ঘটনা এমনি এমনিও ঘটতে পারে। কত কারণেই তো মানুষ বাড়ি বিক্রি করে বাস উঠিয়ে চলে যায়। কিন্তু শহীদুল জহিরের উপন্যাসে এই অতিশয় তুচ্ছ দুটি সংবাদের মাঝখানে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- একাত্তরের ন’মাস- পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশের ঢাকা শহরের একটি মহল্লা। এই মহল্লাটি শহীদুল জহিরের এক টুকরো বহির্বাস্তব। সেই বাস্তবই তাঁর উপন্যাসের অবলম্বন। ঐটুকু সীমানা-বাঁধা, সময়-বাঁধা, ঘটনা-বাঁধা বাস্তব অক্ষরশব্দবাক্যঠাসাই হয়ে মাত্র বাহান্ন পৃষ্ঠার মধ্যেই রূপান্তরিত হয়ে যায় সারা বাংলাদেশে। পুবে থেকে পশ্চিমে ছড়ানো, উত্তর থেকে দক্ষিণে সমুদ্রশায়ী বাংলাদেশে। তার বিস্তৃত রণাঙ্গনে। ঐ মহল্লার বিশ ত্রিশ হাজার মানুষ একাত্তরের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। ন’মাসে ঐ মহল্লার নিরপেক্ষ স্থির বাস্তবই হচ্ছে শহীদুল জহিরের নির্মিত বাস্তবের মাত্র সিকি ভাগ কঠিন, অলঙ্ঘ্যনীয়, নৈর্ব্যক্তিক ও অপরিত্যাজ্য বাস্তব। শহীদুল সেই বাইরের বাস্তবেই ধূম-ধোঁয়া আগুন জল তৈরি করেছেন, যা স্থির আর প্রদত্ত, তাতে তীব্র অসহনীয় গতি সঞ্চার করেছেন। হাহাকার কান্না, পাহাড়-চাপা যন্ত্রণা, পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষের শরীরের খ-, নরমাংসের টুকরো কাককে দিয়ে খাওয়ানো, শতবার ধর্ষণে রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন উলঙ্গ নারীশরীর ফের আবার বেয়োনেটে ফুটিফাটা- উহ্, এরকম এক ভয়ঙ্কর বাংলাদেশ পিকাসোর কত কত গুয়ের্নিকা হয়ে শান্ত আর সর্পিল অক্ষর আর বাক্যের বাঁধনে তৈরি হয়ে যায়। এভাবেই শহীদুল নির্দিষ্ট বাস্তবকে শতবার অতিক্রমণ পরিক্রমণ করে জ্বলন্ত ফুটন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব সৃষ্টি করেন। তাঁর খননকাজের অন্ত নেই, স্তরের পর স্তর উন্মোচিত হচ্ছে, একটি একটি বাস্তব, অতিবাস্তব তৈরি হচ্ছে, দক্ষ হীরে-শিল্পীর কাটা হীরের মতো শঙ্কাহীন কোণে কোণে শঙ্কাহীন আলোকণা জ্বলছে নিভছে সংখ্যাহীন নক্ষত্রের মতো, প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্যের মাত্র সাত রং নয়, সাত শ’ সাত শ’ অকল্পনীয় রং; তাজা রক্ত, বাসি রক্ত, কালো রক্ত, যোনি থেকে উরু বেয়ে ঝুঁঝিয়ে নামা কুমারীর পবিত্র রক্ত, বদু মওলানা আর রাজাকার পিশাচ খোক্কসদের দুর্গন্ধ কালো রক্ত এই রকম রক্তের রং, এই রকম মাংসের রং। শহীদুল জহির মেলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের অফুরন্ত অফুরান গল্প। গোলালো পরিসমাপ্ত গল্প নয়, চক্রাকারও নয়, নানা বিভঙ্গের সর্পিল গল্প। শুরুতেই শেষে চলে যায়, শেষে পৌঁছে আবার শুরুকে স্পর্শ করে, শুরুরও আগে চলে যায়, সময়ের ক্রমকে বারবার ভেঙে দেয়, সময় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত, আমাদের সুবিধেমতো বেঁধে দেওয়া সীমানা, নির্দিষ্টতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, সময় হয়ে ওঠে চিরবর্তমান। অসীম তার ধারণক্ষমতা। চোখের নিচে ভেসে ওঠে মানব সংসারের একটির পর একটি পরত- গূঢ় রহস্যময় লুকানো জীবনের সমস্ত তন্তুগুলি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই উপন্যাসের নাম ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ছাড়া আর কী-বা হতে পারত তখন আর ভেবে পাই না।

এতসব কথা কি আমি কল্পনা করে লিখছি, না, লিখতে লিখতে কল্পনা করছি? যদি সবটাই কল্পনা না করে থাকি, তা হলে ভাবতে হয় শহীদুল জহিরের মন্ত্রগুপ্তি কী? ব্যবহার করেছেন তো তিনি সেই আদি অকৃত্রিম অস্ত্র- অতি ভয়ঙ্কর যাদু-অস্ত্র নিশ্চয়ই- ভাষা। ব্যবহারে, অতি ব্যবহারে, অব্যবহারে, অপ-ব্যবহারে জীর্ণ বাংলা ভাষা। কেমন করে কথার পট তৈরি করেন তিনি, গল্পের পট?

প্রথমে স্থির করেন পুরনো পথে হাঁটবেন না। চেনা পথ নয়, প্রৌঢ়া বিধবার মাথার চওড়া সিঁথির মতো আটপৌরে পথ নয় বরং কোনো পথই নেই যেখানে সেখানে শক্ত পা ফেলে নতুন পথ তৈরি করারই চেষ্টা করেছেন। এক পা ফেলে যেটুকু পথ এগুনো গেল, দ্বিতীয় পায়ে আবার ঠিক ততটুকুই নতুন পথ মিলল। আর এই পা ফেলাও আগে স্থির করে নেওয়া সোজা পথে নয়, এলোমেলোও নয়, পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই দিক নির্দিষ্ট হচ্ছে, আগেও নয়, পরেও নয় আর খানিকটা এগিয়েই দেখা যাচ্ছে পথ অভাবিতপূর্ব প্যাঁচালো, অনির্দেশ্যভাবে ঘোরানো। বালিতে জল ঢাললে যেমন আগে থেকে বোঝবার উপায়ই নেই ঠিক কীভাবে বালি থেকে পথ এগুবে। শহীদুল জহিরের ভাষা ব্যবহার অনেকটা এই রকম- কথনভঙ্গি, লিখনভঙ্গি যাই বলি না কেন এতে অসম্ভব নিস্পৃহতা আছে; আবেগের গোড়া কেটে দেওয়া, চিন্তার লজিকটাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা, আচমকা আনকা বাঁকফেরা, বাক্যের সুতোয় সুতোয় অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র তৈরি করা- এই রকম নানা ছবি তুলতে তুলতে, রেখা আঁকতে আঁকতে, চেনা-অচেনায়, স্বাভাবিক অস্বাভাবিকে মেলাতে মেলাতে কথন এগিয়ে চলে তাঁর। দীর্ঘ অবারিত বাক্যস্রোত, চিন্তার ছবির টানা প্রবাহ- তালিম খানিকটা যেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাছ থেকে নেওয়া- কিন্তু মেজাজে নয়, কথনবস্তুতে নয়, ওয়ালীউল্লাহর রসহীনতায়, দার্শনিকতায় নয়, কাঠ-কাঠ নিস্পৃহতায়ও নয়। শহীদুলের লেখায় আবেগ-ক্ষোভ-ক্রোধের সাগর ভাষার তলায় চাপা পড়ে থাকে। তবে তাদের ফোঁসানি কখনো কখনো টের পাওয়াও যায়। তখন এক একবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কলম মনের মধ্যে ভেসে উঠেই আবার মিলিয়ে যায়। মিলিয়ে যায় তার কারণ শহীদুল জহির ওয়ালীউল্লাহ নন, ইলিয়াসও নন, ওঁদের কথা মনে পড়ে যায় মাত্র। বাক্যের বিসর্পিলতায়, নানামুখী ভাবনা আর ছবি একসঙ্গে একটু অভিনবভাবে বেঁধে ফেলায় আর নিস্পৃহতায় এদের কথা মনে পড়ে বটে, কিন্তু নিষ্ঠুরতাঘেঁষা ইলিয়াসের শুকনো রুঠোবিদ্রুপ জহিরে নেই, ইলিয়াস আদ্যন্ত পাকা বাঁশ, মাথার মাঝখানের টিকিতে মহাচৈতন্য- জহির কখনোই তেমন নন।

তবে এখনো আমি কেন মার্কেজ আর যাদুবাস্তবতার কথা তুলছি না সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। দেখি না কতক্ষণ না তুলে পারা যায়।

http://sangbad.net.bd/images/2021/September/11Sep21/news/shahidul-jahir-3.jpg

বিদেশে কনফারেন্সে শহীদুল জহির

‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র দ্বিতীয় পাঠের পর যে শহীদুল জহিরকে এতক্ষণ ধরে বয়ান করলাম, সেই একই শহীদুলকে পাওয়া গেল তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’তে। শহীদুল এই উপন্যাসে আরো বিশদ, ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’রই ভাষা আরো স্বচ্ছন্দ, আরো পরিণত, যাকে পোশাকী ভাষায় বলে পূর্ণ প্রস্ফুটিত। দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্যগুলির ভিতরের সংযোগ এখন একেবারেই মসৃণ। সংযোগের চিহ্নগুলি পর্যন্ত পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলা গেছে। ভাষা এখন অনেক সহজে ছুটতে পারে। মনে হয়, শহীদুল কি এখন তাঁর লেখার মধ্যাহ্নের আকাশের চূড়ান্ত শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে ফেললেন? এর পরেই কি পশ্চিমে হেলতে শুরু করবে? প্রথম উপন্যাস থেকে এই দ্বিতীয় উপন্যাসের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা- তবে নিজের প্রিয় বিষয় মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া শহীদুল আর কী কী ধরনের বিষয়ের দিকে যাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে যাবেন তার একটি অল্প বিস্তর স্থির মানচিত্র বোধহয় এই লেখা থেকেই মিলে যেতে পারে।

‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ এককথায় একটি চাঁদে-পাওয়া উপন্যাস। কথাটা আর কীভাবে বলা যায় জানি না। চাঁদে-পাওয়া মানুষের গল্প খুব পুরনো, চাঁদে-পাওয়া মানুষ, চাঁদে-পাওয়া জনপদ, চাঁদে-পাওয়া জাতির গল্প আমরা বারবার পড়ি। ভাদ্র মাসের এক মেঘ-শূন্য পূর্ণিমা রাতে সুহাসিনী গ্রামের মফিজুদ্দিন সপরিবারে নিহত হয়, তার ঘর দুয়োর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মফিজুদ্দিনকে কেন এমন নৃশংসভাবে ঝাড়ে-বংশে ধ্বংস করা হলো, উপন্যাসের প্রথম দিকে তা জানার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু পাঠ এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে এই আগ্রহ স্তিমিত হতে হতে উপন্যাসের শেষে এসে তার আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। গল্পের বয়ানের ভিতর দিয়ে একের পর এক নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তুচ্ছের কল্পনায়, উদ্ভটত্বের আবিষ্কারে, চমৎকার কৌশল আর দক্ষতায় গল্পের ঘটনায় ঘটনায় এত নতুন যোগসূত্র তৈরি হয়ে যায় যে, একসময় মূল আগ্রহের ডালপালাই মনোযোগের সামনে আসে, মূল চলে যায় পিছনের দিকে। তারপর আরো নতুন নতুন ডালপালা অবিরত দেখা দিতে থাকে আর মফিজুদ্দিন কেন যে তার বিরাট পরিবারসহ খুন হয়েছিল তা জানার আগ্রহটা একেবারেই অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। বিন্যাস কৌশলে, বাক্য-বয়নে, ঘটনা উদ্ভাবনে বয়ান-বিষয়ের একোণে ওকোণে নতুন নতুন আলো ছুটে আসে আর মূল ঘটনাটা ছড়িয়ে গিয়ে পুরো বয়ানটাই গ্যাস পরিপূর্ণ বেলুনের মতো আগ্রহ-পূর্ণ হয়ে ওঠে। গল্প যখন বালির ওপর ঢালা জলের মতো ছোট ছোট জিভ মেলে এদিক ওদিক যেতে থাকে, মনে হয়, জটিল প্যাঁচালো সুতোর বান্ডিল যেখানে সেখানে ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে আছে, আবার তেমনি করে এগুতে এগুতেই ছিন্ন সুতোতন্তুগুলি চমৎকার জুড়ে জুড়েও যাচ্ছে। তার পরেও কিন্তু গল্পে ছেঁড়া সুতোর প্রান্ত ফেলে যাওয়ার কোনো অন্ত নেই। সমস্ত উপন্যাসের মানুষজন, গ্রামবাসীরা, গাছপালা লতাপাতা মাঠপ্রান্তর পুকুর দীঘি সব সব চাঁদে-পাওয়া, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আচ্ছন্ন, ঘোর-লাগা। বোবা-মা আর গরিবের গরিব বাবা আকালুর ছেলে মফিজুদ্দিন কী আকাক্সক্ষায় ঘোরে কেউ জানে না। তার বোবা মা ভুঁইচাপা ফুলের মতো, পূর্বাপর ইতিহাসশূন্য, মাঠে জঙ্গলে একদিন হঠাৎ ফুটন্ত দেখা গেছে। পাগলা কুকুর মেরে মফিজুদ্দিন তার গতি আর সংকল্পের অবিচলতা দেখিয়ে দেয়, গ্রামীণ অভিজাত বংশের মেয়ে ভানুমতিকে সে বিয়ে করবেই। এই মেয়েও চাঁদে-পাওয়া, ঘুম-হাঁটা, অভিভূত; পূর্ণিমা রাতে সে বিলের পারে শাড়ি ছায়া ইত্যাদি খুলে রেখে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে স্নান করে, মফিজুদ্দিনের হবু শ্বশুর, অনেক উঁচু বংশের সমাজপতি ভানুমতির বাবা বিয়ে বন্ধ করতে মফিজুদ্দিনকে খুন করার জন্য দুজন খুনী ডাকাতের হাতে তুলে দেয়। যমুনার বুকে নৌকোয় সিরাজগঞ্জের পতিতাপাড়ার ভাড়া করা বেশ্যাকে বাৎসল্যের সঙ্গে যৌনাকাক্সক্ষা বা বাৎসল্যের কারণেই রমণ-কামনা একাকার করে মফিজুদ্দিনকে বাঁচিয়ে দিতে চায় ডাকাত দুটির হাত থেকে আর সেই জন্য পালা করে ওদের সঙ্গে দিনরাত টানা রতিক্রিয়ায় লিপ্ত থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না ওরা দুজনেই রমণ-অবসাদে রমণরত অবস্থাতেই পঞ্চত্ব পায়। এরকম অজস্র আপাত অর্থহীন, তুচ্ছ, অসম্ভব ঘটনার তালিকা তৈরি করে দেওয়া যায় যা জীবনের অন্তহীন রহস্য আর অনির্দিষ্ট আকাক্সক্ষার দিকে ক্রমাগত আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে চায়। পূর্ণিমা রাতের কুহক একবারের জন্যও আমাদের ছাড়ে না, সেই কুহকীমায়া আমাদের উপন্যাস পাঠের ওপর চাদরের মতো বিছিয়ে থাকে, কিছুতেই ঘোর কাটে না। ঐ রকম আটপৌরে সাধারণের সাধারণ সুহাসিনী গাঁয়ের মানুষেরা, নিরক্ষর, অব্যাখ্যেয় ক্ষমতাধর মফিজুদ্দিনসহ সমাজ প্রকৃতি সবই এক স্তরান্তরিত বাস্তবে পৌঁছে যায়। এদিকে সংগোপনে পিছনে অবিরাম জীবন বয়ে চলতে থাকে।

এইবার, এইখানে, এই চোরাস্রোতের টানে পড়ে যাদুবাস্তবতার প্রসঙ্গটা তুলতেই হয়, যদিও সাহিত্যে যাদুবাস্তবতার তত্ত্বটা প্রায় অবান্তর বলেই মনে হওয়া সম্ভব। একালে যাদুবাস্তববাদী লেখক বলে যাঁদের দেগে-দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবাই কেন যে লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মাথাচাড়া দিয়েছেন, ইউরোপ থেকে তেমন নয় (যাদের কথা বা বলা যায় তাদের অনেকেই আবার সাহিত্যের ভাষার দিক থেকে ইউরোপের লাতিন ভাষাগোষ্ঠির সঙ্গেই সম্পর্কিত), তার কারণ ব্যাখ্যা করা একটু কঠিন। সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে, আমার মতে, একে দাঁড় করানো মুশকিলই বটে। লেখকে লেখকে যে তফাৎ, এমনকি সমকালের হিসেবেও, যাদুবাস্তববাদী বলে মার্কামারা লেখকে লেখকেও তেমনি তফাৎ। যাদুবাস্তবতার তত্ত্ব দিয়ে তাঁদের ইস্ত্রি করে সমান করা একটুও সম্ভব নয়। আসলে তত্ত্বটি কোনো কাজের কথা নয়, চিত্ত-চমৎকারী গল্প বলার নতুন এক রীতিই সাহিত্য পাঠকের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। আর সেই যাদুবাস্তবতা, কার্নিভ্যালেস্ক সাহিত্যতত্ত্বের সার্ভেন্তিস, কাফকা, ফকনার, হেমিংওয়ে ইত্যাদি অসংখ্য উৎসের সাম্প্রতিক এবং মনবিবশ করা উৎস হচ্ছে মার্কেজের কুহকী সাহিত্যের জগত। মার্কেজ নিজে বারবার এই তত্ত্বটিকে অস্বীকার করেন, কারণ তিনি জানেন তাঁর বয়ানরীতি যাদুগ্রস্ত হলেও কুহকী বাস্তবতা সৃষ্টি করেছেন অতীত বর্তমানের অনেক অনেক লেখক। তাঁর সমকালী হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’ উপন্যাসটি লিখিত হয়েছে, তাঁর সমকালেই লিখেছেন ফকনার, হেমিংওয়ে, আজও লিখছেন গ্যুন্টার গ্রাস।

এরকম একটা সহজ জায়গা থেকে দেখলে বলতে হয়, মার্কেজ চমৎকৃত করেছিলেন শহীদুল জহিরকে। তাঁর উপন্যাস যেমন চাঁদে-পাওয়া, তিনিও তেমনি কোনো তত্ত্বে নয়, একজন লেখকের গল্প বলার রীতিতে আচ্ছন্ন। এর ফলে তাঁর সাহিত্যে ঊনতা কতটা দেখা দিয়েছে? তিনি কি প্রতিধ্বনি মাত্র? আমার মনে হয়, রীতিটিকে নিজের লেখায় কাজ করতে দেবার ফলে তাঁর সাহিত্য থেকে তেমন কিছু খোয়া যায় নি। বাংলাদেশের ইতিহাস সমাজ দেশ কাল হারিয়ে যায়নি। বরং তাদের ত্রিমাত্রিক চতুর্মাত্রিক বাস্তবতা বহুস্তরা চেহারায় ধরা পড়েছে। তবে মার্কেসীয় মোহ যখন তাঁর লেখাকে অনুচিত শাসন করেছে, তখনই মনে হয় কোথায় যেন ভুল স্বর বাজে, তেমন খারাপ শোনাচ্ছে না কিন্তু তা শুদ্ধ স্বর নয়। তেমনি কখনো ভুল ছবি আসে, মন্দ লাগে না সেসব ছবি, কিন্তু তারা ভিতরের নয়, তারা যেন বাইরের। নৌকোর ভাড়া করা বেশ্যা সরলা ইরেন্দিরা, কায়েবানো জেন্তিলে আর মফিজুদ্দিন, মৃত্যুর সুতো, রমণে রমণে মরনের অধিবাস। সাহিত্যে বহুগ্রাহী পাঠকের কাছে শহীদুলের এমন মোহগ্রস্ততাও শেষ পর্যন্ত সয়ে যাবে বলেই মনে হয়।

আমার নিজেরই এখন মনে হচ্ছে, সম্পূর্ণ হলো না, শহীদুল জহিরের গল্প নিয়ে আলাদা করে আমাকে লিখতেই হবে। কিন্তু সে সময় এখন নেই। আরো একটি কথা মনে হচ্ছে, শহীদুল তাঁর নিজের সৃষ্টির ধনুতে বাণ যোজনা করে তার জ্যা আকর্ণ আকর্ষণ করেছিলেন, তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুল কর্ণমূল স্পর্শ করেছিল। বেশি কিছু তাঁর আর করার ছিল না বোধহয়।

ছবি

শিকিবু

ছবি

কবিতায় যখন অন্ত্যজ মানুষের কথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

ছলম

ছবি

তারাশঙ্করের ‘কবি’ এবং উত্তরহীন অনন্ত জিজ্ঞাসা

ছবি

রবীন্দ্রনাথ ও মানবতা

ছবি

বাংলা ভাষার নব্বইয়ের দশকের প্রধান কবিদের কবিতা

ছবি

একটি পূর্ণাঙ্গ কোষগ্রন্থ

ছবি

সুবেদার রাজ্জাকের বীরত্বগাথা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

লরেন্স ফারলিঙ্ঘেতির কবিতা

ছবি

অলকানন্দা

ছবি

মুখের দিকে না দেখে

সাময়িকী কবিতা

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

ছবি

তাপস গায়েনের কবিতা

ছবি

চির অন্তরালে বশীর আলহেলাল

ছবি

“জনপ্রিয় লেখকরা ক্ষমতাবান”

ছবি

শব্দহীন শোকের ভেলায় চলে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ!

ছবি

শোকার্ত পুষ্পাঞ্জলি

ছবি

মনন-মেধা আর বিনোদনের ত্রিবেণী সঙ্গম

ছবি

বিস্ময় না কাটে

ছবি

বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ছবি

কাজী নজরুল ও কাজী আব্দুল ওদুদ প্রসঙ্গ

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

লকডাউন

সাময়িকী কবিতা

ছবি

রাজবন্দি নজরুল

ছবি

তাঁর তৃতীয় জীবন

ছবি

নজরুল ইসলাম ও উন্মুক্ত পথ

ছবি

শহরের শেষ রোদ

ছবি

একজন মায়াতরুর গল্প

ছবি

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

ছবি

শিকিবু

tab

সাময়িকী

সোনা-মোড়া কথাশিল্প শহীদুল জহির

হাসান আজিজুল হক

শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

http://sangbad.net.bd/images/2021/September/11Sep21/news/shahidul-jahir-1.jpg

শহীদুল জহিরের লেখার শৈশব বাল্যকাল বলে কিছু নেই। তেইশ বছর বয়সে প্রথম গল্পের প্রকাশ, প্রায় কাছাকাছি সময়েই আর একটি বড় আকারের গল্প : তারপর সাতাশ বছর বয়সে তৈরি একটি ছোটগল্প সংগ্রহের পাণ্ডুলিপি। সেটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে যখন তিনি চৌত্রিশ। ছোটগল্প সংগ্রহ ‘পারাপার’-এর সব গল্প আমার পড়া নেই, মনে হয় বেশিরভাগই পড়িনি। এর কয়েক বছর পর, যখন তাঁর আটত্রিশে পা, ১৯৮৯ সালে বেরুল উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। একেবারে প্রদীপ্ত যৌবনের রচনা। না কোনো খোকামি, না কোনো বালখিল্যতা, প্রখর পরিণত লেখকের লেখা উপন্যাস। বলতে ইচ্ছে হয়, এই লেখাটি আর তিনি কোনোদিনই অতিক্রম করতে পারেননি, (ছোটগল্পের কথা এখানে হিসেবে ধরছি না) এমনি সুপরিণত, এমনি আবেগ আর বুদ্ধির টান টান ভারসাম্যে তা বাঁধা। লেখক হিসেবে জন্মেই টলমলে পায়ে হাঁটা নয়, একেবারে সেই মুহূর্ত থেকেই ঋজু মেরুদ-, খাড়া ঘাড়, খরদৃষ্টি। এইভাবেই আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল শহীদুলের। না, শহীদুলের নয়, তাঁর রচনার। লেখক নামে যে মানুষটি থাকে, জীবনযাপন করে, কাজে যায়, কাজে আসে, সেই মানুষ শহীদুল কোনোদিন আত্মপ্রকাশ করেন নি। সংগোপনে জীবনযাপন করেছেন তিনি, চলেও গেছেন প্রায় সকলের অজান্তেই। শুধু তাঁর লেখাগুলি যেভাবে নিঃসংকোচে আত্মপ্রকাশ করেছিল, বাংলা সাহিত্যে বিনা আড়ম্বরে একটা শক্ত মজবুত আসন দাবি করেছিল, সেই দাবি এখন অনপেক্ষ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।

http://sangbad.net.bd/images/2021/September/11Sep21/news/shahidul-jahir-2.jpg

শহীদুলের নজর ছিল মানব-বাস্তবের দিকে। নতুন কথা কিছু নয়, লেখক অলেখক সব মানুষেরই তাই থাকে। এই বাস্তব সৃষ্ট নয়, প্রদত্ত : আকাক্সক্ষা অনাকাক্সক্ষার বিষয় নয়- সব সময়ই হাজির, সদাই বিদ্যমান, অস্তিত্বের, চেতনার শর্ত। সেজন্য মানব-অস্তিত্ব জীবন কালের জন্য একটা সমগ্র- সময়, কাল, বস্তু, পট, প্রকৃতি, জীবজগত, জড়জগত সবকিছু নিয়ে এই সমগ্র। আমাদের অস্তিত্বে সেই সমগ্রের দখলই শেষ কথা। সব কাজ, সব চিন্তা, সব আচরণ, সব আবেগ আর প্রবৃত্তির চূড়ান্ত আভিমুখ্য এই সমগ্রের দিকে আর সমগ্র থেকে। বাস্তববাদী নয় কে? সবাই বাস্তববাদী, লেখকও তাই, অবাস্তববাদী লেখক নেই। কোদালকে সরাসরি কোদাল বলতে চান যে লেখক তাঁকে আমরা বাস্তবপন্থী, জীবন ঘনিষ্ঠ, জীবনবাদী বলতে চাইলেও এটা আমাদের খেয়াল থাকে না যে, বাস্তবের প্রতিবাস্তবও আছে, চেতনার ভেতর দিয়ে তা নির্মিত, মানুষসহ সব চেতনজীবীরই আছে এই বাস্তব। আসলে দুই বাস্তব- বহির্বাস্তব আর আন্তর-বাস্তব পরস্পর সম্পর্কিত হতে পারে আবার হতেই যে পারে তা প্রমাণ করা যায় না- অথচ এরা জুজুধান, সম্পর্কিত, সমন্বিত, মিশ্রিত জটিল কুটিল নানা অলিগলিতে বাঁধা আছে। এই দ্বিতীয় বাস্তব আমাদের মনোজগত, একান্তভাবে ব্যক্তিজগত, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত মনোভূমি। আমরা প্রত্যক্ষভাবে এখানেই বাঁচি, এখানেই মরি, এখানেই চিন্তা করি, এখানেই আবেগ ভালোবাসা ঘৃণা জন্মায়, কল্পনা সৃষ্টি প্রেম অপ্রেম এখানেই ওঠে পড়ে। এখানেই বহির্বাস্তবের অবিকলতা তৈরি হয়, অবিকলতার বিভ্রমও দেখা দেয়। বিভ্রান্তি, ভুল, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, একই বাস্তবের অগণ্য ভিন্নতা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির ভিন্নতা থেকেই তৈরি হয়। সব শিল্পের শিকড় কা- শাখা প্রশাখা ফুল ফল কাঁটা বিষের উৎস এখানেই।

বোধহয় একরকমে একটা প্রচণ্ড বিরোধিতার প্রসঙ্গই তোলা হলো। মিলবে না, মেলানো যাবে না। শিল্পের জমি, শিল্পের আকাশ একই সাথে পরস্পর জুড়ে আছে। স্থান আর স্থান থেকে প্রস্থান। চেতনার সঙ্গে সম্পর্কশূন্য বাইরের বাস্তব আর চেতনার সঙ্গে সংকর্ষণউপজাত ব্যক্তির প্রাতিস্বিকবাস্তব। একবার বলেছি, শহীদুল জহিরের নজর ছিল মানব বাস্তবের দিকে- প্রকৃতিলিপ্ত, সমাজ রাষ্ট্র দেশ সময়লগ্ন বহির্বাস্তব। এই বাস্তব কঠিন সত্য, আমাদের সকলের জন্য অনন্যোপায় সত্য অথচ এটা মাত্রই আধখানা। রাসেলের নিরপেক্ষ বস্তুজাত উপাত্ত তত্ত্ব- নিউট্রাল মনিজম-এর মতো। একদিকে মানব চেতনার সঙ্গে সম্পর্কশূন্য বস্তু-উপাত্ত, অন্যদিকে সেই উপাত্তজাত চেতনা আর বোধের অধিগত বাস্তব। দুই আধখানায় পুরো বাস্তব। বহির্বাস্তবের দিকে শহীদুলের কঠিন একরোখা নজর থাকলেও আধখানা সত্যটিও যেন দুভাগ হয়ে গিয়ে মাত্র সিকিতে দাঁড়িয়েছে; তাঁর সাহিত্যের বাকি তিন ভাগই যেন আন্তর্বাস্তবের খেলা। সাহিত্যের সেই আন্তর্বাস্তব বাড়ে কমে, স্থির হয়ে দাঁড়ায়, অস্থির হয়, অর্থ বা অর্থহীনতায় ভরে ওঠে, ভেঙে যায়, গড়ে ওঠে, অলীক অবাস্তব অশরীরী বা কঠিন তির্যক সত্যের থেকে সত্য বাস্তব থেকে বাস্তবতর হয়ে ওঠে। কিন্তু সিকি ভাগ কঠিন বাস্তব সত্যটুকু কখনোই অলীক হয়ে ওঠে না, দৃষ্টির মনোযোগের বাইরে যায় না, চষবার জমি হিসেবে চিরকাল মানবজমিন থেকে যায়- এতটুকু নড়চড় হয় না। তখন বুঝতে পারা যায়, একই বাস্তব সবাই দেখে বটে, চর্মচক্ষুসহ পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দেখা সবারই এক কিন্তু সেই দেখা সকলের বোধে নেই, বুদ্ধিতে নেই, আলোয় নেই, দীপ্তিতে নেই। সেই জন্যই সবাই লেখক নয়, সব লেখকও লেখক নয়, কোনো লেখকই কোনো লেখকের মতো নয়, সেই জন্যই পাই-পয়সা লেখক আনা আনা লেখক যেমন পাওয়া যায়, ক্বচিৎ কখনো প্রায় ষোলো আনা লেখকও মেলে। হিসেব করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় শহীদুল জহির কত আনার লেখক ছিলেন। তিন ভাগ অবাস্তব-বাস্তবকে মিলিয়ে যিনি সিকি ভাগ বাস্তবকে তীব্র তির্যক তীক্ষ্ণ করে তুলতে পেরেছিলেন, তিনি খুব সামান্য লেখক নিশ্চই ছিলেন না।

হিসেব করে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় শহীদুল জহির কত আনার লেখক ছিলেন। তিন ভাগ অবাস্তব-বাস্তবকে মিলিয়ে যিনি সিকি ভাগ বাস্তবকে তীব্র তির্যক তীক্ষ্ণ করে তুলতে পেরেছিলেন, তিনি খুব সামান্য লেখক নিশ্চয়ই ছিলেন না

গোটা বাংলা কথাসাহিত্যেই এই ধারা প্রায় অনুপস্থিত, তার সূত্রপাতও বেশিদিনের নয়। এই ধারা এখনও ক্ষীণ। বরং অনর্থক, অপটু, বোধহীন, উদ্দেশ্যহীন চর্চার ফলে প্রচুর জঞ্জাল আজকাল বাড়ছে আর বেড়েই চলেছে। বঙ্কিমে, রবীন্দ্রনাথে এই তৃতীয় নয়নের দৃষ্টিপাত মেলে, ধুর্জটিপ্রসাদে আছে সচেতন আড়ষ্টচর্চা, সতীনাথেও তা দেখি। তবে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ লিখে মানিক অসাধারণ শুরু করেছিলেন ও সফলতাও পেয়েছিলেন। শুরু করেই তিনি ছেড়ে দেন বটে, তবে কুণ্ডলি পাকানো সাপের মতো তাঁর সারা জীবনের সমস্ত লেখায় এটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েও থাকে। বাংলাদেশের সাহিত্যে একেবারেই আলাদা একটা জায়গা থেকে- সমাজ-বীক্ষণ, ব্যক্তির মধ্য দিয়ে সমাজ আর সমাজের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি- শুরু করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। শহীদুল জহির হয়ে ওঠেন তাঁর প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি। তবে উত্তরসূরি তার বেশি কিছু নয়, ছায়া প্রতিচ্ছায়া নয়, ধ্বনির প্রতিধ্বনি নয়, এক নতুন ওয়ালীউল্লাহ নয়, বরং ওয়ালীউল্লাহর ভিতর দিয়ে এক শহীদুল জহির, মৌলিক, ছাপিয়ে যাওয়া, চূড়ান্ত স্বতন্ত্র এক শহীদুল।

‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ঠিক কবে প্রথম পড়েছিলাম মনে নেই। ’৮৮-তে বেরুনোর পর কোনো একসময়ে হবে- ছ’মাসের মধ্যেও হতে পারে, বছর খানেকের ভেতরেও পারে। গাধার কাছে সোনার পিণ্ডের চেয়ে ঘাস বেশি পছন্দ, আমি অনেকটা সেইরকম ঘাসের দিকেই মনোযোগ দিয়েছিলাম। একে তো বইয়ের ম্যাড়মেড়ে সাদামাটা একটা নাম, হতে পারে বইটা একটা রাজনৈতিক প্রবন্ধ। বিচ্ছিরি রকম সস্তা সাদা মফস্বলি মলাটের ওপর হাতের লেখায় বইয়ের নামটা লেখা; মাঝখানে সাদা ফুটোওয়ালা একটা কালো পাথরে কাঁচা হাতের আঁকা দুটি পাতার জলজ কুসুমের ডাঁটি। সেয়ানা পাঠকও কখনো কখনো বোকাটে চোখে কোনো বইয়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। উপন্যাস দেখে পড়ে ফেলেছিলাম বটে, কিন্তু হয়তো সময় ছিল না, মন ছিল না, হয়তো তৈরিই ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল নতুন লেখা, সামান্য নড়েচড়ে বসার মতো, একটু চমকে উঠতে হয়, আচ্ছা, সময় করে আবার কখনো পড়া যাবে- এই হলো তখনকার প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয় পাঠের আগে বোধেও এলো না যে, এই বই এক আবির্ভাব। তৃতীয় পাঠে এসে মনে হলো আমার এই মত কোনোদিন আর বদলাবার প্রয়োজন নেই।

লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আব্দুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেলের ফিতে রায়সাবাজারের দিকে যেতে নবাবপুর সড়কের ওপর উঠতেই ফট করে ছিঁড়ে যায় এবং মাত্র বাহান্ন পৃষ্ঠা পরে এই উপন্যাসের শেষে আব্দুল মজিদ দৈনিক ইত্তেফাকে একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে তার বাড়িটি বিক্রি করে লক্ষ্মীবাজার থেকে বাস উঠিয়ে চলে যায়, ফলে যেনবা তার অস্তিত্বই মুছে যায়। আরম্ভে আর শেষে দুটি খবর মাত্র। প্রথম খবরটি তুচ্ছ, উদ্ভট, একেবারেই গুরুত্বহীন- ফট করে স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া আর দ্বিতীয় খবরটিতে যা আছে তা তো হরহামেশাই ঘটে থাকে, বাড়ি বেচে আর কোথাও চলে যাওয়া। এমন ঘটনা এমনি এমনিও ঘটতে পারে। কত কারণেই তো মানুষ বাড়ি বিক্রি করে বাস উঠিয়ে চলে যায়। কিন্তু শহীদুল জহিরের উপন্যাসে এই অতিশয় তুচ্ছ দুটি সংবাদের মাঝখানে আছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- একাত্তরের ন’মাস- পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশের ঢাকা শহরের একটি মহল্লা। এই মহল্লাটি শহীদুল জহিরের এক টুকরো বহির্বাস্তব। সেই বাস্তবই তাঁর উপন্যাসের অবলম্বন। ঐটুকু সীমানা-বাঁধা, সময়-বাঁধা, ঘটনা-বাঁধা বাস্তব অক্ষরশব্দবাক্যঠাসাই হয়ে মাত্র বাহান্ন পৃষ্ঠার মধ্যেই রূপান্তরিত হয়ে যায় সারা বাংলাদেশে। পুবে থেকে পশ্চিমে ছড়ানো, উত্তর থেকে দক্ষিণে সমুদ্রশায়ী বাংলাদেশে। তার বিস্তৃত রণাঙ্গনে। ঐ মহল্লার বিশ ত্রিশ হাজার মানুষ একাত্তরের সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। ন’মাসে ঐ মহল্লার নিরপেক্ষ স্থির বাস্তবই হচ্ছে শহীদুল জহিরের নির্মিত বাস্তবের মাত্র সিকি ভাগ কঠিন, অলঙ্ঘ্যনীয়, নৈর্ব্যক্তিক ও অপরিত্যাজ্য বাস্তব। শহীদুল সেই বাইরের বাস্তবেই ধূম-ধোঁয়া আগুন জল তৈরি করেছেন, যা স্থির আর প্রদত্ত, তাতে তীব্র অসহনীয় গতি সঞ্চার করেছেন। হাহাকার কান্না, পাহাড়-চাপা যন্ত্রণা, পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষের শরীরের খ-, নরমাংসের টুকরো কাককে দিয়ে খাওয়ানো, শতবার ধর্ষণে রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন উলঙ্গ নারীশরীর ফের আবার বেয়োনেটে ফুটিফাটা- উহ্, এরকম এক ভয়ঙ্কর বাংলাদেশ পিকাসোর কত কত গুয়ের্নিকা হয়ে শান্ত আর সর্পিল অক্ষর আর বাক্যের বাঁধনে তৈরি হয়ে যায়। এভাবেই শহীদুল নির্দিষ্ট বাস্তবকে শতবার অতিক্রমণ পরিক্রমণ করে জ্বলন্ত ফুটন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব সৃষ্টি করেন। তাঁর খননকাজের অন্ত নেই, স্তরের পর স্তর উন্মোচিত হচ্ছে, একটি একটি বাস্তব, অতিবাস্তব তৈরি হচ্ছে, দক্ষ হীরে-শিল্পীর কাটা হীরের মতো শঙ্কাহীন কোণে কোণে শঙ্কাহীন আলোকণা জ্বলছে নিভছে সংখ্যাহীন নক্ষত্রের মতো, প্রতিফলন ঘটাচ্ছে সূর্যের মাত্র সাত রং নয়, সাত শ’ সাত শ’ অকল্পনীয় রং; তাজা রক্ত, বাসি রক্ত, কালো রক্ত, যোনি থেকে উরু বেয়ে ঝুঁঝিয়ে নামা কুমারীর পবিত্র রক্ত, বদু মওলানা আর রাজাকার পিশাচ খোক্কসদের দুর্গন্ধ কালো রক্ত এই রকম রক্তের রং, এই রকম মাংসের রং। শহীদুল জহির মেলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধের অফুরন্ত অফুরান গল্প। গোলালো পরিসমাপ্ত গল্প নয়, চক্রাকারও নয়, নানা বিভঙ্গের সর্পিল গল্প। শুরুতেই শেষে চলে যায়, শেষে পৌঁছে আবার শুরুকে স্পর্শ করে, শুরুরও আগে চলে যায়, সময়ের ক্রমকে বারবার ভেঙে দেয়, সময় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত, আমাদের সুবিধেমতো বেঁধে দেওয়া সীমানা, নির্দিষ্টতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, সময় হয়ে ওঠে চিরবর্তমান। অসীম তার ধারণক্ষমতা। চোখের নিচে ভেসে ওঠে মানব সংসারের একটির পর একটি পরত- গূঢ় রহস্যময় লুকানো জীবনের সমস্ত তন্তুগুলি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই উপন্যাসের নাম ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ ছাড়া আর কী-বা হতে পারত তখন আর ভেবে পাই না।

এতসব কথা কি আমি কল্পনা করে লিখছি, না, লিখতে লিখতে কল্পনা করছি? যদি সবটাই কল্পনা না করে থাকি, তা হলে ভাবতে হয় শহীদুল জহিরের মন্ত্রগুপ্তি কী? ব্যবহার করেছেন তো তিনি সেই আদি অকৃত্রিম অস্ত্র- অতি ভয়ঙ্কর যাদু-অস্ত্র নিশ্চয়ই- ভাষা। ব্যবহারে, অতি ব্যবহারে, অব্যবহারে, অপ-ব্যবহারে জীর্ণ বাংলা ভাষা। কেমন করে কথার পট তৈরি করেন তিনি, গল্পের পট?

প্রথমে স্থির করেন পুরনো পথে হাঁটবেন না। চেনা পথ নয়, প্রৌঢ়া বিধবার মাথার চওড়া সিঁথির মতো আটপৌরে পথ নয় বরং কোনো পথই নেই যেখানে সেখানে শক্ত পা ফেলে নতুন পথ তৈরি করারই চেষ্টা করেছেন। এক পা ফেলে যেটুকু পথ এগুনো গেল, দ্বিতীয় পায়ে আবার ঠিক ততটুকুই নতুন পথ মিলল। আর এই পা ফেলাও আগে স্থির করে নেওয়া সোজা পথে নয়, এলোমেলোও নয়, পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই দিক নির্দিষ্ট হচ্ছে, আগেও নয়, পরেও নয় আর খানিকটা এগিয়েই দেখা যাচ্ছে পথ অভাবিতপূর্ব প্যাঁচালো, অনির্দেশ্যভাবে ঘোরানো। বালিতে জল ঢাললে যেমন আগে থেকে বোঝবার উপায়ই নেই ঠিক কীভাবে বালি থেকে পথ এগুবে। শহীদুল জহিরের ভাষা ব্যবহার অনেকটা এই রকম- কথনভঙ্গি, লিখনভঙ্গি যাই বলি না কেন এতে অসম্ভব নিস্পৃহতা আছে; আবেগের গোড়া কেটে দেওয়া, চিন্তার লজিকটাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা, আচমকা আনকা বাঁকফেরা, বাক্যের সুতোয় সুতোয় অপ্রত্যাশিত যোগসূত্র তৈরি করা- এই রকম নানা ছবি তুলতে তুলতে, রেখা আঁকতে আঁকতে, চেনা-অচেনায়, স্বাভাবিক অস্বাভাবিকে মেলাতে মেলাতে কথন এগিয়ে চলে তাঁর। দীর্ঘ অবারিত বাক্যস্রোত, চিন্তার ছবির টানা প্রবাহ- তালিম খানিকটা যেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাছ থেকে নেওয়া- কিন্তু মেজাজে নয়, কথনবস্তুতে নয়, ওয়ালীউল্লাহর রসহীনতায়, দার্শনিকতায় নয়, কাঠ-কাঠ নিস্পৃহতায়ও নয়। শহীদুলের লেখায় আবেগ-ক্ষোভ-ক্রোধের সাগর ভাষার তলায় চাপা পড়ে থাকে। তবে তাদের ফোঁসানি কখনো কখনো টের পাওয়াও যায়। তখন এক একবার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কলম মনের মধ্যে ভেসে উঠেই আবার মিলিয়ে যায়। মিলিয়ে যায় তার কারণ শহীদুল জহির ওয়ালীউল্লাহ নন, ইলিয়াসও নন, ওঁদের কথা মনে পড়ে যায় মাত্র। বাক্যের বিসর্পিলতায়, নানামুখী ভাবনা আর ছবি একসঙ্গে একটু অভিনবভাবে বেঁধে ফেলায় আর নিস্পৃহতায় এদের কথা মনে পড়ে বটে, কিন্তু নিষ্ঠুরতাঘেঁষা ইলিয়াসের শুকনো রুঠোবিদ্রুপ জহিরে নেই, ইলিয়াস আদ্যন্ত পাকা বাঁশ, মাথার মাঝখানের টিকিতে মহাচৈতন্য- জহির কখনোই তেমন নন।

তবে এখনো আমি কেন মার্কেজ আর যাদুবাস্তবতার কথা তুলছি না সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। দেখি না কতক্ষণ না তুলে পারা যায়।

http://sangbad.net.bd/images/2021/September/11Sep21/news/shahidul-jahir-3.jpg

বিদেশে কনফারেন্সে শহীদুল জহির

‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র দ্বিতীয় পাঠের পর যে শহীদুল জহিরকে এতক্ষণ ধরে বয়ান করলাম, সেই একই শহীদুলকে পাওয়া গেল তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’তে। শহীদুল এই উপন্যাসে আরো বিশদ, ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’রই ভাষা আরো স্বচ্ছন্দ, আরো পরিণত, যাকে পোশাকী ভাষায় বলে পূর্ণ প্রস্ফুটিত। দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্যগুলির ভিতরের সংযোগ এখন একেবারেই মসৃণ। সংযোগের চিহ্নগুলি পর্যন্ত পুরোপুরি লুকিয়ে ফেলা গেছে। ভাষা এখন অনেক সহজে ছুটতে পারে। মনে হয়, শহীদুল কি এখন তাঁর লেখার মধ্যাহ্নের আকাশের চূড়ান্ত শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে ফেললেন? এর পরেই কি পশ্চিমে হেলতে শুরু করবে? প্রথম উপন্যাস থেকে এই দ্বিতীয় উপন্যাসের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা- তবে নিজের প্রিয় বিষয় মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া শহীদুল আর কী কী ধরনের বিষয়ের দিকে যাচ্ছেন বা ভবিষ্যতে যাবেন তার একটি অল্প বিস্তর স্থির মানচিত্র বোধহয় এই লেখা থেকেই মিলে যেতে পারে।

‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ এককথায় একটি চাঁদে-পাওয়া উপন্যাস। কথাটা আর কীভাবে বলা যায় জানি না। চাঁদে-পাওয়া মানুষের গল্প খুব পুরনো, চাঁদে-পাওয়া মানুষ, চাঁদে-পাওয়া জনপদ, চাঁদে-পাওয়া জাতির গল্প আমরা বারবার পড়ি। ভাদ্র মাসের এক মেঘ-শূন্য পূর্ণিমা রাতে সুহাসিনী গ্রামের মফিজুদ্দিন সপরিবারে নিহত হয়, তার ঘর দুয়োর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মফিজুদ্দিনকে কেন এমন নৃশংসভাবে ঝাড়ে-বংশে ধ্বংস করা হলো, উপন্যাসের প্রথম দিকে তা জানার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু পাঠ এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে এই আগ্রহ স্তিমিত হতে হতে উপন্যাসের শেষে এসে তার আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। গল্পের বয়ানের ভিতর দিয়ে একের পর এক নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তুচ্ছের কল্পনায়, উদ্ভটত্বের আবিষ্কারে, চমৎকার কৌশল আর দক্ষতায় গল্পের ঘটনায় ঘটনায় এত নতুন যোগসূত্র তৈরি হয়ে যায় যে, একসময় মূল আগ্রহের ডালপালাই মনোযোগের সামনে আসে, মূল চলে যায় পিছনের দিকে। তারপর আরো নতুন নতুন ডালপালা অবিরত দেখা দিতে থাকে আর মফিজুদ্দিন কেন যে তার বিরাট পরিবারসহ খুন হয়েছিল তা জানার আগ্রহটা একেবারেই অপ্রধান হয়ে দাঁড়ায়। বিন্যাস কৌশলে, বাক্য-বয়নে, ঘটনা উদ্ভাবনে বয়ান-বিষয়ের একোণে ওকোণে নতুন নতুন আলো ছুটে আসে আর মূল ঘটনাটা ছড়িয়ে গিয়ে পুরো বয়ানটাই গ্যাস পরিপূর্ণ বেলুনের মতো আগ্রহ-পূর্ণ হয়ে ওঠে। গল্প যখন বালির ওপর ঢালা জলের মতো ছোট ছোট জিভ মেলে এদিক ওদিক যেতে থাকে, মনে হয়, জটিল প্যাঁচালো সুতোর বান্ডিল যেখানে সেখানে ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে আছে, আবার তেমনি করে এগুতে এগুতেই ছিন্ন সুতোতন্তুগুলি চমৎকার জুড়ে জুড়েও যাচ্ছে। তার পরেও কিন্তু গল্পে ছেঁড়া সুতোর প্রান্ত ফেলে যাওয়ার কোনো অন্ত নেই। সমস্ত উপন্যাসের মানুষজন, গ্রামবাসীরা, গাছপালা লতাপাতা মাঠপ্রান্তর পুকুর দীঘি সব সব চাঁদে-পাওয়া, পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আচ্ছন্ন, ঘোর-লাগা। বোবা-মা আর গরিবের গরিব বাবা আকালুর ছেলে মফিজুদ্দিন কী আকাক্সক্ষায় ঘোরে কেউ জানে না। তার বোবা মা ভুঁইচাপা ফুলের মতো, পূর্বাপর ইতিহাসশূন্য, মাঠে জঙ্গলে একদিন হঠাৎ ফুটন্ত দেখা গেছে। পাগলা কুকুর মেরে মফিজুদ্দিন তার গতি আর সংকল্পের অবিচলতা দেখিয়ে দেয়, গ্রামীণ অভিজাত বংশের মেয়ে ভানুমতিকে সে বিয়ে করবেই। এই মেয়েও চাঁদে-পাওয়া, ঘুম-হাঁটা, অভিভূত; পূর্ণিমা রাতে সে বিলের পারে শাড়ি ছায়া ইত্যাদি খুলে রেখে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে স্নান করে, মফিজুদ্দিনের হবু শ্বশুর, অনেক উঁচু বংশের সমাজপতি ভানুমতির বাবা বিয়ে বন্ধ করতে মফিজুদ্দিনকে খুন করার জন্য দুজন খুনী ডাকাতের হাতে তুলে দেয়। যমুনার বুকে নৌকোয় সিরাজগঞ্জের পতিতাপাড়ার ভাড়া করা বেশ্যাকে বাৎসল্যের সঙ্গে যৌনাকাক্সক্ষা বা বাৎসল্যের কারণেই রমণ-কামনা একাকার করে মফিজুদ্দিনকে বাঁচিয়ে দিতে চায় ডাকাত দুটির হাত থেকে আর সেই জন্য পালা করে ওদের সঙ্গে দিনরাত টানা রতিক্রিয়ায় লিপ্ত থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না ওরা দুজনেই রমণ-অবসাদে রমণরত অবস্থাতেই পঞ্চত্ব পায়। এরকম অজস্র আপাত অর্থহীন, তুচ্ছ, অসম্ভব ঘটনার তালিকা তৈরি করে দেওয়া যায় যা জীবনের অন্তহীন রহস্য আর অনির্দিষ্ট আকাক্সক্ষার দিকে ক্রমাগত আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে চায়। পূর্ণিমা রাতের কুহক একবারের জন্যও আমাদের ছাড়ে না, সেই কুহকীমায়া আমাদের উপন্যাস পাঠের ওপর চাদরের মতো বিছিয়ে থাকে, কিছুতেই ঘোর কাটে না। ঐ রকম আটপৌরে সাধারণের সাধারণ সুহাসিনী গাঁয়ের মানুষেরা, নিরক্ষর, অব্যাখ্যেয় ক্ষমতাধর মফিজুদ্দিনসহ সমাজ প্রকৃতি সবই এক স্তরান্তরিত বাস্তবে পৌঁছে যায়। এদিকে সংগোপনে পিছনে অবিরাম জীবন বয়ে চলতে থাকে।

এইবার, এইখানে, এই চোরাস্রোতের টানে পড়ে যাদুবাস্তবতার প্রসঙ্গটা তুলতেই হয়, যদিও সাহিত্যে যাদুবাস্তবতার তত্ত্বটা প্রায় অবান্তর বলেই মনে হওয়া সম্ভব। একালে যাদুবাস্তববাদী লেখক বলে যাঁদের দেগে-দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবাই কেন যে লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকা মহাদেশ থেকে মাথাচাড়া দিয়েছেন, ইউরোপ থেকে তেমন নয় (যাদের কথা বা বলা যায় তাদের অনেকেই আবার সাহিত্যের ভাষার দিক থেকে ইউরোপের লাতিন ভাষাগোষ্ঠির সঙ্গেই সম্পর্কিত), তার কারণ ব্যাখ্যা করা একটু কঠিন। সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে, আমার মতে, একে দাঁড় করানো মুশকিলই বটে। লেখকে লেখকে যে তফাৎ, এমনকি সমকালের হিসেবেও, যাদুবাস্তববাদী বলে মার্কামারা লেখকে লেখকেও তেমনি তফাৎ। যাদুবাস্তবতার তত্ত্ব দিয়ে তাঁদের ইস্ত্রি করে সমান করা একটুও সম্ভব নয়। আসলে তত্ত্বটি কোনো কাজের কথা নয়, চিত্ত-চমৎকারী গল্প বলার নতুন এক রীতিই সাহিত্য পাঠকের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। আর সেই যাদুবাস্তবতা, কার্নিভ্যালেস্ক সাহিত্যতত্ত্বের সার্ভেন্তিস, কাফকা, ফকনার, হেমিংওয়ে ইত্যাদি অসংখ্য উৎসের সাম্প্রতিক এবং মনবিবশ করা উৎস হচ্ছে মার্কেজের কুহকী সাহিত্যের জগত। মার্কেজ নিজে বারবার এই তত্ত্বটিকে অস্বীকার করেন, কারণ তিনি জানেন তাঁর বয়ানরীতি যাদুগ্রস্ত হলেও কুহকী বাস্তবতা সৃষ্টি করেছেন অতীত বর্তমানের অনেক অনেক লেখক। তাঁর সমকালী হুয়ান রুলফোর ‘পেদ্রো পারামো’ উপন্যাসটি লিখিত হয়েছে, তাঁর সমকালেই লিখেছেন ফকনার, হেমিংওয়ে, আজও লিখছেন গ্যুন্টার গ্রাস।

এরকম একটা সহজ জায়গা থেকে দেখলে বলতে হয়, মার্কেজ চমৎকৃত করেছিলেন শহীদুল জহিরকে। তাঁর উপন্যাস যেমন চাঁদে-পাওয়া, তিনিও তেমনি কোনো তত্ত্বে নয়, একজন লেখকের গল্প বলার রীতিতে আচ্ছন্ন। এর ফলে তাঁর সাহিত্যে ঊনতা কতটা দেখা দিয়েছে? তিনি কি প্রতিধ্বনি মাত্র? আমার মনে হয়, রীতিটিকে নিজের লেখায় কাজ করতে দেবার ফলে তাঁর সাহিত্য থেকে তেমন কিছু খোয়া যায় নি। বাংলাদেশের ইতিহাস সমাজ দেশ কাল হারিয়ে যায়নি। বরং তাদের ত্রিমাত্রিক চতুর্মাত্রিক বাস্তবতা বহুস্তরা চেহারায় ধরা পড়েছে। তবে মার্কেসীয় মোহ যখন তাঁর লেখাকে অনুচিত শাসন করেছে, তখনই মনে হয় কোথায় যেন ভুল স্বর বাজে, তেমন খারাপ শোনাচ্ছে না কিন্তু তা শুদ্ধ স্বর নয়। তেমনি কখনো ভুল ছবি আসে, মন্দ লাগে না সেসব ছবি, কিন্তু তারা ভিতরের নয়, তারা যেন বাইরের। নৌকোর ভাড়া করা বেশ্যা সরলা ইরেন্দিরা, কায়েবানো জেন্তিলে আর মফিজুদ্দিন, মৃত্যুর সুতো, রমণে রমণে মরনের অধিবাস। সাহিত্যে বহুগ্রাহী পাঠকের কাছে শহীদুলের এমন মোহগ্রস্ততাও শেষ পর্যন্ত সয়ে যাবে বলেই মনে হয়।

আমার নিজেরই এখন মনে হচ্ছে, সম্পূর্ণ হলো না, শহীদুল জহিরের গল্প নিয়ে আলাদা করে আমাকে লিখতেই হবে। কিন্তু সে সময় এখন নেই। আরো একটি কথা মনে হচ্ছে, শহীদুল তাঁর নিজের সৃষ্টির ধনুতে বাণ যোজনা করে তার জ্যা আকর্ণ আকর্ষণ করেছিলেন, তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুল কর্ণমূল স্পর্শ করেছিল। বেশি কিছু তাঁর আর করার ছিল না বোধহয়।

back to top